Home আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৭

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৭

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৭
সাবিলা সাবি

পরদিন সকালবেলা।
লন্ডনের আকাশে তখনও সকালের ম্লান কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। টাউন হাউসের বিশাল কাচের জানালাগুলো দিয়ে ধূসর সকালের আলো ধীরে ধীরে কক্ষের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছিল।
সেই আলোয় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল দানিয়েল।
পরনে নিখুঁতভাবে পরা গাঢ় রঙের ফরমাল স্যুট, তার ওপর একই রঙের শার্পকাট ব্লেজার। গলায় বাঁধা টাইটি ছিল একদম নিখুঁতভাবে সাজানো। স্যুটের ওপর জড়ানো লম্বা কালো ওভারকোটটি তার ব্যক্তিত্বকে আরও গম্ভীর এবং প্রভাবশালী করে তুলেছে। চুলগুলো স্বাভাবিকভাবেই পেছনের দিকে আঁচড়ানো তবে দুই একটা অবাধ্য চুল কপাল বেয়ে চোখের ওপর এসে পড়েছে। আর চোখজোড়ায় সেই পরিচিত ঠান্ডা, স্থির দৃষ্টি—যে দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়েও কেউ সহজে বুঝতে পারে না, তার মাথার ভেতর ঠিক কী চলছে।

এই মানুষটাকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সবাই এক নামে চেনে ফ্যান্টম কিং হিসেবে।
যে নিজের অস্তিত্বের চেয়ে নিজের ছায়াকেই বেশি পরিচিত করেছে। দানিয়েলের এক হাতে কফির কাপ, আর অন্য হাতে ফোন। সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে ওপাশের মানুষের কথা নীরবে শুনছিল। মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কারন সে কথাগুলো শুনছে না, বরং প্রতিটি শব্দের ওজন মেপে নিচ্ছে।
অবশেষে নিরবতা ভেঙ্গে ধীরস্বরে বলে উঠলো, “সব প্রস্তুত?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসতেই দানিয়েল জানালার বাইরে তাকিয়ে জবাব দিলো “পারফেক্ট।”
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে আবার বলল, “বাট প্ল্যান একটু চেঞ্জ করো।”
ওপাশ থেকে কিছু একটু বলা হলো। দানিয়েলের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
“ওদের শুধু ভয় দেখানোর দরকার নেই।”

তার কণ্ঠ নিচু, অথচ অস্বাভাবিকভাবেই শান্ত। “ওরা যেন বুঝতে পারে, কার সীমা অতিক্রম করেছে।”
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে বলল, “হিয়াকে গ্রেফতার করা পর্যন্ত ঠিক ছিলো।”
তার আঙুল কফির কাপের গায়ে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল “জেরা করা পর্যন্ত ঠিক ছিলো।”
দানিয়েলের চোখে এবার আগের সেই শান্ত ভাবটা আর নেই “কিন্তু ওরা যা করেছে…” সে বাকিটা শেষ করল না। কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর ঠান্ডা গলায় বলল,
“ওরা হিয়াকে জেরা করার নামে যতটা সীমা অতিক্রম করেছে, তার হিসাব এবার ওদের দিতে হবে।”
ওপাশ থেকে কেউ সম্ভবত বলল, “স্যার, আপনি কি CID এর জন্য—”
দানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো “না।”
তার গলায় এবার এমন দৃঢ়তা ফুটে উঠল যে প্রশ্নটা আর এগোল না। “এটা আমার পেছনে পড়ে থাকার প্রতিশোধ নয়।”

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে পুনরায় বললো— “CID আমাকে খুঁজেছে, আমার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে, আমার নাম বের করার চেষ্টা করেছে এসব নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।”
তার চোখে ধীরে ধীরে সেই পরিচিত শীতলতা ফিরে এলো “কিন্তু তারা আমার মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেরার নামে রি/মান্ডে নিয়ে গিয়ে নি/র্যাতন করেছে।”
এক মুহূর্ত থেমে সে বলল, “এটার উত্তর আমি দেব।”
ওপাশ থেকে আবার কিছু কথা বলা হলো। দানিয়েল মৃদুস্বরে বললো “না। টিমের কেউ কিছু জানবে না।”
তারপর আরও স্পষ্ট করে বলল, “ইভানা, মার্ক, জ্যাক, হিয়া কেউ না।”
“সবকিছু আমার নির্দেশে হবে।”
দানিয়েল ফোনটা কানের কাছ থেকে সামান্য সরিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। “আমি চাই না হিয়া জানুক, ওকে এই প্লানে আমি ইনভলব করবো না। কারণ এটা ওর লড়াই নয়। এটা আমার একান্ত লড়াই।”
কয়েক সেকেন্ড পর দানিয়েল আবার ফোন কানে তুলে বললো “আর একটা কথা।”
ওপাশের মানুষটি চুপ হয়ে গেল। “CID যেন এখন কিছুই সন্দেহ না করে।”
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল “ওদের মনে হতে দাও, হিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার পর সবকিছু আগের মতো হয়ে গেছে।”

সে টেবিলের ওপর রাখা কালো লেদারের ফাইলটার দিকে তাকাল। “কারণ আসল সমস্যা তখনই শুরু হবে, যখন ওরা ভাববে কোনো সমস্যা নেই।”
কথাটা বলেই দানিয়েল কল কেটে দিল। কক্ষটা আবার নীরব হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে ডেস্কের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কালো ফাইলটা খুলতেই ভেতরে একের পর এক নথি চোখে পড়ল। কয়েকজন CID অফিসারের নাম, তাদের ছবি, কয়েকটি লোকেশনের তথ্য এবং এমন কিছু বিবরণ যেগুলো এখনো CID-এর নিজেদের কাছেও অজানা।
দানিয়েল কয়েক মুহূর্ত সেগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব ধীরে ফাইলটা বন্ধ করে দিল। চোখে তখন আর কোনো আবেগ নেই। শুধু সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তুতি।
হিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সময় CID ভেবেছিল, তারা একজন আন্তর্জাতিক অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। তারা ভেবেছিল, রিমান্ডে নিয়ে জেরা করে হয়তো দানিয়েল সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য বের করে আনতে পারবে, যা এতদিন তাদের নাগালের বাইরে ছিল।
কিন্তু তারা একটা বিষয় বুঝতে পারেনি। তারা শুধু হিয়াকে গ্রেফতার করেনি তারা এমন একজন মানুষের সীমারেখায় হাত দিয়েছে, যার নাম প্রকাশ্যে খুব কম মানুষ জানে, অথচ যার ছায়া পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে আতঙ্কের কারণ।
ফ্যান্টম কিং (Phantom King).

দানিয়েল ধীরে ধীরে কালো ওভারকোটটা ঠিক করে নিল। তারপর আবার একবার ডেস্কের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে তাকাল। ফাইলের ভেতরের প্রতিটি তথ্য তার পরিকল্পনার একটি করে অংশ। কিন্তু সেই পরিকল্পনার শেষ কোথায়, সেটা এখনো কেউ জানে না।
হিয়া নয়। ইভানা নয়। মার্ক কিংবা জ্যাকও নয়।
দানিয়েলের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর কাছেও এই পরিকল্পনার কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু দানিয়েল জানে।
সে ধীরে ধীরে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে লন্ডনের সকাল তখন পুরোপুরি জেগে উঠেছে। রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষ নিজেদের কাজে বেরিয়ে পড়েছে। শহরটা নিজের স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছে।
কেউ জানে না, এই স্বাভাবিকতার আড়ালে অন্য একটি খেলা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
দানিয়েল জানালার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “তোমরা হিয়াকে রিমান্ডে নিয়েছিলে…”

কয়েক সেকেন্ড থামল সে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল শীতল হাসি।
“তোমরা হয়তো ভেবেছিলে, হিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।”
সে ধীরে চোখ নামিয়ে নিজের কব্জির ঘড়ির দিকে তাকাল।
“কিন্তু তোমরা জানো না…” তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এলো।
“তোমাদের সেই একটা সিদ্ধান্তই আমাকে খেলাটা বদলে দেওয়ার কারণ দিয়েছে।”
দানিয়েল আর কিছু বলল না। শুধু কালো ওভারকোটের কলারটা ঠিক করে স্টাডি রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে পৌঁছে এক মুহূর্তের জন্য থামল সে। পেছনে ফিরে আরেকবার কালো ফাইলটার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “হিয়াকে ছুঁয়েছো…”
তার চোখে এবার ঠান্ডা আগুনের মতো কিছু একটা জ্বলে উঠল। “এবার তোমাদের বুঝতে হবে, একজন মানুষকে আঘাত করার আগে তার পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে সেটা না জেনে সীমা অতিক্রম করার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।”

কথাটা শেষ করে দানিয়েল দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। দরজাটা ধীরে ধীরে তার পেছনে বন্ধ হয়ে গেল। আর সেই বন্ধ দরজার ওপাশে থেকে গেল একটি কালো ফাইল, কয়েকটি গোপন তথ্য এবং এমন একটি পরিকল্পনা যার অস্তিত্ব সম্পর্কে হিয়া কিংবা দানিয়েলের নিজের টিমও কিছু জানে না।

অন্যদিকে, CID হেডকোয়ার্টারে তখনও কেউ বুঝতে পারেনি গতকাল তারা যাকে রি/মান্ডে নিয়ে জেরা করেছিল, তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর আসলে তদন্তের একটি অধ্যায় শেষ হয়নি।
বরং অজান্তেই তারা খুলে দিয়েছে এমন এক অধ্যায়ের দরজা, যেখানে এবার তদন্তকারী নয় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফ্যান্টম কিং নিজেই খেলাটা পরিচালনা করবে।

সকালের আলোয় ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙল হিয়ার।
কয়েক মুহূর্ত সে চোখ বন্ধ রেখেই বিছানায় শুয়ে রইল। মাথার ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে ভারী লাগছিল। গত রাতের অতিরিক্ত সিগারেটের ধোঁয়া, একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে কেটে যাওয়া দীর্ঘ রাত আর শেষ পর্যন্ত চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ার কারণে শরীরটাও যেন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চাইছিল না।
ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই প্রথমে তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সামনের টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটায়। স্ক্রিন তখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভিডিওটা অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে, কিন্তু স্ক্রিনে এখনো স্থির হয়ে থাকা মুখটা দেখে হিয়ার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা
হাসি ফুটে উঠল।
লিওন।
গত রাতে কতক্ষণ ধরে যে সে লোকটার ভিডিও দেখেছে, তার কোনো হিসাব নেই। কখনো তার সাক্ষাৎকার, কখনো সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দৃশ্য, আবার কখনো শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। শেষ পর্যন্ত নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

হিয়া ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ঘুমের কারণে এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলগুলো এক হাতে সরিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখার জন্য স্ক্রিন অন করতেই তার চোখ হঠাৎ ক্যালেন্ডারের তারিখে আটকে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে স্থির হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর হঠাৎ তার চোখ দুটো একটু বড় হয়ে গেল।
“ওহো…”খুব আস্তে কথাটা বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে।
আর মাত্র দুদিন। দুদিন পর লিওনের জন্মদিন।
মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমের সমস্ত ভার তার চোখ থেকে উধাও হয়ে গেল। হিয়া বিছানার পাশে বসে আবার ফোনের তারিখটা দেখল, হঠাৎ নিজের মনে পড়া কথাটাকে নিশ্চিত করে নিতে চাইলো।
তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে একটা দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
“আমার বাজপাখির বার্থডে…” কথাটা বলার সময় তার চোখে এমন উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল, যা গত কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তির সঙ্গে একেবারেই মেলেনি।
হিয়া লিওনের জন্মদিন ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ নয়। বরং তার কাছে এখন বিষয়টা এমন, লিওনের জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ই কোনো না কোনোভাবে তার নিজের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আর আজ সকালে হঠাৎ জন্মদিনের কথা মনে পড়তেই তার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা এলো, সেটা ছিল খুব স্বাভাবিক—লিওনকে কী দেওয়া যায়?

এতো বছর সে নিজেকে ভাইপার হিসেবে তৈরি করতে ব্যাস্ত ছিলো তবুও লিওনের জন্মদিন সে কখনোই ভোলেনি। কলেজ লাইফে লিওনের বার্থডে তার বন্ধুরা যখন পালন করেছিলো, সেদিনই সে প্রথম জেনেছিলো লিওনের জন্মদিনের তারিখ। গত কয়েকবছর সে লিওনের নামের বার্থডে কেক কাটতো একাই মোম জ্বালিয়ে কারন তখন এরচেয়ে বেশি কিছু করার বা লিওনকে খুঁজে নেয়ার কোনো রাস্তাই তার কাছে ছিলোনা। তবে আজকে সময় আর পরিস্থিতি একদম ভিন্ন।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের ভেতর কয়েক পা হাঁটতে হাঁটতে বিভিন্ন জিনিসের কথা ভাবল, কিন্তু কোনো কিছুই তার পছন্দ হলো না। লিওনের জন্য সাধারণ কোনো ঘড়ি, দামি গাড়ি, কিংবা অন্য কোনো বিলাসবহুল উপহার তার কাছে যথেষ্ট মনে হলো না। এমন কিছু দিতে হবে, যেটার সঙ্গে শুধু অর্থের মূল্য নয়, একটা আলাদা অর্থও জড়িয়ে থাকবে।
হিয়া কিছুক্ষণ জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল একটি জিনিসের কথা। তার চোখের দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।

সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে কক্ষের একপাশে রাখা আলমারির কাছে গেল। দরজাটা খুলে ভেতরের কয়েকটি জিনিস সরিয়ে নিচের দিকে থাকা একটি গোপন ড্রয়ার বের করল। ড্রয়ারটির ভেতর থেকে সে কালো ভেলভেটের একটি ছোট বাক্স তুলে নিল।
বাক্সটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে ঢাকনাটা খুলল।
সকালের আলো এসে ঠিক সেই মুহূর্তে বাক্সের ভেতরের পাথরটার ওপর পড়ল। নীলচে এক ঝলক আলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
Blue Star Diamond।

থাইল্যান্ড থেকে হিয়া নিজে সংগ্রহ করেছিল এই বিরল নীল হীরাটি। পরে আসাদ খান এটা নিতে লন্ডনে এসেছিল। হীরাটি হিয়ার কাছে পৌঁছানোর পর থেকেই সেটার গন্তব্য প্রায় ঠিকই ছিল—দানিয়েল।
কারণ হিয়া এ ধরনের বিরল এবং মূল্যবান জিনিস নিজের কাছে জমিয়ে রাখে না। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার হাতে আসা এমন বিশেষ জিনিসগুলো সাধারণত সে দানিয়েলের কাছেই তুলে দেয়। এই হীরাটার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হওয়ার কথা ছিল না।
কিন্তু আজ হিয়া হীরাটার দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু ভাবল। সে আঙুলের ডগা দিয়ে পাথরটার ওপর খুব আলতো করে স্পর্শ করল। তারপর নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে বলল, “সরি, বস…”
কয়েক মুহূর্ত পর তার চোখে আবার সেই দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এলো “এইবার এটা আপনার জন্য না।”
হিয়ার চোখের সামনে তখন লিওনের মুখ ভেসে উঠল।
“এটা আমার বাজপাখির জন্য।”

তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এই ব্লু স্টার ডায়মন্ড দিয়েই সে লিওনের জন্য একটি হাতঘড়ি বানাবে। এমন একটি ঘড়ি, যার ডায়ালে এই বিরল নীল হীরাটার নিখুঁতভাবে কাটা অংশ থাকবে। ঘড়িটা হবে একেবারে ইউনিক—শুধু দামি নয়, এমন একটি জিনিস যা পৃথিবীর আর কারও হাতে থাকবে না।
কারণ হিয়া লিওনকে এমন কিছুই দিতে চায়নি, যা অন্য কারও কাছেও থাকতে পারে। সে বাক্সটা বন্ধ করে নিজের হাতে শক্ত করে ধরে রাখল। তার ঠোঁটে তখনও সেই হাসি।
“দেখি, দিলবার… আমার দেওয়া গিফটটা পেয়ে তোমার মুখটা কেমন হয়।”
কথাটা বলেই সে ফোনটা হাতে তুলে ইভানাকে কল করল।
“ইভানা, রেডি হ। আজকে একটু বাইরে যেতে হবে।”
ওপাশ থেকে ইভানা জিজ্ঞেস করলো “কোনো ইমার্জেন্সি মিশন আছে কি মিস্ট্রেস?”
হিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“আমার জন্য একটা চপার কিনব।” কথাটা বলেই কল কেটে দিল সে। কল কেটে দিয়ে সে প্রস্তুত হতে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর টাউন হাউসের সামনে এসে দাঁড়াল হিয়া। তার সঙ্গে ইভানাও ছিল। গাড়ি আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। হিয়া কোনো কথা না বলে গাড়িতে উঠে বসল। ইভানাও তার পাশে গিয়ে বসল।
গাড়ি টাউন হাউস ছেড়ে দানিয়েলের ব্যক্তিগত হেলিপ্যাডের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
কিছুক্ষণ পর তারা শহরের ব্যস্ত এলাকা পেরিয়ে দানিয়েলের ব্যক্তিগত হেলিপ্যাডে এসে পৌঁছাল।
বিশাল হেলিপ্যাডজুড়ে একাধিক চপার দাঁড়িয়ে আছে। দানিয়েলের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সেখানে সবসময়ই বেশ কয়েকটি চপার প্রস্তুত থাকে।
গাড়ি থেকে নেমে হিয়া ধীরে ধীরে সেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। ইভানা তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চপারগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“মিসট্রেস, আপনি তো চপার পছন্দ করেন না। আপনি তো সবসময় বাইক পছন্দ করেন।”
হিয়া থেমে ইভানার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
“পছন্দ করি না।”
“তাহলে হঠাৎ চপার?”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর চপারগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “সবকিছু পছন্দ করার জন্য কিনতে হয় না, ইভানা। কখনো কখনো কাজের জন্যও কিছু জিনিস নিজের কাছে রাখতে হয়।”
ইভানা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
“তাহলে এখান থেকে একটা চপার নেবেন?”
হিয়া ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। তবে যেটা আছে, সেটা সেভাবেই থাকবে না।”
ইভানা বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল। হিয়া সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চপারগুলোর দিকে আরেকবার তাকিয়ে নিজের পছন্দের একটি চপার বেছে নিল।

“এটা কাস্টমাইজ করাব। L আর H দিয়ে।”
ইভানা আর কোনো প্রশ্ন করল না।
হিয়া চপারটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে তখন এমন এক পরিকল্পনার ছাপ, যার সামান্যতম ধারণাও ইভানার নেই।
কারণ এই চপারটা শুধু তার নিজের ব্যবহারের জন্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিওনের জন্মদিনকে ঘিরে তার আরও একটি গোপন পরিকল্পনা।
কিন্তু সেই পরিকল্পনার কথা এখন কাউকেই জানানো যাবে না। হিয়া ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত দুষ্টু হাসিটা ফুটিয়ে তুলল।
“দেখি, বাজপাখি…”
তার চোখে তখন শিশুসুলভ আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে সেই উন্মাদনা, যেটা শুধু লিওনের কথা উঠলেই তার মধ্যে দেখা যায়।
“তোমার এই জন্মদিনটা কতটা মনে রাখার মতো করে দিতে পারি।”

সকাল পেরিয়ে কখন যে বিকেল হয়ে গেছে, হিয়া নিজেও খেয়াল করেনি।
সকালে ব্যক্তিগত জুয়েলারি ওয়র্কশপে এসে যে কাজটা দিয়ে গিয়েছিল, এতক্ষণে সেটাই সম্পূর্ণ হয়েছে।
লিওনের জন্য তৈরি করা বিশেষ ঘড়িটা এখন তার সামনে রাখা।
কারিগররা শেষবারের মতো ঘড়িটা পরীক্ষা করে হিয়ার সামনে এগিয়ে দিল।
হিয়া ধীরে ধীরে ঘড়িটা হাতে তুলে নিল।
ঘড়িটার ডায়ালের ঠিক মাঝখানে নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে ব্লু স্টার ডায়মন্ডের একটি অংশ। নীল পাথরটির স্বাভাবিক দীপ্তিকে আরও স্পষ্ট করে তুলতেই ঘড়িটির পুরো নকশা তৈরি করা হয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকাজের প্রতিটি অংশে ছিল হিয়ার নিজের দেওয়া নির্দেশনার ছাপ।

ঘড়িটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল হিয়া।
সকালে যখন ডায়মন্ডটা কারিগরদের হাতে দিয়ে গিয়েছিল, তখন থেকেই তার মাথায় ঘড়িটার প্রতিটি খুঁটিনাটি ঠিক করা ছিল। ডায়ালের মাপ থেকে শুরু করে পাথরটির অবস্থান কোনো কিছুতেই সে সামান্যতম ভুল চায়নি।
এখন সেই কল্পনাটাই বাস্তবে তার হাতে।
হিয়া ঘড়িটা ঘুরিয়ে একবার পেছনের অংশটাও দেখল। তারপর আবার ডায়ালের দিকে তাকাল। নীল পাথরটার ওপর আলো পড়তেই তার চোখে তৃপ্তির ঝিলিক ফুটে উঠল।
ঘড়িটা ছিল নিখুঁত, মার্জিত এবং অত্যন্ত সাদাসিধে সৌন্দর্যের। বাইরে থেকে দেখলে প্রথম নজরে এটাকে শুধু একটি দামি বিলাসবহুল ঘড়ি বলেই মনে হবে। কিন্তু একটু কাছ থেকে তাকালেই বোঝা যাবে—
এটা সাধারণ কোনো ঘড়ি নয়। আর ঘড়ির পেছনে ছিল মাত্র একটি ছোট্ট খোদাই—L
একটি অক্ষর। কিন্তু সেই একটি অক্ষরের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল হিয়ার পুরো অনুভূতি।
এমন ঘড়ি পৃথিবীর আর কারও হাতে নেই। আর কখনো থাকবেও না। কারণ এটা শুধু একটি মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরি বিলাসবহুল ঘড়ি নয়। এটা তৈরি হয়েছে একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্যে, তার একমাত্র ভালোবাসা একমাত্র অবসেশন লিওনের জন্য।
হিয়া ধীরে ধীরে ঘড়িটার ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল।
তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“এটা শুধু তোমার জন্য, বাজপাখি।”
কিছুক্ষণ পর ঘড়িটা সাবধানে তার বিশেষ বাক্সের ভেতর রেখে দিল হিয়া। সকালের কাজ শেষ হয়েছিল ডায়মন্ডটা কারিগরদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে।
আর বিকেলটা শেষ হলো সেই ডায়মন্ড দিয়ে তৈরি লিওনের ঘড়িটা নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
এখন শুধু বাকি—লিওনের হাতে সেটা তুলে দেওয়ার মুহূর্তটা। এরপর হিয়া ফোনটা হাতে তুলে একটি নম্বরে কল করল।
কল রিসিভ হতেই হিয়া কোনো ভূমিকা না করেই দৃঢ় কতৃত্বপুর্ন গলায় বলল, “লিসেন, বাইশে আগস্ট রাতে টাওয়ার ব্রিজটা আমার জন্য ভোর পর্যন্ত সম্পূর্ণ খালি চাই।”
ফোনের ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো। হিয়া চোখ নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা ঘড়ির বাক্সটার দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, পুরো রাত। সাধারণ যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ব্রিজের দুই পাশের প্রবেশপথও আমার নির্দেশ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করবে।”
ফোনের ওপাশ থেকে আবার কিছু বলা হলো।
হিয়া এবার আরও কঠিন গলায় বলল, “কোনো ঝামেলা আমি চাই না। যাদের যেখানে থাকার দরকার, সেখানে থাকবে। আর পুরো ব্যবস্থাটা এমনভাবে করবে যেন আমার অনুমতি ছাড়া কেউ ব্রিজের ভেতরে ঢুকতে না পারে।”
কিছুক্ষণ নীরব থেকে হিয়া শেষ নির্দেশটা দিল,
“বাকি সবকিছু আমি নিজে দেখব। শুধু নিশ্চিত করবে, বাইশ আগস্ট রাত থেকে ভোর পর্যন্ত থেমস নদীর ওপরের সেই টাওয়ার ব্রিজটা সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে।”
কথাটা বলেই সে কল কেটে দিল। ফোনটা নামিয়ে হিয়া আবার বাক্সের ভেতরে রাখা ঘড়িটার দিকে তাকাল।
তারপর খুব আস্তে হাসল। লিওনের জন্মদিনের আর মাত্র দুদিন বাকি।

অন্যদিকে, সিআইডি হেডকোয়ার্টারে তখনও গত দিনের ঘটনাগুলো নিয়ে ব্যস্ততা চলছে।
লিওন নিজের কেবিনে বসে কয়েকটি পুরোনো নথি দেখছিল। একের পর এক ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ তার দৃষ্টি একটি পুরোনো কেস ফাইলের ওপর গিয়ে থামল।
ফাইলের নামটা দেখেই লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
ইশতিয়াক খান।
লিওন ধীরে ধীরে ফাইলটা হাতে তুলে নিল। ইশতিয়াক খান—হিয়ার বাবা।
সাত বছর আগের বাংলাদেশের একটি জটিল মামলা। এমন একটি কেস, যেটা তখনকার সিআইডির জন্যও সহজ ছিল না। বহু তদন্তের পরও কেসটির আসল রহস্য পুরোপুরি বের করা সম্ভব হয়নি। অথচ সেই সময় ইশতিয়াক খান নিজেই এমনভাবে তদন্ত করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত কেসটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লিওন কয়েক মুহূর্ত ফাইলের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
“এমন একজন মানুষ…”

তার চোখে চিন্তার ছাপ আরও গভীর হলো “কীভাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে?”
প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরতে লাগল। হিয়ার কথা মনে পড়তেই লিওনের দৃষ্টি আরও স্থির হয়ে গেল।
ভাইপার এমন একজন ক্রিমিনাল যে কখনোই কাউকে ভয় পায়না এমনকি সেদিন হিয়া তার সব মিশনের কথা লিওনকে বলে দিয়েছে। তাহলে সে তার বাবার বিষয়ে কিভাবে মিথ্যা বলবে কাকে ভয় পেয়ে মিথ্যা বলবে?
লিওন ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল। “সে কি সত্যিই মিথ্যে বলছে?”
কয়েক মুহূর্ত পর তার মনে আরেকটা প্রশ্ন জেগে উঠল।
“নাকি ইশতিয়াক খানকেই ফাঁসানো হয়েছিল?”
লিওনের চোখে এবার অন্যরকম দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
হিয়াকে নিয়ে যত প্রশ্ন ছিল, তার সঙ্গে এই পুরোনো কেসটাও নতুন করে জড়িয়ে গেল।
সে এতদিন ভাইপারকে ধরতে চেয়েছিলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ভাইপারকে ধরার আগে তাকে আরও অনেক কিছু জানতে হবে।

সাত বছর আগে আসলে কী ঘটেছিল? ইশতিয়াক খান কেন সেই কালো জগতে জড়িয়ে পড়েছিলেন?
আর তার এবং তার পরিবারের মৃ/ত্যুর পেছনে আসল সত্যিটা কী?
আসাদ খান আর আয়মান খান এখন আর বেঁচে নেই। তাদের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়ার সুযোগও নেই। তবু লিওন জানে, কোনো রহস্যেরই কোনো না কোনো সূত্র থাকে। তার কাজ সেই সূত্রটা খুঁজে বের করা। লিওন ধীরে ধীরে ফাইলটা আবার খুলল।
এবার তার চোখে আর কোনো দ্বিধা নেই “না…”
সে খুব নিচু স্বরে বলল, “এবার আমাকে আরও সিরিয়াস হতে হবে।”
সাত বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই কেসটা তাকে সমাধান করতেই হবে। ভাইপারকে ধরার চেয়েও এখন এই রহস্যটা তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ যদি ইশতিয়াক খান সত্যিই ফাঁসানো হয়ে থাকেন, তাহলে হিয়াকে ঘিরে এতদিনের ধারণার অনেক কিছুই পরিষ্কার হতে পারে।
লিওন ফাইলের প্রথম পাতাটা আবার সামনে টেনে নিল। “আসাদ খান আর আয়মান খান মারা গেলেও…”
তার চোখে দৃঢ়তা আরও গভীর হলো “এই রহস্য আমি বের করেই ছাড়ব।”
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ব্যস্ততার মাঝেও লিওনের কেবিনে তখন নেমে এসেছে নীরবতা।
তার সামনে পড়ে আছে সাত বছর আগের সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কেস।আর লিওন জানে—এবার তাকে সেই কেসের শেষ পর্যন্ত যেতেই হবে।

এদিকে সিআইডি হেডকোয়ার্টারে হঠাৎ করেই নতুন একটা খবর ছড়িয়ে পড়ল।
সিআইডি অফিসার আরিয়ান রিজাইন করেছে।
খবরটা শুনে অফিসের সবাই অবাক হয়ে গেল। এতদিনের একজন দক্ষ অফিসার হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এটা কারও কাছেই স্বাভাবিক লাগছিল না।
কিছুক্ষণ পর জানা গেল, আরিয়ান ইতিমধ্যেই একজন মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে ফেলেছে। মেয়েটির পরিবার গ্যাংস্টার পরিবারের সঙ্গে জড়িত। আরিয়ানের বাবা এই সম্পর্ক কখনোই মেনে নেননি।
বাবার আপত্তি সত্ত্বেও আরিয়ান নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত সে মেয়েটিকে নিয়ে শহর ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবরটা শুনে অফিসার রওশন অবাক হয়ে বলল, “আরে বাহ! এ তো পুরো সিনেমার কাহিনী হয়ে গেল!”
কেউ কেউ মৃদু হেসে উঠলেও লিওনের মুখে কোনো হাসি ফুটল না। সে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর গম্ভীর গলায় বলল, “সিরিয়াসলি? একজন সিআইডি অফিসার হয়ে নিজের ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিলো শুধুমাত্র একটা মেয়ের জন্য?”

তার কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি “মানুষ এতটা দুর্বল হয়ে যায়? একজন সিআইডি অফিসার হয়ে কীভাবে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে?”
কিছুক্ষণ থেমে লিওন আবার বলল, “আর একটা গ্যাংস্টারের মেয়ের সঙ্গে জড়াবে, এটা তো কখনোই ভাবিনি আরিয়ানের মতো সিআইডি অফিসার এমনটা করবে।”
রওশন হেসে মাথা নেড়ে বললো “এটাই ভালোবাসা, স্যার। ভালোবাসায় সবাই মজনু হয়ে যায়। আপনি প্রেমেই পড়লে আপনিও হয়ে যাবেন।”
লিওন সঙ্গে সঙ্গে রওশনের দিকে তাকিয়ে বললো।
“কখনোই না।”

রওশন ভ্রু তুলে তাকাল। লিওন এবার শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “আমার কাছে আমার পরিবার সবার আগে।”
কয়েক মুহূর্ত থেমে সে বলল, “আমার বাবা একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। উনি আমার অনুপ্রেরণা। তার বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।”
তার কণ্ঠে এবার আরও দৃঢ়তা ফুটে উঠল “আর এমন কোনো কাজও আমি কখনো করব না, যেটার কারণে আমার পরিবারকে আমার জন্য মাথা নিচু করতে হয়।”
রওশন চুপ করে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইল।
লিওন আবার বলল, “আমার কাছে সবার আগে আমার পরিবার। তারপর আমার সিআইডি পেশা।”
কথাটা বলেই সে সামনে থাকা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে থামলো তারপর আবার বললো
“ভালোবাসার জন্য নিজের পরিবার আর নিজের পরিচয় বিসর্জন দেওয়ার মতো মানুষ লিওনার্দো নয়।”
রওশন মৃদু হেসে বলল, “দেখা যাবে, স‌্যার। সময় আসলে মানুষ কী করে, সেটা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না।”
লিওন কোনো উত্তর দিল না।শুধু ফাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।তার মনে তখনও একটাই বিশ্বাস, পরিবারের আগে কোনো কিছুই নয়।

রাত হতেই লিওন সিআইডি হেডকোয়ার্টার থেকে বাড়িতে ফিরে এলো।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখল সবাই কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ড্রয়িংরুমে অ্যামেলিয়া, রুদ্রনীল, আর্থার হায়াত আর শিরিন হায়াস—সবাই ব্যস্ত।
লিওন কিছুটা অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“সবাই কোথাও যাচ্ছ?”
অ্যামেলিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “লিওন, তুই যাবি আমাদের সাথে?”
লিওন ব্লেজার খুলতে খুলতে বলল, “কোথায়?”
অ্যামেলিয়া একটু উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, “আমি আর তোর রুদ্র ভাইয়া একটা বাচ্চা অ্যাডপ্ট করতে যাচ্ছি। একটা বাচ্চা পেয়েছি।”
কথাটা বলতে বলতে তার চোখে আলাদা একটা আনন্দ ফুটে উঠল।
“ভাবছি, বাংলাদেশ যাওয়ার আগে এবার একটা বেবি নিয়েই যাবো।”
তারপর একটু হেসে বলল, “ড্যাড আর মমও আমাদের সাথে যাচ্ছে।”
লিওন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,“অভিনন্দন।”
কথাটা বলেই তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল রুদ্রনীলের ওপর। রুদ্রনীলও চুপচাপ লিওনের দিকে তাকিয়ে ছিল। লিওনের চোখে তখন অন্য একটা অনুভূতি। ফুটে উঠলো।
সে জানে, অ্যামেলিয়া মা হতে পারবে না। ভবিষ্যতেও সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই— এই সত্যিটা সে অনেক আগেই জেনেছে।
কিন্তু রুদ্রনীল যেভাবে সবসময় অ্যামেলিয়ার পাশে থেকেছে, তাকে কখনো কোনো কিছুর জন্য ছোট করেনি, বরং প্রতিটি মুহূর্তে আগলে রেখেছে—সেটা লিওনকে মাঝে মাঝে ভাবিয়ে তোলে।
কখনো কখনো তার মনে হয়, সেদিন রুদ্রনীলকে জেরা করা হয়তো ভুল ছিল। হয়তো একজন ভাই হিসেবে তার আগে নিজের বোন জামাই রুদ্রনীলকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত ছিল।
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের চিন্তাটা নিজেই থামিয়ে দেয় লিওন। কারণ তার সিআইডি ব্রেইন আবেগের কথা শোনে না।প্রমাণ ছাড়া কাউকে নির্দোষ ভাবতে শেখেনি সে। লিওন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোমরা যাও। আমি আজ খুব টায়ার্ড।”

অ্যামেলিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,“তুই যাবি না?”
লিওন মাথা নাড়ল। “না। তোমরা যাও। আমি একটু রেস্ট নেব।”
রুদ্রনীল কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। লিওন তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল “আর হ্যাঁ, বেস্ট অফ লাক।”
অ্যামেলিয়ার মুখে আবার হাসি ফুটে উঠল। “থ্যাঙ্ক ইউ, ভাই।”
লিওন সেখান থেকে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
পেছনে তাকিয়ে একবার দেখল—রুদ্রনীল খুব যত্ন করে অ্যামেলিয়ার জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে। লিওন কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল। তারপর খুব আস্তে নিজের মনে বলল, “হয়তো মানুষটা সত্যিই তার বোনকে ভালোবাসে…”
কিন্তু পরক্ষণেই তার মাথায় আবার সিআইডির সেই কঠিন যুক্তিগুলো ফিরে এলো। “কিন্তু ভালোবাসা সত্যিটা বদলে দেয় না।”

সবাই বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখনই অ্যামেলিয়া হঠাৎ লিওনকে ডেকে বলল,
“লিওন আরেকটা কথা।”
লিওন থেমে গেলো ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকলাম বোনের দিকে। অ্যামেলিয়া বলল, “মায়া বাড়িতে একা আছে। ওকে একটু দেখে রাখিস। ওর কী লাগবে, না লাগবে একটু খেয়াল রাখিস।”
লিওন ভ্রু কুঁচকে বলল, “মায়া এখন কোথায়?”
অ্যামেলিয়া বলল, “ওর ঘরেই আছে।”
পাশ থেকে লিওনের মা বললেন, “তোরা দুজন একসাথে ডিনার করে নিস। মায়াকে একা রেখে আবার বাইরে কোথাও চলে যাস না।”
লিওন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে।”
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িটা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেল। লিওন কয়েক সেকেন্ড সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
নিজের রুমে ফিরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল লিওন। তারপর ধীরে ধীরে শাওয়ার নিতে চলে গেল।
শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ তার মাথায় আবার আরিয়ানের কথা চলে এলো।
সত্যিই কি ভালোবাসা মানুষকে এতটা বদলে দিতে পারে?

একজন সিআইডি অফিসার হয়েও আরিয়ান নিজের চাকরি ছেড়ে দিল। নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিল। এমনকি পরিবারের বিরুদ্ধেও চলে গেল শুধুমাত্র একটা মেয়ের জন্য।
লিওন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের পরিবারটার কথা মনে পড়ল।
তার পরিবার তাকে কখনো কোনো কিছুর জন্য জোর করেনি। কখনো তার পছন্দকে অকারণে ছোট করেনি। বরং সবসময় নিজের মতো করে ভালো রাখার চেষ্টা করেছে।
হ্যাঁ, তার বাবা খুব রাগী মানুষ ছিলেন।
ছোটবেলায় কোনো ভুল করলে কখনো কখনো কঠোর শাস্তিও পেতে হয়েছে তাকে। বাবার হাতে মার খেতেও হয়েছে, কিন্তু সেই রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না।
কিছুক্ষণ পর সেই মানুষটিই আবার লিওনের পছন্দের খেলনা এনে দিতেন।
আর কিশোর বয়সে যখন ভিডিও গেমসের প্রতি তার ভীষণ আগ্রহ ছিল, তখন নিজের পছন্দের গেমও এনে দিয়েছেন প্রতিবার শাস্তি দেয়ার পরেও।
লিওন জানে, তার বাবার ভালোবাসার প্রকাশটা হয়তো সবসময় কোমল ছিল না। কিন্তু ভালোবাসাটা সত্যি ছিল। খুব সত্যি।
আর তার মাও তাকে সবসময় নিজের মতো করে আগলে রেখেছেন। লিওন ধীরে চোখ খুলল।

“আমি কীভাবে তাদের কষ্ট দিতে পারি?”
তার মনে হলো, সে কখনোই পারবে না। তার বাবা-মাকে সে যতটা ভালোবাসে, তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেও তার আপত্তি নেই।
মায়ার কথা মনে পড়তেই লিওন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মায়াকে সে ই নিজের বোনের মতোই ভেবেছে এতদিন। তবুও বাবার ইচ্ছার সামনে সে বিয়েতে রাজি হয়েছে। মায়াকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা তার নিজের চাওয়া থেকে আসেনি। সে রাজি হয়েছে একমাত্র তার বাবার জন্য। কারণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, এই মানুষটার একটা ইচ্ছা পূরণ করতে পারা তার দায়িত্ব।
লিওন ধীরে ধীরে শাওয়ার বন্ধ করল। তার চোখে তখন দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“ভালোবাসা মানুষকে বদলাতে পারে…”
সে নিজের মনেই বলল, “কিন্তু আমার পরিবারকে কষ্ট দিয়ে নয়।”
তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে লিওন আবার ভাবল—
আরিয়ান যা করেছে, সেটা হয়তো তার কাছে ভালোবাসা। কিন্তু লিওনের কাছে পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়া ভালোবাসার প্রমাণ হতে পারে না। সে নিজের পরিবারকে ছেড়ে কখনোই এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। কারণ তার কাছে—পরিবার সবার আগে।

শাওয়ার শেষ করে লিওন আলমারির সামনে দাঁড়াতেই বারান্দার দিক থেকে হঠাৎ ডানা ঝাপটানোর শব্দ পেল। শব্দটা শুনে সে ধীরে ধীরে সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল, শ্যাডো রেলিংয়ের ওপর বসে আছে। লিওন কয়েক মুহূর্ত সোনালী ঈগলটার দিকে তাকিয়ে রইল। আজ কোনো চিরকুট নেই, আর না কোনো বার্তা, তবুও শ্যাডো তার বারান্দায় এসে বসে আছে।
তার সিআইডি ব্রেইন খুব দ্রুত হিসাব মিলিয়ে ফেলল। হিয়া তাকে নজরে রাখছে, আর শ্যাডোর মাধ্যমে সেটা করার যথেষ্ট সুযোগও তার আছে। অর্থাৎ এতদিন ধরে এই ঈগলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা কোনো ক্যামেরার মাধ্যমে হিয়া তার ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও দেখেছে।
লিওনের চোখে এবার অন্যরকম একটা দৃষ্টি ফুটে উঠল।
সে জানে হিয়া কী ধরনের মেয়ে। তার মধ্যে লজ্জা, সংকোচ কিংবা স্বাভাবিক সীমারেখার বোধ খুব একটা নেই। অথচ লিওন নিজে সম্পূর্ণ বিপরীত—রাগী, বদমেজাজি, আত্মমর্যাদাবোধে কঠিন, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত সীমারেখা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন একজন মানুষ। আর সেই মানুষটাই আজ প্রথমবারের মতো এমন একটা কাজ করতে যাচ্ছে, যা সে নিজেই কখনো কল্পনা করেনি।

লিওন শ্যাডোর দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল,
“আই নো ইউ স্টক মি, হর্নি ফক্স! সো কিপ ওয়াচিং এন্ড..এনজয় ইয়োর ভিউ।”
তারপর নিজের কোমরে জড়ানো টাওয়ালটা খুলে দুই হাতে প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে রইল, সে ইচ্ছে করেই ক্যামেরার ওপাশে থাকা হিয়াকে তার নিজের খেলায় পাল্টা জবাব দিলো।
সে হিয়াকে মোটেও আকৃষ্ট করার জন্য এটা করছে না। বা হিয়াকে কিছু দেখানোর ইচ্ছাও তার নেই। বরং সে ইচ্ছা করেই এমন কিছু করলো,যেটা তার নিজের স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত, শুধুমাত্র হিয়াকে একটা কথা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য— হিয়া যদি সত্যিই এই খেলায় এতটা নির্লজ্জ হয়, তাহলে তার নিজের খেলায় তাকে একবার অপ্রস্তুত করেই দেখা যাক।

ওদিকে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকা হিয়া মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল।
সে জানত লিওন একদিন না একদিন এই হিডেন ক্যামেরটা সম্পর্কে জানতে পারবেই। একজন সিআইডি অফিসারের পক্ষে সেটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু লিওন বুঝে যাওয়ার পরও যে এমন কিছু করবে সেটাই তার মাথায় ঢুকছিল না।
এই সেই লিওন, যে তার দিকে তাকালেই বিরক্ত হয় রাগ দেখায়। এই সেই লিওন, যে তাকে একজন বিপজ্জনক অপরাধী ছাড়া আর কিছু মনে করে না।
এই সেই লিওন, যার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এতটা সংযম আর জেন্টলম্যানসুলভ কঠোরতা রয়েছে।
তাহলে আজ সে এমন করল কেন?
হিয়া কয়েক মুহূর্ত স্ক্রিনের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। হিয়া লিওনকে দেখতে চেয়েছিল, লিওনের ব্যক্তিগত মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের চোখের আড়ালে রাখতে চায়না সে। কিন্তু এতোটা ব্যক্তিগত জিনিস তো এত তাড়াতাড়ি হিয়া দেখতে চায়নি, তাও আবার লিওন নিজে থেকে।
নিজের অজান্তেই ঠোঁট কামড়ে ধরলো আর ঝটপট ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে থাকার পর হিয়া নিজের অজান্তেই আবার একটু আগে দেখা দৃশ্যটা মনে করতে লাগল।
তখনই তার মাথায় হঠাৎ একটা কথা এলো। “ওহ…”

হিয়া এক মুহূর্ত থেমে গেল। তারপর মনে পড়ল, লিওনের টাওয়ালের নিচে আসলে কালো রঙের বক্সার পরা ছিল। হিয়া এক মুহুর্তের জন্য ভেবেছিলো লিওন আসলে সত্যি তাকে সব দেখিয়ে ফেলেছে।
সে নিজের এই চিন্তায় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—“এই দিলবারটা আসলে কী করতে চাইছে?”
আর প্রথমবারের মতো হিয়ার নিজের খেলায় এমন একটা চাল এলো, যার উত্তর তার কাছেও নেই।
হঠাৎ মায়া লিওনের রুমের দরজায় এসে হালকা করে নক করল।
“লিও ভাইয়া?”
ভেতর থেকে লিওনের কণ্ঠ ভেসে এলো, “এক মিনিট, মায়া। ওয়েট কর।”
লিওন দ্রুত পোশাক বদলে নিল। কালো বক্সারের বদলে একটি কালো লাউঞ্জ শর্টস পরে তার ওপর টি-শার্ট জড়িয়ে নিল। তারপর দরজার কাছে এসে দরজা খুলে দিল। দরজা খুলতেই মায়া মৃদু হেসে বলল,

“ডিনার করবে না?”
লিওন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। আয়।”
লিওন এখন তার রুমের পাসওয়ার্ড বদলে ফেলেছে। মায়া সেটা লক্ষ্য করলেও বিষয়টা নিয়ে কিছু ভাবল না। সবারই তো নিজের একটা ব্যক্তিগত পরিসর থাকে।
মায়া আসলে তাকে ডিনারের জন্য ডাকতেই এসেছিল।
লিওন তাকে ভেতরে বসতে বলল। “নিচে যেতে হবেনা, তুই রুমে বস। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
মায়া মাথা নাড়ল।

কিছুক্ষণ পর লিওন খাবার নিয়ে ফিরে এলো। টেবিলের ওপর সবকিছু গুছিয়ে রাখার পর দুজন একসঙ্গে খেতে বসল। মায়া খুব সুন্দরভাবে চুপচাপ বসে খাচ্ছিল।
লিওন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ তার মাথায় অন্য একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
হিয়া।
সেদিন হিয়া তার রুমে বসে টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে কী অদ্ভুত ভঙ্গিতেই না খাচ্ছিল! লিওন সঙ্গে সঙ্গে নিজের চিন্তা থেকে ফিরে এলো। সে ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবল,

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৬

“আবার!”
সবকিছুতেই কেনো ওই মেয়েটার কথা মনে পড়ছে?
খাবারের টেবিলে বসেও হিয়া। কোনো একটা দৃশ্য দেখলেও হিয়া। কথা বললেও হিয়া। লিওন নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে বলল,
“ওই ক্রিমিনাল মেয়েটা আমার মাথা থেকে কবে যাবে?”

আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৮