Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৭

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭
জাবিন ফোরকান

ছয় মাস অতীত:
সামিয়ার বেডরুমে বসে আছে ইরাম। তার কোলে তিন মাসের ছোট্ট ইযান। বাচ্চাটা মাত্রই ঘুমিয়েছে। অথচ ইরামের চোখে কোনো ঘুম নেই। নেই ক্লান্তি, শান্তি। বুকের ভেতর অশান্তির ঝড়। শেষ ভরসার খুঁটিটাও আর রইলনা তার। ভাইয়ের দুয়ার থেকেও ফিরে আসতে হলো। এখন কি করবে ইরাম? এই অথৈ সাগরে এইটুকুন বাচ্চা বুকে নিয়ে কোথায় যাবে? কে তাকে আশ্রয় দেবে? আশ্রয় পাওয়াটা অবশ্য মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো অরণ্য মির্জা সওদাগরের হাত থেকে বেঁচে থাকা। ওই লোকটা রীতিমত আল্টিমেটাম দিয়েছে তাকে! ইরামকে তার কাছে নাকি ফিরতেই হবে। ভিক্ষা চাইতেই হবে। এই তিন মাসে সমাজের যে বাস্তবতা ইরাম দেখেছে, তাতে সে নিশ্চিত, শীঘ্রই কিছু করতে না পারলে হয়ত অরণ্যর দ্বারস্থই তাকে হতে হবে। সেটা সে মনে প্রাণে চাইছে না। আর যাই হোক, ওই লোকের সামনে মাথা নিচু কোনোদিন করবেনা সে। অরণ্য যদি এমন একটা সময়ে ইযানের কাস্টাডির দাবী করে বসে? তখনি বা কী হবে?

ইযান ছোট বলে হয়ত আদালতের রায় অনেকটাই ইরামের পক্ষে আসবে। তবে ভরণ পোষণ আর পিতৃত্বের অধিকার থেকে অরণ্যকে হটানো যাবে না। তাছাড়া ইরামের এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, হাতে পর্যাপ্ত টাকা পয়সা নেই। আদালতের চক্কর, উকিলের ফিস এসব কীভাবে বহন করবে? তার নাজুক অবস্থাও আদালতে বিবেচিত হবে। এখন তার হাতে দুটো উপায় আছে। এক, রাহাতের কাছে মায়ের বাড়ির সম্পত্তির দাবী করা। সেই কাজ করতে গেলে অবশ্য কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে শুধু টাকাই পাবে ইরাম, বাদবাকি সব পথ তাকে ইযানকে নিয়ে একলাই চলতে হবে। দুই নাম্বার উপায়টা একটু স্বার্থপর। একটু না, পুরোটাই স্বার্থপর। সামিয়ার কাছে সাহায্য চাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আশ্রয় পাওয়া যাবে, টাকা পয়সাও পাওয়া যাবে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা?

ইরামের শক্ত কোনো খুঁটি নেই। সামাজিক ভিত্তি নেই। সবার কাছে সে যা পাবে তা হবে শুধুমাত্র আশ্রয় এবং সাহায্য। সব করুণা, অধিকার নয়! আর সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। ইরাম চাইলে এখন কষ্ট করতে পারে। দুধের শিশুকে অন্যের ভরসায় রেখে জুতার তলা ক্ষয় করে চাকরি খুঁজতে হন্যে হয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে পারে। কিন্ত আর কত? তার মন যে আর মানতে চাইছেনা। ১৭ বছর থেকে যে সংগ্রাম সে করে এসেছে, মা হওয়ার পরে বাচ্চার সঙ্গে কিছু ভালো মুহূর্ত কাটানো ছাড়া কোনো লড়াইয়ের ইচ্ছা তার হচ্ছে না। তাছাড়া ইযানের কী হবে? তার ভবিষ্যত কেমন হবে? কী হিসাবে বড় হয়ে উঠবে তার ছেলে? একটা ভাঙাচোরা পরিবারের সন্তান? যাকে নিয়ে বাবা মায়ের মাঝেই দ্বন্দ্ব? ডিভোর্সি বাবা মা, সিঙ্গেল মাদার মা। কোনো পরিবার নেই, মাথা গোঁজার মতন গুরুজনের ঠাঁই নেই, একটা সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ নেই। হয়ত ইযান ছোট থেকে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তার কাছে এসব স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু যখন স্কুল কলেজে যেতে শুরু করবে, যখন আর পাঁচটা বাচ্চার সাধারণ জীবনযাপন দেখবে তখন? তখন মন খারাপ না করে সে থাকতে পারবে? তার বন্ধুরা কী তাকে জিজ্ঞেস করবে না তার পরিবারের কথা? বাবা মায়ের কথা? বাড়ির কথা? ভাবতেই ইরামের বুকটা হুহু করে উঠল।

ইরাম কৈশোরে পিতাকে হারিয়েছে। সেই শোকে মা পাগলপ্রায়। দুই ভাই, মায়ের পরিবার থাকা সত্ত্বেও বাবা নেই শুনলে মানুষ এমন করুণা করে তাকাত এবং এখনো তাকায় যে ইরামের মাঝে মাঝে মনে হয় বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে একটা পরিপূর্ণ পরিবার না পেয়ে। উপরি করুণার কোনো অভাব নেই। অথচ মন থেকে মানুষ যা দেয় তা হলো শুধু বদদোয়া। স্কুলের চাকরি করার সময় কলিগদের কাছ থেকে এমন সব কু প্রস্তাব সে পেয়েছে যা মুখে আনাও দুষ্কর। সবাই শুধু তার রুটিনমাফিক জীবন দেখেছে। ভাইদের মানুষ করা দেখেছে, উপার্জন করা দেখেছে। দেখেনি শুধু এই দিনগুলোর প্রত্যেকটা মিনিট, প্রত্যেকটা সেকেন্ড কতশত প্রশ্ন, কুনজর, উদ্ভট ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরামকে যেতে হয়েছে। একটা শক্তপোক্ত পরিবার না থাকলে মানুষ সরকারি সম্পত্তি মনে করে। উপরন্তু সে মেয়ে। এতদিন তাও অবিবাহিত মেয়ে ছিল। এখন এক বাচ্চার মা, ডিভোর্সি। সমাজে পা রাখতে গেলেই ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে একদল হায়েনা। ইরাম এসব মোকাবেলা করতে করতে ক্লান্ত। আর চায়না সে।

ঘুমন্ত ছেলেকে একটা চাদর বিছিয়ে আস্তে করে বিছানায় শুইয়ে দিল ইরাম। তার মাথাটা ভীষণ ব্যথা করছে। চিন্তায় চিন্তায় শরীর অসাড় হয়ে আসছে অথচ কোনো সমাধান মিলছে না। কোন পথে গেলে সে আর তার ছেলে দুজনই ভালো থাকতে পারবে? কোন পথে গেলে তার দিকে সামাজিক কোনো প্রশ্ন উঠবে না? কেউ তাকে সরকারি সম্পত্তি ভেবে হেলাফেলা করবে না? জানেনা ইরাম। একনাগাড়ে নিষ্পাপ বাচ্চাটার মুখের দিকে চেয়ে রইল সে। বড় হয়ে যদি কোনোদিন এই ছেলে তাকে প্রশ্ন করে, ‘যদি ভালো জীবন দেয়ার সামর্থ্যই না থাকে তবে আমায় পৃথিবীতে এনেছিলে কেন?’ কী জবাব দেবে ইরাম? হয়ত ইযান তেমন করবে না। তাকে সেভাবে মানুষ হতে দেবে না ইরাম। তবুও, তার জন্য ছেলের জীবনটা অনিশ্চয়তায় ফেলবে সে? ঝুঁকে গেল ইরাম। নরম আঙুলে ছুঁয়ে দিল ইযানের গাল, ফিসফিস করে বলল,
“কুচুপু, আম্মু তোমাকে অনেক ভালোবাসি, জানো তো? তোমার জন্য আম্মু সব করতে পারে।”
ইযান সামান্য শব্দ করে উঠে আবার ঘুমে তলিয়ে গেল। ইরাম মৃদু হাসল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোল তার। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই বেডরুমের দেয়ালে টাঙানো কিছু ফটোফ্রেমের দিকে নজর পড়ল তার।

উঠে গেল ইরাম। দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বুকে দুবাহু ভাঁজ করে অপলক পর্যবেক্ষণ করল ফটোফ্রেমগুলো। একটাতে পারিবারিক ছবি, আহমদ, সামিয়া, সারিকা আর আরেকটা বাউন্ডুলে ছেলে। হালফ্যাশনের বেশভূষা। পাশেই আরেকটা ফটোফ্রেমে তার সিঙ্গেল ছবি। সুদর্শন যুবকের চোখে চকচকে দৃষ্টি, জিভ বের করেছে ভ্যাঙানোর ভঙ্গিতে। হাতের তর্জনী আর কড়ে আঙুল তুলে ইয়ো ইয়ো সাইন দেখাচ্ছে। ভ্রুতে চিকচিক করছে একটা ছোট্ট সিলভার রিংয়ের মতন। ইরামের চিনতে কষ্ট হলেও একেবারে অপরিচিত লাগলনা। আপনমনে বিড়বিড় করল সে,
“আলাদিন।”

হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ফটো ফ্রেমের মুখটা ছুঁয়ে দিল সে। করলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ। মাথায় হুট করে ভয়ানক এক পরিকল্পনা এলো তার। এমন এক পরিকল্পনা যা হয় তার আশেপাশের সবকিছু ধ্বংস করে দেবে, নাহয় তাকে ধ্বংস করে দেবে। তবে সুরক্ষিত থাকবে একটাই মানুষ। তার ছেলে, ইযান।
এমন সময়ে মৃদু পদশব্দ ভেসে এলো। রুমে ঢুকলেন সামিয়া। হাতে একটা ট্রে। তাতে খাবার আর জুস। ট্রেটা নাইটস্ট্যান্ডে রেখে অতি সাবধানে ঘুমন্ত ইযানের পাশে বসলেন তিনি। ইরামকে বললেন,
“কিছু খেয়ে নে।”
ইরাম ফিরে তাকালনা। তখনো সাইবানের ছবিটা দেখে যাচ্ছে সে। তারপর হুট করে শুধাল,
“তোমার ছেলে?”
সামিয়া খানিকটা চমকালেন। ইরামকে সাইবানের ছবির দিকে চেয়ে থাকতে দেখে বললেন,
“হুম।”
“বদলে গিয়েছে অনেকটা। শুরুতে চিনতেই পারিনি।”
“হয়ত।”
“বয়স কত ওর? ২৬ হয়েছে?”
“২৫ এর বেশি, কিন্তু ২৬ হয়নি। কেন বল তো?”

ইরাম উত্তর করলনা। নিঃশব্দে বিছানার এক কোণায় বসল। জুসের গ্লাসটা তুলে চুমুক দিল। সামিয়া ইরামকে পর্যবেক্ষণ করলেন। মেয়েটার মুখটা কি মলিন! চোয়ালের দিকটা চেপে গেছে, অথচ আগে গাল দুটো ছিল ফোলা ফোলা, চাপলে নরম বালিশের মতন লাগত। উজ্জ্বল চোখে ক্লান্তির ছায়া। যেন জীবনের ভার বইতে বইতে হাঁপিয়ে যাওয়া এক পথিক। সামিয়া হাতের মুঠো শক্ত করে ফেললেন। বুকের ভেতরটায় ভাঙচুর হলো তার। অথচ কিছুই করার নেই। তিনি বললেন,
“খুব কি সমস্যায় ছিলি? আগে জানালি না কেন? আমি আর তোর খালু কেউ না কেউ কিছু অন্তত করার চেষ্টা করতাম।”
ইরামের ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ফুটল। পরিহাসের হাসি। জুসের গ্লাসটা রেখে দিতে দিতে সে আচমকা বলে বসল,

“জন্মের আগেই যারা পর করে দিয়েছে তাদের কাছে আবার কিসের আবদার?”
চমকালেন সামিয়া। এতটা প্রকটভাবে যে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। শরীর কাঁপল তার। দুহাত মুঠো হয়ে গেল। বুকের ভেতর অক্সিজেন পাওয়াটাও যেন দুষ্কর। বিপরীতে ইরাম অতীব শান্ত। ধীরে ধীরে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে।
“তু…তুই…সব…জানিস?”
ইরাম উত্তর করলনা। ফিরেও দেখলনা। সামিয়া ধপাস করে হাঁটু মুড়ে তার পাশে বসে পড়লেন। জোর করে ইরামের একটা হাত তুলে নিজের দুহাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন,
“কবে থেকে? কে বলেছে তোকে?”
“কারো বলতে হয়না। বুদ্ধি থাকলে বোঝা যায়।”

সত্যিকার কাহিনীটা সামিয়াকে জানালনা সে। আজকের কথা নয়, বরং আরও অনেক বছর আগে থেকেই সে জানে, যে বাড়িতে থাকছে, যাদের মানুষ করছে তারা আসলে ইরামের পরিবার নয়। সত্যিটা সে জেনেছে ১৫ বছর বয়সে, কিবরিয়া সাহেব আর লামিয়ার কথোপকথন ভুলক্রমে শুনে ফেলার মাধ্যমে। কেউ জানে না, একটা কাকপক্ষীও জানেনা সেই কথা। এতগুলো বছর বুকে পাথর চাপা দিয়ে সেই সত্য চেপে রেখেছে সে। কারণ, ওই মুহূর্তে তার কিছু যায় আসেনি আর। যে পরিবার তাকে জন্মের সময়ই ত্যাগ করেছে, সেই পরিবারের প্রতি কিসের টান অনুভব করবে সে? রাহাত আর ইহানই তার আপন ভাই, হ্যাঁ, ওরাই ইরামের র*ক্তের বন্ধন, অন্য কেউ নয়, হতে পারেনা!
সামিয়ার চোখজোড়া টলটলে হলো ইরামের উত্তর শুনে। দুহাত বাড়িয়ে মেয়ের মুখটা ধরতে চাইলেও ইরাম তার কব্জি ধরে ফেলল। দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকাল। বলল,
“আমার মতের বিরুদ্ধে আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছিল, খালামণি? যদি বিলিয়ে দেয়ারই ছিল, তবে জন্ম কেন দিয়েছিলে? সত্যি বলতে, আই ডোন্ট কেয়ার। যারা জন্ম থেকে এতগুলো বছর পরোয়াহীন কাটিয়ে দিয়েছে তাদের কাছে আমার আর কোনো অধিকারের দাবী নেই।”
“না। ইরাম, মা আমার…আমরা অমনটা চাইনি। তোর আব্বু, আহমদের কোনো দোষ নেই। শুধু আমিই…”

“শুধু তুমিই। ঠিকই বলেছ। শুধু তুমিই ছিলে, আর তোমার পাশে ছিল তোমার স্বামী। ওই বাড়িতে পরে থাকা সন্তানকে আপন মনে হয়নি তোমাদের, আপন করে নিয়েছ বাইরের কোনো র*ক্তকে।”
সামিয়া এবার বুঝি বজ্রাহত হলেন। মুখে হাতচাপা দিলেন। ইযান ঘুমে না থাকলে তিনি নির্ঘাত চিৎকার করে বসতেন। থেকে থেকে কাঁপতে লাগল শরীর তার। ইরাম আজ নির্দয়। ভ্রু কুঁচকে সে বলল,
“এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাত বছর ছিল আমার যখন তোমার বাড়িতে ছেলে এসেছে। এতটাও অবুঝ ছিলাম না। সত্য কখনো চাপা থাকে না। বের হওয়ার হলে ঠিকই বেরিয়ে যায়, যেকোনো উপায়ে।”

সামিয়ার পুরাতন স্মৃতিগুলো মনে পড়ল। যেদিন ছেলে সাইবানকে প্রথম ঘরে এনেছিলেন, সেদিন মুন্সীবাড়ির সবাই দেখতে এসেছিল। মুন্সীবাড়ি বলতে শুধু কিবরিয়া সাহেব, তার বোন লামিয়া, ইরাম আর রাহাত। ইহানের তখনো জন্ম হয়নি। রাহাতও একেবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু। সেদিনই পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সাইবানকে দত্তক নেয়ার কথা কোনোদিন দুই কান করা হবেনা। সে বেড়ে উঠবে এই পরিবারের অংশ হিসাবেই। ঠিক যেমনভাবে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল বহু বছর আগে আরেক সত্য, যে ইরাম আসলে সামিয়া আর আহমদের সন্তান। পাড়া প্রতিবেশীদের থেকে বহু ছলচাতুরী করে ধামাচাপা দেয়া হয়েছিল ভয়ংকর দুই সত্যকে।
কিন্তু সেই সব সত্য ইরাম জানে? কীভাবে জানল? কখন? লামিয়া বলেছে? নাকি কিবরিয়া সাহেব? সামিয়ার মাথায় ঢুকলনা। বুকে প্রচন্ড উৎকণ্ঠা ভর করল। মেয়ের হাত আঁকড়ে ধরলেন তিনি করুণ আবেগে,

“প্লীজ। সাইবানকে বলিস না। ম*রে যাবে আমার ছেলেটা!”
নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ইরাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরক্ষণে সূক্ষ্ম হাসল।
“তোমার ছেলে। সে বাঁচল কি ম*রল তাতে আমার কী আসে যায়? তোমাদের তো কোনোদিন আমার জন্য যায় আসেনি।”
সামিয়ার চোখ বেয়ে একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মেয়ের লতানো হাতটা তিনি কপালে ঠেকালেন, ফুঁপিয়ে বললেন,
“সব আমার পাপের ফল, সব আমার পাপের শাস্তি। তোকে নিজের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করেছি, সেই জঘণ্য কর্মের প্রতিফল। যা করার আমাকে কর, যা দোষ দেয়ার আমায় দে। কিন্তু আমার ছেলেটা যে নিষ্পাপ। ওকে কোনোদিন সত্যিটা জানতে দেয়া যাবে না। যদি জানে, আমার ছেলেটা ধ্বংস হয়ে যাবে রে। একটু দয়া কর এই অধম মাকে? একটু?”
ইরামের মায়া হলো। আর তাতে সে নিজের উপর যারপরনাই বিরক্ত হলো। মায়া! আবেগ! এই অনুভূতিগুলোই তো তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুয়ারে। তাই মায়া করতে গিয়েও করতে পারলনা সে। ইযানের মুখটা নজরে এলো। নিষ্পাপ তো তার নিজের ছেলেটাও। তার কি অধিকার নেই সুন্দরভাবে বাঁচার? যদি এই মানুষগুলো তাকে পরিত্যাগ না করতো, তবে হয়ত তারও একটা চমৎকার জীবন হতো। বুকের ভেতর দ্বন্দ্ব হলো। আবেগ আর বাস্তবতার দ্বন্দ্বে জয়ী হলো বাস্তবতা। ইরাম ঝুঁকে এসে সামিয়ার মুখটা ধরে নিজের দিকে ফেরাল। ঠান্ডা কন্ঠে শুধাল,

“যদি বিনিময়ে কিছু চাই, তবে কী আমি স্বার্থপর সন্তান হয়ে যাব?”
সামিয়া চোখ মুছে জোরে জোরে ডানে বামে মাথা নাড়লেন। আর্তনাদ তুলে বললেন,
“একদম না! বল তোর কী চাই? তোর উপর আমি আর একফোঁটা কষ্টের আঁচ আসতে দেবনা। তোকে আমি সুখে সুখে মুড়িয়ে রাখব। তোকে, আমার নাতিকে আমি এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখব যে আর কোনোদিন যন্ত্রণা খুঁজে পাবেনা তোদের। বল, আর কী চাই তোর?”
ইরামের চেহারায় নিরেট ছায়া নেমে এলো। গভীর গলায় সে জানাল,
“তোমার ছেলেকে চাই।”

একটা দিন। কয়েকটা ঘন্টা। এই তুচ্ছ সময়টুকুরই দরকার ছিল সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে দিতে, এমন সব সত্যকে উদঘাটন করতে যাদের ক*বর খুদা হয়েছিল বহু বছর আগে। অবিশ্বাস, বিশ্বাস, ভরসা, বিশ্বাসঘাতকতা এই সবগুলো শব্দ যেন আজ নিজেদের অর্থ হারিয়েছে। কে আপন? আর কেই বা পর? বোঝা বড়ই মুশকিল। এজন্যই হয়ত বাউলরা গেয়েছিলেন, আপন মানুষ চেনা বড়ই দায় রে~ আপন মানুষ চেনা বড়ই দায়।

ইরাম বসে আছে সোফায়। উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের দৃষ্টি তার উপর আবদ্ধ। বাকরুদ্ধ তারা। এই একটা দিন এই বাড়ির মানুষগুলোর ভাগ্যে আর কত কষ্ট লিখে রেখেছে সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। ইরামের শরীর পাথরের মতন স্থির। চেহারায় হালকা অপরাধবোধ। দুহাত কোলের উপর রেখে কলের পুতুলের মতন বসে আছে সে। কেউ তাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করছে না, সেও আর কিছু বলছে না। তবে বেহায়া চোখ দুটো ঠিকই ফিরে ফিরে যাচ্ছে সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো স্বামীর দিকে। সাইবান দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতন। চেহারাটা দেখাচ্ছে খাতার সাদা পৃষ্ঠার ন্যায়। চোখ দুটো নিভু নিভু তারা যেন। ঠোঁটজোড়ায় এক ইঞ্চি অবিশ্বাসের ফাঁক। যেন জেগে জেগে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। ইরামের বুকের ভেতর তোলপাড় হলো। অথচ সে আজ নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলনা। অনেক হয়েছে। আজ হয় এসপার নয় ওসপার।
সকলের দীর্ঘ নিস্তব্ধতা ভাঙল ইরামই। কোলের উপর রাখা হাতদুটো মুঠো পাকিয়ে জানাল,
“তুমি যেদিন গভীর রাতে বাইরে গিয়ে তিতলির জন্য মা*রামা*রি করে এসেছিলে, সেদিন তোমাকে বকলেও আমি মনে মনে খুশি হয়েছিলাম।”
সাইবানের মধ্যে পরিবর্তন এলোনা। ইরামের দিকে তাকিয়ে নেই সে। তবে সে যে সবটাই শুনছে এটা পরিষ্কার। তাই ইরাম বলে গেল,

“আমি এমন একজনকে চেয়েছিলাম যে আমার আর ইযানের জন্য অরণ্যর সাথে লড়াই করতে পারে। যে শক্ত খুঁটি হয়ে আমাদের আগলে রাখতে পারে। যে ওই লোকটার মুখোমুখি হওয়ার দুঃসাহস রাখে। আমি জানি, অরণ্যর সাথে তোমার অনেক আগেই বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল। আর প্রত্যেকবার তুমি আমার কাছ থেকে সেসব লুকিয়ে গিয়েছ যেন আমি ভয় না পাই।”
“আর কী কী জানেন আপনি?”
সাইবানের কন্ঠ ভেসে এলো। বড্ড নিষ্প্রাণ তা। ইরাম ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল, বলল,
“এমন অনেক কিছুই যা তুমি আমার কাছ থেকে লুকিয়েছ। আমি প্রশ্ন করিনি, তার অর্থ এই না যে আমি কিছু বুঝতে পারিনা। আমার আব্বু আম্মুও মনে করতো, আমি খুব অবুঝ। চেহারাটা বড্ড নির্মল আর নিষ্পাপ কিনা! তবে সদ্য কৈশোরে পদার্পণ করেই আমি শিখেছিলাম, যত চুপ থাকা যায়, যত অবুঝ থাকা যায়, ততই মঙ্গল। মানুষ যখন তোমাকে গুটি হিসাবে ব্যবহার করে, সে তখন বুঝতেই পারেনা তুমি আসলে খেলোয়াড়।”

সাইবান এবার আর কোনো কথা বললনা। মিসিরের বুকে মাথা গুঁজে রাখা সারিকা এবার তেঁতে উঠল বেশ। আর কত সহ্য করা যায়? প্রথমে সামিয়া, এবার ইরাম! দুজন মিলে তাদের গোটা বংশকে নাচিয়ে ছেড়েছে! হতে পারে তারা তার আপনজন, মা আর মায়ের পেটের বোন! তাতে কী? সারিকার কিচ্ছু যায় আসে না! আঙুল তুলে ইরামকে শাসাল সে,
“আপনি একটা পাষাণ মহিলা! যবে থেকে আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন, তবে থেকে আমাদের পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এখন আমি বুঝতে পারছি, ড্যাড কেন নিজের মেয়েকেই দেখতে পারেনা! একদম ঠিক করেছে ড্যাড আর মম আপনাকে ওই বাড়িতে ফেলে দিয়ে! আপনি একটা আবর্জনা! স্বার্থপর কোথাকার!”
ইরাম প্রত্যুত্তর করলনা। ওভাবেই বসে রইল। তার মাঝে কোনোপ্রকার অনুভূতিও দেখা গেলনা।
“সরি, আমার আর যাত্রাপালা দেখার মুড নেই।”

বাক্যটা ভেসে এলো আহমদের পক্ষ থেকে। কারো দিকেই তিনি আর তাকালেন না। হেঁটে হেঁটে গায়েব হয়ে গেলেন অন্দরমহলে। অপরদিকে মিসির এগিয়ে সারিকার কাঁধে হাত চেপে ইশারায় স্ত্রীকে শান্ত থাকতে বলল। সামিয়াও একদম শূণ্য হয়ে পড়েছেন। মূর্তিমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক কোণায়। ক্ষণে ক্ষণে তার জ্বলজ্বলে চোখজোড়া খুঁজে খুঁজে দেখছে সাইবান আর ইরামকে। দীর্ঘ সময় কেউ কোনো কথা বললনা।
হুট করে নড়ে উঠল সাইবান। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তার উপর আপতিত হলো। কোনোদিকে না চেয়ে সাইবান ধীরে ধীরে হেঁটে এগোল সোফার দিকে। ঠিক যেখানে ইরাম বসমান। কাছে পৌঁছে সে আস্তে করে হাঁটু মুড়ে সামনের কার্পেটে বসল। মুখ তুলে শুষ্ক চোখে তাকাল অর্ধাঙ্গিনীর নয়ন বরাবর। প্রশান্ত গলায় বলল,

“আপনি আমাকে ব্যবহার করেছেন।”
ইরাম চোখ সরিয়ে নিল। বুকের ভেতর উথাল পাথাল ঢেউ উঠল। সাইবান দ্বিতীয় দফায় বলল,
“আপনার আমার উপর চাপা ক্ষোভ ছিল। এই পরিবার আপনার হওয়ার কথা ছিল। কিন্ত আমার হয়ে গেছে। আমি সেই সবকিছু পেয়েছি যা আপনার পাওয়ার কথা ছিল।”
সাইবানের ইচ্ছা হলো ইরাম অস্বীকার করুক, অন্তত কিছু একটা বলুক প্রতিবাদস্বরূপ। অথচ ইরামের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল। কোলের দিকে চেয়ে সে জানাল,
“কারেক্ট। আমি যা পাইনি তুমি তা পাবে কেন?”
“এজন্য আপনি আমাকে তুরুপের তাসের মতন ব্যবহার করেছেন। যখন আমি ভাবছিলাম দাবা খেলাটা হচ্ছিল আমার আর আপনার অতীতের ভেতর, তখন পর্দার আড়াল থেকে দাবার গুটিটা আপনি চালছিলেন।”

“হ্যাঁ। দাবা খেলায় আমি বরাবরই ভালো ছিলাম। অস্বীকার করতে পারো?”
সাইবান জানেনা কেমন অনুভব করল সে। অনুভূতিরাও মূল্য হারিয়েছে সম্পূর্ণ। তবুও ঝুঁকে এলো সে। শেষ একটা ক্ষীণ আশার আলো আঁকড়ে ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করল,
“অ্যাট লিস্ট….ডিড ইউ লাভ মি?”
ইরামের চোখের দৃষ্টি এবার বদলালো। ঘোলাটে হলো। মুখ তুলে সাইবানের নয়ন বরাবর তাকাল। সাইবান আবারও ফিসফিসাল,

আমার আলাদিন পর্ব ৬৬

“ডিড ইউ?”
“নো।”
দ্বিধাহীন উত্তর করল ইরাম। পুনরায় বলল,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি না, আলাদিন।”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৭ (২)