আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েজ রেকর্ডটা কমপক্ষে বারোবার শুনে ফেলেছে তামান্না। ওদিকে জায়নামাজে বসে আজ দীধিতি আল্লাহ পাকের কাছে মোনাজাতে অনেক কিছুই প্রার্থনা করে যাচ্ছে। এর মাঝে নাওফিলের নামটা ও একবারের জন্যও উচ্চারণ করেনি৷ শুধু বলে যাচ্ছে মহান সৃষ্টিকর্তাকে, ”আমার জন্য যা কিছু ভালো আপনি আমাকে তাই দিন রব্বুল আলামীন।”
আর তন্বী এদিকে ব্রাশটা নিয়ে দাঁত ঘষতে ঘষতে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে শিহাবকে লাগাতার কল করে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে হঠাৎ দীধিতির ফুপিয়ে কান্নার শব্দ পেয়ে সর্বপ্রথম ঘুমটা ভেঙে যায় ওরই। তখন সবে ফজরের আজান দিচ্ছে। তামান্নাকে ঠেলা, গুঁতো দিয়ে ডেকে দীধিতির কাছে এসে ”কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করতেই দীধিতি নিজের হাতে থাকা মোবাইলটা শুধু ধরিয়ে দেয় ওদের কাছে। ফোনটা হাতে পেয়ে নাওফিলের দেওয়া মেসেজ আর অডিয়ো রেকর্ডটা শুনে তামান্না বিশ্বাসই করেনি শুরুতে, এই কথাগুলো নাওফিল বলেছে! তন্বীর ক্ষেত্রেও অভিব্যক্তিটা দেখার মতো ছিল। ও প্রথমে ভাবে ঘুম চোখে ভুলভাল দেখছে আর শুনছে হয়তোবা। তাই বাথরুমে গিয়ে চটজলদি চোখে-মুখে পানি দিয়ে ফিরে এসে মেসেজ আর রেকর্ডটা আবার দেখে আর শোনে। মাথা খারাপ হয়ে যায় দু’জনেরই তখন। যে ছেলে গতকাল পর্যন্তও একটা সাইকোপ্যাথ রোগীর মতো দীধিতির পিছে পড়ে থাকল, সেই গাজীপুর থেকে খুঁজে বের করে পর্যন্ত আনল ওকে, সেই ছেলে এখন আর্দশ, সুশীল, নীতিবান মানুষের মতো বুলি আওড়ে বলে কি না মুক্তি দিচ্ছে সে দীধিতিকে! তাও এমন একটি মুহূর্তে এসে বলছে, যে মুহূর্তে দীধিতি পুরোপুরি ফেঁসে গেছে।
নিস্তব্ধ ঘরটায় রাগের বহিঃপ্রকাশে তন্বী তৎক্ষণাৎই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ইয়ার্কি না কি এটা! মাইন্ড গেম খেলেছে জানোয়ারটা ওর সঙ্গে? এই, ও এই কথাগুলোই কী বোঝাতে চাইল আসলে? দীধিতি ওর ওপর ফল করেছে সেটা আমরা সবাই বুঝে গেছি। আর ওর মতো মহা চতুর ছেলে তা এখনও বোঝেনি তাই বোঝাতে চায়? বিশ্বাসযোগ্য তা?’
তামান্নাও সেসব কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে, ‘কখনোই না। বরং আমাদের আগে নাওফিল বুঝেছে দীধিতি ওর প্রতি ফল করেছে৷ ভালোবাসাটা হওয়া মাত্রই এখন পিছটান দিচ্ছে। একদম পরিষ্কার এতে, নাওফিল খেলেনি উলটে শোধ তুলেছে। দীধিতির কাছে ছ্যাঁচড়ামি করেও এক চান্সে পাত্তা পায়নি বলেই জিদ ধরে পড়েছিল এতদিন তাহলে।’
তারপর দুই বান্ধবী নানানরকম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে করতে দীধিতি এর মাঝে আজান শেষ হতেই নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। একে একে ওরাও প্রাতঃকর্ম সেড়ে নামাজ পড়েই বর্তমান যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷
আজ তন্বী শিহাবের সঙ্গে তাণ্ডব বাধিয়ে বসবে তা নিশ্চিত। কিন্তু তামান্না এতক্ষণ নাওফিলকে হাজারটা গালাগালি দিলেও ওর মনটাতে এখনও খুঁতখুঁত রয়েই গেছে। পুনরায় মেসেজটা পড়ে যাচ্ছে আর রেকর্ডটা শুনছে। এক মন ওর দুইরকম কথা বলছে যেন। একবার মনটা বলছে, নাওফিল খুব অসহায়বোধ করছিল কথাগুলো বলবার মুহূর্তে। তো আরেক মন বলছে, নাটকবাজ ছেলে একটা!
অন্যান্য দিন শিহাব তন্বীকে ফজরের ওয়াক্তে কল করে জাগিয়ে তুলত৷ তন্বী নিজে থেকে কল করে যাচ্ছে তারপরও আজ খোঁজ নেই সেই ছেলের! কলটা ধরবার নামগন্ধই নেই। অশ্লীল ভাষায় গালাগালিটা বরাবরই আয়ত্তে ছিল ওর৷ কিন্তু কখনও ভাবেনি সেই গালিগুলো নিজের প্রথম ভালোবাসার মানুষটাকেও প্রয়োগ করতে হবে। বাবা-মা তুলে শ্রবণহীন গালিগুলো নাওফিলকে দেওয়ার পরই তা এখন শিহাবকেও দিয়ে চলেছে সে৷ একই ঘরে দীধিতি নামাজে বসে মোনাজাত করছে, সেদিকে হুঁশই নেই!
সকালের নাশতার পর্বটা শেষ হবার পরই দীধিতি এক ঘণ্টা সময় ধরে মা আর বোনের সাথে কথা বলে মনটা হালকা করে। নিজের লক্ষ্যের প্রতিই মনটাকে ধাবিত করার চেষ্টা করে সেই আগের মতো। এরপর তন্বীকে ডেকে বলে, ‘তুষারকে এ ব্যাপারে কিছুই জিজ্ঞেস করবি না। দ্যাখ আগে ও নিজে থেকে কিছু বলে কি না। যদি এড়িয়ে যায় তাহলে তুইও সেভাবেই টপিকটাকে ভুলে যাবি৷ আমি প্রেমে পড়লেও তা স্বীকার করে আসিনি কিন্তু৷ তাই আমার কাছে এখনও আমার ওয়েটটা ঠিক জায়গাতেই আছে। আমি দাম্ভিকতা নিয়ে আগেও যেমন চলতাম এখনও তাই চলব। নাওফিলের সঙ্গে সম্পর্ক না হওয়া ছাড়াও ঐশীর সুবাদে মাঝেমধ্যেই ওর সঙ্গে দেখা হবে আমাদের৷ আবার তোর তরফ থেকেও একই ব্যাপার৷ তাই সিন ক্রিয়েট করাটা উচিত হবে না আমাদের। এতে ঝামেলাটা হবে ঐশী আর রুমানের মাঝে৷ রুমান আর নাওফিলের বন্ধুত্ব আমাদের বন্ধুত্ব থেকেও পুরোনো আর ভীষণ স্ট্রং। কতটা স্ট্রং হলে নাওফিল একটা ফ্ল্যাট গিফ্ট করে বন্ধুকে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস। আমার জন্য ঐশী না পারবে রুমানের সাথে ঝামেলা করতে নাওফিলকে নিয়ে, আবার না পারবে তা সহ্য করতে। এটা একটা সমাধান ছাড়া ব্যাপার আসলে। তাই ঐশীকেও জানাবি না। নতুন সংসার ওর। ওকে সংসারে মন দিতে দে। তাছাড়া প্রপোজালটা এসেছিলও শুরুতে নাওফিলের থেকে, সেটা আবার নিজেই ফিরিয়ে নিয়েছে ও। তো ওকে নিয়ে আমার মধ্যে আর কোনোরকম ভাবনাচিন্তা হতে দেবো না। ও আসলে একটা ধ্বংস মানব৷ ও যে মেয়ের জীবনে আসবে সেই মেয়ের জীবনটা অভিশপ্ত হবে। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ পাক ওর থেকে রেহাই দিয়েছেন আমাকে।’
-‘হুঁ, ঠিক বুঝেছিস। কিন্তু আমার মধ্যে এখন তুষারকে নিয়েও নানারকম দোটানা সৃষ্টি হচ্ছে যে! নাওফিল আর তুষারই সব থেকে ক্লোজ। দু’জনের মাঝে সিক্রেট বলতে তেমন কিছু নেই। সেখানে তোর ব্যাপার নিয়ে আলোচনা তুষারের সঙ্গে আলবাত করেছে। আর তাই তুষার আমার কল রিসিভ করেনি জবাবদিহি করার ভয়ে। ও-ও তাহলে কতটা খাঁটি প্রেমিক তা নিয়ে আমার মন সন্দিগ্ধ।’
তামান্নাই আজ সকালের নাশতা তৈরি করেছে। রান্নাঘরে হাতের কাজ গুছিয়ে রেখে ঘরে আসতেই তন্বীর কথাগুলো শুনতে পায়৷ নিজের মতামত জানায়, ‘এই ভাবনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শিহাব ভাইয়ের মাঝে তোর জন্য আমি গাঢ় অনুভূতি টের পেয়েছি। সেটা কথাতেই বল আর কাজেকামে বল। তাই বলব, যাচাই-বাছাই করতে থাক সম্পর্কটাকে আগের জায়গাতেই রেখে৷ তাছাড়া ও কিছুদিন আগে বলেছিল না, প্রেম করার ধৈর্য আর ইচ্ছা কোনোটাই ওর নেই? খুব জলদি বিয়ের ব্যাপারে ভাববে ও। ওকে নিয়ে তোর চূড়ান্ত ভাবনা কী তা জানতে চেয়েছিল। তুই সময় চেয়েছিলি। তো তুই ভাবনাচিন্তা করেই এগো। দ্যাখ এর মাঝে ও আবারও বিয়ের প্রসঙ্গ তোলে কি না।’
-‘তামান্নার কথা ঠিক আছে৷ আমার ব্যাপার নিয়ে তুই জাজ করিস না তুষারকে।’
দীধিতির কথায় সায় দিলো তন্বী নীরবেই মাথা দুলিয়ে।
সেদিন বিকাল হলে তামান্না আর তন্বী দু’জন মিলে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় নাওফিলের কথাগুলো নিয়ে সরাসরি একবার ওরা নিজেরাই কথা বলবে নাওফিলের সঙ্গে। দীধিতিকে তা মোটেও বুঝতে দেওয়া চলবে না। এই সিদ্ধান্তের কারণ একটাই, নাওফিলের প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাস আর মায়া জন্মে গেছে ওদের মাঝেও। তাই চট করেই নাওফিলকে দোষারোপ করতে চাইছে না আর। আবার দীধিতির মনের অপ্রকাশ্য অনুভূতির বিশ্লেষণও আড়ালেই রাখতে হবে ওদের। নয়তো এতে সত্যিই দীধিতির আত্মগরিমাতে আঘাত করা হয়ে যাবে। আর সেটা মোটেও ঠিক হবে না।
সন্ধ্যা থেকে রাত ন’টা অবধি দীধিতি আজ থাকবে সামনের বিল্ডিংয়ে। সেখানে ওদের ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট গার্ল অনুপমা থাকে। তার সঙ্গে গ্রুপ স্টাডিতে ব্যস্ত থাকবে ও। ওদেরও থাকার কথা ছিল। কিন্তু শপিং করার বাহানায় ওরা আজ এই পরিকল্পনাতেই ঐশীর বাসায় যাবে।
আসরের নামাজটা আদায় করে তন্বী আর তামান্না বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। আর দীধিতি মাগরিব বাদে বের হয় বাসা থেকে। সামনে এগিয়ে বাঁ দিকে গলিতে ঢুকে আটতলা অট্টালিকার সদর গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়। সপ্তমতলাতে অনুপমা মেয়েটার বাসা। সনাতনধর্মী অনুপমার পরিবারের প্রতিটা মানুষ ভীষণ অমায়িক।
অঙ্ক করতে বসে আজ দীধিতি না চাইতেও হঠাৎ হঠাৎ অমনোযোগী হয়ে পড়ছিল। এত বুঝদার হয়েও কী জঘন্যভাবে যে ও নাওফিলে আটকে পড়েছে, তা তো খোলাখুলি বান্ধবীদের বলেইনি। শুধু ও জানে, কতটা পরিশ্রম দিতে হচ্ছে মনটাকে সামলাতে। দুর্বল মনটা বারবার আকাঙ্ক্ষা করছে এই বুঝি নাওফিলের থেকে কোনো মেসেজ এলো। তাই বারবার চোখজোড়া গিয়ে আটকাচ্ছে ফোনের স্ক্রিনে। অনুপমা তা বেজায় বুঝল৷ কিন্তু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে অবশ্য দ্বিধাবোধ করল। যদিও ওর জানাতে দীধিতি কোনো সম্পর্কে আবদ্ধ নেই৷ তবে হতে আর কতক্ষণ! দু’জন অঙ্ক করা থামিয়ে হঠাৎ এ কথা সে কথা বলতে বলতে অঙ্কের বদলে গল্পই চলতে শুরু করল বেশি ওদের মাঝে৷ এই ফাঁকে সত্যিই দীধিতির একবারের জন্যও মনে পড়ল না নাওফিলের কথা৷ কারণ, আজ অনুপমা জানাল নতুন কিছু তথ্য। যা পুরোটাই ওকে ঘিরে। ডিপার্টমেন্টের বেশ ক’জন ছেলে না কি নিজেদের মাঝে দ্বন্দ-কলহ করে চলেছে কিছুদিন যাবৎ। যার মূল কেন্দ্রবিন্দু দীধিতি। একই সার্কেলের চারজন বন্ধু এক সঙ্গে দীধিতিকে পছন্দ করে বসে আছে৷ তা নিয়ে পুরো ক্লাসে চাপা হাসিঠাট্টা চলে। এসব চলে অবশ্য পুরোটাই দীধিতির আড়ালে৷ অনুপমা জানাল, খুব শীঘ্রই নাকি এই চারজন বন্ধু একেক করে ওকে প্রণয় আহ্বান জানাবে৷ তাতে দীধিতি যার আহ্বানে সাড়া দেবে, বাকি বন্ধুদের তা চুপচাপ মেনে নিতে হবে। এমন হাস্যকর গল্পে কেটে গেল টানা দু’ঘণ্টা৷ অনুপমার মা এর মাঝে এসে খুব করে অনুরোধ করে গেলেন, যেন আজ রাতে দীধিতি অবশ্যই ওদের সাথে নৈশভোজটা সেড়ে যায়। না করতে পারল না দীধিতি ওই মানুষটিকে।
-‘ওদের দু’জনকেও কল করে আসতে বলতি!’
-‘ওরা আজ শপিং করতে গেছে৷ আর ওদের শপিং মানে রাত দশটা ওভার। কিন্তু আমি যে কাজে এলাম তার তো কিছুই হলো না।’
-‘কাল আসিস, সমস্যা নেই। তোর হাবভাব আজ অন্যরকম। ম্যাথে মনোযোগ দিতে পারবি না।’
অনুপমান কথায় নাওফিল নামক বিষাক্ত মানুষটা ফের ওর হৃদয়ে এসে ছোবল বসাল। আনমনেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপের সুরে বলে ফেলল, ‘পিরিতের বিষ পান করে ফেলেছি। তার মাশুল গুণতে হচ্ছে।’
-‘কী বললি?’ চমকে যাবার ভান অনুপমার।
খানিকটা অপ্রস্তুত হলো দীধিতিও। খুব একটা কাছের সম্পর্ক এখনও গড়ে ওঠেনি অনুপমার সাথে। তার কাছে এ বিষয়ে কথা বলা একদমই ভরসাযোগ্য নয়। বেফাঁস কথাটাকে কোনোরকমে সামাল দিতে বলতে হলো ওকে, ‘আরে এক ছেলেকে দেখে প্রেমে পড়ে গেছি মনে হচ্ছে। ঐশীর বরের বন্ধু সে। কিন্তু কাহিনি হলো ছেলেটা ভিন্নধর্মী। ফ্লার্টিং করেছিলাম তাও কিছুদিন। তারপর নিজেই কেটে পড়েছি। তাই মনের মধ্যে কেমন অপরাধবোধ হচ্ছে।’
কপাল চাপড়ে অনুপমাও আহাজারির সুরে স্বীকারোক্তি দিলো, ‘একই বেহাল দশা রে বোন! নতুন এসেছে ব্যাচেলর ছেলেটা। আমাদের নিচতলায় থাকে৷ খুব ভোরে নামাজ পড়তে যায় মসজিদে। আমি ওই সময় তখন পড়তে বসি। তাই ব্যালকোনি থেকে একদিন দেখতে পেয়েছিলাম। এরপর ওর জন্য রোজই দাঁড়িয়ে থাকি ওই সময়ে। কী যে চেহারা দীধিতি! যে-কোনো মেয়ে দেখলে পটে যাবে। আমার মা-ই তো আফসোস করে, ছেলেটা আমাদের ধর্মের কেন হলো না তাই। প্রতিদিন দামী গাড়ি নিয়ে সকাল ন’টায় বের হয়। আর আসে সন্ধ্যা সাতটায়। খোঁজখবর নিয়ে যতটুকু জেনেছি তা হলো, ছেলে গেজেটেড অফিসার। সোনালী ব্যাঙ্কের ম্যানেজার।’
-‘এহ্হে! ব্যাটার বয়স কত তাহলে?’
-‘আরে নাক সিটকচ্ছিস কেন?আটাস থেকে ত্রিশের মধ্যেই হবে। হয়তো প্রথমবার বিসিএস দিয়েই টিকে গেছে৷ নয়তো অনার্স শেষ করেই বিসিএস পরীক্ষায় ট্রাই করে গেছে। এক মাস হলো জয়েন করেছে। জয়েন করেই বাসা নিয়েছে এখানে। মনটা দিনদিন বেসামাল হয়ে পড়ছে রে বোন! এত সুন্দর ছেলে আমি সত্যিই সিনেমা ছাড়া বাস্তবে দেখিনি।’
সুন্দর তো নাওফিলও। মাত্রাতিরিক্ত সৌন্দর্য এই ছেলের মাঝে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই সত্যিই হয়তো ভালো না। জবাবে দীধিতি বলল, ‘ভেবে নে ওই ছেলে নিষিদ্ধ বিষ। তাই এত আকর্ষণ ওর মাঝে। জেনে-বুঝে মৃত্যুর কাছে যেতে চাইবি না নিশ্চয়ই?’
অসংলগ্ন ঠেকল কথাগুলো অনুপমার কাছে৷ তুলনাটা একেবারেই খাপছাড়া হলো না? বক্র চোখে দেখতে থাকল ও দীধিতিকে। মেয়েটা বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। ঘটনা তো জটিল মনে হচ্ছে! ওর খুব কৌতুহল জাগছে দীধিতির মনের কথা পুরোপুরি জানার। তাই হঠাৎ প্রস্তাব রাখল, ‘চল তো ছাদে যাই। তোর মনটন ভালো নেই আজ বেশ বুঝতে পারছি৷ ছাদে দারুণ বাতাস আর বাইরে জ্যোৎস্নাও খুব। ভালো লাগবে তোর।’
আবারও এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দীধিতি চেয়ার থেকে, ‘চল, ঘুরে আসি একটু।’
-‘আচ্ছা তুই আগে যা। আমি দুই কাপ কফি করে নিয়ে আসি। তাহলে বেশি ভালো লাগবে। সিঁড়িতে ওঠার আগে লাইটটা জ্বালিয়ে নিস। সিঁড়িটা খুব অন্ধকার।’
মাথা কাৎ করে সায় জানিয়ে দীধিতি বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। মন খুব অস্থির হয়ে আছে ওর। এক জায়গায় স্থির হতেই পারছে না ও। অবাধ্য মনটা উষ্কাচ্ছে ওকে, একবার যেচে পড়ে নাওফিলকে কল করতে। কিন্তু জান থাকতে এরকম বেহায়াপনা ও কোনোদিনই করবে না। নাওফিলের মুখোমুখি যেদিন হবে, সেদিন অবশ্যই একবার জানতে চাইবে এমন সিদ্ধান্ত নেবার কারণ কী ছিল?
টালমাটাল ভাবনায় পড়ে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পার করে উঠে আসার পর খেয়াল হলো, সত্যিই ভারি অন্ধকার। ভাবনার ঘোরে পাঁচ-ছ’টা সিঁড়ি আন্দাজে পা ফেলে উতরে এলেও চোখের সামনে এখন কিছুই দেখছে না৷ ফোনটাও তো ফেলে এসেছে ঘরে! না হয় আন্দাজের বশে পা ফেলে নিচে নেমে লাইটটা জ্বালাতে হবে। তার থেকে না হয় সাবধানে সাবধানে পা ফেলে ছাদে পৌঁছল। নেমে গিয়ে লাইট জ্বালানোর ভেজাল আবার করবে কে?
সামনে পা দিয়ে সিঁড়িগুলো নির্ণয় করতে করতে আকস্মিক ধাক্কা খেল এক পুরুষালী দেহের সঙ্গে৷ বেলী ফুলের সুগন্ধীযুক্ত পারফিউম না কি আতর পুরুষটির শরীর থেকে ভুসভুস করে উড়ে এসে নাকে লাগছে ওর। একটু পিছিয়ে এসে বেশ জোরেই শুধাল ও, ‘কে?’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১০
সামনের ছেলেটা ওর মতো পিছিয়ে না গিয়ে আরও কাছে এগিয়ে আসলো। তা টের পেয়ে বক্ষঃস্থলে কেউ যেন খামচি দিলো দীধিতির। সুযোগ পেয়ে ছেলেটা কোনো অসভ্যতামি করবে না তো? ও আবারও চেঁচিয়ে শুধাল, ‘এই সামনে কে আপনি? কথা বলুন নয়তো সরে দাঁড়ান।’
কথা বলার বদলে ছেলেটা ওকে ধাক্কা দিয়ে পাশের দেওয়ালে জাপটে ধরল, এমনকি মুখটাও চেপে ধরল।
