Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি

জ্বরে দুর্বল কিরণের বুকটাকেই দীধিতি আশ্রয় করে নিয়ে লেপটে আছে সেখানে। বেলকনির দরজার কাছে তখন তাওসিফ দাঁড়িয়ে, আর সৌরভ ঘরের মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দূর থেকেই ওদেরকে দেখছে। কোনোভাবেই তারা ঘরে ঢুকতে পারছে না, এগোতে পারছে না দীধিতির কাছে৷ এগোলেই দীধিতি চিৎকার করে উঠছে … প্রচণ্ড ভয়ে জড়িয়ে ধরছে কিরণকে। একমাত্র কিরণই থাকতে পারছে ওর কাছে। কিন্তু তাওসিফ অথবা সৌরভ কাছে আসলেই দীধিতি চোখের সামনে বিভৎস একেক রূপ দেখতে পাচ্ছে শুধু৷ যা কখনও শুধু একটা বিশাল বড়ো ভয়ানক চেহারার মাথা, কখনও শুধু ভয়ঙ্কর চোখ আবার কখনও নগ্ন হয়ে দণ্ডায়মান কালো কোনো অশরীরী। যে এলোমেলো দীর্ঘ চুল ছেড়ে, লম্বা জিহ্বা বের করে ওর দিকে এগিয়ে আসতে চাইছে।

নাওফিল বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই দীধিতির শরীরটা ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। গায়ে জ্বর এসেছে বুঝতে পেরে দীধিতি নিচে চলে আসে একটু বিশ্রাম নিতে। সে সময় বাকিদেরও আর আড্ডা জমে না। শিহাব তন্বীকে নিয়ে ওই রাতেই বাসায় চলে যায়। তামান্না রুমানের ফ্ল্যাটে চলে আসে ঐশীর সাথে৷ বাকিরাও একেক করে বিদায় নেয়৷ শুধু সৌরভকে যেতে দেওয়া হয়নি। তাওসিফ নিজের সাথে করে তাকে নিয়ে নিচে গেস্টরুমে আসে, কিরণকে উপরে থাকতে বলে।
দীধিতি সে সময় লিভিংরুমে সোফায় শুয়ে ছিল। নাওফিল এলে আবার খেতে চাইতে পারে, তাই তার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই সামনের সোফায় এক নগ্ন পুরুষকে ওর দিকে চেয়ে বসে থাকতে দেখে সে। দেহের তুলনায় যার মাথাটা অস্বাভাবিক বড়ো ছিল৷ তৃতীয়বার এমন কিছুর মুখোমুখি হওয়ার পর দীধিতি বিশ্বাস করে নেয়, এটা মোটেও ওর দৃষ্টিবিভ্রম হতে পারে না। এত জীবন্ত অনুভব কল্পনাতে আসতেই পারে না, যদি সে সুস্থ না থাকত।

ওর চিৎকারে তখন পাশের ঘর থেকে কিরণ ছুটে আসে। নিচে তাওসিফদের কাছে আওয়াজ পৌঁছয়নি তখন। কিরণকে সব কিছু খুলে বলতে না পারলেও তাকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলে, ‘আমার সঙ্গে উলটা পালটা কিছু হচ্ছে, কিরণ। ও না আসা অবধি আমার কাছে থাক তুই।’
এরপর ওকে নিয়ে কিরণ নিচে নেমে আসে৷ ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি এনে দেয় পান করতে। সে সময় সৌরভও পানি চাইতে আসলে দীধিতি নিজের গ্লাসটা তাকে দিয়ে দেয়। আর তার পরপরই বিশ্রী রূপের একটা মাথা দেখে চোখের সামনে। অমনি চিৎকার করে উঠলেই তাওসিফ ঘর থেকে ছুটে আসে তখন, তিনজনই জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে ওর? তাতে আরও ভয়ানক পরিস্থিতি হয়। শুধু দু’টো জ্বলন্ত, রাগান্বিত চোখ তেড়ে আসতে চায় তখন ওর দিকে। আবারও চিৎকার করে উঠলে একটা সময় দীধিতি জ্ঞানই হারায় তীব্র ভয় আর জ্বরের প্রকোপে।

সহজে জ্ঞান ফেরাতে পারে না কেউ। তখন তাওসিফ কল করে নাওফিলকে ফিরতে বলে জলদি। অনেকটা সময় ধরে চেষ্টার পর ওর জ্ঞন ফিরলে ওকে ঘরে নিয়ে আসে কিরণ। তাওসিফ আর সৌরভও ঘরে এসে জিজ্ঞেস করে সমস্যাটা কী হচ্ছে ওর? দীধিতি ক্লান্ত কণ্ঠে সবটা জানায় তাদের, সে যা যা দেখেছে আজকে। সৌরভ মেডিকেলের ছাত্র বিধায় কথাগুলো আমলে না নিয়ে ওর কাছে এসে বসে যখন ওকে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর কি কিছুদিন ধরে কোনোরকম শারীরিক বা মানসিক সমস্যা হচ্ছে? হলে আমাকে খুলে বল।’
দীধিতি জবাব দেওয়ার পূর্বেই তখন দেখতে পায় নগ্নবেশে, জিহ্বা ঝুলিয়ে রাখা ওই অশরীরী ওর দিকে ক্রোধ নিয়ে ছুটে আসছে। চিৎকার করে উঠলে সৌরভ তখন ওর হাতটা ধরে বসে। আর তক্ষুনি অনুভব করে দীধিতি, ওর বাহু কেউ প্রবল বেগে খামচে ধরেছে। ব্যথায় আর ভয়ে সে কান্না করতে করতে বলে, ‘আমার হাত! আমার হাত খামচি দিয়ে ধরেছে, সৌরভ।’

সৌরভও তখন দীধিতির অমন আকুল হয়ে কান্না করতে দেখে ঘাবড়ে যায়৷ কিরণ বোনের এমন করে কান্না করা কোনোদিনও দেখেনি। সে আরও বেশি ভয় পেয়ে বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে, জিজ্ঞেস করে, ‘কে খামচে ধরেছে আপু? কোথায় ধরেছে?’
দীধিতি বাহুতে অন্য হাত দিয়ে ধরে দেখাতেই তখন সেখানে আরও ব্যথা অনুভব করে৷ যেন ধারাল নখ গেঁথে দিচ্ছে। ‘উহ্ আল্লাহ!’ বলে দীধিতি করুণ সুরে আর্তনাদ করতে থাকে। সৌরভের হাত থেকে ওই হাতটা টেনে নিয়ে বাঁ হাতে সেখানে চেপে ধরতেই টের পায়, ওর বাহু ওই অদৃশ্য সত্ত্বাও ছেড়ে দিয়েছে। সৌরভদেরও তা জানায় ও।

তাওসিফ চিন্তিত মুখ করে নির্বাক হয়ে শুধু দেখতে থাকে সবটা। তার কাছে কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্য লাগে দীধিতির কথাগুলো। কারণ, কিশোর বয়সে নাওফিলও চোখের সামনে এমন অতিপ্রাকৃত ঘটনা দেখত নাকি প্রায়শ। যদিও ছোটো থেকেই নাওফিল অত্যধিক সাহসী থাকায় ও কখনই এমন করে ভয় পেত না। বরঞ্চ সেগুলো ইয়াসিফ আর তাকে স্বাভাবিক সুরেই জানাত। এমন করেই একদিন মাহতাব সাহেব শুনতে পান, নাতির সাথে হওয়া ঘটনা। আর তারপরই বিশ্বস্ত এক মওলানাকে বাসায় ডেকে নাওফিলকে তার কাছে সবটা জানাতে বলেন তিনি। সেই মাওলানার হাফেজিয়া মাদ্রাসাতে গিয়েই নাওফিল চার বছর বয়স থেকে দশ বছর অবধি ইসলাম শিক্ষা নিত। তবে জাকির শেখের জেদের কাছে হেরে মাহতাব শেখ নাতিকে কুরআনের হাফেজ বানাতে পারেননি। কারণ, নাওফিল মাদ্রাসা যাওয়ার বদলে তাওসিফ আর ইয়াসিফের স্কুলে গিয়ে বসে থাকত প্রায়দিনই। তা দেখে জাকির শেখ নাওফিলকে ওদের সঙ্গে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দিলে ইসলাম শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটে যায় ওর।

সেদিন মাওলানা সাহেব নাওফিলের মুখে সব জেনে মাহতাব শেখের সঙ্গে আলোচনা করেন অনেক কিছু। সেসব অবশ্য ওরা কেউ শুনতে পায়নি। তবে নাওফিলকে ডেকে নিয়ে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তে বলেন আর কতগুলো দোয়াও বলে দেন। যেগুলো রোজ ওকে আমল করতে বলা হয়েছিল। সাথে দোয়া লেখা একটা তাবিজও দিয়েছিল মাহতাব সাহেবের কথায়, যেটা সব সময় কাছে রাখার নির্দেশ দিতেন মাহতাব সাহেব। কিন্তু নাওফিল একটা সময় সেটা মাঝেমধ্যে ঘরে ফেলে রাখত৷ কারণ, মাওলানা সাহেব নিজ আমল করাটাকেই অধিক গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন ওকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই দীধিতির সাথে এমনটা কেন হচ্ছে এখন? নাওফিলের মতো তাহলে ওরও কি এরূপ সমস্যা ছিল পূর্ব থেকেই? না কি নাওফিলের জন্যই ওর সমস্যাটা হচ্ছে?
দীধিতি হঠাৎ করেই ধারণা করল, সৌরভ বা তাওসিফ যতবার ওর কাছাকাছি আসছে ততবারই ওই অশরীরী রূপগুলো ওর দিকে রাগ নিয়ে ছুটে আসছে আর ওকে আঘাত করছে৷ তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য দীধিতি সৌরভকে আদেশ করে, ‘তোরা প্লিজ একটু ঘরের বাইরে যা! আমার মনে হচ্ছে তোরা থাকলেই ওই জিনিস আমার কাছে আসছে।’

-‘কী ফালতু কথা বলছিস? তোর মাথায় সমস্যা হয়েছে, স্মরণ।’ সৌরভ রাগান্বিত। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না দীধিতির সাথে এমন কিছু সত্যিই ঘটছে।
শেষে তাওসিফ বলে, ‘সৌরভ আসো তো। দেখি কী হয় ওর সঙ্গে।’
তারপরই তারা দূরে গিয়ে দাঁড়ায় ওর কাছ থেকে। এবং এরপর দীধিতি সত্যিই নিস্তার পায় ওসব জিনিসের আঘাত থেকে।

নাওফিল বাসায় এসে পৌঁছল অবশেষে রাত আড়াইটার সময়। দীপ্তকে অজ্ঞান অবস্থায় ওখানেই ফেলে এসেছে সে। তবে মিনিট চল্লিশ আগে সবুজকে কল করে দীপ্তর ঠিকানা দিয়ে দীপ্তকে বাসায় পৌঁছে দিতে বলে। আর এও জানিয়ে দিতে বলে, নেশারত অবস্থায় কাদের সঙ্গে যেন মারামারি করে এই হাল হয়েছে। অবস্থা খারাপ হলে দীপ্তই তাকে কল করে আসতে বলে।
সবুজ নাওফিলের বাসা থেকে বেরিয়ে তখন নিজ বাসাতে সবে পৌঁছে গিয়েছিল। সে ধানমন্ডি দুইয়ে থাকায় নাওফিল তাকেই অবহিত করে। দীপ্তর আহত থাকার কথা শুনে যখন ছুটে আসলো ওর কাছে, তখন ওর নাক থেকে গড়িয়ে আসা রক্তে গা মুখ, গলা, বুক ভিজে আছে৷ জ্ঞানহারা অবস্থাতেই ঘরের মধ্যে ফেলে চলে গেছে নাওফিল।
নাওফিল বসার ঘরে সোফাতে ক্লান্ত দেহ নিয়ে ধপ করে বসে পড়তেই সবুজ কল করে। চেঁচিয়ে ওঠে ফোনের ওপাশ থেকে, ‘তুই আমাকে জড়ালি কেন এর মধ্যে? ওকে আমি একা কী করে নেব? মারলিই যখন তখন আবার বাসায় পৌঁছে দেওয়ার মানেটা কী? আমি যদি জানতাম এত বেগতিক অবস্থা ওর, জীবনেও আসতাম না।’

-‘আমাকেও মেরেছে ও।’
-‘মারামারি মানে তো দুই তরফাই খাওয়া। কিন্তু মারার পর যত্ন করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার নাটক ফাটক কে করতে বলেছে তোকে?’
-‘বন্ধু হই না আমরা।’
-‘শা*লা বান** ক্লিয়ারলি কথা বল। নয়ত আমি গেলাম এমনেই ফেলে রেখে। রাত তিনটায় তোর এই চু**বু** কাহিনি করে বেড়াব আমি?’ সবুজও প্রচণ্ড ক্লান্ত থাকায় বিশ্রাম নেওয়ার বদলে এই ঝামেলা তাকে গছিয়ে দেওয়ায় অস্বাভাবিক রেগে আছে।

ধীর স্বরে বলল নাওফিল, ‘ও সমঝোতা করতে ডেকেছিল আমাকে, বুঝলি? মারামারি তো করলাম ইন দ্য এন্ড। কিন্তু ওর উদ্দেশ্য ছিল আমার সঙ্গে পুনরায় মিলেমিশে যাওয়া। আমিও সেরকমই ব্যবহার করেছি সারাটা ক্ষণ। তাতে লাভও হয়েছে। নয়ত ওর হাত কতদূর অবধি পৌঁছেছে সেটা জানা হত না। ও বোধ হয় আমাকে এতগুলো বছরেও চিনতে পারেনি। আমি বেইমানদের চিরতরে ত্যাগ করি সেটা ও ভুলে গেছে। বন্ধুত্বে স্বার্থপরতা, বিশ্বাসঘাতকতা, অসাধুতা একবার হলে সে বন্ধুত্বে আর ভরসা পাওয়া যায় না। তার থেকেও বড়ো কথা— আমার বউকে নিয়ে ওর ভাবনা, প্রত্যাশা বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল। যতই ও মাফ চাক, শুধরে যাওয়া দেখাক। নারী সম্পর্কিত ব্যাপারে পুরুষ মানুষের মানসিকতা কেমন হয়, তা আরেক পুরুষ হয়ে জানিস নিশ্চয়ই? সেখানে সেই নারী আবার আমার বউ। আমার কাছে একচুলও ছাড় নেই এক্ষেত্রে। ওর প্রবেশ আমার জীবনে, আমার সার্কেলে আজীবনের জন্য নিষেধ। একটু কষ্ট করে আজকের ফ্যাসাদটা ঘাড়ে নে, ভাই। মালদ্বীপের টিকিট তাহলে তোর হাতে দিয়ে দেব।’

-‘সিরিয়াসলি বলছিস তো? লোভ দেখালে একদম কুরবানির দেব কিন্তু!’
নাওফিল হাসল, ‘এতদিনেও হানিমুন গেলাম না মানে আর যাওয়াও হবে না। প্যাকেজটার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যাওয়া তো দরকার। তুই আর রাতুল চলে যা।’
-‘তাওসিফ ভাই কষ্ট পাবে না তোরা না গেলে?’
-‘না, শুধু রেগেমেগে টাকাটা ব্যাক দিতে বলবে৷ আচ্ছা শোন, দীপ্তকে নিয়ে যা তাহলে। আর ওকে যেন এ সপ্তাহেই লন্ডন পাঠিয়ে দেয় ওর বাপ, নির্বাচনের আগে যেন দেশে না ফিরতে পারে। গল্পটা সেভাবেই সাজিয়ে বলিস।’
-‘বললেই যেন বিশ্বাস করবে? তোরা ওকে আবারও আটকে রেখেছিলি, সেটা দীপ্ত জানাবে না যেন!’
-‘জানাবে না শিওর থাক। আমার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার জন্য কিছুই জানাবে না। এই সুযোগেই তো তোকে গল্প জুড়তে বললাম। রাখছি তাহলে।’

কলটা কেটেই ঘরে যাওয়ার জন্য উঠে পড়লে তাওসিফ গটগট করে নেমে এলো তখন উপর থেকে। চোখেমুখে তার দারুণ রাগ। তা দেখেই মনে পড়ল নাওফিলের, দীধিতির অবস্থা খারাপ বলেছিল তাওসিফ। বাসায় ঢোকার আগেও এই চিন্তাতে মশগুল ছিল সে। কিন্তু বাসাতে ঢোকার পরই সবুজের কল পেয়ে চিন্তাটা কী করে যেন মাথা থেকে সরে গেল। ব্যগ্র কণ্ঠে তাওসিফকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে ওর? কিছুই তো বললি না ফোনে।
তাওসিফ ওর মুখের অবস্থা দেখে কঠিন সুরে ধমকে উঠল, ‘কার সাথে মারামারি করে এসেছিস?’
-‘দীপ্ত পালিয়ে গিয়েছে। ওর একটা অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আমাকে ফোনে দুটো ছবি পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেছিল। আমি বেলস্ বিচে পার্টি করেছি শিপে, সেসবের ছবি। বাসার ঠিকানা দিয়ে বলল মুখোমুখি বসে কথা বলতে।’

-‘তারপর?’ চিন্তার রেখা দেখা গেল তখন তাওসিফের কপালে।
-‘কথা হলো অনেক কিছু নিয়ে। সমঝোতা করতে চাইছিল আসলে। তখন জানতে পারলাম সে আমার উইকনেস ধরতে ওখানে স্পাই ঠিক করেছিল। খুন করতে কন্ট্র্যাক্ট কিলারের সঙ্গেও ডিল করতে চেয়েছিল। কথাবার্তা শেষে ফিরে আসার আগে নিজেই কুস্তি খেলার আমন্ত্রণ দিলো আমাকে। ওকে মেরেধরে সন্তুষ্ট হতে না পারলেও ওর বাপ যেন দেশ থেকে বিদায় করার বন্দোবস্ত এ সপ্তাহেই করে, তার ব্যবস্থা করালাম সবুজকে দিয়ে। ছেলে নেশা করে যেখানে সেখানে মার খেয়ে পড়ে থাকলে নির্বাচন আর করা লাগবে না, এই চিন্তাটা ঢুকিয়ে দিতে বললাম।’
প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে তাওসিফ জানাল, ‘স্মরণের কাছে যা।’
-‘কিন্তু তুই ফোনে যেভাবে বললি তাতে তো ভয় পেয়েছিলাম খুব। কী হয়েছে বলছিস না কেন?’
-‘তখন সত্যিই খুব সিরিয়াস কেস ছিল৷ কী হয়েছে তা তুই আমার থেকে ভালো বুঝতে পারবি ওর কাছে গেলে৷ আমি আর সৌরভ এতক্ষণ বেলকনিতে বসেছিলাম। সৌরভ এখনও বসে আছে। কিরণও না ঘুমিয়ে।’
এসব শোনার পর নাওফিল চোট পাওয়া জায়গার ব্যথাগুলো ভুলে গেল। খুব খারাপ কিছুর আভাস টের পেয়েই ও দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে ঘরে এলো৷ ঘরের আলো জ্বেলে রাখা, কিরণ দীধিতির শিথানে বসে ঝিমাচ্ছে। আর দীধিতি ওর কোলের ওপর মাথা দিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে আছে। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই উজ্জ্বল, সজীব মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে যেন।

-‘কিরণ?’
নাওফিলের কণ্ঠ পেয়েই কিরণ ঝট করে চোখ মেলল, ‘ভাইয়া এসেছেন?’
দীধিতির মুখপানে উৎকন্ঠা নিয়ে চেয়ে জিজ্ঞেস করল ওকে নাওফিল, ‘কী হয়েছিল ওর? জলদি বলো তো। ঘুমিয়েছে কখন?’
-‘আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন আগে, ভাইয়া। আপনাকে দেখতেও কেমন যেন লাগছে। আপু ঘণ্টাখানিক হলো ঘুমিয়েছে। এখন আর সমস্যা নেই।’
-‘এখন সমস্যা না হলেও আমি যাওয়ার পর কী সমস্যা হয়েছিল?’
কিরণ বুঝল, বিস্তারিত না শোনা অবধি নাওফিল যাবে না। তাই দেরি না করে দীধিতি যা বলেছিল ওদেরকে, সেটাই নির্ভুলভাবে জানাল সে নাওফিলকে। সবটা শোনার পর নাওফিলের অভিব্যক্তি কেমন হয় তা দেখতে উৎসুকভাবে তাকিয়ে রইল তার দিকে৷ ওর ধারণা, নাওফিল এসব শোনার পর বলে বসবে, ‘ধুরঃ! কীসব আবল তাবল বকছ!’ যেমনটা সৌরভ বলেছিল। কারণ, দীধিতির বলা কথাগুলো কেউ-ই সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না। সে নিজেও তো প্রথম বিশ্বাস করেনি। কিন্তু যখন দীধিতি কামিজের হাতাটা নামাল, তখন সত্যিই দেখতে পেল ভুজ অংশে ডেবে যাওয়া কতগুলো নখের চিহ্ন। সেখান থেকে বিন্দু বিন্দু রক্তও দেখা গেছে। নিজেকে নিজে নিশ্চয়ই এমনভাবে ক্ষত করার মতো অসুস্থ নয় দীধিতি?
নাওফিল চুপচাপ কয়েক পল দীধিতিকে অপলক দেখে চলে গেল বাথরুমে৷ গোসল করে বেরিয়ে এসে কিরণকে বলল, ‘তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো, কিরণ। আর সৌরভ কি এখনও বেলকনিতে? থাকলে ওকেও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলো।’

কিরণ বোনের মাথাটা বালিশে নামিয়ে আদরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বেলকনিতে চলে গেল। সৌরভ দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে ঘুমিয়ে গেছে। তাওসিফ অনেকবার বলেছিল তাকে, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তে। কিন্তু দীধিতির আতঙ্কিত মুখটা দেখে সে এক পাও নড়েনি৷ দীধিতিও পাশে বেশি মানুষ থাকলে একটু ভয় কম পাচ্ছিল বলে তারা কেউ-ই আর ঘরে যায়নি। কিরণ সৌরভকে ডেকে তুলল। সৌরভ চোখ ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করল, ‘ও ঘুমিয়েছে?’

-‘হ্যাঁ অনেকক্ষণই। ভাইয়াও এসে পড়েছে। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়তে বলল সবাইকে।’
সৌরভ উঠেই চলে গেল নিচে। এতটুকু সময়ের মাঝে একবারও কিরণের দিকে তাকায়নি সে৷ এমনকি আজ পুরোটা সময়ে ভুল করেও এক পলকের জন্যও ওর দিকে চোখ পড়েনি তার। কী নিদারুণ অনাগ্রহ তার কিরণের প্রতি! তা ভেবেই বুকটা ভার হয়ে আসে ওর।
নাওফিল গোসল শেষেই ওজু করে বেরিয়েছে বাথরুম থেকে। গায়ে টিশার্ট ঢুকিয়ে, মাথায় সাদা টুপিটা পরে জায়নামাজ পেতে নিয়ে দাঁড়াল বিছানার কাছেই। তার আগে ঘরে নরম আলো জ্বেলে বড়ো লাইটগুলো নিভিয়ে দিলো। নির্ভীকে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া শেষে সে চার্জ লাইটটা জ্বালিয়ে হাফেজি কুরআন শরীফটা নিয়ে বসল তারপর। সূরা বাকার তিলাওয়াত শুরু বেশ করার কিছুক্ষণ পরই আচমকা দীধিতি ঘুমের মাঝে বিকট এক চিৎকার দিয়ে উঠল৷ নাওফিল তবুও পড়া বন্ধ করল না। তবে কুরআন শরীফটা বন্ধ করে সূরা ইয়াসিন মুখস্ত পড়তে পড়তেই সে দীধিতির কাছে এসে বসল।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪২ (২)

দীধিতি খুবই ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছে। অবিরত শরীর কেঁপে চলেছে ওর এখনও৷ উচ্চ কণ্ঠে একের পর এক সূরা পড়তে থাকা নাওফিলকে পাশে দেখে সে নিশ্চিন্ত হওয়ার বদলে আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল। কারণ, নাওফিলের থেকে মাত্র তিন হাত দূরেই এক বিভৎস রূপের নগ্ন পুরুষ দাঁড়িয়ে ওর দিকে চেয়ে রীতিমতো ফুঁসছে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৩ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here