আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৪
suraiya rafa
আজকের আকাশটা দেখেছেন? ভীষণ ভারী আর মেঘাচ্ছন্ন। শ্রাবনের বিষন্ন বিকেলের মতোই তার গায়ে লেপ্টে আছে অবর্ণনীয় মন খারাপ। ওই দূর আকাশের মতো আমারও যে ভীষণ মন খারাপ। হৃদয়ের কোণে অব্যক্ত ব্যথা, কত গুমরে ম’রা অভিমান। আমি বিধ্বস্ত তুষার। আপনি কেন বিয়ে করলেন আমায় বলুন তো? কেন দেখালেন নতুন করে বাঁচার লোভ? আমার মতো মেয়ের কপালে যে ভালোবাসা লেখা নেই, গত দু’টো দিনে আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি সেটা। ভালোবাসাবিহীন এই সম্পর্কটা লাটাইবিহীন ঘুড়ির মতোই নিরুদ্দেশ আর অর্থহীন। আপনাকে দূর থেকে ভালোবেসে অভ্যস্ত আমি তুষার। জামা কাপড় গোছাতে গিয়ে আড়ালে আপনার শার্টে নাক ডুবিয়ে রাখা, আপনার আধখাওয়া প্লেটে নিজের খাবার খাওয়া, লাইট অফ করার বাহানায় আপনাকে একনজর দেখতে পাওয়া ,কিংবা কাছে না থাকলে চোখ বন্ধ করে আপনাকে একান্তে অনুভব করা, এই বাঁধাবিহীন অভ্যেস গুলোতে আমি দিনের আলোর মতোই অভ্যস্ত। অভ্যস্ত ওই রাতের আকাশে শুকতারা জ্বলে ওঠার মতো।
তাইতো হঠাৎ করে এই বিয়ে নামক দ্বায়িত্বের গণ্ডিটা ভারী লাগছে ভীষণ। আপনার এতো কাছে থেকেও না থাকার দূরত্বটা মেনে নিতে পারছি না কিছুতেই । অনুভূতি না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কর্তব্য রক্ষার্থে আপনার এই মেপে মেপে দ্বায়িত্ব পালন আমাকে ভীষণ যন্ত্রণা দেয় জানেন? মনে হয়, অবহেলার নীরব বিভীষিকায় ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছি আমি। আপনাকে ভুলে থাকার সাধ্য নেই, আবার ভালোবাসারও অধিকার নেই। নিজেকে কেমন শূন্য লাগে,অসহ্য লাগে এই অনুভূতি। দম বন্ধ হয়ে আসে যখন মনে হয় আপনি স্রেফ দয়া করছেন আমাকে। আপনি তো দয়াবান নন, তাহলে কেন দয়া করছেন বলুন তো? আমি দূর্বল বলে? নিজের কেউ নেই বলে? নাকিই আমার অস্তিত্বটাই কলুষিত বলে? আচ্ছা, চ্যারিটি ম্যারেজ বলে আদৌও কিছু হয়?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আপনাকে ভালোবাসা যন্ত্রণাদায়ক, তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণার এই অর্থহীন বিয়েটা। এক জীবনে ব্যথার ঘরা পরিপূর্ণ আমার,আর সইতে পারছি না। তাই বিরতি নিলাম, যদি কখনো সয়ে যাওয়ার মতো আশ্চর্য ক্ষমতা পাই, তবেই না হয় ফিরবো। ভালো থাকবেন আর আমায় মনে রাখবেন।
ইতি
আপনার দুশ্চিন্তার একমাত্র কারণ,
ফ্লোরা~~
ইয়াকুতিয়া রাজ্য,
গত সাতদিন ধরেই বেলা করে রোদ ওঠে ইয়াকুতিয়ায়। রাতভর নিরলস তুষারপাতের শেষে সকালের দিকের আলো ঝলমলে রোদটুকু যেন স্বয়ং ঈশ্বরের আশির্বাদ। বছরের পর বছর ধরে বরফ জমা ঠান্ডার মাঝে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষ গুলো রোদের দেখা পেলেই কাজে নেমে পড়ে। কেউ পশু চড়ায়, আবার কেউ ফিটনে চেপে বেড়িয়ে যায় জীবিকার সন্ধ্যানে, ভারী উলের সোয়েটার আর লম্বাকৃতির টুপি পড়ে শিশুরা ছুটে চলে পাঠশালার উদ্দেশ্যে। গ্রামের রমণীরা তখন উনুন জ্বালিয়ে রান্না চাপায়। কেউ কেউ আবার ঘরে বসেই উল বোনে, তৈরি করে বাহারি সব রঙবেরঙের পোশাক।
মস্কো থেকে হাজার মাইল দূরবর্তী এই গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া নেই, নেই কোনো যান্ত্রিক কোলাহল। এখানকার মানুষগুলোর প্রতিটি দিন বেঁচে থাকা যেন একেকটা নিখাঁদ লড়াই। তবুও তাঁরা সুখী, ভালোবাসা আর ভালো থাকার সংমিশ্রণে কুয়াশার চাদরের মতোই অদৃশ্য এক সুখ সুখ বলয় সবর্দা ঘিরে রাখে তাদের।
তেমনই এক রোদ ওঠা সোনারঙা সকালে হাঁটু সমান তুষার পেরিয়ে একঝুড়ি কাপড়চোপড় রোদে শুকাতে দিচ্ছিল ফ্লোরা। শহর থেকে ফিরতে না ফিরতেই নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বসনে সেজে উঠেছে রমণী। পরিধেয় স্কার্ট,ফ্রক এমনকি মাথায় প্যাঁচানো স্কার্ফটাও নিজ হাতে ভারী যত্ন করে বানিয়েছে ওর দাদী ভ্যালেরিনা। তাইতো এতো ভালোবেসে জিনিস গুলো পরিধান করে মেয়েটা। সবকিছুতেই যেন আশ্চর্য এক মমতার ছোঁয়া। সূয্যি মামার নিরুত্তাপ মোলায়েম কীরণে স্বচ্ছ কাচের মতোই চিকচিক করছে রুশ রমণীর ঈষৎ সোনালু বিনুনি। গোলাপি কোমল তকতকে চেহারায় অদ্ভুত পরিনতির ছোঁয়া, চোখের তারায় জ্বলজ্বল করছে সপ্রতিভ দ্রীপ্তি, যেন আকাশে ভাসমান একটুকরো শুভ্র কোমল মেঘ হাওয়ায় ভেসে নেমে এসেছে এই তুষারাবৃত জমিনে।
— হায় ঈশ্বর! কি মিষ্টি লাগছে তোমায় ক্রাসিভায়া(সুন্দরী রমণী)
ওপাশ থেকে ভেসে আসা নারী কণ্ঠে দৃষ্টি ঘুরিয়ে চাইলো রমণী। ফ্লোরার থেকে কয়েক হাত দূরেই কাপড় শুকোতে আসা এক অল্পবয়স্কা রমণী কাপড়ের আগল সরিয়ে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর পানে। যা দেখা মাত্রই মিষ্টি করে হাসলো ফ্লোরা,মাথা নাড়িয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে শুধালো,
— কেমন আছো সেস্ত্রা (বড় বোন)?
ফ্লোরার সম্মোধনে সংকীর্ণতা ভুলে খানিকটা কাছে এগিয়ে এলো সে । আন্দ্রিয়া হলো ফ্লোরাদের প্রতিবেশী, ছোটবেলায় খুব যাওয়া আসা হতো। পাশাপাশি বাড়ি হলেও এক পরিবারের সদস্যদের মতো সারাক্ষণ আঠার মতো লেগে থাকতো দু’জন। অথচ সময় কত দূরের বানিয়ে দিলো। বহু বছরের ব্যবধানে চেনা মুখ আজ বড়ই অচেনা। অশ্রুসজল নয়নে মেয়েটাকে পরখ করে জবাব দিলো আন্দ্রিয়া,
— সেই কবে দেখেছি তোমায়, কত বড় হয়ে গিয়েছো, কি মিষ্টি দেখতে।
কথাটুকু শেষ করে পরম মমতায় মেয়েটার কোমল চিবুক ছুঁয়ে আঙুলের ডগায় চুমু খেলো রমণী। ফ্লোরা বিগলিত হেসে বললো,
— তোমাকেও বহুদিন পর দেখলাম সেস্ত্রা,এখন অনেক পরিনত তুমি, আগে চুল বেঁধে দেওয়ার জন্য কত তোমার পেছন পেছন ঘুরেছি মনে আছে?
চট জলদি মাথা নাড়ালো আন্দ্রিয়া, তার খুব মনে আছে। এই মেয়েকে ভোলা যায়? যার মাঝে কোনো আধুনিকতার উগ্রতা নেই, আছে কেবল প্রাণবন্ত প্রকৃতির স্নিগ্ধতা। মেয়েটার পবিত্র সরলতম সত্তা অবলোকন করতেই যে ভক্তিতে ন্যুজ্ব হয়ে এসেছিল তার অন্তর।
— তোমার পরিবার কেমন আছে তাই বলো? বিয়ে করেছিল নিশ্চয়ই?
খুব আয়োজন করে হাসি মুখে গল্প জুড়ে দিলো ফ্লোরা। যা দেখে এক নিমেষে চোখ জুড়িয়ে যায় আন্দ্রিয়ার।
বহুবছরের আলাপচারিতার মাঝপথেই হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন করে বসলো আন্দ্রিয়া। বড় আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো,
— ভ্যালেরিনার কাছে শুনেছিলাম তোমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, কিভাবে হলো বলোতো? তোমাকে তো ছোটবেলায় মাফিয়ারা নিয়ে গিয়েছিল, সেইইই মস্কো শহরে! শুনেছি ওরা ভীষণ ভয়ংকর আর নৃ’শংস! আচ্ছা ওরা তোমাকে কষ্ট দেয়নি তো?
একসাথে অনেক প্রশ্ন আন্দ্রিয়ার। প্রতিটি প্রশ্নতেই একধাপ করে গলা শুকিয়ে আসে ফ্লোরার। অব্যক্ত বেদনায় আর্ত পাণ্ডুর হয়ে ওঠে রক্তিম ফর্সা মুখ। হৃদয়ের মরচে ধরা ক্ষতস্থানে নতুন করে শুরু হয় র’ক্তক্ষরণ। ব্যথাক্লিষ্ট নয়ন মেলে কিয়ৎক্ষণ উদ্দেশ্যহীন চেয়ে থাকে রমণী , পরক্ষণেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রয়াসে সামান্য ঢোক গিলে কণ্ঠা ভেজায় সে, কৌশলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে হঠাৎই খোলা আকাশের দিকে দৃষ্টি তাক করে বলে,
— আকাশটা অমন মেঘে ঢেকে গেলো কেন সেস্ত্রা? এই অবেলায় বৃষ্টি হবে না তো আবার?
ফ্লোরার কথায় তড়িঘড়ি করে দৃষ্টি ঘোরালো আন্দ্রিয়া, আকাশটাকে তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করতে করতেই শোনা গেলো তার অশনী বানী,
— গুরগুরিয়ে মেঘ ডাকছে দিগন্তে,এতো ঝড়ের পূর্বাভাস।
তারপর সোজা উত্তরের সীমানায় আঙুল তাক করে বললো,
ওদিকে বৃষ্টি হচ্ছে ভীষণ, জলদি জামাকাপড় গোছাও ক্রাসিভায়া, নয়তো বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিবে সব। আকাশের অবস্থা ভালো না, আজ সারারাতেও বৃষ্টি থামবে বলে মনে হয় না।
কথাগুলো বলতে বলতেই তড়িৎ হাতে জামাকাপড় গোছাতে লাগলো আন্দ্রিয়া। অবচেতন ফ্লোরা কিছু না ভেবেই গগন পানে চাইলো, মেঘের আবরণে ঢাকা পড়েছে সূর্যরাজ, মিঠেমেদুর উষ্ণতাটুকু গ্রাস করে নিয়েছে বৃষ্টিস্নাত হিমেল হাওয়া। নিবিষ্ট নয়ন মেলে ধূসর আকাশের সেই অশনী আয়োজন আনমনা হয়ে দেখলো মেয়েটা। দেখতে দেখতেই স্বগতোক্তি করে আওড়ালো,
— এই অবেলায় ঝড়, আশ্চর্য !
জিভ খসে কথাটা বলতে না বলতেই আকাশভাঙা বৃষ্টিতে মুখরিত হলো ধরণী। চারিপাশের স্তূপাকৃতির বরফ অচিরেই গলে যেতে থাকলো। শুকনো জামা কাপড় থেকে শুরু করে উলের সোয়েটার রমণীর অবচেতনতায় ভিজে একাকার হলো সব।
— ক্রাসিভায়া!
নিজের সঙ্গে আনা জামাকাপড় গুলো ঝটপট গোছাতে গোছাতে ফের হাঁক ছেড়ে ডাকলো আন্দ্রিয়া। রমণীর সতর্ক আহ্বানে হকচকিয়ে উঠলো ফ্লোরা। বিভ্রম কেটে যেতেই ব্যস্ত হলো স্বীয় কর্মে। ঠিক সেই মূহুর্তে কোথা থেকে যেন ঝড়ের বেগে ছুটে এসে হিং’স্র ক্ষুদার্থের ন্যায় রমণীর জলে ভজা কোমল ওষ্ঠে হা’মলে পড়লো এক আগন্তুক। সবকিছু যেন সেখানেই থমকে গেলো। ঘটনার আকস্মিকতায় কয়েকমূহুর্ত স্তব্ধ বিমূঢ় হয়ে রইলো ফ্লোরা।প্রকৃতি জুড়ে চলমান ঝোরো হাওয়ার বৈরী উল্লাসের মতোই অস্থির উন্মত্ত চুম্বনে মশগুল সেই আগন্তুক। প্রিয়তমার সুমিষ্ট ওষ্ঠাধর ব্যাতীত দুনিয়ার সকল কিছুই যেন মামুলি আর নিস্প্রয়োজন, তেমন করেই আঁকড়ে ধরেছে রুশরমণীর দু’ঠোঁট। আগন্তুকের কাঁকভেজা শরীরের সংস্পর্শে ক্রমশ ভিজে উঠেছে ফ্লোরার শরীরের ফিনফিনে বসন। হাতে থাকা কাপড়চোপড়ের ও একই দশা। অথচ সময় যেন সেখানেই থমকে আছে।
আকস্মিক ভাবটা কেটে যেতেই কিয়ৎক্ষণের স্তব্ধতা ভেঙে নড়েচড়ে উঠলো ফ্লোরা, ধড়ফড়িয়ে চোখ তুলে তাকাতেই অপ্রত্যাশিত এক মানবের দর্শনে ছলকে উঠলো তার নাজুক হৃদযন্ত্র। চুম্বনের তোড়ে ধরাশায়ী হয়ে আছে ওষ্ঠ, মুখ ফুটে কথা বলার জো নেই,ফলস্বরূপ ভয়ে আতংকে মুশড়ে গিয়ে আগন্তুকের শক্ত বাঁধনে লুটিয়ে পড়লো রমণীর শীর্ণ তনু। ওদিকে হতচকিত আন্দ্রিয়া। ফ্লোরার এহেন হাল দেখা মাত্রই জলদি পায়ে ছুটে এলো সে, এই অভব্য, বেহায়া লোকটার হাত থেকে মেয়েটাকে ছাড়ানোর প্রয়াসে আগন্তুককে উদ্দেশ্যে করে রুষ্ট আওয়াজে চেঁচিয়ে উঠলো সে,
— অসভ্য,লম্পট লোক কে তুমি? এক্ষুণি ছেড়ে দাও ক্রাসিভায়াকে, নয়তো চিৎকার করে গ্রামের লোক জড়ো করবো।
কথাগুলো বলতে বলতেই তড়িৎ পায়ে কয়েক কদম সামনে এগিয়ে এলো রমণী, তন্মধ্যে পেছনের হোলস্টার থেকে রিভলবার বের করে আন্দ্রিয়ার কপালে ঠুকে দিলো লোকটা। যা দেখা মাত্রই আঁতকে উঠলো ফ্লোরা, উদগ্রীব হয়ে দু’হাতে টেনে সরালো সেই নিশানা। ভয়, জড়তার মিশেলে অস্থির হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে আন্দ্রিয়াকে উদ্দেশ্য করে ছুড়লো প্রকম্পিত বাক্যধ্বনি,
— ত…তুমি ফিরে যাও সেস্ত্রা,
আন্দ্রিয়ার কপাল কুঁচকে গেলো। অবিশ্বাস্য আওয়াজে শুধালো,
— কি বলছো তুমি ক্রাসিভায়া! এই লোকটা তোমাকে অপমান করেছে।
ফ্লোরাকে নিস্পৃহ দেখালো। চোখের তারায় অদ্ভুত অভিমান। পাশ ঘুরেই বৃষ্টিস্নাত কাতর নয়নে তাকালো সে মানুষটার দিকে। সুদর্শন, দাম্ভিক অথচ অঢেল মায়া জড়ানো মুখাবয়বটাকে পরখ করে, ততোধিক শান্ত আওয়াজে জবাব দিলো,
— উনি আমার স্বামী।
আন্দ্রিয়ার কৌতুহলী দৃষ্টি ধীরে ধীরে শীতল হয়ে এলো। সেও এবার ফ্লোরার মতোই অধীর আগ্রহ নিয়ে দৃষ্টিপাত করলো আগন্তুকের পানে। তবে তুষার যেন বিক্ষিপ্ততার শিখরে, দুনিয়ার কোনোকিছুই আজ লক্ষ্যচূত করতে পারবেনা তাকে, তেমন করেই রমণীর আরক্ত ঠোঁটের ভাঁজে ফের ডুব দিলো সে।
ফ্লোরাদের ঘরটা দোতলা কাঠের। যার উপরের তলায় ফ্লোরা থাকে, আর নিচ তলায় কিচেন ডাইনিং এর পাশে ছোট্ট কামরায় ভ্যালেরিনা। অবিরাম বর্ষনে বর্ষার জলে থৈ থৈ করছে চারিপাশ।যার দরুন ঘরের কাজ বাদ দিয়ে আবারও উল বুনতে বসেছেন বৃদ্ধা। বসার ঘরে কাঠের গুড়ির চেয়ার পেতে আয়েশ করে বসে পুরনো সুতো ছাড়িয়ে কুশি কাটার মাঝে নতুন করে সুতো গাঁথছেন ভ্যালেরিনা। অবচেতন বৃদ্ধা নিজের কাজে এতোটাই মনোনিবেশ করেছেন যে, তার সামনের সিঁড়ি দিয়েই তরতর করে উপরে উঠে যাওয়া চুম্বনরত কপোতকপোতির উপস্থিতি ঘুনাক্ষরেও টের পাননি তিনি।
অস্থির পদচ্ছাপে উপরে উঠে নরম বিছানার হদিস পেতেই একযোগে সেখানটায় ছিটকে পড়লো দু’টো কাকভেজা চুপচুপে শরীর। তুষার যেন উন্মাদ হয়ে আছে, বাঁধনহীন নেশাগ্রস্তদের মতোই ব্যগ্র হাতে রমণীর জামার বোতামে হাতড়ে চলেছে সে।
ফ্লোরার কি জানি কি হলো,তৎক্ষনাৎ ঝটিকা প্রবাহের ন্যায় প্রত্যাখান করলো সেই বেপরোয়া আন্দলিত স্পর্শ।মেয়েটা ডুকরে উঠে কাঁথার ভাঁজে মুখ লুকাতেই কয়েক মূহুর্তের জন্য থমকে গেলো তুষার। পরক্ষনেই মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দৃঢ়তার সাথে চেপে ধরলো ওর দু’হাত। প্রবল ধস্তাধস্তির মাঝে দৃষ্টির মিলন ঘটতেই মুখ খুললো যন্ত্রমানব,
— কথা বলবে না আমার সাথে?
নাক টেনে কান্না সংবরণ করলো ফ্লোরা। চোখের কোলে টলমল করছে বেদনাশ্রু। দীর্ঘশ্বাস জমে আছে কণ্ঠায়, মানুষটাকে প্রশ্রয় দিতে সায় দিচ্ছে না মস্তিষ্ক, অথচ সর্বনাশা হৃদয়টা যে গলে জল হয়েছে সেই কখন।
রমণীর মৌনতায় আরও একধাপ দূরত্ব ঘোচালো যন্ত্রমানব। ঠোঁটের মিষ্টতা ছাপিয়ে তুলতুলে কোমল গ্রীবায় নাক ডোবাতেই দমকা হাওয়ার মতো ভেসে এলো রুশরমণীর অভিমানী কণ্ঠস্বর,
— কেন এসেছেন আপনি?
— জানতে চাও?
মুখ তুলে প্রশ্ন ছুড়লো তুষার। অপরপ্রান্ত থেকে জবাব আসেনা আর। দস্যি বালিকার মতোই দু’চোখে ব্যথার সমুদ্র নিয়ে উদ্দেশ্যহীন চেয়ে থাকে মেয়েটা। যা দেখে চোখে হাসলো তুষার। কৌশলী ভঙ্গিমায় বলে উঠলো,
— তাহলে যা বলছি তাই শোনো।
এতোক্ষণে দৃষ্টি ঘোরালো ফ্লোরা। তার চোখে নীরব সম্মতি। ফ্লোরা প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালে কোনোরূপ দ্বিধাদ্বন্দ ছাড়াই রোবটের মতো বাক্য উগড়ে দেয় যন্ত্রমানব,
— জাস্ট বি আ গুড গার্ল,এ্যান্ড টলারেট মি।
ঈশানীদের পেন্ট হাউজ ছেড়ে ম্যানশনে বসবাস শুরু করার পর সময়গুলো যেন হাওয়ার মতো ছুটতে লাগলো। ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড মিলিয়ে যেতে লাগলো হাওয়াই মিঠাইয়ের মতোন।
সত্যিকারের একটা স্বাভাবিক জীবন না দিতে পারলেও ঈশানীর স্বপ্ন পূরণে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছে এরীশ। অধরা মরিচীকায় নিবার্সিত জীবন, পেশাগত নৃ’শংসতার অন্তরালে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সময়গুলো এই ম্যানশনে স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে কাটায় মাফিয়া বস।
ম্যানশনে থাকাকালীন সময়ে এরীশ যেন ভিন্ন এক সত্তা, যে ওভারসাইজড টিশার্ট আর ব্যাগী ডেনিম পড়ে ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক,ছেলের সঙ্গে খুনসুটিতে মেতে থাকে সারাক্ষণ, কখনো আবার খালি গায়ে এ্যাপ্রোন চড়িয়ে মা ছেলের জন্য তৈরি করে মজাদার এগ স্ক্র্যাম্বল।
শুনতে অবিশ্বাস্য হলেও গত বেশিকিছুদিন ধরে মাফিয়া বসের এহেন সাবলীল সত্তায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে ঈশানী। খুব অল্প সময় অতিবাহিত করে অথচ সেই পুরোটা সময় জুড়ে ঈশানীর জন্য রেখে যায় অজস্র সুখের স্মৃতি। সেই আবেগঘন সুখের স্মৃতিকে শিশুর মতো বুকে আগলে নিয়ে দিন কাটায় নীলাম্বরী, পথ চেয়ে অপেক্ষায় বসে থাকে আবার কবে ফিরবে সে!
এমনই এক রৌদ্রজ্জল ঝলমলে সকালে ছেলেকে ন্যানীদের দ্বায়িত্বে রেখে কোনোরূপ জবাবদিহি কিংবা আত্ম সুরক্ষা ছাড়াই ম্যানশন থেকে বেড়িয়ে যায় ঈশানী, সারাদিন বাইরে কাটিয়ে যখন আবার ফিরে আসে,তখন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। শহর জুড়ে শুভ্র চাদরের মতো ছড়িয়ে পড়েছে কুয়াশার আবরণ, চারিদিক অন্ধকার করে শুরু হয়েছে ভয়াবহ তুষারপাত।
কোনোমতে ট্যাক্সি থেকে নেমে সোজা গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো ঈশানী। দু’টো মালামাল ভর্তি শপিং ব্যাগ তার হাতে, গায়ে দৃষ্টিনন্দিত ওভারকোট, মাথায় ধবধবে সাদা উলের টুপি, রেশমের মতো খোলা চুলের ভাঁজে মুক্তোর মতো লেগে আছে অজস্র তুষারকণা। দরজার আগল ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতে না করতেই থমকে গেলো তার পদক্ষেপ। চোখের ডগায় লেগে থাকা মোলায়েম খুশিটুকু উবে গেলো অকস্মাৎ, অভিব্যক্তি পাল্টে যেতেই র”ক্তশূন্য ভয়ার্ত মুখে ডেকে উঠলো রমণী,
—র… রীশ!
— কোথায় গিয়েছিলে?
হলরুমের শোভাবর্ধক কাউচের উপর পায়ে পা তুলে বসে আছে এরীশ। একহাত কাউচের উপর ছড়িয়ে ছেলের সুরক্ষা নিশ্চিত করে অন্যহাতের তর্জণী আর মধ্যমার সন্ধিতে নিজের চিবুক চেপে ধরে হিমশীতল আওয়াজে প্রশ্নখানা ছুড়ে দিলো মাফিয়া বস। বিক্ষুব্ধ ক্রোধে রক্তিম হয়ে আসা শক্ত চোয়াল, আর কোপদৃষ্টি লক্ষ্য করতেই ভয়ে আত্মা শুকিয়ে এলো ঈশানীর। শুষ্ক একটা ঢোকা গিলে নজর ঘুরিয়ে ইয়াশের দিকে তাকালো একপল। ছেলে তার বাবার কোলের কাছে পা ছড়িয়ে বসে বুলেট আর রিভলবার নিয়ে খেলছে।
— লুক এ্যাট মি!
আরেকদফা শীতল হুংকারে জমে গেলো ঈশানী। হাতের ব্যাগ গুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে এরীশের দিকে এগিয়ে আসতেই কাউচ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মাফিয়া বস। কোনোরূপ বাক্যব্যয় না করেই ব্যঘ্র থাবায় চেপে ধরলো ওর নরম গালদুটো। বহুদিন বাদে এরীশের এমন হিং’স্র পৈশাচিক সত্তার মুখোমুখি হয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠলো ঈশানী। নিঃশব্দ কদমে সংকীর্ণতা বাড়িয়ে ভয়ে জবুথবু মেয়েটার গাঢ় নীল চোখে নিজের কৃষ্ণগহ্বরের মতো অশুভ দৃষ্টি তাক করলো মানব।দাঁতে দাঁত পিষে ফের পুনরাবৃত্তি করলো একই বাক্যের,
— কোথায় গিয়েছিলে?
— ব…বলবো এরীশ, ত…তুমি একটু শান্ত হও।
মেয়েটার ভয়ার্ত নীলাভ চোখের মায়াজালে ডুবে যেতে নিয়েও ফের নিজেকে সংবরণ করলো মাফিয়া বস। তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে ছুড়ে দিলো কঠোর বাক্য,
— গার্ড নাওনি কেন?
— ব্যথা লাগছে আমার এরীশ।
নির্দেশ অমান্য করার অপরাধে মেয়েটাকে তীব্র থেকে তীব্রতর ব্যথা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল এরীশ। অথচ এই মূহুর্তে রমণীর একটুখানি ব্যথা টলিয়ে দিলো হিমালয়। ফলস্বরূপ হাতের বাঁধন ঢিলে করে মেয়েটাকে ধমকে উঠলো আবারও,
— এতো অবাধ্য কেন তুমি? বাড়ির বাইরে পা রাখতে নিষেধ করিনি?আমাকে না জানিয়ে, গার্ড না নিয়ে বের হতে কতবার নিষেধ করেছি? নাকি আমার কথাগুলোকে সিম্পল জোক্স মনে হয় তোমার!
এরীশের পুরুষালী গর্জনে কেঁপে উঠলো ঈশানী। পেছনের কাউচে বসা ছোট্ট ইয়াশ শব্দ করে কেঁদে উঠতেই একজন ন্যানী ছুটে এসে ভেতরে নিয়ে গেলো ওকে। ছেলেটাকে নিয়ে গেলে ঠোঁট ভেঙে ডুকরে কেঁদে ওঠে ঈশানী।কান্না বিজরিত গলায় বলে,
— এমন কেন করছো তুমি? ফিরেই তো এসেছি, ম’রে তো আর যায়নি।
— ফাকঅফ!
কপালের উপর বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনী বুলিয়ে চোখমুখ খিঁচে রাগ সংবরণ করার চেষ্টা চালালো এরীশ। পরক্ষণেই শক্ত হাতে বাহু চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে উঠলো ঈশানীকে,
— আর ইউ্য ফাকিং ইনসেইন ! টেল মি? তুমি জানো আমি কোথা ছুটে থেকে এসেছি? ধারণা করতে পারবে একবারও? আজ যদি গার্ড আমাকে অবগত না করতো, আমি যদি রাস্তায় প্রোটোকলের নির্দেশ না দিতাম, তাহলে কি হতে পারতো তুমি জানো? ক্যান ইউ্য ইমাজিন?
নিশ্চুপ বিপরীত পক্ষ। নীরব নিদানে চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে রমণী।
পরপরই অন্যহাত দিয়ে নিজের কণ্ঠনালীটা স্পর্শ করে এরীশ। দাঁতে দাঁত পিষে উন্মাদের মতো বলে ওঠে ,
— গত কয়েকটা ঘন্টা আমার প্রাণটা ঠিক এইখানে আঁটকে ছিল, এই যে এইখানে।
— আমি ঠিক আছি, আমার কিছু হয়নি তো। কেন এতো রাগারাগি করছো?
কান্না গিলে গিলে জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বললো ঈশানী।
— আর কতভাবে ভাঙবে তুমি আমায়? পাইথন প্যারাডাইসের মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিন্যাল দ্যা মাফিয়া বস রীশস্কা আর কিভাবে ভাঙলে খুশি হবে তুমি? বলো আমায়, আন্সার মি!
আবারও ক্রুদ্ধ স্বরে গর্জে উঠলো এরীশ। ও জানেনা এই মেয়েটা কেন এতো অবুঝ। এতো অবুঝ, এতো সরল মেয়েটাকেই কেন মনে ধরলো ওর। গতিহীন হৃদয়টা কেন এই অবাধ্য মেয়েটার দাড়ে এসেই থমকে গেলো হঠাৎ । মন যদি মস্তিষ্কের কতৃত্ব মাথা পেতে নিতো,মনিবের মর্জিতে একটু খানি পরোয়া করতো, তাহলেতো আজ এভাবে পুড়তে হতোনা এরীশকে। নিজের দূর্বলতা, নিজের প্রাণভোমড়ার সুরক্ষায় এতোটা মরিয়া হয়ে আরেক দেশ থেকে ছুটে আসতে হতোনা ওকে। কি আছে এই মেয়েটার মাঝে আজও জানেনা এরীশ, অথচ বেইমান হৃদয়টা বড্ড উপহাস করে বলে, এখানেই তোর সমাপ্তি ।
নিজের অযাচিত ভুল বুঝতে পেরে নীরবে মাথা নোয়ায় ঈশানী। প্রত্যুত্তর করার সাহস নেই ওর, সহসা ফুঁপিয়ে ওঠে নিঃশব্দে।
এরীশ আর কথা বাড়ায় না সহনীয় এক ধাক্কায় ওকে সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে হনহনিয়ে বেড়িয়ে যায় বাড়ি থেকে।
মাঝরাতে শুনশান নিস্তব্ধ হয়ে আছে চারিপাশ। বাইরে বৃষ্টির মতো অবিশ্রান্ত তুষারপাত। অন্ধকার করিডোরের আলোছাঁয়া হাতড়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে এরীশের পাশ ঘেষে দাঁড়ালো ঈশানী। তখনও কাচের দেওয়ালের অপরপ্রান্তের নিরবধি তুষারপাতের দিকে দৃষ্টিস্থাপন করে অজানা চিন্তায় নিমগ্ন মাফিয়া বস । ঈশানীর সশরীর উপস্থিতিতেও কোনোরূপ ভাবান্তর দেখা গেলো না তার মাঝে। এক পর্যায়ে হাত বাড়িয়ে ওর কাঁধ স্পর্শ করলো ভীতু মেয়েটা, তাতেও হেলদোল হলোনা মোটেই, মাফিয়া বসের নিস্প্রাণ শূন্য দৃষ্টি তখনও ডুবে আছে বিভ্রমে। এরীশের তরফ থেকে কোনোপ্রকার ভাবান্তর না পেয়ে এতোক্ষণের মৌনতা ভেঙে ডেকে উঠলো ঈশানী,
— রীশ!
পেছনে ঘুরলো না এরীশ। একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে প্রস্তর কঠিন আওয়াজে বাক্য ছুঁড়ে দিলো,
—চলে যাও এখান থেকে, আমি রেগে আছি ভীষণ।
— কতোটা?
নির্বিকার রমণী প্রশ্নটা করতে করতেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো অনুভূতিহীন প্রত্যুত্তর,
— মে’রেও ফেলতে পারি তোমাকে ।
— যার সুরক্ষার জন্য এতো তৎপরতা, তাকে মা’রতে হাত কাঁপবে না তোমার?
প্রশ্নটা ঈশানী হেয়ালির ছলেই করেছিল, সঙ্গে সঙ্গে ওর চুলের ভাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে সংবেদনশীল হাতে মেয়েটাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো এরীশ। মুখের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে জবাব দিলো,
— প্রথমে তোকে শ্যুট করবো তারপর নিজেকে।
তপ্ত রাগে চিড়বিড় করছে এরীশের মস্তিষ্ক । মুখের উপর আঁচড়ে পড়া তার প্রতিটি গরম নিঃশ্বাসে ঝলসে যাচ্ছে রমণীর পেলব ত্বক। ঈশানী নির্বাক সেইসাথে এরীশও, অসহনীয় নীরবতার মাঝেই হুট মাফিয়া বসের চোখ গিয়ে আটকালো রমণীর আশ্চর্য বসনে। যা দেখা মাত্রই কপাল কুঁচকে গেলো তার। আলোআঁধারির মাঝে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে পরখ করে বুঝলো মেয়েটা শাড়ি পড়েছে, লাল পেড়ে মসৃণ সাদা শাড়ি। পাতলা আঁচলের ফাঁক গলিয়ে অবলীলায় বেড়িয়ে আছে তার নির্মেদ কোমরের বাঁক, যার উপর জ্বলজ্বল করছে এরীশের নাম খচিত সুক্ষ্ম অলংকার।
নির্মেদ কটিদেশ, ধনুকের মতো বাঁকানো বুক, রমণীয় লতানো শরীর সবকিছু ছাড়িয়ে ওই নীলাভ নয়ন দু’টোতে আটঁকে গেলো মাফিয়া বস। চোখের পলকে দুনিয়া থমকে গেলো তার। মেয়েটার চোখে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি তাক করে বললো,
— কি পড়েছো এটা?
আড়ষ্ট হাসলো রমণী, ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো,
— তোমাকে পাগল করার জন্য পড়েছি, এবার ঝটপট দেখে বলোতো কেমন লাগছে আমায়?
এরীশ জবাব দিলো না, বলে কয়ে অনুভূতি প্রকাশ ওর ধাঁচে নেই, সহসা নির্বিকারে হাঁটু ভেঙে ধীরে ধীরে বসে পড়লো মেঝেতে, অতঃপর দু’হাতে প্রিয়তমার কোমর আঁকড়ে ধরে পরিশ্রান্ত মাথাটা এলিয়ে দিলো ওর নরম বুকে। হিমশীতল গলায় আওড়ালো,
— প্রেম আমার!
ঈশানী কোমল হাতে ওর মাথাটা আগলে ধরলো, চুলের ভাঁজে আঙুলের প্রলেপ বুলিয়ে শুধালো,
— কি হয়েছে?
— আ’ম স্যরি, স্যরি ফর এভরিথিং, বলো আর কখনো গার্ড ছাড়া বের হবেনা?
এরীশের মুখে অপ্রত্যাশিত এই বাক্যখানা শোনা মাত্রই ঝুঁকে বসলো ঈশানী। দু-হাতের অঞ্জলিতে মাফিয়া বসটার চিবুক ছুঁয়ে অভিযোগের স্বরে বললো,
— আমি জানি তুমি আমার জন্য দুশ্চিন্তা করছিলে, তোমার রাগ মোটেও অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু কি করবো বলো? তোমার গার্ড গুলো পাঁজি ভীষণ। তারাতো তোমার অনুমতি ছাড়া নিঃশ্বাসও ফেলতে পারেনা, তুমিই বলো, সবকিছু যদি আগেভাগেই বলে দিতো তাহলে সারপ্রাইজটা কিভাবে হতো? ওই জন্যই তো ওদের সঙ্গে নিইনি।
— সারপ্রাইজ! কিসের সারপ্রাইজ!
ভ্রুকুটি করে প্রশ্ন ছুঁড়লো এরীশ। তৎক্ষনাৎ নিজের বোকামো উপলব্ধি করে দাঁত দিয়ে জিভ কাটলো ঈশু। মেকি হেসে বললো,
— কই কিছু না তো।
সেই দুষ্টুমি মাখা হাসিতে স্তব্ধ হয়ে গেলো এরীশ। অনুভব করলো ঈশানীর চাঞ্চল্য। মেয়েটা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে, অন্তর্মুখীর শক্ত খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে ক্রমশ চিনতে শুরু করেছে নিজেকে। হারিয়ে ফেলছে কলুষিত অতীত, ভুলে যাচ্ছে অবসাদগ্রস্ততা। দেখতে দেখতেই এরীশের মনে হলো ঈশানীর হাসি চমৎকার, তার চেয়েও চমৎকার ওর ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে ঝিলিক দেওয়া মুক্তোর মতো গিজ দাঁত।
এই হাসিটুকু অম্লান রাখতে যা কিছু করবে এরীশ, যা কিছু!
একটু বাদেই কি ভেবে যেন ঈশানী সমেত উঠে দাঁড়ালো সে। হাত ধরে কোথাও একটা নিয়ে যেতে যেতে বললো,
— চলো আমার সাথে।
হতচকিত ঈশানী মুখ ফুটে কিছু একটা বলে ওঠার আগেই, ওকে বেজমেন্টে নিয়ে এলো এরীশ। তারপর গোপন একটা দরজা দেখিয়ে বললো,
— এটা হলো বাঙ্কার। কখনো কোনো কারণে যদি পরিস্থিতি তোমাকে এখানে এনে দাঁড় করায় তাহলে ছেলেকে নিয়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিবে। ভেতরে একটা সেন্সর বাটন আছে, ওটাতে প্রেস করলে আমার কাছে সিগন্যাল চলে যাবে, পৃথিবীর যে প্রান্তে যে অবস্থায় থাকিনা কেন আমি চলে আসবো, দুনিয়া ওলট-পালট করে হলেও আসবো। এ্যান্ড আই প্রমিস দ্যাট!
এরীশ বেশ নিরুত্তাপ স্বরে কথাগুলো বললেও ঈশানীর যেন পিলে চমকে গেলো। মেয়েটা অবিশ্বাস্য নয়নে চাইলো স্বামীর পানে, থেমে থেমে আওড়ালো,
— এসব কি ছিল এরীশ?
— আমি যা বলেছি পারবেনা?
— কিন্তু কেন?
ঈশানীর কণ্ঠ আহত শোনালো। মাফিয়া বসের মুখাবয়ব থমথমে হয়ে উঠলো এতোক্ষণে। তপ্ত শ্বাস ফেলে, গম্ভীর গলায় জবাব দিলো ,
— পাইথন প্যারাডাইসের পুরো আইটি টীম একজনকে খুঁজে বের করতে মরিয়া, আর সে মরিয়া আমার দূর্বলতা খুঁজতে, অর্থাৎ তোমাকে।
কথাগুলো বলতে না বলতেই ছিঁটকে এসে এরীশের বুকের উপর পড়লো ঈশানী, দু’হাতে শক্ত করে ওর গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
— আমার খুব ভয় করছে এরীশ। নিজের আত্মবিশ্বাস দেখাতে গিয়ে সবসময় কিছুনা কিছু গন্ডগোল করে বসে আমি। তারপর সব ভুল তোমাকে শোধরাতে হয়। এবারও যদি….
রমণীর বাক্য সম্পন্ন হওয়ার আগেই ওকে টান মে’রে নিজের বুকের ভেতরে পুরলো এরীশ,অতঃপর তীব্র
খড়ায় বয়ে আসা জলোচ্ছ্বাসের মতোই ভেসে এলো তার রাশভারি কণ্ঠস্বর,
— আমি যদি প্রলয় হই, তবে তুমি আমার পরিণিতা। তুমি পারবে, তোমাকে পারতেই হবে।
ইয়াকুতিয়া রাজ্য,
রাতভর তুমুল বর্ষণ শেষে সকাল সকাল মিষ্টি রোদে ভরে উঠেছে চারপাশ। চকচকে রোদের ঝলক চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেলো ফ্লোরার। ঘুম ভেঙে কয়েক মূহুর্ত স্তম্ভিত চেয়ে থেকে নিজের পরিণতি দেখলো রুশকন্যা। পাশেই দুনিয়া ভুলে ঘুমিয়ে আছে তুষার। কাল ওমন পাগলামো করে বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকেই শরীরটা জ্বরে পুড়ছে ওর। অগত্যা রাগ অভিমান সব ভুলে পতিসেবায় ন্যাস্ত হয়েছে ফ্লোরা।তার পুরস্কার স্বরূপ রমণীকে নির্ঘুম রাতজাগিয়ে এখন মনের আনন্দে ঘুমাচ্ছে সে লোক।
ঘুমন্ত তুষারের পানে চেয়ে এক আধবার মুখ ঝামটালো ফ্লোরা, অতঃপর নিরাবরণ শরীরটাকে চাদরে ঢেকে বিছানা ছাড়লো ও। কক্ষের এককোনায় আটপৌরে ধাঁচের একটা পিয়ানো রাখা আছে, ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে আজ বহুদিন বছর বাদে পিয়ানোর সামনে রাখা টুলটা টেনে বসলো ফ্লোরা। পিয়ানোর গায়ে এলোমেলো হাত চালিয়ে সুর তোলার চেষ্টা করলো কয়েকবার, ঠিকঠাক সুর না ওঠায় পূর্ণ মনোযোগ নিবিষ্ট করে আঙুল চালাতে গিয়ে অনুভব করলো ওর হাতের উপর অন্য একটি পুরুষালি হাতের উপস্থিতি, চকিতে পাশ ফিরে তাকাতেই সম্মুখীন হলো ঘুম জড়ানো পুরুষালী চাহনীর। রমণীর র’ক্তিম ওষ্ঠাধরের পানে নিবিষ্ট চোখে চেয়ে পিয়ানোর দিকে ঝুঁকে আছে যন্ত্রমানব। ফ্লোরার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই টান মে’রে ওকে কোলের উপর নিয়ে বসলো সে, একই চাদরের অন্তরালে ঢাকা পড়লো দু’টো নিরাবরণ শরীর। তুষারের অনাবৃত ঢেউ খেলানো বুকের স্পর্শ পেতেই কলমিলতার ন্যায় গুটিয়ে গেলো রমণী। তাতে চুল পরিমাণ তোয়াক্কা না করে ওর খোলা কাঁধে চিবুক ঠেকালো তুষার। হাতের উপর হাত রেখে পিয়ানোর গায়ে সুর তুললো। চিরচেনা বিমুগ্ধ সেই সুর,
আখে মেরি হার জাগাহ্,
ঢুনডে তুঝে বেওয়াজাহ্
ইয়ে মেইন হু ইয়া…..
কয়ি অর হেয়….
মেরি তারাহ……
ক্যায়েসে হুয়া ক্যায়েসে হুয়া,
তু ইতনা জরুরি ক্যায়েসে হুয়া….
সুরের সয়লাবে মুখরিত চারপাশ। ঠিক সে সময় ফ্লোরার ঘাড়ের উপর আলতো স্পর্শে নাক ঘষে দিয়ে আদর জড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো তুষার,
— এবার বলো চিঠি কে লিখেছিলো?
— আমিই…
কুণ্ঠিত স্বরে প্রত্যুত্তর করে ফ্লোরা?
— সাহস কে দিয়েছে?
মানবের আকস্মিক প্রশ্নে ভড়কে গেলো মেয়েটা,মুখ কাঁচুমাচু করে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো সাবলীল অভিব্যক্তি,
— আমি তোমাকে স্পর্শ করিনি এই জন্য এতো অভিমান?
— ভালোবাসলে তো স্পর্শ করবেন, আপনিতো দ্বায়িত্বের জেরে বিয়ে করেছেন।
রমণীর ব্যথাক্লিষ্ট অন্তর, প্রতিটি বাক্যে ঝরে পড়ছে অবর্ণনীয় অভিমান। ঠিক তখনই নিরুত্তাপ স্বরে স্বগোতক্তি করলো যন্ত্রমানব,
— বিয়ের পরেও দূরত্ব ধরে রেখেছি বলে তুমি ব্যথা পেয়েছো ফ্লোরা? অথচ তোমার দগদগে ক্ষততে আবারও র’ক্তক্ষরণ করতে চাইনি বলে আমার এই আত্মিক সংযম। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া উচিৎ, হুট করেই যদি আমার স্পর্শ তোমার খারাপ লেগে যেতো? যদি পুরোনো সেই বিভীষিকার কথা মনে করিয়ে দিতো। তাহলে অপরাধবোধে আমি শেষ হয়ে যেতাম ফ্লোরা।আ..
শেষ কথাটা বলতেই পেছনে ঘুরে শক্ত হাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে ফ্লোরা, মানুষটাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বুকের কান্না গিলে গিলে বলে ওঠে ,
— চুপ!একদম চুপ! আমি ওসব ভুলে গিয়েছি তুষার। আপনার ভালোবাসার স্পর্শে আমার শরীরের সব কলুষতা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে, আমি এখন পবিত্র তুষার! আমি পবিত্র!
— আই লাভ ইউ্য!
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৩
অনবরত ক্রন্দনের মাঝেই নীরব স্বীকারোক্তিতে নিজের হৃদয়টাকে রুশরমণীর নামে সমর্পিত করলো তুষার জাওয়াদ। অস্ফুট সেই আওয়াজে খেই হারালো রমণী,পিয়ানোর তাল কেটে গেলো, বেখেয়ালে সরে গেলো চাদরের পাতলা আবরণ। অতঃপর ধীর, শান্ত, কোমল দৃষ্টি আলাপনের তালে তালে অনুভূতির এক নিরবধি উল্লাসে মেতে উঠলো দু’জন।

Plz 65 part plz!?🙂✨
Ar part kothai please dau aro part last part porjonto please
Eta Running story,,next part akhono release hoy nai🙂