আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২২
সুরভী আক্তার
মেঘা ঘাড় ঘোরালো অগত্যা । পেছনে বিছানার উপর কতগুলো ফাস্ট ফুডের প্যাকেট মেলে রাখা । প্রত্যেকটায় মোমো ভর্তি । স্টিমড মোমো , ফ্রাইড মোমো উভয়েই । মোটে ছয়টা প্যাকেট । এগুলোই আবার ভাগ ভাগ । একেকটায় একেক ফিলিং করা হয়তো , বিভিন্ন ফ্লেভারের । মেঘা ফের ঝট করে রৌদ্রের দিকে চায় । সহসা হিসহিসিয়ে বলে রৌদ্র…..
” বাইরে যেতে চাস ? তো এগুলো সব ফিনিশ করে তবেই যাবি ! সব তোর জন্য । খুব ফেভারিট তোর এই খাবার ? অন্যের টাকার খাবার কেনো খাবি তুই ? আ’ম ইউর হাসবেন্ড, চলবি তুই আমার টাকায় । খাবিও আমার টাকায় । সব আশা মেটাবি আমার টাকায় । নে চল , সব ফিনিশ কর ফাস্ট ।
মেঘা কন্ঠ স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন ছোড়ে…..
” কে এনেছে এসব ?
” আমি !
” কেনো ?
” তোর জন্য ! সব খাবি তুই….
” খাবো না আমি !
মেঘা উঠে দাঁড়ায় । রৌদ্র এক ঝটকায় এগোতেই ফের ঠাস করে পিছিয়ে বসে পড়ে বিছানায় । বিছানার দুদিকে দুহাত ঠেসে ঝুঁকে এসে মেঘা কে বন্দি করে নেয় রৌদ্র । রেগে বলে….
” তুই খাবি না তোর ঘাড় খাবে । অন্য কেউ এনে দিলে খুব ভালো লাগে তাই না ? এখন আমি এনেছি এসব । সব তোকেই খেতে হবে । খুব ফেভারিট খাবার তোর এটা , কতগুলো খেতে পারিস তাই দেখবো আমি । যদি না খাস, তাহলে ফেভারিট খাবারের জায়গায় থাপ্পর খাবি আমার হাতে ।
শুল্ক ঢোক গেলে মেঘা । পিছিয়ে খাটে ওঠে । বলে ভেজা গলায়….
” দেখুন , জোর করবেন না আমায় । আ.. আমার খিদে নেই । আমি খাবো না এখন ।
” খিদে নেই কেনো ? সকাল থেকে তো কিছু খাস নি আদ্রের নিয়ে আসা মোমো ব্যাতীত । ওর দেওয়া খাবার খেয়েই পেট তাজা আছে এখনো ? ইডিয়ট , থাপ্পর খেতে চাইছিস ? সামলে আছি আমি । এতক্ষণে মেরে বসতাম তোকে । কাঁদতে না চাইলে দ্রুত খেয়ে নিবি ।
মেঘা অনড় । রৌদ্র থেমে থেকে ওর শক্ত ভঙ্গিমা দেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় । গা ঝেড়ে বলে….
” যতক্ষণ না খাবি , ততক্ষণ মুক্তি পাবি না এ ঘর থেকে । বন্দি হয়ে থাকতে চাইলে থাক এভাবেই । আমি চললাম সেদিনের মতো ।
রৌদ্র পা বাড়াতে গেলে মেঘা এই প্রথম স্বেচ্ছায় খপ করে টেনে ধরে ওর হাত । ঝাঁকুনি দিয়ে দ্রুত ফিরে চায় রৌদ্র । মেঘা ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে বলে হাত ধরে রেখেই…..
” সত্যিই খিদে পায় নি আমার । আমি খেতে পারবো না এখন । আমি এসব নিয়ে যাচ্ছি , পরে খেয়ে নেবো । আপনি আমাকে রেখে যাবেন না প্লিজ । দরজা খুলে দিন , আমি বেরিয়ে যাবো ।
রৌদ্র খানিক অবাক হয়ে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে নিজের হাতের পানে । মেঘা ওর নজর বুঝে ঝাড়া মেরে হাত ছাড়লো । রৌদ্র বোধহয় হাসে । ঠোঁটের কোণে ভিড় জমায় তৃপ্ত হাসি । পরক্ষনে হাসি ঠেলে বলে….
” আমার সামনে খাবি যতটা পারিস ততটা । বাকি গুলো নিয়ে কোথায় যাবি যাস ।
মেঘা সুযোগ পেলো । দুহাতে গপাগপ দুটো মোমো মুখে পুরে নিলো । আহম্মক বনলো রৌদ্র । মেঘা চিবুতে চিবুতে অস্পষ্ট স্বরে বললো….
” খেয়েছি , এবার আমি গেলাম ।
” ইডিয়ট , সব সাথে নিয়ে যা ।
মেঘা নেমে দাঁড়ায় । সব হাতে তুলে বলে…..
” নিয়েছি , এবার দরজা খুলে দিন ।
রৌদ্র আর বাঁধা দিলো না । দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো মেঘা । যেনো কোনো রকমে বেরোতে পারলেই বাঁচে ।
প্যাকেট গুলো হাতে তুলে কোনো রকমে বড় বড় ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নামলো । এসব সবার সামনে এই মুহূর্তে নিয়ে যাওয়া মানে হাজার প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া ।
এসব কোনো রকমে কিচেনে ফেলে আসতে পারলেই বাঁচে সে ।
করিডোরের বাম দিকে নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তোফায়েল কাবির । সবটা ধারালো দৃষ্টিতে অবলোকন করলেন তিনি । মস্তিষ্ক চড়াও হয়ে উঠলো অমনি । তার বেপরোয়া ছেলের ঘর হতে বেরিয়ে আসলো মেঘা ? কেনো ? কি হচ্ছে এসব ?
রাতের খাবারের সময় হয়েছে । নিচে সবাই উপস্থিত খাবার টেবিলে । একমাত্র তোফায়েল কাবির ব্যাতীত । তাকে ছেড়ে বসেছে সবাই , কিন্তু খাওয়া শুরু করে নি কেউ । রুবিনা কাবির যথা সময়েও স্বামীর উপস্থিতি না দেখে তাকে ডাকতে উপরে উঠলেন । বারান্দায় ইজি চেয়ারে শরীর এলিয়ে বসে আছেন তোফায়েল কাবির । বোধহয় চিন্তিত । চেয়ারের হাতলে কনুই ভর দিয়ে দুই আঙ্গুলে কপালে স্লাইড করছেন চোখ বুজে । দুলছে রকিং চেয়ার । রুবিনা কাবির ডাকলেন….
” এখনো বসে আছেন যে এখানে ? কটা বাজে খেয়াল আছে ? ডিনার করবেন না ? সবাই বসে গেছে , অপেক্ষা করছে আপনার ।
” হ্যাঁ ? হু , যাচ্ছি ! চলো….
একটু বিলম্ব রেখে বললেন জড়তা ঠেলে….
” আ… শোনো । দুটো কথা আছে তোমার সাথে ! কিছু জানার আছে !
” বলুন ! এখনি জানতে হবে ? নিচে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে সবাই । আগে খেয়ে নিন চলুন । পরে…
” না , এক্ষুনি জানা প্রয়োজন আমার ।
কথা বলেছো তোমার ছেলের সাথে ? সে কি করবে এখন ? এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে যাওয়ার ডেট ক্যান্সেল হলো । এখন কি করবে তোমার ছেলে ? ফিরবে ? কবে ফিরবে আবার ? বলে নি তোমায় ?
রুবিনা কাবির মুখ চুপসে কালো করলেন সহসা । রাগে বিকৃত করলেন কিছুটা । বললেন রুক্ষ স্বরে….
” আপনি এখনো এসব নিয়ে পড়ে আছেন ? এসবই ভাবছেন তাহলে ? ছেলে থেকে গেছে অঘটনে , এই নিয়ে একটুও খুশি নন আপনি ? উল্টে , ছেলে কবে ফিরবে না ফিরবে সেসব জানার আগ্রহ জাগছে আপনার ? শুনে রাখুন , ফিরবে না আমার ছেলে । ও থেকে যাবে আজীবন ।
” সেটাই শিওর হতে চাইছি আমি । তোমার ছেলে থাকবে তো ? যদি থাকে , তাহলে আমার বিপরীত দিকের একটা পদক্ষেপ নিতে হবে । তোমার রুখো ছেলের মনোভাব ভালো ঠেকছে না আমার কাছে ।
” কি ভালো ঠেকছে না শুনি ? কি করেছে আমার ছেলে ? পদক্ষেপ ? কি পদক্ষেপ নেবেন আপনি ?
” সেটা তোমাকে বলে লাভ নেই ।
” হ্যাঁ , লাভ থাকবেই বা কেনো ? বিপরীতে হলে তো এটা আমার ছেলের বিষয় নয় ! ও কেবলই একলা আমার ছেলে । আপনার তো কেউ নয় ও । এটাই মানেন আপনি । ওর চিন্তা যেমন আপনার নেই , তেমনই ও ব্যাতীত অন্য কারোর চিন্তা নেই আমার মাথায় । আমার ছেলের বৃত্তান্ত বাদ দিয়ে আপনি যা খুশি , যার বিষয়ে খুশি মাথা ঘামান । আমি বাধা দেবো না । ভাববোও না । তবে আমার ছেলের বিষয় হলে অবশ্যই ভাববো আমি ।
তোফায়েল কাবির চুপ রন । ক্ষিয় কাল বাদ হাসেন মৃদু শব্দে । প্রসঙ্গ পাল্টে কৌতুক স্বরে বলেন উঠে দাঁড়িয়ে….
” তুমি আজকাল স্বার্থপর হচ্ছো খুব । আমাকেও হিংসে করছো । বড্ড ঠাস ঠাস কথা শোনাচ্ছো আমায় । ভালোবাসা কমে গেলো আমার প্রতি ।
রুবিনা কাবির ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন । মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কন্ঠের তোপ এক রেখেই জবাব করলেন…..
” ভীমরতি করবেন না । কথা শুরু আপনি করেন সর্বদা । নিজের বলা কথা মনে থাকে না , আমার কথা গুলোই গায়ে লাগান শুধু । খেতে চলুন এখন । কখন থেকে বসে আছে সবাই ।
সবাই প্লেট সামনে নিয়ে বসে আছে ।
তোফায়েল কাবির নেমে আসা মাত্রই খাওয়া শুরু করলো সবাই । খেতে খেতে তোফায়েল কাবির জবান খুললেন শাহিনা কাবিরের উদ্দেশ্যে….
” ভাবি , তোমার বাপের বাড়ি থেকে তো দাওয়াত করে গেছে , তাই না ?
” হুম । ভাইয়া ভাবি যাওয়ার আগে তো যেতে বলে গেছে ।
” কবে যেতে বলেছে ?
” মাঝে তো সাবা’র পরীক্ষা আছে । এর মধ্যে ও বাড়িতে গিয়ে তালগোল না পাকানোই শ্রেয় । মেয়েটা পরীক্ষা দিক আগে । শুভ্রও বিয়ের ভেজালে অফিস করতে পারে নি কদিন । এর মধ্যে আবার ওখানে গেলে অফিস কামাই হবে । কাজের চাপ বাড়বে পরে । মেঘা আর শাফাহ্’র ভার্সিটিতেও ছুটি শেষ । মাঝে কটা দিন যাক । সবাই সবদিক সামলে নিক । শুভ্র এ কদিন অফিসে যাক একটু । সপ্তাহে তিনেক পর ওরা সবাই মিলে যাবে না হয় ।
” সপ্তাহ তিনেক নয় ।
কালকেই ওদের পাঠিয়ে দাও গ্রামে । ঘুরে আসুক ওরা ।
সাবা’র পরীক্ষা আছে তো কি হয়েছে ? এরা কি ছোট বাচ্চা , যে ওকে ডিস্টার্ব করবে ?
” কিন্তু…
” কোনো কিন্তু নয় ভাবি । তোমার বাপের বাড়ি হলেও জোর খাটাচ্ছি আমি । এতে কিছু মনে করো না । কালকেই যাক ওরা ।
রুবিনা কাবির বললেন….
” মেহের তো বিয়ের পর এখনো নিজের বাপের বাড়িই যেতে পারে নি । কাল তো সেখানেই যাওয়ার কথা !
” বাপের বাড়িতে সারাজীবন থেকে এসেছে । এখন কদিন না হয় শশুর ঘরের আত্মীয় বাড়িতে ঘুরে বেড়াক । কি মেহের , সমস্যা আছে কোনো ? বাপের বাড়িতে পরেও যেতে পারবে মা । এখন একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসো , দেখবে ভালো লাগবে ।
মেহের হাসার চেষ্টা করলো । বললো না কিছু । আড়চোখে তাকালো শুভ্রর দিকে । শুভ্র ওর দৃষ্টি বুঝে নেয় সহসা । বলে….
” কিন্তু কাকাই , আমার তো অফিস আছে । এখন গ্রামে গেলে গ্যাপ পড়ে যাবে অনেক । তোমরা একলা সামাল দিতে পারবে ?
” পেরে যাবো ঠিক । অফিস নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না ।
কাল গ্রামে যাচ্ছো তোমরা । আমি আর দ্বিমত শুনতে চাই না । আদ্র আর তুমি কাল শাফাহ্ , মেহের আর মেঘা মামুনি কে নিয়ে গ্রামে যাবে । এখানকার চিন্তা বাদ দিয়ে ফ্রি হয়ে সেখানে থাকবে কদিন ।
” আমার যাওয়া হবে না আব্বু । ভার্সিটি আছে আমার । একেই ছুটি কাটিয়েছি কদিন । এরপর ছুটি পাবো না । মেঘ আর টুকটুকিও খুব বেশি মিস দিচ্ছে ভার্সিটি । আই থিংক , এ সময় অন্য কোথাও না যাওয়াই ভালো ।
বারবার একেক জনের একেক বাঁধ সাধা কথার শেষে ছেলের কথায় রেগে গেলেন তোফায়েল কাবির । খাওয়া থামিয়ে কন্ঠ চড়িয়ে বললেন….
” ভালো,খারাপ তোমাকে বা তোমাদের কাউকেই ভাবতে বলি নি । আমি যা বলেছি তাই হবে । বারবার একেক জন একেক বাহানা দিচ্ছো কেনো তোমরা ? ভার্সিটি আছে তোমার ? কাল শুক্রবার , আর পরশু শনিবার । দু’দিন সরকারি ছুটি আছে হাতে । কাল যাবে , মেয়েদের রেখে প্রয়োজন পড়লে দু ভাই মিলে চলে আসবে পরশুদিন । ভার্সিটি আর অফিস , দুজনের দুটোই হবে এতে । আর বাকি রইলো মেঘা আর শাফাহ্ – ওরা ছুটি কাটাচ্ছে, এই সুযোগে আর কদিন ভার্সিটি না গেলেও খুব একটা ক্ষতি হবে না । তুমি তো আছো । সামলে নিতে পারবে না ওদের দিকটা ? কোনো কথা আছে আর ? বলতে চাও আর কেউ কিছু ?
স্তব্ধতা ছড়ালো তিনি থামতেই ।
আদ্র সূক্ষ্ম নেত্রে তাকায় । হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত আর রাগ , কোনো টার কারন বুঝলো না সে ।
তোফায়েল কাবির খেলেন না ঠিকমতো । উঠে গেলেন হাত ধুয়ে । তার রেখে যাওয়া সিদ্ধান্তটাই ফাইনাল হলো । কালকেই গ্রামে যাবে , এটাই শেষ কথা ।
পুরো সময় জুড়ে মেঘা, শাফাহ্ সহ বাদ বাকিরা নিরব ভূমিকা পালন করলো ।
শাফাহ্ বড্ড খুশি । এই সুযোগে আরো কদিন ভার্সিটির চক্কর থেকে মুক্ত সে ।
খেয়ে দেয়ে ঘরে উঠে গাল ফুলিয়ে বসে আছে মেহের । বাড়িতে যাওয়ার কথা সেই কাল থেকে । যাওয়া হয় নি । এখন আবার অন্য কোথাও যাবে । সেখানে গেলে সামনে আরো কতদিন যাওয়া হবে না নিজের বাড়ি । আম্মু আব্বু কে দেখা হয় নি এই দেড় দিন হলো । এতেই মনে হচ্ছে কতদিন ধরে দেখা হয় নি ।
সায়ান কালকে এসেছিলো একবার । আজ আসেনি ।
অভিমান হয়েছে মেহেরের । কালকে ওর নিজের বাড়ি যাওয়া টা ক্যান্সেল ।
মিররের সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছে জোর খাটিয়ে । ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলছে ক্ষণিকে ক্ষণিকে । শুভ্র বুকে হাত গুটিয়ে ঠোঁট কামড়ে ওকে পর্যবেক্ষণ করলো । এই মেয়ে টা অভিমান করলেও বড্ড সুন্দর দেখায় । আজকাল ওর সব রুপই চমৎকার ভাবে ধরা দেয় চোখে ।
শুভ্র এগিয়ে গেলো । মেহেরের পেছনে দাঁড়িয়ে আয়নাতেই ওর পানে তাকিয়ে বললো….
” কি মহারানী ? রাগ হয়েছে ?
মেহের ঝট করে উঠে দাঁড়ায় । সামনাসামনি হয়ে নাক টেনে বলে…..
” ভাইয়া , আমি আগে বাড়ি যা….
শুভ্র কিড়মিড়িয়ে রাগ দেখায়…..
” গাধা , আবার ভাইয়া বলছিস ? কাল রাতের কথা বেমালুম ভুলে গেছিস ?
মেয়েটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখ ফাঁক করে চায় । এক মুহুর্ত পর এক রাশ লজ্জায় চিবুক নামায় কন্ঠায় । জিভে দাঁত বসায় একটু আধটু । ওরনার কোণা খামচে ধরে লজ্জা সূচক ইতস্ততায় । এই লোকটার মুখের লাগাম হারিয়েছে কোথায় ? কাল থেকে বড্ড জ্বালিয়েছে । প্রথম দু’রাত মুক্তি পেলেও গতরাত মুক্তি মেলেনি এই লোকের কবল থেকে । সেই থেকে কথায় কথায় লজ্জা দিচ্ছে ওকে ।
মেহেরের লাজুকতা দেখে ওষ্ঠপূটে দাঁত চেপে হাসি সংবরন করে শুভ্র । বলে গলা ভার করে…..
” ভাইয়া বলাটা ছাড়বি কবে ?
মেহের মুখ বাঁকায় । পিঠ ফিরে আয়নার দিকে ঘোরে । চিরুনি রেখে খোপা করে নেয় চুলগুলো ।
দৈবাৎ বিলম্ব না করে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো শুভ্র । সুডৌল কাঁধে থুতনি বসিয়ে পেঁচিয়ে নিলো লতানো কোমর । আপন পুরুষের খোঁচা দাঁড়ি মসৃণ কাঁধে বিদ্ধ হওয়া মাত্রই কুঁকড়ে যায় রমনী । শুভ্র কাঁধের কাছটায় শব্দ করে চুমু বসিয়ে আয়নার পানে রমনীর লালিত মুখ পানে তাকিয়ে বলে মোলায়েম কন্ঠে….
” বউজান , আমি না তোমার হাসবেন্ড । হাসবেন্ড কে ভাইয়া বলতে নেই বুঝেছো ? আর বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে না বলে অভিমান করেছো জানি । অভিমান উপড়ে ফেলো দেখি । গ্রাম থেকে ঘুরে আসি আগে । কাকাই যেহেতু বলেছে , অবাধ্য হওয়া টা ঠিক হবে না । ফিরে এসে বাপের বাড়ি যেও । কেমন ?
মেয়েটা মৃদু উচ্চারণ করে কন্ঠ খাদে নামিয়ে….
” হু ।
” এবার হাসো একটু । অভিমানীর ওষ্ঠপূটে দৃশ্যমান লাজুক হাসি দেখার তাগিদে তাকে আরো একটু বেশি লজ্জা দিতে ইচ্ছে করছে যে আমার । দেবো কি লাজবতীকে আরেকটু লাজ ?
মেয়েটা আর পারে না । দুহাতে মুখ লুকিয়ে নেয় কুন্ঠায় । ফিক করে শব্দ তুলে হাসে শুভ্র ।
পরদিন দুপুর । শুক্রবার আজ ।
জুমার নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরেছেন সকলে । খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে ড্রইং রুমে বসে আছেন বাড়ির দুই কর্তা । রৌদ্র বাড়িতে থাকলেও সবার সাথে খায় নি । শাওয়ার নিয়ে স্বভাব সুলভ আধো ভেজা শরীরেই টিশার্ট জড়িয়েছে । গলায় টাওয়েল ঝুলিয়ে খেতে বসেছে নিচে নেমে । ছোপ ছোপ ভেজা টিশার্ট । ভেজা চুল অগোছালো হয়ে কপালে লেপ্টে । রুবিনা কাবির ছেলেকে খেতে দিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন । ছেলে তার বড্ড বেখেয়ালে । নিজের যত্ন বোঝে না । হুতাশ হয়ে শ্বাস ফেললেন তিনি । ছেলের গলা হতে পেঁচানো টাওয়েল সরিয়ে নিতে নিতে বললেন…..
” চুল গুলো ভেজা এখনো । ঠান্ডা পড়ছে । এই সিজন চেঞ্জে ঠান্ডা লেগে যাবে তো । তুই সেই অগোছালোই রয়ে গেছিস রৌদ্র । নিজের দিকে খেয়ালি হবি কবে ? এবার একটু নিজের প্রতি এই বেখেয়ালি পনা ছাড় ।
রৌদ্র নিরুদ্বেগ । কথা গুলো এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিলো । আপন মনে খাচ্ছে সে । রুবিনা কাবির টাওয়েল সরিয়ে ছেলের মাথায় চেপে ধরতেই ছেলে তার রুষ্ট জবান খুললো….
” ওও মম , খাচ্ছি তো । ডিস্টার্ব করো না ।
” চুল গুলো তো এখনো ভেজা ।
” থাক ।
” ঠান্ডা বসবে শরীরে ।
” অভ্যাস হয়ে গেছে । চিন্তা করো না ।
তোফায়েল কাবির সেই থেকে সূক্ষ্ম নেত্রে একাধারে ছেলেকে পরখ করলেন । কোনো রকমে ঠুকরে খেয়ে উঠে গেলো রৌদ্র ।
সকাল থেকে মেঘার নাগাল মেলে নি একবারের বেশি । ব্রেকফাস্টের সময় দেখেছিলো সেই সকালে । তারপর আর দেখেনি ।
মাথা মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার আগে মেঘার ঘরে একবার চোরের মতো উঁকি দিলো সে । ঘরের দরজা হাঁট করে খুলে রাখা । ভেতরে নেই কেউ । রৌদ্র কপালে ভাঁজ ফেলে । কোথায় সেই ইডিয়ট ? ছাদে ? এই দুপুরে তো ছাদে ওঠার কথা নয় । রৌদ্র ঘাড় উঁচায় । শিরদাঁড়া টানটান করে হাতের ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে । পা বাড়াতে বাড়াতে কললিস্ট ঘেঁটে নাম্বার বের একটা । সেটাতে ডায়াল করে ফোন তুলে কানে ঠেকায় । দুবার রিং হয় সবে ।
কল রিসিভ হওয়ার আগেই নিজের ঘরের দিকে এগোতে গেলে কানে বাজে মেয়েলি চিকন হাসির ঝংকার । সহসা থমকায় যুবক । দ্রুত কান থেকে ফোন নামায় । সিরাতের ঘরে থেকে আসছে হাসির শব্দ । শাফাহ্’র কন্ঠও শোনা যাচ্ছে ।
রৌদ্রের বুঝতে বাকি রইলো না । ঘাড় ডললো সে । ফোন কেটে পথ পরিবর্তন করে সোজাসুজি এগোলো সিরাতের ঘরের দিকে । দরজায় টোকা মারতেই চট করে চার জোড়া দৃষ্টি ফিরে চায় রৌদ্র বরাবর । রৌদ্র কে দেখে হাসি বিলিন হয় একবিংশীর ঠোঁট হতে । মুখ কালো নিতে সময় পার করে না । সিরাত আকস্মিক নিজের দোরগোড়ায় ভাইকে দেখে সন্দিহান হয়ে প্রশ্ন করল….
” রৌদ্র , তুই এখানে ?
রৌদ্র ভেতরে ঢোকে । আবারো প্রশ্ন করে সিরাত…
” কিছু প্রয়োজন ?
রৌদ্র কথা খুঁজে না পেয়ে অযথা প্রয়োজন খুঁজলো….
” রামিশা ঘুমিয়েছে ?
সিরাত বাম ভ্রু উপরে তোলে । ভাইয়ের মতলব ঠাহরে নিয়ে বলে তাল মিলিয়ে….
” হু ।
” তাহলে ঘুমন্ত বাচ্চার কানের কাছে হিহি করে এতো কিসের হাসাহাসি করছো এখানে ? এই ইডিয়ট , এখানে কি চাই তোর ? বের হ এই রুম থেকে !
মেঘার উদ্দেশ্যে গজগজ করে শেষের কথা গুলো ছুঁড়ে দিলো । মুখশ্রী বিকৃত করলো মেঘা ।
সিরাত ব্যাতীত, মেহের আর শাফাহ্ নির্বোধের ন্যায় চেয়ে আছে আচমকা হুমকি ধামকি দেখে ।
রৌদ্র হাতের ফোনটা বিছানার উপর রাখলো । বিছানার পাশের দোলনায় শোয়ানো রামিশা । রৌদ্র ঝুঁকে বাচ্চাটার মাথায় হাত ছোঁয়ায় । কেউ না জানলেও সে বড্ড বাচ্চা প্রিয় । মৃদু ওষ্ঠ প্রসারিত করে কিছু বলার জন্য উদ্যত হয়….
” আপু….
কথা শেষ করার আগেই সেই একই বাংলা গানের রিংটোনে বেজে ওঠে বিছানার উপরে থাকা মুঠো ফোনটা ।যা সেদিনও ড্রইং রুমের সবার সামনে বেজে উঠেছিলো । হঠাৎ সেই গানের টোন শোনা মাত্রই সেদিনের ন্যায় ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে একবিংশীর নমনীয় ললিতাঙ্গ । মস্তিষ্ক কেমন শিরশির করে উঠে বাহুল্য অর্থে । মেঘা বিছানাতেই বসে । চাদর খামচে ধরে চকিতে তাকালো ফোনটার দিকে । ফোনের স্ক্রিনে আবছা আবছা কিছু একটা দেখা মাত্রই শিরশিরে অনুভূতি চাপা পড়লো নিমিষেই । চোখ তীক্ষ্ণাকারে কুঁচকে আসলো সহসা । স্ক্রিনে নাম্বারের সাথে সাথে একটা ছবি ভেসে উঠেছে । একটা ছোট বাচ্চার ছবি বোধহয় । ঠিকঠাক ভাবে দেখার আগেই রৌদ্র চোখে বালি ছিটিয়ে ফোন হাতে তুললো । বাকিটা দেখা হলো না আর । মেঘা ধক্ করে রৌদ্রের দিকে তাকায় । রৌদ্র ফোন সাইলেন্ট করেছে হাতে তুলেই । কপাল কিছুটা কুঁচকানো । চেয়ে আছে ফোনের দিকে । মেঘা ঢোক গেলে । আর কিছু না বলেই দ্রুত বেগে বড় বড় ধাপে ঘর ছাড়ে রৌদ্র । ও বেরোতেই শাফাহ্ পিটপিট করে কিছু একটা ভাবে । ভাবুক ভঙ্গিতেই মুখ ফসকে বলে বসে সংশয়ী হয়ে….
” আসবো ফিরে আবারো , তোমারি টানে…..
আচ্ছা আপু , ভাইয়ার ফোনে এই রিংটোন টা সেট করা কেনো ? শুনতে কিন্তু বেশ ভালোই লাগে । বুক কাঁপে আচমকা শুনলে । ভাইয়া কি কারোর টানে ফিরে এসেছে দেশে ? মেঘা….
ভাইয়া কি মেঘার টানে দেশে ফিরে এসেছে আপু ? মেঘা তো ভাইয়ার বউ ! জোর করে হলেও বউই তো । তাই এই রিংটোন দেওয়া ফোনে ? এতো বছর পর মেঘার জন্য বাড়িতে ফিরেছে ভাইয়া ?
মেঘা ভড়কায় । আঁতকে চোখ নামায় । কন্ঠ ভিজিয়ে শাফাহ্’র কথা গুলো উপেক্ষা করে বিছানা থেকে নামে ঝটপট । এলোমেলো পায়ে ছুটে বেরোয় ঘর থেকে ।
সিরাত মুচকি হাসলো কেবলই । নিঃশব্দে মাথা নাড়ালো দুদিকে । শাফাহ্ মেঘার এমন আচরণ দেখে ঠোঁট উল্টিয়ে আবার বলে….
” মেঘার আবার কি হলো ? চলে গেলো কেনো ? আমার কথায় রাগ করলো আবার ?
” তুই বুঝবি না । হুটহাট না বুঝে এভাবে বেফাস করে হলেও মাঝে মাঝে মেঘার সামনে এ ধরনের কথা বলতেই পারিস । ও রাগ করলেও ফল বিফল হবে না ।
” বাই দ্যা ওয়ে ..
রিংটোন টা পছন্দ হয়েছে আমার । কেমন অদ্ভুত লাগে শুনলে । ইশশ্ , কেউ যদি আমার টানে আমার কাছে চলে আসতো , তাহলে কতই না ভালো হতো ।
ছাদের সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ধীর কন্ঠে ফোনে কথা বলছে রৌদ্র । যেন খুব মনযোগী আর কোমল এ বেলায় । ওপাশ থেকে কিছু বলতেই কথার পৃষ্ঠে ধীরুজ স্বরে কিছু একটা বললো সে । মুখেই মিলিয়ে গেলো কথাটুকু ।
কান থেকে ফোন নামিয়ে বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে মুচকি হাসলো । পিছু ফেরা মাত্রই কিছুটা দূরে দৃশ্যমান হলো একবিংশীর অবয়ব । রৌদ্র ফেরা মাত্রই এক ছুটে চলে গেলো রমনী ।
ফিটফাট হয়ে সেজেগুজে পুরোপুরি তৈরি আদ্র আর শুভ্র । দুভাই বেশ পরিপাটি । দুজনাই ড্রইং রুমে বসে ফোন স্ক্রল করছে আপন মনে । অপেক্ষা করছে বাকি তিন রমনীর । ওরা তৈরি হয়ে নিচে নামলেই গ্রামের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে সবাই । কোথা থেকে ধড়ফড়িয়ে টুকটুকি ছুটে আসলো । এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমেছে । তৈরি সে । গোলাপি রংয়ের সুন্দর একটা থ্রি পিস পড়েছে । সেজেছে টুকটাক । বাইরে বেরোবে , আর একটু আধটু না সাজলে চলে নাকি ? ওকে ওভাবে চঞ্চলা হয়ে নামতে দেখে দুভাই ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায় । এক পলকেই দুজনায় চোখ ফিরিয়ে নেয় । শাফাহ্ নিজের প্রতি কারোর এটেনশন না দেখে হাসি প্রগাঢ় করে গদগদ হয়ে বললো শুভ্রর উদ্দেশ্যে….
” ভাইয়া , আমি পুরো রেডি । দেখো তো , কেমন লাগছে আমায় ?
শুভ্র দায় সারা তাকালো । বোনকে ঠেস দিয়ে বললো চাপা স্বরে….
” তেঁতুল গাছের পেতনি দের মতো লাগছে !
তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে শাফাহ্ ।
” ভাইয়া ! ভালো হচ্ছে না কিন্তু ।
থেমে আদ্রের দিকে ফিরলো , একই প্রশ্ন করলো….
” ভাইয়া , তুমি বলো । কেমন লাগছে আমায় ?
আদ্র তাকালো । ঠোঁট কামড়ে বললো চোখ নামিয়ে….
” উমমম , সুন্দর !
” শুধু সুন্দর ? আর কোনো কমপ্লিমেন্ট দেবে না ? আমি জানি আমাকে সুন্দর লাগছে । নতুন কিছু বলো ।
” কি বলবো ?
” আরে নতুন কিছু বলো । বোঝো না, সুন্দর কে সুন্দর তো সবাই বলে ।
” হুঁ , পুরো পেঁচি মুখীর মতো সুন্দর লাগছে তোকে । এতো সুন্দর পেঁচি মুখী জীবনে প্রথম বার দেখলাম ।
শুভ্র শব্দ করে হেসে উঠলো । সাথে আদ্র ও । এই মেয়েকে জ্বালাতে পারলে দুভাইয়ের আর কিছু লাগে না । শাফাহ্ পথ পাল্টে কিড়মিড়িয়ে উচ্চারণ করে…..
” আদ্র ভাইয়ার বাচ্চাাাাা….
” টুকটুকির বাচ্চাাাাা , এই শোন…
” শুনবো না । কথাই বলবো না তোমার সাথে ।
” এইইই শোন , খুব সুন্দর লাগছে তোকে । অনেক অনেক বেশি সুন্দর । পুরো বিউটিফুল….
শাফাহ্ থামলো । খুশি হলো বোধহয় । ক্ষণিকের রাগ ঝেড়ে লাজুক হেসে বললো….
” থ্যাংক ইউ ভাইয়া….
” এতো গুলো মিথ্যে কথা বললাম , তার জন্য শুধু থ্যাঙ্ক ইউ ? তোর থ্যাঙ্ক ইউ দিয়ে আমার মিথ্যে বলার পাপ ধুয়ে যাবে নাকি ?
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ২১
হাসির শব্দ বাড়ে শুভ্রের । ফোন রেখে হো হো করে হেসে ওঠে আদ্র সহ । শাফাহ্ চিবিয়ে ওঠে , সিঙ্গেল সোফা থেকে একটা কুশন তুলে নিয়ে সজোরে ছুড়ে মারে আদ্রের দিকে । ঝাই ঝাই করে ওঠে…..
” তোমরা খুব বাজে । আমি তোমাদের কারোর সাথেই কথা বলবো না ।
