Home আসবো ফিরে আবারো আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৫
সুরভী আক্তার

সেমিস্টার ফাইনাল আজ থেকে সমাপ্ত ।
ভার্সিটি চত্বরে সমাগম খুব ‌। পরীক্ষা শেষে হল ছেড়েছে সবাই । এলোমেলো চারদিক । মাঝে দিন বিশেকের ছুটি আছে ‌। এর মধ্যে শিশিরের সাথে আর দেখা হবে না হয়তো , আজ শেষ দেখা ।
ব্রেক শেষ না হওয়া অবধি ওরা একজোট হবে না আর । পরীক্ষা শেষে তিন বান্ধবী বাইরে বেরিয়েছে । আদ্র আজ ভার্সিটিতে আসে নি । অফিসে বেরিয়েছিল সে । বলেছিলো ছুটির সময় মেঘা আর শাফাহ্ কে নিতে গাড়ি পাঠাবে । কিন্তু এখনো গাড়ি আসে নি ।

ভার্সিটির গেইট পেরিয়ে সেই ক্যাফেটেরিয়া টাতে আজ দ্বিতীয় বার ঢুকেছিল ওরা তিনটে । টুকটাক খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি গল্প গুজবের মাঝে আদ্রের নাম্বার থেকে কল আসলো । দুপুর হওয়ায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলো লাঞ্চ ব্রেকে । ভাবলো ওদের দুটোকে একেবারে নিয়ে যাওয়া যাক ।
সব ছেড়ে ছুড়ে ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসলো ওরা । রাস্তার পাশে আদ্রের গাড়ি দাঁড়িয়ে । ড্রাইভিং সিটে বসে আছে দাম্ভিক ভঙ্গিতে । শক্ত চোয়াল, চোখ রক্তিম । ডিস্টার্ব সে ।
মেঘা,শাফাহ্ আর শিশির বাইরে বেরিয়ে গাড়ির দিকে এগোয় । শিশির থামে রাস্তার মোড়ে ।
” মেঘা , তাহলে আজকের মতো বিদায় । এখন তো আর দেখা হবে না আমাদের । সেমিস্টার ব্রেকের পর আবার দেখা হবে । যা তোরা…
শাফাহ্ ওকে চট করে জড়িয়ে ধরলো । ছেড়ে বললো…
” তোকে খুব মিস করবো বেইবি ।
কিন্তু এখন বাড়ি যাবি কি করে ? এদিকে তো রিকশা দেখছি না আজ ।
” ভরা দুপুর , চড়া রোদে রিকশা কম বেরিয়েছে বোধহয় । একটু অপেক্ষা করলেই পেয়ে যাবো । তোরা যা , স্যার অপেক্ষা করছে । রোদ এখানে….
ওদের দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখে আদ্র গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে এসেছে । ব্রেক কষে না তাকিয়ে চড়া গলায় বললো স্টিয়ারিং চেপে ধরে….

” দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? উঠবি তোরা , নাকি রেখে চলে যাবো ?
কন্ঠে রাগ প্রকাশ পেলো ।
মেঘা রাস্তার এদিক ওদিক তাকায় ‌। নাহ , আশেপাশে ফাঁকা রিকশা চোখে পড়ছে না । এখানে প্রচন্ড রোদ । এই রোদে শিশির একা দাঁড়িয়ে থাকবে ?
পথ ভিন্ন হলেও মেয়েটার পথে একদিন ঘুরে আসলে মন্দ হয় না । মেঘা গাড়ির জানালার কাছে এসে ঝুঁকে বললো অনুনয় স্বরে….
” ভাইয়া , এদিকে রিকশা নেই আজ । একটু ঘুরে গিয়ে শিশির কে ওর বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেবে প্লিজ ?
” সময় নেই আমার হাতে ।
তাৎক্ষণিক আদ্রর উত্তর । শিশির বাঁধা দিতেই যাচ্ছিলো , তার আগে আদ্রের এমন উপেক্ষিত চড়া গলায় কিছুটা বিব্রত হলো । বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ ফেলে বললো….
” আমাকে পৌঁছে দিতে হবে না । আমি যেতে পারবো মেঘা । তোরা যা…
” তুই চুপ কর তো ।

আর ভাইয়া , সময় নেই কেনো ? কি রাজ কার্য আছে তোমার ? একটুই তো পথ । ঘুরে গিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবো । মেয়েটা একা একা এখানে কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবে ?
আদ্র এবার তাকালো । রেগে আছে সে । মাত্রা বেড়ে কন্ঠ শৃঙ্গে উঠলো..
” মেঘ , বললাম তো আমার সময় নেই । কথা বুঝিস না ? উঠতে বলেছি ওঠ । ও যখন বলছে একলা যেতে পারবে , তখন জোর করছিস কেনো ?
আদ্র এভাবে কথা বলে না কখনো । আজ ভিন্ন স্বর তার । প্রকাশিত রাগ স্পষ্ট দেখতে পেলো মেঘা । চোখ মুখ ঝুলে এসেছে । রাগের সাথে সাথে অবসাদ স্পষ্ট । মেঘা কিছুটা অবাক হয়ে গলা নামালো , ধীরে বললো….
” ভাইয়া , কিছু হয়েছে ?
” আমি ডিস্টার্ব মেঘ । কথা বলতে ভালো লাগছে না । প্লিজ কথা বাড়াস না । উঠে আয়….
আদ্র সামনে তাকায় । শিশির তপ্ত মেজাজি লোকটার অহংকার দেখে মুখ সিঁটকে পাশ ফিরিয়ে নেয় । ও কি লিফট চেয়েছে নাকি ? মেঘা বললেও এভাবে ওর সামনে , মুখের উপর প্রত্যাখ্যান করতে পারলো এই লোক ? এই লোককে নিয়ে শিশিরের ধারনায় পরিবর্তন কখনোই আসবে না । বরং খারাপ ধারণা বেড়েই চলেছে একে একে ‌ । অহ‌ংকার কম নেই তার মাঝে !
মেঘা দ্বিরুক্তি করলো না আর ।

শিশিরের থেকে মাথা নামিয়ে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো শাফাহ্ সহ । কতটা বড় মুখ করে মেয়েটার সামনে কথা তুললো সে । অথচ আদ্র সোজাসুজি প্রত্যাখ্যান করলো । কিছু তো একটা হয়েছে ।
শিশির রাস্তায় নেমে গলা বাড়িয়ে এপাশ ওপাশ দেখছে । আদ্র এতক্ষণে তাকালো সামনের গ্লাস ছাপিয়ে । মেয়েটা কে দেখে এক পলকে দীর্ঘক্ষণ পার করলো । গাড়ি স্টার্ট করে কিছুদূর এগোলো শিশির কে পাশ কাটিয়ে । কি একটা ভেবে থামলো । আসলেই রিকশা নেই আজ । পাওয়াও যাবে না । মেইন রোড অবধি হেঁটে গেলে তবেই দেখা মিলবে । কিন্তু সেই অবধি পথ অনেকটা । রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসছে । তপ্ত দুপুর । রোদের নিচে একলা দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা । শ্যামলা বর্ণের চেহারা খানা চিকচিক করে জ্বলছে যেনো ।
আদ্র ব্যাক গিয়ারে পিছিয়ে আসলো আবার । মেয়েটার পাশাপাশি থামালো গাড়ি । ফ্রন্ট সিটের অন্যপাশের জানালা গলিয়ে সোজাসুজি শিশিরের দিকে দৃষ্টি তাক করলো । কাঁধের ব্যাগ চেপে ধরে সরে দাঁড়িয়েছে রমনী । আদ্র ভনীতা হীন ভার গলায় আদেশ ছুড়লো এক প্রকার…..

” এই মেয়ে , উঠে এসো । পৌঁছে দিচ্ছি ।
শিশির তাকায় । অভিব্যক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যুত্তর করে আত্মগরীমা বজায় রেখে…
” নো থ্যাংকস, স্যার । আমি যেতে পারবো ।
” বলেছি না উঠতে ? রিকশা পাবে না এতো সহজে । মেইন রোডে হরতাল চলছে । গাড়ি অবরোধ হচ্ছে যেখানে সেখানে । উঠে এসো ফাস্ট…
” প্রয়োজন নেই । আপনার তো দেরি হয়ে যাচ্ছে । সময় নেই , চলে যেতে পারেন আপনি ।
আদ্র বিব্রত হলো । ধমকে বললো….
” বেয়াদব , মুখে মুখে তর্ক করো ? উঠতে বলেছি না , ওঠো।

” আপনি আমাকে ধমকাচ্ছেন কেনো ? বললাম তো আপনি চলে যান ।
চোয়াল খিচলো আদ্র ।
মেঘা আদ্রের দিকটা লক্ষ্য করে বলে…
” শিশির , উঠে আয় না । ভাইয়া পৌঁছে দেবে । বাড়তি গাড়ি পাবি না এখানে ।
” তোর ভাইয়ার একটু আগে সময় ছিলো না । এখন ও নিশ্চয়ই নেই ? আমাকে আলাদা করে পথ ঘুরে পৌঁছে দিতে গেলে সময় কুলোবে না তার । আমি আমার পথ চিনি । কারোর সাহায্যের প্রয়োজন নেই ।
সেই জেদি আচরণে আদ্রের বিরক্তি বাড়ে । চরম ক্ষুব্ধতায় মাড়ি খিচে নেয় । স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে কন্ঠ পিষে বলে হিসহিসিয়ে….

” বেয়াদব গার্ল…
থাকো তুমি এখানে ।
এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । সটান গাড়ি স্টার্ট করে স্থান ত্যাগ করলো । শিশির মাথা নাড়ায় দুদিকে ।
সে দ্বিতীয় বার কেনো যেতো ? প্রথম বারেই উঠতো না গাড়িতে । তার উপর রাশভারী লোকটার থেকে উপেক্ষিত হয়েছে প্রথম বার , ওর কি আত্মসম্মান নেই নাকি ? নিজেকে ছোট প্রমাণ করে সেই গাড়িতেই,সেই লোকটার কাছে সাহায্য নেবে ও ? কিছুতেই না । বিড়বিড় করে গাড়ি চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে…
” হাউটি পার্সোন….
বাড়িতে এসে ধুপধাপ পা ফেলে সোজা উপরে উঠে গেছে আদ্র । হিসহিস করে গর্জাচ্ছে রাগে । মেজাজ বিগড়ে ছিলো একেই । তার উপর ঐ মেয়েটার অবাধ্যতায় ক্ষুব্ধ মেজাজ তুঙ্গে উঠেছে আরো ।
মেঘা আর শাফাহ্ ওর পিছু পিছু পা টিপে টিপে নিজেরাও উপরে উঠে গেলো । আদ্র রাগে না সহজে । রেগে গেলে তোয়াক্কা করে না কোনো কিছুর । আজ রেগে আছে । বুঝতে বাকি নেই । পথিমধ্যে মেঘা,শাফাহ্ মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলো ।

লাঞ্চের আগে ড্রইং রুমে তোফায়েল কাবির বসে ছিলেন । আদ্র কে দেখলেন তিনি । বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছেন । ছেলেটা ব্যস্ত সময় পার করছে । কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে । ভার্সিটি, অফিস দুটোই এটেন্ড করছে । সামলাচ্ছে নিজ দায়িত্ব । দুটোর সমান চাপে চেহারায় বিষন্নতা ভর করে ছেলের ।
আজ অফিসে গন্ডগোল পাকিয়েছে । যদিও ছোট একটা ত্রুটি হয়েছে তার দ্বারা । তবুও সেটাকেই নিজের সীমাবদ্ধতা ধরে বড় বানিয়ে ফেলেছে ।
নিজের উপর রাগ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে অফিস থেকে । তার দ্বারা হবে না এসব ।
তোফায়েল কাবির বসে বসে কিছু ভাবলেন ।
কিছু সময় পর উঠলেন ছেলের ঘরে । শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে আদ্র । ভেজা শরীরে সোফায় বসে মাথা এলিয়ে রেখেছে । টগবগ করছে মস্তিষ্ক ।

তোফায়েল কাবির দরজায় নক করে উপস্থিতি জানান দিলেন । তাকে দেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে উঠে দাঁড়ায় আদ্র । চোখ নামিয়ে নেয় । অফিসে ওর জন্য প্রজেক্ট পেপার সাবমিট হয় নি । তোফায়েল কাবিরের কানেও নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে এতক্ষণে । হয়তো সেজন্যই ঘরে হানা দিয়েছেন ।
ওকে ভুল প্রমাণ করে হঠাৎ ভদ্রলোক মুখ খুললেন….
” নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করো, আদ্র । অফিসে যেতে হবে না তোমায় ।
আদ্র চট করে তাকায় ।
” ঠিক শুনেছো , নিজের ক্যারিয়ারে ফোকাস করো । অফিস শুভ্র সামলে নেবে । নিজের দিকে খেয়াল দাও ।দুদিক সামলাতে গিয়ে শরীরের অবস্থা বেহাল করছো দিনকে দিন । আমি চাই নি এটা । নিজের মনের বিপরীতে গিয়ে কিছুই করতে হবে না তোমায় । যেটা নিয়ে ফিউচার গড়তে চাও , সেটাতেই এ্যাফোর্ট দাও ।
” অফিসে আমার জন্য ডিল হাতছাড়া হয়েছে , তাই বাদ দিচ্ছেন আমায় ? এতো দিন অফিসে জয়েন করার জন্য এতো এতো ইনসিস্ট করলেন । এখন যেই একটা ভুল হলো আমার দ্বারা , সেই মত পাল্টালেন ।
তোফায়েল কাবির পুরু দৃষ্টিতে তাকান । হাসেন ভঙ্গুর ভাবে । কেমন নেতিয়ে পড়া চোখ তাক করে বলেন….
” তোমার আর তোমার ভাইয়ের ভাবনার ভুল সংশোধন করাতে পারলে সেটাই করাতাম আগে । মানুষ সব দিক দিয়ে পারফেক্ট হয় না । ইনসিস্ট করে যদি ভুল করে থাকি , তাহলে ভেবে নাও সেই ভুল সংশোধন করছি এখন । অফিসের প্রেশার নিতে হবে না তোমায় । যা করছিলে তাই করো । সেভাবে চলছিলে বেশ । সেভাবেই চলো । বাবা হিসেবে তোমার ভালো চাওয়া ব্যাতীত আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই । ভাইয়ের মতো যদি আমাকে ভুল বুঝো , তাহলেও কিছু করার নেই ।
বেরিয়ে আসলেন তিনি ‌। আদ্র নিস্প্রভ চোখে তাকিয়ে দেখলো বাবাকে ।
হঠাতই মনে হলো , শুভ্র সেদিন ভুল বলে নি ।

পরদিন শুক্রবার । বিকেলের লগন । সূর্যি হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে । পশ্চিমাকাশ লালচে কমলা রং ধারণ করেছে । ক্ষয়ে ক্ষয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে দিনের উজ্জ্বল আভা । পাখিদের নীড়ে ফেরার ফুরসৎ জুগেছে । গলা চিরে ডেকে ডেকে গগন কাঁপিয়ে তুলছে ডানা ঝাপটে ।
সদরের দিকে কড়া পড়তেই নিজের এলোমেলো অবস্থা ঠিক করলো শিশির । কোমরে পেঁচানো ওরনাটা খুলে ভালোমতো গায়ে জড়িয়ে নিলো ।
বসার ঘরে কেউ নেই । নিজে গিয়ে দরজা খুলে দিলো সে । চৌকাঠের বাইরে অপরিচিত বেশ কিছু মুখ । জন চারেক সভ্য পোশাকধারী । একটা মেয়ে আর একজন মহিলাও আছেন চারজনের মাঝে । বাকি দুজন পুরুষ ।
শিশির ভরা চোখে একে একে সবাইকে পরখ করলো । অচেনা সকলে । না চিনে নরম কন্ঠে বললো…
” কাকে চাই ? আপনাদের তো চিনলাম না !
” তুমি ইকরা ?
ভদ্রমহিলার আকস্মিক প্রশ্ন । শিশির চোখ সরু করে । উত্তর করার আগেই পাশের ছেলেটা মুখ খোলে….
” না মা , ও ইকরা নয় । ইকরার ছোট বোন !
শিশির হতবাক হয়ে বলে ….

” আপনারা আপুকে চেনেন ?
” হুম । তুমি তো শিশির , এম আই রাইট ? একচুয়েলি, আমি ইকরার কলিগ – আবিদ । হয়তো চিনবে না আমায় ! এনারা আমার বাবা মা আর বোন ।
” ওও । কিন্তু আমাদের বাসায়,, আই মিন .. কিছু প্রয়োজন ছিলো ?
ভদ্রমহিলা হেসে উঠলেন । খানিক কৃত্রিম হাসি মনে হলো । শিশির কে পাশ কাটিয়ে ভেতরে পা বাড়ালেন তিনি । ভীত হলো নমনীয় মেয়েটা । এভাবে হুটহাট অপরিচিত কেউ এভাবে বাড়িতে ঢুকে পড়লে ভয় পাওয়ারই কথা । এমনিতেও ওদের এই ছোট্ট বাড়িতে কেউ আসে না । আবিদ , পরিচয় অনুযায়ী আপুর কলিগ । কিন্তু শিশির তো চেনে না কাউকেই । মেয়েটা ভয় ঠেলে মুখ খুলতে উদ্যত হলো….
তার আগেই ভদ্রমহিলা মুখ কুঁচকে এদিক ওদিক তাকিয়ে কন্ঠ চিপে বললেন….
” প্রয়োজন তো আছেই । প্রয়োজন না হলে এই অলি গলিতে আসতাম নাকি । যাই হোক , প্রয়োজন টা তোমার বোনের সাথে । কোথায় সে ? ডাকো দেখি , কত সুন্দরী ? যে সৌন্দর্যে আমার ছেলেকে নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে সে !

” মানে ?
ভদ্রমহিলা এদিক ওদিক দেখার মাঝেই বসার ঘরের মাঝ বরাবর দাঁড়ালেন । পুরনো সোফা একপাশে । মুখ বিকৃত করে নাক সিটকালেন তিনি । মাথা ঝাঁকালেন , গা গুলিয়ে আসছে ভাব ধরলেন এমনটা । চিপা চাপা ছোট খাটো একটা বাড়ি । একতলা ছাদ বিশিষ্ট ।
শহরের একপাশে ‌। সরু অলিগলি পেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে আসতে হয় । গাড়ি ঢোকে না এদিকে । সেই রাস্তার মোড়ে গাড়ি থামিয়ে এই বাড়ি অবধি হেঁটে এসেছেন তারা । কেবলমাত্র তার বড় ছেলে আবিদের তাগিদে ।
আবিদ ইকরা কে পছন্দ করে । পছন্দের সময়সীমা অনেক পূর্ব হতে চলে আসছে এ অবধি ।
কিন্তু ইকরা নারাজ । লোকটার পছন্দ জেনেও সব এড়িয়ে চলে সে । আগে দুজনার মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক ছিলো । আবিদ ওকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর গুঁড়িয়ে গেছে সেই সম্পর্ক ।
মেয়েটা এখন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে চায় ওকে ।
বাপ নেই । বোন, ভাই আর মাকে নিয়ে তার সংসার । বর্তমান পরিবারের একমাত্র ভরসা সে । উপার্জনক্ষম একমাত্র কেউ ।
ও চলে গেলে বাড়ি দেখবে কে ? কিভাবে চলবে ওর পরিবার ? এসব বাহানায় আবিদ কে উপেক্ষা করেছে সে । লোকটার সব জানা । তবুও হাল ছাড়ে নি ।
অনেক সাধনার পর বাড়িতে রাজি করাতে পেরেছে । আজ এসেছে ইকরা কে দেখতে ।
ইকরা বাড়িতে নেই । শিশির তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে আছে । ওর মা কথা শুনে ঘর থেকে বেরোলেন । উঠোনে এতো সব অপরিচিত মুখাবয়ব দেখে দৃষ্টি সরু করলেন তিনি । শিশির ছটফট করে মায়ের কাছে যায় । #আজমিরা_বেগম মেয়েকে দেখে প্রশ্ন সূচকে বলেন…..

” এনারা কারা ?
” আপুর অফিসের কলিগ উনি ।
” আমাদের এখানে কি চাই ?
” আপুকে খুঁজছে !
আবিদ এগিয়ে সালাম দেয় । উত্তর করেন আজমিরা বেগম ।
” আপনারা আমাদের বাড়িতে এভাবে ? ইকরা তো বেরিয়েছে একটু ‌। সন্ধ্যা নামতে চললো । ফেরার সময় হয়েছে ওর ।
আবিদের মা বাবা বসেছেন ।
ক্ষুণ্ন চোখে এপাশ ওপাশ দেখছেন বারবার ।
আবিদ দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই ইকরা আসলো । সদর খোলা দেখে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে গলা উঁচিয়ে বললো….
” শিশির ,, দরজা খুলে রেখেছিস কেনো ?
দরজা লাগিয়ে পিছু ফিরতেই থমকায় মেয়েটা । একখানা সুপরিচিত চেহারা । আকুল দৃষ্টিতে চেয়ে আছে । প্রথমেই চোখাচোখি হলো তার সাথেই । পরক্ষনে চোখ সরু করলো ইকরা । এগিয়ে বাদবাকি সবাইকে নজরে নিলো । হাতে বাজারের ব্যাগ । পিটপিট করে এগিয়ে ধীরে উচ্চারণ করে মেয়েটা….

” আবিদ , আপনি এখানে ?
” ও , তুমিই তাহলে ইকরা ?
আবিদের মা উঠে দাঁড়ালেন । ইকরার দিকে ঘুরে আগাগোড়া পরখ করলেন ওকে । তার দৃষ্টি দেখে থতমত খায় মেয়েটা । কিছু একটা আন্দাজ হতেই ছ্যাত করে ওঠে । ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে বলে….
” আপনারা এখানে ?
” আই থিংক তোমার জানা আছে , আমরা এখানে কেনো এসেছি ।
আজমিরা বেগম মেয়েকে দেখে প্রশ্ন করেন….
” ইকরা , কি হয়েছ ? ওনারা আসবেন এটা জানতিস তুই ? আগে বলিস নি কেনো ? শিশির , যা … গিয়ে ওনাদের জন্য কিছু একটা ব্যাবস্থা কর ।
” প্রয়োজন নেই । আমরা এখানে খেতে আসিনি । আপনাদের বড় মেয়ের জন্য সম্বন্ধ নিয়ে এসেছি । আমার ছেলের মাথাটা ভালোই খেয়েছে আপনাদের মেয়ে । ফ্যামিলি বিজনেস ছেড়ে আপনাদের মেয়ের পিছু পিছু ছোট খাটো একটা জব করছে আমার ছেলে ।
এখন আবার বাড়িও ছাড়তে চাইছে শুধু আপনার মেয়ের জন্যই ।
” মানে ?
আবিদের মা হাসলেন । বাবা বললেন ঠান্ডা স্বরে….

” সোজাসুজি বলতে গেলে , আমরা আপনার বড় মেয়েকে আমাদের বাড়ির পূত্র বধূ করতে চাই । আমার ছেলে ইকরা কে পছন্দ করে । পছন্দের মাত্রা ছাড়িয়ে ভালোবাসার পর্যায়ে গিয়েছে । আপনার মেয়ে সবটা জানে । তার থেকে বুঝে নেবেন । এবং তাকে একটু বোঝাবেন ।
আবিদ ওকে ভালোবাসে । আমরা কেবলই আমাদের ছেলের চাওয়া টাকে প্রাধান্য দিতে এসেছি আজ । আপনার মেয়ে কে আমাদের ছেলের জন্য চাই আমরা…
ইকরা চোখ বড় বড় করে তাকায় আবিদের দিকে ।
” আবিদ , এসব কি হচ্ছে ? আপনি হঠাৎ করে….
তাকে কথা শেষ করতে দেওয়া হলো না ।
” আন্টি , আমি আপনার মেয়েকে চাই । কিন্তু আপনার মেয়ে আপনাদের ছাড়তে চায় না । ছাড়তে হবে না । বিয়ের পর ইকরা এ বাড়িতেই থাকবে । ফ্যামিলি ছাড়তে হবে না ওকে । ও যেভাবেই চলছিলো , সেভাবেই চলবে । শুধু যোগ হবো আমি । তবুও বিয়োগ হবো না । আমার ইকরা কে চাই । ও আপনাদের ফ্যামিলির নির্ভরতা , সেভাবেই থাকবে । শশুর বাড়িতে যেতে হবে না ওকে ।
আমার ফ্যামিলি রাজি এতে । আপনি যদি রাজি থাকেন , তাহলে ইকরা কে বিয়ে করতে চাই আমি ।

” আবিদ , পাগল হয়ে গেছেন আপনি ?
” হয়েছি । আপনি কথা বলবেন না মাঝে ।
” আমার জীবন , আর আমি কথা বলবো না ? দেখুন , আমি বুঝিয়ে ছিলাম আপনাকে । আমার জীবন আলাদা । আমার পরিবারের গন্ডীর বাইরে আমার আর কিচ্ছু নেই….
” এই গন্ডি ছাড়াতে চাইছি না আমি ।
আপনি বলেছিলেন আমার ফ্যামিলি মানবে না । শুনুন তবে , মেনে নিয়েছে আমার ফ্যামিলি । আমি আপনাকে বিয়ে করে এ বাড়িতেই থাকবো । তবু আপনাকে ছাড়বো না ।
হাতের বাজারের ব্যাগ টা আপনা আপনি ফসকে যায় ইকরার হাত হতে । ঘন পলক ফেলে সে ।
” আবিদ…..
” হ্যাঁ ইকরা , আমার বলতে দ্বিধা নেই । আমি আপনাকে চাই শুধু । এরজন্য সবকিছু ছাড়তে পারবো ।
বাকিরা নিস্তব্ধ । শিশির আর আজমিরা বেগম কেবল মূর্ত বনে দাঁড়িয়ে রইলেন । বেশি কিছু মাথায় ঢুকলো না তাদের । আবিদের মা ছেলের আচরনে দাঁত চেপে ধরেন । হাত মুঠো করে সামলান নিজেকে । অনেক সহ্য করেছেন তিনি । এই একটা সাধারণ মেয়ের জন্য পাগল তার ছেলে । পরিবার ছাড়তেও দুবার ভাবে না । ইকরা নিজের পরিবার ছাড়বে না , এটা জানার পর থেকে আবিদ নিজের পরিবার ছাড়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে । তবুও এই মেয়েকেই তার লাগবে । সেটা যে করেই হোক ।
সহ্য ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ছেলের পাগলামো তে সায় দিয়ে এখানে এসেছেন আজ সবাই ।
রাগ চেপে মুখ খুললেন তিনি….

” শোনো মেয়ে , আমার ছেলে তোমার জন্য আমাদের ছাড়তে চায় , এতেও দ্বিমত আছে তোমার ? আমাদের পরিবারের বড় বউ হবে তুমি । আর বড় বউ কিনা তার স্বামী কে হাতিয়ে ঘর জামাই রাখবে । রাখো , আপত্তি নেই আমাদের । তবে হ্যাঁ , আরেকটা সুযোগ দেই…..
পিছু ফিরলেন তিনি । শিশিরের দিকে তাকালেন । মেয়েটাকে আগাগোড়া পরখ করে বললেন আবার….

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৪ (২)

” আমার ছোট ছেলের বউ হিসেবে তোমার বোনকে চাই আমরা । তুমি আমার বড় ছেলেকে রাখবে , আর আমরা তোমার ছোট বোনকে । এক ছেলের বউকে বাড়িতে রাখতে চাই আমি । যদি সম্পর্ক হয় , তাহলে দুটো হবে । আমার এক ছেলে তোমাদের বাড়িতে আসবে , আর তোমার বোন আমার বাড়িতে যাবে আমার বাড়ির বউ হিসেবে । তুমি যদি তোমার পরিবার ছাড়তে না চাও , তাহলে আমি কিভাবে চাইবো আমার ছেলেকে ছাড়তে ? আমার ছেলে আবার তোমাকে ছাড়বে না ।
ছাড়াছাড়ির হিসেব সমান সমান হোক তাহলে । আমার বাড়িও পূর্ণ হোক , আর তোমার বাড়িও । তোমার সাথে সাথে তোমার ছোট বোনকেও পছন্দ হয়েছে আমার ।

আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here