আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৫
সুরভী আক্তার
মেঘা অস্ফুটে ডাকে……
” রৌদ্র !
একবিংশীর মুখে নিজের নাম শুনে এলোমেলো হয়ে যায় রৌদ্রের অন্তঃস্থল । ধক্ করে চোখ মেলে ।
” ইয়েস সানি !
” এদিকে আসুন !
উঠে দাঁড়িয়ে এগোলো রৌদ্র ।
” হোয়াট ?
মেঘা পিছু ফিরে ওষ্ঠ উল্টে চায় । ইশারা করে ড্রায়ারের ভেতরটা দেখায় । ওকে অনুসরণ করে নিজেও তাকায় রৌদ্র । ওর চোখ জোড়াও আঁতকায় ।
” এসব কি ?
রৌদ্র ভ্রু জড়ো করে মৃদু হাসলো । আতঙ্কিত ভঙ্গিমা পাল্টালো । রমনীকে পিছু ফিরিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে নিলো আলগোছে । তার আকস্মিক আলিঙ্গনে কেঁপে ওঠে মেঘা । খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ওঠা থুতনি একবিংশীর মসৃণ কাঁধে রাখতেই কুঁকড়ে যায় রমনী । শিউরে ওঠে লোমকূপ । রৌদ্র ললিতার মৃদু কম্পন অনুভব করলো । বললো আলতো করে…..
” কিছু মিছু । বাট , এতো গুলো জমা হলো কবে ? একটা দোকান খোলা যেতে পারে এগুলো দিয়ে । তাই না ?
মেঘা শিহরণ সামলে উত্তল কপালে ভাঁজ ফেলে আধো আধো ঘাড় ঘোরায় । লোকটা খুব কাছে ।
রমনী আবার তাকায় ড্রায়ারের দিকে । ড্রয়ার টা বেশ বড় । বেশি অর্ধাংশ জুড়ে একটা সাদা টাওয়েল ভাঁজ করে রাখা । কোণে রংচঙে আরো কিছু একটা । বাকি অর্ধাংশে অগণীত খোঁপার কাঁটা । একেকটা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে । খুচরো খুচরো আরো কিছু একপাশে । মেঘা বেশি লক্ষ্য করলো না । কাঁটা গুলো রেখে সাদা টাওয়েল টার দিকে দৃষ্টি তাক করলো । কিছু একটা আন্দাজ করে দম ফেলে আগ বাড়িয়ে বললো…
” এটা তো আমার সেই টাওয়েল টা , যেটা আপনার মুখে ছুড়ে মেরেছিলাম । তাই না ?
রৌদ্র ঘাড় ঝাঁকায় ।
” একদম ! মনে আছে তোমার ?
মেঘা ওটাকে বের করতে করতে বললো….
” এটা এভাবে গুছিয়ে রেখেছেন কেনো ?
” স্মেল পাই এটা থেকে ! ডেঞ্জারাস স্মেল । যখন তোমাকে পাই না , তখন এটাকে ঠেসে রাখি নিজের কাছে । শুকে দেখো….
মেঘা কপাল কুঁচকায় । ভাঁজ খুলে নাকের কাছে টাওয়েল টা নিয়ে আসতেই কেমন ভ্যাপসা গন্ধ পেলো । নিশ্চয়ই ভেজা অবস্থাতেই এটাকে এভাবে গুছিয়ে রেখেছে । নাক সিঁটকায় রমনী…
” এটা আপনার কাছে ডেঞ্জারাস স্মেল মনে হচ্ছে ? ইয়াকক্….
পরিপাটি হাসলো রৌদ্র । মেঘার এক দলা চুল টেনে নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ টানলো । অতঃপর উন্মাদের ন্যায় একই ভাবে টাওয়েল থেকে ।
” সেম সেম সুইটহার্ট , আমাকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট ।
পাত্তা দিলো না মেঘা । লোকটা পাগল , সে জানে । ফের ড্রয়ারের দিকে তাকালো সে । রংচঙে কিছু একটা দেখে কপাল কুঁচকালো । হাতে নিয়ে দেখলো সিল্কের একখানা ওরনা । কিছুটা পরিচিত ঠেকলো ।
বিশেষ তোয়াক্কা না করে সেটাকে একপাশে সরিয়ে রাখলো সে । তা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো রৌদ্র । মনে মনে বিড়বিড় করলো , মেয়েটার স্মৃতিশক্তি কম ।
টাওয়েল টার নিচে এক কোণে কতকগুলো চকলেট আর আইসক্রিমের পুরনো খোসা । এগুলো এভাবে যত্ন করে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছে কেনো এই লোক ? ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে চোখ সরু করে জানতে চাইলো….
” এগুলো এখানে কেনো ? আপনি খুব নোংরা , অগোছালো একদম !
” অগোছালো হলে এগুলোর স্থান সেই রাস্তার ধারে কোথাও হতো । অস্তিত্ব সংকটে পড়তো এতো দিনে । গোছালো বলেই গুছিয়ে রেখেছি ছয় বছর ধরে ।
” কেনো ?
” ভালোবাসি তাই !
” এই চকলেটের খোসা গুলোকে আপনি ভালোবাসেন ?
” উঁহু , তোমাকে ।
রৌদ্রের হাস্কি টোন । মেঘা কপালে বিস্তর ভাঁজ ফেলে এক চিলতে হাসলো ।
কাঁটা গুলো সরিয়ে সরিয়ে দেখলো । প্রায় ষাট–সত্তর টা তো অনায়াসে হবেই । দম ফেলে দুদিকে মাথা নাড়ালো সে । হাত দিয়ে আলগোছে সরিয়ে দেখার মাঝেই নিচে কিছু একটা চকচকে স্বচ্ছ কিছু জ্বলে উঠলো চিকচিক করে । চোখ ছোট করে দেখার চেষ্টা করলো । হাতে তুলে নেওয়া মাত্রই আকাশ ভেঙ্গে পড়লো মাথায় ।
তড়াক করে নিজের পায়ের দিকে তাকালো সে । অতঃপর হাতের দিকে , ফের রৌদ্রের দিকে । হাঁসফাঁস করে উঠলো….
” রৌদ্র !
” ইয়েস সুইটহার্ট !
” এ….এটা তো , এটা তো আমার নুপুর ।
” তোমার বুঝি ?
” হ্যাঁ ! এই দেখুন ,, আমার এক পায়ে একটা নূপুর আছে , দ্বিতীয় পায়ে নেই । হারিয়ে গেছিলো ওটা । কিন্তু এটা আপনার কাছে, কি করে ?
” পেয়েছিলাম !
” কোথায় ? এটা তো অনেক আগে হারিয়ে গেছিলো । আমার মনেই নেই কবে হারিয়েছে !
” কিন্তু আমার মনে আছে । আজ থেকে ছয় বছর চার মাস চার দিন আগে হারিয়ে গেছিলো । সেই কোনো এক অক্টোবরের দুই তারিখে । যেবার তোমায় দেখলাম , সেবার ।
মেঘা স্তব্ধ । মাথা ভনভন করে উঠলো । এসব কি করে হতে পারে ? ওর অবুঝ শিশু সুলভ চেহারা দেখে এক পশলা হাসলো রৌদ্র । টেনে খাটে বসালো ওকে । নিজে বসলো মেঝেতে হাঁটু মুড়ে । ঠিক রমনীর পায়ের কাছে । স্তব্ধ রমনীকে পাথর বানিয়ে ওর ডান পা তুলে নিলো নিজের উরুর উপর । খুব আলগোছে সযত্নে পরখ করলো । নূপুর খানা নিয়ে সন্তর্পণে পড়িয়ে দিলো পায়ে । তর্জনী দিয়ে পায়ের উপরি পিঠে স্লাইড করতে গেলে শিরশিরে অনুভূতিতে কুঁকড়ে গেলো মেঘা । রৌদ্র বললো আবেশিত কন্ঠে…..
” এতদিন গুছিয়ে রেখেছিলাম নিজের কাছে । এখন ফিরিয়ে দিলাম । গোটা তুমি টাই এখন আমার, আলগা জিনিস রেখে কি করবো । যখন ছিলে না , তখন অমূল্য ছিলো ।
মেঘা হিসেব মেলাতে ব্যস্ত । রৌদ্রের কথা গুলো কানালো না । বললো চিন্তিত হয়ে…..
” আপনি কি বলছেন বলুন তো ? এটা কোথায় পেয়েছেন আপনি ? অনেক আগে হারিয়ে গেছিলো এটা । আপনার সাথে তখন দেখাই হয় নি আমার । আমাদের প্রথম দেখা হয়েছে ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ , আর সেদিনই আপনি আমায় ফোর্স করে বিয়ে করেছিলেন । তার পর পাঁচ বছর পর ২ অক্টোবর ২০২৪ ফেরত এসেছেন আপনি ? তখন আমাদের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয় । আর আপনি বলছেন এটা পেয়েছেন ছয় বছর আগে ? সেটাও দুই অক্টোবর ? কিসের এই ২ অক্টোবর ? এক হয় কিভাবে ? আপনি এটা পেয়েছেনই বা কিভাবে ? বলুন না রৌদ্র ! তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে আমার সবটা !
রৌদ্র ক্লান্ত হয়ে দম ফেললো । মেঘার উৎকণ্ঠা বুঝলো সে । চাপলো নিজের উচাটন । আলগোছে মাথা এলিয়ে একবিংশীর কোলে রাখলো । চোখ বুজে আষ্টেপৃষ্ঠে কোল জড়িয়ে নেওয়ায় চেষ্টা করে বললো শান্ত কন্ঠে…..
” ভালোবাসি সুইটহার্ট , ভীষণ ভালোবাসি তোমায় । জোর করে বিয়ে করেছি এটা দেখেছো , অথচ ভালোবাসা টা দেখোনি ? এতো বোকা কেনো তুমি ? চেনো আমায়, একটু মনে করে দেখো । আমি তোমার খুব পরিচিত । তবে সে পরিচয় যে আমার চাই না । তাইতো লুকাই । ভয় হয় , যদি ভুল বোঝো ? প্লিজ জান পাখি , ভুল বুঝো না কখনো ? আমি ভুল নই , ভালোবাসা তোমার । ভালোবাসি খুব ।
সকাল সকাল ভার্সিটিতে বেরোনোর সময় হয়ে গেছে । তৈরি শিশির । অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নিয়েছে । নিচেও নেমেছিলো । ব্রেকফাস্ট বানাতে টুকটাক সাহায্য করে আবার উপরে উঠেছে । আদ্রের ঘুম ছুটেছে একটু দেরিতে । শিশির রুমে গিয়ে দেখে লোকটা মিররের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে মিটিমিটি । পড়নে টানটান সাদা শার্ট, ইন করেছে ইতোমধ্যে । চুল সেট করে একদম পরিপাটি সে । নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে বেশ কিছুক্ষণ লোকটাকে পরখ করলো শিশির । লোকটা সুপুরুষ বটে , সৌন্দর্য চোখে লাগে ভীষণ । যে কারোর চোখকে আকৃষ্ট করার যোগ্যতা রাখে ।
অপরদিকে শিশির সাধারণ । বোধহয় তার যোগ্য নয় । এটাই ধারনা শ্যামলিনীর ।
চোখ নামিয়ে এগোলো সে । হিজাব পড়া বাকি । ওর উপস্থিতির আভাস পেয়ে হাসি লুকায় আদ্র । নিজেকে গুরুভার করে ডাকে…..
” শিশির , একটু এসো তো ।
মেয়েটা যাচ্ছিলই । হিজাব নিয়ে আয়নার সামনে আদ্রের পাশাপাশি দাঁড়ালো । ডাকে তোয়াক্কা করলো না । অবশ্য ঘরের চার দেয়ালের মাঝে ওদের কথা হয় কম । আদ্র যবে আগ বাড়িয়ে কথা বলে , তবেই একটু জবান খোলে রমনী । তার সাঁড়া না পেয়ে আদ্র আবার বললো….
” এইই বেয়াদব , ডাকছি তো !
হিজাব পরে বাঁধো । আগে আমার কাজ করে দাও ।
” কি ?
” শার্টের বাটান খুলে গেছে , লাগিয়ে দাও ।
আবদারে ভ্রু কুঁচকে ফেললো শিশির । তাকালো লোকটার বুকের নিকট । উপর থেকে দ্বিতীয় বোতাম টা নেই । খুলে এসেছে আদ্রের হাতে । দুটোই লক্ষ্য করলো রমনী । মুখ ফিরিয়ে বললো…..
” পারবো না । অন্য শার্ট পড়ে নিন ।
” আমিও পারবো না । এটা আয়রন করেছি । একটা বোতাম খুলে গেছে কেবল , লাগিয়ে দাও ।
” বললাম তো পারবো না । নিজের কাজ নিজে করে নিন ।
” নিজের কাজ নিজে করতে পারলে তোমাকে এনেছি কেনো , বেয়াদব ?
” আমি বলিনি আমাকে আনতে ।
” মুখে মুখে তর্ক করবে না । যা বলছি করে দাও । সূচ আছে ওখানে । যাও নিয়ে এসো ।
শিশির বিব্রত হলেও প্রকাশ করলো না । অবাধ্য হলো না আর । গটগট পায়ে নিশানা অনুযায়ী একটা সূচ নিয়ে আসলো । সুতো আটকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো ।
” এভাবে ?
” কিভাবে ?
” শার্ট খুলে দিন , লাগিয়ে দিচ্ছি ।
চোখ সরু করে আদ্র । ব্যাঙ্গ করে বলে……
” তুমি তো ভারী আন–রোমান্টিক ! ওওওওও , নাকি একটু বেশি রোমান্টিক ? শার্ট’লেস দেখতে চাইছো আমায় ?
শিশির চোখ সরু করলো একই ভাবে । ক্ষুব্ধ হয়ে দাঁত পিষে বললো…..
” আপনি এতো নির্লজ্জ , আগে জানতাম না ।
” জানবে কি করে ? আগে তো তুমি আমার বউ ছিলে না !
ভেংচি কাটলো মনে মনে । লোকটা অনেকটা লম্বা । বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে নিজের কাজে লেগে পড়লো সে । আদ্রের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ । পলক পড়ছে না । চোখ নত করে চেয়ে আছে এক ঘোরে । কাজের ফাঁকে চোরা চোখে ওর এমন দৃষ্টি দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো শিশির । ঘন পলক ফেলতে ফেলতে বললো……
” চোখ সরান ।
” প্রশ্নই ওঠে না ।
” অস্বস্তি হচ্ছে আমার ।
” শুধু দৃষ্টিতেই অস্বস্তি ? ছুঁয়ে দিলে কি হবে ? খুঁজে পাওয়া যাবে তোমায় ?
লোকটার মুখে লাগাম নেই । বলে ফেলে সব । কিড়মিড় করলো শিশির । তড়িঘড়ি করে হাতের কাজ খতম করলো ।
ভার্সিটি থেকে নিজের বাড়িতে গেছিলো শিশির । আদ্র নিয়ে এসেছে আবার । সারাটা দিন কেমন অস্বস্তিতে কেটেছে ।
ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রিবার নিকট কারোর উষ্ণ শ্বাস অনুভব করলো শিশির । বেজায় ঘুম পেয়ছিলো তার । ডিনারের পর পরই রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়া মাত্রই তলিয়ে অঢেল নিদ্রায় । গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলো সে । ঘুমের মাঝে এখন হঠাৎ করেই গলার কাছটায় উষ্ণ গরম কিছু অনুভব করলো । আরো অনুভব করলো, নঢ়চড় করা মাত্রই খোচা খোচা কিছু খচখচ করে বিধলো নরম ত্বকে । বিভ্রান্তি ঘটলো গভীর ঘুমে । মস্তিস্ক তখনো অচল । সচলতা ফেরে ধীরে ধীরে । একটু সজাগ হতেই নিজেকে কারোর বাহুডোরে বন্দিনী হিসেবে আবিষ্কার করলো সে । তার উদর শক্ত করে পেচিয়ে নিয়েছে কেউ । ঘুমের ঘোরেই ধক্ করে ওঠে রমনী । সেকেন্ড কয়েকের মাথায় তড়াক করে চোখ খোলে । ঘরে হলদে একখানা মিটমিটে আলো । টালমাটাল চোখে ঝাপসা দেখলো প্রথমে । তার উপর মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো আকস্মিক ঘুমের বিঘ্নতায় । নিজেকে সামলাতে তার সময় লাগলো সেকেন্ড কয়েক । মিনিটের মাথায় ধীরে ধীরে সবটা বোঝার চেষ্টা করলো ।
নিভু নিভু চোখে দেখলো, আদ্র তার খুব সন্নিকটে । লোকটা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে তার গলার ভাজে মুখ গুজে বেশ আয়েশে ঘুম জমিয়েছে । তার ভারী শ্বাস গলায় আছড়ে পড়ছে । গভীর শ্বাসেই তার ঘুমের গভীরতা আন্দাজ করা যায় ।
আকস্মিক আদ্র কে এতোটা কাছে দেখে সর্বাঙ্গ কেপে ওঠে শিশিরের । শিরশির করে জেকে ওঠে নারী দেহের সুপ্ত অনুভূতিরা । ঘুম ছুটে যায় নিমিষেই । জমে যায় তার কোমল কায়া । লোকটা এতো কাছে এসেছে কেনো ? কখনই বা আসলো ? ওদের মাঝে তো বালিশের প্রাচির দেওয়া হয় রোজ রাতে । তাহলে ? ওর ঘুমের সুযোগ নিতে এসেছে লোকটা ? শুধু কি আজ ? না রোজ নেয় ?
শিশির কেমন কেপে ওঠে । মস্তিস্ক এলোমেলো হয়ে যায় । আকস্মিক সে গলা চড়িয়ে বাজখাই গলায় ডেকে উঠলো….
” স্যার ?
সাথে ঝাকলো একটু । আদ্রের নড়চড় নেই । শিশির আবার ডাকে । এবেলায় গলার স্বর আরো শক্ত । আদ্রের কানে ডাক পৌছেছে এবার । সে কেবলই ঠোঁট নাড়িয়ে উত্তর করলো ঘুমের ঘোরে….
” হোয়াট ? ডিসটার্ব করছো কেনো ? ঘুমোতে দাও ?
আদ্রের ঘুম পাতলা হয়ে এসেছে, এটা বোঝা মাত্রই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ওকে ধাক্কা মারলো শিশির । আকস্মিক ধাক্কায় ঘুমন্ত আদ্র ছিটকে পড়লো বিছানার অপর দিকে । ওকে তাড়িয়ে সাথ সাথ এক ঝটকায় উঠে বসলো শিশির । চোখ মুখ খিচে খ্যাকিয়ে উঠলো….
” আপনার সাহস কি করে হয় আমার কাছে আসার ? একটু ঘুমিয়েছিলাম বলে সুযোগ নিতে এসেছেন ?
ঘুমের মাঝে হঠাৎ বিরক্তি, তার উপর শিশিরের এমন খেই খেই কথার চোটে ভারী বিব্রত হলো আদ্র । ঘুমে বিভোর দৃষ্টি যুগল ত্রম্ভ হয়ে মেলে আসলো । চোখের সামনে নিভু আলোয় ঝাপসা ঝাপসা রাগান্মিত শিশিরের চেহারা দেখে নিজেও রেগে গেলো সে…
” হোয়াটস ইউর প্রবলেম বেয়াদব ? দেখছিলে না ঘুমোচ্ছিলাম ? আমার শান্তি সহ্য হলো না তোমার ?
” ঘুমোচ্ছিলেন তো আমার কাছে কি ? বাউন্ডারি ক্রস করেছেন কেনো আপনি ? আমি বলেছিলাম আমার কাছে আসবেন না । তবুও কোন সাহসে জড়িয়ে ধরেছেন আমায় ।
আদ্র প্রচন্ড রেগে উঠে বসে, চিবিয়ে বলে….
” এনাফ ইজ এ্যানাফ,, অনেক হয়েছে । হাসব্যান্ড আমি তোমার । কি করেছি আমি , শুধু তো জড়িয়ে ঘুমোচ্ছিলাম ।
” জড়াবেন না আমায়, ছোবেন ও না ।
” শিশির, বাড়াবাড়ি করবে না । আমি সহ্য করি বলে সহ্য ক্ষমতার পরীক্ষা নিচ্ছো ?
” আমি তো বলিনি আমাকে সহ্য করতে ? জোর করে কেনো সহ্য করছেন ? ছেড়ে দিন আমায় ?
ব্যস, আদ্রের চোয়াল মাত্রাতিরিক্ত শক্ত হতে সময় লাগেনা । বিভৎস রাগে তিরতিরিয়ে কেঁপে ওঠে সে । তড়াক করে মস্তিষ্কে রক্ত চড়ে । রক্তিম হয়ে ওঠে চোখজোড়া । কি পেয়েছে এই মেয়েটা ? কেনো বুঝতে চাইছে না ওকে ? নাকি বুঝেও বোঝার চেষ্টা করছে না ?
” এইই, কি সমস্যা তোমার ? বলো ? ছাড় চাও কেনো বারবার ? বোঝোনা আমি তোমায় ছাড়বো না ? বউ তুমি আমার। দুদিন বাদ সবাই জানবে এটা । এখনো কিসের এত জেদ ?
শিশির ব্যাথা পায়…
চোখ ছলছল করে আদ্রের আকস্মিক হিংস্রতায়….
” ছাড়ুন, ব্যাথা পাচ্ছি ।
” পাও ব্যাথা । আমিও ব্যাথা পাচ্ছি, এটা দেখতে পাচ্ছো না ? আরে প্রবলেম কি তোমার ? চাও টা কি ?
” ডিভোর্স !
কন্ঠ কাপলেও বেফাসে সরু কন্ঠে উচ্চারণ করে বসলো তৎক্ষণাৎ । আদ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না । বারংবার এই মেয়ের অবাধ্যতায় ক্ষুব্ধ সে । এবার চরমে পৌছালো ক্ষুব্ধতা । হাত উঠে গেলো নিয়ন্ত্রন হীন । কথা শেষ হতে না হতেই ঠাস করে একটা দাপুটে থাপ্পড় আছড়ে পড়লো শ্যামলিনীর বাম গালে । আকস্মিক আক্রমণে খেই হারিয়ে খাটের ব্যাক বোর্ডের দিকে ছিটকে পড়লো রমনী । থাপ্পরের পশ্চাতে কপাল গিয়ে ঠেকলো শক্ত কাঠে ।
শিশির টাল সামলাতে বেশ হিমশিম খেলো । একেই সদ্য ছোটা ঘুম , তার উপর চড়ের আঘাতের পাশাপাশি কপালে দগ্ধ ব্যাথা । সবমিলিয়ে মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো মেয়েটার । আঁখি কোটরে পানি ধরে রাখতে পারলো না বেশিক্ষণ । কোটর ফেটে ঝরঝরিয়ে পানি গড়ালো গাল ঝাঁপিয়ে । আহ্ সূচক মৃদু আর্তনাদ করে ফিকড়ে উঠলো রমনী ।
তার কান্নার শব্দে হুঁশ ফেরে ক্ষিপ্ত লোকটার । রাগে থরথরিয়ে কাঁপা শরীর শান্ত হয় তড়িতে । চোখে মুখে আঁতকে ওঠা ভাব ফুটে ওঠে তার । শ্যামলিনীকে কাঁদতে দেখে মনে পড়ে নিজের করা শক্ত আঘাতের কথা , অমনি ছটফট করে ওঠে সে….
” শিশির ,, এইই কাঁদছো কেনো ? লেগেছে বেশি ? দেখি , তাকাও আমার দিকে ! ব্যাথা পেয়েছো খুব ?
আদ্র ওকে আগলে নিতে গেলে শিশির পিছিয়ে যায় । কেঁদে ওঠে শব্দ করে । বাম গালে হাত চেপে ধরে বিছানা থেকে নামে । আদ্র ওকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেলে ক্রন্দনরত স্বরে বাঁধা দেয় থেমে থেমে…..
” খবরদার কাছে আসবেন না আমার । ছোঁবেন না আমায় । মারলেন আপনি আমাকে ? আপনি খুব খারাপ ,, খাটাস লোক দূরে যান আমার থেকে ।
কথা শেষ করে আর দাঁড়ালো না । এলোমেলো উদ্যত পায়ে দ্রুত দরজা খুলে এক ছুটে বেরিয়ে গেলো বাইরে । ও বেরোতেই নিজের মাথা চেপে ধরে আদ্র । নিজের উপর চরম ক্ষুব্ধ হয় সে । ফর্সা শরীর তার টকটকে লাল হয়ে ওঠে ।
মিনিট কয়েক পর লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে ধাতস্থ করে নিজেকে । রাগ সামলায় । চোখ ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায় । রাত্রি তখন দুটো বেজে সাতচল্লিশ মিনিট ।
সময় দেখে ঢোক গিললো আদ্র । চোখ বুজে উপর দিকে মাথা তুলে আবারো বেশ কয়েকটি লম্বা শ্বাস টানলো । ঠোঁট ভিজিয়ে ধীর পায়ে ঘর ছাড়লো নিজেও ।
সেই মিনিট পনেরো ধরে ড্রইং রুমের সোফায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে শিশির । হেঁচকি উঠে গেছে এক পর্যায়ে । শ্বাস কমে এসেছে বুকে । নিঃশ্বাস নিচ্ছে হাঁ করে ।
চোখ মুছছে ঘন ঘন ।
ড্রইং রুম অন্ধকার । করিডোরে একটা আলো জ্বলছে । তার থেকেই মৃদুমন্দ আলো ছুটে এসেছে নিচে । এককোণে পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে । মধ্য রাতে নিস্তব্ধ পুরো বাড়ি । গুমোট ঘরে ক্ষণে ক্ষণে রমনীর ফোঁপানির শব্দ শোনা যাচ্ছে ।
ওর এমন কান্নার মাঝেই পাশে কেউ বসলো । কে সে , তা শিশিরের বুঝতে বাকি নেই । লোকটার দিকে না তাকিয়েই উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে । শত কষ্টেও হেঁচকি থামাতে পারলো না । গলা চিরে হেঁচকি উঠলো । তৎক্ষণাৎ ভেসে আসলো একটা শান্ত কন্ঠ…..
” আ’ম সরি !
ভীষণ কাতর কণ্ঠ । যেনো অপরাধ বোধ উপচে পড়ছে ।
” শুনছো , সরি । লেগেছে খুব ? বেশি জোরে মেরেছি তাইনা ? আর মারবো না কখনো ! এটাই প্রথম আর এটাই শেষ । ভুল করে হাত উঠে গেছে । ভুল করেও আর এই ভুল হবে না । সরি শিশির । আমি মারতে চাই নি তোমায় ।
শিশির লোকটার কথা শুনতে চাইছে না । ভেজা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো সে । লোকটাকে উপেক্ষা করে ত্রম্ভ পা বাড়ানো মাত্রই টান পড়লো হাতে । এতেই থেমে রইলো না । লোকটা রমনীকে এক টানে বসালো নিজের উরুর উপর । পেঁচিয়ে নিলো লতানো কোমর । যাতে বাঁধন ছাড়াতে না পারে । আকস্মিক এমন করে জড়িয়ে নেওয়ায় ছটফট করলো শিশির । মুখে টু শব্দও না করে হাত ছোড়াছুড়ি করলো । এদিকে চোখ ফেটে ঝর্না নেমেছে । আদ্র ওর ছটফটানি রুখে আরো শক্ত করে কোমর জড়িয়ে নিলো । অন্যহাতে রমনীর ঘাড় দাবিয়ে ধরলো আলগোছে । দূর্বল হয়ে বললো সে…..
” শোনো তো একটা বার , ভুল হয়ে গেছে । ক্ষমা করে দাও । আই প্রমিস , আর ভুল করবো না । দেখি কোথায় লেগেছে !
” দেখতে হবে না ছাড়ুন আমায় ।
” ছাড়ার জন্য তো ধরিনি । সরি বলছি তো ।
” আঘাত দিয়ে এখন সরি বলতে এসেছেন ? চাই না আপনার সরি । আমি ক্ষমা করবো না আপনাকে , ছাড়ুন বলছি ।
” ছাড়বো না । আগে কান্না থামাও । ইউ নো , তোমার চোখের পানি সহ্য হয় না আমার । ভীষণ কষ্ট হয় । এই দেখো হার্টবিট ফার্স্ট হয়ে গেছে । কেঁদো না প্লিজ । মরে যাবো নয়তো ।
শিশির কান্নার মাঝে হুট করে স্থির হয়ে গেলো এহেন কথায় । আদ্রের চেহারা কেমন বিষন্ন । চোখে গ্লানি । আবছা আলোয় তার ভারাক্রান্ত মুখাবয়ব বেশ বুঝতে পারলো শিশির । চোখ ঝাপসা তখনো । পানি কমছে না । টুপটাপ গড়াচ্ছে আপন ধারায় । আদ্র এ বেলায় হাত উঁচিয়ে ওর ভেজা চোখ , গাল মুছিয়ে দিলো । জ্বলছে কপোল খানা । লাল টকটকে হয়ে মারের দাগ ফুটে উঠেছে । কপালে ক্ষুদ্র কাঁটা ক্ষত । আদ্র ছোট চোখে নজর বুলিয়ে নিলো আবছা আলোয় । অতঃপর হাত উঠিয়ে আলগোছে ছুয়ে দিলো শ্যামলিনীর বাম কপোল খানা । বললো করুন স্বরে…..
” ব্যাথা পেয়েছো খুব ? সরি,, হ্যাঁ ? এই দেখো , কানে ধরছি ,, আর কক্ষনো এভাবে ব্যাথা দেবো না । রেগে ছিলাম তখন । আর রাগবো না ।
শিশির ফুঁপিয়ে উঠলো । চোখ নামিয়ে বললো….
” আপনি মেরেছেন আমায় । আমি থাকতে চাই না এই সম্পর্কে, ছাড়ুন আমায় ।
” এখনো ধরলাম না , ঠিকমতো আগলে রাখলাম না, ভালোবাসলাম না, এর আগেই ছাড়বো ? তুমি বড্ড বেয়াদব বউ । বোঝো না আমায় । আমি থাকতে চাই তোমার সাথে । ছাড়তে চাই না তোমায় , পারবো না ছাড়তে ।
শিশির চিবুক নামিয়ে ফুঁপিয়েই যাচ্ছে । আদ্র ওর চিবুক উঁচিয়ে ধরলো অন্ধকারে…..
” শিশির , লুক এ্যাট মি । তাকাও আমার চোখের দিকে । আমি জানি আমাদের বিয়েটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হয় নি । তবে হয়ে তো গেছে । এখন আর কিসের এতো দ্বিধা তোমার ? আমি কখনো জোর করিনি তোমায় । এখনো অবধি তোমার অনিচ্ছা কে প্রাধান্য দিয়ে এসেছি । আমি জানি আমার সংস্পর্শে অকোয়ার্ড ফিল করো তুমি । কিন্তু এভাবে আর কতদিন ? আমরা হাসবেন্ড ওয়াইফ ! আমাদের সম্পর্ক টা হালাল । বোঝো না তুমি ? কেনো এমন করো , বলবে ?
আদ্রের শান্ত প্রশ্নে শিশির চোখ তুলে চাইলো । চোখাচোখি হতেই নাক টানলো সে । উদ্যত হলো কিছু বলার জন্য । হেঁচকি উঠেই যাচ্ছে । অসুবিধা হচ্ছে শ্বাস নিতে । আদ্র ওর অবস্থা বুঝলো । কোমর ছেড়ে দুহাতের আজলে রমনীর মুখখানা আগলে নিয়ে ভেজা ভেজা পুরো মুখশ্রী মুছিয়ে দিলো । গালে কপালে লেপ্টানো খুচরো চুল গুলো আলগোছে গুছিয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বললো….
” রিল্যাক্স, শিশির । আমি আছি তো । ধীরে বলো…..
” আপনি আমার প্রফেসর । এতো দিন আপনাকে অন্য চোখে দেখে এসেছি আমি । এখন এভাবে হঠাৎ করে কিভাবে স্বামী হিসেবে মানবো আপনাকে ? এটা ভাবলেই অস্বস্তি লাগে আমার ।
শিশির আর দোনামোনা করলো না । কান্না গিলে পরপর বলে দিলো কথাগুলো । আদ্র চোখ সরু করে । একটুও ভাবে না । প্রত্যুত্তরে ঝট করে বলে……
” তাহলে চাকরিটা ছেড়ে দেই ? ছেড়ে দিলে আর টিচার থাকবো না আমি তোমার । তখন আমাকে মানতে অসুবিধা হবে না নিশ্চয়ই ? ছেড়ে দেবো চাকরি ?
শিশির তাজ্জব বনে তাকালো বড় বড় চোখে । এ বেলায় চোখের পানি চোখেই আটকালো । হেঁচকি থামলো তার । লোকটা কি বলছে ?
” কি বলছেন ? আমার জন্য চাকরি ছাড়বেন ?
” হু , ছেড়ে দেবো । কারন, আমি তোমার পারফেক্ট হাসবেন্ড হতে চাই শিশির, প্রফেসর নয় । তোমাকে চাই আমি । সংসার করতে চাই তোমার সাথে । তোমার বিপরীতে আমার কাছে চাকরি কোনো ব্যাপার নয় । তুমিই সবার আগে ! বাকি সব তুচ্ছ ।
শিশির বড়সড় অবাক হলো । দৃষ্টিতে ঘোর । লোকটা তাকে চেনে কতটুকু ? এভাবে দুদিনের সংসারের জন্য নিজের চাকরি ছেড়ে দেবে ? সজ্ঞানে আছে তো এই লোক ? আবারো চোখ নামালো শিশির ।
ঠোঁট উল্টে বলতে নিলো…..
” আমার জন্য চাকরি ছাড়তে হবে না আপনাকে । আপনি বরং আমায় ডিভোর্স……..
সম্পুর্ন বাক্য শেষ হলো না । এর আগেই রমনীর ওষ্ঠযুগল আঁকড়ে ধরলো আদ্র । বিদ্যুতের শকের ন্যায় ঝটকা খেলো মেয়েটা । চোখ জোড়া তড়াক করে বৃহৎ হলো । সেকেন্ড পাঁচেকের মাথায় ক্ষুদ্র পরশ এঁকে আদ্র নিজেই সরে এসেছে । চোখ খুলে তাকিয়েছে রমনীর কিংকর্তব্য বিমূঢ় মুখটার পানে । শিশির পুরো স্তব্ধ । সবটা ধ্যানে আসা মাত্রই আদ্রের দৃষ্টি বুঝে নড়েচড়ে উঠলো । আদ্র আবার নিবিড়ভাবে কোমর জড়িয়ে নিয়েছে বিধায় স্থানচ্যুত হলো না সে । দ্রুত লাজুক পলক নামিয়ে ঢোক গিললো ,,,
” কি করছেন আপনি ? আমি আপনার থেকে ডিভোর্স…..
এবারো আর কথা শেষ হলো না । পূনরাবৃত্তি ঘটলো একই ঘটনার । এবারের পরশের সময়সীমা ঐ সেকেন্ড পাঁচেক । শিশির দ্বিতীয় বার বিদ্যুতের শক্ খেলো । ঝলকানি বয়ে গেলো সর্বাঙ্গে । তার নারী দেহের থরথরে কম্পন স্পষ্ট ঠাহর করলো আদ্র । তবুও লোকটার প্রতিক্রিয়া নেই ।
শিশির মিশে যাচ্ছে লজ্জা, আড়ষ্টতায় । লাল হয়ে উঠেছে সে । আদ্রের বুকে এবার আলতো ধাক্কা দিলো রমনী । ঘন ঘন শ্বাস টানলো । কন্ঠ রুদ্ধ , থেমে আসছে…..
বললো ঠোঁট নাড়িয়ে….
” স্যার প্লিজ,, ছাড়ুন আমায় । আমি ডিভোর্স …….
তৃতীয় বারেও তার বাক্য পূর্ণ হলো না । এ বেলায় আদ্র তার কোমর পেঁচিয়ে নিলো শক্ত করে । অন্য হাত গ্রিবা ভিজিয়ে রমনীর ঘাড়ে পৌঁছালো । শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো এবার ।
শিশির ছটফট করে ওঠে । বিপরীতে লোকটার কর্তৃক বাড়ে । এবারে সময় জ্ঞান নেই । সেকেন্ড কয়েকের মাথায় ছাড়লো না এবার ।
এক পর্যায়ে শিশিরের ছটফটানি কমে আসে । চোখ বুজে নেয় সে । চঞ্চল হাত দুটো দিয়ে খুবলে ধরে লোকটার মেদ হীন উদরের দু’পাশ । তীব্র শীতের সাথে সাথে এমন উন্মত্ত পরশে জমে যায় সে ।
আদ্রের উন্মাদনা কমে মিনিট তিনের মাথায় । হাতের বাঁধন আলগা করে সে । ছাড়ে শ্যামলিনীর কম্পিত নরম অধর জোড়া । নিভু নিভু চোখ মেলে তাকায় । এর পরপরই শিশির তাকায় । চোখাচোখি হতেই ভারী লজ্জা পায় মেয়েটা । আদ্র তৎক্ষণাৎ বাম ভ্রু নাচিয়ে বলে ফিসফিসিয়ে…..
” সরি, বাট নট সরি । যতবার আমার থেকে আলাদা হতে চাইবে , ততবার এভাবে জড়িয়ে নেবো তোমায় । সুযোগ লুফে নেবো । শুধু , চেয়েই দেখো আরেকবার । ছাড় চাইতে পারো , তবে আমি ছাড়বো না ।
শিশির মিইয়ে যায় । হাত চালিয়ে লোকটার বুকে মৃদু আঘাত করে । নাক ফুলিয়ে লজ্জা ঢাকতে লোকটার কাঁধের নিকট মুখ লুকিয়ে বলে…..
” অসভ্য স্যার…..
হেসে ফেলে আদ্র । রমনীর তেজ নেই আর । সে বলে….
” বেয়াদব বউ ,,, স্যারের সাথে বেয়াদবি করতে নেই ।
তোমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম জাস্ট দু সেকেন্ডে । আর তুমি আমার থেকে বিচ্ছেদ চাও ? ভেবেছো কি , ছাড়বো তোমায় ? ছাড়ার হলে জড়াতাম না ! কেনো বোঝো না ? আই লাভ ইউ ! কবে, কিভাবে জানি না । শুধু জানি ভালোবাসি আমি তোমায় ? ভীষণ ভাবে ভালোবেসে ফেলেছি । ছাড়া সম্ভব নয় ।
শিশির আবার চোখ তুলে তাকালো । চোখাচোখি হতেই উপরনিচ মাথা নাড়ালো আদ্র । আকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি বিনিময় হলো । হাত আলগা হয়েছে তার । এ সুযোগ ছাড়লো না শিশির । আর কথায় কান না দিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো । লোকটার দিকে দ্বিতীয় বার না তাকিয়ে আঁধারের মাঝে এলোমেলো কদমে ছুটলো সিঁড়ি বেয়ে । আদ্র মৃদু হাসলো কেবলই ।
” তোরা গেটের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা কর । আমি এক্ষুনি আসছি ।
রাশভারী আদেশ ছুড়লো আদ্র । মুখভঙ্গি নিরেট । ভার্সিটিতে ছুটি হয়েছে । আজ ওদের আসার কথা না থাকলেও আদ্র আসছিলো বিধায় তিন রমনীও এসেছে । করিডোরে দাঁড়িয়ে ওদের আদেশ করে গটগট পায়ে অফিস রুমের দিকে হাঁটা ধরলো সে । শাফাহ্ আর মেঘা একসাথে উল্টো দিকে পা ফেরালেও, শিশির থম মেরে দাঁড়িয়ে । আদ্রের হাতে সাদা খাম মতো কিছু একটা লক্ষ্য করেছে সে । অমনি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চোখে মুখে । সে নড়তে পারলো না । ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেঘা ডাকে…..
” শিশির , দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? আয়….
ধ্যান ভাঙলো ওর । চটপট করে বললো……
” তোরা যা । আমি আসছি ।
বলেই ত্রম্ভ পায়ে ছুটলো আদ্রের পিছু পিছু ।
লোকটাকে পিছু ডাকলো না । ফাঁকা করিডোরে দ্বিধা হীন হাত টেনে ধরলো । আদ্র থামতেই পাশাপাশি দাঁড়ালো সে । কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জানতে চাইলো…..
” কোথায় যাচ্ছেন ?
” প্রিন্সিপাল রুমের দিকে ?
” কেনো ? হাতে কি এটা ?
আদ্র তাকালো হাতের খামটার দিকে । কন্ঠ খাদে নামিয়ে উত্তর করলো……
” রেজিগনেশন লেটার । কথা বলে জমা দিয়ে আসি গিয়ে । কদিনের মধ্যে ঝুট ঝামেলা শেষ হয়ে যাবে । এসবে গড়মিল হবে অনেক । তবে বেশি সময় লাগবে না ।
শিশিরের মাঝে খুব একটা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেলো না । বরং নাক ফুলিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো সে । লোকটার হাত থেকে খামটা টেনে নিলো । বললো ভারিক্কি স্বরে…..
” প্রয়োজন নেই । বাড়ি চলুন ।
আদ্র চোখ সরু করে….
” কেনো প্রয়োজন নেই ?
” বলেছি যখন , তখন প্রয়োজন নেই । বাড়ি চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে । কাল তো আমাদের বউভাত । মা আজ ভার্সিটিতে আসতে বারন করেছিলো । তবুও এসেছি । এখন চলুন । বাড়ি যেতে হবে । কাজ আছে অনেক ।
আদ্র একটু নড়েচড়ে উঠলো । হাঁসফাঁস করে বললো….
” তারমানে তুমি এভাবেই আমাকে মেনে নিচ্ছো ?
” ভার্সিটিতে নয়, বাড়িতে !
আদ্র ফিক করে ক্ষুদ্র হাসে । ঝুঁকে বলে ফিসফিসিয়ে…..
” বাড়িতে নয় , শুধু ঘরে মানলে ততেই হবে ।
চোখ ছোট করে কুঁচকে ফেললো শিশির । রেগে তাকালো । অমনি হাসি চওড়া হলো আদ্রের ঠোঁটে । বললো অধরের কোণে দাঁত চেপে…..
” চুমুতে এভাবে কাজ হবে, ভাবিনি । পটে গেছো তুমি ?
” মোটেও না ।
” আচ্ছা ? তাহলে এখনো ডিভোর্স চাই তোমার ? চাও একটাবার ! সমস্যা নেই , করিডোর ফাঁকা আছে । আমার অসুবিধা হবে না । একবার ডিভোর্স কথাটা উচ্চারণ করো শুধু । মুখ বন্ধ করার দায়িত্ব আমার । প্লিজ শিশির , একবার ডিভোর্স চাও , আমি চাইছি তুমি এটা চাও । চেয়েই দেখো । বেয়াদব হও একটু , আমার অসভ্য হতে ইচ্ছে করছে ।
আসবো ফিরে আবারো পর্ব ৫৪
রাগ লজ্জা মিশিয়ে কটমট করলো শিশির । ক্ষেপে আদ্রের বাহুতে মৃদু আঘাত করলো । চাপা স্বরে খেকিয়ে উঠলো….
” অসভ্য কোথাকার…..
বাড়ি চলুন চুপচাপ । বেশি বেশি বলে ফেলছেন ।
