Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১০

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১০
মেহজাবিন নাদিয়া

মেহমানরা একে একে বিদায় নিতেই পুরো শেখ ভিলায় একটা থমথমে, জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা নেমে এল। উৎসবের সেই চেনা রঙিন আলো, সুগন্ধি রজনীগন্ধার মালা আর ঝলমলে ডেকোরেশনগুলো এখন যেন এক-একটা বীভৎস ব্যঙ্গচিত্রের মতো ঘরের কোণে কোণে ঝুলে আছে। ড্রয়িংরুমের ওই উজ্জ্বল রোশনাই এখন জেবার চোখে তীব্র, তপ্ত সূঁচের মতো বিঁধছে; যা ওর অবশ মগজের প্রতিটি রগকে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে।
সোফায় বসে থাকা সোলেমান শেখ ওনার দুই হাতের তালুতে নিজের মুখটা এত শক্ত করে চেপে ধরে আছেন যে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে ফর্সা চামড়া লাল হয়ে উঠেছে। একটু আগেও ওনার মুখে যে সুপ্রতিষ্ঠিত, নিরাপদ ভবিষ্যতের তৃপ্তির হাসি ছিল, তা এখন এক লহমায় শ্মশানের ছাইতে পরিণত হয়েছে। ওনার আজন্মের বন্ধু, পরম সুহৃদ, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা আজ ওনার একমাত্র মেয়ের স্বামী! ওনার জামাতা! এই সামাজিক জটিলতা, এই অসম বয়সের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ে ওনারা কীভাবে এই পৃথিবীর সামনে, সমাজের কড়া রক্তচক্ষুর সামনে নিয়ে দাঁড়াবেন, তার কোনো কূল-কিনারা ওনার জানা ছিল না। ওনার বুকটা অপমানে, কষ্টে আর তীব্র ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছিল। ওনার আঠারো বছরের কচি মেয়ে, ওনার কলিজার টুকরো জেবা এমন একটা কাজ করতে পারল?

আরিশান মৃধা সোফা থেকে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার ধবধবে সাদা কটন পাঞ্জাবিতে এক নতুন সম্পর্কের অমোচনীয়, অদৃশ্য দাগ লেগে গেছে। ওনি সারিমের দিকে একবারও তাকালেন না, পাশে থাকা সোলেমান শেখের দিকেও চাইলেন না। ওনার বাঘের মতো তীক্ষ্ণ চোখ দুটোতে কোনো রাগ নেই, সেখানে জমাট বেঁধে আছে এক মহাসমুদ্রের মতো নিঃসঙ্গতা আর পরাজয়ের গ্লানি।
আরিশান মৃধা ওনার চশমাটা নাকের ওপর একটু সোজা করে জেবার দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ওনার সেই চাউনিতে এখন কোনো পিতৃত্বের স্নেহ ছিল না, আবার কোনো বৈবাহিক অধিকারের উষ্ণতাও ছিল না। ওটা ছিল স্রেফ এক অজানা কুয়াশায় ঘেরা শীতল চাউনি। ওনি কোনো কথা না বলে, এক মুহূর্তও আর সেই ড্রয়িংরুমে না দাঁড়িয়ে সোজা সদর দরজার দিকে হেঁটে চলে গেলেন। ওনার জুতোর শব্দটা ধীরে ধীরে ঘর পেরিয়ে বাইরের লনে মিলিয়ে গেল। আরিশান মৃধা একাই চলে যান; সদ্য বিয়ে করা নিজের নতুন স্ত্রীকে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলেন না। ওনার চলে যাওয়ার পথটার দিকে তাকিয়ে পুরো ঘরটা যেন আরও বেশি নিঝুম হয়ে গেল।

আরিশান মৃধা ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই সোলেমান শেখের ভেতরের রুদ্ধ ক্ষোভ, অপমান আর তীব্র যন্ত্রণা এক লাক্ষ্মী আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। ওনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ দুটো রাগে জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে তীব্র বাতাহত পাতার মতো। ওনি মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা জেবাকে দেখামাত্রই ওনার সমস্ত পিতৃস্নেহ যেন এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল। ওনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তীব্র ক্ষোভে বলে ফেললেন।
“নিয়ে যাও একে! আমার চোখের সামনে থেকে দূর করো একে!”
সোলেমান শেখের গলার আওয়াজ পুরো ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আছড়ে পড়ল। ওনি সারিমের দিকে তাকিয়ে কাঁপানো আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে বললেন

“সারিম! তুমি এবার তোমার এই নতুন মা কে আমার এই বাড়ি থেকে ইমিডিয়েটলি বের করে নিয়ে যাও! আমি এই মেয়ের মুখ আর আমার এই জীবনে দেখতে চাই না। যে মেয়ে নিজের বাপের বয়সী একটা মানুষের জন্য নিজের ইজ্জত, নিজের বংশের সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে, সে আমার মেয়ে নয়! ও একটা কলঙ্ক! ও একটা জ্যান্ত অভিশাপ! আমি একে আর এক সেকেন্ডও এই বাড়িতে সহ্য করব না!”
জেবা বাবার এই চরম ঘৃণাপূর্ণ কথাগুলো শুনে মেঝের ওপর কপাল ঠেকিয়ে আরও জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ও ভাঙা গলায় কিছু বলতে চাইল, তবে ওর মুখ থেকে কোনো স্পষ্ট শব্দ বের হলো না; শুধু এক অবরুদ্ধ হাহাকার আর ডুকরে ওঠা কান্নার আওয়াজ বেরোচ্ছিল। ওর কান্নায় সোলেমান শেখের মন একটুও গলল না, বরং ওনার রাগ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
সোলেমান শেখ ওনার মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন। ওনার গলার স্বর রাগে আর অপমানে চিরে যাচ্ছিল।
“আজ থেকে আমার কোনো মেয়ে নেই। আমার মেয়ে মরে গেছে। সারিম, তোমাকে বলছি, তুমি একে নিয়ে যাও। ও যদি আর এক মুহূর্ত আমার এই ঘরের বাতাসে শ্বাস নেয়, তবে আমার দম আটকে যাবে। নিয়ে যাও একে তোমার বাড়িতে! ওখানেই ও ওর নিষিদ্ধ ভালোবাসার মানুষকে দেখে বাকি জীবন কাটাক! আমার ঘরে এর কোনো জায়গা নেই!”

সাদমান এতক্ষণ পুরো দৃশ্যটা এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ওর ব্লেজারের হাত দুটো পকেটে গোঁজা, মুখে এক গভীর পেশাদারী নিস্পৃহতা। ও ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মামার কাঁধে একটা হাত রাখল–“মামা, শান্ত হোন। আপনি এখন যা দেখছেন, তা একটা গভীর মানসিক ক্ষত। নিজেকে সামলান। এখন রাগ দেখিয়ে কোনো লাভ নেই।”
“তুমি এর মধ্যে কোনো কথা বলবে না সাদমান! তোমাদের যা করার তা তো তোমরা দুজন করেই ফেলেছ। এই মেয়েকে বলো এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। আমি এর মুখ আর এক মূহর্তের জন্যও দেখতে চাই না।”
সারিম আর এক মুহূর্তও সেখানে সময় নষ্ট করা সমীচীন মনে করল না। ওর চোয়াল শক্ত, কিন্তু চোখের ভেতরের সেই খুনে উন্মাদনাটা এখন এক চরম ক্লান্তিতে রূপ নিয়েছে। ও অরির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল

“অরি, জেবাকে তোলো।”
অরি এতক্ষণ একটা কোণে কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আজ সারাটা দিন ওর ওপর দিয়েও কম ঝড় যায়নি। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে জেবার পাশে বসল। জেবার কাঁধে হাত দিয়ে অত্যন্ত নরম গলায় বলল-
“জেবা… ওঠ। চল আমাদের সাথে। আর এখানে থেকে লাভ নেই। আঙ্কেল এখন অনেক রেগে আছেন।”
জেবা অবশ পায়ে ভারী বেনারসির আঁচলটা কোনোমতে ভালো করে জড়িয়ে অরির ওপর ভর করে অত্যন্ত কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো বাবার দিকে তাকাতে চাইল, একটা শেষ ক্ষমা ভিক্ষার দৃষ্টি নিয়ে; কিন্তু সোলেমান শেখ ওনার পিঠ ফিরিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার অবয়বে শুধু ছিল চরম ঘৃণা।সব কাজকাম, সমস্ত সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া এক অদ্ভুত, নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে সারিম, অরি আর জেবাকে নিয়ে গাড়ি করে মৃধা নিবাসের দিকে রওনা হলো। গাড়ির পেছনের সিটে জেবা আর অরি পাশাপাশি বসে আছে। পুরোটা পথ কেউ একটা কথাও বলল না। গাড়ির ভেতরের নীরবতা এতটাই ভারী ছিল যে শুধু এসি-র মৃদু গুঞ্জন আর চাকার পিচঢালা রাস্তায় চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার ঢাকা শহরের আলোগুলো যেন এক-একটা রহস্যময় স্মৃতির মতো পেছনে ছুটে যাচ্ছিল।জেবা জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিল, অরি ওর একটা হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। অরি বুঝতে পারছিল জেবার ভেতরের ঝড়টা কতটা প্রলয়ঙ্করী। সারিম ড্রাইভিং সিটে বসে স্টিয়ারিং হুইলটা এত শক্ত করে ধরেছিল যে ওর হাতের রগগুলো সাদা হয়ে উঠেছিল। ওর চোখ জোড়া সামনের কালো পিচঢালা রাস্তার ওপর নিবদ্ধ ছিল, যেন সে নিজের ভেতরের সব প্রশ্নের উত্তর ওই অন্ধকারের মাঝে খুঁজছে। ওর কপাল বেয়ে হালকা ঘাম জমছে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। গাড়ি মৃধা নিবাসের সদর গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল, তখনো পুরো বাড়িটা যেন এক ভুতুড়ে নীরবতায় নিমজ্জিত। আরিশান মৃধার গাড়িটা বারান্দার নিচে পার্ক করা আছে, যার অর্থ ওনি অনেক আগেই বাড়ি ফিরে এসেছেন। বাড়ির কাজের লোকেরা সবাই চুপচাপ, কারণ ওরা আরিশান মৃধার মেজাজ আর আজকের ঘটনা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন।গাড়ি থামতেই সারিম নেমে পেছনের দরজাটা খুলে দিল। সে অরির দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু ক্লান্ত গলায় বলল-
“তুমি জেবাকে নিয়ে ভেতরে যাও, আমি গাড়ি পার্ক করে ফিরছি।” অরি শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল।
অরি জেবাকে ধরে ধরে গাড়ি থেকে নামাল। জেবার পা দুটো যেন আর উঠছিল না, বেনারসির ভারী কাজের শাড়িটা শরীরের ওপর এক বিশাল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। গয়নাগুলোর ওজন যেন এখন লোহার শিকলের মতো লাগছিল। অরি ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরে ধরে বাড়ির ভেতর নিয়ে এল। সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় অরির ঘরটিতে পৌঁছাতে জেবার মনে হলো ও যেন এক যুগ পার করে এসেছে।
রুমের ভেতর ঢুকে অরি দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিল। এরপর জেবাকে খাটের ওপর বসিয়ে দিয়ে আলমারি থেকে একটা সাধারণ টিশার্ট আর প্লাজো বের করল। জেবার সামনে এসে ওর মাথার জড়োয়ার ওড়নাটা খুব সাবধানে, আলতো করে খুলে ফেলল। ওড়নাটা সরিয়ে নিতেই জেবার অবিন্যস্ত, জট পাকানো চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। অরি বাথরুম থেকে একটা ভেজা তোয়ালে এনে জেবার মেকআপ করা মুখটা খুব সাবধানে মুছে দিতে লাগল।

কনসিলারের প্রলেপটা তোয়ালেতে লেপ্টে যেতেই জেবার গালের সেই কালশিটে, লাল হয়ে যাওয়া চড়ের দাগগুলো আবার স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল। ঠোঁটের কোণের সেই কাটার দাগটা থেকে হালকা একটু রক্তাভ রসানি বেরোচ্ছে। অরি তোয়ালেটা একপাশে রেখে জেবার ফোলা গাল দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। এরপর সে জেবার হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল-
“জেবা… তুই নিজের এই কী অবস্থা করেছিস রে? তুই কেন নিজের মনের ভেতর এত বড় একটা সত্য লুকিয়ে রেখেছিলি? কেন আমাকে একবারও বলিসনি? আমি কি তোর এতটাই পর ছিলাম? আমরা তো বন্ধু ছিলাম, জেবা!”
জেবা অরির দিকে তাকাল। ওর চোখের শূন্যতা দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন এই পৃথিবীর সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে। ওর চোখ দুটো সম্পূর্ণ নিষ্প্রাণ। ও শুকনো ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে অত্যন্ত ফিসফিসিয়ে ভাঙা গলায় বলল-

“অরি… তুই আমাকে ঘৃণা করছিস না? আমি তোর বাবার প্রেমে পড়েছি… আমি তোর পরিবারের ওপর, তোর বাবার সম্মানের ওপর এত বড় একটা ঝড় নিয়ে এলাম… সমাজ আমাকে কুলটা বলবে, অরি। আমি কীভাবে মুখ দেখাব ওনার সামনে?”
অরি জেবার রক্তাক্ত ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল রাখল।”চুপ কর জেবা। একদম চুপ কর। এসব কথা এখন বলিস না। ঘৃণা করার সময় এটা নয়। তুই আগে ফ্রেশ হ। এই বেনারসি শাড়ি আর গয়নাগুলো তোর শরীরটাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে। আমি তোকে একটুও ঘৃণা করি না, জেবা।”
অরি নিজে হাতে জেবার গায়ের ভারী সোনার গয়নাগুলো, গলার হার, কানের দুল, হাতের বালা একটা একটা করে খুলে টেবিলের ওপর রাখল। এরপর জেবা ওয়াশরুমে গিয়ে কাপড় চেঞ্জ করে আসল।টিশার্ট আর প্লাজোতে জেবাকে দেখতে এক্কেবারে এক নিষ্পাপ, শান্ত বাচ্চার মতো লাগছিল। অরি তাকে খাটে শুইয়ে দিয়ে গায়ের ওপর একটা পাতলা চাদর টেনে দিল।”এবার একটু চোখ বন্ধ কর জেবা। অনেক ঝড় গেছে তোর ওপর দিয়ে। এবার শান্ত হয়ে ঘুমা। কাল সকালে সব দেখা যাবে,” অরি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল।
জেবা চাদরটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে অরির দিকে তাকিয়ে রইল। সারাদিনের তীব্র মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিতে ওর চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসছিল। ও চোখ বন্ধ করার ঠিক আগের মুহূর্তে ফিসফিস করে বলল-

“অরি… আরিশান আঙ্কেল কি আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন? ওনি কি আমাকে কখনো বউ হিসেবে মেনে নেবেন?”
অরি এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না, ও শুধু নিঃশব্দে জেবার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। কিছুক্ষণ পর জেবার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল, ও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।জেবার ঘুমন্ত মুখটার দিকে আরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বের হয়ে এল।অরি দরজাটা বাইরে থেকে আলতো করে লক করে দিল, যাতে কেউ ওকে ডিস্টার্ব না করে। ওর নিজের শরীরটাও এখন ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু ওর মনের ভেতরের অস্থিরতা ও বিশাল কৌতূহল তাকে এক মুহূর্তেও স্থির হতে দিচ্ছিল না।অরি তিনতলা থেকে নেমে ধীর পায়ে দুতলার দিকে এগিয়ে গেল। ওর গন্তব্য এখন সারিমের ঘর। আজ বিয়েবাড়িতে সারিম যা যা করেছে, যেভাবে নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নিজের বাবাকে এই বিয়েতে বাধ্য করেছে–তার পেছনের আসল সত্যিটা অরিকে জানতেই হবে। সারিমের এই উন্মাদনার শেষ কোথায়, তা ও বুঝতে পারছিল না।

অরি সারিমের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা খোলাই ছিল।সে ঘরের ভেতর পা রাখতেই দেখল পুরো ঘরটা অন্ধকার, কোনো আলো জ্বলছে না। শুধু বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে বাইরের চাঁদের আলো আর বাগানের ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলো এসে মেঝের ওপর পড়েছে। সারিম ঘরের ভেতর নেই। ও ধীর পায়ে হেঁটে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
বারান্দার রেলিং ঘেঁষে একসেট সোফা রাখা আছে। সারিম সেই সোফায় বসে একহাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট ধরে আছে। ওর শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, চুলগুলো রাতের বাতাসে উড়ছে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে একটি বিশাল শিমুল গাছ অন্ধকারের মাঝে এক অবয়ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সারিম সেখান থেকে চোখ সরাচ্ছিল না।শিমুল গাছটার নিচে একটা কাঠের পুরোনো বেঞ্চ আছে। ওই গাছটা সারিমের প্রয়াত মা, আনতারা মৃধা নিজের হাতে লাগিয়েছিলেন।

এই মুহূর্তে, ওই শিমুল গাছের নিচের বেঞ্চে বসে আছেন আরিশান মৃধা। ওনার হাতে একটা গ্লাস, পাশে রাখা একটা স্কচ-এর বোতল। ওনি একাকী অন্ধকারের মাঝে বসে ড্রিংক করছেন আর শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। ওনার বসার ভঙ্গিটা ছিল চরম এক পরাস্ত সৈনিকের মতো।সারিম বারান্দায় বসে ওর বাবার ওই নিঃসঙ্গ, পরাস্ত অবয়বটা দেখছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বাবাকে এভাবে ড্রিংক করতে দেখছে। ও জানত, ওর বাবা নিজের ভেতরের চরম অশান্তি, একাকীত্বকে চেপে রাখার জন্যই আজ আবার ওই বোতলের আশ্রয় নিয়েছেন। সারিমের বুকের ভেতরটা এক তীব্র ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে একটা বড়, ভারী শ্বাস নিয়ে নিজের হাতের সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে পিষে নিভিয়ে ফেলল। বাবার সাথে করা এই আচরণে, ওকেও যে ভেতরে ভেতরে কতটা পুড়তে হয়েছে, কতটা রক্তাক্ত হয়েছে, তা কেবল ওই ওপরের আল্লাহ-ই জানেন। সারিমের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার আগেই ও তা মুছে ফেলল।
ঠিক তখনই সে পেছনে কারো হালকা পায়ের শব্দ টের পেল। সারিম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল অরি বারান্দার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ওর পরনের ফর্মাল কোটটা ও খুলে ফেলেছে, এখন শুধু শার্ট আর প্যান্ট পরা। চোখে একরাশ ক্লান্তি আর হাজারটা প্রশ্ন খেলা করছে ওর।সারিম একটু বাঁকা হাসার চেষ্টা করল, যদিও সেই হাসিতে কোনো প্রাণ ছিল না, বলল

“চন্দ্রিমা? তুমি এখানে? রাত হয়েছে ঘুমাওনি কেন? জেবা ঘুমিয়েছে?”
অরি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সারিমের ঠিক সামনে দাঁড়াল
“হ্যাঁ, ও ঘুমিয়েছে।”
অরি একটু থেমে সারিমের লালচে, ক্লান্ত চোখের দিকে তাকাল-
“আপনি তো সেই দুপুর থেকে কিছু মুখে রাখেননি সারিম। চলেন নিচে, সুফিয়া খালা খাবার দাবার টেবিল ঢেকে রেখে গেছে। একটু খেয়ে নিবেন। খালি পেটে থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।”
সারিম ওর মাথাটা পেছনের দেওয়ালে ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল, ওর গলায় এক গভীর ক্লান্তি-“আমার একটুও ক্ষিদে নেই চন্দ্রিমা। তুমি গিয়ে খেয়ে নাও। আমার গলা দিয়ে আজ কিছু নামবে না।”
সারিমের গলার সেই গভীর আর্তি আর মন খারাপের সুরটা অরির বুকের কোথাও গিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করল। অরি এই প্রথম সারিমকে এত অসহায়, এত বিধ্বস্ত দেখতে পাচ্ছে। যে মানুষটা সবসময় ড্যাম-কেয়ার ভাব নিয়ে ঘোরে, অরির কষ্টের বানানো নোটস বই পুড়িয়ে দেওয়ার মতো আদিম উন্মাদনা দেখাতে পারে-সে আজ তার বাবার দিকে তাকিয়ে ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে কাঁদছে। এই রূপ অরি কোনোদিন দেখেনি।অরি কিছু বলল না। ও সারিমের ঘর থেকে বের হয়ে সোজা নিচে ডাইনিং রুমে চলে গেল। অরি একটা প্লেটে পরিমাণমতো ভাত আর মাংস খুব যত্ন করে বেড়ে নিল। তারপর পানির জগ আর গ্লাসটা সহ একটা ট্রেতে করে খাবারগুলো নিয়ে আবার দুতলায় সারিমের রুমে ফিরে এল। ও আজ সারিমকে না খাইয়ে ছাড়বে না।

সারিম তখনো ওভাবেই চোখ বন্ধ করে সোফায় বসে ছিল। অরি ট্রেটা বারান্দার ছোট টেবিলটার ওপর রাখল।সে ধীর পায়ে সারিমের পাশে সোফায় বসল।প্লেটটা হাতে নিয়ে এক লোকমা ভাত মাংস দিয়ে মেখে সারিমের মুখের সামনে ধরল।সারিম চোখ খুলে চরম অবাক হয়ে অরির দিকে তাকাল। অরির এই নরম, পরম যত্নশীল রূপটা দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এই প্রথম ও ওর চন্দ্রিমার কাছ থেকে এতটা কেয়ার, এতটা আপনত্ব পাচ্ছে। ওর ভেতরের সমস্ত কঠোরতা যেন মুহূর্তেই গলে গেল।”খাবারটা খান! অনেক নাটক করেছেন আজ সারাটা দিন। শরীরটা তো আর লোহা নয় যে না খেয়ে টিকে থাকবে,” অরি অত্যন্ত নরম আদেশসূচক গলায় বলল।

সারিম আর না করতে পারল না।বাচ্চাদের মতো অরির হাত থেকে সেই লোকমাটা মুখে নিল। অরি একে একে নিজের হাতে মাখিয়ে সারিমকে পুরো প্লেটের ভাত খাইয়ে দিল। সারিমের মনে হলো এই খাবারের প্রতিটি দানা যেন ওর ভেতরের সব ক্লান্তি, সব রাগ আর মানসিক অশান্তিকে এক নিমেষে দূর করে দিচ্ছে। ওর মনটা এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর প্রশান্তিতে ভরে গেল। সে অরির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।খাওয়া শেষ হতেই অরি প্লেটটা পাশে রেখে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল। সারিম পানি খেয়ে গ্লাসটা রাখল। তারপর ও যা করল, তার জন্য অরি মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
সারিম সোফা থেকে নেমে সরাসরি মার্বেল মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল।সোফায় বসে থাকা অরির পা দুটো নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোয় জড়ো করল। তারপর নিজের মাথাটা অত্যন্ত আলতো করে অরির কোলের ওপর রেখে দিল। এক অবুঝ, ক্লান্ত বাচ্চার মতো অরির কোলের মাঝে সারিম নিজের মুখটা গুঁজে দিল; যেন এক চিরন্তন আশ্রয়ের সন্ধান পেয়েছে।

“চন্দ্রিমা… আমাকে একটু শান্ত করো। আমার ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আমি আর পারছি না,” সারিমের গলার স্বর কাঁপছিল, সে এক গভীর প্রশান্তি অনুভব করছিল অরির স্পর্শে।
অরি প্রথমে একটু থমকে গেল। ওর শরীরটা শক্ত হয়ে উঠেছিল, কারণ সারিমের এই আচরণে ও অভ্যস্ত নয়। কিন্তু সারিমের এই চরম আত্মসমর্পণ আর ওর ভেতরের হাহাকার দেখে অরির সমস্ত রাগ, সমস্ত ক্ষোভ এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। ও নিজের ডান হাতটা খুব ধীর গতিতে সারিমের ঘন, সিল্কি চুলগুলোর মধ্যে ডুবিয়ে দিল। অরি নিজের আঙুল দিয়ে সারিমের চুলে বিলি কাটতে লাগল, ঠিক যেভাবে একটা মা তার অশান্ত সন্তানকে শান্ত করার জন্য মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সেও ইচ্ছে করেই আজ সারিমকে এই আরামটা দিতে চাইল।
সারিম অরির এই হাতের স্পর্শ পেয়ে এক দীর্ঘ, তৃপ্তির শ্বাস ছাড়ল। ওর মনের সব কষ্ট যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল।চোখ বন্ধ করে ওভাবেই অরির কোলে মাথা রেখে রইল সে। পুরো বারান্দায় তখন শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে আসা রাতের হিমেল বাতাসে শনশন শব্দ।কিছুক্ষণ এই নীরবতা বজায় থাকার পর, অরি সারিমের চুলে হাত বুলাতে বুলাতেই অত্যন্ত গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় প্রশ্ন করল

“সারিম… এবার আমাকে একটা সত্যি কথা বলবেন? কোনো লুকোছাপা ছাড়া?”
সারিম ওভাবেই চোখ বন্ধ করে রইল, ওর গলার স্বর বুজে আসছিল-“কী সত্যি, চন্দ্রিমা?”
“আজ বিয়ে বাড়িতে আপনি যা যা করলেন… জেবাকে যেভাবে বাবার বউ বানিয়ে আনলেন, তার পিছনের আসল সত্যিটা কী? আমি জানি মৃধা আবরার সারিম কখনো কোনো কাজ বিনা কারণে করে না। আপনি নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ওনাকে বাধ্য করেছেন এক অসম বয়সের বিয়েতে সায় দিতে। আপনার কথাতে বাবার ভালো হবে ভেবে আমিও সায় দিতে বাধ্য হয়েছি; ওনার মনটা, ওনার আদর্শটা এক মুহূর্তে ভেঙে দিয়েছি, শুধু আপনার কথা রাখতে। এর পিছনে নিশ্চয়ই এমন কোনো বড় কারণ আছে যা কেউ জানে না। প্লিজ সারিম, আমাকে বলেন। আমি আর এই অন্ধকারে থাকতে পারছি না। আমার দম আটকে যাচ্ছে,” অরির গলার স্বরে এক ব্যাকুলতা আর মিনতি ছিল।
সারিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ও অরির কোলের ওপর নিজের মাথাটা আর একটু শক্ত করে চেপে ধরল, যেন সে নিজের ভেতরের সেই গোপন সত্যটা বলার শক্তি সঞ্চয় করছে। সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর, গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল-
“তুমি ঠিকই ধরেছ চন্দ্রিমা। মৃধা আবরার সারিম কখনো কোনো লসের ব্যবসা করে না, আর কোনো কাজ বিনা কারণেও করে না। আজ বিয়েবাড়িতে আমি যা করেছি, তা যদি না করতাম, তবে হয়তো দুটো জীবন চিরতরে শেষ হয়ে যেত।”

সারিম চোখ খুলল, কিন্তু ও মাথা তুলল না। সে বাগানের ওই শিমুল গাছের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল-
“গতকাল বিকেলে যখন জেবা ডক্টর আয়ুশের চেম্বার থেকে বের হয়ে যায়, তখন সাদমান ওকে দেখে ফেলেছিল। সাদমান আর আয়ুশ একই হসপিটালের কলিগ। সাদমান যখন জানতে পারে জেবা বিগত এক বছর ধরে একজন সাইকোলজিস্টের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছে, ও তখন ওর প্রফেশনাল সিক্রেটের তোয়াক্কা না করে আয়ুশের কাছে সত্যটা জানতে চায়। কারণ জেবা ওর বোনের মতো ছিল, ও জেবাকে কেয়ার করত।”
অরি সারিমের চুলে হাত বোলানো থামিয়ে দিল, ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল
“তারপর? ডক্টর আয়ুশ কী বললেন?”
“ডক্টর আয়ুশ সাদমানকে জেবার সেই মেডিকেল ফাইলের কথা বলে।তিনি বললেন যে জেবা কোনো সাধারণ ডিপ্রেশনের পেশেন্ট নয়। ওর যে সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস, তার নাম হলো ‘প্যাশনেট অবসেসিভ লাভ ডিসঅর্ডার’। জেবা বিগত একটা বছর ধরে বাবার প্রেমে পড়ে নিজের ভেতরটাকে প্রতিদিন শেষ করে দিচ্ছে। নিজের মগজ থেকে বাবার ওই গম্ভীর ইমেজটা ডিলিট করতে পারছে না। জেবা ওনার প্রেমে একপ্রকার অন্ধ হয়ে গেছে। সাদমান যখন এই সত্যটা জানতে পারে, ওর ভেতরের প্রেমিক পুরুষটা এক রাতেই মরে যায় চন্দ্রিমা। ও বুঝতে পারে জেবাকে বিয়ে করা মানে ওর নিজের জীবন তো ধ্বংস হবেই, জেবাও কোনোদিন সুখী হতে পারবে না। কারণ জেবা যার জন্য নিজের হাত রক্তাক্ত করতে পারে, তার জীবনে অন্য কাউকে সে সহ্য করবে না।

সাদমান কাল রাতেই আমাকে ফোন করে।এরপর যখন ফোনে আমাকে জেবার এই অবসেসিভ ভালোবাসার কথা বলছিল, আমি প্রথমে আকাশ থেকে পড়েছিলাম। আমার নিজের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল যে, আঠারো বছরের একটা কচি মেয়ে আমার ওই পঞ্চান্ন বছরের গম্ভীর, খিটঝিটে বাবার প্রেমে পড়েছে! আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো সাময়িক কোনো মোহ বা ইমোশন।”
সারিম একটু থামল, ও অরির হাতটা নিজের গালে আর একটু শক্ত করে চেপে ধরল-
“কিন্তু চন্দ্রিমা… তোমার সঙ্গে রুমে সেই দৃশ্য দেখার পর, আমি রাতে আরও একটা ভয়াবহ দৃশ্য লক্ষ্য করেছিলাম। যা দেখার পর আমার নিজের মগজ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।”
“কী জিনিস? আপনি কী দেখেছিলেন সারিম?” অরি কৌতূহল আর ভয় মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল। ওর বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল।

“রাত দেড়টার দিকে পানি খাওয়ার জন্য নিচে নেমেছিলাম আমি। ড্রয়িংরুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাই, বাবা ড্রয়িংরুমের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝরাতে ওনাকে অন্ধকারে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি বেশ অবাক হই। ওনার সামনে কেউ ছিল না, পুরো ঘর অন্ধকার। কিন্তু বাবা শূন্য হাওয়ার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মায়াভরা,অদ্ভুত গলায় কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন! বারবার বাবা শূন্য বাতাসে হাত বাড়িয়ে কাউকে জড়িয়ে ধরার, ছোঁয়ার চেষ্টা করছিলেন, চন্দ্রিমা!”
অরি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ওর পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। ও ভাবতেই পারছে না আরিশান মৃধার মতো একজন ক্ষমতাধর আর ইস্পাত-কঠিন মানুষ এমন করতে পারেন-
“বাবা… বাবা শূন্য হাওয়ার সাথে কথা বলছিলেন? ওনার কি…”

“হ্যাঁ চন্দ্রিমা,” সারিম এবার অরির কোল থেকে মাথা তুলল। ও সোজা হয়ে বসে অরির দুই হাত নিজের হাতের মধ্যে নিল। ওর চোখে তখন এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক তীক্ষ্ণতা আর কষ্ট-
“আমি বাবার ওই রূপ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমার গা শিউরে উঠেছিল। আমি সাথে সাথে সাদমানকে ফোন করে বাবার এই অদ্ভুত আচরণের কথা জানাই।সাদমানের মনে একটা খটকা লাগে তখন। ও আমাকে বলে-বাবার পারসোনাল ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে ইমিডিয়েটলি। ওনার কোনো বড় মেন্টাল প্রালব্লেম হচ্ছে।’
আমি আর দেরি করিনি। আমি বাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক, ইরফাদ আঙ্কেলকে ফোন করি। ওনাকে অনেক চাপ দেওয়ার পর, ওনি আমাকে বাবার পারসোনাল সাইকিয়াট্রিস্টের নম্বর দেন। বাবা ওনার কাছে সম্পূর্ণ গোপনে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। আমি আর সাদমান কাল রাত তিনটের সময় ওই ডাক্তারের বাসায় যাই। ওনাকে মিনিস্টারের ভয় দেখিয়ে, অফিশিয়াল প্রেশার ক্রিয়েট করে বাবার ফাইলটা চেক করি।”
সারিম একটা ভারী নিশ্বাস ফেলল, ওর গলার স্বর এবার একদম নিচু হয়ে এল-

“চন্দ্রিমা, ডাক্তার বাবার যে ফাইলটা দেখিয়েছে, তা দেখার পর আমার আর সাদমানের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। বাবার রোগটা মারাত্মক… ওনি এখনো মাকে হ্যালুসিনেশন করেন! ওনি ওনার নিজের মনের ভেতর মাকে এক দ্বিতীয় সত্তা বা ‘অল্টার-ইগো’ বানিয়ে ফেলেছেন, যার সাথে ওনি প্রতিদিন রাতে নির্জনে কথা বলেন। ওনি মনে করেন মা এখনো ওনার চারপাশেই আছে-ওনার সাথে খাচ্ছে, ওনার সাথে ঘুমাচ্ছে।”
“এটা এক ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি চন্দ্রিমা। ‘সিভিয়ার ডিসোসিয়েটিভ হ্যালুসিনেশন। এই রোগে মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের ভেতর দুটো সমান্তরাল ক্যারেক্টার প্লে করে। একটা ক্যারেক্টার হলো বাইরের পৃথিবীর জন্য-কঠোর, নীতিবান, লৌহমানব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা। আর অন্য ক্যারেক্টারটা হলো ওনার ঘরের ভেতরের-যেখানে ওনি একাকী, অসহায় এবং ওনি মায়ের হ্যালুসিনেশনের সাথে কাল্পনিক সংসার করছেন।”
“ওনার এসব কিছু হয়েছে শুধু ওনার চরম, অবদমিত একাকীত্ব থেকে। মা চলে যাওয়ার পর গত বারোটা বছর ওনি নিজেকে কোনো নতুন সম্পর্কে জড়াতে দেননি। ওনি নিজের ভেতরের একাকীত্বটাকে একটা লোহার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলেন। ওনি বাইরে যত কঠোর হতেন, ভেতরে ওনি ততটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তেন। আর এই নিঃসঙ্গতার চরম পর্যায়ে ওনার মস্তিষ্ক অবাস্তবকে বাস্তব বলে ধরে নিয়েছে; মাকে হ্যালুসিনেশন করতে শুরু করেছে।”

অরি নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের মুখটা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল-
“বাবা… বাবা! ওনি এত বড় একটা মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আর আমি ওনার ঘরে থেকেও কোনোদিন কিচ্ছু বুঝতে পারিনি! আমি শুধু ওনার গম্ভীর রূপটাই দেখে গেলাম! আমি কতটা স্বার্থপর!”
সারিম অরিকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ও অরির পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলল-
“শান্ত হও চন্দ্রিমা। তুমি কীভাবে বুঝবে? বাবা ওনার এই রোগটা সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এমনকী আমার থেকেও। ডাক্তার পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন-বাবাকে যদি এই একাকীত্ব থেকে বের করে কোনো নতুন সম্পর্কে না জড়ানো যায়, ওনাকে যদি সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখার মতো, ওনার যত্ন নেওয়ার মতো কেউ না থাকে, তবে আস্তে আস্তে ওনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন। ওনার এই হ্যালুসিনেশন ওনার বাস্তব চেতনাকে একদিন সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেবে।”

সারিম অরির মুখটা নিজের দুই হাতের অঞ্জলিতে তুলে ধরল, ওর চোখে তখন এক দৃঢ় বিশ্বাসের আলো-
“এসব শোনার পর আমার আর সাদমানের মনে হলো-একমাত্র জেবাই পারবে বাবাকে এই নরক থেকে টেনে বের করতে। আজ না হলেও কাল যে আরিশান মৃধা জেবার উপর ভালোবাসা আনতে বাধ্য হবেন, সেটার দীর্ঘ মনোবল আমি করে রাখছি। কারণ জেবা বাবাকে ওনার এই মানসিক রোগ সুদ্ধ গ্রহণ করতে পারবে। জেবা বাবাকে কোনো সামাজিক নিয়মের খাতিরে ভালোবাসেনি, ও ওনার ওই কঠোরতা আর একাকীত্ব সুদ্ধ ওনাকে ভালোবেসেছে। জেবা ওনার সেবার অধিকার চায়। আর বাবার এই মরণব্যাধির জন্য ঠিক এমন একজন মানুষেরই প্রয়োজন ছিল, যে ওনাকে ওনার ওই কাল্পনিক হ্যালুসিনেশনের দুনিয়া থেকে টেনে বাস্তবে ফিরিয়ে আনবে। জেবার ভালোবাসার তীব্রতা বাবার ভেতরের ওই কাল্পনিক অল্টার-ইগোকে একদিন মেরে ফেলবে।”
“সেজন্যই সাদমান আর আমি মিলে এই বিয়ের ছকটা করি চন্দ্রিমা। সাদমান নিজেকে এই বিয়ে থেকে সরিয়ে নেয় যাতে জেবা আর বাবার জীবনটা বাঁচে। আর আমি আজ বিয়েবাড়িতে নিজের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে যে নাটকটা করেছি-তা না করলে আমার ওই নীতিবান বাবা নিজের জীবন দিয়ে দিতেন, তাও কোনোদিন এই অসম বিয়েতে সায় দিতেন না। ওনাকে বাধ্য করার আর কোনো পথ আমার কাছে খোলা ছিল না।

আজ আমি সবার চোখে ভিলেন, বাবার চোখে অপরাধী-কিন্তু আমি জানি চন্দ্রিমা, আমি আমার বাবার জীবনটা বাঁচিয়েছি।”বারান্দার টিমটিমে আলো আর শিমুল গাছের পাতার ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াময় আবহের সৃষ্টি করেছে। রাতের নির্জনতা যত গভীর হচ্ছে, চারপাশের বাতাস যেন ততটাই ভারী হয়ে উঠছে। সারিম এতক্ষণ সোজা হয়ে বসে অরির দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছিল, কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক সুদূর অতীত, যা বেদনায় নীল। অরি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সারিমের দিকে। ও বুঝতে পারছে, এই কঠিন, আবেগহীন ও খামখেয়ালী মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটা আজ ওর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টা ওর সামনে মেলে ধরতে চাচ্ছে।
সারিম একটা দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলল। ওর গলার স্বর এবার আরও একটু নিচু, আরও একটু গম্ভীর হয়ে এল।সে অরির হাতের ওপর আলতো চাপ দিয়ে আবার বলতে শুরু করল-
“তুমি হয়তো ভাবছ চন্দ্রিমা, আরিশান মৃধার মতো একজন নীতিবান, কঠোর মানুষ কীভাবে এতটা দুর্বল হয়ে পড়লেন?কীভাবে নিজের মনের ভেতর একটা কাল্পনিক দুনিয়া বানিয়ে বেঁচে আছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমার বাবা আর মায়ের গল্পে।”

সারিম একটু থামল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান, বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল, যা দেখতে উথালপাথাল করা সমুদ্রের মতো শান্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর।
“আমার বাবা-আরিশান মৃধা, আর আমার মা—আনতারা রহমান। ওনারা যখন একে অপরের প্রেমে পড়েন, তখন ওনাদের বয়সটা ছিল বড্ড কাঁচা। তখনো বাবা ক্ষমতার এই চূড়ায় পৌঁছাননি, আর মা-ও ছিলেন এক সাধারণ মেডিকেল স্টুডেন্ট। ওনাদের প্রেমটা কোনো সাধারণ প্রেম ছিল না চন্দ্রিমা; ওটা ছিল এক তীব্র, অবাধ্য এবং সর্বগ্রাসী ভালোবাসা। দুই পরিবারের তীব্র বিরোধিতা ছিল ওনাদের এই সম্পর্কের মাঝে। বংশমর্যাদা আর অহংকারের দেওয়ালে ওনাদের ভালোবাসা বারবার হোঁচট খাচ্ছিল। কিন্তু ওনারা দমে যাননি। এক তীব্র আবেগের বশবর্তী হয়ে, অল্প বয়সেই ওনারা দুজনে মিলে পরিবার ছেড়ে, সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের মায়া ত্যাগ করে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন।”
অরি সারিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ও কল্পনা করার চেষ্টা করল-আজকের এই গম্ভীর, একাকী আরিশান মৃধা একদিন কতটা রোমান্টিক আর সাহসী ছিলেন, যিনি ভালোবাসার জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন।

সারিম বলতে লাগল, “পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর ওনাদের জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না। মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট্ট ভাড়া ঘর, আর ডাল-ভাতের সংস্থান করতেই ওনাদের হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু সেই অভাবের দিনগুলোতেও ওনাদের সংসারে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। বাবা একদিকে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, অন্যদিকে টিউশনি আর ছোটখাটো পার্ট-টাইম চাকরি করে সংসার টানতেন। আর মা-ও নিজের মেডিকেল কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি ঘরের সব কাজ সামলাতেন। বাবা প্রায়ই আমাকে বলতেন, সেই দিনগুলোতে নাকি ওনারা এক কাপ চা দুজনে ভাগ করে খেতেন, কিন্তু সেই চায়ের কাপে যে সুখ ছিল, তা আজকের এই বিশাল রাজপ্রাসাদেও নেই। ওনাদের সেই ত্যাগ, সেই কঠোর পরিশ্রমের মাঝেই একদিন আমার জন্ম হয়-মৃধা আবরার সারিম। আমার জন্মের পর ওনাদের সেই ছোট সংসারটা যেন একটা পূর্ণতা পেয়েছিল। মা ডাক্তার হলেন, বাবাও নিজের মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে আস্তে আস্তে রাজনীতির দিকে পা বাড়ালেন। অভাব দূর হলো, প্রতিষ্ঠা এল, কিন্তু ওনাদের ভেতরের সেই আদিম, নিখাদ ভালোবাসাটা একদম একই রকম রয়ে গেল। অন্তত আমি আমার শৈশবের বারো-তেরোটা বছর ওনাদের ঠিক এভাবেই দেখে এসেছি।”

বলতে বলতে সারিমের গলার স্বর হঠাৎ করেই শক্ত হয়ে এল। ওর চোয়াল দুটো দৃঢ় হলো, চোখ জোড়ায় ফুটে উঠল এক চরম বিতৃষ্ণা আর যন্ত্রণার ছাপ। ও অরির হাতটা নিজের গালের সাথে আর একটু জোরে চেপে ধরে বলল
“কিন্তু চন্দ্রিমা, নিয়তি হয়তো ওনাদের এই নিখাদ সুখ সহ্য করতে পারেনি। অথবা মানুষের মন বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবর্তনশীল এবং বিশ্বাসঘাতক জিনিস। আমার বয়স যখন ঠিক বারো কি তেরো-আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি—ঠিক তখন থেকেই আমি লক্ষ্য করতে লাগলাম, আমাদের ঘরের ভেতরের বাতাসটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। মায়ের ব্যবহার বাবার প্রতি দিন দিন খুব অদ্ভুত উপায়ে পাল্টাতে শুরু করল। যে মা বাবা অফিস থেকে ফেরার আগে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতেন, সেই মা এখন বাবার উপস্থিতিতেও চরম উদাসীন। বাবার সাথে কথা বলা তো দূর, ওনার দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করতেন না। বাবা প্রথম প্রথম ভেবেছিলেন, হসপিটালের কাজের অতিরিক্ত চাপ, নাইট ডিউটি আর পেশাগত স্ট্রেসের কারণেই হয়তো মা এমন খিটখিটে আর নিস্পৃহ হয়ে গেছেন। বাবা ওনাকে আরও বেশি স্পেস দিতে চাইলেন, ওনার প্রতি যত্ন আরও বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু দূরত্ব কমার বদলে দিন দিন তা এক বিশাল খাদের মতো রূপ নিতে লাগল।”

অরি নিঃশব্দে শুনছিল। একটা সাজানো-গোছানো সুখী পরিবারের ভাঙনের গল্প সবসময়ই বড্ড নির্মম হয়। ও সারিমের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল, যেন ও সারিমকে বোঝাতে চাইল-সে আছে ওর পাশে।
সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাবা তো সাধারণ কোনো মানুষ ছিলেন না, ওনার তীক্ষ্ণ চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ ছিল না। মায়ের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন যখন ওনার সহ্যসীমা পার করে গেল, তখন ওনি গোপনে মায়ের খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলেন। আর সেই খোঁজ নিতে গিয়েই ওনার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। বাবা সেদিন জানতে পারলেন-যে তারার পবিত্রতার ওপর ওনার আজন্মের বিশ্বাস ছিল, যে তারাকে ওনি নিজের সবকিছু ভাবতেন, সেই তারা হসপিটালেরই অন্য এক তরুণ কলিগের সাথে এক পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন! মায়ের চেয়ে বয়সে বেশ ছোট ছিল লোকটা। নিষিদ্ধ অ্যাফেয়ার চলছিল ওনাদের মাঝে।”

অরি চমকে উঠল। ও নিজের মুখটা চেপে ধরল বিস্ময়ে। আনতারা মৃধার মতো একজন মহীয়সী নারী, যার ছবি এখনো এই বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে শ্রদ্ধার সাথে ঝুলে আছে, ওনি এমন একটা কাজ করতে পেরেছিলেন?
“হ্যাঁ চন্দ্রিমা, এটাই চরম এবং নির্মম সত্য ছিল,” সারিমের গলায় এক অদ্ভুত নিস্পৃহতা ফুটে উঠল। “এই সত্যটা জানার পর বাবার মনটা এক মুহূর্তে কাঁচের মতো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। যে মানুষটার পুরো পৃথিবী গড়ে উঠেছিল তার তারাকে কেন্দ্র করে, সেই মানুষটা জানতে পারলেন ওনার পৃথিবীটাই আসলে এক মরীচিকা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? বাবা এত বড় একটা আঘাত পাওয়ার পরেও, মায়ের ওপর কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি, ওনাকে গায়ে হাত তোলা বা ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভাবেননি। ওনি মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এক ভিখারীর মতো। ওনি মাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন, ওনার পা দুটো ধরে কেঁদেছিলেন।বাবা ওনার সমস্ত পুরুষালি সত্তা, সামাজিক মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে মায়ের সামনে আকুতি-মিনতি করেছিলেন শুধু ওনাকে নিজের কাছে ধরে রাখার জন্য।”

সারিম চোখ বন্ধ করল, যেন সেই অতীতের দৃশ্যগুলো এখনো ওর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে।
“কিন্তু মা শোনেননি। ভালোবাসার সেই তীব্র অন্ধত্ব মাকে এতটাই গ্রাস করেছিল যে, ওনার সামনে নিজের স্বামীর এই কান্না, নিজের সন্তানের নিষ্পাপ মুখ-কোনো কিছুই আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মা বাবার সাথে একই ছাদের নিচে থাকার পরেও, গোপনে সেই লোকটার সাথে ফিজিক্যাল রিলেশন এ জড়িয়েছেন। ভাবো একবার, একটা পুরুষ মানুষের পক্ষে এটা কতটা জঘন্য এবং যন্ত্রণাদায়ক! যে স্ত্রীকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, সে প্রতি রাতে অন্য একটা পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হচ্ছে-এটা জানার পরেও বাবা ওনাকে নিজের ঘরে জায়গা দিয়েছিলেন। শুধু এই আশায়, যদি মায়ের ভুল কোনোদিন ভেঙে যায়। এর মাঝে একবার সেই প্রেমিক লোকটা মাকে ধোঁকা দিয়েছিল, ওনাকে একা ফেলে চলে গিয়েছিল। মা তখন বিধ্বস্ত হয়ে আবার বাবার কাছে ফিরে এসেছিলেন। বাবা ওনাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, ওনার চোখের জল মুছে দিয়েছিলেন। কোনোদিন একটা তপ্ত কথাও ওনাকে বলেননি। বাবা মাকে এতটাই ভালোবাসতো যে ওনাকে কোনোদিন ঘৃণা করতে পারেননি।”

অরির চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।সে আরিশান মৃধার এই অবদমিত কষ্টটা নিজের বুকের ভেতর অনুভব করতে পারছে। যে মানুষটা বাইরে এত শক্ত, সে ভেতরে কতটা রক্তাক্ত হয়ে বেঁচে ছিল এতগুলো বছর!
সারিম বলতে লাগল,
“কিন্তু মায়ের সেই সুমতি বেশিদিন টেকেনি। সেই প্রেমিক লোকটা প্রায় ছয় বছর পর আবার মায়ের জীবনে ফিরে আসে। আর এবার মায়ের ভেতরের সেই অবাধ্য ইচ্ছেটা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। মা এবার আর কোনো লুকোচুরি করলেন না। একদিন সাতসকালে আমার আর বাবার জীবনের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়ে, ওনার যাবতীয় সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সেই লোকটার সাথে একেবারে চলে গেলেন। আমাদের চিরতরে ছেড়ে, এক কাপড়ে মা ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। আমি তখন সবেমাত্র কলেজে উঠেছি। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখা আমার সেই বয়সটাতে চোখের সামনে নিজের মাকে এভাবে অন্য একজনের হাত ধরে চলে যেতে দেখা-আমার ভেতরের পুরো জগতটাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল।”
সারিম এবার অরির কোলের ওপর নিজের মাথাটা খুব আলতো করে রেখে দিল। এক অবুঝ, ক্লান্ত বাচ্চার মতো অরির কোলে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে ও বলতে লাগল-

“মা চলে যাওয়ার পর বাবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। ওনি ঘরের দরজা বন্ধ করে দিনের পর দিন পড়ে থাকতেন। কিন্তু… অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? বাবা তখনো মাকে ঘৃণা করতে পারেননি। ওনি প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত মায়ের জন্য অপেক্ষা করতেন। ওনার মনে হতো-মা হয়তো আবার ভুল বুঝতে পেরে ওনার এই আরিশানের বুকেই ফিরে আসবে। ওনার সেই অন্ধ ভালোবাসার ওপর থেকে আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। কিন্তু বাবার সেই অপেক্ষা আর ফুরায়নি। মা ফিরেছিলেন… তবে জীবন্ত নয়, লাশ হয়ে। মা চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই একদিন ওনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। সেই লোকটা, যার জন্য মা নিজের স্বামী-সন্তান, সংসার সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন-সে ছিল আসলে এক চরম সাইকোপ্যাথ আর লোভী পিশাচ। মায়ের সমস্ত সম্পত্তি আর টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে, সে মায়ের ওপর চরম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার শুরু করে। দিনের পর দিন মাকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রেখে নির্মমভাবে পেটাতো। আর একদিন সেই অত্যাচারের চরম পর্যায়ে মা মারা যান।”

অরি আতঙ্কে শিউরে উঠল। ও সারিমের চুলে নিজের আঙুলগুলো আরও শক্ত করে চেপে ধরল। সারিমের গলার স্বর এখন কাঁপছে, এক তীব্র চাপা কান্না যেন ওর বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠছে।
“বাবা যখন মায়ের এই করুণ পরিণতির কথা জানতে পারেন, ওনি নিজের সমস্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন। ওনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই নরপিশাচ লোকটাকে আইনের খাঁচায় পুরেছিলেন এবং থার্ড ডিগ্রি টর্চার নিশ্চিত করেছিলেন। ওনার ক্ষমতার জোরে সেই লোকটাকে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ ছিল। লোকটা জেলের ভেতরেই ধুকে ধুকে মরেছে। বাবা ওনার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওনার ভেতরের সেই আরিশান মৃধা ওইদিনই চিরতরে মরে গিয়েছিলেন। যে মানুষটা নিজের স্ত্রীর অপেক্ষায় বুক বেঁধেছিলেন, সে যখন জানল যে তার ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য একজন এভাবে অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে-ওনার ভালোবাসার ওপর থেকে, এই পৃথিবীর ওপর থেকে সমস্ত বিশ্বাস উঠে গেল। ওনি নিজের চারপাশে এক বিশাল, দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে নিলেন। বাইরের পৃথিবীর জন্য ওনি হয়ে উঠলেন এক কঠোর, অনুভূতিহীন লৌহমানব। আর ঘরের ভেতরে… ওনি নিজের একাকীত্ব সহ্য করতে না পেরে মায়ের সেই পুরোনো স্মৃতিগুলোকে হ্যালুসিনেশন করতে শুরু করলেন। ওনি ওনার নিজের মনের ভেতর মায়ের একটা ভালো রূপ, সেই পুরোনো আনতারাকে জ্যান্ত করে তুলে ওনার সাথে কথা বলতে লাগলেন। কারণ বাস্তব আনতারার সেই চরম প্রতারণা আর নির্মম মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো ক্ষমতা বাবার এই মস্তিষ্কের ছিল না।”
সারিম একটু থামল। ও একটা গভীর শ্বাস নিয়ে অত্যন্ত ফিসফিস করে বলল

“আর সবচেয়ে বড় সত্যিটা কী জানো চন্দ্রিমা? আমি আজো আমার মাকে ঘৃণা করতে পারি না। যতই হোক, ওনি তো আমার জন্মদাত্রী মা। ওনার হাত ধরেই তো আমি এই পৃথিবীতে এসেছি। ওনার সেই অপরাধ, ওনার সেই প্রতারণা যেমন সত্যি; ওনার কোলে মাথা রেখে আমার বেড়ে ওঠার শৈশবটাও তো সত্যি। আমি ওনাকে ঘৃণা করতে পারি না, আর বাবাও ওনাকে ভুলতে পারেন না। এই এক তীব্র বৈপরীত্যের মাঝে আমারা প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি।”

এসব বলতে বলতে সারিমের গলার স্বর আস্তে আস্তে বুজে এল। সারাদিনের তীব্র মানসিক ঝড়,নিজের জীবনের সবচেয়ে গোপন ও রক্তাক্ত ক্ষতটা অরির সামনে মেলে ধরার পর-ওর শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন শেষ হয়ে গেছে। সারিম আস্তে আস্তে ওর এক হাত দিয়ে অরির পা দুটো আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন ও এই পৃথিবীর একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়টাকে কোনোমতেই হারাতে চায় না। আর অপর হাতটা অরির কোলের ওপর আলতো করে রেখে,ওর কোলের মাঝে নিজের মুখটা সম্পূর্ণ গুঁজে দিয়ে ও নিথর হয়ে রইল।
অরি এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সারিমের প্রতিটি কথা শুনছিল। ওর চোখের জল সারিমের শার্টের কাঁধ ভিজিয়ে দিয়েছে।সে এতদিনে বুঝতে পারল-কেন সারিম এতটা খামখেয়ালী, কেন সে চট করে কাউকে নিজের জীবনে জড়াতে চায় না, আর কেন সে আজ নিজের বাবার জীবন বাঁচাতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সারিম কোনো ভিলেন নয়; সে আসলে এক চরম বিধ্বস্ত, পিতৃভক্ত ছেলে-যে নিজের বাবাকে সম্পূর্ণ মানসিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে এই ভয়ঙ্কর জুয়াটা খেলেছে।
অরির মনের ভেতর জমে থাকা সারিমের প্রতি সমস্ত ক্ষোভ, সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি আর অভিমান এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল। ওর মনে এখন সারিমের জন্য কোনো দ্বিধা নেই,

অরি ও খুব ধীর গতিতে নিজের দুই হাত সারিমের পিঠের ওপর রাখল। ওর ডান হাতের আঙুলগুলো পরম মমতায় সারিমের ঘন, সিল্কি চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিল। খুব আলতো করে, পরম যত্নে সারিমের মাথায় বিলি কাটতে লাগল।ঠিক যেভাবে একজন প্রেমিকা তার সমস্ত সত্তা দিয়ে তার পুরুষকে আগলে রাখে।
সারিম অরির এই নিঃশর্ত, পরম ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে এক দীর্ঘ, পরম তৃপ্তির শ্বাস ছাড়ল। ওর শক্ত হয়ে থাকা শরীরের পেশীগুলো আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এল।মনের ভেতরের সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড়টা যেন অরির এই আঙুলের ছোঁয়ায় এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সারিমের শ্বাস-প্রশ্বাস একদম স্বাভাবিক আর গভীর হয়ে এল।সে অরির কোলে মাথা রেখে, এক নিষ্পাপ শিশুর মতো গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
অরিও সেভাবেই বসে রইল। বারান্দার বাইরে তাকাল। বাগানের সেই বিশাল শিমুল গাছটা এখনো অন্ধকারের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে আছে, আর তার নিচে বেঞ্চে বসা আরিশান মৃধার অবয়বটা এখন আর ততটা ভয়াল লাগছে না। অরির মনে হলো-জেবা হয়তো সত্যিই পারবে এই পরিবারে আবার আলো ফিরিয়ে আনতে। যে মেয়ে আরিশান মৃধাকে তার সমস্ত অন্ধকার সুদ্ধ ভালোবাসতে পারে, সে-ই পারবে ওনার এই মরণব্যাধি দূর করতে।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৯ (২)

সারিমের চুলে বিলি কাটতে কাটতে অরির নিজের চোখের পাতাও দিনভরের ক্লান্তিতে ভারী হয়ে আসছিল। সে আর নিজের মাথাটা সোজা রাখতে পারছিল না। সোফার পেছনের দেওয়ালে নিজের মাথাটা হেলিয়ে দিল। ওর হাতটা তখনও সারিমের চুলে স্তব্ধ হয়ে আছে। রাতের শেষ প্রহরের হিমেল বাতাস , সারিমকে নিজের কোলের মাঝে আগলে রেখে, অরি নিজেও আস্তে আস্তে এক গভীর, শান্তিময় ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here