ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১১
মেহজাবিন নাদিয়া
ভোরের আলো ফুটে ওঠার সাথে সাথে রাতের অমানিশা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো জানালার পর্দা চুঁইয়ে ঘরে প্রবেশ করছে,যেন রাতের সব হাহাকার এক মায়াবী চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।
অরির যখন ঘুম ভাঙল, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করল নরম কম্বলের ওমে। ঘরটা মৃদু আলো-আঁধারিতে আচ্ছন্ন, জানালার ভারী পর্দাগুলো টানা। অরি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতের প্রতিটি মুহূর্ত যেন সিনেমার রিল হয়ে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। সারিমের সেই আকুলতা, ওর কোলে মাথা রেখে এক অবুঝ শিশুর মতো আত্মসমর্পণ, আর সেই বুক কাঁপানো অতীতের গল্প-সবই কি তবে স্বপ্ন ছিল?
অরি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। শরীরে গতরাতের ধকলের তীব্র ক্লান্তি। চারপাশটা ভালো করে দেখল সে, ঘর একদম ফাঁকা। সারিমের কোনো চিহ্ন নেই। তবে ও বিছানায় এল কীভাবে? সারিমই কি ওকে সোফা থেকে তুলে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল? ভাবতেই অরির বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত দোলায় কেঁপে উঠল। মানুষটা গোপনে এতখানি যত্ন করতেও জানে!
কিন্তু নিজের ভাবনায় বেশিক্ষণ মগ্ন থাকতে পারল না অরি। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকানোর সাথে সাথেই ওর চোখ দুটো কপালে উঠল। ঘড়ির কাঁটা স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে-সকাল সাড়ে নয়টা বেজে গেছে!
”হায় আল্লাহ! সাড়ে নয়টা!”
অরি একপ্রকার চিৎকার করেই বিছানা ছাড়ল।
ওর মাথা তখন ভোঁ ভোঁ করছে। ঠিক দশটায় ওর এবং জেবার কোচিং ক্লাস। সামনেই জীবনের —মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। এই সময়ে একটা ক্লাস মিস দেওয়া মানে আত্মহত্যার শামিল। জেবার কথা মনে হতেই অরি দৌড়ে নিজের রুমের দিকে গেল, আশা ছিল জেবা হয়তো এতক্ষণে তৈরি হয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু অরি ধপাস করে রুমের দরজা খুলল,ভেতরের দৃশ্য দেখে ওর মুখের চোয়াল ঝুলে গেল।
রুমের মাঝখানে খাটের ওপর জেবা শুয়ে আছে। পুরো খাট জুড়ে হাত-পা ছড়িয়ে, কোলবালিশটা এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে যেন গতরাতে কোনো ঝড়ই বয়ে যায়নি! সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, কোচিংয়ের চিন্তা-সবকিছু ভুলে ও যেন কুম্ভকর্ণের মতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চাদরটা মেঝেতে লুটাচ্ছে, আর ওর চুলগুলো খাটের চাদরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
অরি খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জেবার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বেশ জোরেই ডাকল,
“এই জেবা! ওঠ! জেবা বলছি ওঠ! প্রায় ১০টা বাজে! কোচিংয়ে যাবি না?”
জেবা কোনো উত্তর দিল না। শুধু একটা মৃদু ‘উঁহু’ শব্দ করে কোলবালিশটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওপাশ ফিরে শুলো।
”বাদামনী, ইয়ার্কি করিস না, পরেও এসে ঘুমানো যাবে, সময়মতো না গেলে কোচিংয়ের ভাইয়া আজকে ক্লাসে ঢুকতে দেবে না। তাড়াতাড়ি ওঠ বলছি!” অরি জেবার কাঁধ ধরে বেশ ভালো রকম এক ঝাঁকুনি দিল।
জেবা চোখ না খুলেই অত্যন্ত বিরক্ত এবং ঘুম জড়ানো গলায় বিড়বিড় করল,
“অরির বাচ্চা… ডিস্টার্ব করিস না তো। আর মাত্র পাঁচটা মিনিট ঘুমাতে দে। প্লিজ দোস্ত…”
”পাঁচ মিনিট? তোর এই পাঁচ মিনিটের চক্করে ভবিষ্যৎ কয়লা হয়ে যাবে! সামনে মেডিকেল পরীক্ষা সেটা মনে নেই? ওঠ বলছি!” অরি এক হেঁচকায় জেবার গায়ের চাদরটা নিচে ফেলে দিল।
কিন্তু জেবা যেন আজ প্রতিজ্ঞা করে ঘুমাচ্ছে। চাদর ছাড়াও সে অবলীলায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইল
“আরেকটু… জাস্ট আর একটু…”
অরির ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। অরি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের ডান পা টা তুলল এবং সজোরে এক লাথি মারল জেবার কোমরের নিচে।ধপাস!
তীব্র বেগে খাট থেকে গড়িয়ে জেবা সরাসরি মার্বেল মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। মেঝের শক্ত স্পর্শে ওর ঘুম এক লহমায় উধাও হয়ে গেল।ও চোখ বড় বড় করে, কোমরে হাত দিয়ে মেঝের ওপর বসে চেঁচিয়ে উঠল,
“আউচ! মাগো! কোমরটা গেল আমার! অরির বাচ্চা, তুই পাগল হয়ে গেছিস? একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ওভাবে খাট থেকে লাথি মেরে ফেলে দিলি?”
অরি কোমরে দু হাত দিয়ে ওল্টো ধমক লাগাল,
“হ্যাঁ দিয়েছি! ভালো করেছি! তোর দেখি বিয়ে হয়েছে বলে লেখাপড়া একদম চাঙ্গে তুলে রেখেছিস!দ্রুত গিয়ে রেডি হ, কোচিংয়ে যেতে হবে!”
জেবা মেঝের ওপর বসেই নিজের টিশার্ট ঠিক করতে করতে মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে বলল,
“তোর কি দয়ামায়া বলতে কিছু নেই রে অরি? কাল আমার ওপর দিয়ে কত বড় ঝড় গেল! নিজের বাপের বাড়ি থেকে বিতারিত হলাম, একটা অচেনা সম্পর্কে জড়িয়ে গেলাম… আর তুই কি না সকাল সকাল এসে আমাকে লাথি মারছিস?”
”ঝড় কাল গেছে, আজকে সকালের আকাশ পরিষ্কার! আর সেই পরিষ্কার আকাশে এখন ১০টার সূর্য উঁকি দিচ্ছে। আর কুড়ি মিনিট বাকি আছে। তুই যদি আর এক সেকেন্ড এখানে বসে ঘ্যানঘ্যান করিস, আমি কিন্তু তোকে ছাড়াই চলে যাব!”
বলেই অরি আর এক মুহূর্ত নষ্ট না করে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
জেবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। অরিকে মনে মনে গালমন্দ করতে সে ভুলল না। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসার পর অরি পড়ার টেবিল থেকে রিডিং গ্লাসটা তুলে চোখে পরল। গ্লাসটা পরতেই ওর চেহারায় এক চটজলদি সিরিয়াস ভাব চলে এল। এরপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পিঠসমান লম্বা, হালকা বাদামী রঙের চুলগুলোকে মুঠোয় এনে একটা শক্ত ঝুঁটি বেঁধে নিল।
আলমারি খুলে সাধারণ একটা শার্ট আর জিন্সের প্লাজো পরে নিল। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় নোটস, কলমদানি আর প্রশ্নব্যাংকগুলো গুছিয়ে ঢুকিয়ে নিল। ঘড়িতে তখন ৯টা ৪৫।
ঠিক তখনই ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে জেবা,পরনে সালোয়ার-কামিজ পরা, ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। তবে ওর মুখে এখনো ঘুম জড়ানো ভাব আর অরির প্রতি একরাশ অভিমান স্পষ্ট। জেবা খাটের কোণে বসে গলা খাঁকারি দিল। পিঠটা সোজা করে বসতে গিয়ে হঠাৎ করেই ওর ভঙ্গিতে কেমন এক কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটে উঠল।
অরি ব্যাগের চেইন আটকাতে আটকাতে না তাকিয়েই বলল,
“হলো তোর? জলদি চল, অলরেডি অনেক লেট হয়ে গেছে।”
জেবা এবার নড়েচড়ে বসল। নিজের গলার স্বরটা একটু ভারী করে বলল,
“শোন অরি… তোকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলার আছে। একটু মনোযোগ দিয়ে শোন।”
অরি বিরক্ত হয়ে তাকাল, “কী গুরুত্বপূর্ণ কথা? তাড়াতাড়ি বল।”
জেবা ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে, অরির দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“দেখ অরি, কাল রাতে যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। আইনত, সামাজিকভাবে এবং ধর্মীয়ভাবে এখন আমি এই বাড়ির একজন সদস্য। সেই সূত্রে, তুই একবারও ভেবে দেখেছিস আমি এখন তোর কী হই?”
অরি ভুরু কুঁচকে তাকাল, “কী আবল-তাবল বলছিস?”
”আবল-তাবল নয়, খাঁটি সত্য!” জেবা একটু বুক ফুলিয়ে বলল,
“সম্পর্কের হিসাবে আমি এখন দেশের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার বৈধ স্ত্রী। অর্থাৎ, আমি এখন এই বাড়ির কর্ত্রী। সেই হিসেবে… আমি এখন সম্পর্কে তোর নিজস্ব ‘শাশুড়ি মা’ হই! বুঝলি কিছু?”
অরি স্তব্ধ হয়ে জেবার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখ দুটো চশমার আড়াল থেকে আরও বড় হয়ে গেল। জেবা ভেবেছিল অরি হয়তো এই অকাট্য যুক্তি শুনে থতমত খেয়ে যাবে, তাই সে আরও একটু গুছিয়ে নিয়ে বলল,
“তাই বলছি… তুই যেভাবে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিলি, একজন শাশুড়ির সাথে কি এমন ব্যবহার শোভা পায়? এখন থেকে অন্তত একটু সম্মান দিয়ে কথা বলা উচিত তোর।”
জেবার কথা শেষ হয়নি, অরির ভেতরের বারুদ তখন ফেটে পড়ার অপেক্ষায়।
”শাশুড়ি মা? সম্মান?” অরি দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
অরি ব্যাগটা খাটের ওপর ছুঁড়ে ফেলল। ধীর পায়ে জেবার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ওর চোখের বিপজ্জনক চাউনি দেখে জেবা কিছুটা ভড়কে গিয়ে খাটের ওপর পিছাতে লাগল।
“এই… অরি, তুই ওভাবে আসছিস কেন? আমি তো জাস্ট সম্পর্কের সত্যিটা…”
”তোর শাশুড়ি গিরি আমি আজকে ছুটিয়ে ছাড়ছি!”
বলেই অরি ঝাঁপিয়ে পড়ল জেবার ওপর। খাটের ওপর চেপে ধরে জেবার পিঠে ঠাস ঠাস করে দুটো কিল বসিয়ে দিল।
”আউচ! মাগো! মেরে ফেলল রে!” জেবা চিৎকার করে উঠল।
”কত বড় সাহস! আমার সামনে এসে শাশুড়ি গিরি ফলাচ্ছিস? তুই আমার বান্ধবী, বান্ধবীই থাকবি! বেশি পেকেছিস না? পরীক্ষার পড়া মাথায় নেই, শাশুড়ি সেজে সম্মান নিতে এসেছে!” অরি জেবার চুল ধরে একটু টান দিল।
জেবাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নয়। সে-ও ঘুরে দাঁড়িয়ে অরির শার্টের কলার চেপে ধরল,
“এই অরি! তুই কিন্তু বেশি করছিস! আমি কি মিথ্যা বলেছি? আমি তোর শ্বশুরের বউ, আমি তোর শাশুড়ি হব না তো কে হবে?”
”আবার শাশুড়ি বলিস! তোকে আজকে আমি মেরেই ফেলব!”
অরি জেবার হাতটা মোচড় দেওয়ার চেষ্টা করল।
”ছাড়! তুই ছাড় আগে!” জেবাও পা দিয়ে অরিকে ধাক্কা মারল।
দুই বান্ধবীর মধ্যে খাটের ওপর শুরু হলো তুমুল লড়াই। একজন চুল টানছে, অন্যজন কোলবালিশ দিয়ে মারছে। জেবা যতই শাশুড়ি পদের দোহাই দিক না কেন, অরির শক্ত হাতের মারের সামনে ওর গাম্ভীর্য ধুলোয় মিশে গেল। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে খাটের দুই কোণে গিয়ে বসল। দুজনেরই চুল উস্কোখুস্কো, জামাকাপড় এলোমেলো।
অরি হাঁপাতে হাঁপাতে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল—৯টা বেজে ৫২ মিনিট!
”সর্বনাশ! আর মাত্র আট মিনিট!”
অরি চিৎকার করে উঠল, “তোর ওই ফালতু শাশুড়ি গিরির চক্করে আজকে সত্যি ক্লাস মিস হবে! তাড়াতাড়ি নিচে চল!”
জেবাও সময় নষ্ট না করে কোনোমতে ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে অরির পেছনে দৌড়ে বের হলো। দুইজনে সিঁড়ি বেয়ে ঝড়ো গতিতে নিচে নামতে লাগল, ওদের পায়ের ধুপধাপ শব্দে যেন বাড়িটা কেঁপে উঠল।
নিচে ডাইনিং রুমের সামনে আসতেই দেখা হলো শাহীন মিয়ার সাথে। হাতে পানির জগ নিয়ে তিনি ডাইনিং টেবিলের দিকে যাচ্ছিলেন। দুই তরুণীকে ওভাবে হুলস্থুল করে নামতে দেখে তিনি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
অরি ড্রইংরুমের কাছে এসে গতি কমাল। ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করতে করতে হাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আঙ্কেল! বাবা আর সারিম কোথায়?”
শাহীন মিয়া একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত বিনীত স্বরে বললেন,
“ওনারা কেউ বাড়িতে নেই। বড় স্যার আর ছোট স্যার দুজনেই খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অফিসের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেছেন।”
শাহীন মিয়ার কথা শুনে অরি আর জেবা একে অপরের দিকে তাকাল। জেবার চোখে এক মুহূর্তের জন্য তীব্র হতাশা আর অপরাধবোধ ফুটে উঠল। সে হয়তো আশা করেছিল আরিশান মৃধার মুখোমুখি হবে, ওনার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখবে। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে ওনার অফিসে চলে যাওয়াটা যেন এক নীরব অবহেলার মতো শোনাল।অরি অবশ্য মনে মনে কিছুটা স্বস্তি পেল। সারিম যে সকালে উঠে নিজের কাজে মন দিতে পেরেছে, এটাই বড় ব্যাপার। অরি শাহীন মিয়াকে বলল,
“আচ্ছা আঙ্কেল, আমরা কোচিংয়ে যাচ্ছি। ফিরতে বিকেল হবে।”
”সাবধানে যাবেন। টেবিলে নাস্তা রেডি আছে, দুটো মুখে দিয়ে গেলে ভালো হতো না?” শাহীন মিয়া পেছন থেকে বললেন।
”সময় নেই আঙ্কেল, পরে খেয়ে নেব!” বলেই অরি জেবার হাত ধরে সদর দরজার দিকে টানল।
ক্লান্তিতে, অবসাদে আর তীব্র ভ্যাপসা গরমে অরির কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। আকাশটা আজ সকাল থেকেই তামাটে রঙ ধারণ করে আছে, যেন কোনো এক বিশাল চুল্লির ঢাকনা টেনে দেওয়া হয়েছে শহরের মাথার ওপর। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ এত বেশি যে শ্বাস নিতে গেলে ফুসফুস ভারী হয়ে আসে। শার্টের হাতাটা টেনে ও কপালের ডান পাশটা চেপে ধরল। বিন্দু বিন্দু জমে থাকা নোনতা ঘামটুকু কাপড়ের নীলিমায় শোষিত হতেই এক দীর্ঘ, তপ্ত নিশ্বাস ফেলল।
মেডিকেল পরীক্ষার দিনটা যত এগিয়ে আসছে, ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো যেন তত দ্রুত,গতিতে ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোচিং সেন্টারের মডেল টেস্টগুলোর প্রশ্নের মান যেন দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আজকেও প্রায় আড়াই ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে হল থেকে বের হলো অরি,ওর মাথাটা রীতিমতো ঝিমঝিম করছিল। চোখের সামনে চারপাশের চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন দুলছে। অরি চোখের ওপর চেপে বসা রিডিং গ্লাসটা আলতো করে নাক থেকে সামান্য নামিয়ে আনল। দুই আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের কোণ দুটোকে একটু ম্যাসাজ করে চোখ দুটোকে একটু আরাম দেওয়ার চেষ্টা করল ও।
ওর ঠিক পাশেই গুটিগুটি পায়ে, প্রায় মাটির সাথে জুতো ঘষে হেঁটে আসছিল জেবা। জেবার ডান বগলে তখনও চেপে ধরা বায়োলজি আর কেমিস্ট্রির মোটা মোটা প্রশ্নব্যাংক। পেপারব্যাকের কোণগুলো ওর ঘামে ভিজে কিছুটা কুঁচকে গেছে। জেবার ফর্সা, ডালিম ফুলের মতো মুখটা এই ভরদুপুরের রোদে পুড়ে একদম তামাটে, রক্তাভ বর্ণ ধারণ করেছে।ক্লান্ত, ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলল,
“অরি, আর পারছি না দোস্ত। মনে হচ্ছে ব্রেনটা একদম ফ্রাইড রাইস হয়ে গেছে। বাড়ি যাব, পেটটা ক্ষিধায় একদম চোঁ চোঁ করছে আমার। চল, জলদি গিয়ে গাড়িতে উঠি। এই রোদের মধ্যে আর এক সেকেন্ড দাঁড়ায়ে থাকলে আমি নির্ঘাত রাস্তায় ফিট খায়ে পড়ে যাব।”
অরি ওর দিকে তাকিয়ে একটা মলিন, শুষ্ক হাসি দিল। ওর নিজের ভেতরের শক্তিও তখন তলানিতে। ও ম্লান গলায় বলল,
“চল। তবে একটা শর্ত আছে। ড্রাইভিং সিটে কিন্তু আজ আমি বসব। অনেকদিন হলো স্টিয়ারিং ধরি না। এই মেন্টাল প্রেশারের মধ্যে একটু ড্রাইভ করলে হয়তো মাথার জটটা খুলবে।”
জেবা একটা দীর্ঘ হাই তুলতে তুলতে নিজের ব্যাগটা অন্য কাঁধে নিল। ক্লান্তিতে ওর চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে এসেছে।বলল,
“নে বাবা তুই-ই বোস। আমার হাত-পা এমনিতেই কাঁপছে। তুই গাড়ি চালালে আমি অন্তত সিটে একটু চোখটা বন্ধ করে থাকতে পারব। জলদি চল।”
দুই বান্ধবী কোচিং সেন্টারের মেইন গেটের লোহার জালি গলে ফুটপাতে এসে দাঁড়াল। মাথার ওপর তপ্ত সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে। চারপাশের কোলাহল, রিকশার টুংটাং আর বাসের তীব্র হর্ন—সব মিলিয়ে একটা গুলজার অবস্থা। ওরা ফুটপাথ ধরে পার্কিং লটের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের সমস্ত স্বাভাবিক কোলাহলকে এক নিমেষে ছাপিয়ে একটা বিকট, কানফাটানো ব্রেকের শব্দ হলো।
‘কিঁইইইইইচ!’
শব্দটা এত তীব্র আর আকস্মিক ছিল যে রাস্তার কয়েকজন পথচারী ভয়ে কানে হাত দিয়ে দু’কদম পিছিয়ে গেল। একটি কুচকুচে কালো রঙের বিশাল জিপ গাড়ি একদম ওদের গা ঘেঁষে, মাত্র কয়েক ইঞ্চির ব্যবধানে এসে ব্রেক কষল। গাড়ির চাকা রাস্তা ঘেঁষে এত জোরে ঘষটে গেছে যে পোড়া রবারের একটা কটু গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। একই সাথে চাকা থেকে ছিটকে আসা ধুলোবালি আর শুকনো পাতার কুচি বাতাসে উড়ে অরি আর জেবার চোখে-মুখে এসে পড়ল।
অরি চরম বিরক্তিতে ওর চোখের সুরক্ষায় ঝট করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। ভেবেছিল হয়তো কোনো বেপরোয়া লাইসেন্স বীহিন ছেলে গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু যখন ও দুই সেকেন্ড পর চোখ খুলল, তখন ওর ভেতরের সমস্ত শারীরিক ক্লান্তি এক লহমায় উবে গিয়ে এক তীব্র, জমাটবদ্ধ আর হিমশীতল আতঙ্কে রূপ নিল। ওর মেরুদণ্ড বেয়ে যেন একটা বরফ-শীতল স্রোত নেমে গেল।
জিপের ভারী দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। আর সেখান থেকে নিচে নেমে এলো এক দীর্ঘ, চওড়া অবয়ব। লোকটার পরনে কুচকুচে কালো রঙের সিল্কের শার্ট, যার বুকের ওপরের তিনটি বোতাম খোলা। উন্মুক্ত বুকের লোমের ভেতর দিয়ে রোদে চকচক করছে একটা মোটা, সাপের মতো পেঁচিয়ে থাকা সোনার চেইন। ওর ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে হাসি।
আফিম খন্দকার!
এই একটা নাম শুনলে পুরো শহরের সাধারণ মানুষের বুকে কাঁপন ধরে। এক মাস আগের একটা দুপুরের স্মৃতি অরির চোখের সামনে সিনেমা রিলের মতো ভেসে উঠল। এই মেইন রোডের ওপরেই, এই লোকটা অরির হাত ধরার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। অরি অন্য সাধারণ মেয়েদের মতো ভয় পেয়ে কেঁদে ফেলেনি, বরং নিজের পায়ের তলা থেকে চামড়ার জুতোটা খুলে প্রকাশ্য দিবালোকে, শত শত মানুষের সামনে লোকটার গালে কষে থাপ্পড় মেরেছিল। যে কুখ্যাত মাস্তানকে,পুরো শহর বাঘের মতো ভয় পায়-সে আজ দীর্ঘ এক মাস পর,আবার ঠিক ওদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।
জেবা আফিমকে দেখামাত্রই চিনে ফেলল। ভয়ে ওর ফর্সা মুখটা এক মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে, কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। ও অরির ডান হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। জেবার হাতের তালু তখন বরফের মতো ঠান্ডা আর থরথর করে কাঁপছে। অরির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে, কাঁপানো গলায় বলল,
“অ… অরি! এই জানোয়ারটা আবার এসেছে! দেখ ও আমাদের দিকেই তাকাচ্ছে। এক মাস পর ও আবার আমাদের ওপর বদলা নিতে এসেছে রে! ও আমাদের মেরেই ফেলবে। চল, আমরা উল্টো দিকে দৌড় দিই! কোচিংয়ের ভেতরে ঢুকে যাই চল!”
অরি জেবার কাঁপতে থাকা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। ও আলতো চাপে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল। অরির নিজের বুকের ভেতরটাও যে ড্রামের মতো কাঁপছিল না, তা নয়। ওর ভেতরের হৃৎপিণ্ডটাও তখন তীব্র গতিতে আছাড়ি-বিছাড়ি খাচ্ছিল। কিন্তু অরি খুব ভালো করেই জানে, আফিম খন্দকারের মতো পিশাচের সামনে ভয় দেখানো মানেই নিজের পরাজয় ডেকে আনা। এরা মানুষের ভয় দেখেই বেঁচে থাকে, ভয়টাই এদের পুষ্টি।
অরি এক চুলও নড়ল না। ও নিজের রিডিং গ্লাসটা আঙুল দিয়ে নাকের ওপর ঠিকঠাক করে বসিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।এরপর চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে ধরল। চোখের মনিতে এই মুহূর্তে কোনো ভয়ের লেশমাত্র ছিল না, সেখানে জমা হয়েছিল কেবল তীব্র ঘৃণা, অবজ্ঞা আর চরম বিরক্তি।
আফিম ধীর, দর্পিত আর শিকারী পশুর মতো পায়ে অরির দিকে এগিয়ে এলো। প্রতিটা পদক্ষেপে ওর জুতোটা পিচঢালা রাস্তায় ভারী শব্দ তুলছিল। সে এসে অরির একদম মুখোমুখি, মাত্র এক হাত দূরত্বে দাঁড়াল। লোকটার শরীর থেকে ফ্রেঞ্চ পারফিউম আর কড়া ঘ্রান সিগারেটের তামাকু গন্ধের এক বিশ্রী, দমবন্ধ করা মিশ্রণ তৈরি হয়ে অরির নাকে এসে লাগল। অরির ইচ্ছা করল তখনই বমি করে দিতে।
আফিম অরির আপাদমস্তক নিজের সেই চিরচেনা লম্পট, কামুক আর ক্ষুধার্ত দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিল। ওর চোখ দুটো যেন অরির পোশাক ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে চাইছে। এরপর ও যা করল, তার জন্য হয়তো অরি বা জেবা—কেউই প্রস্তুত ছিল না। আফিম কোনো হুমকি দিল না, কোনো গালি দিল না। সে অত্যন্ত যত্নসহকারে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা তাজা, লাল টকটকে গোলাপ ফুল বের করল। ফুলটার পাপড়িতে তখনও কৃত্রিম জলের ফোঁটা চকচক করছে।
সে ওটা অরির মুখের সামনে বাড়িয়ে দিল।এরপর অত্যন্ত গম্ভীর অথচ এক অদ্ভুত উগ্র, চাপা গলায় বলে উঠল, “আই লাভ ইউ, হুরপরি! তোমাকে আমি আমার এই জান দিয়ে ভালোবাসি।”
আফিমের মুখ থেকে এই শব্দগুলো বের হওয়ামাত্রই চারপাশের বাতাস যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। অরি আর জেবা-দুজনেই আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। জেবার হা হয়ে যাওয়া মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। শুধু ওরাই নয়, চারপাশের কিছু পথচারী, যারা ভাবছিল আজ হয়তো এখানে কোনো খুনাখুনি হবে, তারাও এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল। রিকশাওয়ালারা হ্যান্ডেল ধরে হা করে তাকিয়ে রইল। যে আফিম খন্দকার মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের বিছানায় পিষে ফেলার জন্য কুখ্যাত, যে মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে দ্বিধা করে না, সে আজ ভরদুপুরে মাঝরাস্তায় একটা সাধারণ মেয়েকে ফুল হাতে প্রপোজ করছে!
আফিম নিজের শুকনো, কালো হয়ে যাওয়া ঠোঁটটা জিব দিয়ে একবার চাটল। ওর চোখের কোণে এক ধরনের পাগলামি, এক ধরনের উন্মাদ প্রেমিকের ছায়া। সে বলতে লাগল, “এই দীর্ঘ একটা মাস… একটা মাস আমি প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট তোমার ওই তেজী রূপের নেশায় পুড়ে মরেছি, হুরপরি। ঘুমাতে গেলে চোখের সামনে তোমার ওই রাগী মুখটা ভেসে ওঠে। তুমি অন্য সব সস্তা মেয়েদের মতো নও, যারা আমার টাকার গরম বা নাম শুনেই পায়ে এসে পড়ে। তুমি এক পবিত্র অগ্নিকন্যা। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তোমার ওপর কোনো জোর-জুলুম করব না। আমি তোমাকে ভালোবেসে নিজের করে নিতে চাই। এই আফিম খন্দকারের রানী বানিয়ে রাজপ্রাসাদে রাখব তোমাকে। বলো, তুমি আমার হবা? আমার এই দিলটা তোমার নামে লিখে দিলাম।”
আফিমের মানসিক বিকারগ্রস্ত কথাবার্তাগুলো যখন অরির কানে ঢুকছিল, ওর ভেতরের রাগটা এতক্ষণে ফুটন্ত লাভার মতো টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিল। ওর কান দুটো গরম হয়ে লাল হয়ে উঠল। এই নরপশুর মুখে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা শুনলে ভালোবাসার পবিত্রতা অপমানিত হয়। ও এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। আফিমের বাড়িয়ে দেওয়া লাল গোলাপটার দিকে ও একটা তীব্র, থুতু ফেলার মতো ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
এরপর অরি নিজের গলার সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে অত্যন্ত ঠান্ডা, কড়া এবং বজ্রকঠিন গলায় বলল,
“তোর ওই নোংরা ফুল আর কুৎসিত প্রস্তাব নিজের পকেটেই ঢুকিয়ে রাখ, আফিম খন্দকার! তোর মতো একটা রাস্তার জঞ্জাল, খুনি, ধর্ষক আর পিশাচের দিকে তাকাতেও আমার ঘেন্না হয়। তুই ভাবছিস তুই খুব বড় মস্তান? তুই একটা আস্ত নর্দমার কীট! ভালো চাস তো আমাদের পথ থেকে সর। নয়তো ঐদিন শুধু জুতো মেরেছিলাম, আজকে এই রোডের মাঝখানেই তোকে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে তোর ওই লম্পট গিরি আমি চিরতরে শেষ করে দেব! সমাজ তোকে ভয় পেতে পারে, অরি তোকে জুতোর যোগ্যও মনে করে না।”
কথাটা বলেই অরি আফিমকে আর কোনো কথা বলার, এমনকি একটা নিশ্বাস ফেলার সুযোগও দিল না। সে জেবার হাত ধরে এক হেঁচকা টান মারল। আর নিজের পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে আফিমের চওড়া কাঁধে এক সজোরে ধাক্কা দিয়ে ওকে একপাশে সরিয়ে দিল। আফিম আকস্মিক এই ধাক্কায় দু’কদম পিছিয়ে গেল। অরি সোজা গিয়ে পার্কিং লটে দাঁড় করিয়ে রাখা ওদের গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। চট করে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং জেবাকেও টেনে সিটে বসিয়ে ‘ঠাস’ করে দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল।
আফিম মাঝরাস্তায় ফুল হাতে ওভাবেই কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চারপাশের পৃথিবীটা যেন ওকে উপহাস করছে। ওর বাড়িয়ে দেওয়া প্রস্তাব, ওর এতদিনের জমানো ‘প্রেম’ এভাবে এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মেয়েটা ওকে আবার সবার সামনে, এই সাধারণ পথচারীদের সামনে চরমভাবে অপমান করল!
ওর ভেতরের সেই সুপ্ত পৈশাচিক রূপটা, সেই মাস্তান অহংকার এবার এক ধাক্কায় জেগে উঠল। ওর মুখের সেই উগ্র প্রেমিকের মুখোশটা খসে পড়ল, সেখানে বেরিয়ে এলো এক হিংস্র হায়নার মুখ।আফিম এক ঝটকায় হাতের গোলাপ ফুলটা মাটিতে ফেলে দিল এবং নিজের ভারী বুট জুতো দিয়ে ওটা পিষে, থেঁতলে মাটির সাথে মিশিয়ে দিল।
এরপর সে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে অরিদের গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। নিজের নোংরা, তামাকের গন্ধযুক্ত মুখটা জানালার কাঁচের একদম কাছাকাছি এনে নিজের ভারী হাত দিয়ে কাঁচে সজোরে থাপ্পড় মারল।
অত্যন্ত হিংস্র, কর্কশ আর কুৎসিত গলায় চিৎকার করে বলল,
“এত তেজ ভালো না সুন্দরী! এই আফিম খন্দকারকে রিজেক্ট করার ইতিহাস এই শহরে কারো নেই। আজকে তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিলে তো? মনে রেখ হুরপরি, খুব শীঘ্রই… অত্যন্ত শীঘ্রই তোমাকে আমি আমার ওই ডেরায় তুলে নিয়ে যাব। আর সেদিন তোমার এই ত্যাঁদড়ানি রূপ, তোমার এই অহংকার আমি এমনভাবে নিজের শরীরের নিচে পিষে ফেলব যে, তুমি নিজেই সারাজীবন আমার পায়ের দাসী হয়ে থাকার ভিক্ষা চাইবে! আফিম খন্দকার যা চায়, তা সে যেকোনো মূল্যে ছিনিয়ে নেয়। ইউ আর মাইন, হুরপরি! তোকে আমি ভোগ করবই!”
অরি আফিমের এই ভয়ংকর হুমকির দিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না।জানালার কাঁচটাও নামাল না। ড্রাইভিং সিটে বসে স্টেয়ারিংটা শক্ত করে ধরল। এরপর উল্টো জানালার ওপাশে থাকা আফিমের বিকৃত মুখের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র তাচ্ছিল্য আর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল অরি। ওর ওই এক চিলতে হাসি আফিমের বুকে তপ্ত শেলের মতো বিঁধল।
এরপর ও এক ঝটকায় গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে রিভার্স থেকে ড্রাইভে নিল এবং এক্সিলারেটরে সজোরে পা চেপে ধরল। গাড়িটি এক ঝটকায় আফিমের গা ঘেঁষে, ওর হাতের কনুই স্পর্শ করে তীব্র গতিতে, চাকার নিচে ধুলো আর ধোঁয়ার এক বিশাল কুণ্ডলী উড়িয়ে মেইন রোডের দিকে ছুটে চলে গেল। আফিম শুধু সেই ধুলোর আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের ঠোঁটের কোণ কামড়াতে কামড়াতে রাগে, অপমানে আর কামনায় বুনো ষাঁড়ের মতো ফুসতে লাগল। ওর চোখ দুটো তখন জবা ফুলের মতো লাল।
ঠিক একই সময়ে, দেশের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের এক অতি গোপন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ে এক জরুরি, রুদ্ধদ্বার মিটিং শেষ করে বের হচ্ছিলো সারিম। ওর পরনে একটা নিখুঁত ফিটিংসের, চারকোল গ্রে কালারের ল্যাপেল স্যুট, ভেতরে ধবধবে সাদা শার্ট আর গলায় গাঢ় নীল রঙের সিল্কের টাই। বাঁহাতে চকচক করছে সীমিত সংস্করণের সুইস ব্যান্ডের ঘড়ি।
ওর ঠিক পেছনের ফাইলপত্র বগলে চেপে অত্যন্ত তটস্থ, প্রায় কুঁজো ভঙ্গিতে হেঁটে আসছিল আলভি। আলভির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, যদিও করিডোরের সেন্ট্রাল এসি-র তাপমাত্রা তখন ১৬ ডিগ্রিতে সেট করা।তবে আজকে সকাল থেকেই সারিম বেশ খিটখিটে হয়ে আছে, ফাইলের ছোটখাটো ভুল দেখলেই অফিসারদের সাসপেন্ড করার হুমকি দিচ্ছে। যার জন্য আলভি একরকম তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে প্রতিটা মিনিট পার করছে।
সারিম লবি ধরে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আলভি, দুপুরের লাঞ্চ মিটিংয়ের শিডিউলটা প্রোটোকল অফিসারকে বলে ক্যানসেল করো। ওই ফালতু ব্যবসায়ীদের সাথে বসে সময় নষ্ট করার মতো মুড আমার নেই আজ। আমার একটু বিশেষ তাড়া আছে।”
আলভি আমতা আমতা করে, বলল, “জি বস… সেটা তো করাই যাবে। আমি এখনই ফোন করে ক্যানসেল করে দিচ্ছি। কিন্তু… কিন্তু স্যার, তার চেয়েও একটা অত্যন্ত জরুরি, স্পর্শকাতর খবর আছে।”
সারিম নিজের পায়ের গতি এক চুলও না কমিয়ে, শুধু মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ, বাজপাখির মতো দৃষ্টিতে আলভির দিকে তাকাল, “কী খবর? স্পষ্ট করে বলো। আমার হেয়ালি পছন্দ না, সেটা ভালো করেই জানো।”
আলভি নিজের শুকিয়ে যাওয়া ঢোক গিলে করিডোরের এদিক-ওদিক তাকাল। কোনো পিয়ন বা অন্য কোনো কর্মকর্তা শুনছে কিনা নিশ্চিত হয়ে ও অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি স্বরে বলল, “স্যার… আসলে… আপনি ম্যামের সুরক্ষার জন্য যে স্পেশাল ইন্টেলিজেন্সের লোকগুলোকে গোপনে ওনার চারপাশে চব্বিশ ঘণ্টা লাগিয়ে রেখেছিলেন, ওদের মধ্য থেকে একজন এইমাত্র আমার ফোনে একটা জরুরি ইনফরমেশন দিল।”
‘ম্যাম’ শব্দটা শোনামাত্রই সারিমের পায়ের গতি যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে করিডোরের ঠিক মাঝখানেই ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। ওর সেই গাঢ়, নেশাক্ত অথচ শান্ত চোখ দুটো এক মুহূর্তে এক ভয়ংকর শিকারী বাজপাখির মতো ধারালো হয়ে উঠল। সারিম এক কদম এগিয়ে এসে আলভির দামি শার্টের কলারটা নিজের এক হাত দিয়ে আলতো কিন্তু অত্যন্ত শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। ও আলভিকে নিজের মুখের কাছাকাছি টেনে এনে অত্যন্ত ঠান্ডা, নিচু কিন্তু মেরুমজ্জা কাঁপানো গলায় বলল,
“চন্দ্রিমার কী হয়েছে? স্পষ্ট করে বলো আলভি। একটা শব্দও যদি এদিক-ওদিক হয়, তবে তোমার এই চাকরি আর এই জীবন আজকেই শেষ!”
আলভি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতের ফাইলগুলো কোনোমতে ধরে রেখে বলল,
“বস! শান্ত হোন স্যার! ওই যে কুখ্যাত মাস্তান রাজন খন্দকারের ছেলে… আফিম খন্দকার আছে না!ম্যাম যখন কোচিং বের হচ্ছিলেন, তখন মাঝরাস্তায় নিজের জিপ গাড়ি নিয়ে ওনার পথ আটকে দাঁড়িয়েছে।”
সারিমের সুগঠিত চোয়াল দুটো এক লহমায় লোহার মতো শক্ত হয়ে গেল। ওর ভেতরের সেই পরিশীলিত, সুশীল মন্ত্রীর রূপটা এক ধাক্কায় উধাও হয়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তারপর? ওই শুয়োরের বাচ্চা, ওই নর্দমার কীট কী করেছে আমার চন্দ্রিমার সাথে? হাত লাগিয়েছে?”
“না… না বস! হাত লাগায়নি।” আলভি এক নিঃশ্বাসে বলল, “স্যার, ওই আফিম নাকি ম্যামকে সবার সামনে রাস্তার মধ্যে ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছে!
আলভির কথা শেষ হওয়ামাত্রই সারিমের চোখের মনিতে এক পৈশাচিক, আদিম হিংস্রতার দাবানল জ্বলে উঠল। ওর নাকের পাটা দুটো রাগে ফুলতে লাগল। সে নিজের গলার টাইটা এক হেঁচকা টানে সামান্য ঢিলে করে দিল, যেন ওর দম আটকে আসছে।সারিম চাপা গলায় বলল, “আমার চন্দ্রিমা… আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আমার পবিএ নারীর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস ওই ড্রেনের কীটের কীভাবে হলো? চন্দ্রিমা কী করেছে? ও কি ভয় পেয়েছে?”
আলভি একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, “ম্যাম তো ম্যাম-ই বস! ম্যাম ওর ফুল তো দূরে থাক, ওর মুখের ওপর ওকে তীব্র অপমান করে রিজেক্ট করে দিছেন। ওকে ঝাঁটা দিয়ে পেটানোর ধমক দিয়ে চলে গেছেন। কিন্তু স্যার, ওই আফিম নাকি যাওয়ার আগে ম্যামকে খুব নোংরা থ্রেট দিসে। বলেছে ওনাকে নিজের ডেরায় তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের শরীরের নিচে পিষে ফেলবে।”
সারিমের পুরো শরীর তখন রাগে থরথর করে কাঁপছিল। ওর ডান হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল, নখগুলো তালুর চামড়া ভেদ করার উপক্রম করল। যে চন্দ্রিমাকে ও নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, যার পবিত্র গায়ে এই পৃথিবীর কোনো নোংরা বাতাস লাগুক তা ও সহ্য করতে পারে না—সেই চন্দ্রিমাকে একটা কুৎসিত লম্পট নজর দেওয়ার সাহস কই পায়!
“আলভি! গাড়ি বের করো! আজকে ওই আফিমকে এই দুনিয়া থেকে চিরতরে ডিলিট করে দেব!” সারিম এক ভয়ংকর হুঙ্কার দিয়ে লিফটের দিকে পা বাড়াল। ওর মুখের অবয়ব তখন কোনো মন্ত্রীর নয়, এক ক্ষুধার্ত পিশাচের মতো লাগছিল।
আলভি ফাইলপত্র সামলাতে সামলাতে ওনার পেছনে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে বলল,
“স্যার! স্যার! শান্ত হোন! আপনি দেশের একজন মন্ত্রী! আপনার সামনে উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ! আপনি নিজে গিয়ে যদি একজন সাধারণ রাস্তার মাস্তানকে রাস্তায় মারতে শুরু করেন, তবে মিডিয়ায় তা জানাজানি হয়ে গেলে আপনার ক্যারিয়ারে মারাত্মক এফেক্ট পড়বে! তাছাড়া রাজন খন্দকারও কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। প্লিজ স্যার, আইন নিজের হাতে নেবেন না! আমরা পুলিশ পাঠাচ্ছি।”
সারিম লিফটের ভেতর ঢুকে সজোরে বোতাম চাপতে চাপতে এক পৈশাচিক হাসি হাসল। ও বলল, “আইন? আইন আমার পকেটে থাকে, আলভি! যে আমার চন্দ্রিমার দিকে চোখ তোলে, যে আমার সম্পত্তির দিকে কুনজর নজর দেয়, তার জন্য এই সারিমের ডিকশনারিতে কোনো আইন নেই। জাস্ট গেট দ্য কার রেডি!”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কালো রঙের প্রাডো গাড়িটি পার্কিং থেকে টায়ারের চিৎকার তুলে বের হয়ে মেইন রোডের দিকে ছুটে চলল। ড্রাইভিং সিটে আলভি ঘামতে ঘামতে স্টিয়ারিং ধরেছে, আর পেছনের আরামদায়ক সিটে সারিম বসে নিজের ফোনের স্ক্রিনে অনবরত আফিমের জিপের বর্তমান জিপিএস লোকেশন ট্র্যাক করছিল, যা ওর গোপন এজেন্টরা অনবরত আপডেট পাঠাচ্ছিল। ওর চোখ দুটো তখন পুরোপুরি লাল বর্ণ ধারণ করেছে, এক ভয়ংকর খুনে মেজাজ ওর পুরো অবয়বকে গ্রাস করে রেখেছে।
গাড়িটি যখন শাহবাগের এক ব্যস্ত, ঘিঞ্জি মোড়ের সিগন্যালে এসে থামল, সামনে বিশাল বড় জ্যামের লাইন দেখে বিরক্তিতে এক তীব্র ‘চ’ শব্দ উচ্চারণ করল সারিম। চারপাশ থেকে বাসের কালো ধোঁয়া আর হর্নের শব্দ আসছিল। সারিম পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রোল করতে লাগল।
এমন সময় গাড়ির সামনের কাঁচের ওপাশে হুট করেই এসে দাঁড়াল একদল হিজরা। প্রায় সাত-আটজন হিজরার একটা দল, যাদের পরনে অত্যন্ত চড়া, সস্তা রঙের জ্যামিতিক শাড়ি, মুখে অতিরিক্ত মেকআপের সাদা প্রলেপ আর ঠোঁটে কড়া রক্তের মতো লাল লিপস্টিক। তারা এসেই অনবরত বিকট শব্দে হাততালি দিতে দিতে গাড়ির বনেটে ধাক্কা মারতে লাগল। ‘তালি! তালি!’
ওদের মধ্যে সবচেয়ে মস্ত বড় এবং হৃষ্টপুষ্ট, প্রায় দেড়শ কেজি ওজনের এক ভুটকি হিজরা-যার নাম চম্পা-সে সরাসরি সারিমের জানালার পাশে এসে কাঁচের ওপর নিজের ভারী হাত দিয়ে ধপধপ করে থাপ্পড় মারতে লাগল। আর অত্যন্ত কর্কশ, চেরা ও বিকট গলায় চেঁচিয়ে বলল,
“এই মন্ত্রী! বিলাতি গাড়িতে বইসা আছস! আমাদের দিকে একটু তাকা! জলদি কইরা টেকা বের কর। আমাগো দলের সবার লাইগা পাঁচ হাজার টেকা দিবি! নয়তো এই মেইন রোডের মাঝখানেই কিন্তু আমরা পরনের জামাকাপড় খুইলা ন্যাংটা হইয়া নাচুম! তোর এই মন্ত্রিত্ব আর ইজ্জত কিন্তু এক মিনিটে পাংচার কইরা দিমু! টেকা বের কর জলদি!”
অন্যান্য হিজরাগুলোও বিকট শব্দে হাততালি দিয়ে চেঁচাতে লাগল, “টেকা দে! টেকা দে! নয়া মন্ত্রীর গাড়ি রে! টেকা না দিলে জামা খুইলা নেমু!”
এমনিতে সারিমের মেজাজ তখন চরম তুঙ্গে, ওর মাথার ভেতরের রগগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তার ওপর এই মাঝরাস্তায় হিজরাদের এই চরম উটকো ঝামেলা ও সহ্য করতে পারছিল না। সারিম অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে জানালার কাঁচটা সামান্য, মাত্র দুই ইঞ্চি নামিয়ে এক তীব্র ধমক লাগাল, “এই! সরো আমার গাড়ির সামনে থেকে! সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছো তোমরা। এক মিনিটে আইজিপি-কে ফোন করে পুলিশ দিয়ে জেলে পুরে দেব! চেনো আমাকে?”
চম্পা হিজরা নিজের চর্বিযুক্ত কোমরে দুই হাত দিয়ে এক বিশ্রী, উগ্র ভঙ্গি করে নিজের নিতম্ব দুলিয়ে বলল, “ওরে আমাগো পুলিশ দেখায়! আমরা পুলিশের গুষ্টিরে ডরাই না! আমরা ন্যাংটা, আমাগো হারানোর কিছু নাই রে বাবা! টেকা না দিয়া যদি এক পা সামনে বাড়াইছিস, তবে এইখানেই তোর কাপড়-চোপড় খুইলা আমাগো সাথে নাচামু!” বলেই ও সত্যি সত্যি নিজের শাড়ির আঁচলটা হাত দিয়ে ধরে টান দেওয়ার এক কুৎসিত ভঙ্গি করে সারিমের জানালার দিকে আরও এক কদম এগিয়ে আসতে চাইল।
“থামো!”
সারিম হঠাৎ করেই খুব জোরে, এক ধাতব কণ্ঠে চিৎকার করে ওদের থামতে বলল। ওর এই আকস্মিক, কর্তৃত্বপূর্ণ চিৎকারে চম্পা হিজরাসহ বাকি পুরো দলটা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ওদের হাততালি দেওয়া হাতগুলো বাতাসেই জমে গেল।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সারিমের মুখের সেই চরম, খুনে রাগটা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে কর্পূরের মতো গায়েব হয়ে গেল। ওর চোখের মনিতে হুট করেই এক অত্যন্ত চতুর, শয়তানি এবং বিকারগ্রস্ত বুদ্ধি খেলে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, বাঁকা এবং শীতল হাসি।
সারিম জানালার কাঁচটা পুরোপুরি নামিয়ে দিল। এরপর চম্পা হিজরার সেই মেকআপ লেপ্টে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, ঠান্ডা কিন্তু গভীর গলায় বলল, “তোমরা মাত্র পাঁচ হাজার টাকার জন্য এখানে নিজেদের ইজ্জত বিলিয়ে দিতে চাচ্ছো, তাই না? মানুষের সামনে নোংরামি করতে চাচ্ছো? আচ্ছা, আমি যদি তোমাদের এই মুহূর্তেই ক্যাশ দশ লাখ টাকা দিই…বিনিময়ে আমার একটা স্পেশাল কাজ করে দিতে হবে?”
‘দশ লাখ টাকা’-এই শব্দটা শোনামাত্রই চম্পা হিজরাসহ বাকি সাত-আটজন হিজরার চোখ আক্ষরিক অর্থেই কপালে উঠে গেল! ওদের চোয়ালগুলো ঝুলে পড়ল। ওরা হাততালি দেওয়া ভুলে একে অপরের দিকে বোকার মতো তাকাতে লাগল। চম্পা নিজের মুখের জর্দা মেশানো পানটা একপাশে চেপে ধরে অবিশ্বাস্য, প্রায় তোতলামো গলায় বলল,
“অ্যাঁ! কী কস মন্ত্রী? ঠাট্টা করস আমগো লগে? দশ লাখ টাকা?! আস্ত দশ লাখ টাকা ক্যাশ দিবি আমগোরে? ওরে বাবারে, এ তো আলাদিনের চেরাগ! কিন্তু আমাগো কী করতে হইবো শুনি?”
সারিম নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা রেশমি রুমাল বের করে নিজের হাতটা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে মুছতে মুছতে ক্রূর গলায় বলল,
“একটা ছেলেকে… তোমরা সব হিজরারা মিলে জবরদস্তি তাকে রেপ করতে হবে!কাজ শেষ হওয়া মাত্রই ক্যাশ দশ লাখ টাকা দেব আমি।”
সারিমের এই বিকারগ্রস্ত, ভয়ংকর, অবিশ্বাস্য এবং অভূতপূর্ব অফারটা শোনামাত্রই ড্রাইভিং সিটে বসা আলভির হাত থেকে স্টিয়ারিং হুইলটা প্রায় ছুটে যাওয়ার দশা হলো!বুকটা ধড়ফড় করে উঠল, কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম নামল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।শুধু হাঁ করে পেছনের দিকে তাকিয়ে নিজের বসের দিকে এমনভাবে দেখল, যেন সে এইমাত্র দেখতে পাচ্ছে আস্ত এক শয়তান ইবলিশ ওর বসের শরীরের ভেতর ভর করে বসে আছে।
ওদিকে চম্পা হিজরা আর ওর দলের বাকি সদস্যরা এই অদ্ভুত আর চরম বিকারগ্রস্ত অফার শুনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও, পরের মুহূর্তেই ওরা চরম পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠল। ওরা আবার দ্বিগুণ জোরে হাততালি দিয়ে, নিজেদের শাড়ি দুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“এ তো আমাগো মনের খায়েশ মিটায়া দিলা মন্ত্রী! আস্ত জোয়ান পোলা! তার ওপর আবার দশ লাখ টাকা! এই কাজ তো আমরা ফ্রিতেও করতে রাজি আছিলাম। আমাগো তো উৎসব হইবো আইজ! জলদি কও হেই পোলা কোনহানে আছে? আজকে ওর পাছার চামড়া আমরা খুইলা দিমু! ওরে আজ আমরা ছাড়ুম না!”
সারিম চতুর হাসি দিয়ে আলভিকে বলল, “আলভি, হা করে তাকিয়ে সময় নষ্ট করো না। পেছনের ব্যাকআপ স্কোয়াডের কালো মাইক্রোবাসের দরজাটা খুলে এদের সবাইকে সম্মানের সাথে ভেতরে বসাও। আর আমাদের সাথে আফিমের লোকেশনে নিয়ে চল।”
আলভি নিজের কপালে হাত দিয়ে এক দীর্ঘ, হতাশ নিশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,
“ইয়া আল্লাহ্! ইয়া রহমান! আমি জীবনে কী এমন পাপ করছিলাম যে এই দুনিয়ার সবচেয়ে জাউরা, খবিশ, নিষ্ঠুর লোকের অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে গেলাম! এই মানুষ তো মানুষ না, এ তো আস্ত একটা ইবলিশের খালাতো ভাই!”
তবে মুখে বসের ধমকের আর ক্ষমতার ভয়ে ও দ্রুত ইশারায় পেছনের মাইক্রোবাসের সিকিউরিটি গার্ডদের বলল দরজা খুলে দিতে। হিজরাদের দলটা অত্যন্ত উৎসাহের সাথে, হাসাহাসি করতে করতে মাইক্রোবাসের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দুপুর তখন ঠিক আড়াইটা। সূর্যের আলোটা কেমন যেন ম্লান আর হলদেটে হয়ে এসেছে। মেইন রোডের এক নির্জন, জঙ্গলঘেরা কোণায় পিচঢালা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আফিমের সেই কুচকুচে কালো জিপ গাড়িটি। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি, চারপাশটা ঘন রেইনট্রি গাছপালা, লতাগুল্ম আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা। দুপুরবেলা এই রাস্তায় তেমন একটা মানুষ থাকে না।
আফিম তখন জিপের পেছনের সিটে একা বসে অনবরত একটার পর একটা সিগারেট টানছিল আর রাগে ফুসছিল। ওর পায়ের কাছে অলরেডি ৪-৫টা সিগারেটের ফিল্টার পড়ে আছে। সে নিজের হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা জিপের লেদার ড্যাশবোর্ডে সজোরে চেপে চামড়া পুড়িয়ে নিভিয়ে দিতে দিতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করছিল, “হুরপরি… তুমি আমাকে সবার সামনে রিজেক্ট করলে! এই আফিম খন্দকারকে!এই অপমানের প্রতিশোধ আমি এমনভাবে নেব যে তুমি ধারণাও করতে পারবে না। তোকে যদি আমি এই সপ্তাহের মধ্যে আমার বিছানায় না আনছি, তবে আমিও আফিম খন্দকার না!”
ঠিক তখনই, আফিমের জিপের ঠিক পেছনে এসে অত্যন্ত নিঃশব্দে, প্রায় বিড়ালের মতো পায়ে এসে থামল সেই কালো বিশাল মাইক্রোবাসটি।আফিম জানালার লুকিং গ্লাস দিয়ে পেছনে গাড়ি থামতে দেখে একটু অবাক হলো। ভাবল হয়তো ওর কোনো চামচা এসেছে বা অন্য কোনো রাইভাল গ্যাং এর লোক।আফিম নিজের ভেতরের বিরক্তি আর রাগ নিয়ে জিপের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে নিচে নামল। নিজের কোমরে গোঁজা পিস্তলটা একটু ছুঁয়ে দেখল।
আফিম গাড়ি থেকে নামা মাত্রই, পেছনের মাইক্রোবাসের স্লাইডিং দরজা দুটো এক হেঁচকায় খুলে গেল। আর সেখান থেকে একে একে নেমে এলো চম্পা হিজরাসহ সেই সাত-আটজন মস্ত বড়, হৃষ্টপুষ্ট এবং পৈশাচিক চেহারার ভুটকি হিজরাদের দল! ওদের মুখে লালাঝরা, ক্ষুধার্ত হাসি।
আফিম ওদের এই নির্জন জায়গায় দেখে চরম ভুরু কুঁচকে, বিরক্তি গলায় বলল, “এই! তোরা কারা রে হিজরার দল? এখানে কী চাস? মরণ মরতে আসছিস? সর এখান থেকে, নয়তো গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব!”
চম্পা হিজরা আফিমের সেই চওড়া ছাতি, সুঠাম দেহ আর রাগী চেহারা দেখা মাত্রই নিজের নোংরা জিব দিয়ে ঠোঁট চাটতে চাটতে বলল, “ওরে আমাগো রাজা ভাই রে! চেহারা তো আস্ত খাসি পার্লার রে! বডি তো পুরা মাখনের মতো! শোন রে দলবল একদম খাঁটি মাল আমাগো লাইগা রাইখা গেছে। ধর এইডারে! আজ আমগো ঈদ!”
আফিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চার-পাঁচজন বিশাল ওজনের, প্রায় একশ কেজি ওজনের হিজরা একযোগে বুনো পশুর মতো আফিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল!
আফিম চমকে উঠে নিজের পকেট থেকে কোমর থেকে পিস্তল বের করতে চাইল, কিন্তু ওর হাত নাড়ানোর আগেই চম্পা হিজরা নিজের বিশাল ওজনের শরীর দিয়ে আফিমকে ধাক্কা মেরে মাটির সাথে পেস্ট করে দিল। আফিম পিচঢালা রাস্তার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল, ওর হাতের পিস্তলটা ছিটকে চলে গেল ঝোপের ভেতর। চম্পা ওর বুকের ওপর বসে পড়ল, যেন একটা আস্ত পাহাড় ওর ওপর চেপে বসেছে। আফিম মাটির সাথে লেপ্টে গিয়ে ব্যথায় চিৎকার করে উঠল, “এই শুয়োরের বাচ্চারা! তোরা জানিস আমি কে? আমি আফিম খন্দকার! তোদের আমি জ্যান্ত কেটে টুকরো টুকরো করে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেব! ছাড় আমাকে! হাত সরা!”
পাশে থাকা এক হিজরা আফিমের এই কথা শুনে নিজের কোমরে থাকা এক টুকরো নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত কালো কাপড় দিয়ে ওর মুখটা শক্ত করে বেঁধে ফেলল। ফলে ওর চিৎকারগুলো ভেতরের গোঙানিতে রূপ নিল। এরপর ওরা সবাই মিলে অত্যন্ত দক্ষতায়, আফিমের জিপের ভেতরে থাকা টোয়িং দড়ি দিয়ে ওর হাত-পা দুটোকে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। আফিম শত চেষ্টা করেও, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়েও ওদের সেই সম্মিলিত পাশবিক শক্তির সামনে এক চুলও নড়তে পারল না।
ওরা সবাই মিলে আফিমকে কুকুরের মতো চ্যাংদোলা করে তুলে মেইন রোডের পাশের সেই ঘন, অন্ধকার মশাভর্তি জঙ্গলের ভেতরের ঝোপঝাড়ের দিকে নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ঘন জঙ্গলের গভীর থেকে আফিমের অবরুদ্ধ, তীব্র, যন্ত্রণাদায়ক আর চরম অপমানের গোঙানির শব্দ বাতাসে ভেসে আসতে লাগল। চম্পা হিজরাসহ সেই সাতজন ভুটকি হিজরা একযোগে আফিমের ওপর নিজেদের সেই পৈশাচিক, বিকারগ্রস্ত আর আদিম লাঞ্ছনা তান্ডব শুরু করে দিল। আফিমের সেই তথাকথিত পুরুষালি মাস্তান গিরি, ওর সেই লম্পট অহংকার, যা দিয়ে ও মেয়েদের জীবন ধ্বংস করত-তা এক এক করে ওর নিজের শরীরের ভেতর দিয়ে নির্মমভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে লাগল। ওর চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু সেই জঙ্গলের নির্জনতায় ওর এই আত্মচিৎকার শোনার মতো কেউ ছিল না। প্রকৃতিও যেন আজ ওর এই পাপের শাস্তি মুখ বুজে দেখছিল।
এদিকে, জঙ্গল থেকে প্রায় একশ গজ দূরে, রাস্তার এক নিরাপদ, গাছের ছায়ায় ঘেরা কোণায় প্রাডো গাড়িটি ভেতরের এসি-র ঠাণ্ডা বাতাস, সুগন্ধি পরিবেশে অত্যন্ত আরামদায়ক ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে বসে ছিল সারিম। ওর বাম হাতে থাকা ফোনের স্ক্রিনে তখন অনবরত রঙিন জেলি আর ক্যান্ডিগুলো ফাটছিল।
সারিম অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে,ফোনে ‘ক্যান্ডি ক্র্যাশ’ গেম খেলছিল। ওর সুগঠিত ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, স্বর্গীয় প্রশান্তির হাসি। জঙ্গল থেকে আসা আফিমের সেই তীব্র, পশুর মতো অবরুদ্ধ গোঙানি আর হিজরাদের উল্লাসের শব্দ মৃদুভাবে ওর কানের পর্দায় পৌঁছালেও ওর মুখের একটি পেশীও নড়ল না।চোখে কোনো অনুশোচনা বা ঘৃণাও ছিল না। যেন ওর কাছে এই মুহূর্তে গেমের এই কঠিন লেভেলটা পার করাটাই এই ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ড্রাইভিং সিটে বসা আলভির পুরো শরীর ভয়ে, আতঙ্কে কাঁপছিল।সে নিজের দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে অনবরত চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করছিল,
“লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ… ইয়া আল্লাহ্, আপনি আমারে ঈমানের সাথে রক্ষা করেন। আমি কোন পাপে এই চাকরি করতে আসলাম। একটা জলজ্যান্ত ছেলেকে,হিজরা দিয়ে রেপ করিয়ে দিল এই লোক! ওনার মনে একটুও দয়া-মায়া নাই!আজ সমাজ কোথায়, ছেলেদের সম্মান কোথায়। এখন দেখছি ছেলেরাও নিরাপদ নয় এই দেশে।এই লোক মানুষ না, আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ, একটা সিরিয়াল কিলারের চেয়েও ভয়ংকর!”
আলভি আর নিজের ভেতরের ভয় ধরে রাখতে না পেরে পেছনের দিকে তাকাল। ওর মুখটা তখন কান্নায় ভেঙে পড়ার মতো হয়েছে। ও অত্যন্ত করুণ ও কাঁপানো গলায় বলল,
“ব… বস! আর কতক্ষণ? লোকটা তো মনে হয় মরেই যাবে ওভাবে হিজরাদের নিচে পিষে! ওর গোঙানি তো বন্ধ হয়ে আসছে স্যার। প্লিজ এবার ওনাদের থামতে বলুন স্যার।”
সারিম নিজের ফোনের স্ক্রিন থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ না সরিয়েই, অত্যন্ত অলস, নিস্পৃহ এবং হিমশীতল গলায় বলল,
“আরেকটু আলভি… জাস্ট আর একটু ধৈর্য ধরো। গেমের এই লেভেলটা পার হতে আর মাত্র চারটে রঙিন ক্যান্ডি ফাটানো বাকি আছে। মুভসও বেশি নেই। তাছাড়া… যে আমার চন্দ্রিমাকে নিয়ে নোংরা স্বপ্ন দেখার ধৃষ্টতা দেখায়, তার শাস্তিটা তো একটু স্পেশাল, একটু ইউনিক হওয়াই উচিত, তাই না? ও যাতে নিজের মুখ আর শরীর কোনোদিন কোনো মেয়েকে দেখানোর যোগ্য না থাকে। জাস্ট ওয়াচ দ্য গেম, আলভি।”
বিকেলের তপ্ত রোদ তখন ম্লান। ঝোপঝাড়ের মাথায় এক বিষণ্ণ, তামাটে আলো ছড়িয়ে হুট করেই থেমে গেল এতক্ষণের পৈশাচিক তাণ্ডব।
শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে, কপাল থেকে ঘাম আর মেকআপের মিশ্রণ মুছল চম্পা হিজড়া। একটা বিকট হাততালি দিয়ে মাটিতে অর্ধমৃত, রক্তাক্ত আফিমের দিকে তাকিয়ে তীব্র তাচ্ছিল্যে হাসল সে। আফিমের সেই কালো শার্ট এখন ছিন্নভিন্ন; সারা শরীরে কামড় আর খামচির কালচে দাগ। মুখ থেকে খসে পড়া কাপড়ের টুকরো বেয়ে ঝরছে লালা আর রক্ত। আধবোজা চোখে সে যেন নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু গুনছে।
নিজের দলবলের দিকে তাকিয়ে চম্পা কর্কশ গলায় বলল,
“চল রে দলবল! মন্ত্রী সাব যে কাম দিছিল, হেইডা ষোলো আনা উসুল। অহন ওনার কাছ থেইকা পাওনা টাকা বুইঝা নিমু।”
খিলখিল হাসিতে মেতে উঠে তারা মেইন রোডের দিকে চলে গেল। নিঝুম জঙ্গলের কোণায় পড়ে রইল দাপুটে, লম্পট আফিম খন্দকার। যার পুরুষালি তেজ এখন নোংরা ধুলোয় মিশে ছটফট করছে। মৃদু গোঙানির শক্তিও তার নেই। অবচেতন মগজে তখন ভেসে উঠছে অতীত-ঠিক এভাবেই তো তার হাতে ধর্ষিত পঁচিশটা মেয়ের শরীর শোচনীয় অবস্থায় পড়ে থাকত! আজ নিজের পাপের হিসাব মেলাচ্ছে সে।
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কালো প্রাডোর পেছনের সিটে বসে সারিম ফোনটা পকেটে রাখল। ‘ক্যান্ডি ক্র্যাশ’ গেমের লেভেলটা সফলভাবে পার করে তার মুখে এখন পরম তৃপ্তির চতুর হাসি। ততক্ষণে তার পেছনের স্কোয়াড থেকে টাকা নিয়ে হিজরাদের দলটা চম্পট দিয়েছে।
স্যুটের কলারটা সোজা করে সারিম ড্রাইভিং সিটে বসা আলভিকে বলল, “আলভি, গাড়ি স্টার্ট দাও। এবার একটু সমাজসেবামূলক কাজ করতে হবে।”
স্টিয়ারিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে তওবা পড়তে থাকা আলভি চমকে তাকাল, “সমাজসেবা?! স্যার, এইমাত্র একটা মানুষকে জ্যান্ত নরকে পাঠালেন, আর এখন…”
সারিম রহস্যময় হাসল, “গাড়িটা ওই ঝোপের কাছে নাও, তাহলেই বুঝবে।”
কাঁপাকাঁপা হাতে আলভি গাড়ি এগিয়ে নিয়ে ঠিক আফিমের কাতরাতে থাকা ঝোপের পাশে থামাল। গাড়ি থামতেই সারিমের মুখের চতুর ভাবটা পলকে বদলে গেল। এক ঝটকায় দরজা খুলে সে যখন নিচে নামল, তখন তার চোখে-মুখে চরম বিস্ময় আর গভীর উদ্বেগ!
রাস্তায় দু-একজন পথচারী দেখে সারিম বেশ জোরে চিৎকার করে উঠল, “আরে! ওটা কে ঝোপের আড়ালে? আলভি, জলদি এসো! মনে হচ্ছে কেউ মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে!”
বসের এই ‘দয়ালু’ রূপান্তর দেখে আলভি মনে মনে বলল, ‘অস্কারের জুড়ি নাই ওনার কাছে! নিজে খাইয়া এখন আবার ডাক্তার সাজতেছে!’ তবে সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে সারিমের পেছনে দৌড়ে গেল।
ঝোপের ভেতরে ঢুকে আফিমের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে সারিম কপালে হাত ঠেকিয়ে নিখুঁত অভিনয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “এটা তো রাজন খন্দকারের ছেলে আফিম! ওর এই অবস্থা কে করল? কোন জানোয়াররা এমন পৈশাচিক নির্যাতন চালাল?!”
আফিম আধবোজা চোখে দেখল-স্বয়ং দেশের শিক্ষামন্ত্রী আবরার সারিম তার সামনে দাঁড়িয়ে, চোখে তার ব্যাকুল দয়া! আফিম তো আর জানে না, এই সুদর্শন দেবদূতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শয়তানটাই এর মূল হোতা। সে শেষ শক্তিতে সারিমের স্যুটের কোনা ছুঁয়ে গোঙাল, “বা… বাঁচান…”
“একদম চিন্তা করবে না আফিম, আমি আছি!” সারিম আলভিকে ধমক দিল, “আলভি! ওভাবে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছ কী? ওর বাঁধন খোলো! জলদি ওকে গাড়ির পেছনের সিটে তোলো। হসপিটালে নিয়ে চলো!”
আলভি বসের এই দ্বিমুখী রূপ দেখে শিউরে উঠল। সে দ্রুত আফিমের দড়ি খুলে ফেলল। দূর থেকে সাধারণ মানুষ যাতে দেখে মন্ত্রী নিজে কতটা ব্যাকুল, তাই সারিম নিজেই আফিমের হাতটা বুকে আগলে ধরে তোলার ভান করল।
ততক্ষণে কয়েকজন পথচারী আর রিকশাচালক সেখানে ভিড় জমিয়েছে। আফিমকে গাড়ির পেছনের সিটের ফ্লোরে শুইয়ে দেওয়া হলো। যন্ত্রণায় অবচেতন হতে হতেও আফিমের মগজে সারিমের এই ‘উপকারিতা’ এক মস্ত বড় ঋণের মতো গেঁথে গেল।
গাড়ির দরজা বন্ধ করে সারিম ফ্রন্ট সিটে বসতেই দয়ালু ভাবটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই খুনে, বাঁকা হাসি। দামি রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে সে জানালার বাইরে তাকাল।
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১০
আলভি গাড়ি মেইন রোডে তুলে রিয়ার-ভিউ মিররে বসের হাসিমুখ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “বস… আপনি তো আস্ত একটা চালবাজের খনি! পুরো দুনিয়ার মানুষ জানবে আপনি আফিমকে বাঁচিয়েছেন। খোদ ওর বাপ আপনার পায়ে এসে কৃতজ্ঞতায় সেজদা দেবে।বস বিশ্বাস করেন পয়সা থাকতে আমি নিজে আজ আপনাকে নোবেল প্রাইজ দিতাম, কি অ্যাক্টিং আপনার!বাহ্।
