Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৪
মেহজাবিন নাদিয়া

আরিশান মৃধা ধীর পায়ে করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেন। নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ আর হিংসাকে জোর করে চেপে রেখে যতটা সম্ভব শান্ত দেখানোর চেষ্টা করলেন তিনি।আরিশান মৃধাকে অফিসের বদলে কোচিং সেন্টারের আসতে দেখে জেবা বেশ অবাক হলো।চোখ-মুখ থমথমে তার। মনে মনে ভাবল জেবা,
_”এই লোকটা অফিসে না গিয়ে আমার পিছু পিছু কেন এসেছে?”
জেবার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরাফ এতক্ষণ জেবার সাথে গল্প করছিল। সে জেবার দিক থেকে নজর সরিয়ে সামনে তাকাতেই আরিশান মৃধাকে দেখে চমকে উঠল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এভাবে সামনাসামনি দেখবে, তা সে কল্পনাও করেনি। আরাফ অবাক হয়ে ওনার দিকে চেয়ে রইল।আরিশান মৃধা জেবার দিকে এগিয়ে এলো।তারপর হাত থেকে জেবার ফেলে যাওয়া ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,

_”তোমার ব্যাগ গাড়িতে ভুল করে ফেলে এসেছিলে।”
জেবা ওনার হাত থেকে ব্যাগটা নিল এবং মুখে একটা কৃত্রিম মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
_”ধন্যবাদ, আঙ্কেল।”
জেবার মুখে ‘আঙ্কেল’ শব্দটা শুনে আরাফ একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে বসল,
_”ওনি তোর কে হন জেবা?”
জেবা আলতো করে পাশ ফিরে আরিশান মৃধার দিকে তাকাল।চোখে তখন দুষ্টুমির আভাস। সে আরাফকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_”ওনি আমার বাবার খুব ভালো ফ্রেন্ড। আমার আঙ্কেল আরকি। তবে বাবার থেকে কোনো অংশে কম নন। আমাকে নিয়ে ওনার প্রচুর দায়িত্ববোধ! সেজন্যই তো মাঝে মাঝে আমি বাবাকে ওনার সাথে গুলিয়ে ফেলি।”
আরাফ মুচকি হেসে বলল,
_”ওহ, আচ্ছা!”
এরপর সে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল,

_”আপনাকে এভাবে এখানে দেখতে পাবো কখনো ভাবিনি, স্যার। প্লিজ, আপনার সঙ্গে একটা ছবি তোলা যাবে?”
আরিশান মৃধা এতক্ষণে ভেতরে ভেতরে রাগে পুরো ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছেন। এই মেয়েটা শেষমেষ ওনাকে নিজের বাপের সমতুল পরিচয় দিল! পুরো ব্যাপারটা ওনার কাছে মোটেও সুবিধাজনক ঠেকলো না। তিনি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। আরাফের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে, আচমকা জেবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে টেনে নিজের সাথে নিয়ে আসতে লাগলেন।
মুখের গম্ভীর ভাব বজায় রেখেই বললেন,
_”বাড়ি চলো।”
জেবা ওনার দীর্ঘ পায়ের কদমের সঙ্গে পা মেলাতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছিল। তার ওপর লোকটা জোর করে ওকে আজ এক বস্তা বোরকা আর নিকাব পরিয়েছে। জেবা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠল,

_”কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আজব তো! আমার কোচিং শুরু হয়ে যাবে।”
আরিশান মৃধা এক চুলও গতি না কমিয়ে বললেন,
_”তোমার আজ থেকে কোনো কোচিং করার দরকার নেই।”
জেবা চোখ বড় বড় করে বলল,
_”কোচিং করবো না মানে? সামনে আমার মেডিকেল অ্যাডমিশন পরীক্ষা!”
আরিশান মৃধা গাড়ি লক্ষ্য করে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
_”পড়া লাগবে না মেডিকেলে। তোমার এই মেডিকেলের পড়া আমাকে হার্টের রোগী বানিয়ে ছাড়বে।”
জেবা রাগ দেখিয়ে বলল,
_”তাহলে আমার ক্যারিয়ার?”
_”সংসার করবে।” আরিশান মৃধার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
জেবা এবার আর থাকতে না পেরে বলে উঠল,
_”কিন্তু আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না! যে আমাকে ভালোবাসে না, আমি তার সঙ্গে সংসার করবো না। ছাড়ুন আমার হাত!”
আরিশান মৃধা জেবাকে গাড়ির দরজার কাছে এনে দাঁড় করালেন।চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত জেদ। জেবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বললেন,

_”ছাড়বো না হাত। ভালোবাসা ছাড়াই সংসার করতে হবে।”
কথাটা শুনে জেবার মেজাজ আবারও চট করে বিগড়ে গেল।কী অদ্ভুত লোক! ভালোবাসে না, অথচ জোর করে সংসার করতে চায়!
_”আপনি নিজেই কিন্তু সেদিন বলছিলেন…”
আরিশান মৃধা জেবাকে জোর করে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিয়ে নিজে ধপ করে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়লেন। এরপর দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিলেন। জেবা সিটে সোজা হয়ে বসে আবার বলল,
_”আপনি কিন্তু বলছিলেন আঙ্কেল!”
আরিশান মৃধা সামনের দিকে তাকিয়েই রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_”কী বলছিলাম?”
জেবা ওনার দিকে তাকিয়ে একটু চড়া সুরে বলল,
_”ভবিষ্যতে আমার যদি অন্য কোনো ছেলেকে পছন্দ হয়, তাহলে আপনি নিজ দায়িত্বে সেই ছেলের সঙ্গে আমার বি…”

জেবা নিজের কথা শেষ করার আগেই আরিশান মৃধা একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে এক নির্জন রাস্তার পাশে ব্রেক কষলেন। গাড়ির চাকাগুলো পিচ রাস্তায় ঘষা খেয়ে শব্দ করে উঠল। আরিশান মৃধা জেবার দিকে ফিরলেন। ওনার চোখ দুটো রাগে ভয়ানক রকমের লাল হয়ে আছে।জেবা বেচারি ওনার এই রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে আঁতকে উঠল।মনে মনে নিজেকেই বকতে লাগল, _”ধুর! কে বলেছিল এভাবে ওভারডোজ দিতে? মনে হয় বেডার রাগ এবার সীমানা পার করে গেছে!”
আরিশান মৃধা কোনো কথা না বলে অত্যন্ত ঠাণ্ডা, থমথমে গলায় জেবাকে বললেন,
_”গাড়ি থেকে নামো।”
জেবা পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেল। ওনার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
_”কেন?”
আরিশান মৃধা এবার ধমকে উঠলেন,
_”নামতে বলছি, নামো!”

জেবা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। ভয়ে ভয়ে গাড়ির দরজা খুলে নিচে নেমে দাঁড়াল। জেবা নামতেই আরিশান মৃধাও গাড়ি থেকে নেমে এলেন। তবে এবার ওনার মুখাবয়ব বেশ স্বাভাবিক দেখাল। এতক্ষণের রাগের লেশমাত্র ওনার চোখে-মুখে আর অবশিষ্ট নেই। জেবা হালকা একটা ঢোক গিলে ওনার দিকে চেয়ে রইল।চারপাশে একদম নিঝুম পরিবেশ। সারি সারি সবুজ গাছপালা ঘেরা এক শান্ত জায়গা। দখিনা বাতাসের মৃদু একটা দোলা চারদিকে। একদম পাশ ঘেঁষেই নদীর স্রোত বয়ে যাচ্ছে কলকল শব্দে। জায়গাটা এতটাই মনোমুগ্ধকর যে, জেবার মন খারাপের মেঘগুলো এই সুন্দর প্রকৃতি দেখে নিমেষেই কেটে গেল। সে আরিশান মৃধার কথা ভুলে নদীর পাড়ের একদম কিনারে চলে গেল।বাতাসে জেবার ঢিলেঢালা বোরকাটা দোল খাচ্ছিল। সে গাউনের মতো করে বোরকাটার ঘের উঁচুতে তুলে ধরে মনের আনন্দে গোল হয়ে ঘুরতে থাকলো। আরিশান মৃধা যে পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, তা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
আরিশান মৃধা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চোখের পলক না ফেলে ওনার এই অবাধ্য, চঞ্চল বউয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই জায়গাটা ওনার জীবনের অনেক গভীর স্মৃতি বহন করে। যদিও জেবা তখন অনেক ছোট ছিল, তাই সেসব স্মৃতি ওর মনে থাকার কথা নয়।এই নদীপাড়ের নির্জন জায়গাটাই একসময় আরিশান মৃধার বেঁচে থাকার একমাত্র উৎস হয়ে উঠেছিল। তিনি মনে করতে লাগলেন সেদিনের কথা, যেদিন নিজেকে পুরোপুরি শেষ করে দিতে এসেও এই মেয়ের কারণেই আবার নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি পেয়েছিলেন তিনি।

জাহরিমা শিকদারের মৃত্যুর পর সোলেমান শেখ মানসিকভাবে একদম ভেঙে পড়েছিলেন। স্ত্রীর চলে যাওয়ার শোক সহ্য করতে না পেরে তিনি একসময় দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। জেবাকে যদিও তিনি ওর ফুফুর কাছে রেখে গিয়েছিলেন, তবে ফুফুর বাড়ি থাকার চেয়ে জেবা বেশিরভাগ সময় আরিশান মৃধার বাড়িতেই এসে পড়ে থাকত।আরিশান মৃধা তখন চাইলেও এই অবুঝ মেয়েটাকে ওনার বাড়ি থেকে সরাতে পারতেন না। সারিম তখন পড়াশোনার জন্য আমেরিকা থাকত। আরিশান মৃধা দেশের মাটিতে একাই দিন কাটাতেন ওনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে। আনতারা মৃধা মারা যাওয়ার পর থেকে ওনার জীবনটা কেমন যেন বেরঙিন আর একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল। একাকীত্বের কারণে সবসময় খিটখিটে মেজাজে থাকতেন তিনি।
তবে এত সব শূন্যতার মাঝেও জেবা প্রতিদিন সকাল হলেই নিয়ম করে ওনার বাড়ি চলে আসত। পুঁচকে মেয়েটা এই বাড়িতে কার টানে আসত, তা কেউ জানত না। তবে বাচ্চার স্বভাব অনুযায়ী আরিশান মৃধাও ঠিকই জানতেন, দিনশেষে বাড়ি ফিরে দেখলেই এই মেয়েটা ওনার আশায় দরজায় দাড়িয়ে আছে।

আরিশান মৃধাও শত ব্যস্ততা আর মানসিক কষ্টের মাঝে জেবার জন্য প্রতিদিন চকলেট কিনতে একদম ভুল করতেন না। জেবাও সবসময় আরিশান মৃধার হাতের সেই চকলেটের আশায় পথ চেয়ে বসে থাকত।ধীরে ধীরে আরিশান মৃধার একাকী জীবনে জেবা একটা বড় অংশ হয়ে উঠতে থাকে। তিনি জেবাকে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। জেবা কত রকমের বায়না ধরত, আর ওনার হাত ধরে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াত। ছোট্ট জেবা ফুফুর বাড়ির বাড়ি থাকলেও সেখানে একাকিত্বে ওর মন টিকতো না। সাদমান তখন মেডিকেল পড়ে,পড়াশুনায় ঘাটতি না হওয়ার জন্য হোস্টেলে থাকতো সে। আরা সারাদিন স্কুল কোচিং নিয়ে ব্যাস্ত। জেবাকে সময় দেওয়ার মতো তখন কেউ ছিলো না। আনজুমান বেগম নিজের সংসারের কাজে ব্যাস্ত থাকতেন।জেবা ভিষন মনমরা হয়ে সেই বাড়িতে থাকলো। ওকে সময় দেওয়ার মতো কারো কাছে সময় থাকতো না।একাকিত্ব আর একঘেয়ি জীবনের মাঝে আরিশান মৃধাকে ওর সকল আবদার পূরন করতে দেখে, ছোট জেবা এক অদ্ভুত আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে থাকত।

সময়টা ছিল আজ থেকে ঠিক এগারো বছর আগের। জেবার বয়স তখন ছিল মাত্র নয় বছর…
সেদিনও আরিশান মৃধা সারাদিনের অফিশিয়াল কাজ শেষ করে বেশ ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরেছিলেন। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে নিজের শোবার ঘরে ঢুকতেই ওনার চোখ পড়ল বিছানার দিকে। ছোট্ট জেবা ওনার রুমের খাটের ওপর বসে আপনমনে পুতুল খেলছে। আরিশান মৃধাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মেয়েটার মলিন মুখটা নিমেষেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে হাতের পুতুলটা বিছানায় ফেলে এক গাল হাসি নিয়ে খুশি মনে দৌড়ে এসে ওনার কোমর জড়িয়ে ধরল।
আরিশান মৃধা কোনো কথা না বলে চুপচাপ শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। জেবা ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আবদারের সুরে বলল,
_”আমার চকলেট কোথায়, হানি আঙ্কেল? এনেছ?”
আরিশান মৃধা কোনো উত্তর দিলেন না,ওনার হাত একদম খালি।জেবা ওনাকে ওভাবে খালি হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু দমে গেল। ও নিজেই আবার ঠোঁট উল্টে বলল,
_”ওহ, ভুলে গেছ বুঝি? আচ্ছা থাক, সমস্যা নেই। রাগ করব না। কালকে মনে করে ডাবল এনে দিও, হানি আঙ্কেল।”

তবুও আরিশান মৃধা একদম নীরব। ওনার মুখে কোনো,রা কাড়তে না দেখে জেবা ওনার কোটের হাতা ধরে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”কী হয়েছে তোমার, হানি আঙ্কেল? কথা বলবে না আমার সঙ্গে? তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”
আরিশান মৃধা এবার জেবার মুখের দিকে তাকালেন। নিজের চোখ-মুখ কঠোর করে অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
_”তুমি আর কখনো এই বাড়িতে আসবে না জেবা। এখনি বাড়ি ফিরে যাবে।”
নিজের এত প্রিয় আর ভরসার মানুষের মুখ থেকে এমন একটা কথা শুনবে,তা ভাবতেও পারেনি জেবা। ছোট মেয়েটার বুকটা ধক করে কেঁপে উঠল।সে বড় বড় চোখ করে তাকাল আরিশান মৃধার দিকে। ও কি কোনো বড় ভুল করে ফেলেছে? যার জন্য ওর হানি আঙ্কেল আজ তার ওপর এত রেগে আছে।যার কারনে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছে ওকে?
জেবা কান্নাভেজা চোখে আরিশান মৃধার কোটের হাতাটা আরো শক্ত করে খামচে ধরল। ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেলার ভঙ্গিতে মিনমিন করে জিজ্ঞাসা করল,
_”কেন আসব না, হানি আঙ্কেল? তুমি কি আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ? কিন্তু আমি তো কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে!”

আরিশান মৃধা নিজের মন শক্ত করলেন। জেবার কান্না দেখেও তিনি ওনার স্বভাবসুলভ কঠোর গলায় বললেন,
_”আমার সাথে তোমার কী সম্পর্ক, বলো? আমি তোমার কী হই? কোন পরিচয়ে তুমি প্রতিদিন এখানে বারবার ছুটে আসো? নিজের বাড়ি যেতে বলছি, বাড়ি যাবে। এখানে আর কখনো পা রাখবে না তুমি।”
আরিশান মৃধার এমন ধমক আর রুক্ষ কথা শুনে ছোট্ট জেবা আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওনার দূর-দূর ছাই-ছাই ভাব দেখে ও যেন আরও বেশি জেদি হয়ে উঠল। আচমকা আরিশান মৃধার কোমর দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের ছোট ছোট দাঁত কামড়ে জেদ নিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
_”না! আমি কোথাও যাব না। এটা আমারও বাড়ি! তুমিও আমার! আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাব না, শুনতে পাচ্ছ তুমি?”

আরিশান মৃধা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এতটুকু একটা মেয়ের ভেতরের এই অবাধ্য জেদ দেখে তিনি মনে মনে ভীষণ তাজ্জব বনে গেলেন। মেয়েটা এসব কী বলছে! ওনার রাগটা এবার আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। তিনি নিজের আবেগকে প্রশ্রয় না দিয়ে জেবাকে জোর করে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। তারপর ওর ছোট্ট কবজিটা খপ করে ধরে টেনে হিঁচড়ে রুম থেকে বের করে একপ্রকার হড়হড় করে এনে গাড়ির ভেতর বসালেন।
জেবা তখনো একনাগাড়ে কেঁদে চলেছে আর বলছে সে আরিশান মৃধাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। কিন্তু আরিশান মৃধা কোনো কথা শোনে না ওর। জোর করে গাড়ি চালিয়ে জেবাকে আনজুমান বেগমের বাড়িতে রেখে একপ্রকার পালিয়ে চলে আসেন। বাড়ির বাইরে এসে আরিশান মৃধার নিজের ভেতরের পুরুষালি মনটাও কি ডুকরে কেঁদে ওঠেনি? ভীষণ কষ্ট হয়েছিল ওনারও। এই অল্প কয়েকটা দিনেই মেয়েটা ওনার বেরঙিন জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সমাজ বলতেও তো একটা জিনিস আছে! ওনার মতো একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রী যদি এভাবে একটা পর-মেয়ের বাচ্চাকে সারাদিন নিজের কাছে আগলে রাখেন, তবে এই সমাজ ওনার চরিত্র আর ক্যারিয়ারে আঙুল তুলতে দুবার ভাববে না। তার ওপর জেবা এখানে এসে দিন দিন নিজের পড়াশোনার কথা ভুলে যাচ্ছিল, ও ফুফুর বাড়ি আর ফিরতেই চাইত না। সব দিক বিবেচনা করেই আরিশান মৃধা জেবাকে নিজের থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

জেবাকে তার ফুফুর বাড়িতে রেখে আরিশান মৃধা নিজের গাড়িতে ফিরে এলেন,চারদিকে ইতিমধ্যে তখন বেশ রাত।একদম থমথমে, নিশুতি। ফেরার পথে তিনি একটা নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ওনার নজর পড়ল রাতের আঁধারে জোনাকির আলোয় ভেসে থাকা একটা চেনা জায়গায়।এই জায়গাটি আরিশান মৃধার ভীষণ প্রিয়। আনতারা মৃধা বেঁচে থাকতে দুজনে প্রায় সময় এখানে এসে বসতেন, গল্প করতেন। কী মনে করে যেন আরিশান মৃধা চলন্ত গাড়িটা একপাশে থামিয়ে দিলেন। কেন যেন আজ ওনার ওই বিশাল, ফাঁকা বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই।
তিনি ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে নদীর কিনারায় এসে দাঁড়ালেন। কলকল শব্দে স্রোত বয়ে চলছে নদীর বুকে। সেই পানিতে রাতের চাঁদের আলো প্রতিফলিত হতেই। নিজের মুখটা দেখতে পেলেন। এক তীব্র একাকীত্ব ওনাকে চারপাশ থেকে যেন জেকে ধরল। প্রিয়তমা ছেড়ে গেছে সেই কবে! একমাত্র ছেলেও এখন নিজের ক্যারিয়ারের পথে এগিয়ে গেছে।ছেলের ভবিষ্যতের জন্য যে ব্যবস্থা করে গেছেন, তা দিয়ে সারিমের জীবন অনায়াসে কাটবে।
আজ এই পুরো পৃথিবীটা ওনার কাছে কেমন ধোঁয়াশা আর অর্থহীন ঠেকল। সব দায়িত্ববোধ থেকে আজ তিনি মুক্ত, সম্পূর্ণ দায়মুক্ত। এবার হয়তো ওনি ওনার তারার কাছে ফিরে গেলে আর কোনো সমস্যা হবে না। কেউ ওনাকে আটকানোর নেই।

আরিশান মৃধা বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলেন। মনে মনে ভাবলেন-এই তো, ওনিও এখন ওনার তারার কাছে চলে যাবেন। বেঁচে থাকার মূল উৎসটাই যখন নেই, তখন আর মিছে বেঁচে থেকে কী লাভ? মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে মনে মনে এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর প্রতি একটু অভিযোগ করতেও ভুললেন না তিনি। পৃথিবী ওনাকে কেন এমন একটা নিঃসঙ্গ পরিবেশ দিল? সব থেকেও আজ ওনার নিজস্ব বলতে কিছুই নেই। ওনার ভালোবাসার মানুষ ওপাড়ে চলে গেছে,যাদের তিনি ভালোবাসতেন তারা ওনাকে কখনো ভালোবাসে নি।এসব ভেবে আরিশান মৃধা যখনই নিজের শরীরটা নদীর পানিতে ছেড়ে দিতে যাবেন, ঠিক তখনই একজোড়া শক্ত পিচ্চি হাত পেছন থেকে ওনার কোমর জাপ্টে ধরল! আর তীব্র আর্তনাদ বাতাসে ভেসে এল।
_”তুমি ঝাঁপ দেবে না একদম!”
আরিশান মৃধা চরম অবাক হয়ে পাশে ফিরতেই দেখলেন-জেবা!সাথে সাথে বিস্ময়ে তিনি পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন।এই মেয়ে এখানে কিভাবে আসলো। ওনি তো মেয়েটাকে রেখে এসেছিলেন।
জেবা ওনাকে নিজের পুরো শক্তি দিয়ে টেনে পাড়ের কিনারা থেকে পেছনে আনতে চাইছে। আরিশান মৃধা ওনার ঘোরের মধ্য থেকেই অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,

_”তুমি… তুমি এখানে কীভাবে?”
জেবা কোনো উত্তর দিল না। শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। আরিশান মৃধা চোখ এবার দূরে দাঁড়ানো ওনার গাড়ির দিকে গেল।গাড়ির ডিকিটা খোলা দেখে যা বোঝার তিনি এক নিমেষেই বুঝে নিলেন।এইটুকু মেয়ের কলিজা দেখে তিনি রিতিমতো বিষ্ময়ের চরম সীমানায় চলে গেছেন।
জেবা ওনাকে বারবার পাড়ের কিনারা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
_”তুমি ওখান থেকে সরে এসো, নয়তো পড়ে যাবে তুমি!”
আরিশান মৃধা জেবার এমন টানাটানি দেখে গম্ভীর গলায় বললেন,
_”জেবা, ছাড়ো। আমার কিছু হবে না।”
নয় বছরের জেবার দুচোখ বেয়ে তখন নোনা জল ঝরছে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
_”না ছাড়বো না! তুমি এখান থেকে ঝাঁপ দেবে না। মিথ্যা বলছ তুমি! আমি জানি তুমি একবার চলে গেলে আর কখনো ফিরে আসবে না।তখন আমি কার কাছে থাকব? আমাকে আদর করার মতো কেউ থাকবে না… মায়ের মতো তুমিও পচা হয়ে যাচ্ছ, আমাকে খালি ছেড়ে যেতে চাও!”

আরিশান মৃধার পুরো শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে শক্ত হয়ে গেল।চোয়ালজোড়া শক্ত, চাউনিতে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত শূন্যতা ও গাম্ভীর্য। কিন্তু এই পিচ্ছি মেয়েটার অনবরত টেনে ধরার আকুলতা ওনাকে থমকে দিতে বাধ্য করল।জেবা নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওনাকে নদীর কিনারা থেকে পেছনে টানছে আর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে,
_”তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না। তুমি আমার সাথে থাকবে সারাজীবন। তুমি চলে গেলে জেবা অনেক কষ্ট পাবে, জেবাও তখন তোমার সাথে এখানে মরে যাবে!”
আরিশান মৃধা ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। ওনার মুখাবয়ব পাথরের মতো গম্ভীর, চোখে কেবল এক চিলতে শীতলতা। নিচু আর ভারী গলায় ওনি প্রশ্ন করলেন,

_”আমি কে হই তোমার যে, তোমার কথা শুনে আমার এখন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে?”
জেবা ওনার কোটের হাতাটা খামচে ধরে, চোখভরা জল নিয়ে মুখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য যেন ওনার সমস্ত গাম্ভীর্যকে ও নিজের নিষ্পাপ চাহনি দিয়ে গলিয়ে দিতে চাইল। ভাঙা গলায় বলে উঠল জেবা,
_”তুমি আমার হানি! হানি যেমন মিষ্টি, তুমিও ঠিক অনেক মিষ্টি। প্লিজ, তুমি যেও না আমাকে ছেড়ে… তুমি গেলে আমাকে ঘুরতে কে নিয়ে যাবে? আমাকে চকলেট কে এনে দিবে!”
আরিশান মৃধা স্তব্ধ হয়ে গেলেন।পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই নদীর পাড় থেকে পেছনের দিকে সরে এল।ভেতরের কঠোর, একগুঁয়ে মানুষটা-যে একবার যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই-ই করে-সে আজ এইটুকু একটা মেয়ের কান্নার কাছে আকস্মিক থমকে গেছে। ওনার কানে তখনো জেবার কথাগুলো বারবার বাড়ি খাচ্ছিল।এইটুকু মেয়ে নাকি ওনাকে ছাড়া বাঁচবে না?ওনি কি আসলেই মেয়েটার জন্য এতটাই ভরসাযোগ্য স্থোল হয়ে উঠলো। যার কারনে মেয়েটা ওনাকে ছাড়তে নারাজ।

আজ তো ওনি সব ছেড়ে, সব মায়া কাটিয়ে ওনার ‘আনতারা’র কাছে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটার কান্নার কাছে আরিশান মৃধা হেরে গেলেন। ভেতরের গম্ভীর পুরুষটা চেয়েও আজ আর জীবনের চরম ও শেষ সিদ্ধান্তটা নিতে পারলেন না।ওনাকে পাড় থেকে পুরোপুরি সরে আসতে দেখে জেবার কান্নামুখর চেহারায় যেন এক চিলতে স্বস্তির আলো ফুটে উঠল। ও খুশিতে ডগমগ হয়ে আরিশান মৃধার কোমর জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,
_”হানি! প্রমিস করো তুমি কক্ষোনো আমায় ছেড়ে যাবে না, সারাজীবন আমার সাথে থাকবে!”
আরিশান মৃধা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার গম্ভীর মুখে কোনো চটজলদি উত্তর ছিল নেই, কিন্তু জেবার আকুলতার সামনে সব জেদ ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হলো। বাচ্চা মেয়েটার মন রাখতে,ভেতরের গম্ভীর মানুষটা এক বুক দীর্ঘশ্বাস চেপে আলতো করে মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ, ওনি প্রমিস করলেন।

জেবা নিজের চোখের জল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের ছোট্ট পিংকি আঙুলটা ওনার দিকে বাড়িয়ে দিল। আরিশান মৃধাও ওনার আঙুলটি সেই ছোট্ট আঙুলের সাথে মেলালেন।এক গম্ভীর, পুরুষের জীবন আজ থমকে গেল এক অবুঝ শিশুর নিষ্পাপ প্রতিশ্রুতির অটুট বাঁধনে।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আরিশান মৃধা যখন অতীতের এই গভীর স্মৃতি থেকে বাস্তবে ফিরলেন, তখন ওনার চোখ গেল জেবার দিকে, যে এখনো বোরকাটা উঁচিয়ে নদীর বাতাসে আপন মনে গোল হয়ে ঘুরছে।আরিশান মৃধার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে গভীর হাসি ফুটে উঠল।বিরবির করে বলে উঠেন।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৩

_”যে মেয়েটা নয় বছর বয়সে আমাকে মরতে দেয়নি, আজ এই বয়সে এসে সে আমার জীবন থেকে কীভাবে চলে যাওয়ার কথা ভাবে? অসম্ভব! ভালোবাসা থাকুক আর না থাকুক, এই হাত আমি আর কখনো ছাড়ছি না।”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here