Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৬
মেহজাবিন নাদিয়া

_”আলভি ভাই, প্লিজ ছেড়ে দিন আমাকে! আমি আপনার জুতোগুলোও যেভাবে হোক ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করব।”
আলভি মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল,
_”না রে চুন্নি, তোকে এত সহজে ছাড়া যাবে না। আগে এক্ষুনি আমার জুতো এনে দে, তাহলেই কেবল ছাড়ার কথা ভাবা যাবে।”
আলভির এই জেদাজিদির মাঝেই সারিম হাত তুলে তাকে শান্ত হতে ইশারা করল। গম্ভীর গলায় বলল,
_”আলভি, ছেড়ে দাও একে।”
আলভি বেশ অবাক হয়ে বলল,
_”কিন্তু স্যার! ও আপনার লাখ টাকার ঘড়ি…”
_”কোনো কিন্তু নয় আলভি, যা বলছি শোনো।” সারিমের কণ্ঠে আদেশ। আলভি অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনুপমার চুলের মুঠি আলগা করে দিল।
সারিম এবার অনুপমার দিকে তিলে তিলে জমানো রাগ মিশ্রিত তীক্ষ্ণ নজর ফেলে বলল,
_”তোকে আমি ঠিক এক মাস সময় দিচ্ছি। এই এক মাসের মধ্যে আমার যা যা জিনিস চুরি করেছিস, তার সব হুবহু ফিরিয়ে দিবি। মনে থাকে যেন!”
অনুপমা যেন ফাঁসির দড়ি থেকে রেহাই পেল। সে দ্রুত ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে বলল,
_”হ্যাঁ হ্যাঁ, সারিম ভাই! এক মাসের মধ্যেই আপনাদের সমস্ত জিনিস একদম ঠিকঠাক পেয়ে যাবেন। আমি নিজ দায়িত্বে দিয়ে আসব।”

সারিম এবার আলতো করে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে অনুপমাকে যাওয়ার রাস্তা করে দিল। অনুপমা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিল না, প্রায় দৌড়ে সেখান থেকে চম্পট দিল।
অনুপমা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতেই সারিম আর আলভি একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় চওড়া হাসি হাসল। এতক্ষণের সেই রাগী ভাবটা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সারিম আলভির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
_”জিপটা ঠিকঠাক মতো লাগাতে পেরেছ তো?”
আলভি হাতে থাকা অফিশিয়াল ডিজিটাল ট্যাবটা বের করল। সেটার স্ক্রিনটা সারিমের দিকে ঘুরিয়ে বেশ তৃপ্তির হাসি হেসে বলল,
_”জি স্যার, একদম পারফেক্টলি সেট করে দিয়েছি। লোকেশন অলরেডি অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে।”
ঠিক তখনি তাদের দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল আয়ুশ। সে পুরো ব্যাপারটা দূর থেকে দেখছিল। আয়ুশ এসে কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল,

_”যাক, বুদ্ধির খেলাটা ভালোই খেলেছে। এখন ওর ওপর নজর রাখলেই আসল কালপ্রিট অবধি পৌঁছানো সম্ভব হবে।”
সারিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_”হুম। তবে তার আগে ওই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে রাখা ভালো। নয়তো পরে কোনো গণ্ডগোল হলে সব দোষ আমাদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেবে।”
আয়ুশ সম্মতি প্রকাশ করে বলল।
_”ঠিক আছে।আমি অবিরামকে দিয়ে ইমেইল সেন্ড করে দিবো।
আলভি পাশ থেকে হঠাৎ একটু উৎসুক হয়ে সারিম কে বলে উঠল,
_”আচ্ছা স্যার, একটা কথা শুনলাম-আপনার মা নাকি কবর থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে? আই মিন, উনি নাকি বেঁচে আছেন! আঙ্কেল নিশ্চয়ই আন্টিকে এতদিন পর ফিরে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছেন, তাই না?”
সারিম ভেংচি কেটে বলল,

_”কচু হয়েছে! মন্ত্রীর এখন দিনকাল খুব ব্যস্ত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই বউ সামলাতে গিয়ে বেচারার জান ওষ্ঠাগত!”
সারিমের মুখে ‘দুই বউ’ কথাটা শুনে আয়ুশ আর আলভি-দুজনেই একটু বিষ্মিত হলো।আয়ুশ চরম অবাকতা নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_”দুই বউ মানে কী? আরেকজন কোত্থেকে এলো?”
সারিম খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
_”কোত্থেকে আবার আসবে, বিয়ে করে এসেছে!”
আলভি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে বলল,
_”আঙ্কেল এই বয়সে এসে আবার বিয়ে করলেন? কবে, কখন?”
সারিম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
_”করেছে, যখন করার দরকার ছিল তখনই করেছে। কিন্তু বেচারার বর্তমান দিনকাল মেলা দুঃখের। বড়টাকেও রাখতে পারছে না, আবার ছোটটাকেও ছাড়তে পারছে না। এক্কেবারে মাইনকা চিপায় পড়ে গেছে!”
আয়ুশ মাথা চুলকে বলল,

_”এটা তো আসলেই সাংঘাতিক অবস্থা!”
আলভি একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
_”স্যার, মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম… মহিলা হিসেবে সে কেমন?”
সারিম ভ্রু কুঁচকে বলল,
_”কোন মহিলার কথা বলছ?”
আয়ুশ মাঝখান থেকে ফোড়ন কেটে দাঁত কেলিয়ে বলল,
_”কেন, তোর সৎ মায়ের কথা বলছে!”
সারিম হুট করে হেসে উঠে বলল,
_”ওহ, জেবার কথা বললি? কেমন আবার হবে, ভালোই।”
আলভি বেচারা ঠিক ওই মুহূর্তেই পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস পানি নিয়ে মুখে ঢেলেছিল। ‘জেবা’ নামটা শোনামাত্রই বিষম খেয়ে তার নাক-মুখ দিয়ে পানি ছিটকে বের হয়ে এল! ওদিকে আয়ুশের নিজেরও পুরো ভিমরি খাওয়ার দশা।নিজেকে কোনমতে সামলে বলল আয়ুশ,
_”আর ইউ জোকিং! আরিশান আঙ্কেল আর জেবা! ফাজলামি বন্ধ কর তো। ওদের এইজ ডিফারেন্স দেখছিস তুই?”
সারিম আয়ুশকে একটু মেপে নিয়ে বাঁকা হেসে বলল,

_”সো হোয়াট?বয়স একটা সংখ্যা মাএ।আমার বাবা এখনো তোর চাইতে বেশি সুন্দর আর ড্যাশিং। নিজের চেহারাটা কখনো আয়নায় দেখিস? হিরো আলমও তোর চেয়ে বেশি সুন্দর আছে!”
আলভি বেচারা একহাতে নিজের কাশি সামলাচ্ছিল, কিন্তু সারিমের এই তুলনা শুনে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, ফিক করে হেসে দিল।আয়ুশ এবার চরম রেগে গিয়ে দুজনের দিকে তাকাল। অপমানে তার কান-ঝাঁঝা করতে লাগল। সে গলার রগ ফুলিয়ে বলল,
_”আমাকে এভাবে অপমান করছিস তোরা? মানলাম তোদের মতো অত হ্যান্ডসাম আমি নই, তবুও একটু খোঁজ নিয়ে দেখিস-আমার পেছনে শত শত মেয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে এই ‘আয়ুশ কায়দার’কে বিয়ে করার জন্য!”
আলভি পাশ থেকে হাসিমুখে আর একটু ঘি ঢেলে দিয়ে বলল,

_”জি স্যার, আপনি একদম ঠিক বলেছেন, আমি নিজে তার প্রমাণ! আমাদের ফ্ল্যাটের ওই যে নাজহা মোটা মেয়েটা আছে না? সে আপনার প্রেমে পুরো পাগল। রোজ আপনার নাম ধরে আমার কাছে খোঁজখবর নেয়।”
আলভির কথা শুনে সারিম আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না, রেস্তোরাঁর সবার সামনেই শব্দ করে হেসে ফেলল। আয়ুশ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দুজনের দিকে তাকাল।সারিম আয়ুশের কাঁধে একটা চটি মেরে হাসি থামিয়ে বলল,
_”সব জায়গায় সব কথা বলতে নেই আলভি। পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হয়।নয়তো দেখা যাবে অপর পাশের ব্যাক্তির পেটে অতিরিক্ত গ্যাস জমা হয়ে ফুলে উঠেছে।
আলভি বলল,

_”একদম ঠিক স্যার।
আয়ুশ দুজনের দিকে রাগি চোখ করে তাকিয়ে থাকে। তবে কিছু বলে না। এদের সঙ্গে কথা বলে নিজের বাকি মানসম্মান আর খুয়াতে চায় না বেচারা।তার চেয়ে চুপ থাকা ঢের ভালো।
গুদামের এক স্যাঁতসেঁতে কোণে কাঠের চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে সোলেমান শেখকে। কেটে গেছে পুরো একটা দিন। হাত ও পায়ের চামড়া ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, সারা শরীরে কালচে দাগ-পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ওনার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে চৌচির।
ঠিক তখনই গুদাম ঘরের দরজা খোলার তীব্র কর্কশ আওয়াজ হলো। লোহার ভারী দরজাটা খুলতেই বাইরের তীব্র আলোর ছটা এসে পড়ল সোলেমান শেখের মুখের ওপর। দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকায় হঠাৎ আলো সইতে না পেরে তিনি অসহ্য যন্ত্রণায় চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেললেন।
ভেতরে প্রবেশ করলেন দেলোয়ার, তার ঠিক পেছনেই ক্রূর চাউনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আনতারা মৃধা ও অনুপমা। সোলেমান শেখের মুখটা একটা মোটা কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল। ওনাদের দেখামাত্রই তিনি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে হাত-পা মোচড়াতে লাগলেন, কিন্তু বাঁধন বিন্দুমাত্র আলগা হলো না।
দেলোয়ার কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে একটা ভারী কাঠের চেয়ার টেনে এনে একদম সোলেমান শেখের মুখোমুখি বসলেন। সোলেমান শেখ তখন রক্তচক্ষু নিয়ে, দেলোয়ারের দিকে তাকিয়ে আছেন। অনুপমা তার বাবার কাঁধে এক হাত রেখে বাঁকা হেসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

দেলোয়ার হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় সোলেমান শেখের মুখের কাপড়টা টেনে খুলে নিলেন। বাঁধন মুক্ত হতেই সোলেমান শেখ হাঁপাতে হাঁপাতে বুক ভরে কয়েকটা লম্বা লম্বা শ্বাস নিলেন। তারপর দেলোয়ারের চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র আক্রোশে চেঁচিয়ে উঠলেন,
_”ছাড়ো আমাকে! কেন আটকে রেখেছ?”
দেলোয়ার হা হা করে উপহাসের ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন।
_”ছাড়ব তো,অবশ্যই ছাড়ব, তবে তার আগে সেই লকেটটা আমাদের হাতে তুলে দাও।”
সোলেমান শেখ যন্ত্রণাকাতর গলায় বললেন,
_”আমি কোনো লকেটের ব্যাপারে জানি না! কতবার বলব এক কথা?”
দেলোয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আনুপমা এবার ফুঁসে উঠলেন।

_”মিথ্যা বলে পার পেয়ে যাবে ভাবছ? আমরা খুব ভালো করেই জানি, ওই লকেট তোমার কাছেই আছে।”
_”আমি বললাম তো আমার কাছে কোনো লকেট নেই!” সোলেমান শেখের গলার স্বর চড়ে গেল।দেলোয়ারের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। তিনি অত্যন্ত কর্কশ ও হিংস্র গলায় বললো,
_”লকেট যদি তোমার কাছে নাও থাকে, তবে জাহরিমা মরার আগে ওটা কোথায় লুকিয়ে রেখে গেছে, সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো! সত্যিটা বলো!”
সোলেমান শেখ কাতর কণ্ঠে বললেন,
_”আমি সত্যিই বলছি, আমি কোনো লকেট সম্পর্কে জানি না। জাহরিমা আমাকে কোনো লকেটের কথা বলেনি।”
এইটুকু বলেই সোলেমান শেখ আনতারা মৃধার দিকে তাকালেন। ওনার চোখে তখন তীব্র বিস্ময় আর ঘৃণা। তিনি বললেন,
_”আনতারা, এসব কী হচ্ছে? আমি তোমাকে কত ভালো আর ভদ্র একজন মানুষ ভাবতাম! অথচ তুমি… ছিঃ! একটা সামান্য লকেটের জন্য তুমি আমাকে এভাবে বন্দি করে মারধর করছ?”
আনতারা মৃধা এবার সোলেমান শেখের একদম কাছে এগিয়ে এলেন। ওনার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পিশাচী হাসি। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,

_”ঐটা কোনো সামান্য লকেট নয়! ওইটা ছিল একটা আস্ত টাকার খনি!”
সোলেমান শেখ আকাশ থেকে পড়লেন।
_”টাকার খনি? এর মানে কী?”
আনতারা মৃধা এবার অতীত হাতড়াতে শুরু করলেন। ওনার চোখের চাউনি আরও শীতল হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন,
_”আজ থেকে বিশ বছর আগের কথা। যখন আমি সবেমাত্র নতুন হসপিটালে হার্ট সার্জন হিসেবে জয়েন করেছিলাম, তখন সেই একই হাসপাতালে জাহরিমাও চাকরি করত। একসাথে কাজ করার সুবাদে আমরা খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠি। কথায় কথায় একদিন আমি জাহরিমার অতীতের কথা জানতে পারি। জানতে পারি, তোমার আগে ওর জীবনে একজন প্রেমিক ছিল। সে আর কেউ নয়, এই দেলোয়ার।”
সোলেমান শেখ স্তব্ধ হয়ে দেলোয়ারের দিকে তাকালেন। আনতারা বলতে থাকলেন,
_”পারিবারিক স্ট্যাটাসের কারণে জাহরিমার বড়লোক বাবা দেলোয়ারের মতো এক সামান্য মধ্যবিত্ত ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না। কিন্তু তারা তখন জানতেন না যে, কলেজ লাইফেই জাহরিমা আর দেলোয়ারের সম্পর্ক কতটা গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল। ঘণিষ্ঠতার এক পর্যায়ে জাহরিমা প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে। দেলোয়ার কোনোভাবেই বাচ্চাটা নষ্ট করতে রাজি ছিল না।”
আনতারা একটু থামলেন, সোলেমান শেখের মুখের চ্যুত হওয়া রঙ দেখতে দেখতে আবার বলতে শুরু করলেন,

_”এই খবর যখন জাহরিমার বাবার কানে যায়, তিনি রাগে-ক্ষোভে জাহরিমাকে ত্যাজ্য করে দেন। দেলোয়ার তখন জাহরিমাকে নিয়ে একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকতে শুরু করে। কিন্তু দুজনের আর্থিক অবস্থা তখন এতটাই খারাপ ছিল যে, ঠিকমতো দু-মুঠো ভাত জোটালাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যেই জাহরিমা মেডিকেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল আর ওদিকে তাদের একটা কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তারা দুজনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ঠিক করে, আগে নিজেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে, তারপর বিয়ে করবে। তাই তারা তাদের সদ্যজাত ছোট মেয়েটাকে একটা অনাথ আশ্রমে রেখে আসে। ঠিক করে, নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে আবার মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনবে। এরপর যে যার মতো নিজের লক্ষ্য গড়তে চলে যায়। জাহরিমা তার বাবার কাছে ফিরে গিয়ে মিথ্যা বলে যে, সে তার বাচ্চাটা নষ্ট করে ফেলেছে এবং নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। মেয়ের মুখে এই কথা শুনে জাহরিমার বাবা ওকে আবার বুকে টেনে নেন।”
সোলেমান শেখ নির্বাক হয়ে সব শুনছিলেন।এই অন্ধকার ইতিহাস ওনার ধারণারও বাইরে ছিল।
আনতারা বলতে লাগলেন,

_”এরপর কেটে যায় আরও প্রায় পাঁচ বছর। দেলোয়ার তখন চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মেজর পদের ট্রেনিং নিচ্ছিল, আর জাহরিমা ঢাকায়। দুজনের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু মনের ভেতরে ভালোবাসা তখনও ফুরিয়ে যায়নি। জাহরিমা ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো, ওদিকে দেলোয়ারও নিজের পায়ে দাঁড়াল। এরপর একদিন দেলোয়ার যখন বুক ভরা আশা নিয়ে জাহরিমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল, তখন সে জানতে পারল জাহরিমার বিয়ে হয়ে গেছে! কার সাথে জানো? তোমার সাথে!”
সোলেমান শেখ দেলোয়ারের দিকে তাকাতেই দেখা গেল ওনার চোখ দুটো ক্ষোভে জ্বলছে। আনতারা বললেন,
_”জাহরিমার বাবা নিজের অসুস্থতার নাটক করে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বাধ্য করেছিল জাহরিমাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে করতে। জাহরিমাও বাবাকে খুব ভালোবাসত, তাই বাধ্য হয়ে সে তোমাকে বিয়ে করে। সেই দিনের পর দেলোয়ার আর কোনোদিন জাহরিমার সামনে যায়নি। প্রেমিকার কাছ থেকে এমন ধোঁকা সে সহ্য করতে পারছিল না।এভাবে আরও একটা বছর কেটে গেল। দেলোয়ারের জীবনেও অন্য এক নারী এল এবং তারা বিয়ে করে নিল। কিন্তু মাঝখান থেকে হারিয়ে গেল ওদের সেই প্রথম কন্যাসন্তানটা, যাকে ওরা আর কোনোদিন খুঁজে আনেনি। এদিকে জাহরিমা তোমাকে বিয়ে করার পর আস্তে আস্তে নতুন সংসার মেনে নিলেও, মনের গোপনে সে দেলোয়ারকেই ভালোবাসত। তোমাদের সংসার তখন বেশ হাসিখুশিই কাটছিল। আমি তখনও জানতাম না যে তুমি আরিশানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।”

রুমের থমথমে ভাবটা আরও বেড়ে গেল। আনতারা মৃধা আবার বলতে লাগলেন,
_”এরই মধ্যে আরও দু-বছর কেটে গেল। আমার আর জাহরিমার বন্ধুত্ব তখন তুঙ্গে। ওই হাসপাতালেই এক জুনিয়র ডাক্তার কাজ করত, নাম জুইফান। সে মনে মনে আমাকে খুব পছন্দ করত। ধীরে ধীরে আমি আরিশানকে ভুলে জুইফানের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। একসময় আমি জানতে পারি, জুইফান হাসপাতালের আড়ালে বিভিন্ন বেআইনি কাজ করত। সে চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের শরীর থেকে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বের করে চড়া দামে পাচার করে দিত! এই ব্যবসায় প্রচুর প্রফিট ছিল।”
সোলেমান শেখের চোখ দুটো এবার কপালে উঠল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,
_”তোমরা… তোমরা অঙ্গ পাচারকারী?!”
“হ্যাঁ !”

আনতারা বিকৃত হেসে বললেন, _”টাকার লোভ বড় লোভ। ধীরে ধীরে আমিও জুইফানের সাথে এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ি। প্রথমে ছোটখাটো অঙ্গ নিয়ে কাজ করলেও পরে ভাবলাম বড় কোনো প্রজেক্ট হাত দেব। যার জন্য আমাদের আরও বিশ্বস্ত সাথীর প্রয়োজন ছিল। আমরা টার্গেট করলাম জাহরিমাকে। সে প্রথমে রাজি না হলেও, আমি যখন তাকে দেলোয়ারকে আবার তার জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার লোভ দেখালাম, বোকা নারী টাকার আর ভালোবাসার লোভে রাজি হয়ে গেল! এরপর জাহরিমা দেলোয়ারের সাথে যোগাযোগ করে তাকেও এই ব্যবসায় টানে। যেহেতু দেলোয়ার তখন একজন মেজর ছিল, বর্ডার পার করে অঙ্গগুলো নিরাপদে পাচার করতে ও আমাদের দারুণ সাহায্য করত।ধীরে ধীরে আমরা চারজন মিলে এই ব্যবসায় এতটাই ডুবে গেলাম যে আমাদের আর কোনো হিতাহিত জ্ঞান রইল না। ওই সময় জাহরিমাও প্রেগন্যান্ট ছিল, আবার কাকতালীয়ভাবে দেলোয়ারের স্ত্রীও প্রেগন্যান্ট ছিল। আমরা দেলোয়ারের স্ত্রীর ডেলিভারির নাম করে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিয়ে ওর শরীর থেকে দুটো কিডনি আর জরায়ু কেটে রেখে দিই! ওদের একটা মেয়ে সন্তান হয়েছিল। অপারেশনের কিছুদিনের মধ্যেই দেলোয়ারের স্ত্রী মারা যায়। দেলোয়ার প্রথমে এই কথা জানতে পেরে খুব রেগে গিয়েছিল, কিন্তু জাহরিমা তাকে ভালোবাসার মায়ায় সামলে নেয়।”

সোলেমান শেখের শরীর এবার শিউরে উঠল। মানুষের রূপ ধরে এরা একেকটা পিশাচ!আনতারা নির্দয়ভাবে বলতে লাগলেন, _”ঠিক একই সময়ে জাহরিমাও একটা কন্যাসন্তান জন্ম দেয়। সেদিনই আবার আমাদের একটা বাচ্চার কিডনি ডেলিভারি দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে কোনো কিডনি ছিল না। টাকার লোভে অন্ধ হয়ে জাহরিমা সেদিন নিজের সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর শরীর থেকেই একটা কিডনি বের করে আমাদের হাতে তুলে দেয়! জাহরিমা সেদিন বিন্দুমাত্র মাতৃত্বের টান অনুভব করেনি। এভাবে আমাদের ব্যবসা তুঙ্গে ওঠে। আমি আর জুইফান মিলে সিদ্ধান্ত নিই আমরা বিয়ে করব, এবং পরে পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করি।অপারেশন করে মানুষের শরীর থেকে বের করা এত এত হার্ট, কিডনি, লিভার, ফুসফুস আমরা হাসপাতালের একটা গোপন রুমে দীর্ঘমেয়াদি মেডিসিন মিশ্রিত পানির ড্রামে সংরক্ষণ করে রাখতাম। আর সেই সিক্রেট রুমের দরজাটা খোলার জন্য একটা বিশেষ পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড লকেট তৈরি করা হয়েছিল, যা সবসময় থাকত জাহরিমার কাছে। এভাবে আরও কিছু বছর আমাদের ব্যবসা খুব ভালোই চলছিল।”
আনতারা মৃধার গলার স্বর এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল।

_”কিন্তু হঠাৎ করেই আমরা লক্ষ্য করলাম জাহরিমা বদলে যাচ্ছে। একদিন সে এসে আমাদের সাফ জানিয়ে দিল-সে আর এই অনৈতিক কাজ করবে না। নিজের সমস্ত অপরাধ স্বীকার করে সে নিজেকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেবে। কারণ একটাই, সোলেমান-এত বছর সংসার করার পর সে সত্যি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল! সে এই জগৎ ছেড়ে তোমার সাথে একটা সুন্দর ও স্বাভাবিক সংসার করতে চেয়েছিল। আর সেই কারণেই সমস্ত প্রমাণসহ সে তোমার কাছে আসছিল সবকিছু খুলে বলতে।”
সোলেমান শেখের চোখ দিয়ে এবার টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। জাহরিমা তাহলে ওনাকে ভালোবাসত! ওনাকে সব সত্যি বলতে আসছিল!

_”আমরা সেদিন ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সে শোনেনি।” আনতারা শীতল গলায় বললেন, _”তাই তোমার কাছে পৌঁছানোর আগেই মাঝরাস্তায় ট্রাক দিয়ে আমরা ওর কার এক্সিডেন্ট করাই। জাহরিমার কাছে কিছু ফাইল ছিল, যার বেশিরভাগই ছিল জুইফানের বিরুদ্ধে আর আমাদের হিসাব-নিকাশের খতিয়ান। ওই এক্সিডেন্টের পর ফাইলগুলো পুলিশের হাতে চলে যায়। কিন্তু জাহরিমার কাছে থাকা সেই আসল লকেটটা, যা দিয়ে সিক্রেট রুম খোলা যেত-সেটা আমরা উদ্ধার করতে পারিনি।সেইদিনি জুইফানকে পুলিশ অ্যারেস্ট করতে আসে। বেগতিক দেখে জুইফান সুযোগ বুঝে আমাকেই চরম ধোঁকা দিয়ে বসে। সেদিন পুলিশ আর আইনের হাত থেকে বাঁচতে প্রমাণ লোপাটের জন্য পুরো ল্যাবে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আমাকে মৃত ভেবে সে নিজে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু বর্ডারে পুলিশ ওকে ধরে ফেলে। আর ওদিকে আগুনের ভেতর থেকে ধোঁয়া আর পোড়া শরীর নিয়ে আমাকে উদ্ধার করে অনুপমা আর দেলোয়ার।অনেক লোক লাগিয়ে এতোদিন খোজাখুজির পর।দেলোয়ার সেইদিন ওর আর জাহরিমার সন্তান। নিজেদের মেয়ে অনুপমাকে খুজে পেয়েছিল”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৫

আনতারা মৃধা এবার সোলেমান শেখের চুলের মুঠি ধরে ওনার মুখটা ওপরে তুললেন।
_”ওই সিক্রেট রুমে এখনও প্রায় তিন হাজারেরও বেশি হিউম্যান অর্গান সংরক্ষিত আছে, যা অত্যন্ত হাই-কোয়ালিটি মেডিসিন দিয়ে সেফ রাখা হয়েছে। যার বাজার মূল্য কম করে হলেও সাতশত কোটি টাকা! কিন্তু ওই রুমটা খোলার লকেটটা জাহরিমা মরার আগে তোমার হাতে গুঁজে দিয়েছিল। এবার বলো, আমাদের সেই লকেট তুমি কোথায় লুকিয়ে রেখেছো?”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here