Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৪

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৪
মেহজাবিন নাদিয়া

বসার ঘরে ভিড়ের এক কোণে থমথমে মুখে বসে আছে অরি। রিনা কায়দার সেই কখন থেকে অরিকে নিজের পাশে জোর করে বসিয়ে রেখেছেন।ওর হাত ধরে নানা কথা বলে যাচ্ছেন, কিন্তু অরির মনটা এক ফোঁটাও সেখানে নেই। এতো এতো মানুষের ভিড় আর গুঞ্জনের মাঝে অরির ব্যাকুল চোখ দুটো বারবার কেবল একজনকেই খুঁজে চলেছে-
লোকটা যে কোথায় গেল, এখনো ফেরার কোনো নামগন্ধ নেই! কাল রাতের পর থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত অরির সাথে সারিমের একবারের জন্যও সামনাসামনি কথা হয়নি। একটু আগে আরিশান মৃধা একা একা ভেতরে ফিরলেন, কিন্তু তার সাথে সারিমকে না দেখতে পেয়ে অরির মনটা যেন আরও বিষিয়ে উঠল। বুক ঠেলে একরাশ হতাশা আর অভিমান বেরিয়ে এলো তার।
ইস! এই শোকের বাড়ীতে এসেও লোকটার থেকে দূরত্ব সহ্য করতে পারছে না অরি। নিজের ওপরই কেমন যেন লজ্জা হতে লাগল তার। ওই অসভ্য লোকটার প্রেমে পড়ে অরি দিন দিন সত্যি বেহায়া হয়ে যাচ্ছে! নয়তো এতো মানুষের আহাজারির মাঝেও কেন সে পাগলের মতো শুধু ওই একটা মানুষেরই পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে?
রিনা কায়দার পাশে বসা অন্য মহিলাদের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে পড়েছেন, ওনার পুরো ধ্যান এখন অন্যদিকে। অরি সুযোগটা হাতছাড়া করল না। চট করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। ভেতরের পরিবেশটায় কেমন যেন তীব্র দমবন্ধ লাগছিল তার। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে সদরের বিশাল কাঠের দরজাটা পেরিয়ে একদম বাইরে চলে এলো।

বাড়ির সামনের খোলা চত্বরেও বেশ কিছু মানুষের জটলা। সবাই তো আর ভেতরে বসে কাঁদছে না, অনেকে বাইরে এসে নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরে ফিসফিস করে নানা কথা বলছে। সোলেমান শেখের এমন ভয়াল মৃত্যু নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। অরি সেই ভিড়ের মাঝেও নিজের অবাধ্য চোখ দুটো বোলালো, যদি অলৌকিক কোনো উপায়ে সারিমকে কোথাও দেখা যায়! কিন্তু নাহ, সারিমের লম্বা, শক্তপোক্ত অবয়বটি কোথাও নজরে এলো না।
অগত্যা প্রচণ্ড বিরক্ত আর অভিমানে গাল ফুলিয়ে গেটের বাইরে রাস্তার দিকে পা বাড়াল অরি। একা একা বিড়বিড় করে বলতে লাগল-
_”সালার বেটা গেলি কই তুই?! এতদিন তো ঠিকই আঠার মতো বউয়ের পিছে পিছে ঘুরতি। দিন-রাত জ্বালাতি! আর যখন বুঝলি আমি তোর প্রতি একটু একটু দুর্বল হয়ে পড়ছি, অমনি উধাও? উগান্ডার জাউরা পুরুষ।পুরুষজাতটাই এইরকম পল্টিবাজ!”
নিজের মনে একরকম বিড়বিড়ানি চালাতে চালাতে অরি রাস্তা ধরে কিছুটা দূর এগিয়ে এলো। নিজের খেয়ালে হাঁটতে গিয়ে সামনের রাস্তার দিকে ওর বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না।ঠিক তখনই-আকস্মিক একটা ধাক্কা খেল অরি কারো সাথে!

ভারসাম্য সামলাতে না পেরে অরি সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল সামনে থাকা লোকটার শক্ত চওড়া বুকের ওপর! আঘাতটা এসে লাগল অরির নরম কপালে।
মুহূর্তের মধ্যে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে প্রচণ্ড সংকুচিত হয়ে গেল অরি। ইশ! এ কী বেখেয়ালি কাজ করে বসল সে!এখন আবার কার সাথে ঝামেলা বাঁধাল কে জানে?
জরুরি একটা কাজের তাগিদে এই রাস্তা দিয়েই দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল দেলোয়ার। হুট করে একটা মেয়ে এসে সজোরে তার ওপর আছড়ে পড়ায় বেশ চটে গেল সে। মেজাজটা খিঁচে উঠতেই সে গজগজ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অরি অপরাধী চোখে মাথা তুলে তাকাল।
খুব নিচু ভাবে লজ্জিত গলায় বলল-
_”স-সরি আঙ্কেল! আসলে আমি খুব বেখেয়ালি বশত আপনার সাথে ধাক্কা খেয়ে ফেলেছি… সত্যি আমি ইচ্ছে করে করিনি!”

দেলোয়ারের মুখের ভেতরের তপ্ত কথাগুলো নিমেষেই যেন গলায় আটকে গেল! তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো!বুকের ভেতরের কোনো এক সুপ্ত, বিষাক্ত কোণে কেমন যেন এক সূক্ষ্ম, তীব্র চিনচিনে ব্যথা জেগে উঠল তার। চোখের সামনে দাঁড়ানো এই এক চিলতে মেয়েটাকে চিনতে দেলোয়ারের এক সেকেন্ডও সময় লাগল না!
মেয়েটির মুখের ওই নিখুঁত কাট, ওই গভীর মায়াবী চোখ দুটি আর খোলা বাতাসে উড়তে থাকা বাদামী রেশমি চুলগুলো স্পষ্ট জানান দিচ্ছে সে কে! দেলোয়ারের সমস্ত সত্তা যেন এক লহমায় হিম হয়ে জমাট বেঁধে গেল।
অরি লোকটাকে এভাবে স্থির হয়ে, অপলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ অবাক ও অস্বস্তিতে পড়ে গেল। লোকটার মুখটা একটা কালো মাস্কের আড়ালে ঢাকা থাকায় তার ভেতরের কোনো অভিব্যক্তি বা প্রতিক্রিয়া অরি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল না।
অস্বস্তি কাটাতে অরি নিজের ছোট হাতটা দেলোয়ারের চোখের সামনে হালকা নেড়ে বলল-

_”আঙ্কেল? আর ইউ ওকে? বেশি আঘাত পেয়েছেন কি?”
অরির সেই কোমল মিষ্টি কণ্ঠস্বরে যেন দেলোয়ারের মোহাচ্ছন্ন হুঁশ ফিরল!
তার নজর গিয়ে থমকে গেল অরির ডান হাতের তালুর ঠিক পাশটাতে থাকা ছোট্ট, সূক্ষ্ম কালো তিলটার ওপর! ওই তিলটায় নজর যেতেই দেলোয়ারের রক্ত হিম হয়ে এলো। তার পুরো শরীরে যেন এক অদৃশ্যের কাঁপুনি দিয়ে উঠল।এ যে তার রক্ত! তার নিজের কলিজার টুকরো-রাজকন্যা!
কবে এত বড় হয়ে গেল তার ছোট রাজকুমারীটা? একদম মায়ের মতো হুবহু সৌন্দর্য আর মায়াবী রূপ নিয়ে আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! জীবনের সমস্ত অবৈধ লোভ,ও অন্ধকার পাপের সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গিয়ে দেলোয়ার নামের এই পাপিষ্ঠ লোকটা কখনো নিজের এই নিষ্পাপ সন্তানের খোঁজ নিতে পারেনি। আজ এতবছর পর তাকে এত কাছে দেখে দেলোয়ারের পা দুটো যেন পিচের রাস্তার সাথে জমে গেল!
অরি এবার বেশ দ্বিধায় পড়ে গেল লোকটার এহেন আচরণে। লোকটা তাকে কোনো স্পষ্ট উত্তরও দিচ্ছে না, আবার তাকে যে চলে যেতে দেবে-এমন ভাবভঙ্গিও দেখাচ্ছে না! কী এক অদ্ভুত অবস্থা!
দেলোয়ার তখনো অস্থির চোখে অরির দিকে তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই রাস্তার ওপাশ থেকে কেউ অরির নাম ধরে ডেকে উঠল-

_”ম্যাম! স্যার আপনাকে ভেতরে যেতে বলছেন।”
অরি চমকে ঘুরে তাকাল। দেখল আলভি ওর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল। আর আলভির ঠিক পাশেই সারিম অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কারো সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে শেখ ভিলার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে।
দেলোয়ার সারিমকে সেখানে ঢুকতে দেখে তীব্রভাবে অবাক হলো! সে নিজের অস্থিরতা চেপে রাখতে না পেরে আচমকা অরিকে প্রশ্ন করে বসল-
_”কে হয় তারা তোমার?”
হুট করে এই অপরিচিত লোকটার মুখ থেকে এমন একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন শুনে অরি বেশ অবাক চোখে তাকাল। তার ভ্রু দুটি হালকা কুঁচকে এলো। সে লোকটার দিকে নজর রেখে ধীরগলায় বলল-
_”আমার স্বামী, আর তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
কথাটা শোনামাত্রই দেলোয়ারের মুখ থেকে একপ্রকার অস্ফুট স্বর বের হয়ে এলো-
_”সারিম তোমার স্বামী?!”
অরি এবার লোকটার কথার ধরন দেখে ঘোর সন্দেহজনক চোখে তার দিকে তাকাল। লোকটির চোখের আচমকা চমকে ওঠা একদমই স্বাভাবিক লাগছে না। অরি সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসল-

_”আপনি চেনেন নাকি ওনাকে?”
দেলোয়ার মুহূর্তেই অনুধাবন করল যে সে নিজের আবেগের তোড়ে কী বলতে কী বলে ফেলেছে! নিজের আসল পরিচয় ঢাকতে আর কথা ঘোরানোর জন্য সে তড়িঘড়ি করে বলল-
_”না না… মানে, এমনিতেই বললাম! আসলে ওনাকে কে না চেনে বলো? দেশের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী উনি, টিভিতে-পত্রিকায় তো ওনাকে প্রতিনিয়ত দেখাই যায়!”
অরি লোকটার এই যুক্তিতে শান্ত হলো। ভাবল-‘হ্যাঁ, তা তো ঠিকই। সারিমকে না চেনার মতো লোক তো এ দেশে কমই আছে।’
দেলোয়ার মনে মনে এক স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তবে তার বুকের ভেতর এতক্ষনে কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেছে। এক ভয়াবহ সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে সে! একদিকে তার রাজকন্যা, আর অন্যদিকে তার আরেক মেয়ে! সে কাকে রেখে কাকে বাঁচাবে? ভাগ্য আজ কী নির্মম খেলায় মেতেছে-তার দুটি মেয়েই ঘুরেফিরে একই পুরুষের সাথে ভালোবাসা ঘটিত সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে!
ভাবতেই দেলোয়ারের কপালে ওপর সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু ফুটে উঠল। অরি লোকটার এমন উসখুস আর ঘর্মাক্ত অবস্থা দেখে বেশ মায়া অনুভব করল। সে নিজের হাতে থাকা ফ্রেশ টিস্যু বের করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
_”আপনাকে ভীষণ ঘর্মাক্ত লাগছে! প্লিজ, এটা দিয়ে ঘামটা একটু মুছে নিন।”
দেলোয়ার একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল অরির বাড়িয়ে দেওয়া হাতটির দিকে। তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল বহু বছর আগের এক পুরোনো ছবি। যখন সে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল, কাজ শেষে কোয়ার্টারে ফিরলে। তার রাজকন্যা ছোট্ট অরিই ঠিক এভাবেই আধো-আধো বোলে বাবার সামনে টিস্যু বা রুমাল এগিয়ে দিত কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে দেওয়ার জন্য!

দেলোয়ারের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। কতই না সুন্দর, নিষ্কপাটে ভরা ছিল সেই কাটানো দিনগুলো! কত পবিত্র ছিল সেই সময়টা! দেলোয়ার কম্পিত হাতে অরির হাত থেকে টিস্যুটা নিল। তারপর কপালে ও মুখে লেগে থাকা সূক্ষ্ম ঘামটুকু মুছে নিল। অরি তা দেখে ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে একটা মেজাজি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো-
_”বাবা! গাড়ি রেডি, জলদি এসো!”
দেলোয়ার চকিতে ঘুরে তাকাল তার আরেক মেয়ে দিকে। রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে অনুপমা। অরিও কৌতূহল নিয়ে কে দেখার জন্য সেদিকে তাকাল। দেলোয়ার তা খেয়াল করে খুব সতর্কতার সাথে অরিকে বলল-
_”তুমি এখন যেতে পারো, আমার মেয়ে এসে গেছে… আমি আসছি। আর হ্যাঁ, ওই ধাক্কা লাগার বিষয়টা নিয়ে একদম মন খারাপ কোরো না, দুর্ঘটনা তো যে কারো সাথেই ঘটতে পারে!”
অরি লোকটার এমন নম্র ও অমায়িক ব্যবহারে আর কথা বাড়াল না। হালকা হেসে মাথা নেড়ে সায় দিল। এরপর ধীরপায়ে শেখ ভিলার গেটের দিকে উল্টো পথে হাঁটা ধরল। সারিম হয়তো এতক্ষণে ভেতরে তার জন্য অপেক্ষা করছে !
অরি চলে যেতেই দেলোয়ার সেদিকে অপলক চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। মনে মনে কালবিলম্ব না করে এক কঠিন সিদ্ধান্তের ছক এঁকে ফেলল সে।
অনুপমার কাছে রাস্তার ওপার হয়ে অপরপাশের একটা ক্যাফের পার্কিংয়ে যেতেই-অনুপমা ভ্রু কুঁচকে বাবাকে জিজ্ঞেস করল-

_”কার সাথে এভাবে দাঁড়িয়েছিলে এতক্ষণ?”
দেলোয়ার অনুপমার এই প্রশ্নটাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে বানিয়ে একটা মিথ্যা বলল-
_”আননোন পারসোন। বাদ দাও ওইসব ফালতু কথা!”
অনুপমা বাবার মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হালকা মাথা নাড়াল, আর কিছু বলল না। এরপর দুজনেই এসে গাড়িতে উঠে বসল।
শেখ ভিলার প্রাঙ্গণে পা রাখতেই অরি চঞ্চল চোখে চারপাশে সারিমকে খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু সারিমকে দেখা গেলো না।কোথাও না পেয়ে অরির নজর গিয়ে ঠেকল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আলভির ওপর। তবে আলভি একা নেই।তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলছে সারিমের সেই তথাকথিত বান্ধবী নওমি!
নওমিকে এখানে দেখে অরি এক মুহূর্তের জন্য ভীষণ অবাক হলো। এই মেয়েটা এখানে কী করছে?আর আলভির সাথেই বা এর কী কথা হচ্ছে? অরি মনে মনে হাজারটা সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করেও কিছুই ভেবে পেল না।
ঠিক তখনই আচমকা কেউ অরির হাত ধরে সজোরে একটা টান দিল!
অরি চমকে উঠে পাশে ঘুরতেই দেখল জেবা দাঁড়িয়ে আছে! কিন্তু জেবার অবয়ব দেখে অরির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। জেবার চোখ-মুখ অসম্ভব রকম ফোলা, রক্তবর্ণ ধারণ করে আছে। গালের দু পাশে স্পষ্ট লাল হয়ে ওঠার ছাপ,কিছুটা আঙ্গুলের ছাপের মতো।
অরি প্রচণ্ড বিচলিত ও শঙ্কিত হয়ে জেবার হাত দুটো ধরে জিজ্ঞেস করল-

_”কী হয়েছে তোর, জেবা?তোর গালে এগুলো কিসের দাগ,”
জেবা অরির কোনো কথার জবাব দিল না। তার ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে অরিকে প্রায় টানতে টানতে শেখ ভিলার পেছন দিকের একটা জনমানবহীন, নির্জন চত্বরে নিয়ে এলো। এই দিকটায় মানুষের আসা- যাওয়া একদমই নেই বললেই চলে।
অরি নিজের হাতটা সামান্য ছাড়িয়ে নিয়ে ব্যাকুল গলায় বলল-
_”তুই আমাকে এভাবে টেনেহিঁচড়ে এখানে কেন আনলি বলবি তো? কী হয়েছে তোর?”
জেবা এবার অরির মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।ভেতরের জমে থাকা সমস্ত যন্ত্রণা।আর বাবার নির্মম মৃত্যুর বিচার পাওয়ার উন্মাদনা যেন চোখ দিয়ে ঠিকরে বের হচ্ছে। সে অরির দু-হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে হিমশীতল কণ্ঠে বলল-
_”আমার তোর একটা সাহায্য লাগবে, অরি! একমাত্র তুই-ই পারবি আমাকে এই সাহায্যটা করতে।”

গাড়িতে শান্ত হয়ে বসে আছে অরি। তার ঠিক পাশের সিটে গম্ভীর মুখে বসে আছেন আনতারা মৃধা। সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে আরিশান মৃধা, আর ড্রাইভার চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অরি নিশব্দে চারপাশের সব পর্যবেক্ষণ করছে আর কিছুক্ষণ পর পর আড়চোখে আনতারা মৃধাকে দেখছে। আনতারা মৃধা অরির এই আড়চোখে তাকানোটা লক্ষ্য করছেন, তবে তিনি কিছুই বলছেন না, একদম শক্ত মুখে বসে আছেন।
অন্যদিকে আরিশান মৃধার কোনো দিকে খেয়াল নেই। তিনি নিজের মতো গভীর ভাবনায় ডুব দিয়ে আছেন। ওনাদের সাথে জেবা আসেনি, আর সে যে আর কোনোদিন আসবে না-তা আরিশান মৃধা খুব ভালো করেই জানেন। মেয়েটা ওনাকে বড্ড ভুল বুঝল! ওনার কি খারাপ লাগছে না নিজের বন্ধুর এই নৃশংস মৃত্যুতে? অথচ মেয়েটা একটু ধৈর্য ধরে সঠিক সময়ের অপেক্ষা পর্যন্ত করল না!
ওনি তো কখনোই চাননি এত ঝামেলার মধ্যে জেবা জড়াক। ওনাকে দেওয়া কথা রাখতে জেবাকে একটা নিরাপদ জীবন দিতে চেয়েছিলেন তিনি, অথচ আজ উল্টো সেই মেয়েটাই ওনাকে পর করে দিল! কতটা জেদি আর সাংঘাতিক এই মেয়ে! আরিশান মৃধা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে এসে ওনাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। যেখানে এইটুকু এক হাঁটু বয়সের মেয়ের কাছ থেকে ওনাকে থাপ্পড় খেতে হবে!

এই তো সেদিনের কথা মনে পড়ে ওনার-সেদিন যখন জেবা জন্মাল, ওনি নিজ হাতে এই মেয়েটার ডায়পার চেঞ্জ পর্যন্ত করেছেন! অথচ আজ সব নিয়তির নির্মম খেলা! অন্য কেউ হলে কিংবা আনতারা মৃধা ওনাকে এভাবে আঘাত করলে ওনি কাউকে ছাড়তেন না, কিন্তু জেবার ব্যাপারে ওনার অনুভূতির হিসাব সবসময় ভিন্ন। ঠিক এই মুহূর্তেও মেয়েটার প্রতি রাগ হওয়ার বদলে নিজের মনের ভেতরে অপরাধবোধ আর অনুশোচনা হচ্ছে।
জেবার থাপ্পড় খেয়েও ওনার মনে হচ্ছে এটা যেন ওনারই প্রাপ্য ছিল। ওনার মস্তিষ্ক বলছে-উচিত হয়নি শোকাতুর মেয়েটাকে এভাবে গায়ে হাত তোলা। আবার পরক্ষণেই ওনার মন বলছে-ঠিকই হয়েছে থাপ্পড় মেরে, কত বড় সাহস মেয়েটার! তা না হলে সামান্য কথাতেই সে তালাক চেয়ে বসে? ওনি তো স্পষ্ট বলেছিলেন মেয়েটাকে তার বাবার হত্যার একদম সঠিক বিচার পাইয়ে দেবেন। কিন্তু মেয়েটা সেই সহজ কথাটা বুঝলই না, উল্টো ওনার অতীত টেনে তুলে বুকটা ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেল!
এদিকে পেছনের সিটে বসা অরি গাড়ির জানালার কাচটা নামিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ছুটে চলা ঠাণ্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার মুখ আর চুল। গাড়িতে এসি চললেও অরির বাইরের প্রাকৃতিক বাতাসই চিরকাল বেশি পছন্দ। এই বাতাস গায়ে লাগলে মনটা একদম ফুরফুরে হয়ে যায়। অথচ আজ কেন যেন অরির মনটা আর ফুরফুরে হলো না।

সারিমের ওপর এখন তার রাগ সোজা সপ্তম আসমানে গিয়ে ঠেকেছে! বেটা তাকে যেতে বলে নিজে কোথায় উধাও হয়ে গেল, আর কোনো খোঁজখবর নেই! শেষে বাধ্য হয়ে অরিকে এই আরিশান মৃধা আর আনতারা মৃধার সাথে গাড়িতে চেপে আসতে হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি এসে মৃধা নিবাসের বিশাল চত্বরে পৌঁছাল। গাড়ি থেকে আগে নামলেন আরিশান মৃধা, ওনার পেছনে নামলেন আনতারা মৃধা, আর সবার শেষে ধীরপায়ে নামল অরি। কাল রাত থেকে ঘুমে-ক্লান্তিতে শরীরটা আর টানছে না, কোনোমতে মেজাজ খারাপ করে হেলেদুলে ভেতরে হেঁটে এলো সে।
আরিশান মৃধা আর আনতারা মৃধা আগেই ভেতরে ঢুকে গেলেও অরি পেছনে পেছনেই রয়ে গেল। তার এখন আর এই ফাঁকা, ছমছমে বাড়িতে একা ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। আগে তো অন্তত জেবা সাথে ছিল, এখন সেও নেই। আর সারিম কোথায় ভেসে গেল, তা তো ওই বদমাইশ লোকটাই ভালো জানে!
বাকি রইলেন আনতারা মৃধা। ওই মহিলাকে এখন অরির জমের মতো ভয় লাগছে! জেবা যে সব সাংঘাতিক কথা শোনাল এই মহিলার ব্যাপারে, তা ভাবলেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তবে সোলেমান শেখের কথা ভেবে অরির বড্ড মায়া হলো। এত ভালো একটা মানুষকে মানুষ কীভাবে এমন নৃশংসভাবে মারতে পারে, অরির পুঁচকে মাথায় তা কিছুতেই ঢুকলো না।

এসব হাবিজাবি চিন্তা করতে করতেই অরি বাড়ির ভেতরের ড্রয়িং রুমে পা রাখল।
আর ভেতরে ঢুকতেই ওর চোখ আটকে গেল সোফায় বসে থাকা দুজনের ওপর! সেখানে সোফায় বসে আছে রুবাব মৃধা আর তার সাথে ফুল! এদেরকে এখানে দেখে ভীষণভাবে চমকে গেল অরি!
এক নিমেষেই অরির মনে পড়ে গেল সারিমের প্রতি ফুলের সেই প্রেমাক্তক দৃষ্টি! তখন অতশত না বুঝলেও, এখন সেই চাহনির আসল অর্থ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে অরি। ওই শাকচুন্নি মেয়েটা যে তার ভাতার নামক আবাল সারিমকে ইশক করে, তা বুঝতে আর বাকি রইল না অরির!তার উপর রুবাব মৃধা অরিকে যে একদম দেখতে পারেনা তা খুব ভালোই বুঝে।মনটা বিষিয়ে উঠে ভাবল অরি।এই মহিলা আর তার মেয়ে আবার কোনো নতুন গণ্ডগোল পাকাতে আসেনি তো তার সংসারে?’
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে অরি মনে মনে বলল-

_”গণ্ডগোল করলেও কি আমি এখন ছেড়ে দেব নাকি? সারিমের সাথে বাসর হয়ে গেছে আমার! এখন আর চাইলেও সারিমকে কেউ আমার থেকে কাড়তে পারবে না! দরকার পড়লে সারিমের গলায় রশি ঝুলিয়ে আমি নিজে সেখানে ঝুলে থাকব, তবুও আমার স্বামীর অধিকার শুধুই আমার!’
আরিশান মৃধা হঠাৎ রুবাব মৃধাকে ড্রয়িং রুমে দেখে বেশ অবাক হলেন। তিনি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন-
_”রুবাব, তুমি এখানে? আসবে তো আগে কিছু বলোনি!”
রুবাব মৃধা মুখখানা খানিকটা ঘুরিয়ে অভিমানের সুরে বললেন-
_”কেন?বোন হয়ে ভাইয়ের বাড়িতে আসতে পারি না বুঝি?”
আরিশান মৃধা একটু লজ্জিত হয়ে বললেন-
_”আরে, আমি তেমনটা কখন বললাম! তুমি তো কখনো আসো নি, তাই হুট করে দেখে একটু অবাক হলাম।”
রুবাব মৃধা এবার আনতারা মৃধার দিকে তাকিয়ে বললেন-
_”ভাবি বলল আসতে, তাই এলাম। নয়তো তুমি গ্ৰাম থেকে আসার পর আমাদের আর কোনো খোঁজখবরই নাওনি!”
আরিশান মৃধা চকিত চোখে আনতারা মৃধার দিকে তাকালেন। এই মহিলা যে ওনার অগোচরে কত দিকে মাথা গলাচ্ছেন আর ছক কষছেন, তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। অথচ এসবের কিছুই ওনাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি আনতারা!
আনতারা মৃধা আরিশান মৃধার চাহনি দেখে হালকা একটা কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললেন-

_”আসলে আমিই বলেছিলাম রুবাবকে চলে আসতে, সাথে ফুলকেও নিয়ে আসতে বলেছি। মেয়েটা সারাদিন একা একা থাকে, তাই বললাম কিছুদিন এসে আমাদের এখানে বেড়িয়ে যাক।”
রুবাব মৃধা হেসে উঠে সায় দিয়ে বললেন-
_”ভাবি একদম ঠিক কথা বলেছো। মেয়েটা এমনিতেই সারাদিন ঘরকুনো হয়ে পড়ে থাকে। তার ওপর এখন আবার কলেজ বন্ধ। কিছুদিন মামার বাড়িতে এসে বেড়িয়ে গেলে তো মন্দ হয় না!”
আরিশান মৃধার মন-মেজাজ একদম ভালো ছিল না।সেজন্য আর কথা না বাড়িয়ে শুধু হালকা মাথা নেড়ে বললেন-
_”বেশ, ভালো তো! আমি একটু ওপরে যাচ্ছি।”
বলেই তিনি হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। ওনার এখন কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
অরি এতক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চুপচাপ এসব শুনছিল। এই মেয়েটা কিছুদিন এখানে থাকবে শুনতেই তার মাথায় যেন বাজ পড়ল!

রুবাব মৃধার নজর তখন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা অরির ওপর গিয়ে পড়ল। অরিকে দেখে যে তিনি মোটেও খুশি হননি, তা ওনার মুখের ভাব দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলও অরির দিকে তাকাল। তবে ফুলের মুখের ভাব এমন-যেন অরিই এই বাড়ির বাইরের কেউ, আর ফুলই সবকিছুর মালিক!
অরি ফুলের সেই বাঁকা আর হিংসুটে দৃষ্টি ঠিকই ধরে ফেলল। এই মেয়েটার এমন ভাবসাব অরির একদম সহ্য হচ্ছে না। সে এদের পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে ওপরে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই রুবাব মৃধা অরিকে উদ্দেশ্য করে আনতারা মৃধাকে কড়া গলায় বলে উঠলেন-
_”ভাবি! তোমার ছেলের বউয়ের দেখি কোনো লজ্জা-শরমে নেই! কীভাবে ওড়না ছাড়া উগ্রভাবে চলাফেরা করছে দেখছ? পোশাক-আশাকের কোনো ছাঁদই নেই! আমরা কিন্তু আমাদের মেয়েকে এমন শিক্ষা দিইনি!”
কথাটা শুনে অরি থমকে দাঁড়াল।আনতারা মৃধা অরিকে এভাবে অপমানিত হতে দেখে মনে মনে ভীষণ তৃপ্তি পেলেন। কিন্তু অরিও তো আর সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়! সে ঘুরে দাঁড়িয়ে একদম ভদ্র ভাষায় বলে উঠল-
_”আন্টি, ডোন্ট মাইন্ড! আসলে আমার স্বামী আমাকে এইরকম ড্রেসআপেই দেখতে বেশি পছন্দ করে। ওর জন্যই পড়া, নয়তো নিশ্চয়ই আপনার কথাটা ভেবে দেখতাম!”
অরির এমন সোজাসাপ্টা জবাবে রুবাব মৃধার মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল! অরি আর সেখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, সোজা হনহন করে ওপরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
অরি চলে যেতেই রুবাব মৃধা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে আনতারা মৃধাকে বললেন-

_”ভাবি! দেখলে তোমার ছেলের বউয়ের মুখের ভাষা? বড়দের একটুও সম্মান করতে শেখেনি এই মেয়ে! আমি তো ওকে এই ল্যাংটা জামাকাপড় পরা নিয়ে একটু শাসন করতে গেলাম, আর মেয়েটা আমাকেই কতগুলো শোনিয়ে গেল! আমি তোমাকে বলে রাখছি ভাবি, এই মেয়ে তোমার সংসারে বসে সবাইকে দাসী বানিয়ে রাজত্ব করবে!”
পাশ থেকে ফুল বিষাক্ত গলায় বলে উঠল-
_”মা একদম ঠিক বলছে, মামি! আমি মুভিতে দেখেছি-এমন নষ্টা পোশাক পরে মেয়েরা ছেলেদের জাদু-টোনা করে পাগল বানিয়ে রাখে! এখনো সময় আছে মামি, এই মেয়েকে সারিম ভাইয়ের জীবন থেকে তাড়িয়ে দিন!”
আনতারা মৃধা সব শুনে মনে মনে হাসলেন। যাক! এদেরকে এই বাড়িতে এনে দারুণ কাজ হয়েছে। ওনার হয়ে অর্ধেক কাজ এরা দুজন এমনিতেই করে দেবে! নয়তো অরির পেছনে লাগতে গেলে সারিমের চোখে তিনি আরও অপরাধী হয়ে উঠতেন। এখন এক লাঠিতে দুই পাখি মরবে-সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না!
তবে বাইরে ভালো সাজার ভান করে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-
_”আমার বলাতে আর কিছুই আসে যায় না রুবাব! ছেলে এখন বউয়ের কথায় ওঠে আর বসে। আর স্বামী তো নিজের কমবয়সী বউকে নিয়ে উল্লাসে মেতে আছে! এই সংসারে আমার কোনো অধিকার বা অবদান নেই বললেই চলে। তাদের সংসার, তারা যা ইচ্ছে করুক! আমি তো শুধু আশ্রয়ের জন্য পড়ে আছি…”
আনতারা মৃধার এই সাজানো দুঃখের কথা শুনে রুবাব মৃধা ভাই আর ভাইপোর ওপর আরও রেগে আগুন হয়ে গেলেন। কড়া গলায় বললেন

_”দুদিনের দুটো মেয়ে এসে এখনি যদি এইরকম নাচ নাচায়, তাহলে ভবিষ্যতে ভাইয়ের সব সম্পত্তি তো এরাই একলা আত্মসাৎ করবে! কিন্তু আমি তা হতে দেব না! তুমি একদম চিন্তা কোরো না ভাবি, আমি এই মেয়েদের একটা ব্যবস্থা করেই ছাড়ব!”
আনতারা মৃধা মুখ টিপে হাসলেন। যাক, টোপ একদম ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগেছে! এখন শুধু ছক অনুযায়ী খেলা দেখার পালা!

রাত দশটা বেজে আঠারো মিনিট।
বাড়ির সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সারিম। এক হাতে গাড়ির চাবিটা আঙুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচাচ্ছে, আর অন্য হাতে ফোনের স্ক্রিনে স্ক্রল করতে করতে হাঁটার তালে আসছিল সে। ঠিক তখনই আচমকা কারো সাথে সজোরে ধাক্কা খেল সারিম!
সারিম ভ্রু কুঁচকে দ্রুত ঘুরে তাকাতেই দেখতে পেল ফুল দাঁড়িয়ে আছে একদম মিষ্টি এক চিলতে হাসি মুখে। ফুলকে এখানে দেখে ভূতের মতো চমকে উঠল সারিম! বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-
_”কিরে ফুলমতি! তুই এখানে কী করস?”
ফুল একটু লাজুক হেসে বলল-
_”এসেছি আজ।”
সারিম বিরক্ত হয়ে বলল-
_”এসেছিস তা তো নিজের এই জ্বলজ্যান্ত চোখে দেখতেই পারছি! কিন্তু কথা হচ্ছে তুই কেন এসেছিস?”
ফুল মুখ বাঁকিয়ে বলল-
_”এমনিতেই বেড়ানোর জন্য।”
সারিম গা জ্বালানো হেসে বলল-

_”ছিঃ! তোর চয়েজ কতটা বেড! নয়তো স্বাভাবিক মানুষ বেড়াতে গেলে সুন্দর সুন্দর অ্যাডভেঞ্চারের জায়গায় যায়, আর তুই এসেছিস এই বাড়ির ভেতর থাকতে!ছেহ।”
ফুল সামান্য মন খারাপের ভান করে বলল-
_”মামি বলেছিল, তাই আসলাম।”
সারিম চট করে জিজ্ঞেস করল-
_”মামি বললেই তোর আসতে হবে নাকি?”
সারিমের এমন তাচ্ছিল্য ভরা কথায় ফুলের পুরো মুখটা নিমেষেই অন্ধকারে ঢেকে গেল! কত শত আশা আর স্বপ্ন নিয়ে সে এখানে এসেছিল-সারিম ভাইকে নিজের করে পাওয়ার গভীর আশায়! আর লোকটা কিনা এখানে আসা নিয়ে তাকেই প্রতি পদে খোটা দিচ্ছে!
ফুল ক্ষুব্ধ হয়ে ছোট গলায় বলল-
_”পরের বার থেকে নাহয় আপনাকে জানিয়ে আসব!”
সারিম সাথে সাথে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল-
_”পরের বার আর তোর আসার কোনো দরকারই পড়বে না!আমরাই তোর শ্বশুরবাড়ি চলে যাব নে!”
ফুল কিছু বুঝতে পারল না। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল-

_”শ্বশুরবাড়ি? এর মানে কী সারিম ভাই?”
সারিম কপালে হাত দিয়ে বলল-
_”আহাগো লেদা বাচ্চা ফুফুর! সব জেনেও কেমন ডং করিস! তোরা সালা সবকটা মেয়েজাতি একই রকম পিরিতের নাটক করিস! যাহ, ভাগ এখন সামনে থেকে! অনেক রাত হয়েছে, আমার এখন বউয়ের সাথে গিয়ে রোমান্স করতে হবে, খুবি পরিশ্রমি কাজ এটা। কাউকে বলিস ডিস্ট্রাব যেন না করে আমাদের।”
কথাটা বলেই সারিম ফুলের উত্তরের তোয়াক্কা না করে ওপরে সিঁড়ির দিকে হনহন করে চলে গেল।
ফুল একদম নিথর হয়ে সারিমের ওপরে চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। লোকটা কত সহজ আর অবলীলায় বলে গেল সে তার বউয়ের সাথে রোমান্স করতে যাচ্ছে! অথচ প্রতি মুহূর্তে যে ফুলের ভেতরটা ছাই হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, তা লোকটার পচা নজরে একবারের জন্যও পড়ে না!ফুলের ভালোবাসা টা কি তবে সারাজীবন একতরফাই থেকে যাবে তাহলে।

সারিম সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় কী যেন একটা মনে পড়তেই একবার আরিশান মৃধার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেজন্য যেই ভাবা, সেই কাজ! সারিম করিডোর পেরিয়ে আরিশান মৃধার ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। ঘরটা হালকা ভেড়ানো ছিল। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু হালকা ডিম লাইটের আলো দেখা যাচ্ছে।
সারিম সেদিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু দেখে বিছানা একদম ফাঁকা! ঠিক তখনই ওর নাকে একটা গন্ধ ভেসে আসে। সারিম ভালো করে শুঁকে বুঝল এটা সিগারেট পোড়ানোর স্মেল! তবে এখানে সিগারেটের গন্ধ আসছে কোথা থেকে? সারিমের জানামতে ওর বাবা কখনোই সিগারেট খান না, তাহলে গন্ধটা কিসের?
সারিম সিগারেটের ধোঁয়ার উৎস খুঁজতে ঘর ছেড়ে ব্যালকনির দিকে অগ্রসর হয়। তখনই তার নজর পড়ে আরিশান মৃধার ওপর। লোকটা রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে থেকে থেকে সিগারেট ফুঁকছে! তাও আবার বেনসন!
সারিমের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড় বাবার এই কর্মকাণ্ডে! যে লোকটা সারাজীবন সারিমকে সিগারেট থেকে দূরে থাকার জন্য শাসন করতো, এমনকি সারিম একদিন বাইরে থেকে সিগারেট খেয়ে এসে চুইংগাম খেতে ভুলে গিয়েছিল। আর আরিশান মৃধা ঠিকই সেটা ধরে ফেলেছিল গন্ধ শুকে,যে সারিম সিগারেট খেয়েছে। সেজন্য সেদিন সারিমকে বাড়ির বাইরে কানে ধরে দুই ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিল! আর আজ সেই লোকটাই কিনা বিড়ি ফুঁকছে!

তবে ঘটনা অন্য কিছু মনে হচ্ছে সারিমের কাছে। সে এতক্ষণ যাবত দাঁড়িয়ে থাকার পরেও বাবার নজর তার দিকে একদম নেই বললেই চলে। সারিম আরিশান মৃধার পাশে গিয়ে একদম মুখ বরাবর দাঁড়ালো।
আচমকা কারো ছায়া অনুভব করে আরিশান মৃধা হাত থেকে সিগারেট ফেলে দিতে যায়। তবে সারিম তো সারিমই! সে খোঁচা মেরে বলে
_”কী ড্যাডি! চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেলে মনে হচ্ছে?”
আরিশান মৃধা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন ছেলের কথায়। এই জাউরা ছেলে এখানে কেন এসেছে ভেবে পেলেন না তিনি।এমনিতেই একজনের জ্বালায় বাঁচেন না, এখন আরেকটা এসেছে তার কার্বন কপি! কী এক মহাজ্বালা ওনার! এখন নিজের ঘরে বসে শান্তিতে থাকাও দায় দেখা গেল।
সারিম বাবার নিশ্চুপতা দেখে বলে উঠল-
_”সিগারেট খাওয়া কিন্তু ভালো লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না। ছ্যাঁকা-ট্যাঁকা খেলে নাকি আবার?”
আরিশান মৃধা চরম বিরক্তি নিয়ে বললেন-
_”সমস্যা কী তোমার,সারিম? সারাদিন আমার পিছু না লাগলে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না?”
_”আরে বাহ! তুমি তো দেখি একদম এক্স্যাক্ট কথাটা ধরে ফেললে! একদম ঠিক ধরেছ, তোমায় না জ্বালালে আমার ভাত কেন, আরো অনেক কিছু হজম হয় না!”
আরিশান মৃধা রেগে বললেন-

_”সারিম, এখান থেকে যাও প্লিজ! আমার মাথা খেয়ো না আর। আমি একটু একা থাকতে চাই।”
সারিম বাবাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল। এরপর বলে উঠল-
_”জেবাকে দেখতে পাচ্ছি না যে? আসেনি নাকি তোমার ওই লেদা বউ?”
আরিশান মৃধা জেবার কথা শুনতেই মুখটা মলিন হয়ে ওঠে। সারিম বাবার মুখের আবহ বুঝতে পেরে বলল-
_”মিস করছ তাকে? কিন্তু তুমি তো বলো বউ মানো না। এখন তার জন্য এত পিরিত উথলে পড়ছে কেন? ভাবছি জেবাকে ধরে আরেকটা বিয়ে দিয়ে দে….।”
সারিম আর কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। দেখতে পেল আরিশান মৃধা হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা হাতের মুঠোয় পিষে ধরে আছেন! চোখ-মুখে তার রাগে অগ্নিশর্মা রূপ! সারিম বুঝল হয়তো কোনো সিরিয়াস ম্যাটার, সেজন্য আর এসব বলল না।
কথার প্রসঙ্গ পাল্টে জিজ্ঞেস করল-
_”জেবা ডিভোর্স চায় তোমার কাছে, গতকাল রাতে আমাকে এসে জানালো।”
আরিশান মৃধা হঠাৎ করে মাথা তুলে তাকালেন সারিমের দিকে। জেবা কাল রাতে সারিমের কাছে ডিভোর্স চায় বলেছে-বিষয়টা অবিশ্বাস্য ঠেকলো তার কাছে।

_”মিথ্যা বলছ তুমি!”
_”তোমাকে মিথ্যা বলে আমার কী লাভ?”
আরিশান মৃধা বলল-
_”ও তোমার কাছে ডিভোর্স চাইলো, অথচ আমার কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করল না?”
সারিম বলল-
_”সেটা তোমার বউ ভালো জানে! হয়তো তুমি অত ভালো এক্সপার্ট নও, সেজন্য বউ থাকতে চায় না!”
আরিশান মৃধা রেগে বলে ওঠেন-
_”সারিম, মজা করো না! সত্যি করে বলো, ও কেন তোমার থেকে ডিভোর্স চাইলো?”
সারিমের সোজাসাপ্টা উত্তর
_”ভালোবাসাবাসি শেষ! এখন মন অন্য কারো জন্য বিট করছে!”
আরিশান মৃধা কথার অর্থ বুঝলেন। জেবা অন্য কাউকে ভালোবাসে? কই, মেয়েটা তো ওনাকে একবারও জানালো না! খুব খারাপ লাগছে কি ওনার এগুলো শুনে? হ্যাঁ, অবশ্যই লাগছে! বুকের ভেতরটা কেমন যেন এসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দিলে যেমন হয়, ঠিক তেমন লাগছে।

আসলেই তো, মেয়েটার বয়সই বা কী! ওইটুকুনি মেয়ের মন তো এই বয়সে যে কারো প্রতি আকৃষ্ট হতেই পারে। আর উনিও কিসের মতো দুনিয়া ভুলে মরীচিকাকে বিশ্বাস করে বসলেন! পাগল সব দুনিয়ার রীতি! নিজেকেও এখন সেইরকম পাগল লাগছে ওনার কাছে। একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে উনি সংসার করার স্বপ্ন দেখছিলেন? আগেই ভাবা উচিত ছিল যে বাস্তবতা বলতে কিছু আছে! এরকম ফ্যান্টাসি নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। উনিও কিছুদিনের জন্য জেবার মতো ফ্যান্টাসিতেই পা দিয়েছিলেন।
আফসোস একটাই-জেবা সেই দুনিয়া থেকে বের হতে পারলেও উনি চিরতরে আটকে গেলেন! তবে ব্যাপার না, নিজেকে ভালো সামলাতে পারেন উনি। এবারও নাহয় সামলে নেবেন!
সারিম বাবার চুপ হয়ে যাওয়া দেখে বুঝল ওনার মনের ভেতরের ঝড়টা। কিছুটা হলেও আন্দাজে আসছে তার। বাবার চোখ জোড়া কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। সারিম ভাবল এই মুহূর্তে বাবাকে একা থাকতে দেওয়া উচিত, সেজন্য সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো।
তবে যাওয়ার আগে ওর একটা কথা ভেবে খুব খারাপ লাগলো-তার বাপ প্রেমে যতবার পড়ে, ছ্যাঁকা ততবারই খায়! এইদিক থেকে সারিম তার বাবার চেয়ে অনেক গুড লাক। কারণ তার বউ তাকে কত ভালোবাসে!ভাবতেই সারিমের হৃদয়ে কেমন যেন প্রেম প্রেম দোলা খেল। নিজের মনেই বিড়বিড় করল-

_”যাহ দুষ্টু! ঘরে যা, বউ নিশ্চয়ই তোর রোমান্সের অপেক্ষায় বসে আছে!”
আরিশান মৃধার রুম ছেড়ে সারিম করিডোর পেরিয়ে তিনতলায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। অরির রুমের সামনে আসতেই দেখতে পেল রুমের দরজা পুরোটা খোলা। সারিম মনে মনে বেশ খুশি হলো-বউ আজ তাকে নিজ থেকে আহ্বান জানাচ্ছে ভেবে দরজা এভাবে খোলা রেখে দিয়েছে মনে হয়! সারিম ধীরপায়ে কিন্তু দ্রুত রুমে প্রবেশ করল।
তবে ভেতরে ঢুকতেই ওর চোখ দুটোয় মুহূর্তে ঘোর বিরক্তি নেমে এলো! দেখা গেল রুমে ফুল আর অরি একসাথে বসে আছে। সারিমকে ভেতরে ঢুকতে দেখে ওরা দুজন তার দিকে তাকাল। সারিম সোজা ওদের দিকে এগিয়ে গেল, এরপর ফুলের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলে উঠল-
_”এই ফুলমতি, এখান থেকে যা তো এখন! রোমান্স করব আমি!”
অরি পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলে উঠল-

_”ফুল, তুমি কোথাও যাবে না! যাবে তো এই লোক! ফুল আজ রাতে আমার সাথে থাকবে।”
সারিমের মেজাজ খারাপ হয়ে রাগ উঠল ফুলের ওপর। সে ফুলের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলে উঠল-
_”কী হলো? তোকে যেতে বলছি না? নয়তো একটা কিক খাবি কিন্তু আমার হাতে!”
অরি পাশ থেকে রেগে গিয়ে বলল-
_”আপনি ওর সাথে এমন ব্যবহার কেন করছেন? আমি বলেছি বলেই তো ফুল এখানে এসেছে! ফুল আজ আমার সাথে একই রুমে থাকবে। আপনার এত সমস্যা কিসের? নিজের রুমে গিয়ে ঘুমান না!”
সারিম এবার অরির ওপর মারাত্মক ক্ষুব্ধ হলো। বালের বউ একদম পল্টি মারল কীভাবে! সারিম ফুলকে আবারো যেতে বলবে, ঠিক তখনই ফুল নিজ থেকে বলে উঠল-
_”ভাবি বলেছে আমি যেন ওনার সাথে ঘুমাই, সেজন্য আমি এখানেই থাকব!”
সারিম ফুলের কথা শুনে নিজের চিরচেনা বাঁকা হাসিটা হেসে উঠল। মাথায় জাউরা বুদ্ধির উদয় ঘটেছে, তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। আচমকা ফুলকে চরম অবাক করে দিয়ে সারিম এক ঝটকায় অরিকে কোলে তুলে নিল! অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সারিম অরির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট পুরে দিল!
ফুল এই দৃশ্য নিজের চোখের সামনে এক সেকেন্ডও সহ্য করতে পারল না। ওড়নায় মুখ গুঁজে সোজা রুম ছেড়ে এক দৌড়ে পালালো!

ফুল চলে যেতেই সারিম অরিকে ওই অবস্থাতেই কোলে করে নিয়ে গিয়ে রুমের দরজার লক আটকে দিল। অরি ছুটে বের হওয়ার জন্য হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে লাগলে সারিম অরিকে নিয়ে সোজাসুজি বেডে এলো। অরিকে নরম গদির ওপর শুইয়ে দিয়ে নিজে অরির বুকের ওপর মুখ গুঁজে শুয়ে রইল। দু-হাতে অরির কোমরখানা শক্ত করে জড়িয়ে চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে লাগল সে।
অরি কিছু বলতে গিয়েও আর বলল না। সারিম অরির বুকে মুখ রেখে মিনমিন গলায় বলল-
_”মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও, চন্দ্রিমা!”
অরি আর না করল না, চুপচাপ সারিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। সারিম নিঝুম হয়ে রইল। এভাবে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর অরি হঠাৎ সারিমকে জিজ্ঞেস করল-
_”আচ্ছা সারিম। সোলেমান আঙ্কেলের খুনের ব্যাপারে নতুন কিছু জানা গেছে? কারা বা কে এত নৃশংসভাবে ওনাকে হত্যা করল?”
সারিম ওভাবেই শুয়ে শুয়ে কিছু একটা ভাবল। ওর মুখটা বেশ গম্ভীর হয়ে এলো। সে ধীরগলায় বলল-

_”এসব থেকে দূরে থাকো, চন্দ্রিমা! তুমি শুধু আমাকে নিয়ে ভাবো।”
অরি বলল-
_”আপনাকে নিয়ে ভাবার জন্য তো গোটা জীবনটাই পড়ে আছে! এখন বলুন না প্লিজ, কে এইরকম পৈশাচিক কাজ করল?”
সারিম এবার একদম চুপ মেরে গেল। সে অরিকে এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কিছু জানতে দেবে না। সবকিছুর আগে নিজের বউয়ের নিরাপত্তাই সারিমের কাছে প্রধান। সারিম অরির বুক থেকে মাথা তুলে অরির কপালে একটা গাঢ় চুমু খেল। বলল-
_”তুমি এসবের মধ্যে ইনভলভ হচ্ছ কেন, বলো তো? অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে, তখন দেখতেই পাবে। এখন এগুলো বাদ দাও তো! প্রচুর খিদে পেয়েছে আমার, কিছু খেতে দাও।”
অরি কিছু বলতে গিয়েও আর বাড়াল না। সারিমের খিদে পেয়েছে শুনে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ানোর জন্য। তখনি সারিম ওকে অবাক করে চট করে কোলে তুলে নিল।

_”কী করছেন কী সারিম, ছাড়ুন! আপনার না খিদে পেয়েছে বললেন?”
সারিম হাসিমুখে বলল-
_”তোমাকে নিচে দিয়ে আসি বউ! একা একা গেলে আবার ভয় পেতে পারো।”
অরি সারিমের গলা জড়িয়ে ধরল। সারিম ওকে কোলে নিয়েই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। অরি সারিমের চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল-
_”আমি মোটেও ভয় পাই না একা একা! এটা কেন বলছেন না যে আপনিও আমার সাথে নিচে যেতে চাইছেন?”
সারিম মুচকি হাসল। সারিমের সেই হাসি দেখে অরি সব বুঝে গেল। নিচে নেমে দুজনে সোজা কিচেনে প্রবেশ করল। রাত অনেক হওয়ায় শাহিন মিয়া নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘুমাতে চলে গেছেন, সেজন্য তাকে আর কেউ ডাক দিল না।
অরি সারিমের কোল থেকে নামল। এরপর ফ্রিজ খুলে দেখল ভেতরে রান্না করা কিছুই রাখা নেই। সে অসহায় চোখে সারিমের দিকে তাকিয়ে বলল-
_”আজ মনে হয় বাড়িতে আমরা ছিলাম না বলে কিছু রান্না করা হয়নি। আপনি একটু ওয়েট করুন, আমি ঝটপট কিছু বানিয়ে দিচ্ছি।”
সারিম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল-

_”তুমি পারো কিছু বানাতে?”
_”মোটামুটি সবকিছুই পারি! খারাপ না, অন্তত মুখে দেওয়ার মতো তো হবেই!”
সারিম আর কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল বউ তার জন্য কী বানায়। অরি ফ্রিজ থেকে বিফের প্যাকেট বের করে স্লাইস করে কেটে রাখা মাংসের টুকরোগুলো নিয়ে নিল। অপর একটা বাটি থেকে দুটো মাল্টা নিল জুস বানানোর জন্য। সারিম কিচেন কাউন্টারে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে দেখতে লাগল বউ তার জন্য কত যত্ন করে রান্না করছে।
মাংসের টুকরোগুলো ব্ল্যাক পেপার আর হালকা লবণের সাহায্যে প্যানের মধ্যে বাটার আর রসুন দিয়ে বিফ স্টেক বানাতে বসাল অরি, চুলো হাই-লো মোডে রেখে। এরপর অন্য একটা প্যান বসিয়ে সেখানে কিছু সবজি আর আগে থেকে সেদ্ধ করে রাখা রাইস দিয়ে দিল। তারপর ফ্রাইড রাইস বানাতে লাগল। সারিম গভীর পর্যবেক্ষণে সব দেখছিল। অরি খুব নিখুঁতভাবে একদম প্রফেশনাল শেফদের মতো কাজ করছে!

সবকিছু তৈরি হয়ে গেলে চুলা অফ করল অরি। ব্লেন্ডার জারে মাল্টাগুলো সুন্দরভাবে কেটে খোসা ফেলে, আইস দিয়ে পুদিনাপাতা, চিনি ও লবণের সাহায্যে ব্লেন্ড করে জুস বানিয়ে একটা কাচের গ্লাসে ঢালল।
অরির জুস ঢালা শেষ হওয়া মাত্রই সারিম পেছন থেকে এসে অরিকে জড়িয়ে ধরলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই,এক ঝটকায় কোলে তুলে রান্নাঘরের কাউন্টারের মাঝে বসিয়ে দিল! অরির দু-পাশে রান্নার দুটো চুলা ছিলো।সারিম অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করে অরির দু-পাশের দুটো চুলার আগুন হালকা রেখেই জ্বালিয়ে দিলো।
অরি ভয়ে লাফিয়ে উঠতে গিয়েও পারল না। সারিম ওইভাবেই অরিকে আটকে রেখে অরির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিল! অরি নামার জন্য ছটফট করতে গিয়েও দু-পাশের আগুনের শিখা দেখে ভয়ে একদম চুপ হয়ে গেল! সারিম গলায় মুখ রাখা অবস্থাতেই অরির এমন অসহায় অবস্থা বুঝে একচিলতে বাঁকা হাসি হাসল।
অরি সারিমকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল-

_”সারিম কী করছেন? ছাড়ুন বলছি! আমার খুব ভয় করছে! আপনার খিদে পাচ্ছিল না?যান।খাবার খান গিয়ে।নয়তো ঠান্ডা হয়ে যাবে!”
সারিম অরিকে ছাড়ল না, ওভাবেই আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অরির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট পুরে দিল। অরি আর কিছু বলতে পারল না। সারিম এক হাতের সাহায্যে ধীরকদমে অরির শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। অরি চেয়েও লোকটাকে হাত দিয়ে আটকাতে পারছে না, কারণ এখন সামান্য সরতে গেলেই আগুনে কাপড় লেগে যাওয়ার ভয়!
আস্তে আস্তে সারিম অরির ঠোঁট ছেড়ে বুকের দিকে নেমে এলো। এরপর নিজের সমস্ত রিফ্রেশমেন্টের ঠিকানা খুঁজতে লাগল অরির উষ্ণতায়। অরি নিজের ধৈর্য বজায় রেখে শুধু সারিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল। কিছু করতে না পেরে সারিমের পিঠে নখ দাবিয়ে দিল। সারিম যেন এতে আরও উন্মাদের মতো উন্মাদ হয়ে গেল, সে একদম বিলীন হতে লাগল অরির ছোঁয়ায়।
এভাবে ঘণ্টাখানেক পর সারিম অরিকে ছেড়ে দিল। অরি হাঁপাতে হাঁপাতে জোর জোরে শ্বাস নিতে লাগল। সারিম চুলা দুটো বন্ধ করে দিল, এরপর অরিকে সাবধানে সেখান থেকে নিচে নামাল। অরির পরনের এলোমেলো পোশাকটা খুব যত্নে ঠিক করে দিল সে। অরি চুপচাপ শান্ত হয়ে সেসব দেখল।
সারিম অরির পোশাক ঠিক করে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল-
_”খাবারগুলো ওভেনে গরম করে রুমে নিয়ে এসো।”

বলেই সারিম অরিকে কিচেনে রেখে সোজা ওপরে চলে গেল! অরি রেগে-মেগে একাকার হয়ে গেল! কত বড় জাউরা হলে রোমান্স শেষ হতেই বউয়ের আর কোনো গুরুত্ব থাকে না! লোকটা কি তবে ওর সাথে এসব করার জন্যই কিচেনে এসেছিল? অরি আজ মরতে মরতে বেঁচেছে! কী সাংঘাতিক লোক, দুটো আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রোমান্স করে! ইতিহাসের পাতায় মনে হয় এই লোকই এক পিস!
অগত্যা অরি গজগজ করতে করতে খাবারগুলো ওভেনে একটু গরম করে ট্রেতে নিয়ে রুমে এলো। দেখল সারিম সোফায় নিশ্চিন্তে বসে আছে। অরি টি-টেবিলের ওপর খাবারগুলো রাখল। এরপর ঘুরে বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার আগেই সারিম উঠে এসে শক্ত করে অরির হাত ধরে ফেলল।
অরি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করার আগেই সারিম ওকে নিজের কোলে বসিয়ে দু-দিক থেকে লক করে নিল। অরি এবার বেশ মেজাজ দেখিয়েই বলল-

_”সমস্যা কী আপনার? ঘুমাতে যাব, ছাড়ুন আমাকে!”
সারিম ছাড়ল না, অরিকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল-
_”খাইয়ে দাও!”
অরি বলল-
_”কেন? আপনার হাত নেই? নিজ হাতে খান!”
সারিম বাঁকা হেসে বলল-
_”বউ থাকতে ওই হাতগুলো এখন ইউজ করতে চাচ্ছি না। তুমি খাওয়াবে, নাকি আবার একটু আগে কিচেনে যেগুলো হলো সেগুলো শুরু করব?”
আর কিছু বলার আগেই অরি তড়িঘড়ি করে সারিমের মুখের ভেতর চামচ দিয়ে খাবার পুরে দিল! বলল-
_”খান! তবুও আর একটাও অসভ্য কথা মুখ দিয়ে বের করবেন না!”
সারিম মনে মনে হাসল। আর জ্বালাতন না করে চুপচাপ অরির হাতে পুরো খাবারটা খেতে লাগল।খাওয়া শেষ হতেই অরি সারিমকে শুতে বলে খালি প্লেটগুলো নিয়ে কিচেনে রেখে এলো। এরপর রুমে ফিরে দেখে সারিম বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোনে মনোযোগ দিয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ গেম খেলছে! অরি দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাল, রাত প্রায় একটা বাজে। সে দরজা লক করে লাইটা অফ করলো।এরপর সারিমের পাশে এসে শুয়ে পড়ল।
সারিম কিছু বোঝার আগেই অরি ওর হাত থেকে ফোনটা ছো মেরে ছিনিয়ে নিয়ে অফ করে বালিশের পাশে রেখে দিল।

_”বউ, দাও প্লিজ! আর অল্প কয়টা ক্যান্ডি ফাটানো বাকি আছে!”
অরি কঠোর গলায় বলল-
_”আর একটাও না! চুপচাপ ঘুমান বলছি!”
অগত্যা সারিম অরির হুকুম মেনে নিল। সে অরির বুকে মুখ গুঁজে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। অরিও সারিমের চুলে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে চোখ দুটো বুজল।
ভোরের দিকে শাহিন মিয়া আরিশান মৃধাকে ডাকতে এলেন জগিংয়ে যাওয়ার জন্য। সাধারণত যদিও আরিশান মৃধাকে কোনোদিন ডাকতে হয় না, তিনি নিজেই আগেভাগে উঠে যান। তবে আজ অনেক বেলা হয়ে যাচ্ছে দেখে শাহিন মিয়া বাধ্য হয়ে ওনার ঘরের দিকে এলেন।
আরিশান মৃধার রুমের সামনে এসে শাহিন মিয়া দেখতে পেলেন ঘরটির দরজা সামান্য আধখোলা হয়ে আছে-ঠিক যেমনটা কাল রাতে সারিম রেখে গিয়েছিল।
শাহিন মিয়া দরজায় আলতো করে নক করলেন-

_”স্যার, আসব?”
ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সেজন্য তিনি আবার নক করলেন। এবারও ঘর একদম নিস্তব্ধ। এভাবে কিছুক্ষণ ডাকার পর শাহিন মিয়া বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। আরিশান মৃধাকে তো আগে কখনো এভাবে বারবার ডাকতে হতো না, একবার নক করলেই তিনি সাথে সাথে রেসপন্স করতেন! এখন কী হলো আবার?
দরজা প্রথম থেকেই খোলা ছিল, সেজন্য শাহিন মিয়ার মনে কিছুটা সন্দেহ দানা বাঁধল। তিনি ভাবলেন হয়তো আরিশান মৃধা ঘরে নাও থাকতে পারেন, তাই একবার ভেতরে চেক করতে গেলেন। ভেতরে প্রবেশ করে রুমে কাউকে দেখতে পেলেন না, তাই তিনি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।
ঠিক তখনই ওনার কানে একটা কিছু নিচে পড়ার শব্দ এলো! তিনি চকিত নয়নে সেদিকে তাকালেন-শব্দটা ব্যালকনি থেকে আসছে।
শাহিন মিয়া ধীরপায়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখতে পেলেন আরিশান মৃধা রকিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তিনি ওনাকে ডাকার জন্য একদম কাছে এগিয়ে গেলেন। কাছে গিয়ে দেখেন আরিশান মৃধার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ।
শাহিন মিয়া ডেকে উঠলেন-

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৩

_”স্যার! আপনার জগিংয়ের সময় হয়েছে তো”
কিন্তু আরিশান মৃধা বিন্দুমাত্র কোনো সাড়া দিলেন না।
এবার শাহিন মিয়া কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে ওনার কাঁধ ধরে মৃদু ধাক্কা দিলেন। আর সাথে সাথেই-আরিশান মৃধার মাথাটা একপাশে ঢলে পড়ে গেল!শাহিন মিয়া আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে খপ করে ওনার ঢলে পড়া মাথাটা ধরে ফেললেন!

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৪৫