উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৪
রুহানিয়া ইমরোজ
(যারা আগে ১-৩ পর্ব পড়ছেন তারা এখন আবার এই পর্ব গুলো পরেন পর্ব গুলো নতুন করে দেওয়া হয়েছে)
কুয়াশাজড়ানো শীতের সকাল। ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘর ছুঁয়েছে। হাড় হিম করা ঠান্ডা না পড়লেও শীতের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। অন্তরীক্ষে সূর্যের দেখা নেই। হয়তো বেলা গড়ালে উঁকি দিবেন মহাশয়। নিজ আলোয় আলোকিত করবেন ত্রিভুবন।
সাত সকালে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে চিত্রা। উদ্দেশ্য, কলেজে যাওয়া। তার মেসের বিপরীত পাশেই কলেজটা অবস্থিত। রাস্তা ক্রস করে দু মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবে। এজন্যই ধীরস্থির পায়ে হাঁটছে। নিরব চোখে অবলোকন করছে চারপাশ। ঢাকা আসার পর আজই প্রথম বাড়ি থেকে বেরিয়েছে সে৷
অচেনা শহর, অজানা মানুষের ভীড়ে চিত্রা একদমই একা। এই একাকীত্বের অনুভূতিটা বড্ড বাজে। মন বিষিয়ে দেয় রীতিমতো। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিক্ত অনুভূতি গুলো ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
সামনের পথ বড়ই দুর্গম। বহু চড়াই-উতরাই পার করতে হবে। এতটুকুতে ভেঙে পড়লে চলবে না।বিষন্নতা ঝেড়ে ফেলে রাস্তা পার হয় চিত্রা৷ আর্লি মর্নিং বলে রাস্তাটা ফাঁকা। গাড়ির কোলাহল নেই। শুধুমাত্র স্টুডেন্টস আর তাদের অভিভাবকদের দেখা যাচ্ছে। চিত্রা নিরব চোখে দেখে সেই দৃশ্য। তার কপালে জোটেনি এত আদর কিন্তু অন্যের ভালোবাসা দেখতেও ভালো লাগে।
ভেতরকার চাপা কষ্টগুলোকে কবর দিয়ে কলেজের প্রবেশদ্বার মাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই মৃদু বাতাস ছুঁয়ে যায় চিত্রার সমগ্র চিত্ত। সামনে এগোতেই সবুজাভ ক্যম্পাসটা তার নজর কাড়ে। তথাকথিত মর্ডান ভাইব না থাকলেও চক্ষু শীতল করার মতো জায়গাটা। যতদূর চোখ যায় সবখানেই সবুজবীথি।
খিলগাঁও মডেল কলেজ ঢাকার স্বনামধন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে অন্যতম। উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি (পাস), অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। এই কলেজে ছাত্ররাজনীতিও পরিচালিত হয়।
উপরের তথ্যগুলো নিতু মেহবুব দিয়েছেন চিত্রাকে। সেই সাথে পরামর্শও দিয়েছেন, এসব থেকে সাত হাত দূরে থাকার জন্য। কোনোক্রমেই যেনো সিনিয়রদের সাথে ঝামেলায় না জড়িয়ে পড়ে, তা নিয়েও একগাদা জ্ঞান দিয়েছেন। চিত্রা ভদ্র মেয়ের মতো সবকিছু মস্তিষ্কে গেঁথে নিয়েছে। কোনো বিবাদে জড়াতে চায় না সে কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? তার জীবনটা তো নাটকের রঙ্গ মঞ্চ। স্বাভাবিক কিছু ঘটবে কিভাবে?
সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত কলেজ টাইম এরপর দুপুর একটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ভার্সিটি চলে। কম্বাইন্ড কলেজ নয় বলে, সকাল শিফটে মেয়েদের এবং বিকাল শিফটে ছেলেদের ক্লাস হয়। এই ব্যপারটা চিত্রার জন্য খুব স্বস্তিদায়ক।
আজ তার কলেজের প্রথম দিন ছিল। খুব একটা মন্দ সময় কাটেনি। ক্লাস গুলো বেশ ভালো লেগেছে চিত্রার। সহপাঠীরাও মোটামুটি ফ্রেন্ডলি। ইতিমধ্যে তার তিনজন ফ্রেন্ড জুটে গেছে। একজনের নাম স্মৃতি অন্যজন নিহা আর সবথেকে দুষ্ট জনের নাম পায়েল। অতিব সাধারণ পরিবারের অসাধারণ সদস্য তারা। একেকটা একেক কিসিমের পাগল। তাদের পাল্লাই পড়ে বহুদিন পর,চিত্রা শব্দ করে হেসেছে। মজা এবং আড্ডার ছলে কেটেছে টিফিন পিরিয়ড৷
ক্লান্ত অপরাহ্ন বেলা। সোনালি রোদের নরম তাপে স্মিত শীতটুকু বিলীন হয়ে গেছে। আবহাওয়ায় নাতিশীতোষ্ণ ভাব বিরাজমান। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে বারোটা বাজতেই ছুটির ঘন্টা পড়ল৷ ক্লাসভর্তি শিক্ষার্থীরা হৈহৈরৈরৈ করে ঘর ছেড়ে বেরোলো। পায়েল, স্মৃতি আর নিহার সাথে চিত্রাও বেরিয়ে এলো। চটপটে পায়েল চিত্রাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-“ তুই ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখেছিস?
অল্প সময়ে সম্পর্কটা গাঢ় হয়ে গেছে বলে তুই ডাকতে হেজিটেট ফিল করছে না কেউ। চিত্রা সল্প শব্দে জবাব দেয়,
-“ সুযোগ হয়নি।
পায়েল মূলত চিত্রাকে ক্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে দেখাতে চায় কিন্তু মাঝখান দিয়ে স্মৃতি ফোঁড়ন কেটে বলে,
-“ উড়নচণ্ডীর বাচ্চা, আজকে যে স্যার পড়াতে আসবে সেটা ভুলে গেছিস? এক্ষুণি রিকশায় না উঠলে বাসায় পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। মা কেলানি দিবে…
পায়েল আর স্মৃতির বাসা কিছুটা দূরে৷ ওরা বাসাবো তে থাকে। এজন্যই কলেজ শেষ করে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পায় না। স্মৃতির কথায় মুখ গোমড়া করে ফেলে পায়েল। পরিস্থিতি সামলাতে নিহা বলে,
-“ তোরা যা, আমি ওকে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি ক্যাম্পাসটা৷ রাতে গ্রুপ কলে আসিস। আড্ডা দিবনি সবাই মিলে..
ওরা সম্মতি জানিয়ে চলে যায়। চিত্রাকে বগলদাবা করে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে নিহা প্রাণোচ্ছল গলায় বলে উঠে,
-“ ক্যাম্পাসে ঘুরে দেখার মতো তেমন কিছু নেই। কিন্তু একজন আছে যার জন্য পুরো ক্যাম্পাসটা বারংবার চক্কর দিতে ইচ্ছে করে। শালা একখান চিজ্ মাইরি ।
নিহার শেষোক্ত কথায় চিত্রা বিষম খায়। ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
-“ তোমার সেই ক্রাশ? ”
নিহা ইতিমধ্যে সেই অজ্ঞাত মানবকে নিয়ে অজস্র কথা বলে ফেলেছে। চিত্রা সঠিক গেস করায় সে রীতিমতো লাফিয়ে উঠে বলে,
-“ ইয়েস মাই লাভ। ডু ইয়্যু নো হু ইজ হি? ”
চিত্রা আশপাশ দেখতে দেখতে আনমনে শুধায়,
-“ কে?
নিহা উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলে,
-“ নাওয়াফ শিকদার সমুদ্র। কলেজ শাখার সভাপতি৷ ক্যাম্পাসের সকল মেয়ের হার্টথ্রব। টিচারদের একমাত্র ভরসা আর আমার ব্যক্তিগত মাল। ব্যাটা পুরাই মাখন। যখন বাইক রাইড করে, মেয়েরা রীতিমতো গিলে খায় আমার হ্যান্ডসামকে। ওর নীল বর্ণের আমন্ড আইজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি… আহা!
অতি আবেগে ভাসতে থাকা নিহা স্থানকাল ভুলে যা-তা বলে বসে। এটাই তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। কেননা ঠিক তাদের পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক নুসাইবা ইবনাত তাথৈ। নাওয়াফ শিকদারের তথাকথিত বেস্টফ্রেন্ড। প্রচলিত আছে, নুসাইবা নাকি নাওয়াফকে ভালোবাসে। তার হাবভাবেও সেটার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়৷
প্রিয় মানুষ সম্পর্কে এমন কথা শুনলে কার মাথা ঠিক থাকে? শান্ত স্বভাবের নুসাইবাও মেজাজ ধরে রাখতে পারল না। নিজের সাথে থাকা চামচাদের বলল,
-“ ওদের নিয়ে নতুন বিল্ডিংয়ের থার্ড ফ্লোরে এসো। ”
সামান্য বার্তাটা ভীত করে তুলল নিহা আর চিত্রাকে। দু জন একে-অপরের দিকে চেয়ে শুকনো ঢোক গিলল। নিহার তো আত্মা শুকিয়ে গেল। নুসাইবার পেছনে থাকা তিনটা মেয়ে চোখ পাকিয়ে চুপচাপ ওদের সাথে হাঁটার ইশারা করল। সরাসরি তো আর শাসন করা যায় না৷ আড়ালে ডেকেই টাইট দিতে হবে এসব পিপীলিকাদের।
কথায় আছে, কেউ ভেলায় মরে আর কেউ ভেলার বাতাসে মরে অর্থাৎ কেউ দোষ করে শাস্তি পায় আর কেউ বিনাদোষে দোষী হয়। চিত্রার কপাল বরাবরই মা শা আল্লাহ। এবারেও সে তার জাদু দেখাতে ভুল করল না। সারাবছর গুপ্ত থাকতে চাওয়া চিত্রা প্রথম দিনেই সাধারণ সম্পাদকের চোখে কালার খেয়ে গেলো। কি আর করার, তাদের চোখ রাঙানিতে বাধ্য হয়ে সদ্য নির্মিত সুনসান ভবনের দিকে এগিয়ে গেল৷
কলেজের শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে নতুন বিল্ডিংটা বানানো হচ্ছে। বাজােট ইস্যু থাকায় কাজ বন্ধ আছে। আপাতত বিল্ডিংটা পরিত্যক্ত এবং পুরোপুরি সুনসান। সহজে কেউ এদিকে আসে না বিধায় নানান দলীয় আলোচনা, গোপন প্ল্যানিং এবং টুকটাক র্যাগিং এর জন্য থার্ড ফ্লোরের তিনটা রুম ব্যবহার করা হয়। বলা যায়, এটা তাদের অলিখিত আস্তানা।
নিহা এবং চিত্রাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দেয় নুসাইবা। সেই শব্দে কেঁপে উঠে ওরা দুজন। সিনিয়রদের চোখ-মুখে এক ধরনের হিংস্রতা খেলা করছে। এই ব্যপারটা ওদের ঘাবড়ে দেয়। কেউ টু শব্দ করতে পারে না। নুসাইবা একটা উঁচু টেবিলের উপর বসে তার সহযোগীর উদ্দেশ্যে বলে,
-“ রাখি? কাঁচা কঞ্চিতে ভালোমতো তেল মাখিয়ে আমার হাতে দে।
নিহার দিকে দৃষ্টি রেখে কথাটা বলে নুসাইবা। রাগে লাল হয়ে আছে তার ফর্সা চেহারা। তার কথামতো মেয়েটা কাজে লেগে পড়ে তন্মধ্যে একজন সাইডে গিয়ে ফোন বের করে ঝটপট একটা মেসেজ পাঠায়। অপর পাশ থেকে ফিরতি উত্তর আসে না শুধু সিন হয়। এরমধ্যে রাখি, তেল চকচকে একটা কঞ্চি নুসাইবার হাতে দেয়।
ওটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নুসাইবা শীতল গলায় প্রশ্ন করে,
-“ ছোটোরা ভুল করলে বড়রা কি করে?
তার প্রশ্ন করার ধরন দেখে নুসাইবার পরিকল্পনা বুঝে যায় চিত্রা। সে মূলত ওদের আঘাত করে রাগ মেটাতে চাইছে। ভয়ে জুবুথুবু হয়ে থাকা নিহার পানে একবার চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিত্রা এগিয়ে গিয়ে নিরুত্তাপ গলায় জবাব দেয়,
-“ শাসন করে।
চিত্রাকে উত্তর করতে দেখে নুসাইবা বাঁকা চোখে চায়। সে আশা করেনি বন্ধুকে বাঁচাতে এই মেয়েটা এগিয়ে আসবে। এসেছে যখন তখন তার ভাগের পাওনাটাও বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। নুসাইবা পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে,
-“ আর?
চিত্রা ধীরস্থির কন্ঠে কাঙ্ক্ষিত জবাবটা দেয়,
-“ প্রয়োজনে মারে।
নুসাইবা নাকের পাটা ফুলিয়ে চোখ গরম করে বলে,
-“ তোমরা ভুল করোনি?
নুসাইবার রাগ কমানোর জন্য চিত্রা নরম গলায় বলে,
-“ জি করেছি।
নুসাইবা শক্ত গলায় বলে,
-“ তোমাদের কি শাস্তি পাওয়া উচিত নয়?
প্রত্যুত্তরে চিত্রা মাথা ঝাঁকাল। নুসাইবা চড়া গলায় বলল,
-“ হাত পাতো..
চিত্রা বিনাবাক্যে হাত এগিয়ে দেয়। নিহা করুন চোখে তাকায়। পরক্ষণেই সপাংসপাং শব্দ তুলে কাঁচা কঞ্চিটা কালশিটে দাগ বসিয়ে দেয় চিত্রার হাতে৷ মেয়েটা নড়ে উঠে কিন্তু আর্তনাদ করে না। নিহা শব্দ করে কেঁদে ফেলে। রাখি নামের মেয়েটা ধমক দিয়ে বলে,
-“ আওয়াজ নিজে। নোংরামি করার আগে মনে ছিল না? ব..
বাকি কথাটুকু বলার আগে দরজায় টোকা পড়ে। সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকায় একে-অপরের দিকে। এসময়ে কে এলো? তা দেখার জন্য রাখি দরজা খুলতে এগিয়ে গেল। নুসাইবা চাপা গলায় বলল,
-“ একটা কথাও যেনো বাহিরে না যায়। নয়তো শাস্তি ডাবল করে দিব। ভদ্র বাচ্চার মতো থাকলে সব গুনাহ মাফ। বুঝেছ?
বলেই হাতের কঞ্চিটা সাইডে ফেলে দিল। আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হাতখনা আড়াল করে ফেলল চিত্রা। নিহা চোখ মুখে স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল। এর মধ্যে দরজা খুলল রাখি। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কে দেখে তার পায়ের তলার জমিন সরে গেল। অস্ফুটে উচ্চারণ করল,
-“ ভূম্ মি..
পুরোটা বলার আগেই স্ব শব্দে চড় পড়ল তার গালে। শক্ত হাতের চড় খেয়ে রাখি তাল হারিয়ে দু কদম পিছু সরে গেল। ভূমিকা নামক নির্দয়হীন রমণী নির্বিকার গলায় বলল,
-“ আজকে বাসায় গিয়ে মায়ের কাছে শিখবে, কীভাবে বড়দের সম্বোধন করতে হয়। কালকে এসে আমি দেখব কতটুকু শিখেছ।
রাখি গালে হাত দিয়ে নত দৃষ্টিতে চেয়ে রইল মেঝের দিকে। ভূমিকা চুইংগাম চিবুতে চিবুতে চোখ ঘুরিয়ে পুর ঘরটা পর্যবেক্ষণ করে ফেলল। সবার কৌতূহলী দৃষ্টি তার উপরেই নিবদ্ধ। ভূমিকা প্রবেশ করার পরপরই ঘরের আবহাওয়া পালটে গেছে। নুসাইবাও নেমে এসেছে হাই বেঞ্চ থেকে।
বিষয়টা লক্ষ্য করে গটগট শব্দ তুলে তার সামনাসামনি গিয়ে দাঁড়াল ভূমিকা। চিত্রা আর নিহা শ্বাস আঁটকে চেয়ে আছে। তাদের ধারণা নুসাইবা কেও কষিয়ে চড় মারবে কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। ভূমিকা পিছিয়ে গিয়ে হাই বেঞ্চে উঠে বসে তাদের দিকে ফিরল। ওরা দু’জন সাথে সাথেই ভয়ে চুপসে গেলো। মাঝখান দিয়ে নুসাইবা তোতলানো স্বরে বলল,
-“ আ.. আপু তুমি এখানে?
ভূমিকা নিঃশব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তার পানে চেয়ে বলল,
-“ ডু ইয়্যু নো হোয়াট ইজ নিল ডাউন? ক্যান ইয়্যু ডু দ্যাট ?
পিওর ব্রিটিশ একসেন্টে কথাগুলো বলল ভূমিকা। তার কথা শুনে তড়িঘড়ি করে ভূমিকার সামনেই মেঝেতে হাঁটু গেড়ে পড়ল নুসাইবা। ভয়ে তার কলিজা কাঁপছে ৷ ভূমি যদি কিছু বুঝতে পারে তবে সেটা নাওয়াফ পর্যন্ত চলে যাবে। এসব খবর উপরমহল অব্দি যাওয়া মানে তার পদ হারিয়ে ফেলা৷ এমনটা হলে ইহজীবনে কখনোই নাওয়াফ শিকদার সমুদ্র তার হবে না৷
নুসাইবাকে পদতলে দেখে ভূমিকার আত্মা পৈশাচিক আনন্দ পেল। সেটা প্রকাশ করল না। জমিনে পড়ে থাকা কঞ্চিটা তুলে নিল হাতে। ওটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিহার দিকে চেয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-“ ইন শর্টে ফুল ঘটনার প্রিভিউ দাও। কি এমন ঘটেছে যার জন্য নুসাইবা ইবনাত তোমাদের কোলে করে তুলে এনে চুমু খাচ্ছে?
নিহা পড়ে গেল দ্বিধাদ্বন্দে। কালো টি শার্টের উপর গাঢ় নীল রঙের ডেনিম জ্যাকেট পরিহিত অদ্ভুত কিসিমের ভূমিকার পানে তাকাল তো আরেকবার জমিনে ভিক্ষুক এর মতো বসে থাকা নুসাইবার পানে চাইল। ভূমিকা চ সূচক শব্দ করে বলল,
-“ ও চুনোপুঁটি। ভয় পেয়ো না, সোজাসাপ্টা কথা বলো৷ একটা টপিক মিস গেলে, আমি তোমায় ডাবল টর্চার করব। মাইন্ড ইট।
এবার নিহা গড়গড়িয়ে বলে ফেলল সমস্ত কথা৷ ভূমি বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলল,
-“ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী ইলন মাস্ক, সুন্দরতম মানুষ টম ক্রুজ, ক্রাশবয় জাংকুক, মাফিয়া ম্যান পুতিনকে ছেড়ে এসব এসহোলের জন্য পাগল হচ্ছো? শেম অন ইয়্যু।
নিহার মুখটা চুপসে গেল। তার পাশে দাঁড়ানো নিশ্চুপ চিত্রাকে মাথা হতে পা পর্যন্ত স্ক্যান করে ভূমিকা বলল,
-“ হাতটা দেখি..
চিত্রা নিরবে হাত বাড়িয়ে দিল। শ্যামলা হাতটা রক্তাভ বর্ণ ধারণ করেছে। সকালে যেই হাতটা ওর জন্য আদর করে যত্ন মিশিয়ে রেঁধেছে সেই হাতের করুণ দশা সহ্য হলো না ভূমিকার। মস্তিষ্কটা খট করে গরম হয়ে গেলো৷ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
-“ জীবনে চরম ম্রা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকো৷ অন্যের আঘাত নিজের গায়ে নেওয়া মানুষেরা কখনোই সুখী হতে পারে না। তারা কেবল প্রয়োজন হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।
চিত্রা প্রত্যুত্তর করল না। ভূমিকা ভুল কিছু বলেনি কিন্তু সে-ই বা কি করত? ওর মার খেয়ে অভ্যাস আছে৷ নিহা তো আদরে মানুষ হওয়া ননীর পুতুল। সামান্য আঘাতে কেঁদেকেটে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেলত।
চিত্রাকে নিরুত্তর দেখে ভূমিকা এবার পা বাড়িয়ে হাই বুটের সামনের অংশটুকু নুসাইবার চিবুকে ঠকিয়ে তার মাথা উঁচু করে চোখে চোখ রেখে বলল,
-“ কলিজায় সাহস বেড়েছে? ব্যক্তিগত ক্রোধ মেটাতে জুনিয়রকে চিপায় এনে শাসন করা হচ্ছে? মরার পাখনা গজিয়েছে না? মস্তিষ্ক বরাবর বুলেট ঠুকে দিব একদম। সব ল্যাটা চুকে যাবে।
নুসাইবা স্থানকাল ভুলে ফুঁপিয়ে উঠল। হাত জোড় করে বলল,
-“ আমার ভুল হয়ে গেছে। স্ স্যরি আপু।
ভূমিকার মাথায় দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। সামান্য এপলজিতে গলার পাত্রী নয় সে। হাতের কঞ্চিটা নিহার দিকে এগিয়ে দিয়ে নুসাইবা কে বলল,
-“ ভুল করলে শাস্তি পেতে হয়। তোমারই নীতি, আমি শুধু রিপিট করছি। একটা সাউন্ড ও যেনো না হয় ওকে? আই হেট নয়েজ৷
বলেই নিহাকে ইশারা করল নুসাইবার পিঠে আঘাত করার জন্য। সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করল না নিহা। প্রিয় বান্ধবীর প্রতিশোধটা নিয়ে নিল। দয়ামায়াহীন ভাবে একের পর এক আঘাত করতে লাগলো নুসাইবার পিঠে। মেয়েটা আঁতকে উঠে শব্দ করতে চাইল। ভূমিকা তার জুতার সামনের অংশ দিয়ে শক্ত করে নুসাইবার চিবুক ধরে থাকায় সেটা সম্ভব হলো না৷
গোঙ্গানির শব্দটুকু গোপন করতে উচ্চ শব্দে বিলিভার গানটা ছাড়ল ভূমিকা। গানটায় কি যেন একটা আছে। অটোমেটিক এনার্জি বেড়ে যায়। নিহার ক্ষেত্রেও তার ব্যতীক্রম ঘটল না। আনন্দ নিয়ে পেটাতে থাকল তাথৈ কে।
একপর্যায়ে আঘাতের প্রকোপে লুটিয়ে পড়ল নুসাইবা। সহসাই নিহার হাত থেমে গেল। ভূমিকা চেখের ইশারায় ওকে সরে যেতে বলে নুসাইবার তিন চামচাকে বলল,
-“ লিমিটের মধ্যে থেকে চামচামি করবা নাহলে মারব এখানে, সব-কয়টা থাকবা কবরে। কথা ক্লিয়ার?
ওরা মুখ ফুটে কিছু বলার সাহটুকুও পায় না৷ ভূমিকা আলগোছে লাফ দিয়ে বেঞ্চ থেকে নামে। চিত্রার পানে চেয়ে ভাবলেশহীন গলায় বলে,
-“ খাবারের ধার শোধ করে দিলাম। এরপর থেকে ওসব ইস্টুপিট কাজকর্ম দেখলে ফ্যানের সাথে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখব তোমায়। ভূমিকা কারও যত্নে গলে যাওয়ার পাত্রী নয়৷ সে জ্বলন্ত আগুন, নিজেকে অক্ষত রেখে অন্যকে পোড়ানো তার ধর্ম। সো, স্টে এওয়ে ফ্রম মি।
বলেই সে গটগট শব্দ তুলে প্রস্থান করে৷ মেয়েটা অদ্ভুত, ঝড়ের মতো আসে আবার ক্ষণিকের মধ্যে হাওয়া৷ কি যেনো একটা আছে তার কথায়। সবাই তাকে ভয় পায় কিন্তু চিত্রা তার মাঝে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে। ভূমিকা চলে যেতেই নিহা আর সেও চটজলদি বেরিয়ে আসে। নিহা তার হাত ধরে আফসোসের সুরে বলে,
-“ স্যরি দোস্ত, আমার জন্য তোকে কষ্ট পেতে হলো।
চিত্রা নরম সুরে বলল,
-“ কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি। এই ব্যপারটা এখানেই সমাপ্ত হয়ে গেলে আরও বেশি ভালো থাকব।
নিহা উত্তেজিত হয়ে বলে,
-“ এই ঘটনা এখানেই কবরস্থ হয়ে গেছে। দেখলি না ওই ব্যাডি আপুটা কীভাবে শাঁসালো ওদের? এরপর আর কারও কলিজায় অতখানি সাহস হবে না। উফ্ আমি তার ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে গেছি। হাউ সুইট, হাউ সুন্দর, হোয়াট আ ফিগার… আহা হা!
উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৩
নিহার কথা শুনে বিরক্ত চোখে তাকাল চিত্রা কিন্তু কিছুই বলল না। অপাত্রে জ্ঞান দান করা অনুচিত। এমনিতেও শরীর ভালো লাগছে না তার। মারের ব্যথায় জ্বর চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে। এখন ভালোই ভালোই এসব ঝামেলা মিটে গেলে হয়। কিন্তু নিয়তির লিখন যে খন্ডানো দায়। যেটাকে সামান্য ব্যপার ভেবে ভুলে যেতে চাইল দুজন সেটাই মহামারি রূপে ধেয়ে ধ্বংস করে দিল তাদের জীবন।
