এক দেখায় পর্ব ১৬
সুরভী আক্তার
” একটা মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে একজন বেস্ট, কেয়ারিং লাইফ পার্টনার । সব মেয়েদের মতো আমিও চাই আমার জীবনে একজন বেস্ট কেউ আসুক । যে আমাকে আমার মত করেই ভালোবাসবে । আমার রাগ-অভিমান বুঝবে, আমাকে আগলে রাখবে, আমার যত্ন নেবে , আমার ছোট ছোট বিষয় গুলোর খেয়াল রাখবে , যার কাছে আমিই হবো ফার্স্ট প্রায়োরিটি । আমি জানি আমি আহামরি রূপের অধিকারি নোই , তবুও আমার জীবনে যে আসবে আমি তার চোখের প্রশান্তি হতে চাই । হাজারো রুপবতী নারী সামনে থাকলেও তার দৃষ্টি যেন শুধু আমার জন্যই নির্ধারিত থাকে । আমি এমন কাউকে চাই, যে আমার থেকে বেস্ট কাউকে খুঁজতে যাবে না, তার কাছে আমিই হবো বেস্ট । আমি তার জীবনের রাব্বাতুল বাইত হতে চাই ।
আমি আমার জীবনে প্রেমিক হিসেবে কাউকে চাই না , আমি চাই আমার জীবনে যে আসবে , সে হালাল হয়ে আসুক । আমার সৌলমেট হয়ে আসুক । উত্তম জীবন সঙ্গী রূপে আমি তাকে আমার জীবনে চাই । তার জীবনের প্রথম নারী বা তার প্রথম ভালোবাসা আমি হতে পারবো কি না জানি না,, তবে আমি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ নারী এবং শেষ ভালোবাসা হতে চাই । তবে হ্যাঁ,, যদি আসতে হয় , তবে তাকে শুধু আমার জন্যই আসতে হবে , তার ভেতরে আর অন্য কেউ থাকলে চলবে না । ভালোবাসলে মস্তিষ্কের গোটা শহরটা আমার নামে লিখে দিতে হবে । যেখানে শুধু আমি আর আমিই থাকবো । যেখানে শুধুই আমার রাজত্ব চলবে । আমি একটা সুন্দর মন চাই, যার পৃথিবী হবে শুধু আমাকে ঘিরে । আমি তাকে ভালোবাসাবো মানে জগতের সব নারীরা তার জন্য নিষিদ্ধ হবে । তার পাশে আমি আর অন্য কাউকে সহ্য করবো না । ভালোবাসা জিনিসটা বড্ড ভয়ংকর । তবে তার থেকেও বেশি ভয়ংকর জেদ – আমি কারোর জেদ হতে চাই, যে সবকিছুর পরেও আমাকে তার কাছে রেখে দেবে ।
আমার কাছে ভালোবাসা মানে শরীর স্পর্শ করা নয় – চোখের দিকে তাকিয়ে মন স্পর্শ করাই ভালোবাসা । আমাকে যদি কেউ ভালোবাসে, তাহলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি সেটা বুঝতে চাই । আমার প্রতি ভালোবাসা আমি তার চোখে দেখতে চাই । ভালোবাসা মানে শুধু ভালোবাসি বলা নয় – ভালোবাসা মানে আরেকজনের জীবনে দায়বদ্ধ থাকা । সেই নারী সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবতী হয় , যে তার জীবনে একজন উত্তম জীবন সঙ্গী পায় । যে তার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে । তাই তো আমি চাই – আমার জীবনে যে আসবে তাকে হতে হবে বিশ্বাসী , যাকে মুক্ত আকাশে উড়তে দিলেও অন্য কোথাও বাসা বাঁধবে না । যে আমার ভরসা হবে , অন্ধের চোখের আলোর মতো সে আমার চোখের আলো হবে । যে আলোতে আমি পুরো পৃথিবী দেখতে চাই । সে আমার নির্ভরতা হবে , তার শক্ত হাতের বাঁধনে আমায় আবদ্ধ করে রাখবে । তার কাছে কিছু থাকুক বা না থাকুক, ভালোবাসার মতো একটা সুন্দর মন থাকলেই চলবে । মেয়েরা যত্নে পাগল হয় , আমাকে যত্ন করে আগলে রাখার মতো এমন একজন নিঃস্বার্থ জীবন সঙ্গী হলেই চলবে ।
এক ধ্যানে এতগুলো কথা বলে আনমনে হাসে মিহি । অদুরে থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকায় । তাকাতেই চোখাচোখি হয় রাফির সাথে । রাফি আবেশিত নয়নে নিষ্ক্রিয় ভাবে অপলক চেয়ে আছে । রাফির চোখে অদ্ভুত এক অনুরক্তি । মিহি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না সেই চোখের দিকে । মিহি চোখ সরিয়ে ঘন পলক ফেলে এদিক ওদিক তাকায় । মিহি এদিক ওদিক তাকাতেই লক্ষ্য করে – সবাই ওর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে । মিহি চোখ ঘুরিয়ে সবাইকে একবার দেখে নেয় । সবাই গালে হাত দিয়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে । সবার এতগুলো চাহনিতে থতমত খেয়ে যায় মিহি । মিহি শুকনো কাশি দিতেই ধ্যান ভাঙ্গে সবার । মেহজাবিন গলা খাঁকারি দিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বলে…
” বাহ্ মিহি… তোমার চিন্তা-ধারা তো অনেক সুন্দর । কত সুন্দর করে গুছিয়ে বললে কথা গুলো ।
মেহজাবিনের কথা শেষ হতেই রুহি মিহির কাধ জড়িয়ে বলল…
” এই না হলে আমার Pakhi…!! Love you Pakhi..!
মিহি গড়গড় করে এতগুলো কথা কিভাবে বলল তা সে নিজেও জানে না । সবার সামনে এতগুলো কথা বলায় বেশ লজ্জায় পড়েছে সে । মিহি চোখ নামিয়ে নেয় সবার থেকে । রাফি এখনো মিহির দিকে একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । শান্ত রাফি কে কনুই দিয়ে খুঁচিয়ে গলা ঝেড়ে বলল….
” উঁহুম উঁহুম…
তা Pakhi.. তোমার মনের একটা ছেলে আমার সন্ধানে আছে । প্রেম-টেম করতে চাও ? করলে বলো ..আর কত দিন এভাবে সিঙ্গেল থাকবে ? বয়স তো কম হলো না…
” আমার পাখির বয়স কমই আছে,,এখনো ১৮ ই হয়নি । ও এখন কেনো বিয়ে করতে যাবে ? বিয়ে আপনি করুন, বয়স তো কম হলো না, দিন দিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন ।
রুহির ভেঙ্গানো কথায় শান্ত কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল…
” তুমি আমায় বুড়ো বলে খোঁটা দিতে পারলে জা….
পরমুহূর্তে আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল…
” সত্যি বলছো ..? বিয়ে করে নেবো ? সত্যি তো, এবার বিয়ে টা করাই উচিত ।
শান্তর কথা কাটাতে আবারো বোতল ঘুরিয়ে দেয় রুহি । এবার থামে রাফির দিকে । বোতলের দিকে তাকিয়ে জোরে ‘ওওও’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠে সবাই । শান্ত রাফির বাহুতে চাপড় মেরে বলে…
” বল bro … কি নিবি..?
রাফি কিছুক্ষণ ভেবে ভারী গলায় বলল…
” আমি ওসব ডেয়ার-ফেয়ার নিতে পারবো না । কি জিজ্ঞেস করবি কর ?
” তাহলে ভাইয়াকে কে প্রশ্ন করবে..?
রুহির কথা শেষ হতে না হতেই লিনার কোমল কন্ঠ ভেসে আসে । লিনা মাথা নুইয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে রাফি কে প্রশ্ন করলো…
” আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ ? কাউকে ভালোবাসেন আপনি ?
রুহি আর মিহি তৎক্ষণাৎ ভ্রু কুঁচকে তাকালো লিনার দিকে । লিনা যে রাফিকে ভালোবাসে বা রাফির প্রতি লিনার অনুভূতি সম্পর্কে মেহজাবিন নিজেও জানে না । মেহজাবিনসহ বাকিরা অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । রাফিকে চুপ থাকতে দেখে শান্ত কথা কেড়ে নিয়ে আগ বাড়িয়ে বলল …
” বাসে তো ,, কোন এক শ্যমলাবতী মায়াবতী কে ভালোবাসে ও । আর মেহজাবিনের বিয়ের পর নিজেও ডিরেক্ট ছক্কা মারার প্ল্যান করছে জানো ? একটু আগেই আমাদের বলল ।
শান্তর কথায় সবাই বিস্মিত নয়নে মুখ গোল গোল রাফির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে । রাফি চোয়াল শক্ত করে চোখ রাঙিয়ে তাকায় শান্তর দিকে । শান্ত আমতা আমতা করতে করতে বলে…
” আমি তো সত্যি কথাই বলছিলাম । এভাবে দেখার কি আছে ?
রুহি আগ্রহ বাড়িয়ে বলল…
” সত্যি ভাইয়া ? কে সেই মায়াবতী ?
রাফি গম্ভীর স্বরে সোজাসাপ্টা উত্তর দেয়…
” আছে কেউ একজন । সময় হলে ঠিক দেখতে পারবি ।
রাফির কথায় সবার চোখ গোল গোল হয়ে যায় । সবাই অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । এদিকে লিনার হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায় অমনি । লিনা মিহির বাহু ঝাঁকিয়ে ফিসফিস করে ভেজা কন্ঠে বলে…
” মিহি , আমার গায়ের রংটাকে কি শ্যামলা বলে ? আর আমাকে দেখতে কি মায়াবতী দের মতো লাগে ?
মিহি কিছু বলে না । মিহির মাথায় একটাই কথা ঘোরপাক খাচ্ছে – ‘ রাফি সত্যি অন্য কাউকে ভালোবাসে..?’ মিহির অন্যমনস্ক ভাবনার মাঝেই লিনা আবারো বলে…
” কি হলো মিহি ? বলো না ?
” হুম ?
” আমাকে কি মায়াবতী দের মতো লাগে ?
মিহি অন্যমনস্ক হয়েই জবাব দেয়…
” হুম….
লিনা খুশিতে মিহির হাত চেপে ধরে বলে…
” সত্যি বলছো..? তার মানে, উনি…
নিজে নিজেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় লিনা । মিহি নিষ্ক্রিয় চোখে তাকিয়ে দেখে লিনা কে । মেহজাবিন সবার মনযোগ ফেরাতে বলে…
” অনেক হয়েছে ,, ভাইয়া তুমি এখন আমাদের একটা গান শোনাও তো দেখি । এসব খেলতে আর ভালো লাগছে না ।
সমস্বরে সবাই একই কথা বলে রাফিকে । রাফিও আর বাঁধা দেয় না । ইভান উঠে গিয়ে রাফির ঘর থেকে গিটার নিয়ে আসে । রাফির দিকে গিটার এগিয়ে গিয়ে বলে..
” এই নে ভাই ,, তোর প্রাণ । একটা সুন্দর দেখে গান ধরতো এবার…
রাফি গিটার হাতে নেয় । গলা পরিষ্কার করে একবার বাঁকা চোখে মিহিকে দেখে চোখ বন্ধ করে নেয় রাফি । মিহির বলা প্রত্যেকটা কথা নতুন করে ধরা দেয় রাফির সামনে । রাফি চোখ বন্ধ করেই গিটারে সুর তুলে গায়….
Chahoge tum jaisa ,, Ho jaunga waise
Chaho tho wada ye lelo
Tum ek musafir ho ,,main koi Raha anjaani !!
Maan chaha modh de toh
Meye yaar baat ban jani…Rang sharbaton ka
Tu meethi ghaat kar pani…..
রাফির গান শেষ হতেই সবাই একসাথে হাতে তালি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে ।
রাত অনেক বেড়েছে । ছাদ থেকে নেমে যে যার ঘরে চলে যায় । মিহি, রুহি আর মিরা আবারো একসাথে শুয়েছে । আজ মিহি খাটের একপাশে শুয়েছে । ১ টা পেরিয়েছে অনেক আগে । মিহি চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে ভাসছে গার্ডেনের সেই ঘটনাটা । মিহি ঢোক গিলে চোখ খুলে উঠে গুটিসুটি হয়ে বসে । ঘরে ডিম লাইট জ্বলছে, টিমটিমে আলোয় এই ঠান্ডাতেও ঘামছে মিহি । মিহি হাঁটুতে মুখ গুজে চোখ বন্ধ করে থাকে কিছুক্ষণ । বালিশের কাছে থাকা ফোনের টুং টুং শব্দে মাথা তুলে তাকায় মিহি । ফোনটা হাতে নিতেই নজর আটকায় ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা নোটিফিকেশন এর উপর । মিহি চোখ পিটপিট করে তাকায়.. অবিশ্বাস্য নয়নে আবারো চোখ কচলে তাকায় মিহি । নোটিফিকেশনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে – ” Rujan Rafi Chawdhury Sent you a friend request ” । মিহির নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না । মিহি ঝটপট Facebook open করে । রাফির আইডি তে ঢুকতেই মিহির চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার মত অবস্থা । রাফির আইডি তে 3.5 million followers দেখে মিহি মুখ আপনা আপনি হাঁ হয়ে যায় । চোয়াল ঝুলে পড়ে কিছুটা ।
মিহি ঘন ঘন চোখ ঝাপটে কাঁপা কাঁপা হাতে মুহূর্তেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে । রাফির আইডি তে ঢুকতেই প্রথম পোস্ট নজরে আসে মিহির । সন্ধ্যায় ক্যামেরা ম্যান মিহি সহ ওদের ছয় জনের যে ছবি তুলে দিয়েছিল, রাফি সেখান থেকে একটা ছবি পোস্ট করেছে পাঁচ মিনিট আগে । মাঝখানে মেহজাবিন, মেহজাবিনের কোলে জেনি , মেহজাবিনের বাম পাশে মিহি, আর ডান পাশে রাফি , পিছনে রুহি আর শান্ত । ছবিতে সবার মুখে উচ্ছাসিত হাসি বিরাজমান । ছবিটা দেখে মিহির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে । ছবিতে মিহির মুখটা বোঝা যাচ্ছে না , রেড হার্ট ইমুজি দিয়ে মুখটা হাইড করে পোস্ট দিয়েছে রাফি । ক্যাপশনে আরো দুটো রেড হার্ট । মিহি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ছবিটার দিকে । এই পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ছবিতে ১৯ হাজার রিয়াক্টস সাথে ৫ হাজার প্লাস কমেন্ট । মিহি কমেন্ট বক্সে ঢুকতেই আরো বেশি অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছে যায় । যত কমেন্ট আছে তার মধ্যে বেশির ভাগই মেয়েদের কমেন্ট । এর মধ্যে একাধিক কমেন্ট রয়েছে মিহিকে নিয়ে । অনেক মেয়েরাই কমেন্ট করেছে রাফির অপর পাশে থাকা মেয়েটাকে ঘিরে । এর মধ্যে বেশির ভাগ কমেন্ট এমন ছিল…
– রাফি বেবি, তোমার অন্য পাশের মেয়েটা কে? 🥺
– অন্য পাশের মেয়েটার মুখ ঢেকে রাখা কেনো? কে উনি ? 🙁
– জান, ও কি তোমার would be..? 😭
– পাশের মেয়েটা কে জান? বলো প্লিজ, নয়তো আমি মরে যাবো কেনো 😭
– পাশের মেয়েটাকে তো কোন দিন দেখিনি, কে ও ?
– ঐ মেয়েটা কি আপনার gf ?
ব্লা ব্লা ব্লা…….
মিহি কমেন্ট পড়তে গিয়ে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে । মিহির হাসিতে ঘুমন্ত রুহি একটু নড়ে চড়ে ওঠে । মিহি তড়িঘড়ি করে নিজের মুখ চেপে ধরে হাসি আটকায় । মিহির পেট ফেটে হাসি বেরিয়ে আসতে চাইছে । মিহি নিজেকে সামলে একটা রেড হার্ট কমেন্ট করে রাফির পোস্টে । মিহি রাফির আইডি স্ক্রল করে অন্য সব পোস্ট দেখতে থাকে । সব পোস্টেই রাফির বিভিন্ন ধরনের স্টাইলিশ ছবি । যেখানে হাজারো রমনীরা তাদের আবেগের কথা প্রকাশ করেছে মন্তব্য আকারে । মিহি খাটের ব্যাক বোর্ডে গাঁ এলিয়ে এক ধ্যানে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখছে রাফির ছবিগুলো ।
এর মাঝেই টুং টুং করে একটা মেসেজ আসে মিহির ফোনে । মিহি বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তাকায়, উপরে জ্বলজ্বল করছে রাফির আইডি । মিহি ঝট করে উঠে বসে । “Rujan Rafi Chawdhury Sent you a message ” – মিহি আবারো অবাক হয় খানিক । একটু সময় নিয়ে মেসেজ ওপেন করে মিহি । মেসেজে স্পষ্ট ভাষায় লেখা…
” দুই মিনিটের মধ্যে ব্যালকনিতে আসুন..!
পরপর দুবার তাজ্জব বনে যায় মিহি । মিহি মেসেজের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খাট থেকে নেমে ব্যালকনির দিকে পা বাড়ায় ।
ব্যালকনিতে গিয়েই রাফি কে দেখতে পায় মিহি । রাফি দাঁড়িয়ে আছে । পড়নে ধূসর রঙের শর্ট হাতা ভারী টিশার্ট,, রাফির সুঠাম বাহু’দ্বয় উন্মুক্ত । মিহির পায়ের শব্দে রাফি ঘুরে তাকায় ওর দিকে । মিহি চোখ নামিয়ে এগিয়ে যায় । রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে..
” এতো রাতে ঘুমান নি কেনো ?
” আপনিও তো ঘুমান নি…
মিনমিন করে বলে মিহি । মিহিকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে রাফি বলে…
” মাথা নিচু করে আছেন কেনো ? তাকান আমার দিকে ?
মিহি চোখ তুলে তাকায় রাফির দিকে । রাফি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” হাতটা দেখি…
” হুম…?
” আপনার হাত ,, হাতটা দেখি ?
মিহি কিছু না বুঝেই হাত বাড়িয়ে দেয় । মিহির ডান হাতের তালুর ঠিক মাঝখানে ছোট্ট করে R লেখাটা নজর কাড়ে রাফির । রাফি ওদিকে তাকিয়েই মুচকি হাসে । মিহির হাতের মেহেদির রং বেশ গাঢ় এসেছে । রাফি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মিহির মেহেদি রাঙানো হাত টা । হাতের কব্জির কাছে এখনো কালচে দাগ স্পষ্ট । রাফি মিহির হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে । মিহি কপাল কুঁচকে তাকায় রাফির দিকে । রাফি কন্ঠে নমনীয়তা টেনে বলে…
” এটাতে কিছু মেডিসিন আর মলম আছে ,, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন ।
মিহি অবুঝের মতো শুধায়…
” কিসের জন্য..?
” হাতে ব্যথা করছে না ? কালসিটে হয়ে আছে হাতটা, সেদিকে খেয়াল আছে ? মলমটা ঠিক মতো লাগাবেন , ব্যথা সেরে যাবে ।
মিহি নিজের হাতের দিকে তাকায়,, সত্যি হাতটা কালসিটে হয়ে আছে, ব্যথাও করছে একটু একটু । এতক্ষণ অনুভব হয় নি , এখন হচ্ছে । মিহি নিজেও এতক্ষণ খেয়াল করে নি এটা । অথচ রাফি খেয়াল করেছে ? এটা ভেবেই বিচিত্র অনুভূতিরা দোলা দেয় মিহির মনে । মিহির প্রতি রাফির এই ছোট খাট উদ্বেগ গুলো খুঁচিয়ে তোলে মিহির স্থির চিত্তকে । মিহি রাফির দিকে আর তাকায় না , মাথা নিচু করেই বলে…
” আচ্ছা…
” যান এখন… গিয়েই ঘুমিয়ে পড়বেন, এতো রাত অবধি জেগে থাকার মানে কি ?
” এমনি.. ঘুম আসে না, তাই..
” ঠিক আছে,, এখন আসতে পারেন ..!
মিহি সোজা বড় বড় ধাপ ফেলে ঘরে ঢোকে । রাফি চোখ সরু করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে যায় । মিহি ঘরে ঢুকেই রাফির কথা মতো মেডিসিন খেয়ে হাতে মলম লাগিয়ে নেয় ।
সকাল সকাল হেনা বেগম মিহিকে ডেকেছিলেন নিজের ঘরে । মিহি হেনা বেগমের ঘরের সামনে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ে । ভেতর থেকে হেনা বেগমের কন্ঠ ভেসে আসে…
” মিহি এসেছিস ? আয় মা ভেতরে আয় ।
মিহি এক পা এগিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে ভেতরে , হেনা বেগম আলমারি থেকে কিছু বের করছেন । ঘরে আর কেউ নেই । মিহি শ্বাস টেনে ঘরের ভেতরে ঢোকে । হেনা বেগম মিহিকে দেখে মুচকি হাসেন । মিহিকে ইশারা করে বসতে বলেন । মিহিও ইশারা অনুযায়ী খাটের পাশে বসে । খাটের উপর অনেক গুলো গহনার বাক্স । হয়তো মেহজাবিনের জন্য । মিহি নিঃশব্দে বসে আছে খাটের এক কোণে । হেনা বেগম হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে এসে বলেন…
” দেখতো এই শাড়িটা কেমন…
হেনা বেগম ব্যাগটা এগিয়ে দেয় মিহির দিকে । মিহি ব্যাগ হাতে নিয়ে শাড়িটা বের করে । গাঢ় নীল রঙের দামি ব্র্যান্ডের একটা শাড়ি । মিহি শাড়িটা তে হাত বুলিয়ে বলে…
” বাহ্ আন্টি.. শাড়িটা তো অনেক সুন্দর ! মেহজাবিন আপুর জন্য বুঝি ? আপুকে কিন্তু অনেক সুন্দর মানাবে এটাতে !
” উঁহুম… এটা তোর জন্য ,, আজকে বিয়েতে তুই এটাই পড়বি ।
মিহি খানিক অবাক হয়ে তাকায় । হেনা বেগম মাথা নাড়িয়ে আবারো বলেন..
” কি দেখছিস ওভাবে,, পছন্দ হয় নি ?
” না না আন্টি ,, পছন্দ হবে না কেনো ? কিন্তু এটা আমাকে কেনো ? আমি এটা নিতে পারবো না আন্টি..
” কেনো নিবি না ,, তোর মা তোকে একটা শাড়ি দিচ্ছে আর তুই নিবি না ? এটা পড়লে তোকে খুব সুন্দর লাগবে দেখিস । রাফি নিজে পছন্দ করে নিয়ে এসেছে এটা তোর জন্য ।
” হ্যাঁ…?
” হুম ,, আমি ওকে রুহিকে নিয়ে গিয়ে তোর জন্য একটা শাড়ি আনতে বলেছিলাম ,, কিন্তু ও একাই এই শাড়িটা নিয়ে এসেছে । ওর পছন্দ যে এতটা সুন্দর হবে আমি ভাবতেই পারি নি ।
” কিন্তু আন্টি…
” কোন কিন্তু না মা…
আমার কথা রাখবি না তুই ? প্রথম বার তোর মা তোকে কিছু একটা দিচ্ছে, আর তুই সেটা ফিরিয়ে দিবি ?
” না আন্টি… এভাবে বলো না প্লিজ,, ফিরিয়ে দিতে যাবো কেনো ? আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে আমি আজকে এটাই পড়বো ।
হেনা বেগম মিষ্টি হেসে মিহির গালে আলতো হাত ছুঁইয়ে দেয় । মিহি নরম হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ।
দুপুর থেকে বিয়ের আয়োজনে ভরপুর পুরো বাড়ি । মেহমানদের আনাগোনা বাড়তে থাকে । সন্ধ্যা ৬ টার দিকে বরের আগমন ঘটে । আনন্দ উচ্ছ্বাসে বরকে বরন করে নেওয়া হয় । বিয়ে বাড়ির হইহুল্লোড়ে মেতে আছে সবাই । সবার মাঝে আনন্দ যেন উপচে পড়ছে । চৌধুরী বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে বলে কথা । শহরের বড় বড় ব্যক্তি-বর্গরা আমন্ত্রিত এই বিয়েতে । মেহজাবিন আর মাহিম’কে পাশাপাশি বসানো হয়েছে স্টেজে । ইতিমধ্যে তাদের ছবি তোলার পর্ব শেষ হয়েছে । মেহজাবিন লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে ।
৮ টার দিকে মেহজাবিনের বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু হয় । কাজি সাহেব বারবার মেহজাবিন কে কবুল বলতে বলেছেন কিন্তু মেহজাবিন বলছে না । নিঃশব্দে কেঁদেই যাচ্ছে তখন থেকে । মাহিম মেহজাবিন কে সাহস যোগাতে ওর হাতে হাত রাখে । মেহজাবিন কান্না ভরা চোখ নিয়ে মাহিমের দিকে তাকায়,, মাহিম চোখের ইশারায় শান্তনা দেয় মেহজাবিন কে । রাফি মেহজাবিনের পাশে বসতেই ডুকরে কেঁদে ওঠে মেহজাবিন । রাফি বোনকে জড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয়…
” আবার কাঁদছিস ? তোকে বলেছি না, তোর চোখে যেন কখনো পানি না আসে । লক্ষি বোন,, কাঁদে না ।
রাফি মেহজাবিনকে আদুরে কন্ঠে বোঝানোর পর ওদের বিয়ের পর্ব শেষ হয় । বিয়ের কার্য শেষ হতেই ওখান থেকে উঠে এসে এককোণে দাঁড়ায় রাফি । রাফির অক্ষিপট ভিজে আসছে । বোনরা যে ওর নয়নের মনি । রুহি আর মেহজাবিন কে কম ভালোবাসে না রাফি । এই বাড়িতে সবার আগে বোন’রাই ওর কাছে সব । বোনদের সকল আবদার, অভিযোগ, অভিমান, চাওয়া পাওয়া, সব রাফিকে ঘিরে । রাফি ঘন ঘন চোখ ঝাপটে চোখের পানি আড়াল করতে চেষ্টা করে ।
শান্ত আর ইভান দুর থেকে রাফির অবস্থা বুঝতে পেরে ওর দিকে এগিয়ে আসে । শান্ত রাফির কাঁধে কনুই রেখে টিটকারী মেরে বলে…
” এই জন্যই ভাই আমি তোর বোনকে পটিয়েছি,, যাতে তোর বোনকে বিয়ে দেওয়ার সময় তোকে কান্না না করতে হয় । দেখ ভাই ,, ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকবে, এতে তোরও কষ্ট হবে না আর তোর বোনের ও কষ্ট হবে না । এইরকম বেস্ট ফ্রেন্ড কোথায় পাবি বল ? হারিকেন দিয়ে খুঁজলেও এই রকম বেস্ট ফ্রেন্ড পাবি না । তোর জন্য কত-শত স্যাক্রিফাইস করলাম , কত মেয়ের প্রপোজাল রিজেক্ট করলাম ।
রাফি ভ্রু দুখানা নেত্রদ্বয়ের নিকট কুঁচকে শান্তর দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকায় । শান্ত হাত তুলে বাঁধ সেধে আবারো বলে..
” থাক ধন্যবাদ দিতে হবে না ।
রাফি নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখ ফেরায় । ইভান মেহজাবিন আর মাহিম’কে ইশারা করে বলে…
” দেখ ওদের দুজনকে কি সুন্দর মানিয়েছে । একেবারে পারফেক্ট জুটি । যাকে বলে – মেড ফর ইচ আদার ।
রাফি ওদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে । এদিকে শান্তর মুখ থেমে নেই । শান্ত ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলে…
” ওদিকে আর দেখতে বলিস না ভাই , বুকটা ফেটে চাকা চাকা হয়ে যায় । আর কত সিঙ্গেল থাকবো বলতো ? ভালো লাগে না আর এভাবে । বয়স তো কম হলো না ,, ২৭ এ পা দিলাম । এদিকে আমার থেকে ৫ বছরের ছোট আমার মামার মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে । বাপ-মায়ের আমার বিয়ে নিয়ে কোন মাথা ব্যাথাই নেই । এমন জীবন রেখে কি লাভ,, যেখানে জীবন আছে কিন্তু জীবন সঙ্গী নাই । হাহ্….তুই জানিস ,, হাদিসে অবিবাহিতদের মিসকিন বলা হয়েছে । আমিও মিসকিন , এই মিসকিন টাকে কি কারো চোখে পড়ে না ?
রাফি আর ইভান দুজনে চোখ রাঙিয়ে তাকায় শান্তর দিকে । রাফি রেগে মেগে মুখ খোলার আগেই শান্ত বলে…
” চোখ নাকি বাঘের থাবা ? আমি তো শুধু বলছিলাম — ‘এভাবেই কাটবে কি তবে ? ওদের হয়েছে কবে আমাদের ও হবে ?’ ।
” মুখটা বন্ধ রাখতে পারিস না একটু ? তোকে তো আমি…
রাফি বলতে বলতে শান্তর দিকে তেড়ে যায়, শান্ত ছুটতে উদ্ধত হয়ে রাফি কে আটকানোর জন্য মিহিকে দেখে বলে….
” আরে Pakhi যে..
রাফি থেমে যায় অমনি । শান্তর দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ ফেরায় মিহির দিকে । দুরে রুহি আর মিহি চেয়ারে বসে আছে । রুহি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে । মিহি রুহির হাত ধরে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে ।
হেনা বেগমের দেওয়া শাড়িটা পড়েছে মিহি । তবে আজকে চুল খোলা রাখেনি । নীল শাড়ির সাথে গোল্ডেন কালারের গর্জিয়াস হিজাব । সাথে হালকা মেকআপ । রুহিও শাড়ি পড়েছে । তবে আজ তেমন অসুবিধা হচ্ছে না ওর । বেশ হেলেদুলে হাঁটতে পারছে । এতক্ষণ বেশ খুশি ছিল রুহি । বরপক্ষের কাছ থেকে সব মিলিয়ে এক লাখেরও বেশি টাকা আদায় করেছে । তবে এখন মেহজাবিন কে কাঁদতে দেখে রুহি নিজেকে আটকে রাখতে পারে নি । তখন থেকে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা । মিহি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করছে , তবে কোন লাভ হচ্ছে না । রুহিকে কাঁদতে দেখে ওর কাছে ব্যস্ত পায়ে ছুটে যায় রাফি, শান্ত আর ইভান । শান্ত ব্যস্ত কন্ঠে রুহিকে বলে…
” কি হলো জান ? তুমি কাঁদছো কেনো ? তুমিও বিয়ে করবে ? বিয়ে বিয়ে পাচ্ছে তোমার ?
শান্তর কথায় কান্না গলায় আটকে যায় রুহির । রুহি ভেজা চোখে ভ্যাটভ্যাট করে তাকিয়ে থাকে শান্তর দিকে । রাফি দাঁতে দাঁত চেপে জোরে একটা কিল বসায় শান্তর বাহুতে । শান্ত বাহুতে হাত বোলাতে বোলাতে ঠোঁট উল্টে তাকায় । রাফি শক্ত গলায় বলে…
” সামনে থেকে সররর… নয়তো আরো মার খাবি বলে দিলাম । আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না ।
শান্ত কাঁচুমাচু হয়ে মুখটা চুপসে একপাশে সরে দাঁড়ায় । রাফি চেয়ার টেনে বসে রুহির সামনে । রুহির চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে…
” কি হলো ? কাঁদছিস কেনো ?
এতক্ষণ রাফির দিকে তাকিয়ে ছিল মিহি । খয়েরী রঙের পাঞ্জাবি তে এক দেখায় চোখ আটকে যাওয়ার মতো সুন্দর লাগছে রাফি কে । রাফির কথায় ঘোর কাটে মিহির । ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে রুহির দিকে মনোযোগ ফেরায় মিহি । রাফি একবারের জন্যও তাকায় নি মিহির দিকে । তাহলে মিহি কেনো তাকাবে ?
রাফির প্রশ্নের উত্তরে রুহি নাক টেনে কান্না আটকে বলে…
” ভাইয়া মেহজাবিন আপি আজকে চলে যাবে ?
” তো কি হয়েছে ? এক দিন না একদিন তো চলে যেতোই ।
” আমি সারাদিন বাড়িতে কার সাথে থাকবো ভাইয়া , কার সাথে গল্প করবো আমি ? কে আমাকে সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেবে ? আমার ঘুম না আসলে কে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে ? আমার চুল যত্ন করে আঁচড়ে দেবে কে ? আমার জন্য কফি বানিয়ে আমার সাথে আড্ডা দেবে কে ? আমার পড়ার জন্য নতুন ড্রেস সিলেক্ট করে দেবে কে ? কে আমাকে আদর করে জড়িয়ে ধরবে…
রুহির কথা শেষ না হতেই শান্ত বাঁধ সেধে জোরালো কন্ঠে বলে..
” তার জন্য তো আমি আছি জান…..
রাফি এবার সত্যি সত্যি চোখ রাঙিয়ে কটমট করে তাকায় শান্তর দিকে । শান্ত বোকা বোকা হেসে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে হাত জড়ো করে বলে..
” এবার বেশি বেশি হয়ে গেছে ,, ক্ষমা কর ভাই , মাফ চাই ।
রাফি আবারো দৃষ্টি ফেরায় বোনের দিকে । গলা নামিয়ে বলে….
” ওর সাথে থাকাটা যেমন অভ্যাস হয়ে গেছে তোর, তেমন ধীরে ধীরে ওকে ছাড়া থাকাটাও অভ্যাস হয়ে যাবে । আর ও তো যখন তখন আমাদের বাসায় আসবে, ও তোকে ছেড়ে একেবারেই চলে যাচ্ছে নাকি ? তুই যদি এভাবে কান্না করিস তাহলে মেহজাবিন আরো বেশি কষ্ট পাবে । কাদিস না sissy… তুই না লক্ষি মেয়ে ।
মিহি বিমোহিত চোখে তাকিয়ে দেখে রাফিকে । রাফি কি সুন্দর করে আদুরে কন্ঠে রুহিকে বোঝালো । ভাইয়ারা বুঝি এমন হয় ? আজ যদি ওর একটা ভাইয়া থাকতো তাহলে কি ওকেও এভাবেই ভালোবাসতো ? রুহি তো ভুল বলে না ভাইয়ার ব্যাপারে, আসলেই তো রুহির ভাইয়া ওদের অনেক বেশি ভালোবাসে ।
ভাইয়ার লাই দেওয়া কথায় রুহি চোখের পানি মুছে চুপ হয়ে যায় । পাশ থেকে ইভান রুহির দিকে একটু হেলে আহ্লাদি স্বরে বলে…
” কতো কেজি মেকআপ করেছিস মুখে,, সব তো দেখি চোখের জলে নাকের জলে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে ।
রুহি ইভানের বাহুতে হালকা চিমটি কেটে হেসে ফেলে । রুহির হাসি দেখে মিহিও মুচকি হাসে । রাফি এবার তাকায় মিহির দিকে, তবে দু’সেকেন্ডের মধ্যেই আবারো চোখ সরিয়ে নেয় । এই মেয়ের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকাটা সুবিধার নয় । রুহির চিমটি খেয়ে ইভান বাহুতে হাত বোলাতে বোলাতে বললো…
” খাচ্চুন্নি কোথাকার,, এতক্ষণ তো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছিলি , এখন আবার হাসছিস – দেখিস পাগল বরং জুটবে তোর কপালে ।
পাশ থেকে শান্ত চিল্লিয়ে ওঠে…
” এএএ খবরদার… ওর বর পাগল হতে যাবে কেন ? আমাকে কোন দিক থেকে পাগল মনে হয় তোর ?
শান্তর কথায় কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করে না । রুহি ও মুখ বাঁকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয় । কারোর মনযোগ না পেয়ে শান্ত বেচারা চুপসে যায় ।
শান্ত রুহির হাত ধরে বসা থেকে টেনে তুলে বলে…
” চলো জান.. এখানে থাকাটা ঠিক হবে না । চলো আমরা গিয়ে ছবি তুলি ।
বলেই রুহিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় শান্ত । একটু এগিয়ে পিছন ফিরে ইভানকে চোখ মারতেই ইভানও রাফি আর মিহিকে একবার দেখে বলে….
” আমি বেচারা সিঙ্গেল মানুষ, যাই ওদের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হয়ে কয়েকটা ছবি তুলে আসি ।
সবার চলে যাওয়াতে মিহি অসস্থিতে পড়ে যায় । সামনের চেয়ারে মাটির দিকে দৃষ্টি বজায় রেখে বসে আছে রাফি । মিহি নিঃশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে । রাফি কে এড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়ায় । মাথা নিচু করে দু’পা এগোতেই রাফির ঠান্ডা কন্ঠ শোনা যায়…
” সুন্দর লাগছে আপনাকে !
মিহি চকিতে পেছন ফিরে তাকায় । রাফি বসা অবস্থায় ঘাড় ঘুরিয়ে মিহির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে । রাফির চোখেও ফুটে ওঠে সেই হাসি । মিহি কুন্ঠিত হেসে মোলায়েম স্বরে বলে…
” ধন্যবাদ…
রাফি ভ্রু কুঁচকে বলে…
” For Why..?
” শাড়ি এবং প্রশংসা দুটোর জন্যই ।
” শাড়িটা মা’র পক্ষ থেকে ।
” পছন্দ তো আপনার..! অনেক সুন্দর শাড়িটা ।
রাফি উঠে মিহির মুখোমুখি দাঁড়ায় । পেছনে হাত গুটিয়ে বলে…
” তাহলে তো ডাবল thank you পাওয়ার কথা ।
” হুম..
Thank you,, Thank you…
” শুধু Thank you এ হবে না । রিটার্ন গিফ্ট লাগবে ।
” কি চাই বলুন..?
” গিফ্ট তো চাইতে নেই । তবে সময় আসলে আমি চেয়ে নেবো ..! হিসেবের খাতায় তুলে রাখলাম আপাতত । যা চাইবো দিতে পারবেন তো ?
” সাধ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয়ই পারবো ।
” তাহলে বাকি রইলো । মনে থাকে যেন ।
মিহি স্মিথ হেসে মাথা নাড়ায় ।
এদিকে শান্ত রুহিকে নিয়ে মহা বিপাকে পড়েছে । রুহি মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কেনো তা জানা নেই ,, শান্ত কি করেছে তাও জানে না । শান্ত রুহির হাত ধরার চেষ্টা করে মিনমিন করে বলে…
” রেগে আছো কেনো জান ? কি করেছি আমি ?
বলো তো ,, না বললে বুঝবো কিভাবে ? কাল রাত থেকে দেখছি কেমন এড়িয়ে যাচ্ছো আমাকে ।
” আমি জানি না কেনো রেগে আছি ,, কিন্তু আমি রেগে আছি ।
” অ্যাহহহ্..
এটা আবার কেমন কথা ? আচ্ছা ,, ক্ষমা চাইছি । চলো — ওদিকে যাই ।
মেহজাবিনের বিদায়ের সময় এলে কান্নার ঘনঘটা ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে । হেনা বেগমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে মেহজাবিন । সেই ছোট্ট বেলা থেকে মায়ের আদর স্নেহ সব পেয়েছে হেনা বেগমের কাছ থেকে । হেনা বেগম নিজের সন্তানের থেকে কম কিছু মনে করে না মেহজাবিন কে । পাশে আঁচলে মুখ গুজে কাঁদছে হালিমা বেগম । বিয়ে বাড়ীতে উপস্থিত সকলের চোখেই পানি ।
রুহি নিজেকে সামলাতে না পেরে আবারো কাঁদছে । রুহির পাশে লিনাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাক টানছে । মিহি অশ্রু সিক্ত চোখ নিয়ে দেখে যাচ্ছে সবাইকে । বুকটা ভারী হয়ে আসছে ওর । অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা অনুভব হচ্ছে । মাহিম মেহজাবিনের পাশে শুকনো মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মেহজাবিনের কান্না থামার কোন লক্ষন নেই । লতা বেগম হেনা বেগমের কাছ থেকে মেহজাবিনকে সরিয়ে নেয় । হেনা বেগম আঁচলে মুখ গুজে মেহজাবিনের সামনে থেকে সরে আসে । হেনা বেগম সরে আসতেই রুহি হুমড়ি খেয়ে জাপটে ধরে মেহজাবিনকে । দুই বোনের কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায় । পরিস্থিতি সামলাতে রাফি এগিয়ে যায় ওদের কাছে । মেহজাবিনের থেকে রুহিকে ছাড়ায় রাফি । বোনদের অশ্রু সিক্ত ভেজা চোখের দিকে তাকাতেই মুচড়ে ওঠে রাফির বক্ষ স্থল । এতক্ষণে আটকে রাখা চোখের পানি গাল বেয়ে টপ করে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে । রুহি কান্না চেপে ছুটে যায় বাড়ির দিকে । পিছন পিছন ছুটে যায় মিহিও । রাফি হাসি মুখে মেহজাবিনকে জড়িয়ে ধরে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী পেছনে হাত গুটিয়ে এগিয়ে যায় মাহিমের কাছে । চোখের কোনে জল চিকচিক করছে তার । গলা ভারী হয়ে আসছে । নিজেকে যথাসম্ভব সামলে তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় মাহিমকে বলেন…
” আমার মেয়েটাকে সুখে রেখো বাবা । ওর চোখে কখনো পানি আসতে দিও না । অনেক আদরের মেয়ে আমাদের । ছোট বেলা থেকে অনেক কিছু হারিয়েছে ও ,, তবুও হাসতে শিখেছে, ওর এই হাসিটা যেন কখনো ফিকে না হয়ে যায় । ওকে কখনো কষ্ট দিও না । আগলে রেখো সবসময় ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর কিছু বলতে পারেন না । মাহিম রাশেদ রায়হান চৌধুরীকে বুকে জড়িয়ে শান্তনা দেয় । মাহিম কে ছেড়ে মেহজাবিনের সামনে এসে ওর মাথায় হাত রাখেন, মেহজাবিন ঠোঁট উল্টে অশ্রু সিক্ত নয়নে তাকায় রাশেদ রায়হান চৌধুরীর দিকে ।
এক দেখায় পর্ব ১৫
রাশেদ রায়হান চৌধুরী মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় দেয় মেহজাবিন কে । মেহজাবিনকে গাড়িতে তুলে দিয়ে রাফি, শান্ত আর ইভান ওর শশুর বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে ওকে ।
