এক দেখায় পর্ব ২৫
সুরভী আক্তার
পা টনটন করছে মিহির । হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে । ছিলে যাওয়া চামড়ায় টান পড়ছে হাঁটতে গেলে । তবুও কেনো রকম আম্মুর হাত ধরে উপরে আব্বুর ঘরে গেল মিহি । সাবিনা বেগম মেয়েকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে নিচে নামলেন তড়িঘড়ি করে ।
মিহি ঘরে ঢুকে দেখল আব্বু নেই । নিশ্চয়ই ব্যালকনিতে আছে । এটা অজানা নয় । মিহি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যালকনিতে পা বাড়ালো । আজমাল হোসেন আরাম কেদারায় গাঁ এলিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছেন । সেই বারোটা থেকে মেয়ের চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছিলেন । মেয়েকে নিয়ে ধৈর্য হীন হয়ে পড়েছিলেন তিনি । সাফির কথায় মিহির খবর পেয়ে পরবর্তীতে শান্ত হয়েছেন একটু ।
মিহি ধীর পায়ে আব্বুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায় । চোখ খুললো না আজমাল হোসেন । বরাবরই আব্বুর পায়ের কাছে মেঝেতে বসে আব্বুর কোলে মাথা রেখে আব্বুকে সজাগ করে মিহি । তবে, আজ পায়ের জন্য মেঝেতে বসতে পারলো না । একটা টুল টেনে বসলো আব্বুর সম্মুখ বরাবর ।
মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো….
” আব্বু…
সাঁড়া দিলেন না আজমাল হোসেন । নড়লেন না একটুও । মিহি আবার ডাকলো….
” আব্বু…..
ঘুমিয়ে গেছো…?
এবারো সাঁড়া পেলো না মিহি । মিহির এক ডাকেই গভীর ঘুম থেকেও নিজেকে সজাগ করে ওর কাছে ছুটে আসেন আজমাল হোসেন । মাঝেমধ্যেই রাতের বেলা ভুলভাল স্বপ্ন দেখে ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে ওঠে মিহি । রাতে অনেক সময় ভয় পায় । আজমাল হোসেন আর সাবিনা বেগম সর্বদা সজাগ থাকেন মেয়ে কে নিয়ে ।
আজ দু-দুইবার ডাকলো আব্বুকে । কিন্তু কোন সাঁড়া পেলো না । অজান্তেই বুকটা ধক্ করে উঠলো মিহির । মিহি স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আব্বুর বুকের দিকে , শ্বাস প্রশ্বাসের তাড়নার সাথে ওঠা নামা করছে বুকটা । মিহি দীর্ঘ প্রশান্তির শ্বাস ফেললো ।
এক মুহুর্তেই একটা অজানা ভয় ঘিরে ধরেছিল ওকে । যে ভয়টা সবসময় পায় মিহি ।
মিহি এবার হাত বাড়িয়ে আব্বু কে ঝাঁকালো…
” আব্বু…..
নড়ে উঠলো আজমাল হোসেন । জোরে একটা শ্বাস নিয়ে আধো আধো চোখ খুললেন । সামনে মিহিকে দেখে আরো জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকলেন তিনি । শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে তার । বুকে হাত দিয়ে বারবার জোরে জোরে শ্বাস টানছেন তিনি । আব্বু কে এভাবে দেখে মিহি অস্থির হয়ে বলে…..
” কি হলো আব্বু…?
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ? ব্যথা হচ্ছে বুকে ?
আজমাল হোসেন বলতে পারলেন না কিছু । মিহি কথা না বাড়িয়ে পায়ের ব্যথা ভুলে ব্যালকনি থেকে এক ছুটে ঘরে ঢুকলো । খাটের পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে ইনহেলার বের করে আবারো দৌড়ে গেল ব্যালকনিতে ।
আজমাল হোসেনের শ্বাস কষ্টের সমস্যা আছে । মাঝে মাঝেই বেড়ে যায় এটা । গতবার অসুস্থতার পর থেকে আরো বেশি শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তার , শ্বাস কষ্টের সাথে বুকে ব্যথা । সবসময় ইনহেলার সাথেই রাখতে হয় ইদানিং ।
মিহি তড়িৎ বেগে আব্বুর দিকে ইনহেলার এগিয়ে দেয় । গ্যাস টেনে খানিক বাদ শান্ত হন তিনি । মিহি একনাগাড়ে আব্বুর পিঠে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে ।
” এখন ঠিক লাগছে আব্বু ? কষ্ট হচ্ছে আর ?
আজমাল হোসেন শ্বাস টেনে নিভু স্বরে বলেন…
” এতক্ষণ কোথায় ছিলে আম্মু ? বলোনি কেনো আমাদের ?
মিহি ঠোঁট উল্টায় । সাবিনা বেগম গরম দুধ এসেছেন মেয়ের জন্য । তিনিও পাশে এসে দাঁড়ান । মিহি দু’জনকে দেখে বলে….
” আজকাল আমি তোমাদের অনেক বেশি টেনশন দেই, তাই না আব্বু ?
” হাত পায়ে ব্যান্ডেজ কেনো , কি হয়েছে মা ?
আজমাল হোসেনের ঘোরানো কথায় সাবিনা বেগম বলেন….
” পড়ে গেছিলো আপনার মেয়ে ? নিজের খেয়াল রাখতে পারে ও ? না নিজের খেয়াল রাখতে পারে আর না আমাদের ! ও তো জানে সবসময় ওকে নিয়ে কতটা চিন্তা করি আমরা । তবুও ও আমাদের চিন্তার কোন গুরুত্ব দেয় ?
মিহি করুন চোখে পিটপিট করে তাকায় । আজমাল হোসেন বললেন….
” আজকের পর এমনটা আর কখনো করো না আম্মু ! যেখানে যাবে সবসময় বলে যাবে আমাদের ।
মিহি ঘাড় কাত করে সম্মতি দেয় । সাবিনা বেগম দুধের গ্লাস মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন ….
” খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি…
তারপর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেবে ।
মিহিও ঝটপট খেয়ে নিল । অন্যসময় দুধ দেখলে নাক সিঁটকায় । তবে আজ কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো ।
খেয়ে দেয়ে ঘরে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিয়েছে । ব্যান্ডেজ খোলা হয় নি হাত পায়ের ।
সাবিনা বেগম বাড়িতে ঘটে যাওয়া কিছুই বললেন না মিহি কে । মিহির অবর্তমানে অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আজমাল হোসেন । আবারো এটাক এসেছিল তার । অবশ্য তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানেন না সাবিনা বেগম, সাফিই সামলেছে সবটা । ডাক্তার এসেছিলেন বাড়িতে । আবারো নতুন করে অনেক ঔষধ পত্র দেওয়া হয়েছে আজমাল হোসেন কে ।
তার নিষেধের জন্যই মিহি কে আর কিছু বললেন না সাবিনা বেগম ।
সকাল সকাল নাস্তার টেবিলে বসে আছে রাফি, শান্ত আর রুহি । নয়টা বেজে গেছে । শান্ত কাল থেকেই ছিল এই বাড়িতে । আজ অফিসে যেতে লেট হয়ে গেছে দুজনের ।
আটটার সময় রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী বেরিয়ে গেছেন বাড়ি থেকে । তখন রাফি আর শান্ত ঘুমিয়ে ছিল । কেউ ডাকে নি ওদের ।
সাড়ে আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি করে নিচে এসেছে ওরা । এখন ব্রেকফাস্ট সেরে ডিরেক্ট অফিসে যাবে । রুহি আগে থেকেই বসে ছিল টেবিলে । আজ ও নিজেও একটু বেলা অবধি ঘুমিয়েছে ।
হেনা বেগম আর হালিমা বেগম ব্যাস্ত রান্না ঘরে । চৌধুরী বাড়ির রান্না বাড়ির গিন্নি’রাই নিজ হাতে করে । কাজের লোক আছে তিন জন, তারা অনান্য কাজ সহ রান্না বান্নায় সাহায্য করে তাদের । রাফি, শান্ত আর রুহি কে ব্রেকফাস্ট এগিয়ে দিয়ে হেনা বেগম রান্না ঘরে চলে গেছেন ।
শান্ত খেতে খেতেই চোখের ইশারায় খোঁচাচ্ছে রুহিকে । রাফি সামনে থাকায় কিছু বলতে পারছে না রুহি ।
কালকের ঐ বিষয়টা নিয়ে আর কেউ কোন কথা বাড়ায় নি ।
খাওয়ার মাঝে হঠাৎ রাফি ডেকে ওঠে…..
” Sissy….
রুহি শান্তর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে থতমত খেয়ে অপ্রস্তুত উত্তর করে….
” হ্যাঁ ভাইয়া…..
” দুপুরে গাড়ি আসবে,, আজ থেকে নতুন টিউশন শুরু হবে তোদের । বাড়ির গাড়িতেই যাবি , ড্রাইভার কে বলে রেখেছি আমি । ঐ কোচিংয়ে আর যাবি না তোরা । আমি টিউশন টিচার ঠিক করেছি । প্রতিদিন পড়াবে তোদের । তোর বান্ধবী কে জানিয়ে দিস । সে যেন পাকনামি করে কিছু না করতে যায় আবার…
রুহি খেতে খেতেই বললো…
” ঠিক আছে ভাইয়া…
রাফি চুপ থাকলো কিছুক্ষণ । সময় নিয়ে খানিক বাদ নিচু স্বরে বলল…
” আচ্ছা শোন..
” হুম, বলো…
” ঐ সাফি ছেলেটাকে কেমন দেখতে..?
রাফির দোটানা হীন সোজাসাপ্টা প্রশ্নে রুহি শান্ত কে এক পলক দেখে একটু ভনিতা করে উত্তর দেয়….
” উনি..? একবারে যদি দেখলাম উনি তো একদম সিনেমার হিরোদের মতো দেখতে । অনেক Tall , strong , জিম করা পেশিবহুল ফিটনেস বডি, অনেকটা তোমার মতোই হ্যান্ডসাম । আর জানো , গায়ের রং না আমার থেকেও বেশি ফর্সা, একদম বেদেশিদের মতো ।
রুহি কথা গুলো বলে বাঁকা চোখে শান্তর দিকে তাকায় । খাওয়া ছেড়ে তেঁতে ওঠে শান্ত….
” এই জান এই…
খবরদার আমি থাকতে অন্য পুরুষের প্রশংসা করবে না বলে দিলাম । সহ্য করবো না কিন্তু আমি ।
তোমার তো নজর ভালো না দেখছি… অন্য পুরুষের দিকে ওভাবে তাকাতে লজ্জা করলো না তোমার ? অন্য কারো জিম করা পেশিবহুল ফিটনেস বডি দেখতে লজ্জা করলো না ? আমার কি জিম করা পেশিবহুল ফিটনেস বডি নেই নাকি ? দেখোনি কোন দিন ? দেখাবো ?
শান্তর লাগামহীন কথায় রুহি থতমত খেয়ে থ মেরে বসে রইল । এই লোকটার একদম লজ্জা সরম কিচ্ছু নেই । মুখে যা আসে তাই বলে দেয় । এভাবে রাফির সামনে লজ্জায় পড়ে যায় রুহি ।
রাফি শান্তর কথায় কান না দিয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধায়….
” আমার থেকেও বেশি হ্যান্ডসাম..?
রুহি বুঝতে পারলো রাফির প্রশ্নের মানে । ভেতরে ভেতরে জ্বলছে রাফি । রুহি মুচকি হেসে হাত নেড়ে বলে….
” একদম না…
আমার ভাইয়ার থেকে হ্যান্ডসাম দুটো পুরুষ নেই এই পৃথিবীতে ।
ঐ সাফি না কাফি উনি হ্যান্ডসাম তবে তোমার ধারের কাছেও নয় ।
তবে হ্যাঁ… আপনার থেকে উনি একটু বেশি হ্যান্ডসাম…!
শেষের কথাটা শান্তর দিকে ঘুরে মেকি স্বরে বলে রুহি । খাওয়া শেষ ওর ,, কথাটা বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে এক ছুট লাগায় নিজের ঘরের দিকে । সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে উঠতে থাকে ।
শান্ত তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়…
রুহিকে নাগালে না পেয়ে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আবারো বসে পড়ে । রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে….
” এই সাফির বাচ্চা কে তো ছাড়বো না আমি ! কোন সে বিদেশি খ্যাতের ধলা মুলা..? হনুমানের পোলা..! ও তো দেখি আমার ভবিষ্যৎ সংসার হওয়ার আগেই আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে ।
ওই শালার ফিটনেস বডিতে পাখা ওয়ালা আরশোলা ছেড়ে দেবো আমি…
শান্তর কথায় হেসে উঠলো রাফি । রাফির হাসি দেখে শান্ত খিটখিট করে চোখ পাকিয়ে বলল…..
” আরে শালা,,, তুই হাসছিস কেনো ?
আগুন লাগলে শুধু আমার সংসারে লাগবে না কিন্তু ! না হেসে নিজের সংসার সামলা,, তোর সংসার পোড়ার সম্ভবনা বেশি !
রাফি এবার সম্পুর্ন দৃষ্টিপাত করলো শান্তর দিকে । পানি খেয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল…
” আমার সংসার পোড়াতে আসলে ওকে নিজেকেই পুড়তে হবে ।
কিন্তু তুই ? তোর বিষয়টা মানতে পারলাম না ! তুই কি না ওর বডিতে আরশোলা ছেড়ে দিবি..!
ইটস সো লেইম…
শান্ত হেঁয়ালি করে হাসলো । ভাবসাব নিয়ে বললো….
” ইউ নো ব্রো..
তুই আমার কথার মানেই বুঝিস নি..!
তুই জানিস, তোর বোন আরশোলা কে কতো ভয় পায়,, একটা আরশোলার ঠ্যাং দেখলেও লাফিয়ে ওঠে ।
ঐ সাফি হতচ্ছাড়ার গায়ে যদি আরশোলা ছেড়ে দেই না, তাহলে তোর বোন এক লাফে আমার কোলে উঠে বসে থাকবে । ইহজন্মে আর ঐ বজ্জাত টার বডির দিকে তাকানো তো দুর , ওর নামই উচ্চারণ করবে না মুখে ।
এবার শব্দ করে হাসলো রাফি ।
খাওয়া শেষ ওদের । উঠতে উঠতে থেমে গিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে শান্ত শুধালো….
” আচ্ছা, আমি তো ভুলেই গেছিলাম…..
তুই কাল ঐ গোডাউনের সন্ধান কোথায় পেলি ? কি করে বুঝলি ওরা ঐ গোডাউনে আছে..?
রাফি বেসিনের দিকে এগোতে এগোতে জবাব দিলো….
” লোকেশন ট্র্যাক করে….
” কিন্তু, কি করে..?
ওদের ফোন তো আমাদের কাছে ছিল…
” ফোনের মাধ্যমে নয়…
” তাহলে..?
তুই কি কোন ভাবে, মিহি পাখির মনে ট্রাকার সেট করেছিস নাকি বলতো..?
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো রাফি । হাত ধুয়ে আবারো ফিরে আসতে আসতে বলল…
” মনের সাথে ট্রাকার লাগানোর কোনো প্রয়োজন নেই । খুব শীঘ্রই আমাদের মন একে অপরের সাথে আপনা আপনি কানেক্টেড হয়ে যাবে ।
আপাতত ওর ঘড়িতে লাগিয়েছি । ওকে দেওয়া ঘড়িটা কানেক্টেড আছে আমার ফোনের সাথে । ওর লোকেশন শেয়ার করা আছে আমার ফোনে ।
শান্ত কিঞ্চিত অবাক হওয়ার ভান করে বললো….
” আরে সাবাস…
শালা ,, তুই তো দারুন এক্টিভ….
এদিকে রুহি ঘরে এসেই মিহিকে ফোন করে জানিয়েছে সবটা । কালকের পর আর ঐ কোচিংয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মিহি । ভেবেছিল রুহিকে বলবে । এখন রুহি নিজেই ওকে আশ্বস্ত করলো সবটা জানিয়ে ।
দুপুর দুটোর দিকে বাড়ির গাড়ি মিহি আর রুহি কে নিয়ে এসেছে চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রির সামনে । আসার পথে রাফির কথা মতো মিহিকে ওর বাড়ি থেকে ড্রপ করে নিয়েছে রুহি ।
একটা দশ তলা ভবনের সামনে গাড়ি এসে থামে । মিহি ঘাড় কাত চোখ উঁচিয়ে দেখে ভবন’টা । ভবনের নিচে পার্কিং লটে দাঁড়ায় দু’জনে । খানিক বাদ রাফি আসে । পড়নে অফিসের ফরমাল ড্রেস । সাদা টানটান শার্টের উপর কালো ব্লেজার ।
ওদের সামনে এসেই রাফি মুচকি হেসে বলে…..
” চলো….
হাঁটা লাগায় তিনজনে । এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটছে মিহি । হাত পায়ে পাতলা ব্যান্ডেজ বাঁধা এখনো । রাফি আড়চোখে সেটা লক্ষ্য করে কপাল কুঁচকে শুধায়….
” এখনো ব্যাথা আছে পায়ে..?
মিহি চোখ ঘুরিয়ে শীতল কন্ঠে উত্তর দেয়…
” একটু….
” মেডিসিন খেয়েছেন..?
” হুম…
” ধীরে ধীরে আসুন….
মিহি আলতো হেসে এগোয় । রুহি ওদের থেকে সামনে এগিয়েছিল একটু, পিছন ফিরে দু’জনকে দেখে মুচকি হাসে ও ।
অফিসের ঠিক সামনেই একটা একতলা ছোট বিল্ডিং । একটা বড়সড় রুম । বাইরের উচ্চতার থেকে রুমের ফ্লোর একটু নিচুতে । দরজা থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে রুমে ঢুকতে হয় । রুহি চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে সবার আগে রুমে ঢুকে পড়ল । রাফি নামলো সিঁড়ি বেয়ে । পিছন ফিরে দেখলো মিহিকে । মিহি ধীরে ধীরে কেবল প্রথম সিঁড়িতে পা রেখেছে । রাফি একবার পায়ের দিকে তাকালো । মিহি ঠোঁট কামড়ে রেখেছে, সিঁড়িতে পা বাড়াতে কষ্ট হচ্ছে । বাড়িতেও কোন রকমে আম্মুর হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামা করছে । কালকের তুলনায় আজকে পায়ে আরো বেশি টান ধরেছে । রাফি মিহির বেহাল অবস্থা বুঝে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় ওর দিকে….
” আসুন….
মিহি সহসা তাকালো রাফির হাতের দিকে । অকস্মাৎ ধরলো না । একটু ভেবে দ্বিধা কাটিয়ে হাত বাড়িয়ে হাত রাখলো রাফির হাতের মুঠোয় । রাফি শক্ত করে ধরলো হাতটা । মিহি কোন রকমে ভর করে নিচে নামলো । নেমেই রাফির চোখে চোখ রেখে স্মিথ হেসে ছেড়ে দিলো হাতটা । মিহির দ্বিধাহীন আচরণ দেখে রাফি খানিক অবাক হওয়ার সাথে সাথে খুশি হলো বটে । আলতো হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে ।
ঘরটা অনেক সুন্দর,, দুটো টেবিল আছে পড়ার জন্য । একটা আলমারিও আছে এক কোনে । ওয়াশ রুম থেকে শুরু করে সব ব্যবস্থাই আছে । এখানে টিউশন পড়ানো হবে ওদের ।
সবসময় নজরে রাখার জন্য অফিসের সামনেই ওদের টিউশনের ব্যবস্থা করেছে রাফি । ঘরের চার কোণে চার টা সিসি ক্যামেরাও লাগিয়েছে ।
কিছু সময় পর দুজন আসে । রাফি হাত মোলাকাত করে ওদের সাথে । এদের মধ্যে একজন কে চেনে রুহি । রাফির বন্ধু আহান । শান্ত আর রাফির সাথে কয়েকবার ওকে দেখেছিল রুহি । আহান ও মোটামুটি চেনে রুহি কে । রুহি কে দেখে ও প্রফুল্ল হেসে বলে….
” কেমন আছো রুহি….
রুহিও অপ্রস্তুত একটু হেসে উত্তর দেয়…
” জ্বি ভাইয়া.. আলহামদুলিল্লাহ..
আপনি..?
” আমিও ভালো আছি..!
এবার মিহির দিকে ফিরলো আহান । রাফি কে একবার দেখে প্রশ্ন করলো…
” আপনি কেমন আছেন আপু..?
মিহি কিঞ্চিত ভ্রু কুঁচকালো ।
” জ্বি,, আলহামদুলিল্লাহ….
হাসলো আহান । এবার পরিচয় করালো পাশের জনের সাথে…
” উনি ইমরান…
আজ থেকে উনিই পড়াবেন তোমাদের । রাফি বলেছিল টিউশন টিচার খুঁজে দেওয়ার জন্য । ওনার কাছে ক্লাস করে দেখো, আশা করি ভালো লাগবে ।
ইমরান লেনিন হাসলো একটু ।
রাফি আহান কে নিয়ে বেরিয়ে আসলো বাইরে । রাগান্বিত স্বরে ঝাঁঝিয়ে উঠলো…
” তোকে বলেছিলাম, ভালো টিচারের ব্যবস্থা করতে । কাকে এনেছিস এটা তুই ..?
” কেনো..? কি সমস্যা ?
উনি তো ঢাবি’য়ান । আর অনেক এক্সপেরিয়েন্স আছে ওনার । তোর বোনদের পড়াতে কোন অসুবিধা হবে না…
” বোনদের নয়…
ওখানে শুধু একজন বোন আছে আমার…
রাফির গম্ভীর কথায় হেসে উঠলো আহান । রাফির কাঁধে হাত রেখে টেনে টেনে বললো…
” জানি জানি…
তবে টেনশন করিস না । আমি বুঝতে পারছি তুই কি চিন্তা করছিস । ডোন্ট ওয়ারি… ইমরান স্যার বিবাহিত… একটা বাচ্চাও আছে ওনার , আর উনি অনেক ভালো মানুষ , একদম খাঁটি লয়াল বান্দা যাকে বলে । নজর পড়বে না তোর জিনিসের উপর । এইটুকু আস্থা রাখতে পারিস….
আহানের কথায় স্বস্তি পেলো রাফি ।
টিউশনের প্রথম দিন হওয়ায় আজ তেমন বেশি কিছু পড়ায়নি ইমরান । পরিচয় শেষে, টুকটাক একটু পড়িয়ে গল্প করে Discomfort দুর করেছে মিহি আর রুহির । কথায় কথায় মোটিভেট করেছে অনেক ।
অল্প সময়েই মিহি রুহি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে তার সাথে ।
রোজ দুঘন্টা পড়াবে ইমরান । আজ দেড় ঘন্টার মধ্যেই ছুটি দিয়ে দিয়েছে রুহি আর মিহি কে ।
রাফি বলেছিল ক্লাসের শেষে ওকে জানাতে । রুহি বেরিয়েই অফিসের সামনে এসে ফোন করেছে রাফি কে ।
এবার রাফির সাথে শান্ত ও এসেছে নিচে ।
রুহিকে দেখে এড়িয়ে যাওয়ার মতো কপাল কুঁচকে চোখ সরিয়ে নেয় শান্ত । যেন দেখতেই পায় নি রুহিকে । মিহির দিকে তাকিয়ে উৎসুক হয়ে বললো…
” নতুন টিচারের কাছে কেমন ক্লাস করলে পাখি..?
” জ্বি..?
বেশ ভালোই, অনেক সুন্দর করে বোঝান উনি । তাই না পাখি..?
রুহি গোমড়া মুখে জবাব দিলো….
” হুম…!
শান্ত শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে শক্ত বাহু দেখিয়ে একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলল…
” আচ্ছা পাখি…
ভাবছি কাল থেকে জিমে যাবো..! এইটুকু বডিতে কিচ্ছু হবে না ।
আর , সিক্স প্যাক আছে,, এবার টুয়েলভ প্যাক বানাতে হবে । কি বলতো.. ? আমার সিক্স প্যাক চোখে পড়ে না কারোর, যদি টুয়েলভ প্যাক চোখে পড়ে ।
মিহি বুঝলো না কিছু । রাফি সুক্ষ্ম নেত্রে তাকালো শান্তর দিকে । সকাল থেকে একই কথা ধরে আছে ও ।
রুহিও ভেংচি কেটে মিহিকে বলল…..
” আচ্ছা পাখি….
সিক্স প্যাক থাকলেই কি হ্যান্ডসাম হওয়া যায় বলতো ? আর যতই সিক্স প্যাক থাকুক বা হ্যান্ডসাম হোক, মাথার দুটো চুল তো পাঁকা পাঁকাই থাকবে ।
শান্ত দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো এবার….
” এই দেখো…
খবরদার আমার চুল নিয়ে কথা বলবে না । কোথায় আমার মাথার চুল পেঁকেছে..? দেখাও দেখি..!
” পেঁকেছে তো… দেখেছি আমি একদিন । তিন তিনটে চুল পেঁকেছে আপনার ।
ডান হাতের তিনটা আঙুল উঁচিয়ে কথাটা বললো রুহি । মিহি নীরবে দেখছে ওদের কান্ড । রাফি এবার বিরক্তি নিয়ে বললো…..
” উফফফ…
তোরা থামবি একটু ?
সব সময় ঝগড়া না করলে চলে না তোদের ?
শান্ত চোখ কুঁচকে নাকের ডগায় নামিয়েছে । রুহিও মুখ বাঁকিয়ে সরিয়ে নেয় দৃষ্টি । রাফি দুজন কে দেখে দুদিকে মাথা নেড়ে প্রশ্ন করে….
” কিছু খাবে তোমরা…?
” হুম খাবো…?
” কি খাবি বল…?
রাফির প্রশ্নে শান্ত পাশ থেকে বললো…
” আমার মাথাটা কেটে দে তোর বোনকে, এটাই তো ওর প্রিয় খাবার ।
রুহি কটমট করে তাকালো । রাফি কোন দিকে কান না দিয়ে বললো….
” চলল….
বাইরে বেরিয়ে সবার আগে নজরে আসলো ফুচকার দোকান । খুশিতে লাফিয়ে উঠলো রুহি । রাফির হাত ধরে আবদারের সুরে বলল….
” ভাইয়া, ফুচকা খাবো..!
রাফি চোখ পাকিয়ে তাকালো । এসব বাহিরের খাবার খাওয়া মোটেই পছন্দ করে না সে । রুহি জানে সেটা । তবুও রাফির থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে খায় ।
রাফি ভারী গলায় বলল….
” এসব খোলামেলা বাইরের খাবার খেতে হবে না । অন্য কিছু খেতে চাইলে বল..!
রুহি ঠোঁট উল্টে বলল….
” ভাইয়া প্লিজ,,, আমার পাখি ফুচকা ভীষণ পছন্দ করে,, জিজ্ঞেস করো ওকে । ওর জন্য হলেও আজকে খাই ? না করো না প্লিজ ..!
রাফি সরু চোখে চাইলো মিহির পানে । মিহি কিছু বললো না । খানিক ভেবে রাফি বললো….
” ঠিক আছে,, তবে আজকেই লাস্ট । এরপর আর কোনো দিন না…
” ঠিক আছে….
” এখানে দাঁড়াও,, আমি নিয়ে আসছি…
বলেই ফুচকার দোকানের দিকে হাঁটা লাগালো রাফি । রাফি যেতেই রুহি মিহির বাহুতে হালকা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল….
এক দেখায় পর্ব ২৪
” দেখেছো ভাবি জান…
বউয়ের পছন্দের কি মূল্য আমার ভাইয়ার কাছে ? বোনকে পাত্তা না দিয়ে বউকে তার পছন্দের খাবার খাওয়াচ্ছে । হাউ রোমান্টিক….
এমন পত্নী নিষ্ঠ স্বামী কোথায় পাবে তুমি..?
মিহি মাথা নামিয়ে নিলো । মুচকি হাসলো একটু ।
রুহি গদগদ হয়ে জড়িয়ে ধরলো ওকে । মিহির অনুভূতি গুলো বাইরেও প্রকাশ পাচ্ছে আজকাল । এই যে রুহির খোচানো কথা বার্তায় আগের মতো আর কথার পেষ্টে কথা বাড়ায় না মিহি । বরং রুহির কথায় লাজুক লাজুক আভা ফুটে ওঠে মিহির মাঝে ।
