Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৩

এক দেখায় পর্ব ৩৩

এক দেখায় পর্ব ৩৩
সুরভী আক্তার

মিহির মিষ্টি কন্ঠের নির্মল ডাকটা বোধহয় আব্বুর কানে পৌঁছালো না । আস্তে ডাকা হয়েছে হয়তো । মিহি এবার গলা কাঁপিয়ে জোরে ডাকলো…
” আব্বু …
আব্বু … শুনছো ? ঘুমিয়েছো তুমি ? এই সময় তো ঘুমাও না ! এটা ঘুমের সময় হলো নাকি ? ওঠো…আমি এসেছি দেখো, গল্প করবো তোমার সাথে । ক্ষিদে পেয়েছে ভীষণ, খেতে খেতে গল্প করবো, কেমন ? ওঠো আব্বু…আব্বু…
সাঁড়া নেই আজমাল হোসেনের । মিহি ভেজা অক্ষি যুগল‌‌‌ আরো সরু করে তাকালো । নিজের দুহাত সামনে ধরলো । হাত দুটো কাঁপছে কেনো ? কি হয়েছে ? মিহি কাঁপা হাত দুটো আব্বুর শরীরের উপরে রাখলো । দুহাতে ঝাঁকালো । ঝাঁকিয়ে আবার ডাকলো…

” আব্বু …
শুনলো না আজমাল হোসেন । মিহি আবারো ঝাঁকালো । এভাবে বেশ কয়েকবার । ঝাঁকানোর সাথে সাথে আজমাল হোসেনের পুরো শরীর দুলে উঠছে । নড়ছে পুরো শরীর । মিহি অবুঝ শিশুর মতো চেয়ে আছে । আশেপাশের সবাই নীরব । রুহি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে । মাথা কাজ করছে না তারও । চোখের সামনে যা দেখছে , কি দেখছে এসব ? নিঃশব্দে পানি গড়াচ্ছে ওর চোখ দিয়েও । সাবিনা বেগম এখনো একই ভঙ্গিতে বসে আছেন । পিছু ফেরেন নি একবারও । মিহি একটু ঝুঁকে দেখলো আজমাল হোসেনের মুখ বিবর । নাকে সাদা সাদা তুলোর মতো কি যেন ! যা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে নাসারন্ধ্র । মিহি কপাল কুঁচকে হাত বাড়ালো । আব্বুর নাক থেকে তুলো সরালো । তুলো গুলো এক হাতের তালু তে নিয়ে দেখলো । তারপর আব্বুর পানে চেয়ে বললো…
” এসব তোমার নাকে কে দিয়েছে আব্বু ? নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে তো তোমার ! তোমার না শ্বাস কষ্ট আছে ! নিঃশ্বাস আটকে আসবে তো এসব দিলে । কে দিয়েছে এসব ? তুমি বারন করতে পারো নি ? বারন করো নি কেনো ? কেনো দিয়েছে এসব ?
সাফি বসলো মিহির পাশে । আজমাল হোসেনের নাক দিয়ে রক্ত গড়াতে পারে । তাই তুলো দেওয়া হয়েছিল । সাফি মিহির হাত থেকে তুলো গুলো নিলো । আবারো গুজে দিল নাকে । মিহি ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগান্বিত রুষ্ট স্বরে বলে উঠলো…

” কি করছেন আপনি ? আমার আব্বুর শ্বাস নিতে কষ্ট হবে তো । শ্বাস কষ্ট আছে আব্বুর জানেন না ? সরান এসব । কেনো দিচ্ছেন এসব ।
সাফি বাঁধা দিলো মিহি কে । হাতটা ধরতে চাইলো । এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো মিহি । ধরতে দিলো না হাতটা । সাফি তবুও শান্ত স্বরে বলল…
” মিহি শান্ত হও । বোঝার চেষ্টা করো , কি হয়েছে কিছু বুঝতে পারছো তুমি ?
মিহি এদিক ওদিক মাথা ঝাঁকালো । গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অনাড়গল । মিহি চোখ মুছলো । পাগলের ন্যায় নিজেই নিজের দু গালে শক্ত হাতে চড় মারলো । মারতে মারতে আওড়ালো…
” উঠে পড় ঘুম থেকে , এতো বাজে স্বপ্ন কেও দেখে ? ওঠ বলছি , এসব কিছু সত্যি নয় । এমনটা হতে পারে না কিছুতেই… ওঠ ঘুম থেকে…
মিহির কান্ডে তড়িৎ বেগে ওর কাছে আসলো রুহি । মিহির হাত দুটো ধরে আটকে দিলো । জড়িয়ে ধরল শক্ত করে । ডুকরে কান্না আসছে ।মিহি কে কি বলবে ও , কি বলে শান্তনা দেবে ? রুহি কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে মিহি পাগলের ন্যায় খিলখিল করে হাসলো । চোখে পানির বন্যা , অথচ মুখে হাসি । হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললো হাউমাউ করে ‌। ডুকরে কেঁদে উঠে একটানে রুহিকে জড়িয়ে ধরলো বুকের সাথে । ক্রন্দনরত কন্ঠে তবুও অবিশ্বাস নিয়ে বললো…

” আমি স্বপ্ন দেখছি পাখি ! দেখ কি বাজে আর ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখছি আমি । পানি ছেটা আমার মুখে , জাগিয়ে তোল আমায় । নয়তো মরে যাবো আমি । প্লিজ পাখি , জাগিয়ে তোল আমায়…
মেয়ের কান্নার শব্দে এতক্ষণের ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসলেন সাবিনা বেগম । উঠে দাঁড়ালেন তিনি । এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে বসলেন । এক বার করে দেখে নিলেন মেয়েকে আর স্বামী কে । চোখে এখন পানি নেই তার । এতক্ষণ পানি গড়িয়েছে গাল বেয়ে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । সাবিনা বেগম আজমাল হোসেনের নিথর দেহ খানা দুহাতে ঝাঁকালেন । মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন একবার । অতঃপর মোলায়েম কন্ঠে ডাকলেন…

” শুনছেন , উঠুন না । দেখুন আপনার মেয়ের যেন কি হয়েছে ! কাঁদছে ও ! কতক্ষন ঘুমাবেন আর ? মেয়ের চিন্তায় তো সারারাত সজাগ থাকেন । আজ কি হয়েছে ? দেখুন , উঠুন আপনি ।
আচ্ছা, আমাদের না দুদিন পর হাতিরঝিল যাওয়ার কথা ! আমি কিন্তু একদম তৈরি যাওয়ার জন্য । আপনি তো বলেছিলেন নিয়ে যাবেন আমায় । নিয়ে যাবেন না ? আমার তো কোনো ইচ্ছেই অপূর্ণ রাখেন নি কখনো , এটা রাখবেন কেনো ? আমরা কিন্তু যাবো হাতিরঝিল । আমি কতটা সুখে আছি আপনাকে আর আমার মেয়েকে নিয়ে , দেখাবো না সবাইকে ?
সাবিনা বেগম থামলেন । মিহি তাকিয়ে আছে আম্মুর দিকে । সাবিনা বেগম ঠোঁট ভেজালেন । গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে । কথা বলার শক্তি, সামর্থ্য কোনটাই আসছে না । বুকটা চিরে যাচ্ছে মনে হচ্ছে । চোখ ফেটে যাচ্ছে, কান্না আসছে চোখ ফেটে । বিকট আওয়াজ তুলে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে । ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে আজমাল হোসেন কে । যদি সেই ডাকে সাড়া দেন , ফিরে আসেন যদি !

সাবিনা বেগম এ পর্যায়ে আটকাতে পারলেন না নিজেকে । আজমাল হোসেনের মুখ পানে চেয়ে তার বুকে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন , তাকে দুহাতে জাপটে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন । চিৎকার করে উঠলেন…
” ওরা তো হিংসে করে আমাদের । আপনিও হিংসে করলেন ? সুখ সইলো না আমার ? চলে গেলেন আমায় ছেড়ে ? এটা তো কথা ছিল না ! সবাই কে ছেড়ে আপনার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছিলাম না আমি , এতো তাড়াতাড়ি ছাড়লেন কেনো আমার হাত ? সারাজীবন তো একসাথে চলার কথা ছিলো , ধরে রাখার কথা ছিল আমার হাত, কথা দিয়েছিলেন তো , এবার বাকিটা জীবন চলবো কি করে আমি ? বলুন ? আমার তো কেউ নেই আর , আমার আর আমার মেয়ের কেউ নেই আপনি ছাড়া । কে দেখবে আমাদের ? বলুন ? এতো কিসের তাড়া আপনার ? এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলেন কেনো আপনি , কেনো হাত ছাড়লেন আমার ? আপনার হাত ধরেই তো সব ছেড়েছিলাম , আর আপনি কি না আমাকেই ছেড়ে দিলেন !

মাঝপথে ছাড়লেন আমায় ? কেনো ? বলুন ? কেনো ? আমি তো পারবো না আপনাকে ছাড়া বাঁচতে , চলেই যখন যাবেন তখন আপনাকে ছাড়া বাঁচতে শেখালেন না কেনো আমায় ? কেনো ছেড়ে চলে গেলেন আমাদের ? এজন্যই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আমায় ? হাতিরঝিল নিয়ে যাবেন বলেছিলেন না , চলুন যাবো , উঠুন ! গত ছাব্বিশ টা বছর ধরে যেখানে ছিলেন,যে অবস্থায় ছিলেন সাথে রেখে ছিলেন আমায় । তাহলে এখন কেনো সাথে নিলেন না ? একা একা পালালেন ? মেয়ের দায়িত্ব কে নেবে আপনার ? ব্যাংক একাউন্ট রেখে গেছেন আমাদের জন্য , চাই না আমার কিছু । এসব চাইলে খালি হাতে আপনার কাছে আসতাম না ছাব্বিশ বছর আগে । আমার তো আপনাকে চাই , কেনো চলে গেলেন আপনি ? উঠুন না…
বলতে বলতে বিবস হয়ে আসলো গলা । নেতিয়ে পড়লেন তিনি । মায়ের কান্না কমতেই মেয়ে কেঁদে উঠলো । মিহি অস্পষ্ট স্বরে বলল…

” জানো আম্মু , আব্বু আমায় বলেছিল তোমায় নিয়ে কোথাও যাবে ! এটাও বলেছিল, আমায় নিয়ে যাবে না । কিন্তু আমায় বলেছে ফিরে এসে মেলায় নিয়ে যাবে আমাদের । কি কি কিনবো সেটার লিস্ট করে রাখতেও বলেছিল ।
আব্বু, শোনো, আমি কিন্তু লিস্ট করে রেখেছি । অনেক কিছু কিনবো । কিন্তু কে কিনে দেবে আমায়‌ ? দেখো আমি কিন্তু সহ্য করবো না বলে দিলাম । কেনো এমন করছো আব্বু ? উঠে পড়ো প্লিজ , দেখো তোমার আম্মু কাঁদছে , মুছিয়ে দেবে না আমার চোখের পানি । মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করবে না কেনো কাঁদছি ? আজ কিন্তু তোমার জন্য কাঁদছি । দেখো , ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার , ফেটে যাচ্ছে বুকটা । আমি কিন্তু অগোছালো হয়ে ঘুমাবো প্রতিদিন । তুমি গুছিয়ে দেবে বলে ঠান্ডা লাগলেও গায়ে কম্বল জড়িয়ে ঘুমাই না , এখন থেকে রোজ রোজ কে আমার গায়ে কম্বল জড়িয়ে দেবে ? আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে কে ? কে আমায় আম্মু বলে ডাকবে ? আব্বু, ও আব্বু, উঠে পড়ো প্লিজ । একটা বার আমায় মা বলে ডাকো ! আমি কোন দিন আর অবাধ্য হবো না । তুমি একবার ফোন করলেই ধরবো , সত্যি বলছি । উঠবে না তুমি ?
মিহির আহাজারি করা কথা গুলো পৌঁছালো না আজমাল হোসেনের কানে । পৌঁছালে বোধহয় এতক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকতে পারতেন না তিনি । মিহির হেঁচকি উঠে গেছে । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ । গলায় দলা পাকিয়ে শ্বাস আটকে আসছে শ্বাস নালীতে । হাঁ করে শ্বাস টানছে মিহি । সবার চোখ ভরে উঠেছে মা মেয়ের আহাজারিতে । রুহি এখনো জড়িয়ে আছে মিহি কে । ওর চোখ দিয়ে নিঃশব্দে পানি গড়াচ্ছে শুধু । সময় পেরোলে অনেকক্ষণ । পেরিয়েছে অনেকটা সময় ।

সকালে মিহি টিউশনের উদ্দেশ্য বেরিয়ে যাওয়ার পর স্ট্রোক হয়েছিল আজমাল হোসেনের । আজ আচমকা । সুস্থ হয়েও স্ট্রোক করেছেন তিনি । সাফি সাথে থাকায় তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে । তবে এবার আর ভাগ্য সহায় হয় নি । মিহির ভয় বাস্তবে রুপ লাভ করেছে । ঠিক দশটায় দেহ ত্যাগ করেছেন আজমাল হোসেনের রুহ । যা আর কখনো সেই দেহে ফিরে আসবে না । সচল হয়ে ঘুরে বেড়াবে না দেহ খানা । জবানে কথা ফুটবে না আর । হাত পা চলবে না ।
আজমাল হোসেনের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করা হয় ।
সাবিনা বেগম টেবিলের পায়ার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছেন । চোখ শুকিয়ে গেছে তার । এখন আর পানি আসছে না । মিহি কে জড়িয়ে ধরে বসে আছে হেনা বেগম । খানিক আগে এসেছেন তারা । চৌধুরী বাড়ির সবাই এসেছে । মিহি চোখ বুজে আছে । ফুঁপিয়ে উঠছে বারবার । হেনা বেগম ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বসে আছেন ।
কয়েক টুকরো সাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়েছে আজমাল হোসেনের দেহ খানা । যেটা আজ সকাল অবধি রঙ্গিন পাঞ্জাবি তে মোড়ানো ছিল । খাটিয়া তে শুইয়ে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে তাকে । মিহি চমকে উঠলো আচমকা । লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে । ছুট লাগালো কোথাও । গিয়ে থামলো খাটিয়ার সামনে । মাথা অবধি মোড়ানো হয়েছে আজমাল হোসেনের । আব্বুর মুখ টুকু দেখার উপায় নেই আর । মিহি শেষ বার নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল…

” আল্লাহ , আমার আব্বু কে ফিরিয়ে দিন আল্লাহ । আমি বাঁচবো না আব্বু কে ছাড়া । আমি কাকে আব্বু বলে ডাকবো এখন থেকে ? কে আমায় আম্মু আর মা বলে ডাকবে ? এতো তাড়াতাড়ি কেনো নিয়ে নিলেন আমার আব্বু কে আপনি ? ফিরিয়ে দিন আল্লাহ, ফিরিয়ে দিন আমার আব্বু কে…
হেনা বেগম আর রুহি ছুটে গেল পিছনে । হেনা বেগম মাতৃ স্নেহে মিহি কে জড়িয়ে ধরলেন আবারো । তার বুকে মুখ গুজে ডুকরে উঠলো মিহি…
” আন্টি, আমার আব্বু কেনো চলে গেল আন্টি ? কেনো হলো আমাদের সাথে এমন ? আমাদের এই ছোট্ট পরিবার টা যে ভেঙ্গে গেল ।
বলতে বলতে লুটিয়ে পড়লো মেয়েটা । শরীরের ভার ছেড়ে অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়লো । জ্ঞান হারালো এবার ।
সাবিনা বেগম ও দুর থেকে দেখে চোখ বুজলেন । দীর্ঘ একটা শ্বাস টানার চেষ্টা করলেন ।

রাত ঠিক নয়টা । এখনো অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে আছে মিহি । বাড়ি এখন ফাঁকা । এমনিতেও সবসময় ফাঁকাই থাকে । আজ সব অজ্ঞাত মানুষের দ্বারা কিছু সময়ের জন্য ভরে উঠেছিল বাড়িটা । এখন আবার ফাঁকা । শূন্য চারিপাশ । সাবিনা বেগম মেয়ের পাশেই ব্যাকবোর্ডে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে আছেন । সেই তখন আজমাল হোসেনের দেহের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে আহাজারি করছিলেন , সেটাই ছিল তার মুখ থেকে বেরোনো শেষ আহাজারি আর চোখ ঝড়ানো শেষ পানি । তখন থেকে আর মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করেন নি তিনি , আর না চোখে এক ফোঁটা পানি ঝড়িয়েছেন । পাথরের মূর্তির ন্যায় অনুভূতি হীন হয়ে পড়েছেন তিনি । আশেপাশের কিছুই শুনতে বা বুঝতে পেরেও অবুঝ তিনি । তাকে সঙ্গ দেওয়ার মতোও কেউ নেই । নেই কোনো আপন মানুষ । যে ছিল সে চলে গেছে । তার বিরহেই তো এই কাতরতা । কে আর বোঝাবে ? সঙ্গ দেবে কে ? হেনা বেগম আর রুহি আছেন আজ এই বাড়িতে । থাকবেন তারা । তারা ছাড়া তো আর কেউ নেই আপাতত । বাকিরা চলে গেছেন । সাফির ও আর দেখা মেলে নি । তার কথা মাথাতেও নেই কারোর । দুই মা মেয়ের কাছে নিঃশব্দে বসে আছেন হেনা বেগম আর রুহি । বাড়িতে আর কেউ বা কেনো পুরুষ নেই । ধুপের গন্ধে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে কেমন ।

নয়টা বেজে পনেরো মিনিট । রুহির ভাইব্রেট করা ফোনটা কাঁপছে টেবিলের উপর । রুহি এগিয়ে গিয়ে ফোনটার দিকে তাকায় । রাফি ফোন করছে । স্ক্রিনে নাম্বার টা দেখে রুহির কান্না আসলো ভীষণ । সুদানে এখন হয়তো বিকেল পাঁচটা বাজে । রাফি আর শান্ত সবে নিজেদের ফ্লাটে এসেছে । ফ্রেশ হয়ে ফোন করেছে রাফি । এতক্ষণ রাফি আর শান্ত দু’জনেরই ফোন অফ ছিলো । তাদের চলে যাওয়ার পরের ঘটনা সম্পর্কে তারা অজ্ঞাত । জানবেই বা কি করে ?
রুহি ফোনটা হাতে নিয়ে পিছু ফিরে একবার তাকালো গুটিয়ে থাকা ঘুমন্ত মিহির পানে । অতঃপর হেনা বেগমের উদ্দেশ্য নরম কন্ঠে বলল…

” ভাইয়া ফোন করছে আম্মু । পৌঁছেছে হয়তো । আমি কথা বলে আসছি !
হেনা বেগম সম্মতি দিলেন । রুহি ধীর পায়ে এগোলো ব্যালকনির দিকে । ততক্ষণে ফোনটা কেটে গেছে । আবারো ফোন করেছে রাফি । রুহি খোলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাস টানলো । অতঃপর রিসিভ করলো ফোনটা । আগ বাড়িয়ে কথা বললো না । রাফি শান্ত থেকে শুধালো…
” কি হয়েছে , ফোন করছি কখন থেকে , রিসিভ করছিলি না কেনো ?
রুহি নিরুদ্বেগ হয়ে নিরস স্বরে বলল…
” দেখিনি ভাইয়া , কলটা ধরতে ধরতে কেটে গেছে ।
” কোথায় তুই , আম্মু কোথায় । ফোন করলাম ধরলো না যে ?
” আম্মুর ফোন তো বাড়িতে !
রাফি কপাল কুঁচকালো । গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলো…

” বাড়িতে মানে ? আম্মু কোথায় , আর তুই কোথায় ?
” আমি আর আম্মু বাড়িতে নেই । আমরা পাখি’দের বাড়িতে আছি !
আটকে আটকে কথা বলছে রুহি । গলায় বাঁধছে কথা বলতে গিয়ে । সাহস করে নিজে থেকে আর কিছু বলতে পারলো না সে । রাফির কুঁচকানো কপাল আরো বেশি কুঁচকে গেল । ব্যাস্ত স্বরে শুধালো…
” মানে ? ওখানে কি করছিস তোরা ? ঠিক আছে সব ? মিহি ঠিক আছে ?
রুহি নাক টানলো । শব্দ টা কানে পৌঁছালো রাফির । রুহি জড়ানো কন্ঠে বলল…
” পাখি ঠিক নেই ভাইয়া , একদম ঠিক নেই !
রাফি আঁতকে উঠলো । ধড়ফড়িয়ে উঠলো পুরুষালি চিত্ত । আত্মহারা হয়ে শুধালো…
” ঠ..ঠিক নেই মানে ? কি হয়েছে মিহির ?
রুহি কেঁদে উঠলো ফুঁপিয়ে । রাফির গলা শুকিয়ে আসছে । সবে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে সে । গলায় এখনো টাওয়েল ঝুলছে । ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েই প্রথমে মিহি কে ফোন করেছিল কথা মতো । তবে ফোনে পায় নি ওকে , ফোন সুইচ অফ । হেনা বেগমের ফোনে ফোন করেও পায় নি । তাই রুহি কে ফোন করেছে । আর যাই হোক রুহির কাছ থেকে অন্তত মিহির খবরটুকু পাওয়া যাবে ।
রাফি কিছু না শুনেই অজানা আশঙ্কায় ছটফট করে উঠলো । উত্তেজিত হয়ে বললো…

” Sissy ,, কি হয়েছে বোন , কাঁদছিস কেনো তুই ? বল ভাইয়া কে ? কি হয়েছে মিহির ? ও কোথায় ? ঠিক আছে ও ? দেখ মাথা যন্ত্রণা করছে আমার , টেনশন বাড়াস না প্লিজ । বল কি হয়েছে ?
রুহি সামলালো নিজেকে । কান থেকে ফোনটা দূরে সরিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কান্না আটকালো গলায় । এদিকে এতক্ষণে ওয়াশ রুম থেকে শান্ত বেরিয়ে এসেছে । রাফি কে কানে ফোন নিয়ে উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে আসলো ও । চিন্তিত মুখে শুধালো…
” কি হয়েছে রাফি ? এমন দেখাচ্ছে কেনো তোকে ?
রাফি কিছু না বলে ফোন স্পিকারে দিলো । ওদিক থেকে সময় নিয়ে সব মর্মান্তিক ঘটনা একে একে বললো রুহি । সব কথা শেষ করে থামলো একেবারে । সব শুনে নিস্তব্ধ রাফি । দু পা পিছিয়ে সোফায় বসে পড়লো সে । চোখ বন্ধ করে হাঁটুতে কনুই ভর করে এক হাতে মাথা চেপে ধরলো । মনে পড়লো আজমাল হোসেনকে নিয়ে মিহির মুখে শোনা প্রত্যেক টা কথা । এখন রুহির কথা গুলো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে । ওদিক থেকে রুহি নিশ্চুপ এখন । শান্ত ও অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । রাফি সময় নিয়ে রুদ্ধ স্বরে বলল…

” মিহি কোথায় রুহি ?
” ঘুমিয়েছে , এখনো ওঠে নি । ও উঠলে আমি ওকে সামলাবো কি করে ভাইয়া ? কাঁদতে কাঁদতে পাগল হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা !
রাফির শান্ত কন্ঠ…
” ওকে সামলে রাখিস প্লিজ ! কাঁদতে দে আপাতত । আমি কাল আসছি…
ততক্ষণ ওকে দেখে রাখিস । একা ছাড়িস না ওকে ! ভিডিও কল দিচ্ছি , একবার দেখাবি ওকে ?
” হুম ‌!
রাফি কল কাটলো মুহূর্তেই । ফোনটা রেখে দুহাতে মাথা চেপে ধরলো । শান্ত পাশে বসে কাঁধে হাত রাখলো ওর । কন্ঠের জড়তা ঠেলে প্রশ্ন করলো…
” কাল ফিরবি আবার ?
রাফি স্বাভাবিক করলো নিজেকে । ফোন হাতে উঠে দাঁড়ালো । শক্ত কন্ঠে বলল…
” যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এমার্জেন্সি ফ্লাইট এর ব্যবস্থা কর । আজকের রাত পেরোলে আর দ্বিতীয় একটা রাত এখানে কাটাতে চাই না আমি । ফিরতে চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ।
শান্ত প্রজেক্টের বিষয়ে কিছু বলতে গিয়েও পারলো না । এ সময় বলাটা শোভা পায় না । রাফি আবারো ধারালো কন্ঠে বলল…

” কিচ্ছু বলার চেষ্টা করিস না ,,শুনতে চাই না আমি । আমার জন্য যে আর যেটা ইম্পর্ট্যান্ট, সেটাই আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি ।
বলেই হনহনিয়ে সেখান থেকে চলে আসলো । রুহির ফোনে ভিডিও কল দিলো খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে । সুদানে বিকেলের সূর্য অস্ত যাচ্ছে , আকাশে সুন্দর লাল টকটকে আভা প্রতিয়মান । যেটা অন্য সময় হলে হয়তো মন ছুঁইয়ে দিতো । এখন বিধ্বস্ত মনকে ছুঁতে পারলো না । রাফির ভিডিও কল রিসিভ করে ঘরে আসলো মিহি । রাফি ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ইশারা করলো কথা না বলতে । রুহি বললো না কথা । ঠোঁট উল্টে ছলছল চোখে তাকালো ভাইয়ার দিকে । রাফি আবারো ইশারা করলো কান্না না করতে । রুহি ঘরে এসে দেখে হেনা বেগম বের হচ্ছেন ঘর থেকে । হাতে পানির জগ । নিচে যাচ্ছেন হয়তো পানি আনতে । রুহি ডাকলো না আর । গুটি গুটি পায়ে মিহির পাশে শিয়রে গিয়ে বসলো । ঠোঁট উল্টে গুটিয়ে শুয়ে আছে মেয়েটা । ঘুমের ঘোরে ফুঁপিয়ে উঠছে বারবার । চোখের কোণা দিয়ে পানি গড়াচ্ছে এখন ও । এটা হয়তো অজান্তেই বারি ধারায় গড়িয়ে পড়ছে । রুহি ফোন ক্যামেরা মিহির দিকে ঘোরাতেই রাফি দেখতে পেলো মিহির শুকনো মলিন মুখ খানা । আলতো আধো শুকনো ভেজা পাপড়ি সমেত চোখের কোণের পানি টুকুও নজর এড়ালো না । রাফির তাকিয়ে থাকার মাঝে একবার ফুঁপিয়ে নড়ে উঠলো মিহি । রাফির বক্ষ স্থল কেঁপে উঠলো । পুরুষালি হৃদয় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার । ভীষণ ভাবে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে মেয়েটা কে । হাত বাড়িয়ে চোখের পানি টুকু মুছে দিতে ইচ্ছে করছে । বুকে জড়িয়ে শান্তনা দিতে ইচ্ছে করছে । ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এক ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরতে তার স্নিগ্ধ পুষ্পকে । মিহি তো পারবে না তার আব্বু কে হারানোর কষ্ট সইতে , এটা এতো দিনে বুঝেছে রাফি । মিহির জীবনে ওর আব্বুর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে সে ।

এই সময় কি রাফির উচিত ছিল না মিহির পাশে থাকার ! মিহি কে সামলে নেওয়ার ? রাফি ঠোঁট ভেজালো । ভারী বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো । অনেকটা সময় নীরবে চোখ ভরে দেখলো মিহি কে ।
অতঃপর ধীর শান্ত কন্ঠে রুহি কে ডাকলো…
” রুহি …
সজাগ রুহি সাঁড়া দিলো মুহুর্তেই । রাফি নরম শীতল কন্ঠে বলল…
” কাল পর্যন্ত দেখে রাখতে পারবি না তোর ভাবি জান কে ?
রুহি শুধালো…
” কাল আসবে তুমি ?
” হুম , কালকেই আসবো । তোর ভাইয়ার জন্য হলেও ওকে সাবধানে রাখিস বোন । কাঁদতে দিলেও কষ্ট পেতে দিস না । আমি খুব তাড়াতাড়ি আসবো । কথা দিচ্ছি , সময় নেবো না বেশি…
” তাড়াতাড়ি এসো ভাইয়া…
রুদ্ধ স্বরে শুধু এটাই উচ্চারণ করতে পারলো রুহি । রাফি বললো…

” আসবো…
কথাটা বলেই ফোন কাটলো রাফি । কি অদ্ভুত না , রুহির ও অবাক লাগলো । রাফি পাল্টেছে কতটা ! একটা মেয়ের জন্য এমন করছে ও ? ভাবা যায় , রাফির মতো ছেলে টাকে ভালোবাসা এতটা বদলে দিয়েছে ! কি আছে এই ভালোবাসা নামক চার অক্ষরের শব্দে । রুহি ও তো শান্ত কে ভালোবাসে । কবে থেকে ভালোবাসে সেটা ও নিজেও জানে না । ছোট বেলা থেকেই শান্ত সবকিছুতে আটকে রাখতো রুহি কে , কারোর সাথে তেমন মিশতে দিতো না । কোনো ছেলে তো দূরের কথা । স্কুল লাইফেও বেড়িতে বেঁধে রেখেছিল রুহি কে । কোনো ছেলে রুহির দিকে চোখ তুলে একবার তাকালে দ্বিতীয় দিন আর সেই ছেলে নজরে আসতো না রুহির । খুঁজেও পাওয়া যেত না সেই ছেলেকে । রুহি অবশ্য কখনো কারোর দিকে চোখ তুলে তাকায় নি , প্রয়োজন হয় নি তাকানোর , ইচ্ছে ও জাগে নি কখনো । বড় হওয়ায় সাথে সাথে শান্তর অতিরিক্ত খেয়াল রাখা নিয়ে ভাবুক থাকতো রুহি । সবসময় ছেলে বলতে শান্ত কে চোখের সামনে দেখেছে । ভাই হিসেবে কি না জানা নেই । ভাই হিসেবে দেখলে হয়তো অন্য অনুভূতিরা জাগতো না মনে । ধীরে ধীরে দুজনের অনুভূতি সমান তালে বেড়েছিল । কবে যে রুহি শান্তর পাল্লায় জড়ালো বুঝতেই পারে নি । যে পাল্লা এখন অত্যাধিক ভারী ।

রুহি নিজের অনুভূতি কখনো প্রকাশ করে নি । শান্তই প্রকাশ করেছিল আগে । যেটা গ্রহণ করেছে রুহি ।
রুহি বসে বসে ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মিহির ঘুমন্ত মুখশ্রীর পানে । হেনা বেগম ঘরে এসেছেন । এই ঘরে জায়গা নেই , পাশের ঘরে ঘুমাতে হবে । ঘুম আসবে কি না সন্দেহ । তবুও শোয়ার ব্যবস্থা করেছেন পাশের ঘরে ।

দশটা পেরোলো রাত । এখনো জ্ঞান ফেরেনি মিহির । রুহি সেই একই ভাবে পাশে বসে আছে । এর মধ্যে রাফি আরো কয়েক বার ফোন করেছে । হেনা বেগমের সাথে ও কথা বলেছে । তবে ওর আসার কথা জানায় নি ।
মিহি ঘুমের ঘোরে নড়েচড়ে উঠলো । পাশ ফিরলো একবার । তার পর গাঁ মুড়িয়ে উঠে বসলো । রুহি চেয়ে আছে এখনো । মিহি পিট পিট ঝাঁপসা চোখে দেখলো রুহিকে । ঘুমন্ত মস্তিষ্ক জাগতে সময় লাগলো কয়েক সেকেন্ড । সম্বিত ফিরল মিহির । মিহি বসা অবস্থায় পিছোতে লাগলো । ধুপের গন্ধ নাকে লাগছে । অসহ্য লাগছে এটা । দম বন্ধ হয়ে আসছে । মাথায় গিয়ে তীক্ষ্ণ আঘাত হানছে গন্ধটা । মিহি দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে ব্যাকবোর্ডে গিয়ে পিঠ ঠেকালো । এদিক ওদিক তাকলো অসহায় চোখে । ভয়ার্ত হলো চাহনি । চোখ ভরে উঠেছে টলমল পানিতে । যে টলমল পানি টুকু গড়াতে সময় লাগলো না । মুহূর্তেই টুপটুপ করে ঝড়ে পড়লো । মিহি আহত ভেজা স্বরে বলল…
” পাখি, আমি স্বপ্ন দেখি নি রে । সত্যি ছিল সব ? সব সত্যি ? কেমন সত্যি এটা ? আমি মানতে পারছি না কেনো ?
রুহির চোখে অসহায়ত্ব । মুখে বলার মতো শব্দ আসছে না । গলা কাঁপছে । মিহি ঘাড় কাত করে পাশে তাকালো । আম্মু ঘুমিয়ে আছে নরম আবেশে । কি নিষ্পাপ লাগছে । আম্মু মানলো ? মানতে পারলো ? মিহির ভেতরটা হুঁ হুঁ করে কেঁপে উঠলো । বুকের মধ্যে পেরেক ঠোকার মতো যন্ত্রনা হচ্ছে । কিন্তু পেরেক ঠোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে না । চাপা আর্তনাদে গুমড়ে উঠছে ভেতরটা । চোখের পানি ঝড়ছে আপন গতিতে । থামতে চাইছে না তারা । মিহি আর কথা বললো না । চুপ করে বসে থেকে তাকিয়ে রইল কোনো এক দিকে । রুহি ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বসে আছে ।

শান্ত এমার্জেন্সি ফ্লাইট এর ব্যবস্থা করেছে । সেই বিকেল থেকে এসবেই মগ্ন ছিল সে । রাত্রি বারোটায় একটা ফ্লাইট আছে , অন্যটা পরদিন দুপুর দুটোয় । রাফি কে জানানোর পর রাত্রি বারোটার ফ্লাইটে আসার সিদ্ধান্ত নেয় তারা । যেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল তার থেকে দ্বিগুণ অস্থির প্রস্তুতি নিয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের । অস্থিরতা সম্পুর্নটা রাফির । শান্ত – স্থির থাকতে পারছে না সে । এক মাসের জন্য সুদানে যে ফ্ল্যাট বুকিং করা হয়েছিল সেটা ছেড়ে আট টার দিকে হন্তদন্ত হয়ে বের হয় দুজনে । হাতে সময় আছে তবুও ।
ফ্লাট থেকে এয়ার পোর্টে পৌঁছাতে আধা ঘন্টার রাস্তা । সবে রাত্রি প্রথম প্রহর হওয়ায় শহরের রাস্তায় অত্যাধিক যানজট । ‘খার্তুম’ শহরের মানুষের ব্যস্ততা এই সময়ে অত্যাধিক বেড়ে যায় । ব্যাস্ততায়‌ ছুটে চলে সবাই । মাঝ রাস্তায় বড় বড় গাড়ির ভিরে জেদি মনভাবে তাদের কাটিয়ে ফুল স্পিডে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রাফি । এতক্ষণ ড্রাইভার সন্তর্পণে ড্রাইভ করছিল । যেটা পৌষালো না রাফির । চরম বিরক্তিতে তাকে সরিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়েছে । আশেপাশের যানযট পূর্ণ পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে গাড়ির । মনে হচ্ছে উড়ে চলে যেতে পারলে শান্তি পেতো । রাস্তার অন্যান্য গাড়ি গুলোকে ওভারটেক করে এক প্রকার উড়েই যাচ্ছে বটে । ইতিমধ্যে ট্রাফিক রুলস ভঙ্গ করেছে এক জায়গায় । তবুও ক্ষান্ত হয়নি । শান্ত কিছু বলছে না । চুপচাপ পাশে বসে আছে । এই মুহূর্তে কিছু বলেও লাভ নেই, তা পৌঁছাবে না রাফির কান পর্যন্ত । এদিকে পিছনের সিটে যুবুথুবু হয়ে গুটিয়ে বসে আছে গাড়ির ড্রাইভার । চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় ফুটে উঠেছে তার । রাফি কে এই মুহূর্তে ভিন দেশী উন্মাদ এর থেকে কম কিছু মনে হচ্ছে না তার কাছে ।

ট্রাফিক রুলস ভঙ্গ আর এতো দ্রুত গাড়ি চালানো , দুটোই আতঙ্কে রেখেছে তাকে । এর মধ্যে একবার সুদানি ভাষায় রাফি কে আটকানোর লক্ষ্যে কম্পিত কন্ঠে কিছু একটা বলেছিল, রাফি ধমকে থামিয়েছে ওকে । এতো সুন্দর স্মার্ট সুদর্শন একটা ছেলের গম্ভীরতা দেখে আর ধমক শুনে চুপসে গেছে বেচারা । আর কিছু বলার সাহস পায় নি । দম খিচে বসে আছে ভ্যাবলার মতো । রাফি কে এভাবে উত্তেজিত অবস্থায় গাড়ি চালাতে দেখে আর চুপ থাকতে পারলো না শান্ত । স্পিড বাড়িয়ে চলেছে রাফি । শান্ত হতাশ শ্বাস ফেলে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” রাফি , ব্রো আসতে । এটা তোর দেশ নয় । এখানকার নিয়ম আলাদা । এমনিতেই একবার ট্রাফিক রুলস ভেঙ্গেছিস । এটার জন্য কোন সমস্যায় পড়লে আমাদের কেই পড়তে হবে । এই মুহূর্তে ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই । আর এতো তাড়াতাড়ি চালিয়েও তো কোন লাভ নেই বল । বারোটায় ফ্লাইট আমাদের , এখন সবে আটটা বিশ । এখনো অনেক সময় আছে । এখানে তাড়া দিলেও এয়ার পোর্টে তাড়া দিতে পারবি কি করে ? সাবধানে চালা, নয়তো যেকোনো সময় একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে । ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড…

রাফির শূন্য মস্তিষ্ক কথা গুলো শুনলো । তবে বোঝার চেষ্টা করলো না । শান্ত কোন পরিবর্তন না দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো । দু-আঙ্গুল চিবুকে রেখে চিন্তিত মুখে সামনে তাকালো । রাফি একজন পার্ফেক্ট রাইডার, সেটা বাইক হোক বা গাড়ি । সবক্ষেত্রেই সাবধানতা মেনে চলে রাফি । ফুল স্পিডে চালালেও কখনো কোন দূর্ঘটনা ঘটানোর মতো হিস্ট্রি নেই ওর । তবে আজ বোধহয় পরিবর্তন আসলো সব কিছুতে । একটা ট্রাক পাশ থেকে ওভারটেক করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেগতিক ভাবে রাফির গাড়ির সামনে গিয়ে এসে ব্রেক কষলো আচমকা । একদম গাড়ির সামন বরাবর থেমে গেল ট্রাকটা । আকস্মিক কান্ডে ভড়কে গিয়ে ব্রেক না কষে দ্রুত স্টিয়ারিং ঘোরালো রাফি । দ্রুত ব্রেক কষলেও একদম ট্রাক টার সাথে বাড়ি খেতো রাফির গাড়ি । তাই এক মুহুর্তেই স্টিয়ারিংয়ে ঘোর লাগিয়েছে রাফি । সাথে সাথে মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়েছে…

এক দেখায় পর্ব ৩২

” ওও নোহ ” ।
গাড়ি ঘুরিয়েও কাজ হলো না । ট্রাকের সাথে ধাক্কা না লাগলেও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের ইলেক্ট্রিক পোলের সাথে দ্রুত গতিতে একদম স্ট্রিক ভাবে ধাক্কা খেলো গাড়িটা । পিছনে বসা কালো সুদানি ড্রাইভার ছিটকে পড়লো সামনের দিকে । গাড়ির সমস্ত কাঁচ ঝড়ঝড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে মুহূর্তেই । গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে একাকার । শান্ত সামনের দিকে ছিটকে পড়তে নিলে কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে ওর কপালের সামনে তৎক্ষণাৎ হাত ঠেকিয়ে মাথায় বাড়ি খাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নেয় রাফি । তবে ওকে ধরতে গিয়ে নিজে টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের দিকে । স্টিয়ারিংয়ে মাথা শক্ত ভাবে বাড়ি খেয়ে বাউন্স করে আবারো পিছনের দিকে পিছিয়ে পড়ে । কপাল থেঁতলে কেটে রক্ত গলগলিয়ে বেরিয়ে আসে মুহূর্তেই । মাথায় শক্ত বাড়ি খাওয়ায় রাফি আবারো জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে সামনের দিকে ।

এক দেখায় পর্ব ৩৪