Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৪

এক দেখায় পর্ব ৩৪

এক দেখায় পর্ব ৩৪
সুরভী আক্তার

সুদানে ঘড়ির কাঁটা রাত দুই’টার কোঠায় ! হসপিটালের শান্ত একটা ঠান্ডা কেবিনের বেডের উপর অবচেতন হয়ে পড়ে আছে রাফি । মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো । কোমর অবধি সাদা চাদর টেনে রাখা । মাথা কাত করে চোখ বুজে আছে । কেবিনের দরজা ঠেলে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো শান্ত । রাফির এখনো জ্ঞান ফেরেনি দেখে আহত চোখে তাকালো । ছেলেটা নিজে কতটা ব্যাথা সয়ে শুয়ে আছে । অথচ শান্ত কে ঠিকি প্রটেক্ট করেছে । একটু ও আঁচ আসতে দেয় নি ওর শরীরে । শান্তর গালের উপরের অংশে কেটে গেছে একটু । ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো হয়েছে সেখানে । গাড়ির সামনের কাঁচ ভেঙে ছুটে এসে লেগেছিল গালের উপরে । যার ফলে কেটেছে একটু । তবে এটা অতি সামান্য । কিছুই হয় নি এতে । তবে রাফি বেশ ভালোই ব্যাথা পেয়েছে মাথায় । কপালের অনেকটা অংশ কেটে গেছে । রক্ত ঝড়েছে অনেক । জ্ঞান হারিয়েছিল সেখানেই , হসপিটালে নিয়ে আসার পর থেকে এখনো আর জ্ঞান ফেরেনি । ডাক্তার ওর বিশ্রামের কথা বলেছেন । একে তো অত্যাধিক টেনশন তার উপর আবারো আরেকটা উটকো ঝামেলায় পড়ে ফ্লাইট মিস হয়েছে ।

শান্ত নিঃশব্দে পাশে বসলো রাফির । রুহিকে ফোন করেছিল এই এতো রাতেই । কথা হয়েছে ওর সাথে , তবে এসব বিষয়ে ওকে জানানো হয় নি । কাল দুপুরের ফ্লাইটে ফিরবে এটা জানিয়েছে শুধু ।
শান্ত খানিক ক্ষণ বসে থাকলো রাফির পানে চেয়ে । রাফি নড়ে উঠতেই হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো শান্ত । রাফির হাতটা ধরলো শক্ত করে । রাফি এক হাত মাথায় রেখে চোখ বুজেই ঘটনা আন্দাজ করার চেষ্টা করলো । পর মুহুর্তে চোখ খুললো পিটপিট করে । শান্ত চিন্তিত মুখে তাকিয়ে শুধালো…
” আর ইউ ওকে নাউ ? ডক্টর ডাকবো ?
রাফি কিছু বললো না । মাথা ঘুরিয়ে দেয়ালে টানানো দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । অতঃপর ক্লান্তিতে চোখ বুজে ঢোক গিললো । সময় নিয়ে ধীর নিরেট কন্ঠে বললো…
” ফ্লাইট মিস হয়েছে ? মরি নি আমি, আগে জাগাস নি কেনো আমায় ?
” নিজের অবস্থা দেখ আগে , তারপর কথা বলিস ! আজ যেতে পারিস নি তো কি হয়েছে, কাল যাবি । এতো তাড়া কিসের তোর ?

” জিজ্ঞেস করছিস কিসের তাড়া ?
” হুম করছি জিজ্ঞেস । অবুঝের মতো কেনো করছিস তুই ? বোঝার চেষ্টা কর,তুই তো এমন নোস !
রাফি অদ্ভুত ভাবে বললো…
” আমি বোধহয় এমন নোই, তাই না ? কেমন ছিলাম , আর কেমন হলাম দেখ ! ও কতটা পরিবর্তন করে দিলো আমায় ! তাহলে ওর জন্য এমন করবো না তো কার জন্য করবো ?
শান্তর কন্ঠ কোমল হলো । নরম কন্ঠে বলল…
” ও এখন ঠিক আছে , রুহির সাথে কথা হয়েছে আমার ! তুই গেলেই তো এখন আর সবটা পাল্টে যাবে না বল ! কাল তো যাচ্ছি , আর একটু অপেক্ষা কর ! এই অপেক্ষার পর আর কোনো দিন অপেক্ষা করতে হবে না তোকে । ওকে কষ্ট পেতে দেখতে হবে না আর । এক মাস পরের কাজ না হয় একমাস আগে করবি । তবুও সারা জীবনের জন্য ওকে সামলানোর দায়িত্ব টা তো পাবি । আপাতত ওকে একটু কাঁদতে দে , কেঁদে মুছে যেতে দে কষ্ট গুলো । চোখের পানি কমাতে দে একটু । এর পর যে ওর চোখে কখনো পানি আসবে না এটা আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিউর ।
কথা গুলো বলে থামলো শান্ত । রাফি আর কথা বাড়ালো না । চুপ চাপ চোখ বন্ধ করলো ।
বাংলাদেশে সকাল হয়েছে । ভোরের আলো ফুটেছে চারদিকে । পাখির কিচিরমিচিরের শব্দ শোনা যাচ্ছে । বারান্দা দিয়ে ভোরের আলো ঘরের ভেতর অবধি পৌঁছেছে ।
সেই যে রাতে ঘুম ভাঙ্গলো মিহির । আর ঘুমায় নি সে । চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে ওর । রুহিকে দেখিয়ে চোখ বুজে ছিল অনেকটা সময় । তবে চোখে ঘুম ধরা দেয় নি আর । আব্বু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে হয়তো এমনটা হতো না । তখন সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়তো মিহি ।

সাবিনা বেগম এখনো গভীর ঘুমিয়ে । আজ আর ঘুম ভাঙছে না তার , কেউ ডেকেও দিচ্ছে না । সকাল সকাল গরম চায়ের আবদার ও করছে না । রোজকার মতো শান্ত‌‌‌ কন্ঠে কেউ বলছে না — ‘ম্যাডাম এক কাপ চা বানিয়ে দেবেন’ । চা বানানোর দায়িত্ব টা পালন করতে হচ্ছে না সাবিনা বেগম কে । তাইতো আরামে ঘুমিয়ে আছেন তিনি । সাবিনা বেগমের মাথার কাছে বসে আছে মিহি । এতক্ষণ নিস্তেজ চোখে চেয়ে দেখলো আম্মু কে । এভাবে আব্বু কে চেয়ে দেখতো সবসময় । মিহির এক হাত রুহির হাতে আবদ্ধ । মেয়েটা মিহির পাশে বসে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে , তবুও হাতটা ছাড়ে নি । মিহি অতি আলগোছে নিজের হাতটা ছাড়ালো । আম্মুর মুখে আলতো হাত বুলিয়ে দিলো অতি যত্নে । অতঃপর অতি সন্তর্পণে নেমে পড়লো খাট থেকে । চোখ ঘোরালো এদিক ওদিক , এটা তো আব্বুর ঘর । চোখ গেল বেড সাইড টেবিলের উপর । যেখানে বাপ – মা , আর মেয়ের সুন্দর মুহুর্তের একটা ছবি ফ্রেম বন্দি হয়ে পড়ে আছে । এইতো মিহির জন্মদিনের ছবি এটা । সাফি তুলে দিয়েছিল ।

মিহি মাঝখানে দাড়িয়ে দুহাতে আব্বু আম্মু কে জড়িয়ে রেখেছে । তিন জনের মুখেই কি সুন্দর হাসি । মিহি হাত বাড়িয়ে ছবিটা হাতে তুললো । চোখের ঠিক সামনে নিয়ে গেল ছবিটা । নিজেকেও দেখলো না , আম্মু কেও দেখলো না , দেখলো শুধু আব্বু কে । আনমনে হাসলো মিহি । আব্বুর ছবিটাতে হাত বোলালো । ঠোঁট বাড়িয়ে চুমু ও খেলো । তাকিয়ে রইল অনেকটা সময় । তার পর বুকে জড়ালো ছবিটা । নিস্তেজ ছোট ছোট পা ফেলে এগোলো ব্যালকনির দিকে । সবার আগে চোখ গেলো আব্বুর চেয়ার টায় । এইতো বসে আছে মিহির আব্বু , ঘুরে তাকিয়ে মিহি কে দেখে মুচকি হাসলো । না তো‌, নেই তো , কেউ নেই । মিহি এগোলো চেয়ার টার কাছে , চেয়ারের পাশের ছোট টি টেবিলটার উপর আব্বুর পড়ার বইটা এখনো উল্টো করে খুলে রাখা । কাল সকালেও এই চেয়ারে বসেই বইটা পড়েছেন তিনি । মিহি প্রত্যেক বারের মতোই চেয়ারের সামনে ঠিক পায়ের কাছে মেঝেতে বসলো ।

মনে হলো আব্বু আছে বসে । এক্ষুনি মাথায় হাত রাখবে হয়তো । তার পর জিজ্ঞেস করবে —’ কি হয়েছে আম্মু , মন খারাপ ?’ ।
আজ জিজ্ঞেস করলে হয়তো মিহি আব্বু কে জড়িয়ে খুব করে কাঁদতো । কাঁদতে ইচ্ছে করছে ভীষণ । চোখ দুটো জ্বালা করছে । কোটর ফেটে পানি বেরিয়ে আসতে চাইছে । মিহি আটকে রেখেছে । ঠিক করেছে ও কাঁদবে না, ও কাঁদলে আব্বুর কষ্ট হবে । ও জেনে বুঝে কি করে কষ্ট দিতে পারে আব্বু কে । অথচ আব্বু , আব্বু তো জেনে বুঝে কষ্ট দিয়ে চলে গেলো । একটুও বাঁধলো না এই ভাবে কষ্ট দিয়ে চলে যেতে । মিহি আগে ঠিক যেভাবে আব্বুর কোলে মাথা রাখতো, ঠিক সেভাবেই চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলো । আব্বুর কোলের মতো নরম নয় এটা । মিহি সামনে থেকে আব্বুর বই টা হাতে তুললো । ছবির সাথে সাথে সেটাও জড়িয়ে ধরল বুকে । আহত কন্ঠে থেমে থেমে নালিশ করলো…

” আব্বু , আব্বু তুমি খুব খারাপ,জানো ? খুব খারাপ তুমি ? তুমি তো চলে গেলে অথচ একবারও বলে গেলে না আমায় । সেদিন তো বললে দুদিন থাকবে , কিন্তু দেখো যেখানে গেলে সেখানে কিন্তু দুদিন থেকে আসতে দেবে না তোমায় । আর আসতে পারবে না তুমি ! যাওয়ার আগে আমায় বলে গেলে ভালো হতো বলো , তাহলে আমি আর অপেক্ষা করতাম না তোমার জন্য । কিন্তু দেখো , আমি পাগল এখনো অপেক্ষা করছি তোমার ! মনে হচ্ছে তুমি আসবে ।
মিহি আর আটকাতে পারল না নিজেকে । চাপা আর্তনাদে ডুকরে কেঁদে উঠলো । চেয়ারের হাতল চেপে ধরল একহাতে, অন্যহাতে মুখ । গলা চিরে যাচ্ছে । তবুও শব্দ বের করে কাঁদল না । গুমড়ে উঠলো নিজের মধ্যে । নিজেকে সাক্ষী রেখে আর্তনাদ করলো মৃদু…

” যাওয়ার আগে কেনো বললে না আব্বু , জানো তোমায় শেষবারের মতো আর জড়িয়ে ধরা হলো না । তোমার মুখ থেকে শেষ বার আম্মু ডাক শুনতে পারলাম না । এটা কিন্তু আমার আফসোস রয়ে গেল ।
শেষ বার আবদার করতে পারলাম না তোমার কাছে । আমাকে আর কেউ বুঝবে না আব্বু , তোমার মতো করে কেউ বুঝবে না । আমার দু-আঙ্গুলের ইশারা কেউ বুঝবে না । কারো কাছে আর দু-আঙ্গুল তুলে আবদার করতে পারবো না আমি ।
মিহি থামলো চোখের নোনা জল গড়িয়ে মাটিতে পড়ার আগেই মুছে নিলো তড়িঘড়ি করে । অবাধ্য চোখ তো মানছে না কিছুতেই । কি করে মানাবে ? অক্ষিপট ভিজে আসছে বারবার । মিহি যত বার ভাবছে ততবার দলা পাকিয়ে নিঃশ্বাস আটকে আসছে গলায় , কান্না আসছে ভীষণ । মিহি বড়দের মতো নিজেই নিজেকে সামাল দিতে বলতে লাগলো…

” আব্বু, শোনো , তুমি কিন্তু সবসময় দেখবে আমায় । ঐ উপর থেকে দেখবে , আমি তো দেখতে পারবো না । তুমি বরং আমার স্বপ্নে এসো রোজ , তখন দেখবো তোমায় । কেমন ?
মিহি মাথা তুলে তাকালো । মনে হলো আব্বুর দিকে তাকিয়ে বলল…
” তাহলে এটাই কথা রইলো , রোজ আসবে কিন্তু । আর চিন্তা করো না , তোমার মা তো তোমাকে দেখে রাখতে পারলো না , কিন্তু তোমার বউকে ঠিক দেখে রাখবে । আম্মু কে ঠিক সামলে নেবো আমি ।
মিহি পুনরায় চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো । বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো । লোহার সিকে হাত রেখে কপাল ঠেকালো । ঠান্ডা সিকে কপাল ঠেকাতেই কেঁপে উঠলো । মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো কয়েক মুহূর্ত । চোখ নামিয়ে বৃথা হাসার চেষ্টা করলো । দেয়াল ঘেঁষে পিঠ ঠেকিয়ে আস্তে আস্তে বসলো এক কোনায় । একদম গুটিয়ে বসলো । লুকানোর চেষ্টা করলো নিজেকে । এখন কাঁদলে হয়তো কেউ দেখবে না । হাঁটুতে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল মিহি । মাথা টা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে । সেদিকে খেয়াল নেই ওর । ও একাধারে কেঁদে থামলো । চোখের পানি কমে এসেছে । মিহি মাথা তুললো । চোখের পানি মোছার চেষ্টা করলো না । আব্বুর ছবিটাকে ফের বুকে জড়িয়ে ধরলো । দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজলো । ছোট বেলার একটা কবিতার মনে পড়ে যাচ্ছে । যেটা একবারের বেশি দুবার পড়ে নি মিহি । পড়ার সাহস পায় নি । যে ভয় কাজ করতো , সেই ভয়েই আজ জীবন টা সেই কবিতার সাথে মিলে গেছে । আজ আর বলতে বাধা নেই…

” কাটে না সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না…
জানলার গ্রিল টাতে ঠেকাই মাথা
মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না…
আয় খুকু আয়,, আয় খুকু আয়………

সাবিনা বেগম কেমন যেন হয়ে গেছেন । কথা বলছেন না একবারও । কোনো দিকেই মনোযোগ নেই তার । না কাঁদছেন আর না কোনো কিছু বলছেন । নিস্তেজ কাতর হয়ে ঝিম মেরে বসে আছেন শুধু । মিহির দিকেও ঠিক মতো তাকিয়ে দেখছেন না । নজর পড়লে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন, আবার চোখ সরিয়েও নিচ্ছেন । মিহি সব ছেড়ে আম্মু কে নিয়ে পড়েছে ।
বিকেলের দিকে হেনা বেগম বাড়িতে ফিরবেন । রুহি কে রেখে যাবেন এখানে । রুহি থাকবে । চৌধুরী বাড়ি থেকে গাড়ি এসেছে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী নিজে এসেছেন । তার সাথেই হেনা বেগম বাড়িতে ফিরবেন । সাবিনা বেগম জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন সোফার একপাশে । মিহি আম্মুর গাঁ ঘেঁষে বসে আছে । হেনা বেগম সাবিনা বেগমের সাথে কাল থেকে অনেক বার কথা বলার চেষ্টা করেছে । কোনো সাঁড়া পায় নি । সাবিনা বেগম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান নি । তাই হেনা বেগম এখন আর চেষ্টা করলেন না কথা বলার । মিহির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত কন্ঠে বললেন…

” আমি আসছি মা । সাবধানে থাকবি , একদম কাঁদবি না । আম্মু কে দেখে রাখবি , এখন উনি নয় , তুই ওনার মা হয়ে দেখা ।
রুহি তো আছে তোর সাথে । আমি আবার আসবো । কেমন !
মিহি মাথা ঝাঁকালো । হেনা বেগম মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন ওর । তিনি উঠে দাঁড়াতেই সাবিনা বেগমের শান্ত কন্ঠ ভেসে আসলো…
” রুহি কেও সাথে নিয়ে যান আপা । অনেক করলেন আমাদের জন্য, আর কিছু করতে হবে না । আমাদের নিয়ে ভাবতে হবে না আর । আমরা একা আছি, থাকতে হবে,আর থাকতেও পারবো ।
বিস্মিত হয়ে তৎক্ষণাৎ তাকালেন হেনা বেগম । কাল থেকে এই প্রথম কথা ফুটলো সাবিনা বেগমের মুখে । মিহি ও সঙ্কিত হয়ে তাকালো । রুদ্ধ গলায় ঢোক গিললো । সাবিনা বেগম এবার নরম দৃষ্টিপাত করলেন হেনা বেগমের দিকে । হেনা বেগম বললেন…

” রুহি থাকুক আপা । আপনারা তো একা থাকবেন , ও সাথে থাকলে ভালো হবে ।
” প্রয়োজন নেই । একা থাকাটা অভ্যাস করতে দিন এখন থেকে । অনেক অভ্যাস তো আছে , সেগুলো বদলাতে হবে । আপনার মেয়ে কে জড়িয়ে নতুন করে অভ্যাস বানাতে চাই না আর । নিয়ে জান ওকে , মাঝে মাঝে এসে না হয় দেখে যাবে । আমাদের মা মেয়েকে একটু একা থাকতে দিন । আমি আমার মেয়ের সাথে একা থাকতে চাই ।
থেমে থেমে কথা গুলো বলে থামলেন সাবিনা বেগম । চোখ সরালেন হেনা বেগমের দিক থেকে । রুহি উদ্বিগ্ন ছলছল চোখে চাইলো মিহির পানে । মিহি ওর দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে আস্বস্ত করলো । এই মুহূর্তে আম্মুর কথার বিপরীতে উল্টো কিছু করতে চায় না সে । এদিকে রুহি টানা পোড়েনে পড়েছে । রাফি শতবার বলেছে মিহির সাথে থাকতে । মিহিকে একা না ছাড়তে । রাফির কথা না হলেও মিহি কে কখনো এই অবস্থায় একা ছাড়তো না রুহি । কিন্তু এখন কি করবে ?

দোটানায় পড়লো রুহি । হেনা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না ।
অবশেষে সব দ্বিমুখতা কাটিয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে রুহিকে । ভেতরটা কেমন আনচান করছিল মিহি কে রেখে আসার সময় । এর মধ্যে রাফির সাথে আর কথা হয় নি । শান্তর সাথে কথা হলেও রাফির বিষয়ে শান্ত কিছুই বলে নি । শুধু বলেছে আজকের মধ্যেই ফিরবে ওরা । রুহি বাদে বাড়ির কেউ এখনো জানে না রাফির ফেরার কথা । এদিকে মিহি কে একা রেখে রুহি বাড়িতে চলে এসেছে,এটা জানানো প্রয়োজন রাফি কে । রুহি শান্ত কে বলেছে রাফি কে জানিয়ে দিতে ।

বাংলাদেশে রাত্রি সাড়ে তিনটা । সুদানের দুপুরের ফ্লাইটে নয় ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে রাফি । এয়ার পোর্ট থেকে এক প্রকার ছুটে এসেছে ধানমন্ডি সেক্টরে । মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো । গায়ের সাদা শার্ট টা খানিক ভিজে গেছে ঘামে । বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতেই হন্তদন্ত হয়ে নেমে পড়লো রাফি । সে ড্রাইভ করে নি আজ । শান্ত ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে সেও ছুটলো রাফির পিছু পিছু । চারটা বাজতে চলেছে । এই মুহূর্তে সবাই নিশ্চয়ই গভীর ঘুমে । শান্ত পোই পোই করে বলেছে আজ বাড়িতে গিয়ে কাল সকালে আসতে । রাফি বাড়িতে যাবে না । আর না কোনো রেসর্টে । সে সোজা এখানেই এসেছে ।
রাফি গাড়িতে থাকা অবস্থায় মিহির ফোনে ফোন লাগানোর চেষ্টা করেছিল , তবে সেই কাল থেকেই ওর ফোনটা বন্ধ ।

মেইন গেট হাঁট করে খুলে রাখা । সদর দরজার কাছে গিয়ে থামলো রাফি । লম্বা শ্বাস টানলো বুক ভরে । দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে আশপাশটা ক্ষীন আলোকিত । রাফি এতক্ষণে যেন স্বস্তি পেলো । তবে স্বস্তি টিকলো না এক মুহুর্ত । সদর দরজায় বিশাল এক তালা দেখে কপাল কুঁচকালো রাফি । ফোনের ফ্লাস জ্বালালো ভালো করে দেখার জন্য । তালা দেখে চোখ বন্ধ করে আবারো চোখ খুললো । শান্ত পাশে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করলো…
” বাড়িতে তালা কেনো ? রুহি কোথায় ? ফোন কর ওকে , ভিতরে থেকে বাইরে তালা দিয়ে রেখেছে কেনো ? তাড়াতাড়ি ফোন কর , দরজা খুলে দিতে বল ।
শান্ত নিজেও তালা দেখে অবাক হলো । এতক্ষণের চেপে রাখা কথাটা বলে ফেললো এবার…ক্ষীন স্বরে আওড়ালো…
” রুহি তো এখানে নেই । ও তো আজ দুপুরেই বাড়ি ফিরেছে । কিন্তু তালা ? তালা কেনো এখানে ?
শেষ কথা গুলো গুরুত্ব না দিলেও প্রথম কথা গুলো কানে বাজলো রাফির । সে বৃহৎ নয়নে তাকালো শান্তর দিকে । অবিশ্বাস্য রূঢ় কন্ঠে বলল…

” রুহি এখানে নেই মানে ? ও তো মিহির সাথে ছিল ! বাড়িতে ফিরেছে ও ? তাহলে মিহি কোথায় ? আর এই বাড়িতে তালা কেনো ? কোথায় মিহি ?
শান্ত শুল্ক ঢোক গিললো । বলার চেষ্টা করলো…
” রুহি আজ দুপুরে বাড়ি ফিরেছে ।
তৎক্ষণাৎ চোয়াল শক্ত করলো রাফি । ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো শান্তর দিকে । দাঁত চেপে হুংকার ছাড়লো শক্ত কন্ঠে…
” হোয়াট…?
রুহি বাড়ি ফিরেছে ? মিহি কে একা রেখে ? আর তুই সেটা জানতি ? বল ? তাহলে বল , বাড়িতে তালা কেনো ? কোথায় আমার মিহি ? বল ?
শান্ত ভড়কালো । আজ হয়তো প্রথম শান্তর উপর এভাবে সিরিয়াস ভঙ্গিতে রাগ দেখালো রাফি । শান্তর মাথা কাজ করছে না । বাড়িতে তালা কেনো থাকবে ? সে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো…

” রাফি , ব্রো , কুল ডাউন ! বাড়িতে তালা তো কি হয়েছে , মিহি আছে ! আমি রুহির সাথে কথা বলছি দাড়া । ও হয়তো জানে । এক্ষুনি জানতে পারবো মিহি কোথায় !
রাফি কথা গুলো শুনলো কি না কে জানে । মাথায় আগুন জ্বললো দপ করে । সে একটু পিছিয়ে কষে সজোরে একটা লাথি মারলো দরজায় । পরপর দুটো লাথি মারায় দরজার সিটকিনি ভেঙ্গে তালা সমেত নিচে পড়লো । রাফি গর্জে উঠে আরো একটা লাথি মারলে শব্দ করে খুলে গেল দরজা টা । দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো রাফি । পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার । শান্ত সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করলো । রাফি বিচলিত কন্ঠে উঁচু গলায় ডাকতে লাগলো মিহি কে । ডাকতে ডাকতে ধড়ফড় করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো । উপরের ঘর দুটো ফাঁকা । কেউ নেই কোথাও । আর না কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র আছে । রাফি আবারো নিচে নামলো । হাঁসফাঁস করছে মূলত । কপালের রগ ফুলে উঠেছে তার । চোখ অস্বাভাবিক ভাবে রক্তিম বর্ন ধারন করেছে । নিচে নামতেই মুখোমুখি হলো কারোর । বাড়ি ওয়ালা মানজাল হোসেন । শব্দ পেয়ে এসেছেন তিনি । দরজার তালা ভাঙা দেখে খানিক ভীত হয়েও ভিতরে ঢুকেছেন । ভেবেছিলেন টাটকু-ফাটকু চোর-টোর এসেছে হয়তো । তবে তার ধারনার বিপরীত । এ তো ডিজিটাল সুদর্শন চোর । তাও আবার দু-দুটো । মানজাল হোসেন গলা ভেজালেন শুকনো ঢোক গিলে । অতঃপর মিনমিন করে বললেন…

” কারা বাবা তোমরা ? এতো রাতে আমার বাড়িতে কি করছো ?
রাফি শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলো । গম্ভীর স্বরে শুধালো…
” এই বাড়িতে যারা ছিল , তারা কোথায় ? তালা বদ্ধ কেনো , বাড়ির সবাই কোথায় ? কোথায় মিহি ? আর ওর আম্মু ? কোথায় ওরা ?
মানজাল হোসেন স্বস্তি পেলেন চোর নয় এটা বুঝে । রাফি কে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করালেন তিনি । ছেলেটা কে চেনা চেনা লাগছে বেশ । কোথায় যেনো দেখেছে বলে মনে হচ্ছে । তবে এই মুহূর্তে মনে পড়লো না সঠিক ভাবে । তিনি স্বাভাবিক ভাবেই বললেন…

এক দেখায় পর্ব ৩৩

” আজমাল হোসেনের পরিবারের কথা বলছো ? আজমাল হোসেন তো মারা গেছেন দুদিন আগে । খবর পাও নি ? আর ওনার পরিবার বলতে তো ওনার স্ত্রী আর মেয়ে । ওনারাও আজ বিকেলে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন ।

এক দেখায় পর্ব ৩৪ (২)