Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৯

এক দেখায় পর্ব ৩৯

এক দেখায় পর্ব ৩৯
সুরভী আক্তার

সবার চকিতে নজর পিছনের দিকে । সবে কাঁচের দরজা ঠেলে ক্যাফের ভেতরে ঢুকেছে রাফি , শান্ত ও আছে সাথে । ওদের সূক্ষ্ম গুটানো নজর এদিকটায় । রাফি এক হাত পকেটে গুঁজে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে । মাহি তাকাতেই সবার আগে চোখা চুখি হলো ওর সাথে । এক মুহুর্ত পর তৎক্ষণাৎ চোখ সরালো মাহি । নত করলো দৃষ্টি ।
রাফি কে আচমকা সব ভুলে ছলকে উঠলো মেয়ে গুলো । উত্তেজিত হয়ে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো । বিরক্ত হলো রাফি । এগিয়ে এসে মাহি কে আর পলক দেখে চোখ সরিয়ে জারিফের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে শুধালো….

” কি হচ্ছিলো এখানে ?
জারিফ একবার বিরক্তিকর নজরে তাকালো মেয়ে গুলোর দিকে । ও মুখ খোলার আগেই একটা মেয়ে আপ্লুত কন্ঠে বলে উঠলো…
” হায়,,, র..রুজান রাফি চৌধুরী । হাউ আর ইউ ? আ..আই মিন ভালো আছেন ?
রাফি কপাল গুটিয়ে তাকালো । আর একটা মেয়ে একই স্বরে বলল…
” ইউ আর সো ড্যাসিং ইয়ার….
আমরা আপনার অনেক বড় ফ্যান ,, রাফি । শুধু মাত্র আপনার সাথেই দেখা করতে এসেছি এখানে । আপনার সাথে কয়েকটা সেলফি তুলতে পারি ,, প্লিজ !
রাফি বাঁকা হাসলো । মিহি কে বাঁকা চোখে এক পলক দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো…
” ইয়াহ ,, শিউর….

তৎক্ষণাৎ নত দৃষ্টি ছলকে উপরে উঠলো মাহির । মেয়ে গুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠলো । অতিরিক্ত মেকি আনন্দে এক প্রকার ঢলে পড়ার অবস্থা ওদের । রাফির গায়ে গাঁ ঘেঁষে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত ওরা । এভাবে ঢলে ঢলে একে একে বেশ কয়েকটা ছবিও তুললো ওরা । জারিফ, নিহার, জেরিন, রেহা ওরা হতবাকের ন্যায় তাকিয়ে আছে । জেরিন চোখ কুঁচকে মেয়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললো ।
শান্ত এক পলক মাহি কে দেখছে, তো আর এক পলক রাফি কে । রাফির এমন কর্মকাণ্ড দেখে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো ও । ছবি তোলা শেষে রাফি স্থান ত্যাগের জন্য পা বাড়াতেই মেয়ে গুলো ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মাহির পানে তাকালো ফের । মাহি তাকিয়ে আছে রাফির যাওয়ার দিকে । একটা মেয়ে ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে চেঁতে উঠলো আবার আগের ন্যায়….
” এই মেয়ে ,, এখনো দাঁড়িয়ে আছো এখানে ? যাও কফি নিয়ে এসো আবার…
রাফি দাঁড়িয়েছে এমন কথা শুনে । ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে ও । মাহি ঠোঁট উল্টালো আলতো । চিনচিনে ব্যথা হলো মনে । রাফি শুধু জানতে চাইলো কি হয়েছে, অথচ জানলো না । শোনার প্রয়োজন বোধ টুকুও করলো না ।
মাহি মাথা নুইয়ে বাধ্যের ন্যায় মাথা দোলালো মেয়েটার কথায় । জারিফ, নিহার আর রেহা কে ইশারা করে বললো বাইরে যেতে । কেউ নেই বাইরে । ইশারা অনুযায়ী ওরা চলে যেতেই জারিফ মাহির দিকে ফিরে নরম কন্ঠে বললো….

” তুমি ভেতরে গিয়ে রেস্ট করো মাহি , তোমাকে কিছু করতে হবে না । আমি অর্ডার সার্ভ করে দিচ্ছি ।
মাহি হাসলো আলতো । বললো…
” আজকেই তো শেষ ভাইয়া । আর তো আসবো না আজকের পর । আজ একটু কাজ করি । কাল থেকে আমার কাজ গুলো আপনি করে দেবেন না হয় ।
মাহি কে হাসতে দেখে জারিফ ও শীতল হাসলো । অতঃপর জেরিন সহ তিন জনে এগোলো কিচেনের দিকে । দরজার পাশে উঁচু একটা বেতের মোড়ায় বসেছে মাহি । জেরিন আর জারিফ দুজন দুটো কফি মেকারের সামনে দাঁড়িয়ে । জারিফ হাত চালাতে চালাতে ঘাড় ঘুরিয়ে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল….
” তোমাকে খুব মিস করবো মাহি । আমাদের মতো এই ওয়েটার গিরি না ছাড়লেও পারতে ! অন্তত এই সুযোগে রোজ রোজ দেখা হতো তোমার সাথে, এখন তো আর দেখা হবে না ।
জেরিন ও তাল মিলিয়ে বললো…

” হ্যাঁ রে মাহি ,, খুব বেশি মিস করবো তোকে । হঠাৎ কাজ ছাড়ছিস কেনো বলতো ?
মাহির ক্ষীন নির্লিপ্ত কন্ঠ….
” আম্মু তো সবসময় বাড়িতে একা থাকে । আম্মু কে সঙ্গ দেওয়া প্রয়োজন । তোদের সাথে থাকলে আমার নিঃসঙ্গতা দূর হয় ঠিক , কিন্তু আম্মু নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে । সারাদিন থাকতে পারি না তার সাথে । সন্ধ্যার সময় টুকুই আম্মু কাছে পায় আমায় । রাত্রি তো ঘুমে কেটে যায় ।
তাই আম্মু কে আর একা ছাড়তে চাইছি না , এখন থেকে ফুল টাইম আম্মুর সাথে স্পেন্ড করবো ।
মাহি থামতেই জেরিন দুহাত তুলে শ্বাস ফেলে বললো….
” তুই কি করিস কর ভাই , আমি তো ছাড়ছি না এই কাজ । যতদিন রুজান রাফি চৌধুরী এখানে ততদিন এই জেরিন ও এখানে । কোথাও নড়ছি না আমি ।
রাফির প্রসঙ্গ আসতেই মুখের মলিন হাসি টুকুও গায়েব হয়ে গেল মাহির ।

এদিকে ওদের তিন জনের কর্মকাণ্ড ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখেই চলেছে রাফি । বাইরের দিকটা ও নিজে থেকেই গুরুত্ব দেয় নি অতো । তবে জারিফের সাথে মিহি কে কথা বলতে দেখে তৎক্ষণাৎ কেবিনে এসে ল্যাপটপ ওপেন করে বসেছে ওর সামনে । সিসি টিভি ফুটেজে স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পাচ্ছে ও । চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে যাচ্ছে সবকিছু । চোখের দৃষ্টি নিরেট । বাইরে মাহির বলা শেষ কথাটা কানে এসেছে ওর । আর কথাটার মানে ও বুঝতে বাকি রয়নি । রাফি তিন আঙ্গুলে চিবুক চুলকে ল্যাপটপের থেকে চোখ সরালো । ডেস্কের উপর থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে কল লাগালো কারোর নাম্বারে । দু-একবার রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হয়েছে ফোন খানা । অমনি গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ল রাফি….

” যা যা বলেছিলাম , সব রেডি তো ?
ওপাশ থেকে হ্যাঁ সূচক উত্তর আসলো । উত্তরে যেন প্রশন্য হলো রাফি । ফের একই স্বরে বলল…
” তাহলে অপেক্ষা কিসের , নিয়ে আসুন সব । থার্টি মিনিটের মধ্যে সবকিছু আমার সামনে চাই আমি ।
রাফি আদেশ মোতাবেক ঠিক আধা ঘন্টা পর মি. নেওয়াজ কিছু কাগজপত্র নিয়ে এসেছেন । রাফির কেবিনে সব সার্ভেন্ট দের তলব করা হয়েছে । সবাই উপস্থিত । রাফি ইজি চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছে । এক হাত চিবুকে । শান্ত ও ধীরস্থির হয়ে বসে আছে । অপেক্ষা করছে রাফির পরবর্তী পদক্ষেপের । রাফি চেয়ারে বসেই এক হাত দিয়ে ডেস্কের উপরে রাখা কাগজপত্র গুলো ইশারা করে সবার উদ্দেশ্যে বললো…
” এই এগ্রিমেন্ট পেপার গুলোতে একে একে সাইন করে দাও সবাই ।
সবাই একই সাথে তাকালো টেবিলের উপর রাখা পেপার গুলোর দিকে । জারিফ দোনামোনা করে শুধালো….
” কিসের পেপার স্যার ?

” তোমাদের সবার স্যালারি বাড়িয়ে দিয়েছি । তবে , একটা কন্ডিশন আছে ,, আগামী এক মাস তোমরা কেউ , এক দিনের জন্যেও ছুটি পাবে নিজের দায়িত্ব আর কাজ থেকে । ছুটি পাবে না মানে পাবে না । রোজ আসতে হবে ক্যাফেতে ।
যদি কেউ না আসো , তাহলে তার স্যালারি থেকে কিছু পরিমাণ কাট করা হবে ।
এই মর্মে একটা এগ্রিমেন্ট করেছি আমি । সেটাতে তোমরা তোমাদের মুল্যবান সাইন টা করে দাও আপাতত । তাতেই হবে…
সবাই কপাল কুঁচকে একে অপরের দিকে তাকালো । রাফির কথা গুলো অহেতুক অর্থহীন মনে হলো সবার কাছেই । নিহার বললো….
” আমরা তো রোজ আসবোই , ‌এমনিতেও আসবো, আর অমনিতেও আসবো । এতে আলাদা করে এগ্রিমেন্ট পেপারে সাইন করার কি আছে ?

” তোমাদের কাছে কিছু না হলেও আমার কাছে এটা অনেক কিছু । এমনিতেও আসবে অমনিতেও আসবে , তো সাইন করতে কি প্রবলেম ?
” না..মানে….
জারিফ কে কথার মাঝে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে নিরেট কন্ঠে রাফি বললো….
” অতো কিছু শুনতে চাই না আমি , যা বলছি তা করো । এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার মুখ দেখার সময় নেই তোমাদের ।
জারিফ এদিক ওদিক চোখ ঘোরালো । এগিয়ে আসতেই রাফি বললো…
” পেপার গুলো পড়ার ইচ্ছে থাকলে পড়ে নিতে পারো ।
জারিফ না বোধক মাথা দুলিয়ে বলল…
” প্রয়োজন হবে না, স্যার ।
একে একে সবাই সাইন করা শেষ । জারিফ, নিহার আর বাকি দুজন বেরিয়ে গেছে । জেরিন সাইন শেষে রেহার দিকে ফিরে বললো…

” চল..
মাহি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে । এতোক্ষণ রাফির কথা গুলো দাঁত চেপে শুনে গেছে ও । হঠাৎ এসবের মানে কেউ না বুঝলেও ওর বুঝতে বাকি নেই । জেরিনের সাথে মাহি পা বাড়াতে গেলে রাফি ডাকলো তীব্র স্বরে…
” আপনি কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম ? আপনাকে কি সাইন করার জন্য কোলে তুলে আনতে হবে,নাকি ইনভিটিশন পাঠাতে হবে ?
ভিমড়ি খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো মাহি । জেরিন তৎক্ষণাৎ মোচড় দিয়ে বৃহৎ নয়নে তাকালো । রাফির মুখে এমন কথা অপ্রত্যাশিত । খানিক চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে থেকে জেরিন শুকনো কেশে গলা পরিষ্কার করে বললো…
” ও তো আজকের পর আর আসবে না , সিঙ্গার স্যার । আসবে না মানে , ও এই চাকরি টা ছেড়ে দিয়েছে ।
” ছেড়ে দিয়েছে মানে,কার পারমিশনে ছেড়েছে ?
” ছাড়ার জন্য কারোর পারমিশন লাগবে বুঝি ? আমি যেভাবে এসেছিলাম সেভাবেই চলে যাচ্ছি ।
মাহির কাঠ কাঠ জবাব । রাফি শান্ত কন্ঠে বললো রেহা আর জেরিনের উদ্দেশ্যে…
” তোমরা যাও…
রেহা, জেরিন অপেক্ষা করলো না । ওরা চলে যেতেই রাফি উঠে দাঁড়ালো । এক পা এক পা করে এগোতে এগোতে বললো…

” এসেছেন নিজের মতে , তবে যেতে হবে আমার মতে । আগামী এক মাস চাকরি ছাড়তে পারবেন না আপনি , আর না অন্য কেউ ।
” আমি বাধ্য নোই !
” আপনাকে বাধ্য হতে হবে ম্যাডাম । জীবনে দ্বিতীয় বার কারোর কাছে এক মাস সময় চাইছি । মাত্র ত্রিশ দিন মানে ২৫,৯২০০০ সেকেন্ড জাস্ট । প্রথম জন তো ফাকি দিয়ে হারিয়ে গেছে । আপনাকে দেখে বড় মনের মেয়ে মনে হচ্ছে । আপনি নিশ্চয়ই ফাঁকি দেবেন না ? থেকে যান একটা মাস আমার কাছে , আই মিন আমার সাথে আরকি । আমার এই ক্যাফেতে…
মাহি নিশ্চুপ । রাফি শান্তর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফের মেকি মিনতি পূর্ণ কন্ঠে বলল…
” একটা মাস বাধ্য হয়ে থেকে যান । পরের মাস গুলোতে বাধ্যতা অভ্যাস হয়ে যাবে । যেতে চাইবেন আর তখন ।
শেষের কথাটা ধীরে সুস্থে বিড়বিড় করে বললো । মাহি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল বেশ কয়েক সেকেন্ড । অতঃপর এক মুহুর্তেই পদক্ষেপ নিলো মাহি । তড়িৎ গতিতে অগ্রসর হয়ে টেবিলের উপর থেকে সাইন করলো পেপারে । রাফি তা দেখে ফিচেল হাসলো । গলা বাড়িয়ে বললো…
” নিচে আরো একটা পেপার আছে…
মাহি সাইন করলো ওটাতেও । অতঃপর পিছন ফিরে একপলক রাফি কে দেখে দ্রুত বেরিয়ে আসলো কেবিন থেকে । ও বেরোতেই সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস ফেললো রাফি । বুকের উপর চাপানো ভার হালকা হলো যেন ।
শান্ত এতক্ষণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে । এতক্ষণে ও নিজেও দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো, যেটা বেড়িয়ে আসলো ফোঁস করে । শান্ত নাটকীয় স্বরে বললো ….

” নাটক তো ভালোই শিখেছিস ব্রো !
রাফি ঠোঁট কামড়ে হেসে ইজি চেয়ারে বসতে বসতে বলল…
” নাটক করলাম বুঝি ? যাই হোক , ওকে তো আটকাতে পারলাম ।
” যা করলি ভেবে চিন্তে করলি তো ?
” যা করলাম সেটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল আমার । দেরি করে ফেলেছি । যার মাশুল দীর্ঘ সাতটা মাস গুনতে হলো আমায় । এক মাসের জায়গায় ও আমার জীবন থেকে সাতটা মাস কেড়ে নিয়েছে, মিহি হিনা এই রাফি অতিবাহিত করেছে সাতটা মাস । এখন এই এক মাসে আমি ওর জীবন থেকে পুরো জন্ম টাই নিজের নামে করে নেবো । ওর এই জনমটাই আমার নামে লিখে নেবো । ও নিজেই লিখে দেবে ।
শান্ত উৎসুক হাসলো । চাপড় মেরে বললো…

” কনগ্রাচুলেশনস ব্রো…
বাই দা ওয়ে , তোর ধৈর্য আছে বলতে হবে । এক মাস ওয়েট করবি এখন ? নিজেও শালা বিয়ে করবি না , আমাকেও করতে দিবি না । নিজে তো বুড়ো হয়ে যাচ্ছি , সাথে সাথে তোর বোনটাকেও বুড়ি বানাচ্ছি । বিয়ে করবো কবে আমি ? বাচ্চা কাচ্চার মুখ দেখবো কবে ? আমার কি বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না,বল ? আমার কি বিয়ে হবে না ?
রাফি হেসে ফেললো ।
শান্ত এসেছে থেকে রুহির সাথে না করে হলেও হাজার বার কথা হয়েছে । এই দুদিনে একবারও বাড়ি থেকে বের হতে পারে নি বেচারি রুহি । রাফি নেই , শান্ত ও নেই । কার সাথে বেরোবে ও ? কলেজ ও যেতে বারন করে দিয়েছে রাফি । একেবারে ঘর বন্দি হয়ে পড়েছে ও । বিকেলের দিকে রাফির ফোনে ভিডিও কল করেছে রুহি । শান্ত আর রাফি দুজনের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর শান্ত নিজে থেকেই বললো….
” তোমার ভাইয়ার ক্যাফে টা কিন্তু বেশ সুন্দর,জান । কদিন পর নিয়ে আসবো তোমায় ।
রুহি গাল ফুলিয়ে অভিমানি স্বরে বলল…
” যাবো না, আমি । আপনারা থাকুন ওখানে , আমার কাছেও আসতে হবে না কাউকে । আমি একা আছি,একাই থাকবো ।
শান্ত কাঁচের দরজা ভেদে বাইরে তাকালো একবার । রাফির ফোনটা হাতে তুলে বাইরে যেতে যেতে বললো…

” রাগ করে না জানু , দাঁড়াও আমি তোমায় তোমার ভাইয়ার ক্যাফে টা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি । আপাতত এভাবে দেখেই আঁশ মিটিয়ে নাও । পরবর্তীতে নতুন কিছু অপেক্ষা করছে তোমার জন্য ।
শান্ত পিছন ক্যামেরা এদিক ওদিক করে ঘুরিয়ে সবটা দেখানোর চেষ্টায় রত । রুহি থমথমে মুখে দেখে যাচ্ছে সবটা । আচমকা স্ক্রিনে একটা মেয়ে ধরা পড়তেই ছলকে উঠলো রুহি । শান্ত ক্যামেরা সরিয়েছে । রুহি ফোনের দিকে ঝুঁকে কপাল কুঁচকে শুধালো….
” ঐ মেয়েটা কে ?
ফোন লাউড স্পিকারে থাকায় রুহির গলা পৌঁছে গেছে মাহির কান অবধি । অমনি তড়াৎ গতিতে আঁতকে উঠে তাকিয়েছে ও । সাথে সাথে চোখাচোখি হয়েছে শান্তর সাথে । শান্ত যেন এটারই অপেক্ষায় ছিলো । শান্তর মাহির দিক থেকে চোখ সরিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আন্দাজে উঁচু স্বরে বলল….
” তুমি কেমন আছো,জান ?
রুহি উত্তেজিত । শান্তর এমন প্রশ্ন ঠাট্টার ন্যায় লাগলো । ও পাত্তা দিলো না । বললো আবার…
” ঐ মেয়েটা কে, আগে বলুন ?
শান্ত ফের তাকালো মাহির উপরি উপরি শান্ত উদ্বিগ্ন মুখাবয়বের দিকে । কম্পিত চক্ষু জোড়ার দিকে । অতঃপর ফের রুহিকে শুধালো..

” আগে বলো তুমি কেমন আছো ?
” উফফফ , কি শুরু করলেন আপনি ? আমি কেমন আছি আপনি জানেন না ? দেখতেই তো পাচ্ছেন । ভালো আছি আমি , হয়েছে এবার ? এবার বলুন ঐ মেয়েটা কে ?
শান্ত সরে আসলো ওখান থেকে । মাহি মুচকি হেসে তপ্ত শ্বাস ফেললো । শান্ত কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে রুহি অন্তত শতবার প্রশ্ন করেছে ঐ মেয়েটা কে ? শান্তর উত্তর না পেয়ে রুহি রাগান্বিত বিরক্তি নিয়ে বললো…
” বলছেন না কেনো ঐ মেয়েটা কে ? দেখান আমায়,কে ও ? ঠিকমতো তো দেখতেও পারলাম না । অমন অল্প বয়সী মেয়ে , কি করছিলো ওখানে ?
শান্ত রাফির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো । রাফির সম্মুখে চেয়ারে বসতে বসতে বলল বাঁকা স্বরে…
” আসলে ও তোমার ভাইয়ার বন্দিনী , মানে এই ক্যাফের স্টাফ আর কি । কি বলোতো , তোমার ভাইয়া কে রোগে ধরেছে । ডাক্তার বলেছে ঐ মেয়েটার সাথে থাকতে । আই মিন, ঐ মেয়েটার মতো অল্প বয়সী মেয়ের কাছাকাছি থাকতে বলেছে ডাক্তার । এই জন্যই তো তোমার ভাইয়া এই ক্যাফে টা পার্সেস করেছে । বুঝলে ?
রুহি চোখ মুখ কুঁচকে ঠোঁট উল্টালো । শান্তর সব কথা মাথার উপর দিয়ে শাঁ করে চলে গেছে । শুধু মাথার উপর দিয়েই নয় , ছাদ ভেদ করে উপর আসমান দিয়ে ছাত্ করে চলে গেছে । বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে রুহি । রাফি ও চোখ সরু করে চেয়েছে শান্তর এহেন কথায় । দুই ভাই বোনের এমন মুখ ভঙ্গিমা দেখে মিটিমিটি হাসছে শান্ত ।
শান্তর হাসি দেখে রুহির ওর মশকরা বুঝতে বাকি রইলো না । ও বিরক্ত হয়ে ঠাস করে বললো দাঁত চেপে…

” আপনি একটা আস্ত পাগল….
” শুধু তোমার জন্য জান…
পাগল তো হয়েছি আঠারো বছর দশ মাস আগেই । এখন শুধু তোমায় বিয়ে করে পাগলামো করাটা বাকি । এখন একটু আধটু পাগলামো করি,, বিয়ের পর কিন্তু ফুল মেন্টাল হয়ে যাবো । সামলাতে পারবে তো ?
রুহি চোখ মুখ কুঁচকে কটমট করে বলে উঠলো..
” অসভ্য লোক,, পাবনায় পাগলা গারদে পাঠাবো আপনাকে । রাখুন ফোন , আমি কথাই বলবো না আপনার সাথে ।
বলেই ঝট করে ফোনটা কেটে দিলো । ফোন কাটতেই হো হো করে হেসে উঠলো শান্ত । হাসতে হাসতে রাফির দিকে চোখ তুলতেই রাফির কুঁচকানো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চোখে পড়লো । অমনি হাসি থামালো শান্ত । রাফি খসখসে ভাবে বললো….

” ভালো হবি না তুই ?
শান্ত বাচ্চাদের ন্যায় উপর নিচ মাথা নাড়ালো । আবার দুদিকে ও মাথা নাড়ালো । শান্ত কন্ঠে বলবো…
” সাত মাস ভালো ছিলাম , এতে হয় নি ? তোদের ভাই বোনের বিরহ যাতনা দেখে দম খিচে পেট চেপে রেখেছিলাম কোনো রকমে । বিশ্বাস কর পেটে খিল ধরে গেছে আমার , আর পারছি না । এবার একটু মন প্রাণ খুলে কথা বলতে দে ভাই । তোর বোনকে আর তোকে জ্বালানো হয় নি আজ কতদিন । মিস করছি তোদের জ্বালানো টা ।
” এমনিতেই জ্বলছি , তোকে আর জ্বালাতে হবে না ।
” খালি কি জ্বলছিস ,,? নিজের সাথে সাথে মিহি পাখি কেও তো জ্বালাচ্ছিস ।
” ও এতো দিন জ্বালিয়েছে আমায় , এখন ওকে একটু জ্বলতে দে । এই এক মাস ওকে জ্বলাবো আমি । ভীষণ ভাবে জ্বালাবো । ওকে জ্বলাবোও আমি , জ্বালানি কমাবো ও আমি ।

সময় বহমান , কাটছে ধীরে ধীরে ।
এপ্রিলের চৌদ্দ তারিখ , বাঙ্গালীর নববর্ষ । বাংলা সনের নতুন বছরের প্রথম দিন । বর্ষবরণে উৎকর্ষতা চারদিকে । জাফলং এর ছোট্ট অঞ্চল টাও মুখরিত । মনে হচ্ছে নতুন এক মুগ্ধকর সুগন্ধি ছড়িয়েছে চারপাশে । প্রশান্ত আবহাওয়া । ক্যাফেতে তো আজকাল ভিড় লেগেই থাকে । এক মাসের চুক্তিতে থেকে গেছে মাহি । নিজ ইচ্ছেতেই হয়তো , নতুবা ইচ্ছার বিরুদ্ধ হলে থাকতো না কখনো ‌। সকাল সকাল জমজমাট ভিড় । আজ ছেলে মেয়েদের জুড়ি’দের অভাব নেই । অধিকাংশ মেয়েদের পড়নে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি । ছেলেদের সাদা পাঞ্জাবি । মাহি বাইরে বেরিয়েছে আজ । সবাইকে এভাবে দেখে বেশ উপভোগ করছে ও । অধিকাংশের পড়নেই প্রায় একই রঙের পোশাক । দেখতে বেশ লাগছে । রাফি আসে নি এখনো । জারিফ আজ দেরি করে এসেছে । প্রতিদিন সবার আগে আসলেও আজ লেট । আরো দুজন স্টাফ বাড়ানো হয়েছে ক্যাফেতে । জারিফ এসে সবাইকে একসাথে দেখে মুচকি হাসলো । হাতে কোনো কিছুর বড় একটা প্যাকেট । প্যাকেট থেকে কিছু বের করতে করতে বললো….

” নতুন বছরের শুভেচ্ছা তোমাদের । হ্যাপি নিউ ইয়ার,, ও সরি , বাঙালিয়ানা বাদ পড়ে গেল । বাংলাতেই বলি । শুভ নববর্ষ সবাইকে…
বলতে বলতে প্যাকেট থেকে কতগুলো চকলেট বের করে একে একে ভাগ করে ধরিয়ে দিলো সবাইকে । শেষে মাহির দিকে এগিয়ে দিতেই মাহি বাঁধ সেধে শান্ত কন্ঠে বললো….
” আমি চকলেট খাই না, ভাইয়া ?
জারিফ যেন ভুত দেখার ন্যায় চমকে উঠলো । বললো আশ্চর্য হয়ে…
” সে কি ,, মেয়ে হয়ে চকলেট খাও না , এটাও সম্ভব ? আমি তো জানি মেয়েদের চকলেট অনেক পছন্দ ?
মাহির নরম জবাব…
” পছন্দ ছিলো এক সময় । এখন নেই । পছন্দের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে অনেক আগে । অনেক কিছুই বাদ পড়েছে । এখন আর সেসবে আগ্রহ জাগে না ।
জারিফ ঘাটলো না বেশি । শেষে প্যাকেট টা জেরিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল । মাহি ভেতরে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরতেই মুখোমুখি হলো রাফির । একদম কাছাকাছি সম্মুখে । আচমকা ওকে ওভাবে সামনা সামনি দেখে ভড়কে এক ধাপ পেছালো মাহি ‌ ‌। ধক্ করে উঠে শ্বাস টানলো । ঢোক গিললো শুকনো । রাফির তীক্ষ্ণ সরু দৃষ্টি মাহির উপর । ক্রমান্বয়ে তীক্ষ্ণতা বৃদ্ধি পেলো সেই দৃষ্টির ‌। মাহি নিজেকে ধাতস্থ করে দ্রুত পা চালাতে গেলে রাফি ডাকলো….

” দাঁড়াও…
দাঁড়ালো মাহি ‌। পিছু ফিরলো না । শ্বাস প্রশ্বাস বেগতিক ওর ‌। হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে দ্বিগুণ ‌। রাফি ওর কাছাকাছি দাঁড়ালো । শীতল কন্ঠে প্রশ্ন করলো…
” ভয় পেয়েছিলে ?
নত মস্তিষ্কে দুদিকে আলতো মাথা নাড়ালো মাহি । চোখ তুলে তাকানোর সাহস জাগলো না ‌। হৃৎস্পন্দন জোরালো হচ্ছে আরো । ওকে ওভাবে দেখে মুচকি হাসলো রাফি ‌। নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে আবারো বললো হাস্কি হীমশিতল কন্ঠে….
” ছুঁয়ে দাও আমায়…
তড়িতে চাইলো মিহি । চোখাচোখি হলো রাফির সাথে । দৃষ্টি এক হতেই আবারো তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরালো মেয়েটা । চোখ বুজে শ্বাস টানলো । বললো মিনমিনিয়ে….
” মা.. মানে ?
” ছুঁতে বলেছি আমায় । হাত ধরো । স্পর্শ করো আমায় ।
” কেনো ?
রাফি আরো একটু দুরত্ব ঘুচলো । পেছাতে চাইলো মাহি । তবে পেছালো না । চিবুক গলায় ঠেকিয়ে সিটিয়ে গেলো সে । রাফি বললো শীতল কন্ঠে…

” ভয় পেয়েছিলে তো ? কাউকে আচমকা দেখে ভয় পেলে তাকে স্পর্শ করে ভয় কাটাতে হয় । নিজে থেকে একবার স্পর্শ করো আমায়, ভয় কেটে যাবে ।
নাও হাত ধরো । ছুঁয়ে দাও একবার…
মাহি চোরা চোখে তাকাচ্ছে এদিক ওদিক । হালকা চোখ তুললো ও । ইতস্ততায় কাটলো কিছুক্ষণ । মাহি আর দাঁড়াতে পারছে না । এখানে রাফির সম্মুখে এভাবে থাকাটা সম্ভব হচ্ছে না আর । ও চোখ বুজলো ‌। কম্পিত হাত বাড়িয়ে দুই আঙ্গুলে স্পর্শ করলো রাফির হাতের উল্টো পিঠ । এক মুহুর্তেই বিদ্যুতের ন্যায় হাত সরিয়েছে মাহি । আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ায় নি । এক দৌড়ে ছুটে গেছে ভেতরের দিকে । ও চলে যেতেই রাফি হাসলো অল্প । ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করলো কিছু ।
পরমুহূর্তে দৃষ্টি সরিয়ে তাকালো নিজের হাতের দিকে । তার ব্লোসোমের স্পর্শ কৃত স্থান টায় আঙ্গুল ছোঁয়ালো । পরমুহূর্তে হাত তুলে নরম আবেশে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো ।

কিচেনে ঢুকেই বড় বড় শ্বাস ফেলছে মাহি । আর পারা যাচ্ছে না । নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আর কতো সামলানো যায় নিজেকে ? ছোট্ট একটা হৃদয়ে অবাধ্য অনুভূতি গুলো আর কতো পুষে রাখা যায় ? এই লোকটার সামনে যতো যেতে চাইছে না মাহি , এই লোকটা ততই সামনে চলে আসছে । মাহি যথাসম্ভব নিজেকে সংবরণ করে এড়িয়ে যায় রাফি কে , কিন্তু রাফি ? সে তো বারংবার চোখে ধরা পড়ে যায় । চুক্তিপত্র অনুযায়ী এই একটা মাস কাটতে আরো আঠাশ দিন । সবে দুটো দিন পেরোলো । এতেই নাভিশ্বাস উঠে গেছে । সহ্য ক্ষমতা কমে আসছে । মাহি না পারছে কিছু প্রকাশ করতে আর না পারছে পালাতে ।
বড় বড় শ্বাস ফেলে দরজার পাশের উঁচু তুলটায় বসলো মাহি । মাথার বেনি থেকে ছোট ছোট চুল গুলো ছুটে এসেছে । কপালের পাশে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুলছে সেগুলো । কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম মাহির । মাহি দুহাতে পুরো মুখ ঢেকে বসে রইলো কিছুক্ষণ । এলোমেলো ছুটে আসা চুল গুলো কানের পাশে গুজে উঠে দাঁড়ালো । হাতে কম্পন অনুভূত হচ্ছে ওর । ও দুহাত একসাথে করে মুঠো করলো । শ্বাস আটকে আসছে কন্ঠ নালিতে । মাঝে মাঝে হয় এমন । মাহি কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানি বের করলো । হাত ঠকঠক করে কাঁপছে ওর । কোন রকমে বোতলে পানি ঢেলে আবারো বসলো মাহি । ঢকঢক করে পুরো পানি টা শেষ করলো এক নিঃশ্বাসে ।

এদিকে বাইরে থেকে চকলেট খেতে খেতে গুনগুন করে ভেতরের দিকে ঢুকছিলো জেরিন । অকস্মাৎ একটা মেয়ের দিকে নজর পড়লো ‌। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি মেয়েটার পড়নে । কোমর ছাড়ানো চুলগুলো খুলে রাখা । পিছন থেকে মেয়েটাকে দেখে কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে গেলো জেরিন । মেয়েটা এদিক ওদিক তাকিয়ে সোজা পা বাড়ালো রাফির কেবিনের দিকে । মেয়েটা কে ওদিকে এগোতে দেখে মুখ গোল করে চেঁচিয়ে উঠলো জেরিন….
” এক্সকিউজ মি…?
ও হেলো ,, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন ম্যাডাম ?
মেয়েটা দাঁড়ালো । পিছন ফিরলো । জেরিন বৃহৎ নয়নে তাকালো মেয়েটার দিকে । কি সুন্দর মেয়েটা ! হালকা সাজ গোজ চেহারায় । মাঝ বরাবর সিঁথি । কপালে কালো একটা টিপ । ঠোঁটে হালকা ঠোঁট রঞ্জন । মেকাপ আছে অল্প স্বল্প । জেরিন হাঁ বনে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে গেল । মেয়েটা হালকা স্বরে শুধালো সন্দিহান কন্ঠে….

” আমাকে বলছেন ?
জেরিন একটু ভাবসাব নিয়ে গুরুগম্ভীর করলো নিজেকে । মুখের চকলেট পুরোপুরি গিলে বললো…
” আপনাকেই বলছি ! এখানে তো আর কেউ নেই ! তা ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন ?
ক্যাফে জোন বাইরে , আজ ভেতরটা লক । ভেতরে কি করছেন আপনি ?
” রুজান রাফি চৌধুরী ! ওনার সাথে দেখা করতে এসেছি !
জেরিন ভ্রু যুগল নাকের ডগা পর্যন্ত কুঁচকালো । চোখ সরু করে পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিলো মেয়েটা কে । চুপিসারে ভ্যাংচি কেটে বললো…
” কোথাকার কোন ঐশ্বরিয়া আপনি ? যে রুজান রাফি চৌধুরী আপনার সাথে দেখা করবে ? এপয়েনমেন্ট আছে রুজান রাফি চৌধুরীর সাথে দেখা করার ?
” মানে ?
” আরে ভাই… আবার মানে জিজ্ঞেস করছে দেখো ! বোঝেন নি ? বললাম রুজান রাফি চৌধুরীর সাথে দেখা করার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেয়েরা । আপনি তো দেখি লাইন ছেড়ে বেলাইনে চলে এসেছেন । আপনার তো সাহস কম নয় । কার পারমিশনে এখানে এসেছেন আপনি ? আমাদের সিংগার স্যার যার তার সাথে দেখা করে না…
বাইরের পথ ওদিকে । রাস্তা মাপুন দেখি ঝটপট ।

” এক্সকিউজ মি…
রুজান রাফি চৌধুরী আমার রিলেটিভ ! আমি জাস্ট ওনার সাথে মিট করতে এসেছি এখানে !
” ওওও বাবা…
রুজান রাফি চৌধুরীর রিলেটিভ আপনি ? তা কি হন রুজান রাফি চৌধুরীর ? খালা ,, ফুফু নাকি আম্মা ? নাকি মামি’মা ?
” হোয়াট? কি বলছেন যা-তা ?
মেয়েটা স্নিগ্ধ মুখখানা কুঁচকে খেকিয়ে উঠলো । জেরিন ও একই ভাবে বলে বসলো….
” যা-তা নয় ? এটাকে বলে কথা ! ওকে ? আপনি এখন বাইরে যান মামিমা ? ওসব ভাওতা বাজি করে দেখা করা যাবে না সিংগার স্যারের সাথে । উনি বিজি আছেন অনেক ।
মেয়েটা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লো । জেরিন একটু বেশি ভাবসাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মেয়েটা পাত্তা দিলো না আর । তপ্ত শ্বাস ফেলে দ্রুত পা চালালো রাফির কেবিনের দিকে । জেরিন হকচকিয়ে ডাকলো…
” আরে ঐ মামিমা..
ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন ? বাইরের রাস্তা এদিকে ! দেখে তো অল্প বয়সী সুন্দরী লাগছে , চোখের মাথা খেয়েছেন নাকি ?
ইতিমধ্যে মেয়েটা রাফির কেবিনে ঢুকে পড়েছে । জেরিন চেঁচাতে চেঁচাতে পিছু পিছু ঢুকে পড়েছে । রাফি কে একেবারে সামনাসামনি দেখে চুপসে গেল জেরিন । কপাল কুঁচকে এদিকটায় চেয়ে আছে রাফি । জেরিন মিনমিন করলো…

” দেখুন না সিংগার স্যার..
এই মেয়ে টাকে বারন করেছি আমি , কিন্তু ও আমার কথা শুনছেই না । জোর করে চলে এসেছে এখানে ।
রাফির মুখো ভঙ্গিমা অপরিবর্তিত । সে এবার তাকালো মেয়েটার দিকে । ক্ষিয় কাল তাকিয়ে থেকে অল্প স্বল্প হাসলো । মেয়েটার মুখে লাজুক আভা ফুটলো এতেই । সে এগোতে এগোতে নরম স্নিগ্ধ কন্ঠে বলল…
” কেমন আছেন ?
” ভালো ! তুমি ?
” জ্বি..আলহামদুলিল্লাহ !
” এখানে কি করছো ?
” নানু বাড়িতে এসেছি আজ বেশ কদিন হলো ! শুনলাম আপনি এখানে এসেছেন , তাই আজ আপনার সাথে দেখা করতে আসলাম আরকি !
জেরিন বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে । এই মেয়ে টাকে চেনে রাফি ? তারমানে মেয়েটা মিথ্যে বলছিলো না ? চুপসানো মুখখানা আরো বেশি ফাটা বেলুনের ন্যায় চুপসে গেল বেচারির । হাই তুললো জেরিন । এখন এখান থেকে মানে মানে কেটে পড়াই ভালো ! ও তো কম কিছু বললো না এই মেয়েটাকে । যদি রাফির কাছে নালিশ করে এখন ? তাহলে নিশ্চিত ধমকাবে রাফি !
জেরিন চোরের ন্যায় পিছু ফিরলো । পা বাড়াতে গেলে রাফি ডাকলো….

” এই মেয়ে…
জিভে কামড় বসালো জেরিন । ঢোক গিলে ঘাড় ঘোরালো । বোকা বোকা হাসলো । বললো বাধ্যের ন্যায়…
” জ্বি স্যার ? কিছু দরকার ?
রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো । ভাবলো বোধহয় কিছু । বললো তপ্ত স্বরে…
” ম্যাডামের জন্য এক কাপ স্পেশাল কফি নিয়ে এসো ! আর হ্যাঁ তুমি আসবে না ,, অন্য কাউকে পাঠাবে । কি বললাম ?
” জ্বি স্যার…আমি আসবো না,,, অন্য কাউকে পাঠাবো…
বলেই পা চালালো জেরিন । দূরে এসে হাঁফ ছাড়ল । কিচেনে গিয়ে মাহি কে বসা অবস্থায় দেখে জেরিন নেকি স্বরে বলল…
” মাহি রে…
স্যারের কেবিনে একটা কফি বানিয়ে দিয়ে আসবি প্লিজ ।
মাহি চোখ তুলে তাকালো । আধো চাহনি ওর । ও বললো ক্ষিন স্বরে….
” আমি পারবো না । তুই যা….
” স্যার যেতে বারন করেছে আমায় । রেহাও বাইরে । যা না প্লিজ ! জানিনা কে এসেছে ,, তার জন্যই কফি নিয়ে যেতে বলেছে….
মাহি চাহনি সূক্ষ্ম করলো । শুধালো….

” কে এসেছে ?
” আমি কি জানি ! একটা মেয়ে দেখলাম । বেশ সুন্দর । কি সুন্দর শাড়ি পরে এসেছে । স্যারের রিলেটিভ বোধহয় । স্যার মেয়েটার সাথে কি সুন্দর হেসে হেসে কথা বললো জানিস ? আবার আমাকে আদেশ করলো — ‘ম্যাডামের জন্য এক কাপ স্পেশাল কফি নিয়ে এসো, যাও’ !
শেষের কথাটা রাফি কে অনুকরন করে ওর মতোই গম্ভীর স্বরে বলল জেরিন । ফের বললো…
” কফি টা দিয়ে আয় না প্লিজ…
মাহি কিছু বললো না । চোখ নামালো । ভাবুক ভঙ্গিতে ভাবার চেষ্টা করলো, কিন্তু ভারী মাথায় কোনো কিছুই আর ভাবতে পারলো না । গলা শুকিয়ে আসছে বারবার । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে একটু । শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে , স্পষ্ট টের পাচ্ছে মাহি । জেরিন নিজেই কফি বানিয়ে ধরিয়ে দিলো মাহির হাতে । ফের অনুনয় করে বলল যাওয়ার জন্য । বলেই বেরিয়ে গেছে ও । এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির হয়ে থাকতে পারে না সে । মাহির হাতের কফির মগটা কাঁপছে । শরীরেও মৃদু কাঁপুনি । হাতে আর হাঁটুতে অত্যাধিক । তবুও টালমাটাল পায়ে হা করে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস টেনে ধীরে ধীরে এগোলো মাহি । আশপাশ টা কেমন ঘুরছে , ঘোলাটে হয়ে আসছে ।

তবুও এগোলো মেয়েটা । কেবিনে ঢোকার আগে আরো কয়েক বার জোরে জোরে শ্বাস টেনে সামলে নিলো নিজেকে । দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই রাফির হাসি হাসি মুখটা ঝাপসা চোখে ধরা দিলো । রাফির ঠিক সামনে পিছন ফিরে একটা মেয়ে বসা । মুখটা দেখা যাচ্ছে না । মাহি এগোলো । রাফি একবার চোখ তুলে তাকিয়ে অবিলম্বে চোখ সরিয়েছে মাহির থেকে । মাহি মেয়েটার দিকে তাকিয়েই এগোলো । ডেস্কের কাছে গিয়ে হাতের কফি টা রাখলো । মেয়েটার মুখখানা দেখেই আধো চোখ বৃহৎ হলো মাহির । মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হতেই এক কদম পেছালো মাহি । বিড়বিড় করলো অস্পষ্ট স্বরে…
” ল…লিনা আপু ?
মাহির বিড়বিড়ানো শুনতে পায় নি কেউ । লিনা অবাক লোচনে মাহির দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়ালো । এক গাল হেসে উৎসুক হয়ে বললো….
” আরে মিহি ? তুমি মিহি না ? কেমন আছো ? আর তুমি এখানে কি করছো ?
মাহি জবাব দিলো না । পেছালো আরো এক কদম । এবার তাকালো রাফির দিকে । দীর্ঘ শ্বাস টানলো একটা । রাফি ডেস্কের উপরের ছোট্ট গ্লোব টা এক হাতে নাড়াচাড়া করছে । যেনো এদিকে মনযোগ নেই ওর ।
লিনা আবার বললো…

” কি হলো মিহি ? কেমন আছো বলো ?
” ও মিহি নয়… মিহির মতো অন্য কেউ !
রাফির ঝাঁজালো তপ্ত আওয়াজ । চকিতে চাইলো লিনা । মাহির সাথে দৃষ্টি বিনিময় চলছে রাফির । মাহির চোখে চোখ রেখেই রাফি ফের বললো…
” উনি জাস্ট আমার ক্যাফের একজন সামান্য স্টাফ । ওনার সাথে মিহির তুলনা দিও না, লিনা ।
লিনা অবাক স্বরে বলল…
” কি বলছেন রাফি ? ও মিহি নয় ?
” না…
লিনা হাঁ বনে তাকালো মাহির দিকে । একটু এগিয়ে বললো..
” কি অদ্ভুত ! একটা মানুষের সাথে আর একটা মানুষের চেহারার এতোটা মিল থাকতে পারে ? ও তো অবিকল মিহির মতো দেখতে….
” মিহির মতো দেখতে হলেই মিহি হওয়া যায় না । হলে তো হয়েই যেতো । তোমাকে অতো ভাবতে হবে না , তুমি বসো ! অনেক দিন পর দেখা তোমার সাথে ,, আজকাল তো আমাদের বাসায় যাও না আর । ভুলেই গেছো আমাদের ? আমাকেও ভুলে গেছো ?
লিনা মাথা নুইয়ে লাজুক হাসলো । মাহির দিক থেকে মনযোগ সরে গেছে ওর । ও আর ঘাটলো না এই নিয়ে । ঘাটার ইচ্ছে ও জাগলো না । ওর মন তো প্রজাপতির ন্যায় উড়ছে । এই প্রথম রাফি এভাবে কথা বলছে ওর সাথে । তাও নিজে থেকে । আগে যতবার রাফির সম্মুখীন হয়েছে , ততবার নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে কথা বলতো লিনা । রাফি শুধু গম্ভীর ভাবে কথার উত্তর করতো । অতিরিক্ত কোনো আন্তরিকতা দেখিয়ে কথা বলতো না । এই প্রথম বললো ।

লিনার নানু বাড়ি সিলেটে । বেশ কদিন আগে এসেছে ও । আসার পর রাফির এই ক্যাফের সম্পর্কে শুনে নিজেকে আটকে রাখতে পারে নি । নববর্ষে রাফির সাথে দেখা করার জন্য শাড়ি পরে এসেছে ও । যদিও সন্দেহ ছিলো রাফি ওকে এড়িয়ে যাবে । তবে হিতে বিপরীত হলো । রাফির এমন ভাবগতিকে আশ্চর্য কম আকাশ থেকে পড়ল যেনো ও । লিনা বেশ রসিয়ে রসিয়ে কথা বলছে । রাফির কথার প্রতি উত্তরে ও পুনরায় বসতে বসতে মিনমিন করে বলল….
” আপনাকে আর ভুললাম কোই ?
রাফি দুদিকে মাথা নাড়লো নিঃশব্দে । বাঁকা চোখে তাকালো মাহির দিকে । যে এখনো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে মাহি । দৃষ্টি কম্পমান । রাফি এবার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । মাহির চোখে মুখে ঘাম বিন্দু বিন্দু । স্পষ্ট তা । রাফি ঢোক গিলে কন্ঠ শক্ত করে বললো…
” আপনি কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন , নাকি বাইরে যাবেন ? বাইরে যান ,,,‌ ম্যাডামের সাথে পার্সোনাল কথা আছে আমার….

মাহি দাঁড়াতে পারলো না আর । কাঁপা পায়েই এক ছুটে বেরিয়ে আসলো । বাইরে বেরিয়েই মাথা চেপে ধরলো এক হাতে । শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণ । গলায় কোথাও আটকে আসছে নিঃশ্বাস । ঘাম ছুটছে পুরো শরীরে । কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে । চোখের সামনে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু । গুলিয়ে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে । মাহি ঘন ঘন শ্বাস টেনে কুলাতে পারছে না । দম ফুরিয়ে আসছে । টলে টলে কোনো রকমে কিচেনে গিয়ে থামলো মাহি । বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢাললো কোনো রকমে । কিচেন কেবিনেটে এক হাত ঠেসে কোনো রকমে সেখানে ভর ছাড়লো শরীরের । অন্য হাতে পানির গ্লাস হাতে তুলে নিয়ে মুখ সম্মুখে নিয়ে যাওয়ার আগেই সম্পুর্ন শরীর টলে পড়লো মাহির । শ্বাস আটকে শরীরের ভার ছেড়ে হাঁটু ভেঙ্গে মেঝেতে গড়িয়ে পড়লো মেয়েটা । হাতের কাঁচের গ্লাস মার্বেল পাথরের মেঝেতে পড়ে ঝড়ঝড়িয়ে ঝনঝন শব্দ তুলে ভেঙে টুকরো টুকরো এক নিমিষেই ।

এদিকে মাহি বেরোনোর সাথে সাথে হাতে ল্যাপটপ তুলে নিয়েছে রাফি । ল্যাপটপের স্ক্রিন ওপেন করতেই সিসি টিভি ফুটেজে মাহি কে ওভাবে টলে পড়তে দেখে আঁতকে উঠলো সে । বক্ষ স্থল ছ্যাঁত উঠেছে ওর । হৃৎস্পন্দন থেমে গেছে এক মুহুর্তের জন্য । রাফি ছলকে উঠে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো । ল্যাপটপ হাত থেকে পড়ে গেছে ওর । সেদিকে খেয়াল নেই রাফির । সে খেই ক্ষুইয়ে দিকবিদিক হারিয়ে ছুট লাগালো বাইরের দিকে । আচমকা রাফি কে ওভাবে ছুটতে দেখে চমকালো লিনা । ঝট করে উঠে দাঁড়ালো ও নিজেও ‌।
কিচেনের মেঝেতে পড়ে আছে মাহি । চোখ দুটো এখনো আধো খোলা ‌। ঝাঁপসা চোখে রাফি কে নিজের দিকে ছুটে আসতে দেখে এক চিলতে হাসি ফুটলো মাহির ঠোঁটের কোণে । এবার পুরোপুরি বন্ধ হলো ভিজে অক্ষি যুগল‌‌‌ ‌। রাফি ছুটে এসে থেমেছে কিচেনের দরজায় । বৃহৎ নয়নে মাহিকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে শুল্ক ঢোক গিললো রাফি । পা স্লিপ করে হুড়মুড়িয়ে বসলো মাহির মাথার কাছে । ওর শরীর টা নিজের দখলে আগলে নিয়ে ডাকলো উত্তেজিত কন্ঠে….

” মিহি…? এই…? কি হলো তোমার ? চোখ খোলো ? মিহি ? এই মেয়ে,,, উঠো প্লিজ…..
মাহির শরীরটা ঝাঁকানোর সাথে সাথে নড়ে উঠলো পুরোপুরি । রাফির চিৎকারে বাইরে থেকে ছুটে এসেছে সবাই । লিনা তাজ্জব বনে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে । রেহাও হুমড়ি খেয়ে বসলো । ডাকলো ও….
” মাহি ,, কি হলো তোর ? এই মাহি ,,, চোখ খোল…
রাফির ধ্যান জ্ঞান শূন্য হয়ে আসছে । হাঁসফাঁস করছে ও । হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে পানির বোতল তুলে নিয়ে মাহির চোখে মুখে পানি ছেটালো রাফি । পানির ছেটায় মুখ একটু কুঁচকালো মাহি । তবে চোখ খুললো না । রাফি পানির বোতল টা ছুড়ে ফেলে মাহির গালে আলতো চাপড় মেরে ডাকলো করুন স্বরে…
” মিহি ? এই মিহি ? প্লিজ ওঠো ,,, চোখ খোলো । এই দেখো আমি এখানে আছি ! প্লিজ ওঠো না…
মাহির তবুও সাড়াশব্দ না পেয়ে এবার উঠে দাঁড়ালো রাফি । একটানে মাহির নেতিয়ে পড়া নিথর শরীর টা কোলে তুলে নিলো । পিছনে দরজার কাছে সবাই মূক বনে তাকিয়ে আছে । রাফির এমন উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত ভাবগতিক ঠাহর করতে পারছে না ওরা । তাও আবার মাহির প্রতি ।
রাফি মাহি কে কোলে তুলে এগোতে এগোতে হুংকার ছাড়লো…..

” কল দ্যা ডক্টর…. ফাস্ট !!!
শান্ত উপস্থিত সেই মুহূর্তে । রাফির এমন উদ্বিগ্ন অবস্থা আর মাহির দশা দেখে ও আর এগোয় নি । বড় হসপিটাল নেই এই ক্ষুদ্র স্থানে । হসপিটালে যেতে হলে মেইন শহরে যেতে হবে । এতে অনেক সময়ের প্রয়োজন । যা হাতে নেই । তবে ভাগ্যক্রমে পাশের জনবসতিতে একজন ডাক্তারের বাড়ি । নিহার দের বাড়ির পাশেই তার বাড়ি ।
নিহার কে সাথে করে সেই ডাক্তার কে বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের মাথায় তুলে এনেছে শান্ত । ডাক্তারের পড়নে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি । গলায় স্টেথোস্কোপ । চুপসানো মুখে জড়তা নিয়ে কোনো রকমে ক্যাফের এতো গুলো মানুষের সামনে দিয়ে হেঁটে রাফির কেবিনে ঢুকেছে ডাক্তার । কেবিনের একপাশে বড় সোফা টায় শোয়ানো মাহি । রাফি এখনো উদ্বিগ্ন হয়ে ডেকেই যাচ্ছে ওকে । রেহা পায়ের কাছে বসে । জেরিন দাঁড়িয়ে মাথার কাছে । রাফি মাহির এক হাত নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে কাতর উদ্বিগ্ন নেত্রে চেয়ে আছে ।
অচেতন অবস্থায় ঘন ঘন শ্বাস টানছে মাহি । ডাক্তার পর্যবেক্ষণ করে শান্তর দিকে ফিরে বললো…

” উনি বোধহয় ডিপ্রেস্ড !
অতিরিক্ত ডিপ্রেশন থেকেই প্যানিক অ্যাটাক এসেছে ।
” ও চোখ খুলছে না কেনো ?
রাফির শান্ত বাক্যে ডাক্তার পিছু ফিরলেন । রাফি কে দেখে মুচকি হাসলেন । ভালোভাবে পরখ করলেন রাফি কে । বললেন…
” শরীর উইক ওনার । আমি কিছু ভিটামিন সাজেস্ট করে দিচ্ছি । সেসব ঠিকমতো খাওয়ালে উইকনেস কেটে যাবে ধীরে ধীরে । অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে প্যানিক অ্যাটাক এসেছিল ।
আপাতত নার্ভ সিস্টেম নরমাল আছে । চিন্তার কোন কারন নেই । কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে ‌। তবে বেশি প্রেসার ক্রিয়েট না করাই ভালো ওনার উপর , বলে দেবেন ওনার ফ্যামিলি মেম্বার কে । আই থিংক ওনার এ্যাজামাও আছে । শ্বাস নিতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছেন । ইনহেলার ব্যবহার করা প্রয়োজন ওনার । সবসময় সাথে রাখবেন । ইনহেলার মাস্ট ওনার জন্য…
ডাক্তার থামলেন । শান্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো….

” থ্যাঙ্ক ইউ…
আপনি আসতে পারেন এখন ।
ডাক্তার কাচুমাচু হয়ে ফিরলেন শান্তর দিকে । নিজের দিকে তাকালেন একবার । মনে পড়লো বাইরের মানুষ জন কিভাবে চেয়ে ছিল ওনার দিকে । উনি বললেন নিচু স্বরে…
” এভাবেই বাইরে যাবো ? না মানে , যদি গাড়ি করে রেখে আসতেন, তাহলে ভালো হতো আরকি…
শান্ত অবস্থা বুঝে নিহারের দিকে তাকালো । ওকে ইশারা করলো নিয়ে যাওয়ার জন্য । নিহার ইশারার আদেশ তামিল করলো । ডাক্তার গেলো ওর পিছু পিছু । দুজন বেরোতেই হালকা ফাঁকা হলো কেবিন । শান্ত এবার জারিফ আর জেরিন কে ইশারা করে বললো বাইরে যাওয়ার জন্য । বাইরে কাস্টমার লাগাতার । বাকি দুজন হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন সামলে নিতে ‌। জারিফ আর জেরিন দেরি করলো না । মাহি কে আর এক পলক দেখে বেরিয়ে গেল ওরা ।
রেহা এখনো গুটিয়ে বসে আছে মাহির পায়ের কাছে । দৃষ্টি কাতর ওর । কাতর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাহির অবচেতন মলিন মুখ খানার পানে । সবাই বেরোতেই রাফি শান্ত স্বরে রেহা কে উদ্দেশ্য করে বললো….

” তুমিও যাও…
চকিতে তাকালো রেহা । রাফির কথাটা বোধগম্য হতে সময় লাগলো । ও যাবে মানে ? মাহি কে এখানে একা রেখে ? যত যাই হোক মাহি একটা মেয়ে । আর ওকে এভাবে এই অবস্থায় রাফি আর শান্তর কাছে একলা রেখে যেতে মন সায় দেয় কিভাবে ? ইতস্তত হলো রেহা । হাত কচলে মিনমিন করলো….
” কিন্তু স্যার , মাহি ….
রাফি বুঝলো ওর ইতস্ততার কারন । পূর্ণ দৃষ্টি পাত করলো এবার রেহার দিকে ‌। আশ্বাস জুগিয়ে শান্ত স্বরে বলল….
” চিন্তা নেই ,, কিচ্ছু হবে না । ও তোমার কাছেও অতটা সেইভ থাকবে না, যতটা আমার কাছে থাকবে । আসতে পারো তুমি…
রেহা তবুও বসে থাকলো কিছুক্ষণ । ইতস্তত হয়েই উঠে দাঁড়ালো ‌ । বারবার তাকিয়ে দেখলো মাহি কে । অতঃপর ধীর পায়ে স্থান ত্যাগ করলো ‌। শান্ত এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল । ও এবার বসলো ইজি চেয়ারে । ঠোঁট কামড়ে তাকালো রাফির কর্মকান্ডের দিকে ‌।
রাফি বিমোহিত দৃষ্টিতে চেয়ে তার ব্লোসোমের দিকে । ও মাহির হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে । একটু ঝুঁকে মাহির কপালের এক পাশে নিজের কপাল ঠেকালো । কানের কাছে মুখ গুজে শ্বাস ফেললো চোখ বুজে । অধর বাড়িয়ে ফিসফিস করলো…

এক দেখায় পর্ব ৩৮

” সরি সরি সরি…
সরি মাই ডিয়ার ব্লোসোম । ক্ষমা করে দাও আমায় । সব আমার জন্য হয়েছে তাই না ? সরি জান….
পিছন থেকে শান্ত ঠোঁট চেপে টিপ্পনি মারলো….
” অচেতন অবস্থার সুযোগ নিচ্ছিস মেয়েটার । ফায়দা লুটছিস ? ভ্যারি ব্যাড ব্রো… তবে সমস্যা নেই । চালিয়ে যাও শালা বাবু । যদি বলিস তাহলে বাইরে যাবো আমি ? না মানে তোকে একটু সুযোগ করে দিতাম আর কি…

এক দেখায় পর্ব ৪০