Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৪২

এক দেখায় পর্ব ৪২

এক দেখায় পর্ব ৪২
সুরভী আক্তার

” অবশ্য সম্বন্ধ নিয়েই এসেছি এখানে । এই মেয়ে ,, মটরসাইকেলের ট্যাঙ্কি ফাঁকা । তেল শেষ । হেঁটেই যেতে হবে , বলতো এখান থেকে রঞ্জু শাক্যের বাড়ি টা কতোদূর ?
রেহা চমকালো । চকিতে বৃহৎ নয়নে তাকালো মিহির দিকে । সাথে সাথে মিহিও তাকিয়েছে । চোখাচোখি হয়েছে দুই বান্ধবীর । মিহি চোখ সরিয়ে শুধালো…
” ওনার বাড়িতে কি দরকার আপনাদের ?
ছেলেটা বোধহয় বিরক্ত হলো । ক্যাট ক্যাটে স্বরে বলল…

” কোইলাম না , সম্বন্ধ নিয়ে আসছি । দেখতে আসছি মেয়েকে । মেয়ে পছন্দ হলে বিয়া করমু ঐ বাড়িতে ।
রেহা ভিমড়ি খেলো । কেশে উঠলো খুক খুক করে । ছেলেটার চাহনি সূচালো হলো আরো । আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না । একহাত কোমরে গুজে বললো….
” যক্ষ্মা ধরছে তোমার ? কাশো ক্যান ?
কথা বলতে পারো না । চিনে থাকলে তাড়াতাড়ি ঠিকানা দাও , তোমাদের থোবড়া দেখার সময় নাই আমার । আমার হবু বউয়ের থোবড়া খানা দেখার জন্য মন আনচান করতেছে । জলদি কথা কও….
রেহা তাজ্জব । ও দেখেই যাচ্ছে ছেলে টাকে । ছেলেটা বেশ সুন্দর ‌। লুঙ্গি পড়ায় বেশ অন্য রকম লাগছে । মিহি রেহার মুখো ভঙ্গিমা দেখে হাসলো ঠোঁট চেপে । শুধালো আবার…
” আপনি বিয়ে করতে এসেছেন ?
” হ , দেখে মনে হয় না ? বর বর লাগে না আমারে ?
মিহি উপর নিচ মাথা ঝাকালো । প্রশ্ন করলো…
” বউকে পছন্দ হয়েছে আপনার ?
এঁকেন কপাল জড়ো করলো । পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মিহির দিকে । এবার দুহাতই কোমরে রাখলো ।

” বউরে তো দেখিই নাই এখনো !
” কে বললো দেখেন নি ? এই যে আপনার বউ !
রেহা কে ইশারা করে বললো মিহি । এঁকেন তৎক্ষণাৎ তাকালো রেহার দিকে । মিহি আবারো বললো…
” ওকেই দেখতে এসেছেন আপনারা । ওই তো রঞ্জু শাক্যের মেয়ে । রেহা শাক্য ।
এঁকেন মুখ প্রসস্থ করে আগা গোড়া পরখ করলো রেহা কে । রেহা এখনো মূক বনে তাকিয়ে আছে পাথরের ন্যায় । ছেলেটা প্রশ্ন ছুঁড়লো মিহির উদ্দেশ্যে..
” সত্যি বলছো ? এই টাই আমার বউ ? এরেই দেখতে আসছি ?
” হুম ! একদম সত্যি ! বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিয়ে বাড়িতে চলুন , বাড়িতে গিয়ে বউ রুপে ওকেই দেখবেন ।
এঁকেন রেহা কে ভালো ভাবে দেখে বললো ভনীতা হীন সোজাসাপ্টা…
” ছেমড়ি সুন্দর আছো । এই লাইগা তোমারে দেখার পর বউ বউ লাগতাছিলো । পছন্দ হইছে তোমারে । এই বিয়ে পাক্কা । বিয়ে করবো তোমায় । চলো,, বিয়ে করে ফেলি ! বিয়ে করবা আমায় ? পছন্দ হইছে ?
রেহা তাজ্জবের চরম সীমানায় । মুখ ফাঁক হাঁ হয়ে । কি বলছে এই ছেলেটা ? এভাবে কে কথা বলে ? মিহি হাসছে মিটিমিটি । ছেলেটা সোজাসাপ্টা হুড়ো মনের । রেহার সাথে বেশ ভালো মানাবে ! একজন চুপচাপ , অন্যজন চঞ্চল হলে মন্দ হয় না !
রেহার দুর্বোধ্য ভাবভঙ্গি দেখে ছেলেটা হাত উঁচিয়ে তুড়ি বাজালো ওর মুখের সামনে । বললো…

” কি হলো ? বিয়ে করবা আমায় ?
রেহা আর দাঁড়ালো না এক মুহুর্ত । মিহির হাত চেপে ধরে ” চল মাহি… বলে দ্রুত পা চালালো এঁকেনের সামনে থেকে । এঁকেন বিভ্রান্ত হলো একটু । পরমুহূর্তে গলা বাড়িয়ে বললো…
” বাড়িতে গিয়ে বউ সেজে তৈরি হও বউ , আমি আসতাছি তোমার কাছে । বিয়া করলে কিন্তু তোমারেই করমু ।
চোখ ফিরিয়ে পিছু ঘুরে গলা বাড়ালো আরো…
” ঐ জগু ,, তোর ভাবিরে পাইছি । পছন্দ হইছে আমার । পটকা ফাটা রে । বিয়ে করমু আমি….

সকাল দশটা । রেহা ঠোঁট উল্টে বসে আছে ক্যাফের ভেতর ! পাশে জারিফ, নিহার, জেরিন,মিহি সবাই । মিহি গালে হাত দিয়ে টেবিলের দিকে হেলে তাকিয়ে আছে ওর পানে । ও জানে কিছু মিছু । বাকিটা এখন শুনবে রেহার মুখে । বাকিরা কেউ জানে না । ওরা আগ্রহী হয়ে উৎকর্ষতা নিয়ে চেয়ে আছে রেহার পানে । অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে ক্যাট ক্যাট করে উঠলো জেরিন…
” উফফফ … কিছু বলবি ? আর কতোক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকবো তোর দিকে বলতো ? এতক্ষণ ধরে তোর ফর্সা মুখের তেত্রিশ টা তিল সব গুনে ফেললাম ! আর গোনার মতো কিছু নেই । এবার বল বোইন কি হয়েছে ?
রেহা শ্বাস ফেললো তপ্ত । বললো হুতাশ হয়ে…
” কি আর হবে ? ঠিক হয়েছে বিয়ে ?
সাথে সাথে লাফিয়ে উঠলো সবাই । মিহি আজ বেশ খুশি খুশি । ও গদগদ হয়ে বলল…
” সত্যি রেহা ? কবে ?
” পনেরো দিন পর !
” কি বলিস এতো দেরি ?
জেরিনের প্রশ্নে রেহা তাকালো ওর দিকে । বললো অতঃপর…

” বিয়ে তো কালকেই হয়ে যেতো । কিন্তু, আমি ওনার কাছে সময় চেয়েছিলাম । উনি দিয়েছেন সময় । ভাবিনি দেবেন !
” উনি মানে ,, তোর হাসবেন্ড ?
” হুম ! ফিউচার হাজবেন্ড !
জেরিনের কৌতুহল বাড়লো । রয়ে সয়ে শুধালো…
” তা তোর ওনাকে কেমন দেখতে রে ? বল না ?
রেহা উত্তর করলো না । মাথা নোয়ালো লাজুকতায় । ওর হয়ে উত্তর করলো মিহি…
” আমি দেখেছি ,, অনেক সুন্দর আমাদের রেহার হাজবেন্ড । ওরা একদম মেইড ফর ইচ আদার ‌। খুব মানাবে ওদের , দেখিস !
রেহা হাসলো মুখ নামিয়ে ।
আজ মিহিও হাসছে একটু আধটু । এতো দিনে ওর ঠোঁটে হাসি দেখলো রাফি । কৃত্রিম নয় এটা । ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেই অকৃত্রিম স্নিগ্ধ হাসি টার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে এক জোড়া স্থির দৃষ্টি ‌। দৃষ্টি জোড়ার মালিকের ঠোঁটের কোণে ক্ষিন হাসি । অক্ষিপটের সাথে ক্রমান্বয়ে প্রসস্থ হচ্ছে ওষ্ঠ যুগল ‌।
ওদের ওখানে বসে থাকার মাঝেই একটা পুরুষালি হাসির শব্দ কানে ঠেকলো । কন্ঠ টা পরিচিত । শান্ত এসেছে । সবাই নড়ে চড়ে চকিতে তাকালো দরজার দিকে । একই সাথে বেশ কজন । ওদিকে তাকিয়েই উঠে দাঁড়ালো রেহা আর জেরিন । শান্তর সাথে আরো কজন । একটা ছেলে আর দুটো মেয়ে । একটা পিচ্চিও আছে ।
ছলকে উঠলো মিহি । ভিমড়ি খেয়ে এক ঝটকায় দাঁড়ালো ও । বিড়বিড় করলো মুখে..

” পাখি ?
বৃহৎ নয়ন জোড়া ছলছল করে উঠলো মিহির । দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেছে ওরা । রাফি ও বেরোলো ওর কেবিন থেকে ‌। মিহি আর দাঁড়াতে পারলো না । তাকালো না কোনো দিকে । এক পা এক পা করে সবার থেকে পিছিয়ে নিঃশব্দে ছুটে কিচেনে ঢুকলো । রাফি কে দেখে মুচকি হাসলো রুহি । শান্ত কে ভেংচি কেটে জড়িয়ে ধরল রাফি কে । আদুরে গলায় বলল…
” কেমন আছো ভাইয়া ?
রাফির উত্তর করার আগেই শান্ত বলে উঠলো…
” ও তেরি,,, দুদিন আগেই তো ভাইয়া কে দেখলে ! রোজ রোজ কথাও বলো , এখন আবার জিজ্ঞেস করছো ও কেমন আছে ? আমি তো অসুস্থ , হাত ভেঙ্গে হাঁটতে পারছি না , কোই আমায় তো একবারও জিজ্ঞেস করো না আমি কেমন আছি ?
চোখ উল্টালো রুহি । বললো গাঁ ছাড়া ভাবে…
” হাত ভাঙ্গলে হাঁটতে পারে না কে শুনি ? আমার ভাইয়া কে আমি দেখেছি সেই দুদিন আগে , আপনাকে তো রোজ প্রতিটা মুহূর্ত চোখের সামনে দেখছি । কেমন আছেন সেটাও দেখছি ! বেশ তো যত্নে আছেন আপনি । কোন দুঃখে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে যাবো ?
রাফি থামালো ওদের…

” থামবি তোরা ? এসেই শুরু করে দিয়েছিস ?
মেহজাবিন নালিশ করলো…
” আর বলো না ভাইয়া । ওরা পুরো রাস্তা ঝগড়া করতে করতে এসেছে ।
” এটাকে ঝগড়া বলে না ব্যাহনা !! ইটস্ কলড.. লাভ ফাইট ।
রুহি চোখ মুখ উল্টে ভেঙ্গালো ওকে । রাফি তাকালো আড়চোখে এদিক ওদিক । পাশে জারিফ, নিহার, জেরিন আর রেহা কে নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পূর্ণ দৃষ্টি পাত করলো ওদের দিকে । চোখ ফিরিয়ে বললো…
” বস তোরা । জার্নি করে এসেছিস । ঠান্ডা ঠান্ডা কিছু খেয়ে ফ্রেস কর নিজেদের ।
মেহজাবিন,রুহি, এদিক ওদিক তাকালো । রেহা আর জেরিন কে দেখে ভ্রু কুঁচকালো রুহি । সামনের টেবিলে বসতে বসতে জেনি উদ্বিগ্ন স্বরে বলল…
” এটা তোমার ক্যাফে ভাইয়া ?
হাসলো রাফি । উত্তর করলো…
” হুম !
” তার মানে এখানে সবকিছু আমরা ফ্রিতে খেতে পারবো ?
” উহুম জেনি বুড়ি , টাকা দিতে হবে । কারোর জন্যই ফ্রি সার্ভিস নট এ্যালাউড !
শান্তর কথায় পাত্তা দিলো না রাফি । মোলায়েম স্বরে বললো জেনি কে…
” কি খাবি ?
জেনি ফটাফট বললো সে কি কি খাবে । ফাস্ট ফুড সব । রাফি জারিফের দিকে ফিরে বললো…

” ওরা কি কি খেতে চায় , নিয়ে এসো ।
আদেশ তামিল করলো জারিফ । ও আর নিহার বেরিয়ে গেলো বাইরের দিকে ।
জেরিন,রেহা দাঁড়িয়ে এখনো । রাফি না তাকিয়ে আদেশ করলো….
” আমাদের জন্য কোল্ড কফি নিয়ে এসো তোমরা । যাও…
রেহা আর জেরিন কিচেনে ঢুকতেই আতঙ্কিত অবস্থায় মিহি কে দেখতে পেলো । কোণে দাঁড়িয়ে আছে ও । চোখ মুখের ভঙ্গিমা অদ্ভুত । ঘামছে ও । কপাল গড়িয়ে চিবুক বেয়ে গড়াচ্ছে তা । মিহি জেরিন আর রেহা কে দেখে ধাতস্থ করলো নিজেকে । স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো । জেরিন আর রেহা কপাল কুঁচকে তাকালো একে অপরের দিকে । রেহা এগিয়ে শুধালো…
” মাহি ‌!! কি হয়েছে তোর ? ঘামছিস কেনো এভাবে ? ঠিক আছিস ?
মিহি ঘাম মুছলো ফের । গলা ভিজিয়ে আধো স্বরে বলল…

” হুম ! কি হবে আমার ?
জেরিন কাজে হাত লাগাতে লাগাতে বললো…
” স্যারের ফ্যামিলি মেম্বার বোধহয় ওনারা ! মেয়ে টাকে দেখলি ? কি সুন্দর না ? ও বোধহয় স্যারের বোন ! ভাইয়া বলে ডাকলো তো !
রেহা মুচকি হাসলো । সম্মতি দিলো জেরিনের কথায় । মিহি কে রেখে ওরা বাইরে এসে কফি সার্ভ করে দিলো সবাইকে । খাবার ও এসেছে বাইরের কর্নার থেকে ।
সবাইকে কফি দিয়ে জেরিন আর রেহা কিচেনের দিকে পা বাড়াতে গেলে বাধা দিলো রাফি….
” ওদিকে যেতে হবে না তোমাদের ! বাইরে যাও তোমরা ।
রেহা আর জেরিন কথার পরিপ্রেক্ষিতে বললো না কিছু । বাইরে বেরিয়ে গেল ওরা ।
রুহি টুকটাক বক বক করছে । বাকিরা শুনে যাচ্ছে । রাফি এক ধ্যানে এক দিকে চেয়ে আছে । চোয়াল খানিক শক্ত ওর । মাথায় অনেক কিছুই চলছে । এবার সেসব ঘটানো বাকি । শান্ত বারবার তাকাচ্ছে ওর দিকে । পলকের মাঝে এক পলক করে তাকাচ্ছে কিচেনের দিকে ।
টেবিলের উপর ছোট্ট ডেস্ক বেল । রাফি একই অবস্থায় থেকে হাত বাড়িয়ে বাজালো সেটা । যার শব্দে চমকে উঠলো কিচেনে থাকা মিহি । ও তো লুকিয়ে । লুকানোর চেষ্টা করছে নিজেকে । বেরোবে না ও ।
রাফি পরপর দাঁত চেপে বেল বাজিয়ে যাচ্ছে । শক্ত থেকে শক্ততর হচ্ছে মুখো ভঙ্গিমা । রুহি কপাল কুঁচকালো । শুধালো সন্দিহান হয়ে…

” কিছু প্রয়োজন ভাইয়া ?
রাফি উত্তর করলো না । সে একই কাজে রত । কিচেনে কান চেপে ধরল মিহি । এই রেহা আর জেরিন কোথায় কে জানে ?
মিহি কান ছেড়ে হাঁফ ছাড়ল । শ্বাস টানলো জোরে ‌। ঢোক গিলে দরজা থেকে উঁকি দিলো একটু । অমনি রাফির তীব্র কন্ঠ স্বর । যা ওকে উদ্দেশ্য করেই….
” ডাকছি আমি । কানে যাচ্ছে না কারোর ?
চমকে উঠলো মিহি । ভেতরে দিকটায় কেউ নেই । রাফির আচমকা এমন গর্জে ওঠায় চমকালো রুহি সহ বাকি সবাই । মেহজাবিন শুধালো নরম কন্ঠে…
” ভাইয়া , কি হয়েছে ?
” কিছু না…
ওর ছোট্ট উত্তরে নিঃশব্দে শ্বাস ফেললো শান্ত । মিহির চোখ টলমল করছে । অশান্ত সে । মন ছটফট করছে । ও কিছুতেই যাবে না রুহির সামনে । কিন্তু এই লোক ? এই লোক তো ছাড়বে না ওকে !
চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো মিহি । টলমল চোখ মুছলো । রুহি ওর দৃশ্যমান দুর্বলতা । রাফি অদৃশ্য মান । রাফির প্রতি নিজেকে সামলাতে পারলে , রুহির প্রতিও পারবে । মিহি কৃত্রিম হেসে আত্মবিশ্বাস জাগালো নিজের মাঝে । দুহাতে চোখ মুখ মুছে শক্ত করলো নিজেকে । ওরনাটা টেনে নিলো মাথায় । বেরোলো কিচেন থেকে । রাফি পিছু ফিরে পায়ের উপর পা তুলে বসা । রুহি পাশে । ওদের কারোরই মুখ দেখা যাচ্ছে না । মিহি আলগোছে রাফির পিছনে দাঁড়ালো নত জানু হয়ে । শুধালো গলা নামিয়ে….

” ক…কিছু প্রয়োজন ?
রাফির তৎক্ষণাৎ উত্তর….
” আপনাকেই প্রয়োজন !
রুহি ঠাহর করতে পারে নি কিছু । ও তাকালো চকিতে । সামনে মেহজাবিন থমকে গেছে ‌। ও বড় বড় নেত্রে তাকিয়ে আছে মিহির পানে । জেনি চিৎকার করে উঠলো….
” মিহি আপি ???
রুহি ঝটকা খেয়ে আরো বেশি কৌতুহলে তাকালো । বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা । মুখখানা এতোটা কাছ থেকেও অস্পষ্ট মনে হলো । অবিশ্বাস্য লাগলো নিজের চোখ কে । রুহি যেন জমে গেছে , দৃষ্টি শক্তি অনড় ওর । মেহজাবিন ও বিড়বিড় করলো এবার…
” মিহি ??
রুহির ধ্যান কাটলো এক পলকেই । ঢোক গিললো ও । উঠে দাঁড়ালো । কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিলো মেয়েটার দিকে । এক টানে নিজের দিকে ঘোরালো ওকে । চোখ নিচু করে আগা গোড়া দেখলো নতজানু মেয়ে টাকে । কন্ঠ স্বর রুদ্ধ । কেঁপে কেঁপে উচ্চারণ করলো ও…
” পা..পাখি ?

কথা শেষ হতে দেরি নেই , মিহি কে দুহাতে জড়াতেও দেরি নেই রুহির । রুহি একে বেঁকে দুহাতে আকড়ে ধরলো মিহিকে । চোখ বুজেছে মিহি । বুকের ভেতর দারুন ঝড় বইছে ওর । বন্ধ চোখের বৃহৎ পাপড়ি ছাপিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো রুহির কাঁধে । রুহি ছাড়লো ওকে । মেয়েটা নিস্তেজ, দুহাত অনড় । হাত তুলে জড়ায় নি ও রুহিকে ।
রুহি হাসছে , হাঁসফাঁস করছে । মাথা ঠিক নেই ওর । ওর সামনে ওর পাখি দাঁড়িয়ে ? কেনো যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না । রুহি ওর দুহাত রাখলো মিহির দু গালে । উষ্ণ হাতের স্পর্শে চোখ তুলে তাকালো মেয়েটা । তাকাতেই রুহির ছলছল চোখ সমেত হাসি ভরা স্নিগ্ধ শোভন মুখখানা নজরে আসলো ।
রুহি অস্থির । কাঁপছে ও । ও বললো সন্দিহান কম্পিত কন্ঠে জড়তা সমেত…
” পাখি ? তুই ? আমার পাখি ? তুই এখানে ? জান , সত্যি তুই ? আমার চোখের সামনে তুই ? স্বপ্ন দেখছি আমি ?
ভাইয়া ? ভাইয়া আমার পাখি এটা ? বলো না ভাইয়া ? ও আমার পাখি ? পেয়েছো তুমি ওকে ?
রাফি নিরুদ্বেগ নিরুত্তর । ও বসে আছে একই অবস্থায় । মেহজাবিন উঠলো বসা থেকে । রুহির কাছ থেকে মিহি কে নিজের দিকে ফেরালো । মিহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেহজাবিন জড়িয়ে ধরল ওকে । ঝটকা খেলো মিহি । আপনা আপনি হাত উঠলো মেহজাবিনের পিঠে । মেহজাবিন ও হাসছে । রুহির মতো অবস্থা ওর । তবে একটু কম । ও মিহি কে ছেড়ে বললো উদ্বিগ্ন হয়ে….

” মিহি ? তুমি ? কোথায় ছিলে তুমি এতো দিন ?
মিহি উত্তর করছে না । রুহি ওকে টান মেরে আবার ফেরালো নিজের দিকে । চোখের কোণা ভিজে জবজবে ওর । পানি গড়াচ্ছে নিজ ধারায় । ও বললো ঢোক গিলে….
” এই ,, কথা বলছিস না কেন ? বল ? আমার পাখি না তুই ? বল না ? বল না একবার , তুই আমার পাখি ? আমাকে পাখি বলে একবার ডাক ! কথা বল আমার সাথে !
মিহি সামলাতে পারছে না নিজেকে । ঠোঁট ভেঙে আসছে ওর । মিহির থেকে উত্তর না পেয়ে রুহি ছাড়লো ওকে । বসলো রাফির পায়ের কাছে । ভাইয়া কে ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলো…
” ভাইয়া , তুমি কথা বলছো না কেনো ? বলো না ? আমার পাখি কে পেয়োছো তুমি !
আমাকে বলেছিলে না , আমাকে সারপ্রাইজ দেবে , তার মানে আমার পাখি আমার সারপ্রাইজ ? বলো ভাইয়া ?
রাফি তাকালো রুহির দিকে । রুহি ঠোঁট উল্টে বিড়বিড় করলো ক্ষিন…

” আমার ভাবি জান আমার সারপ্রাইজ ভাইয়া ? খুঁজে পেয়েছো আমার ভাবি জান কে ?
রাফি তাকিয়ে থাকতে পারলো না । চোখ সরালো । মর্মাহত চাহনি রুহির । ও উঠে দাঁড়াল আবার । মিহি নির্জীব, জড়বস্তুর ন্যায় এখনো । চোখে সমুদ্রের ন্যায় জলধারা । যা গড়িয়ে পড়ছে কর্নিশ বেয়ে । গলা রুদ্ধ, আটকে আসছে নিঃশ্বাস । গলায় কান্নারা জোট পাকিয়ে আসছে । চিৎকার করতে ইচ্ছে হচ্ছে ওর । এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে জেনেও কেনো বেরোলো ও কিচেন থেকে । ভালোই তো ছিল লুকিয়ে । আর একটু পারতো না নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ?
রুহি মিহির দুহাত ধরলো । দেখলো উল্টে পাল্টে । দুই বাহুতে হাত রেখে বলল ভেজা স্বরে…
” কি অবস্থা হয়েছে তোর পাখি ? কোথায় ছিলি এতদিন ? জানিস কতো অপেক্ষায় ছিলাম তোর ? ভাইয়া তোকে কতো খুঁজেছে জানিস ?
কেমন আছিস তুই , পাখি ?
মিহি আর আটকে রাখতে পারল না নিজেকে । এবার ও নিজেই জড়িয়ে ধরল রুহিকে । ঠোঁট ভেঙে ফিকড়ে উঠলো । কান্না চেপে ধরা গলায় বলল…

” আমি ভালো নেই পাখি ! একটু ও ভালো নেই !
” আমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলি কেনো তুই ? মনে পড়েনি আমার কথা ?
রুহির অভিমানী স্বর । মিহির ও একই….
” খুব মনে পড়েছে তোকে , সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে ! আমার তো কেউ নেই বল , তুই তো আমার সব । আব্বু আম্মুর পর তোকেই পেয়েছিলাম । কিন্তু দেখ , আব্বু কেও হারালাম আর তোকেও । এখন আমার আম্মু ছাড়া আমার আর কেউ নেই রে পাখি । হারিয়েছি আমি সবাইকে ।
মাহিম নির্বোধের ন্যায় চেয়ে আছে । মিহি কে চেনে ও । তবে এতো সব কিছু জানা নেই ওর । জেনি বসা থেকে ছুটে আসলো । কোমর জড়িয়ে ধরল মিহির । হেসে হেসে উৎসুক স্বর ওর…
” মিহি আপি ,, কতো দিন পর দেখলাম তোমায় ! কোথায় ছিলে তুমি ? আমাদের বাড়িতে আসো না কেনো ? আমি খুব মিস করি তোমায় ? রুহি আপিও খুব মিস করে জানো ? আমাদের বাড়িতে আপির আর কোনো ফ্রেন্ড আসে না ! তুমিও আসো না…
টলটল নেত্রে হাসার চেষ্টা করলো মিহি । ছোট্ট জেনির সম্মুখে বসে সমান হলো ওর । বললো ধাতস্থ হয়ে…

” জেনি বুড়ি ,, আমিও খুব মিস করেছি তোমায় ! কিন্তু আমি তো আর যাবো না তোমাদের বাড়িতে । আমাদের বাড়ি যে এখানে ।
রুহি ওকে টেনে দাঁড় করালো । অনেক কিছু জানার আছে ওর । ও প্রশ্ন করলো….
” মানে ? এখানে বাড়ি মানে ? তুই এখানে কি করছিস ? ভাইয়ার এই ক্যাফেতে ? কি করছিস এখানে ?
রুহি ফিরলো রাফির দিকে । যে এখনো অঢেল অনড় ।
” ভাইয়া ,, কি হচ্ছে এসব ? কিছু বলছো না কেনো তুমি ? পাখি কে কবে পেয়োছো তুমি ? বলো না….
রাফির নিরেট চোয়াল । ও বাঁকা হলো একটু । আড়চোখে পরখ করলো মিহি কে । চোখ মুছলো মিহি । পরক্ষনে কেউ মুখ খোলার আগেই বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ডাকলো জেরিন…
” এই মাহি…?
চকিতে ফিরলো সবাই । মিহি তড়িঘড়ি করে পিছিয়ে চোখ মুখ মুছলো । জেরিন সবার সাথে মিহি কে দেখে মুখো ভঙ্গিমা পাল্টে বললো গলা নামিয়ে …
” বাইরে কেউ এসেছে । ডাকছে তোকে !
ছ্যাত করে উঠলো মিহি । তড়াৎ গতিতে আঁতকে উঠে চাইলো রাফির পানে ‌। রাফির নিরেট মুখো ভঙ্গিমায় বদল এসেছে । কুঁচকে এসেছে অক্ষি যুগল‌‌‌ ।
এতক্ষণে জবানে কথা ফুটলো ওর । ভরাট গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো…

” কে এসেছে ?
” জানি না । চিনি না , দেখি নি আগে । তবে বেশ হ্যান্ডসাম । একদম হিরো , তবে আপনার থেকে একটু কম । মাহি কে ডাকলো । বললো তাড়াতাড়ি যেতে….
উদ্বিগ্নতার সহিত গদগদ হয়ে কথা গুলো বললো জেরিন । মিহি দাঁড়ালো না । সবাইকে উপেক্ষা করে দ্রুত বেরোলো বাইরের দিকে । বাইরে একটা কালো গাড়ি । জানালা লাগানো । স্টিয়ারিংয়ে দুহাত রেখে আঙ্গুল নাচাচ্ছে কেউ । চোখে কালো সানগ্লাস । ফর্সা মুখে ফুটে উঠেছে তা । মিহি কেঁপে কেঁপে দাঁড়ালো জানালার পাশে । কালো গ্লাস ভেদ করে বাইরে থেকে কিছুই দেখা যাচ্ছে না । তবে ভেতর থেকে বাইরেটা স্পষ্ট । ভেতরের জন মিহির ভীত চেহারা খানা দেখলো , তা দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো রহস্যময় । জানালা একটু নামাতেই অধিক পরিবর্তন আসলো মিহির চেহারায় । ভেতরের জন আদেশের সুরে বললো ভরাট কন্ঠে…

” গাড়িতে বসো…
মিহি কোনো প্রকার দ্বিমত বা কথা বলার ফুরসৎ জোগালো না নিজের মাঝে । সোজা হয়ে পিছু ফিরলো একবার । ক্যাফের দরজার সামনে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসছে রাফি , পিছু পিছু সবাই । মিহি আর দাঁড়ালো না । দ্রুত গাড়ি ঘুরে গিয়ে বসলো গাড়ির ফ্রন্ট সিটে । হাতের তালু ঘামছে ওর । শিরশির করছে পায়ের তলা । ও বলল কম্পিত চিত্তে..
” তাড়াতাড়ি চলুন প্লিজ ….
কথা দেরি নেই , ইন্জিন চালু হতেও দেরি নেই । এক মুহুর্তেই গাড়ি টা ফুল স্পিডে চলতে শুরু করল । পিছনে রাফি দাঁড়িয়েছে এক মুহুর্ত । চোখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে । দপ করে মস্তিষ্কে জ্বলে উঠলো অগ্নি । হাত মুঠো করে সে উদ্যমে চোখ মুখ খিচলো । গাড়িতে উঠে বসলো নিজের । কার গাড়ি ওটা ? কার সাথে গেলো মিহি ? যাকে সন্দেহ করার কথা ছিল, সে এখন পুরোপুরি সন্দেহের বাইরে ! তাহলে কে ?
গাড়ি থেকে হুংকার ছাড়লো রাফি…

” আমার পেছনে কেউ আসার চেষ্টা করবি না । ভালো হবে না নয়তো ! আজ এর শেষ কোথায় সেখানেই যাবো আমি…
পিছনে সবাই বিমূর্ত ।
রাফি গাড়ি ছাড়তেই চেঁচিয়ে উঠলো রুহি…
” ভাইয়া ?
ধোঁয়া উঠিয়ে মিহির উঠে বসা গাড়িটার পিছু করলো রাফি । রুহিসহ সবাই তাজ্জব । চোখ আটকে গেছে ওদের । রুহি এবার ধরলো শান্ত কে…
” কি হচ্ছে এখানে এসব ? আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না ! কেউ কিছু বলছেন না কেন আমায়‌ ? আবার আপনি আমার থেকে সবটা লুকালেন ? বললেন না আমায় কিছু ? কবে থেকে চলছে এসব ? আমার পাখি কে কবে পেয়েছিলেন আপনারা ? আমাকে জানালেন না একবারও ? কোথায় গেল ওরা ? বলুন ? কি চলছে সব…?

এক দেখায় পর্ব ৪১

সামনের গাড়িটা কে ফুল স্পিডে ওভার টেক করার চেষ্টা করছে রাফি । চোখ মুখ খিচে স্টিয়ারিংয়ের উপর যুদ্ধ চালাচ্ছে । ফাঁকা রাস্তায় স্পিড বাড়িয়েই যাচ্ছে । সামনের গাড়িটাও রাস্তা বদল করেছে । নিজেদের গন্তব্য থেকে বাক নিয়েছে অন্য পথে । মিহি কেঁপে কেঁপে শুধালো…
” কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ?
উত্তর করলো না পাশের জন । ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি তার । গাড়ির সামনের উত্তল দর্পণে পিছনে তড়পে তড়পে ছুটে আসা গাড়িটার পানে দৃষ্টি চশমার আড়ালে । সময় নিয়ে মিহির প্রশ্নের উত্তর করলো নেশাক্ত স্বরে….
” সেকেন্ড টাইম তোমায় নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছি বেইবি । পালাচ্ছি তোমায় নিয়ে…

এক দেখায় পর্ব ৪৩