এক দেখায় পর্ব ৫৫
সুরভী আক্তার
ফোন কেটে তড়িঘড়ি ফোন পকেটে ঢোকালো রাফি । এক প্রকার তেড়ে এসে মিহির হাতটা খপ করে চেপে ধরলো ।
” মিহি , চলো !
আচমকা ভড়কালো মিহি ।
শুধালো চকিতে…
” কোথায় ?
” ফিরতে হবে ।
” কি হয়েছে ?
” কিছু না । চলো , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
সব আয়োজন এই মুহূর্তে বৃথা হয়ে ফিকে হয়ে আসলো । সাজানো গোছানো এপার্টমেন্ট থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিল রাফি । রাস্তায় উঠতে উঠতে শান্ত কে খবর করলো । ওরা ক্যাফেতে গেছে । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাফি আসতে বললো ওদের । ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে এক্ষুনি ।
হাঁটার রাস্তায় বড় বড় পা ফেলে মিহির হাত মুঠোয় আবদ্ধ করে হাঁটছে রাফি । দৃষ্টি নিচু করে আবার ফোনে কিছু একটা করে ফোন পকেটে ঢোকালো ফের । অবস্থা উদ্বেগজনক । ভীষণ চিন্তিত আর হাইপার দেখাচ্ছে । মিহি বুঝতে পারছে না কিছু । ও রাফির পায়ে পা মিলিয়ে ধীরে শুধালো..
” বলুন না কি হয়েছে ? এতো এক্সাইটেড দেখাচ্ছে কেনো আপনাকে ? কি হয়েছে বলুন ? এতো তাড়াহুড়ো করছেন কেনো ? আমরা তো বাড়িতে ফিরবোই ।
” এক্ষুনি ফিরতে হবে….
” কেনো ? কি হয়েছে বাড়িতে ?
রাফি থামলো । ধীরে পিছু ফিরে ঢোক গিললো মিহির মুখপানে তাকিয়ে । মিহির অবুঝ মুখখানা দুহাতের আজলে নিয়ে শান্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল….
” আন্টি বাড়িতে নেই মিহি । কোথায় গেছে, কাউকে বলে যায় নি । ফোন ও সাথে নেয় নি । সন্ধ্যা গড়াচ্ছে এখন , দুপুরের পর থেকে আন্টি নেই ।
মিহি ধক্ করে উঠলো । অবুঝ মুখশ্রীতে ভয়ের আঁধার নামলো । ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো পুরো শরীর । অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…
” আম্মু ! আম্মু , কোথায় ? কি বলছেন আপনি ? আম্মু বাড়িতে নেই মানে ? কোথায় আম্মু !
” হুসসস , কিচ্ছু হবে না । আন্টি আছেন । চলো আমরা আগে যাই । প্লিজ প্যানিক করো না তুমি । আব্বু আছেন তো বাসায় । খোঁজ নিচ্ছেন উনি ! ডোন্ট প্যানিক…
উত্তেজিত হয়ে পড়ছে মিহি ।
রাফি ওকে সামলে কোনো রকমে বড় রাস্তায় উঠেছে । শান্ত বিচলিত হয়ে গাড়ি নিয়ে বসে ছিল সেখানে । মুহুর্তেই ফেরার পথে রওনা হলো ওরা ।
এর মধ্যেই কেঁদে কেটে একাকার মিহি । চিন্তিত সবাই ।
চার ঘণ্টা পেরিয়েছে ওদের ঢাকায় ফিরতে ফিরতে । ফিকড়ে ফিকড়ে উঠছে মিহি । এর মধ্যে শান্তনা দায়ক খবর এসেছে । সাবিনা বেগম বাড়িতে ফিরেছেন । খবর শুনে নিজেকে সামলেছে মিহি ।
চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত এগারোটা । বাড়ির কেউ ঘুমায় নি এখনো । ছেলে মেয়েরা ফেরে নি ।
জেনি ঘুমিয়েছে গাড়ির মধ্যে । গাড়ি থামতেই তাড়াহুড়ো করে নামলো মিহি । কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটলো বাড়ির ভেতর । ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে পিছু পিছু ধাওয়া করলো রাফি । রুহি ধীরে সুস্থে নেমেছে । শান্ত জেনি কে কোলে করে নামালো ।
ড্রইং রুমে রাশেদ রায়হান চৌধুরী পায়চারি করছেন । জুবায়ের চৌধুরী পাশেই বসে । মিহি ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ডাকলো উচ্চ স্বরে….
” আব্বু !
চমকে চকিতে তাকালেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । দৌড়ে আসলো মিহি । কেঁদে উঠলো আবার । ঠোঁট ভেঙে বললো বাহু আঁকড়ে…
” আব্বু , আমার আম্মু কোথায় আব্বু ? আম্মু…
” আরে মা , কাঁদছিস কেনো ? আম্মু আছে তো । তোদের অপেক্ষাতেই তো ছিলাম আমি । আম্মু ঘরেই আছে…
মিহি ছাড়লো । এক মুহুর্তেই ছুটলো সিঁড়ি বেয়ে ঘরের দিকে । রাফি ডাকলো শুনলো না । সাবিনা বেগমের ঘরের দরজা ধাম করে খুলে ঘরে ঢুকলো মিহি । ঘরে হেনা বেগম ও আছেন । বসে ছিলেন দু’জনে । খাটের উপর আম্মু কে বসে থাকতে দেখে ক্রন্দনরত কন্ঠে অস্পষ্ট স্বরে ডাকল মিহি…
” আম্মু !
দরজার শব্দে চকিতে হেনা বেগম, সাবিনা বেগম তাকিয়েছেন মিহির দিকে । মিহি অপেক্ষা করলো না । এক ধাক্কায় এগিয়ে হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো সাবিনা বেগম কে । কাঁদছে সেই তখন থেকে ।
” আম্মু, কোথায় গেছিলে তুমি ? কাউকে কিছু না বলে কোথায় গেছিলে ? হ্যাঁ ? বলেছি না কোথাও যাবে না আমাকে ছেড়ে । এভাবে একা একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছিলে তুমি ?
” মিহি , কি হয়েছে মা ? এইতো আমি । আমি আছি তো । যাই নি কোথাও !
” গেছিলে । কোথায় গেছিলে বলো ?
” বলছি তো , কান্না থামা । চুপ কর ।
রাফি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো । পিছনে বাকিরা । জেনি কে ঘরে ছেড়ে তড়িঘড়ি করে এসেছে শান্ত ও । মিহি সাবিনা বেগম কে ছাড়তেই রাফি এগিয়ে খাটের পাশে হাঁটু মুড়ে মেঝেতে বসে শুধালো….
” আন্টি , কোথায় গেছিলেন আপনি ?
সাবিনা বেগম শ্বাস ফেললেন । মিহি ফিকড়ে ফিকড়ে উঠছে । তিনি মেয়ের চোখের পানি আলগোছে মুছিয়ে বললেন…
” কবরস্থানে !
থেমে আবার বললেন…
” তোর আব্বু কে করবে ফেলে এসেছি কতদিন হলো , একদিন ও দেখা করতে যাই নি তার সাথে । আজ গেছিলাম । একলা একলা অনেক টা সময় কাটিয়ে এসেছি । জানিস , কবরে ঘাস জমেছে অনেক । মাথার কাছে একটা সন্ধা মালতীর গাছ গজিয়েছে । আমি চলে আসার আগে আগে ফুল ও ফুটেছে গাছে । লোকটা ওখানে শুয়ে আছে রে , দেখতে গেলাম তাকে , তাকে আর কোই , তার বাসস্থান কে । তার কবর কে । একলা অন্ধকারে শুয়ে আছেন উনি । একলা ফেলে আসতে মন চাচ্ছিল না । তাই দেরি করে ফিরেছি ।
মিহি চোখ নামিয়ে চিবুক গলায় ঠেকালো । ফুঁপিয়ে উঠলো ঠোঁট কামড়ে ।মিহির হাতখানা চেপে ধরলো রাফি । সাবিনা বেগম তা দেখে মুচকি হাসলেন । বললেন…
” কাঁদছিস কেনো ? তোর বাপ ছেড়ে পালিয়েছে বলে আমিও ছেড়ে পালাবো নাকি ?
” আর কোনো দিন এমন করবে না বলো ! কথা দাও ! আমাকে এভাবে এক মুহুর্তের জন্যেও একা রেখে যাবে না কোথাও ! বাড়ি থেকেই বেরোবে না তুমি !
” আচ্ছা , যাবো না কোথাও । কাঁদিস না । অনেকটা পথ ফিরেছিস । যা , গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে । মাথা ধরবে নয়তো ।
তোমরাও যাও রাফি । ফ্রেশ হয়ে নাও গিয়ে…
একে একে ঘর ছাড়লো সবাই । ঘরে এসে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে মিহি । সাবিনা বেগম যা বললো , তাই হলো । মিহি শুয়েছিল সবে , ঘুম আসছে না মাথা যন্ত্রণায় । চোখ অব্দি ব্যাথা করছে ।
পেরিয়েছে বারোটা । একটার কোঠায় ঘড়ির কাঁটা । বাড়িতে এখন আর কেউ জেগে নেই । রাফি, শান্ত ও ঘুমিয়েছে হয়তো । ওদের উপর ও ডিপ্রেশন গেছে অনেক । মিহি শোয়া থেকে উঠে ধীরে ধীরে খাট থেকে নামলো । পেইন কিলার খেলো একটা । মাথা যন্ত্রণা কমবে না এতো সহজে । উন্মুক্ত হাওয়া প্রয়োজন । ফাঁকা জায়গা প্রয়োজন প্রাণ খুলে শ্বাস নেওয়ার জন্য ।
মিহি আগ পাছ কিছু না ভেবেই ঘরে থেকে বেরোলো । চোখ ঝাপসা লাগছে ।
ধীর পায়ে ছাদে উঠলো মিহি । মিঠে হাওয়া বইছে রাতের অন্ধকারে । ছাদের উত্তরের কোণে একটা আলো জ্বলছে । মিহি কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ালো ছাদের । চোখ বুজে দম টানলো বুক ভরে । বুজেই রইলো দুচোখ ।
আচমকা ডাকলো রাফি…
” মিহি !
চকিতে চমকে উঠলো মিহি । চাইলো তড়িতে । ভয় জেগেছিল খানিক । রাফি কে দেখে স্বস্তি পেলো । ঠোঁট ভিজিয়ে হাসার চেষ্টা করলো…
রাফি এগিয়ে শুধালো…
” অনেক রাত হয়েছে , এতো রাতে ছাদে কি করছো !
” ঘুম আসছিল না । মাথা ধরেছে !
” খুব বেশি ?
” একটু বেশি । পেইন কিলার খেয়েছি । কমে যাবে ।
” এসো ।
মিহির হাত টেনে ছাদের মাঝ বরাবর দোলনা টায় বসলো রাফি । মিহি কে পিছু ফিরে বসালো ওর সামনে । মিহি তড়িঘড়ি করে বললো…
” কি করছেন ?
” বসো !
কথা বাড়ালো না মিহি । মিহি কে নিজের প্রসস্থ বুকের সাথে হেলান দিয়ে বসালো রাফি । মিহির পিঠ মিশেছে রাফির বুকে । রাফি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো…
” চোখ বন্ধ করো !
মিহি চোখ বুজলো । আলতো হাতে মাথায় স্লাইড করতে লাগলো রাফি । চুলের ভাঁজে ভাঁজে আঙ্গুল চেপে ব্যাথা নিবারণের চেষ্টা করলো । ব্যাথা তুর মাথায় মালিশ করতে লাগলো । চোখ বুজে অনুভব করলো মিহি । রাফি ধীরে ডাকলো…
” ম্যাডাম ?
” হুম !
” আজ আকাশে চাঁদ ওঠে নি ! না ?
” হুম !
” কিন্তু , আমার আকাশে চাঁদ উঠেছে আজ ।
” আচ্ছা ?
” হুম ! আমার সবচেয়ে উজ্জ্বল চাঁদ আপনি ! জানেন , সেবার যখন আপনার সাথে জোৎস্না বিলাস করলাম , তখন খসে পড়া তারার কাছে কি উইস করেছিলাম ?
” কি ?
” উইস করেছিলাম , যেন প্রত্যেক রাতে আপনার সাথে চন্দ্র বিলাস করতে পারি । এক চাঁদকে পাশে রেখে , আরেক চাঁদকে দেখতে পারি । উইস কিন্তু পুরন হয়েছে আমার ! আপনাকে পেয়েছি আমি । কিন্তু দেখুন , চাঁদের সহ্য হলো না সেটা । ও আমার ব্যাক্তিগত চাঁদকে হিংসে করে মেঘের আড়ালে লুকালো । ওর তো নিজস্ব উজ্জ্বলতা নেই , কিন্তু আমার চাঁদের আছে , ও কলঙ্কিত , কিন্তু আমার চাঁদ নিষ্কলঙ্ক । তাই ওর হিংসে হচ্ছে আমার চাঁদের উপর…
” আমার উজ্জ্বলতা আছে বুঝি ? আমি তো শ্যামলা । উজ্জ্বল ফর্সা নোই আপনার মতো !
” তোমার উজ্জ্বলতায় চোখ ঝলসে গেছে আমার । তাহলে ভেবে দেখো , কতটা উজ্জ্বল তুমি ।
” আচ্ছা , আমি যদি আপনার জীবনে না আসতাম ? সেদিনের সেই প্রথম দেখার পর যদি আমাকে আর কখনো খুঁজে না পেতেন , তাহলে কি করতেন ?
” উমমমম , খুঁজে তো পেতামই । তুমি যে আমার , কোথায় পালাতে আমাকে ছেড়ে ?
মিহি চোখ বুজে স্নিগ্ধ হাসলো । চোখ খুলতে ইচ্ছে করছে না । ভীষণ আরাম লাগছে । রাফি কতো যত্নে মাথা টিপে দিচ্ছে ওর । মিহির চোখ লেগে আসছে । সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়তে সময় লাগলো না ওর ।
সকালে নিজেকে আবিষ্কার করলো নিজের ঘরেই । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো খানিক । ঘরে আসলো কি করে ? আর কখন ? চোখ ডলে বসে থেকে ভাবার চেষ্টা করলো । মনে পড়লো না কিছু ।
ফ্রেশ হয়ে নিচে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসেছে সবাই । শুক্রবার আজ । অফিস নেই । রাশেদ রায়হান চৌধুরী , জুবায়ের চৌধুরী , রাফি সবাই বাড়িতেই থাকবে । শান্ত ও তাই । মিহি খেতে খেতে সরু চোখে পরখ করছে রাফি কে । ও ঘরে কি করে পৌঁছালো , এই চিন্তা টা মাথায় চেপেছে আবার ।
জুমার নামাজ পড়তে গেছে বাড়ির সবাই । আজকে বাড়িতে আয়োজন হচ্ছে । কিসের আয়োজন বড়রা ব্যাতীত কেউই জানে না এখনো । বারোটার পর থেকে ধুম পড়ে গেছে এক প্রকার । রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী নামাজ শেষে সোজাসুজি বাড়িতে এসেছেন । রাফি, শান্ত নামাজের পর বাড়িতে না ফিরে গেছে কোথাও ।
রুহি খাটের উপর হাত পা ছড়িয়ে ফিকড়ে ফিকড়ে কাঁদছে । চোখের পানিতে গাল গলা ভিজে জবজবে । মিহি ওকে নিরিহ মুখে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছে । আফসানা বেগমের সামনে বেশি কিছু বলতে পারছে না সে । রুহির সামনে একটা শাড়ি , কিছু টুকিটাকি গহনা ও আছে । আফসানা বেগম একটু আগে এগুলো নিয়ে আসলেন । রুহি কে পড়ানো হবে এগুলো । পাত্র পক্ষ আজ দেখতে আসবে ওকে । এটা ওকে জানানো হলো এক্ষুনি । হেনা বেগম একটু আগে এসে জানিয়ে গেছেন । পাত্র জাকির হোসেনের বন্ধুর বড় ভাইয়ের ছেলে । তাদের পরিচিত । আফসানা বেগম তার কথাই বলেছিলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী কে । তাদের আজকে আসার কথা প্রথমে থাকলেও পরে ক্যান্সেল হয়েছিল । একটু আগে তারা আবার ফোন করে জানিয়েছেন , আজকেই রুহি কে দেখতে আসবেন তারা । ছেলে ভালো , বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । পারিবারিক বিজনেসে জড়িত ।
রুহি এসব শুনে প্রথমে বিশ্বাস করে নি । ভেবেছে সবাই মজা করছে হয়তো । কিন্তু না । মজা নয় ! এটা বুঝতেই কেঁপে উঠেছে সে ! ওকে দেখতে আসবে কেউ ? শান্ত বাদে অন্য কেউ ? অন্য কারোর সামনে পাত্রী হিসেবে উপস্থাপন হবে সে ? অসম্ভব ! কিছুতেই না ! কান্না জুড়ে দিয়েছে রুহি । সে কিছুতেই কারোর সামনে যাবে না । এখন বিয়ে করবে না সে ! হেনা বেগম মেয়ের কান্না দেখে , নিজেকে সামলে কোনো রকমে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন আঁচলে মুখ গুজে ।
রুহির কান্নার বেগ বাড়ছে ধীরে ধীরে । মিহি জড়িয়ে আছে ওকে । আফসানা বেগম বললেন এর মধ্যেই…
” পাগলী মেয়ে , কাঁদছিস কেনো এভাবে ? ওরা তো তোকে দেখতে চেয়েছে শুধু ! বিয়ে কি হচ্ছে নাকি এখনই ? আসতে দে ওদের , ওরা তোকে দেখুক , পছন্দ করুক , তারপর বিয়ের কথা ।
” নাহ , আমি বিয়ে করবো না এখনি । ফুপি , কি বলছো তুমি ? আমি কারোর সামনে যাবো না । আমাকে অন্য কেউ দেখবে না ! তুমি সবাইকে আসতে বারন করে দাও প্লিজ ! ভাইয়া কে আর ওনাকে ডেকে দাও , এসব শুনলে ভাইয়া আর উনি রেগে যাবেন অনেক । আমি কারোর সামনে যাবো না ফুপি । প্লিজ…
” রাফি আর শান্ত তো আসবেই । ওরা বেরিয়েছে একটু । ভাইয়া ফোন করে বলবে ওদের । তুই কাদিস না মা । কাঁদলে খারাপ দেখাবে নয়তো । ওনারা এসে পড়বেন একটু পর । তুই বস , আমি তোর ছোট মা’কে পাঠাচ্ছি । তোকে শাড়ি পড়িয়ে দেবে , কেমন !
কথা শেষ করেই আর কোনো কথা না শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আফসানা বেগম । ফুঁপিয়ে উঠলো রুহি ।
” পাখি , আমি কারোর সামনে যাবো না পাখি । আমি ওনাকে ভালোবাসি । ওনাকে ছাড়া আর কাউকে কল্পনা করতে পারি না আমি । প্লিজ কিছু কর পাখি , আমি যাবো না কোথাও ।
” পাখি , শান্ত হ তুই । আমি শান্ত ভাইয়া কে ফোন করছি দাঁড়া । কিচ্ছু হবে না । ফোন কোথায় তোর ….
রুহি চঞ্চল হয়ে ফোন হাতড়ে খুঁজে বের করলো । কম্পিত হাতে ফোনটা তুলে দিলো মিহির হাতে । রাফি ফোন বাড়িতে রেখে গেছে । মিহি ডিরেক্ট শান্তর ফোনে ফোন লাগালো । রাফি শান্ত ওদের বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে বেরিয়েছে আজ । রানা, সিফাত কাল বিদেশে ফিরবে । আজ আবার এক হয়েছে ওরা । ওদের আড্ডার মাঝেই রুহির ফোন থেকে শান্তর ফোনে কল এলো । শান্ত ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে কপাল গুটালো । প্রতিক্রিয়া দেখালো না কোনো । কাল থেকে ওদের সেই মান অভিমান চলছে । শান্ত টলে নি একটুও । রুহি কল করছে কেনো আবার ওকে ?
শান্ত ফোন ধরবেই না । ও ফোনটা কেটে দিলো । রাফি শুধালো…
” কে ফোন করেছে ?
” তোর বোন ।
” কাটলি কেনো তাহলে ?
” তুই ওসব বুঝবি না , আমাদের সম্পর্কে ইমোশনাল ডিসটেন্স ক্রিয়েট হয়েছে ।যেটা এতো সহজে ভাঙবে না এবার !
মিরাজ চেঁচিয়ে উঠলো তুড়ি বাজিয়ে….
” আরে , রাফির বোন , কি যেনো নাম ? রুহি তো না ? তা কি খবর শান্ত ? কতগুলো এগোলো রুহির সাথে ?
শান্ত শ্বাস ফেললো । রাফির দিকে তাকিয়ে বললো…
” বড় শালা বাবু আছে এখানে । ওর বোনের সাথে সম্পর্ক কতদূর এগোলো , ওর সামনে কিভাবে বলি বল ? শরম লাগে আমার..
এর মাঝেই আবার ফোনটা বেজে উঠলো । এবার ও কাটলো শান্ত । পরপর আরো দুবার ফোন কাটলো । রাফি ক্ষিপ্ত দৃষ্টি ফেললো এবার । বললো গুরু গম্ভীর নিরেট কন্ঠে….
” বারবার ফোনটা কাটছিস কেনো ? দরকার ও তো হতে পারে ….
” তোর বোন আমার অভিমান ভাঙ্গাতে চাইছে,বুঝলি ? তুই আমাদের মাঝে আসছিস কেনো ? ছোট বোনের প্রেমের সংসারে নাক গলাতে লজ্জা করে না ?
রাফি কটমটিয়ে তাকালো । আবার ফোন আসতেই এবারো হেসে ফোনটা কেটে দিলো শান্ত ।
এদিকে পর পর কয়েক বারেও ফোন রিসিভ না হওয়ায় ঠোঁট উল্টালো রুহি । ফোন রিসিভ না করলেও সহ্য হতো , কিন্তু উনি ? ফোন কেটে দিলেন উনি ? এতো বার ফোন করার পরেও ? রুহি কাল থেকে অপরাধ বোধে জড়িয়ে ছিলো । আজ ভীষণ কষ্ট হলো । অভীমান জমলো তড়ে তড়ে । মিহি আহত চোখে তাকিয়ে বললো ধীর কন্ঠে….
” শান্ত ভাইয়া তো ফোন ধরছে না পাখি !
দুহাতে চোখ মুছলো রুহি । নাক টেনে দাঁতে দাঁত চেপে বড় বড় শ্বাস টানলো । খাট থেকে নামতে নামতে গুমড়ে বললো গলা চিপে…
” ছোট মা আসছে না কেনো এখনো ? শাড়ি পড়বো আমি ? পাত্র পক্ষ চলে আসবে তো , আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি পাখি । তুই ছোট মা’কে ডেকে আন ।
” পাখি , কি বলছিস ?
” যা বলছি তাই । শাড়ি পড়বো আমি । সাজবো । অনেক সুন্দর লাগে যেনো , সাজিয়ে দিবি আমায় ।
” মাথা ঠিক আছে তোর ?
” চুপ , কথা বলবি না আর । আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি ।
রুহি ওয়াশ রুমে ঢুকলো । মিহি মুখে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে আরো বেশ কবার ফোন লাগালো শান্তর নাম্বারে । কোনো লাভ হলো না । এই রাফি কেও আজকেই ফোন বাড়িতে ফেলে যেতে হলো ?
মাথা কাজ করছে না মিহির ! কি করবে সে ? রুহিও রেগে গেছে শান্তর উপর ।
খানিক ক্ষণের মধ্যে পাত্র পক্ষের লোক এসে উপস্থিত । জাকির হোসেন নিয়ে এসেছেন তাদের । ছেলের সাথে , ছেলের বাবা মা, চাচা,চাচি , আর একটা বোন এসেছে । মিহি করিডোর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো একবার । সে উত্তেজিত হয়ে পায়চারি করছে । রুহিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এর মধ্যে । সে একরোখা । ভার মুখে নিজেকে ধাতস্থ করে সটান হয়ে গেছে রুহি ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী ছেলেকে ফোন করেছেন অনেক বার । কিন্তু রাফির ফোন ঘরে , এটা জানা নেই তার । রাফি কেও আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি । এখন গেস্ট এসে উপস্থিত । না জানালেই নয় । রাশেদ রায়হান চৌধুরী একটু সরে এসে এবার শান্তর নাম্বারে ফোন লাগালেন ।
বিরক্তি নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো শান্ত । ভেবেছিল এবার ও রুহি , কিন্তু না । রুহি নয় ! রুহি হলে এবার অন্তত ফোন রিসিভ করতো সে , বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছে রুহির সাথে । স্ক্রিনে বড় মামার নাম্বার দেখে কপাল কুঁচকালো শান্ত । রাফি রেগে ছোঁ মেরে ওর হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো , রুহি ফোন করেছে এই ভেবে । কিন্তু না , আব্বুর নাম্বার দেখে নিজেও হতবাক হলো সে । নিজেই ফোন রিসিভ করলো তড়িঘড়ি করে…
রিসিভ হতেই রাশেদ রায়হান চৌধুরীর গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন….
” কোথায় তোমরা ?
রাফির উত্তর….
” জ্বি আব্বু , কাছেই আছি !
” তোমাকে কখন থেকে ফোন করছি , খেয়াল আছে ?
” আমার ফোন তো বাসায় !
” আচ্ছা , শান্ত কোথায় ?
” আমার সাথেই ।
” বাড়িতে এসো তাড়াতাড়ি ! গেস্ট এসেছেন অনেক ।
” গেস্ট ?
” হুম ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী সবটা খুলে বললেন এবার । অমনি বসা থেকে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গেল রাফি । মুখের ভঙ্গিমায় পরিবর্তন আসলো বিভৎস । এজন্যই রুহি হন্যে হয়ে ফোন করছিলো বারবার ।
রাফি তড়িঘড়ি করে ফোন কাটলো । বললো শক্ত গলায়…
” শান্ত , চল ..
সিফাতের উদ্বিগ্ন স্বর..
” কি রে , কি হলো ? কোথায় যাচ্ছিস ?
” বাসায় ফিরতে হবে ।
কথা বাড়ালো না আর । বন্ধু মহলের সবাই দাঁড়িয়ে গেলো রাফির তাড়াহুড়ো দেখে । চট জলদি বাইকে উঠে বসেছে রাফি । চাবি ঘুরিয়ে বাইক স্টার্ট ও দিয়েছে । শান্ত কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধমকে উঠলো এবার…
” কি রে আসবি , না আমি যাবো চলে ?
ধমক খেয়ে তড়িঘড়ি করে বাইকের পেছনে উঠে বসলো শান্ত । বাইক চালু হলো মুহূর্তেই । শান্ত শুধালো…
” এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেন,ব্রো ? কি বললো মামু ?
রাফির দাঁত পিষে উত্তর….
” তোর ভবিষ্যৎ বউকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসে বসে আছে বাড়িতে । তোর মা ঘটক । ছেলে পক্ষকে এনেছে তার হবু বউ মাকে দেখাতে । তাই তাড়াহুড়ো করছি । বিয়ে করার ইচ্ছে থাকলে জলদি চল…
শান্ত টাস্কি খেলো । বৃহৎ আকারে চাইলো । কেশে উঠলো তৎক্ষণাৎ ।
” হোয়াট ? রুহিকে ..?
” হুম ।
ঢোক গিললো শান্ত । ভাবতে পারলো না কিছু । তড়িঘড়ি করে ফোন লাগালো রুহির নাম্বারে । রুহির সাজগোজ শেষ । ড্রেসিং টেবিলের উপরে থাকা ফোনটা বেজে উঠতেই, হালিমা বেগম, জেনি , রুহি,মিহি, মেহজাবিন , উভয়েই চকিতে তাকালো ফোনের দিকে । শান্তর নাম্বার দেখে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না রুহি । ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলে , ফোন হাতে তুলে সুইচ অফ করে দিলো ফোনটা । চরম উদ্বিগ্নতার সীমান্তে শান্ত । হৃৎপিণ্ড খাঁচা ছাড়া হবে এক্ষুনি । ধড়ফড় করছে সে ।
কি করলো ও এটা ? রুহির ফোনে পুনরায় ডায়াল করতেই সুইচ অফ দেখালো । শান্ত ঝাড়া মেরে কান থেকে ফোন নামালো । গলা শুকিয়ে আসছে । ও বললো কোনো রকমে…
” তাড়াতাড়ি চালা ভাই ! আমার প্রাণ এখন তোর হাতে ।
বাড়ির ড্রইং রুমে হাসাহাসির রোল পড়েছে । হাসছে সকলে । ছেলের নাম – শোয়াইব শিকদার । শিকদার পরিবারের একমাত্র পুত্র । বাবা শাফায়েত শিকদার । চৌধুরী পরিবারকে কে না চেনে ? তারাও চেনে আগে থেকেই । শোয়াইব মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিতে বসে আছে । পাশেই ওর বোন – সাফা । বয়স হবে , ষোলো,সতেরো । অনেক ক্ষণ হলো তারা এসেছেন । নাস্তা দেওয়া হয়েছে অনেক । শাফায়েত শিকদার অবশেষে বলে উঠলেন…
” আরে চৌধুরী সাহেব , অনেক তো হলো । এবার মেয়েকে দেখান । আর কতো অপেক্ষা করবো ?
হাসার চেষ্টা করলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । বললেন…
” আমার ছেলে আসছে । ও আসুক, তারপর না হয় মেয়ে কে নিচে নামাবো । মেয়েটা কাঁদছে , বুঝতেই পারছেন । রাফিই ওকে সামলাতে পারবে ।
” আপনার ছেলে , মানে রুজান রাফি চৌধুরী তো ? তাকে কে না চেনে । সে কোথায় ?
” বাইরে বেরিয়েছে একটু । এক্ষুনি এসে যাবে ।
রাফির প্রসঙ্গে কথা শুনে মাথা নিচু করেই একটু হাসলো শোয়াইব । তার আলাদা করে চেনা আছে রুজান রাফি চৌধুরী আর শাহরিয়ার শান্ত কে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড়িয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো শান্ত,রাফি । হাঁসফাঁস করছে শান্ত । ঢুকেই ডাকলো উচ্চস্বরে….
” রুহি…!
চকিতে তাকালো সবাই । শান্ত ধড়ফড়িয়ে এগিয়ে আসলো । সবার সামনেই থামলো এসে । সবার মাঝে রুহি কে না দেখে একটু স্বস্তি জাগলো মনে । তবুও উদ্বিগ্নতার সহিত বলে উঠলো সবার মাঝেই….
” রুহি কোথায় ?
আফসানা বেগমের উত্তর…
” রুহি তো ঘরে , তৈরি হয়েছে হয়তো ! তোদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম ।
কপাল চেপে ধরে ঘন শ্বাস ফেললো শান্ত । রাফি খানিক ধাতস্থ করলো নিজেকে । শান্ত সামনে তাকালো । পাত্র সাজে একটা চেনা মুখ । রাফিও দেখলো । কপাল গুটালো দু’জনেই । শান্ত সন্দিহান হয়ে শুধালো….
” তুমি , শোয়াইব না ?
হাসলো শোয়াইব । উত্তর করলো….
” জ্বি ভাইয়া , ভালো আছেন ? রাফি ভাইয়া , আপনি ভালো আছেন ?
সবাই সচকিত হয়ে তাকালো উভয়ের দিকে । এরা পূর্ব পরিচিত ? রাফি কপালে ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন করলো পাল্টা….
” তুমি তো আমাদের ভার্সিটির দুই বছরের জুনিয়র ছিলে ! রাইট ?
” জ্বি !
ফোঁস করে শ্বাস ফেললো শান্ত । কটমট করলো নিজের মাঝে । আরে বাহ ,একে তো মা ঘটকালি করছে নিজের ছেলের হবু বউয়ের ? তার উপর কিনা , নিজের ছেলের থেকে কম বয়সের অন্য একটা ছেলের সাথে ? নিজের ছেলের বয়স তো কম হলো না ! সেদিকে খেয়াল নেই ? দপদপ করে এগোলো শান্ত । নিজেকে যথাসম্ভব সংযত করে ,শোয়াইব এর অন্য পাশে বসলো । কাঁধে চাপড় মেরে বললো…
” বাহ্ জুনিয়র ভাই বাহ্ ,, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিচ্ছিস ? মেয়ে দেখতে এসেছিস বিয়ে করার জন্য ? বড় ভাইরা এখনো সিঙ্গেল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আর তুই বিয়ে করতে চলে এসেছিস ! লজ্জা করে না ? এতো তাড়া কিসের ব্রো ?
অস্বস্তিতে পড়লো শোয়াইব । আমতা আমতা করতে লাগলো সে । কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শান্ত আবারো বলল…
” বিয়ে করবি ভালো কথা । কিন্তু বড় ভাইয়ের বউয়ের দিকে নজর দিতে আসলি ক্যান ভাই ? এটা তো ভ্যারি ব্যাড ! ভার্সিটিতে হলে তোকে কান ধরিয়ে চড়া রোদে দাঁড় করিয়ে রাখতাম এতক্ষণে । এই সুন্দর চেহারা খানা রোদে পুড়তো তখন । নয়তো দেশলাই কাঠি দিয়ে পুরো ক্যাম্পাসের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপাতাম ! কেমন হতো বল ? সাহস তো কম নয় , একেই বয়স কম , বড় ভাইয়ের আগে বিয়ের সখ জেগেছে , তার উপর বড় ভাইয়ের বউয়ের দিকেই নজর ? দেই একখানা চটকানা ?
থতমত খেলো শোয়াইব । কেউই বুঝলো না কিছু । চোখ সরু করে তাকালো সকলে । আফসানা বেগম বললেন চাপা সতর্কতায়….
” কি সব বলছিস শান্ত ?
রাফি বুকে হাত গুটিয়ে হাসছে মিটিমিটি । শান্ত কে আজ বাঁধা দেবে না সে । উপভোগ করবে সবটা । আম্মুর কথায় শোয়াইব কে ছেড়ে তড়িতে উঠে দাঁড়ালো শান্ত । বললো ভনিতা হীন সোজাসুজি নিরেট…
” আম্মু , আমি বিয়ে করবো ! আমার থেকে কম বয়সের ছেলের ঘটকালি করছো । আমাকে চোখে পড়ছে না ? বয়স তো কম হলো না আমার ? আর কবে বিয়ে করবো আমি ? নাতি নাতনির সাথে বুড়ো বয়সে ফুটবল খেলবে তুমি ?
থতমত খেলেন আফসানা বেগম নিজেও । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো উপস্থিত সবাই ।
আফসানা বেগম দাঁড়িয়ে গেলেন । জাকির হোসেন গলা ভিজিয়ে নিলেন । কি একটা ঠোঁট কাটা ছেলে, অতিথি দের সামনে কিসব কথা বার্তার ধরন ? বললেন তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে…
” শান্ত , এসব কি কথা বার্তা ? অতিথিরা এসেছেন তো । তুমি তাদের সামনে এভাবে কথা বলছো কেনো ? কি ভাববেন তারা ?
আফসানা বেগম তাল মেলালেন…
” ঠিকি তো । কিসব বলছিস তুই ? এখানে একটা সম্পর্ক তৈরি হতে চলেছে । অতিথিরা যাক , তার পর তোর কথা শুনবো । বোন কে গিয়ে নিয়ে আয় এখন , কাঁদছে ও । বারবার তোদের কথা বলছিল । অপেক্ষায় বসে আছে তোদের জন্য ।
” আরে মা আমার ! কি সারাদিন বোন বোন করতে থাকো ? রুহি আমার বোন কবে থেকে ? আই লাভ হার ! আমি ভালোবাসি ওকে ? ওকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না আমি ! চোখ থাকতেও অন্ধ তোমরা ? বোঝো না আমায় ? এতো দিন চুপ ছিলাম ! বাট আজ সব শেষ ! এনাদের যেতে বলো এখান থেকে । আমার সহ্য হচ্ছে না এনাদের । আজ কিছু একটা করতেই হবে তোমাদের । আমি রুহিকে বিয়ে করবো ! তোমার বড় ভাইয়ের মেয়ের সাথে একটু বিয়ে দাও আমার….
সবাই হতভম্ব । উঠে দাঁড়ালেন সকলে । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর গম্ভীর ডাক…
” শান্ত ?
” জ্বি মামা ।
আমি রুহিকে ভালোবাসি । রুহিও আমাকে ভালোবাসে । আমার মাঝে কোনো কমতি নেই নিশ্চয়ই ? আপনার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে পারেন নিশ্চিন্তে ! আমি জাস্ট ওকে চাই ,, সেটা যে করেই হোক !
মূক বনে সকলে । নিস্তব্ধ হলো পুরো হলরুম । হেনা বেগম , সাবিনা বেগম , মেহজাবিন , ওরা এতোক্ষণ রুহির সাথে ছিল । তারাও নামলেন নিচে । মেহজাবিন শান্ত কে দেখে হাঁফ ছাড়ল । কি টেনশনে ছিলো এতক্ষণ সে ।
জাকির হোসেন লজ্জায় পড়লেন । শাফায়েত শিকদার অবস্থা বুঝে বিজ্ঞের চিন্তায় বললেন…
” চৌধুরী সাহেব , এটা বোধহয় আপনাদের পারিবারিক ব্যাপার । আমাদের এখানে থাকাটা উচিত হবে না । আমরা আসি তবে…
তাদের বাধা দিলেন না কেউ । কিছুক্ষণের মধ্যে চলে গেলেন তারা । এখনো শান্ত পুরো ড্রইং রুম । আফসানা বেগম ধীরে চোখ তুলে রাশেদ রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকালেন । ডাকলেন নিরিহ স্বরে….
” ভাইয়া !
রাশেদ রায়হান চৌধুরীর খানিক গুরুভার কন্ঠ ….
” কিসের ভাইয়া আমি তোর ?
চমকালেন সকলে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী একটু থেমে আবার বললেন…
” সম্পর্ক বদলাতে চলেছে । বোন থেকে বেয়ান হবি আমার ! বেয়াই বলাটা অভ্যাস করে নে । আমার কোনো আপত্তি নেই তোর উচ্চিংড়ে ছেলেকে জামাই বানাতে । তোর যদি আপত্তি না থাকে , তাহলে আমার মেয়েকে নিজের বাড়ির বউ বানাতে পারিস ।
শান্ত ধক্ করে উঠলো । আফসানা বেগম প্রথমে থতমত খেলেও পরমুহূর্তে হেসে উঠলেন । তিনি কিছু বলার আগেই জাকির হোসেন বলে উঠলেন…
” আরে বেয়াই সাহেব , আমার কোনো আপত্তি নেই আপনার মেয়েকে নিজের বাড়ির বউ বানাতে । বাকিটা আপনার বোনের হাতে । ছেলে তো আগে থেকেই রাজি….
” আমার ও আপত্তি নেই । আমার মেয়ে আমার বাড়িরই হবে ! এতে আপত্তি করবো কোন সাধ্যে ? আগে বললেই হতো সব । এজন্যই এতো কাঁদছিল রুহি ? তুই ও তো কিছু বলিস নি আমায় ?
শান্তর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন । বাড়ির সবার মুখে হাসি ফুটলো । শান্তর খুশি দেখে কে ? উত্তেজিত সে । এতক্ষণ চিন্তায় উদ্বিগ্ন ছিলো , এখন খুশির জোয়ারে হাঁসফাঁস করছে । সে বললো কোনো রকমে….
” বলি নি তো কি । বোঝা উচিত ছিলো তোমাদের । ছেলে আমি তোমার । এখন শুনেছো , তবেই না বুঝলে ! এখন যা করার করো । আমি আমার জানের কাছে গেলাম….
শান্ত অপেক্ষা করলো না । সবাইকে উপেক্ষা করে ঝটপট দৌড়ে সিঁড়ির দিকে এগোলো । ওকে দৌড়াতে দেখে মুচকি হাসলো সবাই । শক্ত মুখে ঘরে বসে রুহি । মিহি পাশে । নিচে কত কান্ড হচ্ছে কানে যায় নি ওদের ।
শান্ত ধাম করে দরজা খুললো । চমকালো রুহি মিহি । শান্ত কে দেখে ভয় চুকিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো মিহি । হাঁফ ছেড়ে হাসলো সে । রুহি সেজেছে । শাড়ি পড়েছে আজ ও । শান্ত কে দেখে চোখ মুখ দ্বিগুণ শক্ত করে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে । মিহি বিচলিত হয়ে এগিয়ে এসে বললো…
” ভাইয়া , এসেছো তুমি ? কতো ফোন করলাম তোমায় ? ফোন ধরছিলে না কেনো ? জানো কি টেনশনে ছিলাম আমরা ? রুহি কে দেখতে এসেছেন নিচে…
শান্ত ধীর কন্ঠে বলল….
” এখন আর কিচ্ছু হবে না ।
একটু বাইরে যাবি পরী ? রুহির সাথে আমার….
” বলতে হবে না । যাচ্ছি আমি ।
এক দেখায় পর্ব ৫৪
হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো মিহি । নিজেই দরজা চাপিয়ে দিলো সে । শান্ত দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । রুহি কে মুখ ফিরিয়ে থাকতে দেখে কাতর দৃষ্টি পাত করলো । এদিকে চোখ ফিরিয়ে নিজের সজল দৃষ্টি আড়াল করেছে রুহি । কান্না আসছে কোটর ফেটে । ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না চেপে রেখেছে বহু কসরতে । শান্ত ধীর পায়ে এগিয়ে গেল । দাঁড়ালো ওর সামনে । শান্ত দাঁড়াতেই ফের অন্যদিকে মুখ ফেরালো রুহি । এবারো ঘুরে সামনে দাঁড়ালো শান্ত । রুহি বিরক্তিতে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত কে পাশ কাটাতে গেলে ওর হাতটা খপ করে চেপে ধরলো শান্ত । এক টানে রুহিকে টেনে জড়ালো বক্ষ পিঞ্জরে । আকস্মিকেই খুব শক্ত করে জড়িয়ে চোখ বুজে ক্ষিণ স্বরে উচ্চারণ করলো….
” সরি , সরি জান….
