এক দেখায় পর্ব ৬
সুরভী আক্তার
কেটে গেছে আরো কয়েকটি দিন । আজ আবারও বৃষ্টি নেমেছে । এই বৃষ্টিতে আটকে পরেছে মিহি আর রুহি। সবে কোচিং শেষ করে বেরিয়েছিলো এর মাঝে শুরু হয়ে গেলো ঝিরি ঝিরি ঝুম বৃষ্টি । এই বৃষ্টিতে দুই বান্ধবী মিলে আশ্রয় নিয়েছে একটা দোকানের ছাউনির নিচে। বৃষ্টির কারণে আশপাশ টা পুরো ফাঁকা। অনেকক্ষণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও বৃষ্টি থামার কোন নাম নেই । এবার বাধ্য হয়েই রুহি রাফিকে কল করে…
প্রথম বারেই রিসিভ হয় । রুহির ফোন কখনো ইগনোর করে না রাফি । শত ব্যস্ততার মাঝে থাকলেও বোনের জন্য সব ব্যাস্ততা মৌকুভ তার । ফোন রিসিভ হতেই রুহি কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধায়…
– hello !! ভাইয়া,, কোথায় তুমি?
– আমি অফিসে । কেনো ? বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, তুই কোথায় আছিস এখন ?
– ভাইয়া, আমরা না বৃষ্টিতে আটকে পরেছি । আর ড্রাইভার আংকেল ও আজকে আসেনি । ফেসে গেছি পুরো…
– কিহ! বৃষ্টিতে আটকে পরেছিস,, আর ড্রাইভার ও নেই,, তুই ঠিক আছিস তো ? আর কে আছে তোর সাথে?
রুহি ঘাড় বাঁকিয়ে মিহির দিকে তাকিয়ে বলল..
– আমার সাথে এখন আমার Pakhi ,মানে আমার Best friend মিহি আছে। আমি তোমাকে Location পাঠাচ্ছি, তাড়াতাড়ি এসো প্লিজ। ভয় করছে আমার…
রাফি খানিক শান্তনা দিয়ে বলে…
– আচ্ছা sissy,,আমি এখুনি আসছি । ভয় পাস না একদম । ভাইয়া এক্ষুনি চলে আসবে । তোরা ওখানেই থাকবি , কোথাও যাবি না কিন্তু…
বলেই তড়িৎ বেগে রাফি ফোন কেটে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে রাফি । এদিকে রুহি আর মিহি তৃপ্ত শ্বাস ফেলে। রুহির চোখে সামান্য ভয় থাকলেও মিহির চোখে তা নেই । মিহি অনুভব করে এক নিরব উষ্ণ আবেশ, বৃষ্টি বিলাস, নরম মেঘে ঢাকা আকাশ, টুপটাপ বৃষ্টি । এই আবেশেই মিহি ছাউনির নিচে থেকেই হাত বাড়িয়ে ছুঁইয়ে দেয় বৃষ্টির পানি। বৃষ্টির পানি ছোঁয়া মাত্রই মিহির শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে,,মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি লারা দেয় ,, অমনি সে রুহির হাত ধরে এক টানে ছাউনির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে। মিহির হঠাৎ কান্ডে রুহি হতবাক হয়ে বলে..
– কি করছিস Pakhi ? আমরা তো ভিজে যাচ্ছি ।
– কিচ্ছু বলিস না pakhi ,,Just feel কর ।
মিহির কথা এবং চোখমুখের প্রাণবন্ত উচ্ছাস দেখে রুহি খানিক থমকে থাকলেও পরমুহূর্তেই হাত মেলে বৃষ্টিকে উপভোগ করতে থাকে । বৃষ্টির ফোঁটা ওদের ভিজিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি,, চারপাশ যেনো থমকে গেছে,, শুধু বাতাসে আছে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি আর ওদের হালকা হাসির শব্দ । দুই বান্ধবী মিলে হাত ধরে ঘুরতে থাকে ছড়িয়ে থাকা পানির মধ্যে ।
এদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার অপর পাশে গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়ায় রাফি । গাড়ির glass নামিয়ে ভেতর থেকে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয় , বোনকে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে এই বৃষ্টির মাঝেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে নির্জন রাস্তায়,, চিন্তিত মুখে চারদিকে তাকিয়ে রুহিকে খুঁজতে থাকে । এমন সময় রাস্তার অপর পাশ থেকে মেয়েলি কন্ঠের হাসির ঝংকার এবং নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ ভেসে আসে রাফির কানে ,, বৃষ্টির কারণে সেই অনাগত হাসির ঝংকার খুব ক্ষীণ শোনাচ্ছিলো । এদিক ওদিক তাকানোর মাঝেই রাফির চোখ আটকে যায় রাস্তার ওপাশে থাকা দুটি প্রাণবন্ত রমনীর দিকে । দুটো মেয়ের হাসি , ছুটোছুটি, পানির মধ্যে ছলছল করে হাঁটা, সবকিছুই যেনো ধীর গতিতে ধরা দেয় রাফির চোখে । তবে এক মুহূর্তেই ওর দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় মিহির উপর,, সেই ডাগর ডাগর মায়াবী চোখ,, চোখে শিশুসুলভ উচ্ছাস আর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি,, একহাতে রুহির হাত ধরা এবং অন্য হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি বিলাস করা । আবারো আজকে নির্বাক হয়ে যায় রাফি । অপ্রতিভ হয়ে যায় চোখের চাহনি । কিছু সময় পেরিয়ে যায় তাকিয়ে থাকার মাঝেই । রাফি আলতো হেসে এগিয়ে যেতে যেতে শুধু মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে আওড়ায়….
” My Blossom !! I knew , I would meet you again ..!
রুহি আর মিহি বৃষ্টি বিলাসে ব্যস্ত থাকায় তারা কেউ রাফিকে খেয়াল করে নি,,ছুটোছুটির মাঝেই হঠাৎ রুহির চোখ যায় রাফির দিকে, যে এখন ঠিক ওদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে । অমনি থেমে যায় রুহি । অস্ফুটে ডাকে…
– ভাইয়া!!
রুহির দৃষ্টি অনুসরণ করে মিহিও এবার রাফির দিকে তাকায় ,, সামনের সুদর্শন পুরুষটিকে দেখে অমনি মিহির চোখ গোল গোল হয়ে যায় । আটকে যায় চোখ । উজ্জল ফর্সা চেহারায় ঘনো চাপ দাড়ি ,, বৃষ্টির পানিতে ভেজা চুল গুলো কপালে এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে । গায়ের কালো শার্ট টা ভিজে গিয়ে লেপ্টে আছে শরীরে । পেশিবহুল বডি স্পষ্ট ধরা দিচ্ছে চোখে । পেশির প্রতিটি ভাঁজ ফুটে উঠেছে । কিছু সময়ের জন্য থমকে যায় মিহির দৃষ্টি । প্রথম বার কোন পুরুষের প্রতি এভাবে দৃষ্টি আটকালো তার । মিহিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলে যায় রাফির । সে এগিয়ে এসে বলে..
– এভাবে বৃষ্টিতে ভেজার মানে কি হ্যাঁ ? জ্বর আসলে তখন কি হবে ?
রাফির কথায় ধ্যান ভাঙ্গে মিহির । এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মেরে নিজেই নিজেকে বিড়বিড় করে বলে..
– ছিঃ..ছিঃ মিহি,, বান্ধবীর ভাইয়ের দিকে কেউ এভাবে তাকিয়ে থাকে? মানছি উনি সুন্দর তাই বলে তুই এভাবে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে থাকবি ? বান্ধবীর ভাই মানে তোরও ভাই ।
বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলিয়ে যায় মিহির বলা কথাগুলো । এদিকে ভাইয়ের কথায় রুহি সাফাই গেয়ে বলে…
– তুমিও তো ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছো ,, আর আমাদের বলছো । এসব বাদ দাও,,ও হচ্ছে মিহি, আমার Pakhi ।
মিহির দিকে ইশারা করে শেষের কথাটা বলে রুহি ।
রুহির কথায় মিহি অপ্রস্তুত হেসে এগিয়ে গিয়ে বলে …
– আ.. আসসালামুয়ালাইকুম,,,ভা..
মিহির গলায় ‘ ভা ‘ শব্দটা আটকে যায়, যেন শব্দটা বেরোতে চায় না আর । কোথায় একটা অনুচ্চারিত দ্বিধা আটকে দেয় বাকিটা ।
রাফি আলতো হেসে জবাব দেয়..
– ওয়ালাই কুমুস সালাম । আপনি তাহলে মিহি ?
মিহি এক চিলতে হাসি দিয়ে ছোট করে জবাব
দেয়…
– জ্বী ।
তারপর তিনজনে গাড়ির দিকে পা বাড়ায়। রাফি গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিতেই রুহি সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে। মিহি উঠতে গেলে একটু হোঁচট খায়, বৃষ্টির পানিতে পা পিছলে যেতে যেতে রাফির হাত আঁকড়ে ধরে বেঁচে যায়, মূহুর্তেই দুজনের চোখাচোখি হয় । হঠাৎ রাফির এমন অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে মিহির সারা শরীর মৃদু কেঁপে ওঠে, হৃদয়ে কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায় । ধক্ করে ওঠে সপ্তদশীর হৃদয় ।
নরম গলায় বলে রাফি বলে….
– সাবধান…
মিহি নিজেকে সামলে সহসা হাত ছেড়ে দেয় । নিচু স্বরে বলে..
– Thank you… !
বলেই গাড়িতে উঠে পড়ে সে ।
মিহি গাড়িতে উঠার পর রাফি গাড়ির দরজা লক করে দেয় এবং নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে । গাড়ি চলতে থাকে…। গাড়ির জানালা দিয়ে আসা হালকা বাতাসে রুহি আর মিহি ঠান্ডায় কাঁপছে ।
ড্রাইভ করতে করতে বারবার আড়চোখে Front mirror এ মিহিকে দেখছিলো রাফি,,,মিহির উজ্জল শ্যামলা আদলে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মুক্তার দানার মতো চিকচিক করছে ,, গোলাপী অধর আর ঘনো চোখের পাপড়ি গুলো ঠান্ডায় তিরতির করে কাঁপছে । একই সময় মিহির ও চোখ যায় Fron mirror এ ,, আবারো চোখাচোখি হয় দুজনের ।
মূহুর্তেই মিহি চোখ সরিয়ে নেয় । বুকটা আবারো ধক্ করে ওঠে । চোখ কুঁচকে মনে মনে ভাবে..
– উনি কি আমায় দেখছিলেন ?
অজানা এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে মিহির মাঝে ।
বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করতে থাকে, মনের গহীনে চলতে থাকে এক নতুন আন্দোলন।
এই কি তাহলে শুরু? এই কি সেই এক দেখায় – প্রথম অনুভবের গল্পের শুরু?
গাড়ির ভেতরের কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতাকে ভেঙ্গে রাফি গান চালিয়ে দেয়..♪♪♪♪♪
ও আগে কতো বৃষ্টি যে ,দেখেছি শ্রাবণে ..
জাগেনি তো এতো আশা
ভালো বাসা এ মনে••
সেই বৃষ্টি ভেজা পায়ে সামনে এলে হায়
ফোঁটে কামিনী
আজ ভিজতে ভালো লাগে শূন্য মনে জাগে
প্রেমের কাহিনী…..
রিমঝিম এ ধারাতে চায় মন হারাতে
এই ভালোবাসাতে আমাকে ভাসাতে….
রাত – ১০ টা ,, বৃষ্টিতে ভেজার কারনে মিহির প্রচন্ড জ্বর এসেছে । আজমাল হোসেন জোর করে মেয়েকে ঔষধ খাইয়ে ঘুম পারিয়ে দেন। তারপর মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে আসেন । স্বামীর পিছু পিছু সাবিনা বেগম ও বেরিয়ে আসেন । ঘরে এসে আজমাল হোসেনকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ব্যালকনির দিকে পা বাড়ায় সাবিনা বেগম,, সেখানে গিয়ে দেখে আজমাল হোসেন Rocking chair এ আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন,, স্বামীকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে নিরবে ব্যালকনির গ্রিল ঘেসে দাঁড়ায় সাবিনা বেগম । দুজনের মাঝেই পিনপতন নীরবতা,, এই নীরবতা ভেঙ্গে আকাশের দিকে তাকিয়ে সাবিনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন । আচমকা ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলেন…
” আমাদের ঢাকায় আসার প্রায় দুই মাস হতে চলল তাই না ?
আজমাল হোসেন চোখ বন্ধ রেখেই ছোট্ট করে জবাব দিলেন…
” হুম….
” একবার ‘ হাতিরঝিলে ‘ গেলে হয় না ?
স্ত্রীর কথায় আজমাল হোসেন তড়িৎ বেগে চোখ খুললেন । কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন..
” আমি জানতাম,, তুমি একদিন না একদিন এই আবদারটা করবে । এখনো কিছু ভুলে যাওনি..?
” ভুলবো কি করে বলুন ? এই শহরের সাথে কতো স্মৃতি , কতো পাওয়া ,না পাওয়ার , হারানোর গল্প জড়িয়ে রয়েছে আমাদের ।
” শুধু কি হারিয়েছো ? পাওনি কিছু?
সাবিনা বেগম মুচকি হাসলেন এবার । আজমাল হোসেনের চোখে চোখ রেখে বললেন…
” পেয়েছি তো , জীবনের সব চেয়ে দামী জিনিসটা পেয়েছি । যেটা ছাড়া আমরা নিঃস্ব।
” তাহলে পুরনো স্মৃতি ঘাটছো কেনো ?
সাবিনা বেগম চোখ ছলছল এবং কন্ঠে মিনতি নিয়ে আবারো বললো..
” নিয়ে যাবেন ? শুধু একবার…
আজমাল হোসেন বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন । ভারী গলায় বললেন…
” ভুলে যাও ,, কিচ্ছু ঠিক হবে না..।
” জানি,, তবুও যে মন মানে না ।
এক দেখায় পর্ব ৫
এদিকে রাফি বাসায় এসে শাওয়ার নিয়ে শুয়ে পড়েছে । নিজের মুঠোফোনের গ্যালারি থেকে একটা Scrinshot নেয়া ছবি বের করে ।
