Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৭০

এক দেখায় পর্ব ৭০

এক দেখায় পর্ব ৭০
সুরভী আক্তার

রিসোর্টে ফিরেছে ওরা ।
রাত এখন দশটা পেরিয়ে এগারোটা । তিন দম্পতি সবে ডিনার সেরে নিজ নিজ ঘরে ঢুকলো । পাশাপাশি তিনটে রুম । মাহিম আর মেহজাবিনের রুমটা সামনেই । মাঝেরটা রুহি আর শান্তর । আর শেষেরটা রাফি মিহির ।
শান্ত আর রুহি ঘরে এসে খানিক রেস্ট নিয়ে এই রাতেই বিচের দিকে বেরিয়েছে । রুহির আবদার , রাফি এসেই মিহি কে নিয়ে বেরিয়েছিল একা একা । ওরা কেউ যেতে পারে নি । এখন ওর ইচ্ছে হয়েছে যাওয়ার । তাই ও যাবেই । শান্ত না করে নি । ডোর লক করে রুহি কে নিয়ে বেরিয়েছে । এই রাতের বেলা শনশন বাতাস বইছে । পুরোটা ফাঁকা আশপাশ । রিসোর্টের রিসেপশনেও কেউ নেই । শান্ত আর রুহি সবার অগোচরে বের হলো ।
বিচে পৌঁছে হাঁফ ছাড়ল রুহি । এখানে আসার জন্য এতটা উতলা হয়ে ছিলো ও । অবশেষে এখানে । কাল সবটা ঘুরে দেখবে সবাই । আজ পুরো রেস্ট । তবে রুহির তর সয় নি । আকাশে গোল রুটির মতো চাঁদ উঠেছে । সমুদ্রের পানি চাঁদের আলোয় ঝিকঝিক করছে মুক্তোর ন্যায় । নিঃশব্দে শান্ত ঠেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে । শিরশিরে বাতাসে শরীরে কম্পন ধরার দশা । রুহি চোখ বুজে দুদিকে হাত মেলে দীর্ঘ শ্বাস টানলো । নাসারন্ধ্রের ভেতর শিরশিরে বাতাস ঢুকতেই কেঁপে উঠলো ও ।
কম্পন রুখে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো শান্ত । তৎক্ষণাৎ দুচোখ খুললো রুহি । মৃদু হাসলো । শান্ত ওর কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে আলতো ঠোঁট ছোঁয়ায় সেখানটায় । মৃদু স্বরে ডাকে….

” জান ?
” হুম !
” আই লাভ ইউ !
” আই লাভ মি ঠু….
” আই লাভ ইউ ঠু বলতে হয় ! শেখো নি ?
” আমি আমাকে ভালোবাসি । আপনাকে তো বাসি না ।
” আমাকে ভালোবাসো না বুঝি ?
” উঁহু !
” সত্যিই ?
” একদম সত্যি ।
” তাহলে তোমার বিয়ে যখন অন্যকারোর সাথে হওয়ার কথা হচ্ছিলো , তখন কেঁদে ছিলে কেনো ?
” অন্য কারোর সাথে বিয়ে হলে আপনাকে জ্বালাতন করতাম কি করে ? অন্য কেউ কি আমাকে সহ্য করবে ? আপনি ব্যাতীত আমাকে সহ্য করার ক্ষমতা আর কারোর নেই । অন্য কারোর কাছে অসহ্য হতে চাই নি ? তাই কেঁদেছি ।

” শুধু তাই ?
” হুম ।
” তাহলে আমাকে ভালোবাসো না ?
” উমমম , নাহহ ?
শান্ত ছেড়ে দিলো ওকে । বললো…
” তাহলে চোখ বন্ধ করো , তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেবো । এটা পাওয়ার পর আমাকে ভালোবাসো কি না নিজেও বুঝতে পারবে ।
” কি সারপ্রাইজ ?
” সারপ্রাইজ বলতে নেই । চোখ বুজে নাও । আর ভালোবাসা বুঝে নাও..
রুহি উদ্দীপ্ত হয়ে চোখ বুজলো তৎক্ষণাৎ ।
দু সেকেন্ড পর প্রশ্ন করলো….
” চোখ খুলবো ?
” উঁহু , এখন না ।
পরবর্তী পাঁচ সেকেন্ড পর আবার একই প্রশ্ন করলো । একই উত্তর করলো শান্ত । এভাবে বেশ কবার প্রশ্ন করলো । শান্ত উত্তর করতে করতে পেছাতে লাগলো । ক্ষিণ হয়ে আসতে লাগলো ওর গলার স্বর । রুহি অধীর হয়ে উঠছে । মিনিট দুয়েক পেরোলো । লাস্ট দুবার শান্তর কোনো সাঁড়া পাওয়া যায় নি আর । রুহি এক প্রশ্ন বারবার করছে….
” কি হলো ? আর‌ কতক্ষন ? এবার তো চোখ খুলি ? শুনছেন , কোনো কথা বলছেন না কেনো ? আমি কিন্তু চোখ খুললাম ।
কোনো প্রত্যুত্তর নেই । নিরব সমুদ্র তটে বাতাসের শা শা শব্দ ভেসে আসছে শুধু । সাথে ঢেউয়ের কলকল ধ্বনি । রুহি বরাবর অধৈর্য । শান্তর সাঁড়া শব্দ না পেয়ে লাস্ট ওয়ার্নিং দিলো ও..

” আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই চোখ খুললাম এবার ।
কি সারপ্রাইজ আছে , তাড়াতাড়ি দিন না । আমি আর পারছি না । চোখ খুললাম ।
বলেই হাসি মুখে আঁখি মেললো রুহি । সামনে শান্ত নেই । হয়তো এখনো পেছনেই দাঁড়িয়ে । রুহি বলতে বলতে পিছু ফিরলো..
” কোথায় আপনার সারপ্রাই…
থেমে গেলো কন্ঠস্বর ।
পেছনে শান্ত নেই । কপাল গুটিয়ে আসে রুহির । চকিতে এপাশ ওপাশ চায় ‌। সামনে পেছনে , ডানে বামে কোথাও নেই শান্ত । ধক্ করে ওঠে রুহি । ধড়ফড়িয়ে শরীর ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকায় । নাহ , গোটা বিচ শূন্য । দূরে আলো আঁধারির মাঝে কত গুলো সারি সারি সান বেড ব্যতীত আর কিছুই দৃষ্টিতে পড়লো না । ছ্যাত করে ওঠে রুহি । ঢোক গিলে শরীরে ভালো মতো ওরনা টেনে নেয় । রুপোলি আলোয় আলোকিত সমুদ্র তট । এই রাত্রিতে জনমানবশূন্য নীরবতায় ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের কল্লোল ভেসে আসছে কানে । রুহি ঘন পলক ফেলে , গলা উঁচিয়ে ডাকে….

” কোথায় আপনি ?
আমার ভয় করছে ! কি সারপ্রাইজ আছে , সারপ্রাইজ দিতে গিয়ে আপনি কোথায় হারালেন ?
কারোর উপস্থিতির কোনো রেশ নেই ।
ভয় পায় রুহি । গলা শুকিয়ে আসে । চারদিকের আবছা আলো ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে ওর কাছে । গায়ে কাঁটা দেয় শিরশিরে বাতাসে । দাঁড়িয়ে যায় লোম কুপ । রুহি হাঁসফাঁস করে ওঠে । দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে সমুদ্র তটে এপাশ ওপাশ পা চালাতে লাগে । ও শান্ত কে কখনো নাম সম্বোধন বা অন্য সম্বোধনেও ডাকে না ।
শান্ত কোথায় গেলো ? সারপ্রাইজ আনতে গেলো বুঝি ? রুহি কি একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে চোখ খুলে ফেললো অধৈর্য হয়ে ? শান্ত ওকে এখানে একা রেখে গেলোটা কোথায় ?
রুহি কেঁপে কেঁপে ওঠে । সমুদ্রের দিকে তাকাতেই আঁতকে ওঠে । এই বিশাল নির্জন তটে নিজেকে একা আবিষ্কার করা মাত্রই ভয়ে জড়িয়ে যায় মেয়েটা । দুহাত জড়ো করে মুঠিয়ে নেয় । ঢোক গিলে ধীরে ধীরে পেছায় । মনকে বোঝায় , হয়তো শান্ত ওর জন্যই সারপ্রাইজ প্রেজেন্ট করতে গেছে । এক্ষুনি চলে আসবে ।
রুহি জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে ধীরে পেছায় । ভয়ার্ত চোরা নয়নে এদিক ওদিক তাকায় । গা ছমছম করে ওঠে ওর । এবার আর ভয় লুকাতে পারে না । দুহাত পেটের কাছে মুড়িয়ে নিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগে এলোমেলো পায়ে । এলোমেলো কদমে কয়েক পা পেছাতেই পিঠ ঠেকে শক্ত সুঠাম কোনো কিছুতে । রুহি ভড়কে পিছু ফেরে , আবছা অন্ধকারে চাঁদের আলোয় শান্তর উজ্জ্বল চেহারা খানা দেখতে পায় মেয়েটা । এক মুহুর্ত অপেক্ষা হয় না , সেকেন্ড পেরোতে না পেরোতেই দুহাতে শান্ত কে জাপটে ধরলো রুহি । ফিকড়ে ফুঁপিয়ে উঠলো । সবটুকু শক্তি দিয়ে হাতের বাঁধন দৃঢ় করে ফোঁপানো স্বরে নালিশ করলো….

” কোথায় গেছিলেন আমাকে ছেড়ে ?
আমি কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম আপনি জানেন ? আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেছিলেন আপনি !
” সারপ্রাইজ দিতে….
” রাখুন আপনার সারপ্রাইজ ! ভয়ে এক্ষুনি মরে যাচ্ছিলাম আমি । কোথায় আপনার সারপ্রাইজ ? কি সারপ্রাইজ আছে শুনি ? যা দেওয়ার জন্য আমাকে একা রেখে চলে যেতে হলো ? আর কোথায় গেছিলেন আপনি ?
শান্ত ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরেছিলো । হাত আলগা করলো শান্ত । রুহি কে নিজের বুক থেকে উঠিয়ে ভয়ার্ত মুখ পানে তাকিয়ে বললো নরম কন্ঠে….
” ভয় পেয়েছো ?
মাথা ঝাঁকায় রুহি । সে‌ ভীষণ ভয় পেয়েছে ।
শান্ত প্রশ্ন করলো….
” ভয় পেয়েছো কেনো ?
” এটা আবার জিজ্ঞেস করছেন ? কতটা ঘাবড়ে গেছিলাম জানেন ? কোথায় চলে গেছিলেন এর মধ্যেই ?
” কেনো ভয় পেয়েছো বলো আগে ? অন্ধকারে ? নাকি আমাকে দেখতে না পেয়ে ?
” দুটোই ।
” আমি যদি এভাবেই হারিয়ে যেতাম । তাহলে কি হতো ?
” হারাবেন কেনো আপনি ?
” তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না, তোমার থেকে হারালে ক্ষতি কিসে ?
” কে বললো ভালোবাসি না ? ভীষণ ভালোবাসি আমি ?
শান্ত মৃদু হাসে ।

” আচ্ছা ! একটু আগে কে যেনো বললো , আমাকে সে ভালোবাসে না ।
” ভুত বলেছে !
আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি । ভালোবাসা বলতে শুধু আপনাকেই বুঝি , আপনাকেই বুঝে এসেছি । কিন্তু আপনি আমার মনের কথা বোঝেন না । এক্ষুনি যদি ভয়ে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো….
” হুসস , সরি । চোখ বুজে রাখতে বলেছিলাম । রাখো নি কেনো ? আমি একটু ওদিকটায় গেছিলাম একটা জিনিস আনতে ।
” কি আনতে ?
” সেটাই তো সারপ্রাইজ ।
বলেই পিছন থেকে এক হাতে কিছু একটা বের করলো শান্ত । মাঝারি আকারের একটা ফানুস । নিচে আরো অনেক গুলো । অন্যহাতে লাইটার । শান্ত ফানুস টা দেখিয়ে অন্ধকারে ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
” চলো ফানুস ওড়াই ।

বারোটা বেজে দশ মিনিট ।
রিসোর্টের ছাদে আগমন রাফি আর মিহির । মিহির চোখ ঢেকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে সাবধানে উঠলো রাফি ।
মিহি বারবার উতলা হয়ে প্রশ্ন করছে , কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে ? কিন্তু রাফি কোনো উত্তর করে নি ।
মিহি অধৈর্য , উদ্বিগ্ন । ছাদে উঠে থামলো রাফি । মিহির চোখ থেকে হাত সরাতে সরাতে বললো….
” এখন চোখ খুলবে না । আমি বলবো তারপর খুলবে ।
বলেই সামনে দাঁড়ালো । ঠিক তিন সেকেন্ডের ব্যবধানে বললো….
” নাউ , ওপেন ইউর আই’স…
মিহি চোখ মেলে সাথে সাথে ।
অমনি দৃষ্টি রুদ্ধ হয়ে আসে ওর । রিসোর্টের বিশাল ছাদে লাইটিং করা । ডেকরেট করা । ছাদ জুড়ে গোল গোল মিনি বাল্ব জ্বলছে । ছয় তলার ছাদে সমুদ্রের পাড় থেকে আসা ঝড়ো বাতাস এলোমেলো করে দিচ্ছে সব ‌। মিহি তাজ্জব বনে চেয়ে রইলো । পুরো ছাদ জুড়ে সিল্কের সাদা সাদা পর্দা উড়ছে হাওয়ায় ।
ছাদের এক কোণে হোয়াইট সফট পর্দায় আবৃত একখানা পালঙ্ক । শিরশির বাতাসে ঢেউ খেলে উড়ছে পর্দা । তবে এগুলো নজর কাড়লো না মিহির । কাড়লো অন্য দৃশ্য । আকাশ জুড়ে ফানুস উড়ছে । মিহি আশপাশ দেখার আগেই আকাশ পানে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলো । শত শত ফানুস উড়ছে আকাশে ‌। আঁধারের বুক চিরে প্রদিপের শিখা জ্বলে আগুনের উষ্ণতায় একের পর এক ফানুস উড়ে যাচ্ছে আকাশের উদরে ।
মিহি ফিক করে হেসে আকাশ পানে চেয়ে বললো উৎসুক হয়ে….

” ওয়াও , কি সুন্দর !
এগুলোকে ফানুস বলে , তাই না ?
আপনি আমাকে এসব দেখাতে নিয়ে আসলেন ? কতগুলো ফানুস ! কে ওড়াচ্ছে ওগুলো ?
রাফি পিছনে নেই । ও পিছিয়ে গিয়ে ছাদের দরজা পুরোপুরি আটকে আসলো । মিহির পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম পলক মিহির দিকে তাকিয়ে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে পরের পলক চাঁদের সাথে সাথে ফানুসের আলো ছড়ানো দিগন্তের দিকে তাক করলো । শত শত ফানুসের হলদে মোমবাতির ন্যায় মৃদু মৃদু আলোয় আকাশ আরো বেশি আলোকিত । তার উপর ছাদের এতো এতো লাইটিং । রাতের অন্ধকার ঘুচিয়ে ফেলেছে সবটা মিলিয়ে । তবে রাফি আজ আলো চায় না । সে আসমান পানে তাকিয়ে বললো….
” তুমি ওড়াবে ?
” ফানুস ? আছে আপনার কাছে ?
” হুম !
চিকচিক করে উঠলো মিহি ।
” কোথায় ? নিয়ে আসুন ! আমাকে আগে বলবেন তো । দেখুন সবাই ফানুস ওড়াচ্ছে । কি সুন্দর লাগছে ..
” আমি যা দেখাতে তোমাকে এখানে নিয়ে আসলাম , তা কি আদৌ দেখেছো ?
মিহি বুঝলো না , কপাল কুঁচকে বললো…

” কিইই ?
” আশপাশ তাকিয়ে দেখো একটু ‌।
মিহি এতক্ষণে পুরোপুরি আশপাশ টা খেয়াল করলো ।
আগে এক পলকে লাইটিং ইফেক্ট দেখেছিলো একটু ‌। এখন পুরোটা দেখলো । ছাদের ডেকরেশন দেখে অবুঝের মতো বললো…
” এতো সাজানো কেনো ? কিছু আছে ?
” হুম !
” কিইই !
রাফি ওর অবুঝ পনা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো । এই মেয়ে এতো বোকা কেনো ?
রাফি আরো বেশি রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো । রেলিংয়ে ঝোলানো সিল্কের কাপড়ের পরত উড়ছে , উড়তে উড়তে তা ছুটে এসে বাড়ি খেলো রাফির উপর ।
রাফি চোখ বুজে শ্বাস টানলো । অতঃপর এক নিমিষেই হেঁচকা টানে মিহিকে টেনে নিলো নিজের কাছে । ওকে আছড়ে ফেললো নিজের বুকের উপর । মিহি বেসামাল হয়ে টাল হারিয়ে পড়লো । ভড়কালো খানিক । ও নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই রাফি প্রশ্ন করলো অতিব ক্ষিণ স্বরে….
” পা পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেছে , তাই তো ?
মিহি চোখ তুলে তাকায় ।
এক মুহুর্তে ছলকে ওঠে রাফির দৃষ্টিতে দৃষ্টি পড়তেই । রাফি সরু চাহনিতে মাদকতা । অদ্ভুত খেয়ালি দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাফি । নিঃশ্বাস গরম , যা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা পেরিয়ে আছড়ে পড়ছে মিহির মুখের উপর । মিহি শুষ্ক ঢোক গিলে বললো…

” হুম !
” আচ্ছা ।
বলেই মিহি কে ঘুরিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে নিলো রাফি । অতি আলগোছে আবেশে জড়ালো । কানের পাশে ফেললো উষ্ণ গরম শ্বাস । কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়ালো । বললো…
” এই মুহূর্ত টায় স্পেশাল কিছু চাই আমার । তাই সবটা সাজিয়েছি । স্পেশাল কিছুর জন্য । স্পেশালি পর ইউ…
মিহি ছ্যাঁত করে ওঠে । সরে আসতে চায় । আলগা বাঁধন থেকে আলগা হতে পারে খানিক । কিন্তু পুরোপুরি নিস্তার মেলে না । রাফি ছাড়ে না ওকে । মিহি চোখ নামিয়ে নেয় কুন্ঠায় । লাজে রাঙা হয়ে ওঠে, জড়তায় গুটিয়ে যায় নারী সত্বা । কিছু বলতে পারে না মুখ ফুটে ।
রাফি কেবলই ওকে পরখ করে মৃদু হাসলো । পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো আবার । দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে কাঁধে থুতনি ঠেকালো । খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির খোঁচায় শিহরিত হলো মিহি । চোখ বুজে নিলো তৎক্ষণাৎ । হাওয়ায় তাল মিলিয়ে রমনীর খোলা চুল উড়ছে বেপরোয়া । রাফি নাক ডুবিয়ে চুলের ঘ্রাণ টেনে নেয় চোখ বুজে । অতঃপর কানের কাছে মুখ নিয়ে কানের লতিতে আলগোছে ঠোঁট স্পর্শ করায় । হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় করে নেয় । আবারো হিসহিসিয়ে বলে….

” ইউ হেয়ার ? কিছু চাই আমার !
মিহি জিভে অধর ভিজিয়ে নেয় । বুঝেও মৃদু স্বরে বলে মিনমিন করে….
” ক…কি ?
রাফি ওকে নিজের দিকে ফেরায় । শক্ত করে কোমর চেপে ধরে । সবটুকু দূরত্ব ঘুচিয়ে নিজের দিকে পুরোপুরি টেনে নেয় মিহি কে । মিহি তাকাতে পারে না চোখ তুলে । গলে যায় মেয়েটা । জড়তায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে মাটিতে । রাফি ওর কপালে কপাল ঠেকায় । গালে এক হাত উঠিয়ে রাখে আলগোছে । ঝুঁকে ঠোঁটের কোণে স্পর্শ এঁকে ফিসফিস করে বলে…
” তোমাকে !
মিহি শ্বাস রুদ্ধ করে নেয় । রাফি গুনগুন করে নিজের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে….
“ Mujhko barsaath bana lo
Ek lambi Raat bana lo
Apnee jazbaat bana lo
Jaaaaan…..
মিহি একেবারে গলে পড়ে । মিলিয়ে যায় রাফির বুকে । হাঁটু কাঁপে থরথরিয়ে । নিজ শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না । আটকে রয় রাফির বাঁধনে ।
রাফি আবার ফিসফিসিয়ে বললো….

” এনি আদার প্রবলেম এট দ্যা মোমেন্ট ?
মিহির কন্ঠ রুদ্ধ । অনেকটা সময় বাদ ওর না বোধক মাথা
ঝাঁকানোর আভাস পেলো রাফি । অমনি হাসি ফুটলো পুরুষালি দু ঠোঁটের কার্নিশে । অস্বস্তিতে মিহি । ভীষণ ভয়াবহ জড়তায় নুইয়ে পড়েছে মেয়েটা । রাফি আরো একটু অস্বস্তি বাড়িয়ে শব্দ করে চুম্বন আঁকলো মিহির কানের পাশে ।
অতঃপর ওকে ছেড়ে ঝট করে কোলে তুললো ওকে । মিহি খেয়াল হারায় । আকস্মিক কোলে উঠে বরাবরের ন্যায় দুহাতে আকড়ে ধরে রাফির কলারের অংশ । এক পলক দু জোড়া দৃষ্টির মিলন ঘটলেও , পরের পলকে নিজের দৃষ্টি লুকিয়ে নেয় মিহি । গলার ভাঁজে মুখ লুকিয়ে নেয় লাজে । কন্ঠ চিপে উচ্চারণ করে….
” এটা ছাদ!
” এখানেই আয়োজন । ডোন্ট ওয়ারি…
নরম বিছানা । সাদা পর্দা উড়ছে টালমাটাল হয়ে দিকবিদিক । রাফি মত্ত মিহিতে । সর্বোচ্চ দখলদারি ফলাতে । মিহি কে সম্পুর্ন ভাবে নিজের করে নিতে ব্যস্ত সে ‌।

সকাল সাতটা ‌।
ফোনের টুং টুং বিকট শব্দ কানে আসতেই চরম বিরক্তি নিয়ে চোখ খুললো ইভান । বালিশের পাশ থেকে ফোনটা টেনে হাতে নিলো । ঘুম কাতর আধো চোখে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো । আননোন নাম্বার দেখেই বিরক্তির মাত্রা বাড়লো তড়তড় করে । কোন হতচ্ছাড়া ওর আরামের ঘুম হারাম করলো ? রাগে ফুঁসে গজগজ করে ফোনটা রিসিভ করে কানে চেপে ধরল ইভান । মুখ খোলার আগেই ওপাশ থেকে একটা চিকন মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো….
” গুড মর্নিং !
মেয়ের কন্ঠে আরো বেশি ক্ষেপলো ইভান । নিশ্চয়ই নাম্বার ভুলে রং নাম্বারে কল করেছে । নয়তো ওর ফোনে আননোন নাম্বার থেকে ফোন আসবে , তাও আবার মেয়ের, এটাও সম্ভব ? নিশ্চয়ই আননোন নাম্বার , আর নয়তো কেউ মজা করছে । কন্ঠ টা চেনা ঠেকলো না ।
ইভান ঘুমে ভার কন্ঠে কিড়মিড়িয়ে বললো….
” থাবড়িয়ে চৌত্রিশ টা দাঁত ফেলে দেবো । সকাল সকাল আরামের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে গুড মর্নিং বলতে আইছো ? কে হে তুমি ?
ওপাশ থেকে মৃদু স্বর….
” আমি তো মানুষ !
” কাকে চাই ?
” আপনাকে !
” চৌত্রিশ টা না , একেবারে ছত্রিশ টা দাঁত ফেলে দেবো এক থাপ্পড়ে । মশকরা করো সকাল সকাল ?
” উঁহু ।

এপাশে ইভানের আর কোনো সাড়া শব্দ নেই । ফোন ওভাবেই রিসিভ করা অবস্থায় রেখে দিলো ও । কার ফোনের এতো ফাও ব্যালেন্স আছে , যাক , এমনি এমনি কেঁটে যাক । ইভানের সাঁড়া শব্দ না পেয়ে ওপাশ থেকে আবার ভেসে আসলো একই স্বর….
” হ্যালো , আছেন ?
” না নেই , এই ফোনের মালিক এখন ঘুমাচ্ছে । আপনি ভুল নাম্বারে ডায়াল করেছেন । কথা বলার ইচ্ছে থাকলে অনুগ্রহ করে সকাল দশটার পর আবার ডায়াল করুন ।
ইভানের কথায় ওপাশ থেকে মৃদু হাসির শব্দ শোনা গেলো । মেয়েলি স্বরের ক্ষিণ হাসির ঝংকার । এহেন চিকন হাসির ঝংকারে বন্ধ ঘুম কাতর বন্ধ অক্ষি যুগল‌‌‌ তড়াক করে মেললো ইভান । ভ্রু গুটিয়ে বালিশ থেকে মাথা তুলে ফোনটা আবারো হাতে তুললো । স্ক্রিনের দিকে একপলক তাকালো আবার । নাম্বার একেবারেই অচেনা । কে হতে পারে এই মেয়ে ? তাও আবার এতো সকালে ?
ইভান ফোনটা আবারো কানে চেপে ধরে চোখ বুজলো । ওপাশ থেকে মেয়েটা হাসি থামিয়ে বললো….
” ভালো আছেন ?
” না ,, ভালো নেই !
তড়িতে উত্তর ইভানের । মেয়েটা আবার বলে…
” এতক্ষণে আমার জায়গায় একটা ছেলে থাকলে ফোন কেটে দিতেন । আমি মেয়ে বলে ফোন কাটছেন না , তাই তো ?
” আপনি মেয়ে হয়ে সকাল সকাল ফ্লার্টিং করতে এসেছেন কেনো ? মেয়েরাও আজকাল আননোন নাম্বারে ফ্ল্যাট করে , জানতাম না !

” ফ্লার্টিং করছি না তো ।
” তাহলে ফোন করেছেন কেনো , কে আপনি ?
” এমনি ফোন করলাম । এক চেপে আন্দাজে একটা নাম্বারে ডায়াল করলাম । আর আপনার কাছে পৌঁছালো আমার ফোন কল ।
” আচ্ছা , এবার ফোন রাখুন । আন্দাজে অন্য নাম্বারে ফোন করে ফ্লাটিং করুন । আমি ঘুমাবো । গুড বায় ।
মেয়েটা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো….
” আরে এতো তাড়া কিসের ?
ফোন যেহেতু করেছি , দু একটা কথা বলি ? আচ্ছা,, আপনি কি সিঙ্গেল ?
” হুম ।
” প্রেম করেছেন কখনো ?
” করেছি !
” কয়টা করেছেন ?
” দুটো ।
” মাত্র ? আচ্ছা বাদ দিন , আপনি বোধহয় বেশি সুন্দর নন । তাই মাত্র দুটো প্রেম করতে পেরেছেন । আজকাল কার ছেলেরা তো আনলিমিটেড প্রেম করে । এবার বলুন ,,‌প্রেম গুলো টিকলো না কেনো ?
ইভান চোখ বুজে ঘুম ঘুম স্বরে বাধ্যের মতো উত্তর করলো…

” মেয়ে গুলো একেকটা বজ্জাত ছিলো । তাই টেকে নি ।
” তার মানে ছ্যাঁকা খেয়েছেন ?
” দিয়েছি ।
” বাহ্ , আপনি কি খুব সুন্দর ?
” ভীষণ সুন্দর । দেখলেই প্রেমে পড়ে যাবেন ।
মেয়েটা আবার হাসলো । বললো….
” এবার দেখি আপনি ফ্লার্টিং শুরু করলেন !
” ছেলেদের স্বভাব ফ্লার্টিং করা ।
” যেহেতু দু’জনেই ফ্লার্টিং করছি , তাহলে চলুন দুজনে প্রেম করি ।
” উঁহু ।
” কেনো ? আপনি তো সিঙ্গেল , আর আমিও । আর দেখতেও সুন্দর আছি আমি । অপছন্দ করবেন না আমায় । চলুন প্রেম করি ।
” নাহ ।
” আবার নাহ , কিন্তু কেনো ? মেয়ে হয়েও আপনাকে প্রপোজ করছি , আর আপনি সিঙ্গেল হয়েও রিজেক্ট করছেন ? কেনো বলুন তো ? আপনি কি কউকে পছন্দ করেন ?

” করি ।
” কাকে ?
” একটা মেয়েকে !
” সে তো জানি । কিন্তু সেই মেয়েটা কে ?
” আপনি চিনবেন না !
” মেয়েটা কি খুব সুন্দর ?
” উমমম , অনেকটা সুন্দর ।
” আমি কিন্তু ওর থেকেও বেশি সুন্দর ।
” সৌন্দর্য ধুয়ে পানি খান ।
” অপমান করছেন ?
” করছি !
” সত্যিই আমি ভীষণ সুন্দর !
” সুন্দর মেয়েরা রং নাম্বারে ছেলেদের সাথে ফ্লার্ট করে না ।‌আর ফ্লার্টিং করা মেয়ে পছন্দ নয় আমার । মেয়েদের মাঝে একটু ইগনোর করার মতো এটিটিউড থাকতে হয় ‌। আমার উনি সামনাসামনি আমাকে ইগনোর করেন ।
” মানে ? মেয়েটাকে কি শুধু আপনি পছন্দ করেন ? নাকি মেয়েটাও আপনাকে পছন্দ করে ? আই মিন , মিউচুয়াল লাইক ?

” উঁহু , সে পাত্তা দেয় না আমায় ।
” হায় আফসোস , তার মানে আপনি দেখতে সুন্দর নন ।
” হুম , শেয়ালের মত দেখতে আমি । এবার ফোন রাখুন । বায়….
” আরে শুনুন না , এতো যাই যাই করছেন কেনো ?
কথা তো সবে শুরু হলো । আর একটু কথা বলি , দেখি আপনি আমার উপর পটে যান কি না !
” পটবো না । আমি যার তার উপর পটে যাই না ।
” তার মানে আপনি লয়াল ?
” হান্ড্রেড পার্সেন্ট ।
” তা সেই মেয়েটার নাম জানতে পারি ? যার জন্য আপনি হান্ড্রেড পার্সেন্ট লয়াল ।
ইভান মৃদু হাসলো । চোখ বুজেই বললো….

এক দেখায় পর্ব ৬৯

” বলবো না ।
” এ আবার কেমন নাম ?
হেসে ফেললো ইভান । অতঃপর কিছু না বলেই টুং টুং করে ফোনটা কেটে দিলো মুখের উপর ।

এক দেখায় পর্ব ৭১