এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৯
আসিফা খান
আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে লাজুকতায় ভরপুর হলো ইয়ানা।। মাগরিবের নামাজ শেষ করে সোজা মায়ের কাছে গেলো। আকুপাকু মনে মায়ের কাছ থেকে শাড়ির আবদার করতেই ইয়াসমিন বেগম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলো,,,
“এখন শাড়ি দিয়ে কি করবি?”
ইয়ানা আড়ষ্ঠ হলো।। লাজ এসে ভিড় জমায় অবয়বে।। মাথা নুইয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে মিনমিনে কন্ঠে বলল,,,”ওনার সাথে বেড়াবো একটু। শাড়ি পরতে বলেছে,,কিন্তু আমার কাছে তো শাড়ি নেই আর আমি পড়তেও পরি না।”
মেয়ের এরকম খাপছাড়া কথা শুনে ইয়াসমিন বেগম ঠোঁট টিপে হাসলো।। ইয়ানা কে আর ঘাটলো না।। আলমারি থেকে হট পিংক কালারের হান্ডুলোম শাড়ি বের করে ইয়ানাকে তাহ সুন্দর করে পরিয়ে দিলো। শাড়ীটা মূলত ইয়াসমিন বেগম ইয়ানার জন্যই কিনেছিল কিন্তু মেয়ে তার শাড়ি সামলাতে পারেনা ভেবেই এতদিন নিজের কাছেই তুলে রেখেছলেন। এখন মেয়েকে এই শাড়িতে দেখে মন ঠান্ডা হয়ে গেছে তার।। অত্যাধিক অদূরে লাগছে ইয়ানা কে। মেয়ের থুতনি ধরে তার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,,,
“কারোর নজল না লাগুগ।।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইয়ানা ক্ষীণ হেসে রুমে চলে এলো।। তত্পর ঘড়ি দেখল সাতটা বাজতে আর মাত্র দশ মিনিট।। ইয়ানা ঝটপট ম্যাচিং হিজাব বের করলো। হিজাব বেধে চোখে মোটা কাজল টানলো, ঠোঁটে হালকা গাঢ় লিপস্টিক।। ব্যাস এতেই ইয়ানা কে মারাত্মক রূপবতী লাগছে। নিজেকে একবার পরিপূর্ন ভাবে আরশি তে নজর বুলিয়ে নিয়ে বিছানায় বসলো ইয়ানা,,,অপেক্ষা করতে লাগলো রিফাত এর। ফোনে সময় সাতটা দুই।। আপন মনে বসে বসে পা দুলায় আর মোবাইল স্ক্রল করে।।,,,
হুট করেই মনে হলো কেও রুমে প্রবেশ করেছে।। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো রিফাত।। ক্লান্ত ভাব স্পষ্ট চোখে মুখে।। দ্রুততার সঙ্গে নিজের ফোন, পার্শ্,চশমা এক এক করে টেবিলে রাখতে ব্যাস্ত সে।। ইয়ানা বুঝতে পারে রিফাত এর কাণ্ড।। চট জলদি ইয়ানা টেবিল থেকে পানি ভর্তি গ্লাস নিয়ে ধির পায়ে হেঁটে রিফাত এর পিছনে দাঁড়িয়ে মিহি স্বরে বলল,,,
“পানি।”
রিফাত পিছন ফিরে তাকালো।। রুমে প্রবেশ করার সময় ক্লান্তির চোটে সে ইয়ানাকেও দেখতে পাইনি।। কিন্তু এখন ইয়ানা কে দেখা মাত্র রিফাত এর যেনো হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল মুহুর্তেই।। তার সম্মুখে উপস্থিত রমনীর রূপ রিফাত কে বিস্মিত করছে।। প্রহরেই চোখে মুখের ক্লান্তি উবে সেখানে এসে হাজির হলো এক রাশ মুগ্ধতা।। ইয়ানার দিকে চেয়ে থেকেই পানির গ্লাস হাতে নিলো,,, চুমুকও বসালো একই ভাবে থেকে। এখন সত্যিই তার গলা শুকিয়ে আসছে।। পানির দরকার।।,,, রিফাত এর কাছে ইয়ানা কে এখন ইয়াবা লাগছে। মেয়েটাকে দেখেই তার কেমন নেশা লেগে আসছে। সব কিছুই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।। রুমের আবহাওয়ায় হঠাৎ করেই উষ্ণতার পরিমাণ বাড়ছে।। রিফাত জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,,,
“আমার শার্টের বোতাম গুলি সযত্নে খুলে দাও।”
রিফাত এর এহেন কথায় ইয়ানা বিচলিত হয়। এমনিও তার দিকে রিফাত এর অন্তর কে ঝালাফালা করা চাহনি,,,তাকে অস্বস্থিতে জর্জরিত করছে তারউপর ছেলেটার এমন বাক্যে ইয়ানার বুক ধক করে উঠলো। সহসা ইয়ানা কাপা কাপা হাতে রিফাত এর শার্টের বোতাম খুলে দিতে লাগলো।। রিফাত পানির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে গভীর কন্ঠে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,,,
“কাপাকাপি হচ্ছে কেনো? চুমু দিতে বলিনি সিম্পল সাধারণ একটা কাজ দিয়েছি তাতেই এই অবস্থা!”
রিফাত এর কথায় ইয়ানা মুচড়ে ওঠে।। মিহীয়ে পড়ে বিশাল।। লজুকতায় ঝিমিয়ে পড়া এই হৃদয় কাপানো রমনীকে রিফাত নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু নিজেকে সংযত রাখলো বহু কষ্টে।।এক পর্যায়ে রিফাত হতে সরে এলো ইয়ানা।।রিফাত ও আর সময় নষ্ট করলো না। আলমারি থেকে নিজের প্রয়োজনীয় পোষাক নিয়ে ঢুকলো ওয়াশরুমে।। মিনিট পনেরো পরেই বেরিয়ে এল সে। পরনে সাদা আর হালকা গোলাপি রঙের লম্বা দাড়ি কাটা শার্ট আর কালো প্যান্ট। হাতা গুটিয়ে কনুই পর্যন্ত থাকায় লোমময় শুভ্র হাত স্পষ্ট।
ইয়ানার নজর নিজেকে সামলাতে পারছে না।। সদ্য বেহায়া হয়ে ওঠা আঁখি জোড়া লাগাতার তার ব্যাক্তিগত পুরুষকেই দেখে চলেছে।। কি অপুরুপ তার বর। যেমন রূপে ভরপুর ঠিক তেমনি গুনবান। একটা ছেলে এত নিখুঁত ব্যাক্তিত্বের অধিকারী কি ভাবে হতে পারে? কথাটা প্রায়সময়ী কিলবিল করে ইয়ানার মাথায়। মেয়ে হয়েও সে এত অবিকল নয় যতটা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের চুলে ব্রাশ চালানো পুরুষটি।। ইয়ানা তার চোখের দৃষ্টিতে এতই বুঁদ যে রিফাত তার সামনে এসে কখন দাড়িয়েছে তার হুস নাই।। রিফাত ভ্রু নাচিয়ে তুরি বাজাতেই ধ্যান ভাঙলো ইয়ানার,,,লজ্জায় আলুথালু অবস্থা হলো ক্ষণেই।। রিফাত দেখলো মেয়েটার কাহিল রুপ,,,দৃষ্টি রাখলো প্রখর। তৎপর অদ্ভুত কন্ঠে সুধালো,,,,
“এমন কাজের লাভ কি যার ইতি লজ্জা!”
ইয়ানা ভরকালো তবে উত্তর করলো না। রিফাত আবারও একই রকম ভাবে সূধালো,,,
“তোমরা মেয়েরা এত ভয়ংকর কেনো? কাছে আসলে দূরে পালাও,,,আবার দূরে ঠেলে দিলে নিজেই কাছে এসে আমাদের দাহ করো। রূপ দেখিয়ে মোহিত করো।। এক নারীর যন্ত্রণা কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেক রমনীর নিজের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে লেগে পড়ে।। বোঝোনা কেনো এই জ্বালা,পীড়া আমাদের মত নিরীহ পুরুষদের ছারখার করে দেয়।!”
ইয়ানার লাজুকতা কেটে গেল আনমনেই,,, সাহসা এসে হাজির হলো এক রাশ কৌতূহল। রিফাত এর বলা কথা কর্নে পৌঁছালেও তাহ ঠাওর করতে পারলনা মস্তিষ্ক। বোঝার চেষ্টা করেও অসফল হলো মেয়েটা।। ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল রিফাত এর পানে। ভ্রু কুঁচকে,,,বললো,,,
“মানে কি বলতে চাইলেন! বুঝলাম না তো। এক নারী,আরেক রমণী,নিরীহ পুরুষ,জ্বালা পীড়া সব কিছুই মাথার উপর দিয়ে গেলো।”
রিফাত ঠোঁট প্রসারিত করলো খানিক।। মেয়েটা তার অবুঝ পাখি।। পরক্ষনেই রিফাত এর বুক ধুপ করে উঠলো,,,মেয়েটা এখন তার কথার অর্থ না বুঝলেও পরে ঠিকই বুঝবে।। আচ্ছা যখন বুঝবে তখন ইয়ানা আদেও রিফাত কে মানতে পারবে তো?রিফাত আর ভাবতে পড়লো না।। আবেগময় ভাবে হাতের উল্ট পিঠ ছোঁয়ালো ইয়ানার মসৃণ গালে। কেপে উঠলো ইয়ানা।। রিফাত এর চোখে ভরে উঠলো আবেশ মেলা। অপলক তাকিয়ে,,,হালকা ভঙ্গিতে গালে হাত ঘষতে ঘষতে মৃদু স্বরে বলল,,,
“কন্ডিশন ইয়ানা। আড় চোখে তাকাতে পারবে না আমার দিকে,,,পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাতে হবে। চোখে চোখ রাখতে হবে।। নাহলে সাজা হিসাবে,,,,দশমিনিট চোখের পাতা না ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।”
ইয়ানা হা হয়ে রইলো।। রক্তিম হলো শুভ্র গাল। চোখের পলক ফেললো কয়েকবার।। রিফাত দেখলো সবটাই।। বুঝলো মেয়েটাকে চেয়ে ফেলেছে তার বিরহ মন। কারোর মায়া সে কাটাতে শুরু করেছে! কারোর চেহারা দেবে যাচ্ছে মনের কোণে।
রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো।।,,,ইয়ানা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো,,,
“সাড়ে সাতটা বাজতে চললো!”
রিফাত এর টনক নড়ল। দ্রুত সব গুছিয়ে গাড়ির চাবি নিয়ে অপর হাত দিয়ে ইয়ানা হাত চেপে ধরলো। সময় ব্যায় না করেই বেরিয়ে গেল রুম থেকে।। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখলো ড্রইং রুমে সবাই উপস্থিত। আলোচনা চলছে কোনো বিষয় নিয়ে। রিফাত আর ইয়ানা দেখে ইব্রাহিম সাহেব বললেন,,,
“কোথাও যাচ্ছ দাদুভাই?”
“হ্যাঁ,,,একটু বেড়াচ্ছি।”
ইব্রাহিম সাহেব উৎফুল্ল কন্ঠে কইলো,,,”বাহ্,,যাও যাও ঘুরে এসো দুজন।। ফিরতে কি রাত হবে দাদুভাই।”
রিফাত সায় দিয়ে বললো,,,”হলেও হতে পারে দাদু।। আসছি,,,আল্লাহ হাফিজ।”
সকলে শুভ বিহায় জানালো তাদের।। এদিকে ইব্রাহিম সাহেব আর ইসরাত বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।।
রাস্তা ঘাট যানবাহনে ভরা।। আপনা কাজে ব্যাস্ত সকলে। মানব জীবন যাত্রায় শরিক এই অস্থির দল।। রাতের আকাশ আজ তারায় রঞ্জিত। মিট মিট করে যেনো তাকিয়ে দেখছে মনুষ্য কর্ম,,,হয়তো বা বলছে ‘ তোমারে আল্লাহর শ্রেষ্ট সৃষ্টি,,আশরাফুল মাখলুকাত’।। অনবসর জীবন ক্রিয়ার রজনী অবকাশে নিরব ইয়ানা। জানালার বাইরে চেয়ে আছে চাঁদের দিকে। ছোটো কালে মনে হতো চাঁদ তার সাথে যাচ্ছে। তাকে অনুসরণ করছে।। ছোটো বেলার অদ্ভুত এই ধারণা আজ আবারও মস্তিষ্ক নাড়ালো।। সত্য জেনেও ভাবতে ভালোই লাগছে যে চাঁদ তার সাথে সাথেই চলছে,,,দেখছে ইয়ানা কে।।
হঠাৎ গাড়ি থামলো সিগন্যাল এ, গতিপূর্ণ যানবাহন আটকা পড়েছে আইন অনুযায়ী।। ইয়ানা চোখ ঘোরালো,,রিফাত এক নাগাড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।। ইয়ানা ছোট্ট শাস ছাড়ে। তার বর বড়ই ঘাড় ত্যাড়া। তারা কোথায় যাচ্ছে,কথাটা প্রায় চার বার জিজ্ঞাসা করেও উত্তর মেলেনি তাই ইয়ানাও পন করলো চুপ থাকার।।
মাথা বাঁকিয়ে আবারও বাহিরের দিকে তাকাতেই ইয়ানা চমকে উঠলো। আত্কে গেলো অন্তর। অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছালো সে। নাক মুখ কুচকে ফেললো নিমিষেই,,,শরীর দুলে উঠলো।ভারী নিশ্বাস ফেলে চোখ বুজে বেশ মিন মিনে ও উত্কণ্ঠিত ভাবে আড়াল,,”নাউজুবিল্লাহ।”
দ্রুত গতিতে জানালার কাঁচ বন্ধ করলো। মনোরম রাতের আকাশ দেখার অভিজ্ঞতা আর অর্জন করতে দিল চাইলো না।। সেই লজ্জাজনক দৃশ্য সে আর দোবারা দেখতে চায়না,,,একদম না।
রিফাত ভ্রু কুঁচকে বললো,,,”জানালা আটকালে কেনো?”
ইয়ানা তড়াক করে উঠলো।। জানালায় পিঠ ঠেকিয়ে ভীতিগ্রস্ত হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললো,,,”উম হুঁ,,,কি কিছু না। আপনি,,,আপনি সামনে তাকান।”
“এমন করছো কেন? নাকের ডগা ঘামছে,,,কি হয়েছে?,,সরে বস,,,দেখতে দাও বাহিরে।”
“না না,,,,বললাম না সামনে তাকান। বাহিরে কিছুই না। ও এমনি বন্ধ করেছি।”
“সোরতে বলেছি।”
ইয়ানা এবার কাদো কাদো মুখ করে বললো,,,”দেখুন হুমকি দেবেন না।। আপনি যদি এদিকে তাকান তাহলে আমি,,আমি,,,,”
বলতে পারলো না ইয়ানা।। অমন অশ্লীলতা করবার রিফাত এর চোখে পড়লে সে লজ্জায় একাকার হবে।। ইয়ানার একটু রাগও হলো,,,রাস্তায় অমন কে করে? তাদের কি শরম নেই,,,নেই বিন্দু পরিমাণ ভদ্রতা।। ইয়ানা কে ঘামতে দেখে রিফাত এসি ছাড়লো।। বুঝলো মেয়েটা বেশ সংশয়ে ভুগছে।। লাল বাতি সবুজ হলো। একে একে ছুটলো সকল যানবাহন।। ইয়ানা এবার একটু স্বাভাবিক হলো। কিন্তু তাহ ঠিক সইলো না রিফাত এর। মেয়েটাকে বাকি রাস্তায় লজ্জায় ছারখার অবস্থায় দেখতে চায়।। দেখতে চাই তার চঞ্চল বউ কে নিরীহ দশায়।। রিফাত গাড়ি চালানোর সাথে সামনে তাকিয়ে গভীর কন্ঠে বলল,,,
“গাড়িতে রোম্যান্স অসাধারণ। ওরা সঠিক কায়দা জানে না মে বি।”
রিফাত এর বাণী যেনো বিস্ফোরণ ঘটালো। আঁখি ইয়ানার চৌচির। হৈচৈ বাঁধালো লজ্জার পাল।। ইসস তার মানে রিফাত দেখেছে সেই কাঙ্ক্ষিত শরমনাক দৃশ্য। ছিঃ ছিঃ।। নাক লাল হয়ে এলো তার। চোখ তুলে তাকানোর সাহস টুকু নেই ইয়ানার মাঝে।। রিফাত কোনো চোখে পরখ করলো তার পাশে বসা লজ্জাবতী লতিকা কে। বাঁকা হাসলো। হৃদয় ঠান্ডা হয়ে আসলো। মেয়েটার লাজুক ভঙ্গি রিফাতের যেনো আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।।
ইয়ানা মনে মনে ভাবলো,,,”পুরুষ মানুষ সত্যি রহস্যময় চরিত্র। শান্ত নদীর মত রিফাত এর ভিন্ন রকম সত্তা দেখছে ইয়ানা।। পুরুষ সব পারে,,,পুরুষ অবহেলায় রাখে,আগলে রাখে মাঝে মধ্যে লজ্জায় ভরিয়েও রাখে।।”
ইয়ানা ভারিক্কি নিশ্বাস ফেললো। গোপনে তাকালো রিফাত এর পানে।। সুখ অনুভব করলো নিজের আত্মায়।। এই মানুষটা দিনে দিনে তার অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে,,,মানুষটাকে ছাড়া এক পল কল্পনা করাও শ্বাসরুদ্ধকর।।
গাড়ি থামলো বিশাল রেস্তোরার সামনে।। পার্কিং ব্যবস্থায় রিফাত গাড়ি রাখলো যথাযথ স্থানে। তত্পর গাড়ি থেকে নেমে ইয়ানার হাত ধরলো। বড়ো বড়ো পা পেলে এগিয়ে যেতে লাগলো রেস্টুরেন্টের দিকে।। রিফাত সাভাবিক হাঁটলেও তাল মেলাতে বেগ পাচ্ছে ইয়ানা। এক প্রকার জগিং এর ন্যায় পা চালাচ্ছে সে।। ইয়ানা একটু উচ্চ কন্ঠে বলল,,,
“আস্তে হাঁটুন না।”
রিফাত পিছন ফিরে তাকালো। বিলম্ব না করে সরাসরি হাত রাখে ইয়ানার কোমরে। চেপে ধরে নিজের সাথে। ইয়ানা চমকালো। আসে পাশে তাকালো। নাহ তাদের দেখার মত কেও নেই আর থাকলেও তারা নিজে দের মাঝের ব্যাস্ত।।
রেস্টুরেন্টের সামনে তাকাতেই ইয়ানার চোখ চকচক করে উঠলো।। প্রিয় বান্ধবীকে দেখে মন হলো চঞ্চল।। সলজ্জ ভঙ্গিতে রিফাত হতে নিজেকে ছাড়িয়ে এক প্রকার ছুটে আতিকা কে জড়িয়ে নিল। আতিকাও ঝাপটে ধরে সখি কে।। আহিল এগিয়ে এসে রিফাত এর সাথে হ্যান্ডসেক করে।। রিফাত এক পলক দুই বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে বললো,,,”বাকি গল্প নাহয় ভিতরে গিয়ে কোরো।”
“হ্যাঁ,,,ভাইজান চলুন।”
আতিকা সম্মতি জানিয়ে ইয়ানার হাত ধরে টেনে ভিতরে প্রবেশ করলো।। এক প্রান্তে পাশাপাশি বসলো দুই রমণী। রিফাত আর আহিল একে অপরের দিকে চেয়ে রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে তারাও পাশাপাশি বসলো।। আহিল হালকা হেসে ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বললো,,,”বোন কাম শালী সাহেবা ট্রিট চেয়েছে আর আমি তাহ কি ভাবে ফেলতে পারি!”
ইয়ানা মিষ্টি হেসে বলল,,,”ট্রিট আমার প্রাপ্য ছিল দাদাভাই।। লুকিয়ে বিয়ে করেছো তোমরা এইটুটু পকেট ঢিলা তো বেমানান।।”
আহিল মাথা চুলকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো,,, আতিকার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,,,”আমার হাত বাঁধা ছিল ইনু। বান্ধবী তোমার পুরায় আগুন,,,পুড়িয়েছে আর পড়াচ্ছে ভীষণ।।”
“কেনো তুইকি ঘুঁটে!” বন্ধুর গা জ্বালানো কথা শুনতে পেলো আহিল। অত্যাধিক ধির কন্ঠে কথাটি বললেও কান খাঁড়া আহিল এর তাহ শ্রুতিহীন হয়নি।। সেও চোখ ছোটো ছোটো করে রিফাত এর উদ্দেশ্যে ধিমে স্বরে বলে,,,”তুই কি বুঝবি প্রেমের কথা। বেরসিক একটা।” কথাটি শুনে পত্তাদিল না রিফাত। সে যাহ সেটা সবাইকে জানানোর প্রয়োজন নেই,,,তার ভীতু পাখি দেখেছে তার আসল রূপের একটু ঝলকানি।।
এদিকে আতিকা লজ্জায় লাল হলো কিন্তু চোখে দৃঢ়তা রাখার চেষ্টা করে চায় আহিল পানে।। আহিল গলা কেশে উঠলো,,আবাও বললো,,,”আচ্ছা আরো পকেট ঢিলা করতে রাজি আমি। কি চাও বলো,,,”
“ভেবে বলবো,,,আপাতত এটুকুই এনাফ।”
ইয়ানা কথা শেষ হতেই রিফাত মেনু হতে নিজের নজর সরিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বললো,,,”কি খাবে?”
ইয়ানা ওমনি বললো,,”আইস্ক্রিম।”
“ডিনারে এসেছি পার্কে নয়।। পেট ভরার মত কিছু বলো,,,”
ঠোঁট বাঁকাল ইয়ানা।মিন মিন স্বরে উচ্চারণ করলো,,,”রাক্ষস।”
রমণীরা গল্প ব্যাস্ত। খাবারের জিম্মা ছেলেদের ওপর ছেড়েছে তারা। রিফাত ওয়েটার ডাকলো,,,আদেশ দিল কিছু নামজাদা খাবারের।। কিছু মুহূর্তের মধ্যে টেবিল হলো ভরপুর।। খাবার খেতে আরম্ভ করলো সকলে।। কিন্তু ইয়ানা আর আতিকা খাচ্ছে কম আর কথা বলছে বেশি যাহ দেখে রিফাত বললো,,,
“ইয়ানা প্লেটের খাবার পাঁচ মিনিটে শেষ করবে,,,নাহলে এখানে ছেড়েই আমি বাড়ি ফিরে যাবো।।”
“আমিও,,,,”
রিফাত এর শাসানো সুরে ইয়ানা ভরকাল। আর এর ‘ আমিও ‘ শুনে আতিকা চমকে উঠে।। মনে মনে ভাবলো কি এক বর পেয়েছে তারা।। দুই চঞ্চল ভীতু সখি তাদের পুরুষদের দেওয়া হুমকি সত্য স্বরূপ গ্রহণ করে খাওয়া শুরু করলো।। টুকটাক কথা বার্তা আর দীর্ঘ সময় লাগিয়ে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করলো সবাই।। সর্ব শেষে আনা হলো ডেজার্ট জাতীয় খাদ্য যেটা শুধু মাত্র ইয়ানা আর আতিকা জন্য।। আতিকা এক চামুচ ডেজার্ট মুখে পুরে উসখুস বদনে নড়ে চড়ে বসলো তত্পর মিষ্টি হেসে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বললো,,,
“ভাইজান আপনাদের কলেজ লাইফ এর বিষয়ে কিছু বলুন না।।”
আতিকার কথায় অপ্রস্তুত হলো রিফাত।। স্বাভাবিক থাকা মুখায়ব হঠাৎ গম্ভীর রূপ ধারণ করলো।। কিছু তিক্ত সৃতি মস্তিষ্ক আঁকড়ে ধরলো।। ইয়ানার কথা যেনো এক পল ভুলেই বসলো। বিষাদ ছুঁয়েছে হৃদয়।। পরমুহূর্তেই চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখল ইয়ানা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারই পানে।। রিফাত শুকনো ঢোক গিলে সামনের চুলে আঙ্গুল চালিয়ে পিছনে ঠেলে দিলো। আহিল বুঝলো বন্ধুর ক্লেশ,,,পরিস্থিতি অনুকূলে আনার জন্য হালকা হেসে বললো,,
“মেডিকেল লাইনে পড়াশোনায় কলেজের মজা উপভোগ করতে পারিনি আমরা। তাই বলার মত বিশেষ কিছু নেই।”
আহিল এর কথা শুনে আর আতিকা কিছুই বললো না।। রিফাত গলা ঝেড়ে আসন রেখে উঠতে উঠতে বললো,,,”আম জাস্ট কামিং”
ইয়ানা কিছু বলতে নিলেও চুপ করে গেলো।। তাকিয়ে রইল রিফাত এর যাওয়ার পথে।। চুপসে গেল মেয়েটা,,,রিফাত এর এই ভাবে উঠে চলে যাওয়াটা সঠিক ঠেকলো না তার কাছে।। আহিল লক্ষ্য করলো ইয়ানার উদাস চেহারা তাই আগ বাড়িয়ে বললো,,,
“হয়তো দরকারে গেছে,,,চলে আসবে এখনি।”
ইয়ানা সামান্য হাসলো।। সে হয়তো একটু বেশিই ভাবছে,,,কথাটি মনে মনেই আড়িয়ে শান্ত করলো নিজেকে।।
সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাস কে অশুদ্ধ করে তুলছে কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একের পর এক টান দিচ্ছে রিফাত।। নিজেকে সামলে ব্যাস্ত সে।। ক্লেশপূর্ণ অনুভূতিকে ভুলে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত।। রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো গোপনে।। অন্যায়! ইয়ানার সাথে অন্যায় করছে না তো রিফাত? ধোকায় রাখছে কি মেয়েটাকে?!বুক কেপে উঠলো নিমিষেই।। কাওকে হারিয়ে অন্য একজন কে কি আকড়ে ধরে বাঁচা সম্ভব!। নিমিষেই ভেসে উঠলো ইয়ানার নিষ্পাপ মুখশ্রী।। ঘন নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বুজে।। অতীত এর কাছে নিজের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কে বিষিয়ে তুলতে পরে না সে,,,পারে না বিবেক হারাতে।। ছন্নছাড়া রিফাত কে গুছিয়ে তুলেছে ইয়ানা।জীবনের পাঠ শিখিয়েছে,,,বুঝিয়ে দিয়েছে সে ছাড়া কেও রিফাত কে ভালো রাখতে পারবে না। ভাঙ্গা হৃদয় গড়িয়ে নিজের অস্তত্বকে বিরাজ করছে তার মনে। অনন্য সেই মেয়েকে কষ্ট দিলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও নারাজ হবে।। অশান্ত অনুভূতির সমাপ্তি ঘটিয়ে আপন মনে বোঝালো নিজেকে,,,
“প্রথম জীবনের পীড়া শেষ হোক। ইয়ানা হোক আমার শেষ জীবনের সম্বল।। দ্বিতীয় নয় বরং পরিণাম হক আমার।। তৈরি হোক আমার মনে অন্তহীন ভালোবাসা।। অনুভবে, অরুরাগে মিশে যাক আমার।। আল্লাহর দেওয়া রহমত কে অবহেলা নয় আগলে রাখতে হয় রিফাত।। একান্ত আপন সে আমার,,,আমার অর্ধেক, আমার স্ত্রী, আমার ইয়ানা।।”
অর্ধ জ্বলন্ত সিগারেট হঠাৎ কেও আঙ্গুলের ফাঁক থেকে টান দিয়ে দূরে ফেললো।আকস্মিক ঘটনায় বিস্মিত হয় রিফাত। পরক্ষনেই শুনতে পায় চিরচেনা কণ্ঠস্বর,,,
“আবার এই ছাইপাশ খাচ্ছেন? এক জন ডক্টর হয়ে এইধরনের কাজ অন্যায়,বেমানান। রোগী দের কি পরামর্শ দিবেন যেখানে নিজেই নিজের সাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন।। আর এই সব খারাপ মানুষেরা খায়: আপনি না ভালো।”
রিফাত এক পলক তাকালো ইয়ানার পানে।। তার বুক পর্যন্ত ও আসে না মেয়েটা আর সে নাকি তাকে শাসন করছে। ভাবা যায়! রিফাত হাসবে না মেয়েটার কথার উত্তর দেবে ভেবে পেলো না।।রিফাত খানিকটা ঝুঁকে পড়ে মেয়েটার সামনে,,,হাত ধরে নিজের দিকে টেনে আনে,,ভ্রু নাচিয়ে বলে,,,
“কে বললো আমি ভালো?”
“তবে কি ভালো নন?”
ইয়ানার অবুঝ সুলভ প্রশ্নে রিফাত থমকাল। এই রকম একটা মেয়েকে কি ভাবে সে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে!। রিফাত ঠোঁট প্রসারিত করে টোকা মারলো ইয়ানার কপালে। কাধ উচু করে বললো,,,
“আই ডোন্ট নো।।”
ইয়ানা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল,,,,
“এখানে একা দাড়িয়ে আছেন কেনো?ওখানে সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
“সবাই নাকি তুমি?”
ইয়ানা এবার একটু শঙ্কায় পড়লো।। সত্য প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। লজ্জায় অনল হলো লাজুক। কি ভাবে বলবে যে,রিফাত এর শূন্যতা তাকে জলাচ্ছিল। তাই তো থাকতে না পেরে নিজেই ছুটে এলো তার কাছে।। রিফাত বুঝলো তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমনীর মনভাব। প্রশান্তি বয়ে গেলো মন আঙিনায়।। আত্মোক্লেশ উবে গেল মুহুর্তেই।।রিফাত শান্ত কন্ঠে বলে,,,
“কিছু মিনিটের দূরত্ব বরদাস্ত করতে পারছ না! যেদিন এই আমিটাই থাকবো না তখন কি করবেন মিসেস?”
ইয়ানা বুকের ভেতর সব কিছু উলট পালোট হয়ে গেলো যেনো। ফাঁকা হলো মস্তিষ্ক।। জ্বলজ্বলে চোখে তাকালো রিফাত এর দিকে।। ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে রিফাত এর কথার সারমর্ম।।অন্তরের ত্রাস অন্তরালে রেখে ইয়ানা চোখে মুখে মিছে রাগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বললো,,,
“আপনি সত্যিই ভালো নন,,,খারাপ! ভীষণ রকম পচা।। একাই দাড়িয়ে থাকুন,,,আমি গেলাম।।”
ইয়ানা চলে যেতে নিলে রিফাত ঘপ করে ইয়ানার হাত টেনে তাকে আটকিয়ে নেয়। আপন বুকের সাথে ইয়ানার পিঠ ঠেকিয়ে দাড় করায়। সামান্য ঝুঁকে পড়ে বলে,,,
“কি হলো! রাগ,অভিমান নাকি দুঃখ?”
“যাই হোক তাতে আপনার কি?”
“আমারই তো। All of you, including you.”
ইয়ানা আরক্ত হয়। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,,,”ছাড়ুন,,,কেও দেখলে খারাপ ভাববে।”
“ভাবুক,দেখুক,বুঝুক,জানুক আর বলুক সবাইকে যে রিফাত কতটা বদলে গেছে,,,কতটা উন্মাদ মানবে পরিণত হয়েছে”
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৮
মনে মনে কথাটি উচ্চারিত করে রিফাত আলগোছে ঠোঁট ছোঁয়ার ইয়ানার মাথায়। হিজাবের ওপর দিয়েও ইয়ানা বোঝে কাঙ্ক্ষিত স্পর্শ। চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সবটাই। মুচকি হাসে।। এবার ঘুরে দাঁড়ায় রিফাত এর মুখমুখি। মাধুর্য কন্ঠে বলে,,,
“আপনি আর ওই সব খাবেন না।।”
রিফাত ও চোখে গভীর ভাব এনে সুধায়,,,”নেশার বদলে নেশা চাই। যে আসক্তি বিষাক্ত নেশা কেও হার মানাবে।”
