এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৫
আসিফা খান
কেটেছে বেশ কিছু দিন। সময়ের স্রোতের সাথে চলছে সবার জীবন যাত্রা। কারোর একঘিয়েমি আবার কারোর যন্ত্রণায়। আলেয়া এর মধ্যে কোনো রকমেরই জীবন যাত্রার পথিক নয়। তার দিন যাচ্ছে ভয়ে,,,বই খাতা কলমের মাঝে আবদ্ধ। পরীক্ষা তার প্রায় শেষের দিকে। আর দুইটো হলেই আলেয়া শান্তির নিশ্বাস ত্যাগ করবে। রোজ যাতায়াত করে বাবার সাথে,,,কিন্তু আজ তিনি বড্ডো ব্যাস্ত। তাই আজ আলেয়ার স্কুল এর সামনে দাড়িয়ে আছে হাফিজ।। গাড়িতে হেলান দিয়ে ঘড়ি দেখছে একবার তো আবার তাকাচ্ছে গেটের দিকে। আজ কাল সে অনেক বিজি থাকে,,,অফিসের কাজে দিন যায় তার। লাস্ট আলেয়ার সাথে কথা হয়েছে তার পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিন,, তাও শুধু অল দ্যা বেস্ট বলার জন্য।।
কিছুক্ষণের মাঝে গেট খুললো,,,হুর হুর করে বেরিয়ে আসতে লাগলো ছাত্র ছাত্রী দের দল।অপেক্ষার এক পর্যায়ে দেখা মিলল আলেয়ার। পাশ ঘেঁষে হেঁটে আসছে এক কিশোর। কথা হচ্ছে খুবই সিরিয়াস বিষয় নিয়ে তাহ তাদের কথা বলার ভঙ্গিমা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তরতাজা যুবক এর মনের মাঝে ঈর্ষা জাগে সাধারণ কিশোর বালক কে দেখে। চাকুরী কর্মে লিপ্ত,বিবাহ যোগ্য, এডুকেটেড হাফিজ কিনা সামান্য দশ শ্রেণী পড়ুয়া ছাত্রকে দেখে হিংসে হচ্ছে!! এই গাঢ় অনুভূতি সমকর্কে যানে ওই অবুঝ আলেয়া! হাফিজ বড়ো বড় পা ফেলে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে,,,ভনিতা ছাড়াই ঘপ্ করে হাত ধরলো আলেয়ার। মেয়েটা প্রথমে চমকে উঠলেও হাফিজ কে দেখে শান্ত হয়। কোনো কথা উচ্চারণ করার আগেই হাফিজ তাকে টেনে গাড়িতে বসায় নিজেও বসে চালক কুরসী তে।।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“এই হাপানি রোগী কি সমস্যা ওই ভাবে টেনে আনলে কেনো?”
হাফিজ বড়ো একটা শাস ছেড়ে বললো,,,”তোর সমস্যা কি! অত ভাব কিসের ছেলেদের সাথে!”
“কিইই? কোন ছেলে!! ওহহ তুমি রাজ এর কথা বলছো! আরে ওতো আমার বন্ধু।”
“বন্ধু ম্যাই ফুট! এর পর থেকে কোনো ছেলের সাথে কথা বলা তো দুর আসে পাশে দেখেলেই সব কয়টা দাত ভেঙ্গে ফেলবো। গর্ধব,,,”
আলেয়া ছোট ছোট চোখ করে বললো,,,”তোমার কথা শুনতে বয়েই গেছে” কথাটি বলেই ভেংচি কাটলো।
হাফিজ রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো। মেয়েটা তাকে কি কখনো বুঝবে? মেয়েটার এহেন আচরণে মোহিত হয়ে এই যুবক তার মন হারা হয়েছে। কখনো কি বুঝবে,,,মেয়েটা হুট করেই তার মন দখল করে ফেলেছে।। হাফিজ এর মায়া হয় নিজের প্রতি,,,কি এক অনুভুতির মায়াজালে বিভোর হলো সে।। হাফিজ গাড়ি স্টার্ট দিলো। সামনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,,,
“পরীক্ষা কেমন হলো।”
“খুব ভালো,,,”
“সেটা তো রেজাল্ট বলবে। কিছু খাবি! খিদে পাইনি?”
“পেয়েছে তো,,,,ফুচকা খাবো।”
“মেরে দাত ভাঙবো। চুপ চাপ যা খাওয়াবো তাই খাবি,,,আর চুল বাঁধ। এত ফ্যাশন করে পরীক্ষা দিতে এসেছিস। এই সার ম্যামরা চোখে দেখেনি?”
“গোসল করে বেরিয়েছিলাম ,,চুল ভিজে ছিল তাই বাধিনি ,,মোটেও আমি ফ্যাশন করিনি।”
আলেয়া ঝটপট নিজের খোলা লম্বা চুল হাত খোঁপা করে ততপর ব্যাগ থেকে ক্লিপ বের করে আটকে দেয় কেশ যুগল।। চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দেয় সিটে। বেশ ক্লান্ত ভাব ছেয়ে আসছে মেয়েটার মুখশ্রীতে। এর পর দুই দিন পর পরীক্ষা। শান্তি। হাফিজ দেখে আলিয়াকে ,,,হাত বাড়িয়ে মেয়েটার কপাল স্পর্শ করে,,, দেখে হালকা গরম ললাট।। ভ্রু কুঁচকে ফেলে হাফিজ থমথমে সুরে বলে,,,
“দুর্বল লাগছে আলু?”
মাথা নাড়িয়ে না বোঝায় আলেয়া।। এবার রেগে যায় হাফিজ। অবুঝ মেয়েটা এটাও বোঝেনা যে সে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।। এত অবুঝ হলে কি চলে! হাফিজ হুট করে গাড়ি থামায় ততপর এগিয়ে যায় আলেয়ার দিকে,, মেয়েটার গালে হাত দিয়ে টেনে আনে নিজের মুখোমুখি,, দাঁতে দাঁত পিসে বলে,,
“শরীরটা যে ধীরে ধীরে গরম হয়ে আসছে সেটা বুঝতে পারছিস না! কি বুঝিস তুই! মাথামোটা একটা।”
আলেয়া মৃদু চোখে তাকায় ঝিমিয়ে আসা কন্ঠে বলে,,,”আমি মাথা মোটা না। সব বুঝি আমি।”
“তাই! আমায় বুঝিস তুই!”
“হ্যাঁ বুঝি তো।”
“কি বুঝিস! আমার অনুভূতি বুঝিস? বুঝিস আমি কি ফিল করি? দিনে দিনে যে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি বুঝিস?”
আলেয়া এবার চোখ ঘুরিয়ে হাফিজ এর পায়ের দিকে তাকায় অতঃপর খিল খিল করে হেসে বলে,,,
“তোমার পা তো লম্বা হাপানি রোগী। মিথ্যে বলছো কেনো!”
কথাটি আওড়ায় ধীরে সুস্থে। চোখ বুজে ধপ করে কপাল ঠেকায় হাফিজ এর কাধে। হাফিজ জোরে শ্বাস টানে। আলেয়ার অবয়ব সান্নিধ্যে টেনে নেয়। গাড়ি চালায় সাবধানতার সাথে। আলেয়া তার জন্য তীব্র শীতের উষ্ণ রোদ,,,যাহ দেহ ছোঁয়ার সাথে সাথেই আরাম মেলে।
ইয়ানার দিন কাটে রিফাত এর মগ্নে,রাত যায় নির্ঘুম।। রিফাত এর শূন্যতা অনুভব হচ্ছে তীব্র ভাবে। মানুষটার চিন্তা তার মস্তিষ্ক জুড়ে ছড়িয়ে আছে। আজ কাল রিফাত এর নাম শুনলেই পা জোড়া থেমে যায় মুহূর্তের জন্য। অনুভূতির পাহাড় ব্যাক্ত করতে অক্ষম ইয়ানা,,,গত ছয় দিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সাথে কথা হয়েছে মাত্র দুই বার তাও মিনিট তিন পাঁচেক জন্য। রিফাত এর প্রশ্নের উত্তর হিসাবে শুধু ” হু, হ্যাঁ, জী,আচ্ছা,ঠিক আছে ” বাক্য বিনিময় করেছে ইয়ানা।। মেয়েটা প্রবল চঞ্চল স্বাভাবের কিন্তু রিফাত এর সামনে সে ঠিক ততটাই শান্ত,নাজুক।।
বিগত ছয়দিনের মাঝে আজ একটু ফ্রি রিফাত। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য রয়েছে দুই দেশের মাঝে। রিফাত এর হাত ঘড়িতে প্রায় বিকাল পাঁচটা। আজ ইয়ানার সাথে ভিডিও কল এ কথা বলবে বলে ঠিক করে রেখেছে সে। মেয়ে তার সামনে মিহীয়ে যায়,,চঞ্চলতা উবে সেখানে এসে হাজির হয় এক রাশ লাজ। রিফাত জানে ইয়ানা নিজে থেকে কখনোই তাকে ভিডিও কল দেবে না ইভেন রিফাত করলেও তাহ রিসিভ করবে না। তাই আতিকা কে জানিয়েছে নিজের এই আবদার। মেয়েটাও এক কথায় রাজি হয়ে যায়।। রিফাত তাকে সময় বলে দেয়,,,তার ভিডিও দেওয়ার সাথে সাথেই যেনো তাদের রুমে প্রবেশ করে।। আতিকা ও সম্মতি জানায়।।
ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। আতিকার ফোন বেজে উঠলো মৃদু আওয়াজে।। রিসিভ করে মিষ্টি হেসে সালাম জানালো রিফাত কে,,,রিফাত ও উত্তর করলো।। আতিকা সময় অপচয় না করেই সিধা প্রবেশ করলো রুমে।। কারোর রুমে প্রবেশ করার আভাস পেয়েই চমকে উঠলো ইয়ানা। ঝট পট চাদর দ্বারা নিজেকে মুড়িয়ে ফেললো সে।। আতিকা কে দেখে কিছু টা অবাক হয়ে বললো,,,
“তুই! কখন এলি!”
আতিকা হাসে। চোখ টিপ মেরে বলে,,,”সেটা পরে বলছি।। নে কথা বল,,,আমি আলেয়ার কাছে যাচ্ছি।”
ইয়ানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আতিকা ফোন ধরিয়ে চলে গেল দরজা বন্ধ করে। ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে তাকায় ফোনের স্ক্রিন এর দিকে। মুহূর্তেই কেপে ওঠে চিকন বদন।। দেখা পায় কাঙ্ক্ষিত মানুষটির। উস্ক শুষ্ক চুল যা কপালের উপর বিদ্যমান,,, গোল চশমার আড়ালে গভীর আঁখি জোড়া,,, যার দৃষ্টি ইয়ানা তে আবদ্ধ। ইয়ানা প্রথমে লজ্জা পেলেও পরে উদাসীন হয় মন। মানুষটা কে কত দিন পর দেখছে সে। পুরো রুম জুড়ে যেখানে মানুষটির ছোঁয়া সেখানে নেই সেই কাঙ্খিত অবয়ব। ইয়ানার চোখ ভরে আসলো অশ্রু জলে।। রিফাত দেখলো তার বোকা প্রেয়সীর স্নিগ্ধ সুশ্রী মুখশ্রী। ইয়ানার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়বে ঠিক এমন সময় রিফাত গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,,,
“এক বিন্দু পানি গড়ালে ফোন কেটে দেবো,, আর যত দিন এখানে থাকবো এক দিনও ফোন করবো না ,,আর না রিসিভ করবো।”
“সরি”
ঠোঁট উল্টে ইয়ানা দ্রুত সচেতন হয়।চোখের পানি মুছে ফেলে। মানুষটির সুস্থ হুমকি স্বরূপ বলা কথাটি কে ইয়ানা সত্য বলে মেনে নেয়।। কিন্তু সে কি জানে,,রিফাত চায় না দেখতে তার অশ্রু,,,যে অশ্রু সে নিজ দায়িত্বে মুছে ফেলতে পারবে না।। ইয়ানা নাক টেনে ভাঙ্গা কন্ঠে সুধায়,,,
“কেমন আছেন?”
“বউ ছাড়া আর কেমন থাকবো,,,বউ।”
কথাটি বলে রিফাত হাসে অগোচরে।। এদিকে ইয়ানার মনে অনুভূতির জোশ খেলে যায়। আরক্ত হয় গাল।। চোখ তুলে তাকাতে পারেনা ফোনের স্ক্রিনে। ছোট্ট বউ শব্দটি ইয়ানাকে কতটা মোহিত করেছে তা কেবল সেই জানে।। রিফাত দেখে তার প্রেয়সীর লজ্জা রাঙা চেহারা ,,, ছোট্ট শাস ছেড়ে বলে,,,
“আর কতক্ষন লজ্জা পাবে!? এই সামান্য কথাতেই এত লজ্জা! তাহলে পরে কি করবে! প্রনয় সইবে কেমন করে?”
“আল্লাহ,,,”(মৃদু স্বরে)
ইয়ানা এবার বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায়। তার সারা শরীর শিউরে উঠেছে। মানুষটা দিনে দিনে বড়ই বেশরম করে যাচ্ছে। ইয়ানা আমতা আমতা করে।কিছুক্ষন চুপ থেকে কথা কাটানোর জন্য বলে,,,
“খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ দুপুরে।।”
“আপনার চুল শুষ্ক লাগছে,,,চোখ লাল হয়ে আছে কেনো? শরীর ঠিক আছে আপনার!”
“ঠিক আছি আমি।। এখানে প্রেসার অনেক। ক্লান্তির জন্য এমন দেখাচ্ছে।”
ইয়ানার খারাপ লাগে। ক্লান্ত থাকা অবস্থায় তার সাথে কথা বলছে অক্লিষ্ট হয়ে।। ইয়ানা মৃদু সুরে বলে,,,
“তাহলে আপনি রেস্ট নিন,,,আমরা না হয় পরে কথা বললাম।”
“খবরদার ফোন কাটলে! বউ বউ ভাব আমি এসে দেখবো,,,সরাসরি,সামনাসামনি।। কাছা কাছি এসে উপভোগ করবো এই বউ বউ আচরণ। তখন কিন্তু পালালে চলবে না,,,”
হৈহৈ রৈরৈ বাঁধে মন আড়ালে। ইয়ানা লাজে রাঙা হয়। আচ্ছা রিফাত কি তাকে আজ লজ্জায় ফেলতে ফোন করেছে! বুঝে আসে না তার। ইয়ানা এবার বিছানায় বসে। গভীর নিশ্বাস ফেলে তাকায়। সুধীর কন্ঠে বলে,,,
“আমি পালিয়ে যাবো কোথায়!! আমি না আপনার অর্ধাঙ্গিনী। আপনার অর্ধেক। আপনার অর্ধেকের উপর আপনার পুরোপুরি অধিকার আছে।”
ইয়ানার এহেন কথায় রিফাত এর মনে বয়ে যায় শীতল বাতাস।। হৃদয় আকুল হয় মেয়েটাকে নিজের মাঝে জড়িয়ে নিতে,,,কিন্তু রিফাত যে এখন উপায়হীন। দমিয়ে রাখে নিজের এই তীব্র চাওয়া। ভেবে রাখে মেয়েটার কাছে ফিরেই তার আটকে রাখবে মন পিঞ্জরে।। অতঃপর কিছুক্ষণ চুপ থাকে তুই নর নারী। একে অপরের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দেয় কিছু সময়।। বেশ কিছুক্ষণ পর শোনা যায় রিফাত এর কন্ঠ,,,
“রুমের দরজা বন্ধ করে আসো ইয়ানা।”
“হাহ!?”
“ক্লোজ দ্যা ডোর,,,স্টুপিড।”
ইয়ানা উঠে ধির পায়ে হেঁটে দরজা বন্ধ করে।। কোনো প্রশ্ন ছাড়া আবারও ফোন হাতে নেয়। তাকায় স্ক্রিনে। রিফাত ভ্রু নাচিয়ে বলে,,,
“ফোন টা রাখো সেট করে তারপর সামনে বসো।”
তাই করে ইয়ানা।। দুই বালিশের উপর ফোন রাখে দাড় করিয়ে। তত্পর সামনে বসে।। রিফাত পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো তার বউ এর দিকে।। মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখছে যেনো রিফাত। হঠাৎই লাজ ঘিরে ধরলো ইয়ানা কে। কানের পাশে চুল গুজে আবারও তাকায়,,,রিফাত একই ভঙ্গিমায় মাদক নজরে চেয়ে আছে।। ইয়ানা কিছু বলতে যাবে তার আগেই বলে ওঠে রিফাত,,,
“চাদর সরাও।”
ইয়ানা চমকিত হয়।বড়ো বড়ো আঁখি মেলে। ঢিপ ঢিপ শব্দ হচ্ছে হৃদয়ে। গায়ে জড়ানো হালকা পাতলা চাদরটা আরো একটু টেনে ধরে কাধের কাছে। সে কোনো মতেই সরাবে না এই চাদর।। ইয়ানা জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। আমতা আমতা করে বলে,,,
“ঠান্ডা লাগছে।”
ডাহা মিথ্যা কথা। শীত টাটা বাই বাই করেছে অনেক আগেই,, গরমের হাওয়া চলেছে। একটু আধটু। সেখানে অযথা রুমের মধ্যে চাদর জড়িয়ে রাখার মত ঠান্ডা নেই।। রিফাত বোঝে সবটাই,,,তেজী কন্ঠে বলে,,,
“আই হেট লাই।। চাদর সরাও স্টুপিড।”
শেষের কথাটা বলে বেজায় ধমক দিয়ে। ইয়ানা তড়িৎ গতিতে চাদর সরায়,, চোখ খিচে বন্ধ করে ফেলে। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে,, হৃদস্পন্দন হাজার গুণ বেড়েছে। গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে মেয়েটার।। রিফাতের বিরহে উন্মাদ ইয়ানা তার অস্তিত্ব উপভোগ করতে জড়িয়েছে সেই মানুষটির শার্ট।। রিফাত চলে যাওয়ার পরে পরে এটি যেন ইয়ানার নিত্যদিনের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে,,, রুমে একা থাকলে রিফাতের শার্ট পড়ে সারা ঘর মায় ঘুরে বেড়ায়। আবার মাঝেমধ্যে কলারে নাক লাগিয়ে ঘ্রান নেয় প্রিয় পুরুষটির শরীরের স্মেল।। আজও এই স্বভাব বিদ্যমান রেখে রুমের মধ্যে একাকী সময় কাটাচ্ছিল ইয়ানা ,,তারই মধ্যে আতিকার হুট করে ঢুকে পড়াই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে জড়িয়ে ফেলে চাদর। তখনো ক্যামেরার ফোকাস ছিল ইয়ানার দিকে রিফাত বেশ লক্ষ্য করেছে বিষয়টি।।
ইয়ানার এহেন রূপ দেখে রিফাতের ঠোঁটে তৈরি হয় চওড়া হাসির রেখা।। ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হাঁসে সে। শরীরের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে যাচ্ছে শীতল শিহরণ। অকাঙ্ক্ষিত ইচ্ছে মাথা নাড়া দিয়ে উঠছে। পুরুষ সত্তা কাছে পেতে চাইছে তার প্রেয়সী কে।। রিফাত ঠোঁটের কোণে বৃদ্ধা আঙুল ঠেকায়। লাল প্লাজো সাথে রিফাতের সাদা শার্ট পরিহিত ইয়ানাকে দেখে ভাষ্যহারা হয়। অপূর্ব রূপে তার প্রিয়তমা।। মেয়েলি কাঠামো নজর কাড়ে রিফাত এর।। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত করে নিজেকে।।
“শুকরিয়া আদায় করো ইনু যে আমি তোমার কাছে নেই। নাহলে,,,”
“নাহলে!?”
ইয়ানা কৌতূহল বশত চোখ মেলে তাকায়। কিছু মুহূর্তের জন্য লজ্জা উবে সেখানে এসে হাজির হয় এক রাশ ঔত্সুক্য।। রিফাত কপালের চুল ঠেলে দেয়। অতঃপর মৃদু স্বরে সুধায়,,,
“ইউ উইল বি ফিনিশড টুডে”
কথার অর্থ আদায় করার সাথে সাথেই ইয়ানা মিহিয়ে যায়। পারলে যেনো হওয়া হয়ে উবে যাবে ইয়ানা। বুলি গলায় বেধেছে,,, কন্ঠনালী শুখিয়ে কাঠ। রিফাত দুষ্টু কন্ঠে বললো,,,
“চুপ কেনো?লজ্জা পাচ্ছো? এত লজ্জা আসে কথা থেকে! আমায় ধার দাও নাহলে লজ্জা কমাও,,,আমি আসলে কিন্তু কোনো ভাবেই ছাড় পাবে না।।”
ইয়ানার হৃদযন্ত্র অস্থির,ব্যাকুল। রিফাত এর সন্নিকটে তার প্রাণ ছুটে যেতে চাইছে। কিন্তু রিফাত যে বড়ই বেশরম,বেলাজ।। ইয়ানা মনে মনে আওড়ায়,,,”আমি ছাড় পেতেও চাইনা ডক্টর রিফাত।। আপনি আসলে নিজের বউ কে দেখবেন,,,যে কিনা অধীর আগ্রহে আপনার অপেক্ষায় আছে।”
মনের কথা মনেই চেপে রাখে সে। নিজেকে সাভাবিক করে বলে,,,”কবে আসবেন?”
রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে বললো,,,”ধরো আরো দশ দিন বা তার ও বেশি।।”
“দাদু রোজ আপনার কথা বলে,,,আলেয়া মিস করে আপনাকে।”
“জানি।। কিন্তু যে মিস করলে আমার মন শান্ত হবে সে কি করে?”
“করে,,,রোজ,প্রতি মুহূর্তে।”
রিফাত বিস্তার হাসি। অনুভূতির শিহরণে জর্জরিত হয় অন্তর মহল।। দেখে ইয়ানার শুভ্র চেহারা। দেহের অবয়ব। দেখা যায় চিবুক সমান নিচে মেয়েলি কাধ,ঘাড় আর সেথায় রয়েছে কিছু চিহ্ন। রিফাত এর দেওয়া চিহ্ন।। মনে পড়ে সেই কাঙ্ক্ষিত সময়ের কথা,,,ব্যাথায় কুকড়ে যাওয়া মেয়েটার চেহারা। রিফাত সেদিন নিজের অজান্তেই মাতাল হয়ে গিয়েছিল।। কতটা গভীর চুম্বন করলে তার দাগ এখনও রয়ে যায়! নিশ্চয় মেয়েটা ব্যাথা পেয়েছিল ভীষণ?! রিফাত সরাসরি জিজ্ঞাসা করলে মেয়েটা নিশ্চয়ই লজ্জায় আধমরা হবে।। তাই নিজের গলার ভাঁজে আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে ভ্রু নাচিয়ে ইয়ানা কে জিজ্ঞাসা করল,,,
“কিছু লাগিয়েছো? ব্যাথা করে এখনও!”
ইয়ানা ইশারা বোঝে।। ফট করে নিজের পানে তাকায় ওড়নার কোন চিহ্ন নেই।। ইসস খেয়াল ছিল না তার। ইয়ানা উত্তর না দিয়ে এদিক ওদিক ওড়না খোঁজে। রিফাত কপালে ভাঁজ ফেলে দেখে ইয়ানার কণ্ড।।
“কি দেখছ?”
“ওড়না খুঁজি।”
“সেটার আর দরকার নেই,,,যা দেখার আমি দেখে ফেলেছি। বাদ বাকি একান্তে দেখবো।। এখন যা জিজ্ঞাসা করেছি তার উত্তর দাও।”
ইয়ানা চুপ করে বসে। হাত দিয়ে গলা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করে। শুকনো ঢুক গেলে। মিন মিন করে বলে,,
“আপনি বারণ করে ছিলেন তাই কিছু লাগায়নি।”
বলেই চুপ হয়ে যায় মেয়েটা। রিফাত ভ্রু কুঁচকে বলে,,,”আরো একটা প্রশ্ন করেছিলাম,,শুনতে পাওনি নাকি আবার করবো।”
ইয়ানা লম্বা শাস টেনে বলে,,,”ছিলো প্রথম দুই দিন এখন আর নেই।”
রিফাত মাথা নাড়ায়। আরও কিছু বলতে গিয়েও দমিয়ে ফেলে নিজেকে,,,সে যা বলতো তাহ শুনে ইয়ানা নিগঘাত ফোন কেটে দিতে,,,লাজে ডুবে যেত মেয়েটা।। রিফাত বুঝলো তার রেস্ট এর দরকার।। তাই ইয়ানা কে বললো,,,
“রাখী তবে। ঠিক ভাবে থাকবে।”
ইয়ানা বোঝে রিফাত এর ঘুম দরকার চশমা আরালে চোখগুলো কেমন লাল হয়ে আসছে।। তার সুদর্শন স্বামীকে যেন আরো সুদর্শন। ইয়ানা মাথা নাড়ায় মোলায়েম কন্ঠে সুধায়,,
“আপনিও।। আর শুনুন,,,”
রিফাত ফোন কাটতে গিয়েছে থেমে যায়,,,”বলো।”
“কুঁচকানো শার্ট পড়বেন, মাথায় তেল দিয়ে থাকবেন ,আর মুখে মাক্স পড়ে নেবেন,,,”
ইয়ানার এহেন অদ্ভুত কথা শুনে রিফাত অবাক এর চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
“কারণ!”
“সব কারণ জানতে নেই। বলেছি করবেন,,, এমনি প্রচণ্ড সুন্দর হয়ে পাপ করেছেন,,,আর আপনার দিকে তাকিয়ে থেকে মেয়েরা সেই পাপের ভাগীদার কেনো হবে!?”
ইয়ানার বাচ্চা সুলভ অধিকার মূলক কথা শুনে রিফাত সজোরে হেসে ওঠে।। হাত দ্বারা চোখ ঢেকে হাসতে থাকে রিফাত। ইয়ানা খানিকটা লজ্জা পায় মন দুলে ওঠে রিফাতের হাসির আওয়াজে। ইয়ানা কখনো নিজের বাবাকে চোখে দেখেনি কিন্তু হৃদয় মাঝে মধ্যে বলে ওঠে তার বাবা রিফাতের মতই হয়তো ছিলেন,, এতটা নিখুঁত,পারফেক্ট,দক্ষতা সম্পন্ন।। হাসির একপর্যায়ে নিজেকে শান্ত করে রিফাত। ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,,
“স্টুপিড।”
ইয়ানা ঠোঁট উল্টায়।। রিফাত চোখ ভরে দেখে তার প্রেয়সী কে। আবেগী কন্ঠে সুধায়,,,
“নিজের যত্ন নেবে,,,তুমি আমার কাছে অত্যাধিক অমূল্য।
আর হ্যাঁ,,,তোমার এই লুক আমি সামনা সামনি দেখতে চাই,,, উন্মুক্ত ভাবে।”
বলেই চোখ টিপ দেয় রিফাত। ইয়ানা আঁখি বড়ো করে তাকায়। বুক ধক করে উঠল। কাধের পাশ ঘেঁষে বয়ে যায় শীতল তরঙ্গ।। হালকা কাশি ওঠে,,,ঝট পট ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত কন্ঠে বলে,,
“নিজের খেয়াল রাখবেন,,,আল্লাহ হাফিজ।”
কথাটি বলেই ফোন কেটে ধপাস করে শুয়ে পড়ে বিছানায়। দুরুদুরু বুক,ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি আর প্রিয় মানুষের জন্য অপেক্ষা। ইয়ানার যেনো এখন পারো,,,নিজের দেব দাস এর জন্য গুনছে বিরহের প্রহর।। সব শেষে দেখে মিলুক সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষটির।।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়লে ইয়ানা গায়ে চাদর জড়িয়ে দরজা খুলল।। দেখা মিলল আতিকার,,,মেয়েটা কেমন ভ্রু নাচিয়ে,দাত দেখিয়ে হাসছে।। ইয়ানা ছোটো ছোটো চোখ করে বললো,,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৪
“পাগল দের মত হাসছিস কেনো?”
“আহা,,,এখন তো আমি পাগলই হবো। ফোন দে আমার।”
ইয়ানা ফোন এগিয়ে দিয়ে বললো,,,”ধর তোর পচা ফোন।”
“বাহ্,,প্রায় আধা ঘণ্টা আমার ফোন থেকে প্রেমালাপ সেরে এখন পচা ফোন তাই না!!”
ইয়ানা খিল খিল করে হেসে উঠলো। এদিকে আতিকা ছুটলো তার পিছনে। দুই বান্ধবী পুরো রুম জুড়ে ছুটতে লাগলো,,ভেসে আসলো হাসির গুঞ্জন।।
