Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৫

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৫

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৫
নুসরাত ফারিয়া

কয়েক ঘন্টা পর যখন আলোর জ্ঞান ফিরে এল তখন নিজেকে রুমের ভেতর আবিষ্কার করল। তখনকার ঘটনা মনে হতেই লজ্জায় নুয়ে গেল। হঠাৎই কিছু একটা ভেবে চমকে উঠল, মানুষটা রেগে আবার চলে যায়নি তো? আলো তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে বাহিরে ছুটে গেল। শরীরটা দূর্বল হলেও মনের কষ্টের কাছে তুচ্ছ ব্যাপার। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই চোখজোড়া শীতল হলো। মূহুর্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আলেয়া রহমান নিজ হাতে আধারকে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে। আধার ভদ্র ছেলের মতো আরেক মায়ের হাতে তৃপ্তির সাথে খাচ্ছে। আলেয়া রহমান মাঝেমধ্যে গল্প করছে আর ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আলো এগিয়ে এসে কপাল কুঁচকে বলল,

-“জামাইকে পেয়ে মেয়েকে ভুলে গেলে?”
মেয়ের কথা শুনে আলেয়া রহমানের ভ্রু কুঁচকে যায়৷ তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই মতিউর রহমান বলে উঠলেন,
-“তোমার মা ভুলে গেলেও তো আর আমি ভুলে যাইনি৷ এসো মামণি, আমার পাশে বসো। আজ বাবা তোমাকে খাইয়ে দিবে!”
আলো মুচকি হেঁসে বাবার পাশে গিয়ে বসল। মতিউর রহমান ভাত মাখিয়ে মেয়েকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। তখন ছায়া নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বাবার পাশে দাঁড়ায়। তাকে দেখে আলো বিরবির করে বলল,
-“আমার আদরে ভাগ বসাতে চলে এসেছে আরেক ফকিন্নি।”

ছায়া কিছু না বলে বাবার হাতে খেতে লাগল। মায়াও তার বাবার দিকে তাকায়৷ মাহবুব রহমান মুচকি হেঁসে মেয়েকে খাবার দিতে থাকলেন। নীলিমা রহমান সবার প্লেটে আরো খাবার দিলেন৷ কতদিন পর পরিবারের সবাইকে হাসিখুশিতে দেখে বুকটা ভরে ওঠে৷ তবে মনের মধ্যে একমাত্র ছেলেটার জন্য হাহাকার করে উঠল। আজ যদি ছেলেটা বেঁচে থাকত, তাহলে হয়তো এইভাবেই সবার সাথে বসে থেকে হাসিঠাট্টা করতে করতে খাবার খেত। আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন৷ তিনি মা তো, তাই এতদিনেও নিজের ছেলে-বউমাকে ভুলতে পারেননি।
আধারের খাবার খাওয়া শেষে আলেয়া রহমান শাড়ির আঁচল দিয়ে যত্নের সাথে মুখ মুছে দিলেন। আধার আঁচলে নাকমুখ ডুবিয়ে চোখ বুজে নিল৷ তারপর অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আপনার আঁচল থেকে মা, মা ঘ্রাণ পাচ্ছি। যেমনটা আমি আমার মায়ের আঁচল থেকে পেতাম!”
আলেয়া রহমানের চোখদুটো টলমল করছে। পরম স্নেহে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

-“আমি তো মা-ই বাবা। তোমার আরেক মা! আর তুমি আমার ছেলে।”
আধারের হঠাৎই কি যেন হলো। সে দু’হাতে শাশুড়ী মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে ডেকে উঠল,
-“মা…!”
আলেয়া রহমান হেঁসে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন,
-“হ্যাঁ, তোমার মা!”
এই সুন্দর দৃশ্য দেখে সবার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলেও আলোর চোখদুটো ছলছল করছে। অজানা কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। এই এতিম মানুষটাকে সে কীভাবে সুখে রাখবে? কি করলে লোকটার সব কষ্ট মুছে যাবে? সে কি আদৌ পারবে এই মানুষটার সকল কষ্ট লাঘব করতে? নাকি দিনশেষে নিজেই কষ্টের কারণ হবে? যেমনটা এই এক বছরে হয়েছে। সে কোমায় থাকলেও ব্রেন সজাগ ছিল। লোকটার প্রতিটা কথা শুনতে পেয়েছে! সে না দেখেও সব কষ্ট, ছটফটানি, আর্তনাদ সবকিছু টের পেয়েছে। আর এই এক বছর ছয় মাসের মধ্যে এটাও বুঝতে পেরেছে এই পঁচা স্যারটা আগের মতো নেই। এখন এই লোকটাও তাকে চায়!
আলো খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঔষধ খেয়ে রুমে এল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বাতি নিভিয়ে, ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় এসে চুপটি করে বসে থাকল। আড়চোখে উবুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকায়। আগে লোকটা হাসপাতালে তার বুকে মাথা রেখে
শুয়ে থাকত, অথচ আজ একা একা ঘুমাচ্ছে৷ কি নিষ্ঠুর মানুষ!

-“শুনুন?”
মেয়েটার ডাকে আধার চোখ না মেলে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“জ্বী বলুন?”
-“সোজা হোন।”
-“কেন?”
-“আপনার বুকে মাথা রেখে ঘুমাব!”
-“সরি ম্যাম। আমার বুক সরকারি নয়।”
আলো বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“তাহলে কি আমি এতদিন সরকারি ছিলাম?”
-“উঁহু, সরকারি নও! আমার ব্যক্তিগত সুখ।”
-“ধ্যাত, আপনি কখনো ভালো হবেন না। যান আপনার কাছে থাকব না।”
একথা বলে আলো বিছানায় থেকে নেমে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। এই বদমাইশ লোকটার ঘাড়ত্যাড়ামি করার স্বভাব আর শুধরাবে না!
চোখ বুজে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পর অনুভব করল সে হাওয়ায় ভাসছে। আলো চমকে উঠে চট করে তাকিয়ে দেখে সে স্যারের কোলে। আধার বিছানায় সাবধানে আলোকে শুয়ে দিয়ে, ঝুঁকে এসে কপালের মাঝে ভালোবাসার পরশ একে দিল। পরপর গালে, দুই চোখে, নাকে, থুতনিতে ও ঠোঁটেও চুমু খেল। আলো লাজুক হেঁসে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“আমার থেকেও এখন আপনার ঠোঁট বেশি বেয়াদব হয়ে গেছে।”
আধার ঠোঁটের নিচে থাকা তিলটার ওপর চুমু খেয়ে বলল,
-“কথায় আছে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে!”
আলো সরু চোখে তাকায়। আধার কিছু না বলে অর্ধাঙ্গিনীর নরম বুকের মাঝে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। আলো দু’হাতে মাথার চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল। এবং একসময় বলল,
-“কাল আপনার সাথে বাড়ি ফিরতে চাই।”
আধার বাধ্য ছেলের মতো বলল,
-“ঠিক আছে।”
আলো জোরে শ্বাস ফেলে ধীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“আপনি কী এখনো এসব দায়িত্ব থেকে করছেন?”
আধার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল,
-“কি মনে হয় তোমার?”
-“জানি না।”
আধার এগিয়ে এসে মেয়েটার চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

-“আমি যা কিছু করছি, সবটাই আমার মন থেকে।”
আলো মনে মনে হাসল। তবে মুখে বলল,
-“ওওও….আপনার মনও আছে? জানতাম না তো।”
আধার পাশে ঘুরে আলোকে নিজের বুকের ওপর নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“সময় হোক, আমার কি কি আছে আর নেই—সবকিছু প্রমাণ করে দিবো। এখন ভদ্র মেয়ের মতো ঘুমাও!”
আলো আর ভদ্র? সে তো সুযোগ বুঝে স্যারের কালো কুচকুচে কিউট ছোট্ট আঙুরের ওপর চিমটি কাটল। কতদিন হয়ে গেল, স্যারকে জ্বালানো হয় না। আধার চোখমুখ কুঁচকে বিরবির করে বলল,
-“আবার?”
আলো মূহুর্তে খিলখিল করে হেঁসে উঠল। এতদিন পর আবারো মেয়েটাকে হাসতে দেখে আধার ঠোঁট কামড়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকল৷ সে এই হাসিটা দেখার জন্য যে, ভেতরে ভেতরে কতটা ছটফট করেছে, সেটা মুখে বলে বোঝাতে পারবে না। কিছু কিছু অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না। এইগুলো গোপনেই সুন্দর!

পরের দিন সকালে নাস্তা করে, সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আধার, আলো বেরিয়ে পড়ে নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। তিন-চার ঘন্টার পথ জার্নি করে অবশেষে এসে পৌঁছাল। আলো গাড়ি থেকে নেমেই ভেতরে ছুটে গেল। আধার মেয়েটাকে সাবধানে যেতে বলে, সে ল্যাগেজ নিয়ে ভেতরে যেতে শুরু করল।
-“দাদাজাননননন!”
সোবহান খান ড্রয়িংরুমে বসে থেকে চা খাচ্ছিলেন আর নিউজ পেপার পড়ছিলেন। তখন আচমকা চিৎকার শুরু হকচকিয়ে উঠলেন। ফলস্বরূপ হাত থেকে চায়ের কাপ ফ্লোরে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। সেদিকে নজর না দিয়ে চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়৷ নাতবউকে সুস্থ শরীরে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মূহুর্তেই চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে। তিনি তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াতেই আলো ছুটে এসে দাদাজানকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“কেমন আছো দাদাজান? আমি তোমাকে খুব, খুউউব মিস করেছি।”
সোবহান খান মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

-“তোমাকে ছেড়ে ভালো ছিলাম না, কিন্তু এখন তোমাকে পেয়ে অনেক অনেক ভালো আছি। আর আমিও তোমাকে খুব মিস করেছি!”
আলোর চোখদুটো টলমল করলেও সে গাল ভরে হাসল। তাহমিনা খানকে দেখে কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল,
-“কেমন আছেন মা?”
তাহমিনা খান গম্ভীর মুখে বললেন,
-“ভালো ছিলাম। কিন্তু এখন কতটা ভালো থাকব জানা নেই। বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই তো অঘটন ঘটিয়ে দিলে।”
আলোর খারাপ লাগলেও সে মুখে প্রকাশ করল না। কিন্তু তাহমিনা খানের কথাগুলো ঠিক হজম করতে পারল না আধার। সে কিছু না বলে রান্নাঘর থেকে অনেকগুলো চায়ের কাপ নিয়ে এসে ফ্লোরের মাঝে আছাড় মা’রল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
-“নিন, আমিও অঘটন ঘটিয়ে দিলাম।”
তাহমিনা খান রাগে গজগজ করতে করতে সেখান থেকে চলে গেলেন। সোবহান খান স্বাভাবিক থাকলেও আলো বড় বড় চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। কতগুলো কাপ, এক নিমিষেই ভেঙে ফেললো! আলো দাদাজানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

-“তোমার নাতির এত রাগ হলো কবে থেকে?”
-“তুমি যবে থেকে কোমায় গেছো, ঠিক তবে থেকে। আর এটা তো কিছুই নয়! এই বাড়ির অর্ধেক জিনিসই তোমার স্বামীর হাতে ইন্তেকাল করেছে। আবার নিজেই সবকিছু কিনে এনেছে!”
-“কবে না জানি এগুলোর মতো আমাকেও তুলে আছাড় মা’রে।”
-“তোমাকে কিছু করলে—আমি ওরে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রের মধ্যে ফেলে দিয়ে আসব, ঠিক আছে?”
দাদাজানের কথা শুনে আলো শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“ঠিক আছে।”
আধার অনেক আগেই রুমে চলে এসেছে৷ আর এসে ঝুড়ি থেকে টুনা, টুনিকে রুমের ভেতর ছেড়ে দিল। আসার সময় রহমান বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে। আধার নিজেই ল্যাগেজ খুলে আলোর সবকিছু আলমারিতে সুন্দর করে গুছিয়ে রেখে দিল। তারপর টিশার্ট ও ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। আজ আর ভার্সিটিতে যাওয়া হলো না। আগামীকাল থেকে না-হয় যাবে।
লম্বা শাওয়ার নিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে দেখে, আলো বিছানার ওপর সব পুতুলগুলো নিয়ে বসেছে।

-“এইগুলো সব আমার জন্য?”
-“হু!”
স্বামীর কথা শুনে আলোর চোখদুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠল। এইগুলো তার সব পছন্দের জিনিস। বিশেষ করে আকাশি রঙা ইয়া বড় পুতুলটা তার খুব মনে ধরেছে। এই পুতুলটা মনে হয় তার সমান! কিন্তু বাঁদরটা দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“এটা কেন নিয়েছেন?”
আধার তোয়ালে সোফার ওপর রেখে বলল,
-“তোমার মতো আরেকজনকে পেয়ে বুঝি, খুশি হওনি?”
আলো বিরক্তিতে বাঁদর ছুঁড়ে মা’রল স্যারের দিকে। তারপর বলল,
-“নিন, আপনার আরেক বউকে। আজ থেকে ওটার সাথেই সংসার করবেন।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,
-“ছোট বউকে নয়, আমার বড় বউকে প্রয়োজন।”
আলো কিছু না বলে পান্ডা, ডোরেমনকে কাবার্ডের ওপর রেখে দিল। আর বড় পুতুলটা বিছানায় রেখেছে। এটা দেখে আধার কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

-“এখন কি তুমি পুতুল নিয়ে থাকবে?”
-“তো কি পুতুলটা খাওয়ার জন্য নিয়ে এসেছেন?”
-“উমম…একবার ট্রাই করে দেখতে পারো। তাহলে টেস্ট কেমন, সেটাও জানা হয়ে যাবে।”
আলো রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো। মেয়েটার রাগান্বিত চেহারা দেখে আধার মনে মনে হাসল। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এমনিতেই তুমি সবসময় আকাশি রঙা জিনিসই ব্যবহার করো। সো….পুতুলটা কাছে না রাখলেও চলবে।”
লোকটার কথার মানে বুঝতে পেরে, লজ্জায় আলোর গাল রক্তিম হয়ে উঠল। সে মূহুর্তেই চেঁচিয়ে উঠে বলল,
-“আপনার মতো অসভ্য পুরুষ আর দুটো দেখিনি।”
আধার কিছু না বলে হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর আলো রাগে গজগজ করতে করতে আলমারি খুলতেই একটা ঝটকা খেল। একই সাথে তার মুখ অটোমেটিক হা হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস চোখে তাকিয়ে থেকে কয়েকবার নিজের চোখ কচলিয়ে আবার তাকায়। এত এত আকাশি রঙা ড্রেস, শাড়ি দেখে মাথা হ্যাং হয়ে যায় আলোর। তবে সে ভীষণ খুশি হয়েছে৷ মনে মনে অসভ্য লোকটার পছন্দের প্রসংশা করে, সে বেছে বেছে একটা জর্জেট শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল৷
রাত সবে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেছে, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তার পা জোড়া শ্লথ হয়ে গেল। সে উস্টা খেয়ে পড়তে পড়তেও নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে হা করে তাকিয়ে রইল, এক শাড়ি পরিহিত রমণীর পানে।
আলো একহাতে কুঁচি ঠিক করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। সামনে রাতকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল,

-“কেমন আছেন ভাইয়া?”
রাত যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছে। সে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“তুমি….তুমি খুব সুন্দর বোম্বাই মরিচ। খুব সুন্দর!”
আলো কিছু বলতে যাবে তখনই কিছু একটা পরে যাওয়ার শব্দ পেয়ে চমকে উঠল। চট করে পাশে তাকিয়ে দেখে আধার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আর তার পায়ের কাছে কফির মগ গড়াগড়ি খাচ্ছে। আলো হন্তদন্ত হয়ে কাছে এগিয়ে এলে, আধার ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। আলো থমথমে মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, সে নিজেও দোতলায় উঠে গেল।
রুমের ভেতর আসতেই আলো স্তব্ধ হয়ে গেল। আধার আলমারি থেকে সব আকাশি রঙা শাড়ি বের করে ফ্লোরে ছুঁড়ে মা’রছে। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে লাইটার খুঁজে বের করে আগুন জ্বালাতেই আলো ছুটে এসে অস্থির গলায় বলল,
-“না, না! প্লিজ এমন করবেন না। শাড়িগুলো আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনি সেগুলোকে এইভাবে জ্বালাতে পারেন না।”
আধারের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। সে মেয়েটার চোয়াল শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

-“আমি তোমাকে আগে কীভাবে চলতে বলেছিলাম?”
আলো ছটফটিয়ে উঠে বলল,
-“ভ…ভুলে গেছিলাম। স..সরি!”
আধার আরো কিছু বলতে চেয়েও মেয়েটার চোখের পানি দেখে আর বলতে পারল না। চোয়াল ছেড়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“আ-আমি তো আপনার জন্য নিজেকে একটু সাজিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি খুশি হবেন। কিন্তু, আমি ভুল ছিলাম। আপনার কথা অমান্য করার জন্য সরি। আসলে আমি এতগুলো উপহার পেয়ে খুশির ঠেলায় ভুলেই গেছিলাম, আপনি আমার শাড়ি পরা পছন্দ করেন না। অহেতুক আপনাকে রাগিয়ে দিলাম। তারজন্য খুব সরি!”
আলো কথাগুলো বলে চোখের পানি মুছে ফ্লোর থেকে শাড়িগুলো তুলে আলমারিতে গুছিয়ে রেখে দিল। সামনে ফিরতেই তাকে আলমারির সাথে চেপে ধরল আধার। তারপর তীক্ষ্ণ চোখে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বিরবির করে বলল,

-“তোমাকে শাড়ি নিয়ে দিয়েছি শুধুমাত্র আমার সামনে পরে থাকার জন্য। দিনে শাড়ি না পরে রাতে পরবে, এবং আমার জন্য নিজেকে সাজাবে। আমি এসে দেখব। শুধু আমিই দেখব তোমাকে।”
আলো কিছু না বলে অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল। আধার ঝুঁকে এসে গালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমি চাই না তোমার কোনো ক্ষতি হোক। আর না কেউ বাজে নজরে দেখুক! আমি যা করছি সবটা তোমার ভালোর জন্যই। আমি একজন পুরুষ, তাই অন্য পুরুষের নজর বা চাহিদা বুঝতে পারি৷ তুমি প্লিজ রাতের সামনে যেও না৷ ও আমার ভাই হলেও ভালো ছেলে নয়। প্লেবয় একটা! ওর গার্লফ্রেন্ডের অভাব নেই, আর না রুমডেটে আপত্তি আছে। আশা করছি তুমি বুঝতে পারছো, আমি কি বলতে চাচ্ছি! তবুও যদি তুমি আমার কথা না শোনো, তাহলে তোমাকে বাপের বাড়িতে রেখে আসব। কারণ তোমাকে নিয়ে আমি কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চাই না।”
আলো সবকিছু বুঝতে পারলেও এসময়ে এসব নিয়ে ভাবার সময় পেল না। কারণ লোকটার হাতের ও ঠোঁটের স্পর্শে তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। আলো শুকনো ঢোক গিলে দু’হাতে স্বামীকে ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু মানুষটা উল্টো তাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় গেল। আলো কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না, কারণ তার ঠোঁট জোড়া মানুষটার দখলে।
আলো এক মূহুর্তের জন্য ভেবেই নিল, আজ আর নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আধার শুধু চুমু খেয়ে শান্ত গলায় বলল,

-“তুমি পুরোপুরি সুস্থ হওনি। সারাক্ষণ ব্যাঙের মতো না লাফিয়ে এখন চুপচাপ রেস্ট নাও। আমি খাবার নিয়ে আসছি!”
একথা বলে আধার চলে গেল। আর আলো লজ্জায় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ হয়ে বালিশের মধ্যে মুখ লুকিয়ে রাখল। আজকাল মানুষটা একটু বেশিই পাঁজি হয়ে যাচ্ছে।
আধার খাবার নিয়ে এসে নিজ হাতে আলোকে খাইয়ে দিতে লাগল এবং নিজেও একই প্লেট থেকে খেতে থাকল। আলো খাবার চিবোতে চিবোতে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল স্বামীর মুখের দিকে। ইশশশ! তাদের জীবন থেকে কতগুলো দিন চলে গেল। সাথে তিনজন কাছের মানুষকেও হারিয়ে ফেললো। এসব ভাবতে ভাবতে আলোর এক চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আধার চমকে উঠে চোখের পানি মুছে দিয়ে অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“শরীর খারাপ করছে? মাথা ব্যথা করছে? ডক্টর ডাকব?”
আলো নাক টেনে দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“শরীর ঠিক থাকলেও যে আমার মনটা ঠিক নেই স্যার। আমার প্রিয় জনদের খুউউব মনে পড়ছে। তাদের সাথে এমনটা না হলেও পারত!”

আধার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সেও এই কষ্ট-টা অনুভব করতে পারছে। কারণ সে তো নিজের পুরো পরিবারকেই হারিয়ে ফেলেছে। এই মেয়েটা না-হয় নিজের মনের দুঃখ, কষ্ট তাকে বলছে! কিন্তু সে কীভাবে তার অসহনীয় যন্ত্রণার কথাগুলো বলবে? যেগুলো তাকে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে তিলে তিলে শেষ করছে। যার জন্য সে এই মেয়েটাকেও প্রথমে ইগনোর করেছে। হৃদয়টা ভালোবেসে ফেললেও সে কখনো স্বীকার করেনি, এমনকি নিজের অবাধ্য অনুভূতি থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু যখন মেয়েটাকে হারাতে বসেছে, তখনই নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। আর এতে সে নিজের ওপরই ভীষণ রেগে আছে। শুরুতে যদি অতীত না ভেবে মেয়েটাকে একটু আপন করে নিত, তাহলে হয়তো এই দিনটা দেখতে হতো না। ভালোবাসবো না, ভালোবাসবো না, করতে করতে ঠিকই তো ভালোবেসে ফেললো!

কিন্তু…সে কি করত? চাইলেও কী আর অতীত ভুলা যায়? অজানা কারণে তার মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করত, প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়। অথচ সে না ভালোবেসেও এই জঘ’ন্য অনুভূতি তাকে অনুভব করতে হয়েছে। তাহলে এখন থেকে না-হয় সে ভালোবেসেই কষ্ট সহ্য করবে। তারপর যা হবার হোক! তবুও সে আর নিজের অনুভূতি থেকে পালাবে না। কারণ দিনশেষে এই পাগল মেয়েটার কাছেই তার সুখ, একটু শান্তি! উমম….হয়তো বেশিই।
আধার শান্ত চোখে আলোর মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,
-“এই আমিটার কাছে থাকতে কোনোরকম সমস্যা নেই তো তোমার? লিসেন, আমি আগের মতো নেই। একটুআধটু পরিবর্তন হয়েছি! আর তোমাকে কিন্তু এখন থেকে আমাকে সহ্য করতে হবে।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আমার আদর নিতে তোমার কোনো অসুবিধা আছে?”
আলো মাথা নিচু করে লাজুক হেঁসে রিনরিনিয়ে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৪

-“উঁহু!”
আধার এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“তাহলে গতকাল গাড়িতে জ্ঞান হারালে কেন? আমি বাঘ নাকি ভাল্লুক? যে তোমাকে আস্ত চিবিয়ে খেয়ে নিবো?”
-“আপনার হঠাৎ এই আমিষ রূপটা ঠিক হজম হয়নি। তাই ওই আরকি!”
আধার হতাশ কণ্ঠে বিরবির করে বলে উঠল,
-“ঠিক আছে ম্যাডাম! বাহিরে থাকাকালীন না-হয় আপনার কাছে নিরামিষ স্যারই হয়ে থাকব।”
-“আর বাড়িতে?”
-“শুধুই তোমার ব্যক্তিগত পুরুষ।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৬