Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৭

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৭

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৭
নুসরাত ফারিয়া

-“আ…আমি! আমি একজনকে ভালোবাসি ভাবী। আর তাঁকেই বিয়ে করতে চাই।”
ননদের মুখে এমন কথা শুনে আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে বলল,
-“তুমি যাকে ভালোবাসো, সে-ও কি তোমাকে ভালোবাসে? মানে তোমরা রিলেশনে আছো?”
তিথি মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল,
-“হ্যাঁ, তিহানও আমাকে খুব ভালোবাসে৷ আর আমরা আড়াই বছর ধরে রিলেশনে রয়েছি।”
-“বুঝলাম। তা ছেলে কি করে?”
-“ও এবার মাস্টার্সে ভাবী। আপাতত বেকার!”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
-“মা এই বিয়ের প্রস্তাবে রাজী এবং অনেক খুশী। তুমি এই বিষয়টা তোমার ভাইদের বলো। উনারা নিশ্চয়ই তোমাকে বুঝবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিবে।”
ভাইদের কথা মনে হতেই তিথি তড়িঘড়ি করে বলল,

-“বড় ভাইয়া যদি জানে আমি প্রেম করছি, তাহলে আমাকে মে’রে শেষ করে দিবে। ভাইয়া মোটেও ভালোবাসা, প্রেম পছন্দ করে না। আমাকে পইপই করে নিষেধ করেছে, আমি যেন কখনো এই ভালোবাসার চক্করে না পড়ি। কিন্তু…আমি ভাইয়ার কথা রাখতে পারলাম না ভাবী। আমিও দিনশেষে নিজের মনের কাছে হেরে গেলাম। আর ছোট ভাইয়াকে বলেও কোনো লাভ হবে না। মা যেটা বলবে, যেটা করবে সেটাতেই রাত ভাইয়ার মত রয়েছে। বলতে পারো, মায়ের বাধ্য ছেলে। তাকে বললে উল্টো তিহানকে পেটাবে, সাথে আমাকেও!”
আলো চিন্তায় পড়ে গেল। এখন সে কি করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। কারণ তিথির কেসটা বেশ জটিল! একদিকে পরিবারের সবাই এই বিয়েতে রাজী, অন্যদিকে মেয়েটা আবার অন্য কাউকে ভালোবাসে। তাহমিনা খান এটা সহজে মেনে নিবে না। আর না শান্ত থাকবে৷ সে এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“মনে সাহস নিয়ে তোমার বড় ভাইয়াকে একবার বলে দেখতে পারো। উনি এখন আগের মতো নেই, একটু হলেও ভালোবাসায় বিশ্বাস করতে শিখেছে। আর উনি মা’কে বুঝাতে পারবেন। তবুও যদি সমস্যা হয়, তাহলে দাদাজানকে বলো৷ আশা করছি তোমার পাশে থাকবে।”

-“তুমি কিছু করো না ভাবী? আমার খুব ভয় করছে।”
-“দেখো তিথি, আমি তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি কি করব বলো? মা এমনিতেই আমাকে পছন্দ করে না, আমি যদি উনাকে গিয়ে কিছু বলি—তাহলে দেখা যাবে আমাকেই বাড়ি থেকে বের করে দিবে।”
তিথি কিছু না বলে নীরবে কাঁদতে থাকল। না পারছে পরিবারের অবাধ্য হতে আর না পারছে নিজের প্রিয় মানুষটাকে ভুলে যেতে। সে এখন কি করবে নিজেই জানে না। শুধু জানে সে কিছুতেই তিহান ব্যতীত অন্য কারোর হবে না, কিছুতেই না।
আলো মেয়েটার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
-“কাঁদে না তিথি। আমি দেখছি, কি করতে পারি!”
আলো তিথিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘুম পারিয়ে তবেই রুম থেকে বের হলো। দরজা চাপিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখতে পেল, আধার স্যার রক্তিম চোখে তাকিয়ে আছে। আলোর কপাল কুঁচকে গেল। সে কিছু একটা ভেবে নিজের দিকে তাকায়। নাহ, সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তাহলে মানুষটা এমন রাগান্বিত চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তাহলে কি সবকিছু শুনে নিয়েছে?

-“ক’টা বাজে?”
পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে আলো ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এল। সে আশেপাশে তাকিয়ে ঘড়ি খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও দেখতে না পেয়ে বলল,
-“জানি না।”
আধার দাঁতে দাঁত পিষলো। কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে গেল। আর আলো বেকুবের মতো হা করে দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ভাবল—এই লোকটার আবার কি হলো আশ্চর্য!
আলো হামি তুলে রুমে এসে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। রাত একটা বেজে পার হয়ে গেছে। অথচ সে এখনো ঘুরঘুর করছে। ওইদিকে টুনা, টুনিও খেয়েদেয়ে কাউচের ওপর ঘুম দিয়েছে। এরা সারাদিন খায় আর পড়ে পড়ে ঘুমায়! এছাড়া আর কোনো কাজ নেই।

-“রুমে এলে কেন? এতক্ষণ যেখানে ছিলে, সেখানেই থাকতে।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে বলল,
-“এটা আমারো রুম, সো আমি যখন-তখন আসতে পারি, তাতে আপনার কি?”
-“নাথিং!”
একথা বলে আধার সোফায় শুয়ে পড়ল। এটা দেখে আলোর ভ্রু কুঁচকে যায়। সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
-“হঠাৎ এখানে শুলেন কেন?”
-“আমার সোফা, আমার শরীর, আমার মন, আমার ইচ্ছে। তাতে আপনার কি?”
আলোর মুখ গোমড়া হয়ে গেল। সে পাশে বসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“রাগ করেছেন?”
-“…………”
-“আচ্ছা সরি!”
এবারেও আধার কিছু বলল না। আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে রুমের বাতি নিভিয়ে আবারো সোফার কাছে এল। তারপর বলল,

-“ঠিক আছে, আপনি এখানে থাকলে আমিও থাকব!”
সোফায় বেশি জায়গা নেই। তবুও আলো ঠেলেঠুলে শুয়ে পড়ল। কিন্তু তার ছোট্ট শরীরটার জায়গা ঠিকমতো হলো না। ফলস্বরূপ সে সোফা থেকে পড়ে যেতে লাগল, কিন্তু শেষমেশ পড়ল না। উল্টো, নিজের ওপর লোকটাকে আবিষ্কার করল।
আধার শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিতেই আলো হকচকিয়ে উঠে বলল,
-“উমম…শুটকি মাছের ভর্তা হয়ে গেলাম।”
আধার ওড়না সরিয়ে উন্মুক্ত গলায় মুখ ডুবিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আই লাভ শুটকির ভর্তা!”
আলো সামান্য নড়াচড়াও করতে পারছে না। সে ঘাড় কাত করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বলল,
-“কাল সকালে বানিয়ে দিবো, এখন উঠুন।”
-“আমি নই, তুমি এসেছো আমার কাছে। আর এখন আমাকে সহ্য করো!”
আলোর শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে দু’হাতে খামচে ধরল মানুষটার পিঠ! পুরুষালী রুক্ষ হাতের গাঢ় স্পর্শে তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। আলো বারবার শুকনো ঢোক গিলে নিচে চাপা পড়া অবস্থায় ছটফট করছে। হঠাৎই কিছু একটা অনুভব করে অস্ফুটস্বরে বলল,

-“প….প্লিজ না!”
সঙ্গে সঙ্গে আধারের নেশা কেটে গেল। একই সাথে অজানা ঘোর থেকেও বেড়িয়ে এল। তবুও সে শুধাল,
-“নো??”
আলো কোনো জবাব দিল না। আধার চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিয়ে, নিজের সূক্ষ্ম ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখে চুপচাপ সরে গেল। আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিচ থেকে ওড়না নিয়ে শরীরে জড়িয়ে সোজা ওয়াশরুমে চলে যায়। তারপর ফিরে এসে মানুষটাকে দেখতে না পেয়ে আলোর খারাপ লাগল। সে ইচ্ছে করে তখন বাঁধা দিতে চায়নি, কিন্তু তার হাতে কোনো উপায় ছিল না। আলো আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। লোকটা নিশ্চয়ই রেগে আছে তার উপর, নয়তো বিরক্ত হয়েছে। সে আস্তেধীরে হেঁটে বিছানায় গিয়ে আধশোয়া হয়ে বসল। হেড বোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। কিছুসময় পর পেটের ওপর গরম কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে চকিতে তাকায়। আধার হট ব্যাগের দিকে ইশারা করে শান্ত গলায় বলল,

-“এটা পেটে ধরে রাখো, আরাম পাবে।”
আলো বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সে অবিশ্বাস চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় জানতে চাইল,
-“আ…আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
আধার হাসলো। ঝুঁকে এসে কপালের মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“এই পুরো তুমি-টাকে পড়তে শিখে গিয়েছি, সাথে তোমার চোখের ভাষা এবং মনটাকেও!”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আমি খারাপ হলেও এতটা খারাপ নই, যে তোমার কষ্ট বুঝব না৷ আমার কাছে সবার আগে তুমি। তারপর বাকী সব!”
আলো আজ আবারো লোকটার প্রেমে উস্টা খেয়ে পড়ল। এই পঁচা স্যারকে এত ভালো হতে কে বলেছিল হুহ্? সে যে প্রতিবার লোকটার প্রেমে মুখ থুবড়ে পড়ে। এটা কী জানে অসভ্য পুরুষটা?
মেয়েটাকে নিজের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধারের মনে দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে ঝড়ের বেগে মাথা নিচু করে শুকনো ঠোঁটে চুমু খেয়ে কামড় দিল। আলো পাশ থেকে পুতুলটা নিয়ে স্যারের গায়ে মে’রে চিল্লিয়ে উঠল,
-“বদমাশ লোক কোথাকার।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে এইড বক্স খুলে পেইন কিলার নিয়ে এসে, আলোর সামনে পানির গ্লাস ও ঔষধ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-“খেয়ে নাও!”
আলো ভদ্র মেয়ের মতো ঔষধ খেয়ে নিল। আধার গ্লাস টি-টেবিলের ওপর রেখে চুপচাপ পাশে এসে শুয়ে পড়ল। আলো কিছুক্ষণ বসে থেকে স্বামীর বুকের ওপর মাথা রাখল। আধার অর্ধাঙ্গিনীকে আলিঙ্গন করে চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল,
-“ঘুমাও!”
-“আপনাকে কিছু বলার ছিল।”
-“আজ নয়, কাল শুনব।”
-“কিন্তু….!”
-“হুঁশশশশশ! কোনো কিন্তু নয়। এখন চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো ঘুমাও। নয়তো বেলকনি থেকে ফেলে দিয়ে আসব।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে পাশে ফিরে, বিরবির করে বলল,
-“আপনি খুব খারাপ।”
আধার আনমনে হেঁসে মেয়েটাকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আই নো, আমি খারাপ। আর তোমার কাছে সারাজীবন খারাপই হয়ে থাকতে চাই, মিস কালো।”

আলোর ঘুম ভাঙল দুপুর বেলায়। এতে মেয়েটা বেশ বিরক্ত। এতদিন ভার্সিটিতে যেতে পারেনি, পড়ালেখা সব ভুলে বসেছে সে। আর আজ আবারো যেতে পারল না৷ মানুষটাও তাকে ডেকে দেয়নি! যদি ডাকত, তাহলে কী আর এইভাবে নাকে তেল দিয়ে আরামসে ঘুমাত? উঁহু, মোটেও না। আলো একরাশ বিরক্তি নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। একেবারে গোসল নিয়ে তবেই বেরিয়ে এল।
রুম থেকে বের হতেই তিথির সাথে দেখা হয়ে যায়৷ এক রাতেই মেয়েটার চেহারার বারোটা বেজে গেছে। নিশ্চয়ই রাতে আবারো কেঁদেছে।
-“তুমি ঠিক আছো?”
ভাবীর কথা শুনে তিথি মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট করে বলল,
-“হু!”
আলো আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ তিথির সাথে গিয়ে ডাইনিংয়ে বসে পড়ল। তারপর নিজ হাতেই মেয়েটার প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। ততক্ষণে সোবহান খান, তাহমিনা খানও হাজির।
-“রাতে ঘুমাওনি? নিজের চেহারার কি হাল করেছো? আর ক’দিন পর তোমার বিয়ে, সেদিকে কোনো খেয়াল আছে?”
মায়ের কথা শুনে তিথি মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না আম্মু। আমার আরো সময়ের প্রয়োজন!”
ব্যস! তাহমিনা খানের খাওয়া থেমে গেল এবং মূহুর্তেই ডাইনিং টেবিলে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে যায়। আলো পানি দিয়ে কোনোমতে মুখের ভাত গিলে খেল। তারপর আড়চোখে শাশুড়ী মায়ের থমথমে মুখের দিকে তাকাল।
-“তোমার বয়সী মেয়েরা বিয়ে করে এক-দুই বাচ্চার মা হয়ে গেছে। আর তুমি চাও আরো সময়?”
তিথির তখন বলতে ইচ্ছে করল—”আমিও বিয়ে করতে চাই আম্মু, কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষটিকে। এছাড়া আর অন্য কাউকে নয়!”
তবে মুখে বলল,

-“আমি এখনো বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই।”
-“ঠিক আছে, যতদিন ইচ্ছে ততদিন সময় নাও। কিন্তু…তোমার ও অনিমেষের এনগেজমেন্ট হবে। আর সেটা আগামী সপ্তাহেই!”
তিথি অসহায় চোখে ভাবী ও দাদাজানের দিকে তাকায়। আলো কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। কারণ সে জানে, যদি এখন কিছু বলে—তাহলে সব ঝড় তার উপর দিয়েই যাবে। তবুও সে চুপ থাকতে পারছে না। আড়চোখে দাদাজানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি তো কিছু একটা বলো দাদাজান। উমম…বিয়েটা এখানেই ভেঙে দাও!”
নাতবউয়ের কথা শুনে সোবহান খানের কপালে চারটে ভাজ পড়ল। তিনি ধীর কণ্ঠে শুধালেন,
-“হঠাৎ বিয়ে ভাঙব কেন? আর শাহ্ পরিবার তো যথেষ্ট ভালো। ওখানে তিথি সুখে থাকবে!”
-“কিন্তু….মেয়েটা তো চায়না বিয়ে করতে!”
-“সবাই কি তোমার মতো বিয়ে করব, বিয়ে করব বলে লাফালাফি করবে আর ইচ্ছে করে পরীক্ষায় ফেল করবে?”
আলোর মুখ কালো হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল,
-“আমি যদি এমন না করতাম, তাহলে আমাকে নাতবউ হিসেবে কীভাবে পেতে হুহ্?”
সোবহান খান ভাবুক হয়ে বললেন,

-“তাও ঠিক।”
-“এখন তাড়াতাড়ি বিয়ে ভাঙার ব্যবস্থা করো। নয়তো হিতে বিপরীত হয়ে যাবে গো দাদাজান!”
-“কোনো সমস্যা?”
-“তোমার নাতনি অন্য একজনকে ভালোবাসে। আর তাকেই বিয়ে করতে চায়।”
অপ্রত্যাশিত কিছু বাক্য শুনে মূহুর্তেই ভীষম খেলেন সোবহান খান। আলো তড়িঘড়ি করে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল। সোবহান খান এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়ে, নাতবউয়ের দিকে বড়বড় চোখে তাকান। আলো মাথা চুলকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। এখন কী হবে কে জানে!
সোবহান খান কিছুক্ষণ থম মে’রে বসে থেকে ছোট বউমার উদ্দেশ্যে বললেন,
-“এত তাড়াহুড়ো করছো কেন? মেয়েটা যখন চাচ্ছে না বিয়ে করতে তখন জোর করো না। ওর মতো ওকে থাকতে দাও। আর আজকাল মেয়ের পছন্দ, অপছন্দ বলেও কিছু আছে। তুমি কি একবারও জিজ্ঞেস করেছো, মেয়েটা কাউকে পছন্দ করে কি-না?”

কথাগুলো শুনে আলো মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। যাক বাবা, দাদাজান অন্তত তাদের পাশে রয়েছে। এখন এ বাড়ির বড় ঘাড়ত্যাড়াকে নিজেদের দলে নিয়ে আসার পালা। তাহলেই কাজ হয়ে যাবে। তার মতো তিথিও মনে মনে বেশ স্বস্তি পেল। অবশেষে কেউ তো তাকে বুঝতে পারল। আর এটাই তার কাছে অনেক।
-“আমার মেয়ের প্রতি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে বাবা। ও কখনো এমন কাজ করবে না, যেখানে আমার মাথা হেঁট হবে। আর পছন্দের কথা যদি বলেন, তাহলে ওর জন্য অনিমেষ একদম পারফেক্ট। ছেলেটা সবদিক থেকেই আমাদের বাড়ির একমাত্র মেয়ে জামাই হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর আমি তো এখনই বিয়ে দিতে চাচ্ছি না, শুধু এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চাচ্ছি। এতে সমস্যা কোথায়? আপনার বড় নাতিরও এই বিয়েতে মত আছে, কারণ সে ব্যক্তিগত ভাবে অনিমেষকে চেনে। তারা দুজন অস্ট্রেলিয়ায় একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে। শুধু সিনিয়র ও জুনিয়র ছিল।”
তাহমিনা খানের কথা শুনে সোবহান খান আর কি বলবেন ভেবে পেলেন না। আগে বড় নাতিকে বলতে হবে, নয়তো কিছু করা যাবে না। অন্যদিকে, আলো মিনমিন করে বলল,

-“লোকটার বয়স বেশি না?”
তাহমিনা খান বিরক্তিতে বললেন,
-“কোথায় বেশি দেখলে? মাত্র তো উনত্রিশ বছর। আর তোমার স্বামীর থেকে দু বছরের জুনিয়র! সেখানে বয়স বেশি দেখলে কোথায়?”
আলো কিছু না বলে চুপ থাকল। তিথি সজোরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“আমি এই বিয়ে করব না আম্মু। আর না এনগেজমেন্ট করব। আমি কাল সকালেই ফিরে যাচ্ছি চট্টগ্রামে।”
একথা বলে খাবার না খেয়েই চলে গেল তিথি। আর তাহমিনা খান রাগান্বিত চেহারায় মেয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

আজ অফিসে একজনের সাথে রাতের বেশ ঝামেলা হয়েছে। সে মূলত লাঞ্চের জন্য ক্যান্টিনে এসেছিল। লাঞ্চ শেষে কফি খেতে খেতে ফোন দেখছিল আর সামনে হাঁটছিল। তখনই অসাবধানতার কারণে একটা টেবিলের সাথে ধাক্কা খায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের কফি গিয়ে পড়ে একটি ফাইলের উপর। সেখানে একজন রমণী বসে থেকে নিজের কাজ করছিল। সকাল থেকে একটানা কাজ করে মাত্র ফাইলটা চেক করছিল। কারণ একটু পরই বসকে জমা দিতে হবে। নয়তো কথা শুনতে হবে। কিন্তু তা আর হলো কই? এক মূহুর্তেই তার সব কষ্ট বিফলে চলে গেল।
রাত সরি বলেছিল মেয়েটাকে। কিন্তু মেয়েটা রাগে-দুঃখে, কষ্টে, যা নয় তাই বলে সবার সামনে অপমান করে তাকে। সবটা সময় ধরে রাত শুধু রাগ-ক্ষোভে ফুঁসে গিয়েছে। অফিস হওয়ার জন্য সে বেশিকিছু বলতে পারেনি মেয়েটাকে। শুধু মুখ বুঁজে চুপচাপ সয়ে গেছে।

-“কি হয়েছে ঈশু? কোনো সমস্যা?”
বান্ধবীর কথা শুনে ঈশু কান্না আটকিয়ে বলল,
-“আজ মনে হয় এই অফিসে লাস্ট দিন আমার।”
পাপিয়া চমকে উঠল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
-“আবার কী করেছিস তুই?”
ঈশু দুপুরের ঘটনা সবটা খুলে বলল। সবকিছু শুনে নিজের কপাল চেপে ধরে পাপিয়া অস্ফুটস্বরে বলল,
-“স্যার তোকে শেষবারের মতো একটা সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এটাও গেল। এখন কি হবে ওপরওয়ালা জানে!”
ঈশু আড়ালে চোখের পানি মুছে নিল। অনেক কষ্টে এই জবটা পেয়েছিল সে৷ পারিবারিক সমস্যার জন্য মাস্টার্স করতে পারেনি। শুধু গ্রাজুয়েশন কোনোমতে শেষ করেছে। পরিবারের বড় মেয়ে হওয়ায় সব দায়িত্ব তার কাঁধে। বাবা বিহীন সংসার তাকেই সামলাতে হয়। আগে টিউশনি করিয়ে সংসার ও নিজের লেখাপড়া চালিয়েছে। আর এখন এই জবটা পেয়েছে, কিন্তু এটাও হারানোর পথে।

-“মিস ঈশিতা! আপনাকে স্যার ডাকছেন।”
অফিসের ম্যানেজার এসে ঈশুর উদ্দেশ্যে বাক্যটি বলে। মেয়েটা জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগল। তখনই রাত এসে একটা ফাইল দিয়ে বলল,
-“নিন, আপনার ফাইল।”
ঈশিতা চমকে উঠল। তড়িঘড়ি করে ফাইল নিয়ে চেক করে দেখল, সব কাজ কমপ্লিট করা আছে। এমনকি তার করা কাজের থেকেও এটা কয়েকগুণ নিখুঁত। ঈশিতা অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,
-“এ….এটা আপনি করেছেন?”
-“নো, আপনার বয়ফ্রেন্ড এসে করে দিয়ে গেছে।”
একথা বলে রাত হনহনিয়ে চলে যায়। মেয়েটা সামান্য ধন্যবাদটুকুও দিতে পারল না। তবে সে এসব না ভেবে জলদি বসের কেবিনে চলে গেল।
আলো নাস্তার প্লেট সাজিয়ে নিয়ে রুমে এসে টি-টেবিলের ওপর রাখল এবং খেয়াল করল, মানুষটা গোসল নিয়ে বেরিয়েছে। আধার তোয়ালে সোফার ওপর রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। তখন অনুভব করে, একজোড়া কোমল হাত তাকে জড়িয়ে ধরেছে। আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে হাতের ওপর হাত রেখে বলল,

-“আজ সূর্য কোনদিকে উঠেছে?”
আলো কোনো জবাব দিল না। সে আগের মতোই পিছন থেকে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ গুঁজে আছে৷ একসময় জিজ্ঞেস করল,
-“ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন?”
আধার বিছানায় বসে, আলোকে নিজের এক রানের ওপর বসিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“আগে যদি এই প্রশ্নটা করতে, তাহলে উত্তর আমার না হতো। আর এখন…”
-“এখন?”
-“হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসায়।”
আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে গালে টুপ করে চুমু খেল। আধার সরু চোখে তাকিয়ে সন্দিহান কণ্ঠে শুধাল,

-“তোমার মতলব আমার ঠিক লাগছে না। কথায় আছে, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ!”
আলো মুচকি হেঁসে মানুষটার গালে হাত রেখে জানতে চাইল,
-“ভালোবাসেন আমায়?”
আধার ঝুঁকে এসে ঠোঁটে শক্ত চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“উঁহু, একটুও না।”
আলো নিঃশব্দে হেঁসে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
-“আমি যদি আপনার কাছে কিছু চাই, তাহলে দিবেন?”
একথা শুনে আধারের মনটা খচখচ করল। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৬

-“আমার থেকে কখনোই মুক্তি পাবে না।”
-“আমার মুক্তি চাই না। আমি সারাজীবন আপনার কাছে থাকতে চাই।”
আধার মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। সে তো এক মূহুর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেছিল।
-“বলো, কি চাই তোমার? আমার সাধ্য থাকলে অবশ্যই এনে দিবো।”
আলো একটু সময় নিয়ে বলে উঠল,
-“তিথির বিয়েটা ভেঙে দিন। ও অন্য একজনকে ভালোবাসে! আর তাকেই বিয়ে করতে চায়।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৮