Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪২
নুসরাত ফারিয়া

আলোর ঘুম ভাঙল দুপুরবেলায়। একটু নড়াচড়া করতে গিয়ে অনুভব করল, তার সর্বাঙ্গ ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে চোখমুখ কুঁচকে কম্ফোর্টারের ভেতর থেকে মাথা বের করে বালিশের ওপর রাখল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকল। আর ভাবতে লাগল—রাতের কথা! সে সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে ভেবেছিল কসমেটিক নয়তো ড্রেস। কারণ মানুষটা তাকে এইগুলোই দিত বেশি। কিন্তু শেষ মূহুর্তে এসে তার ভাবনায় এক বালতি গোবর ঢেলে দিয়ে, অন্যকিছু দিয়েছে। যেটা সে ভাবতেও পারেনি। ভদ্রলোক যে কথার জালে ফাঁসিয়ে এইভাবে ধোঁকা দিতে পারে, সেটা ঘুনাক্ষরেও টের অবধি পায়নি। লোকটাকে দেখে মনে হবে ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না, অথচ আড়ালে ঠিকই কাটাসহ মাছ গিলে খেতে পারে। এসব ভেবে ডানদিকে ঘাড় কাত করে আধোআধো চোখে তাকায়৷ অসভ্য লোকটা সোফায় বসে থেকে রিল্যাক্সে ল্যাপটপে কাজ করছে। পরণে কালো প্যান্ট ও সাদা শার্ট, ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে লেপ্টে আছে কপালে, লালচে ঠোঁট কামড়ে চশমা ভেদ করে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে স্ক্রিনে। হয়তো জরুরী কিছু পড়ছে৷ আলো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে যখন নজর সরিয়ে নিবে, তখনই মানুষটার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। সে চট করে মাথা সোজা করল। আজ লোকটার দিকে তাকাতেও কেন জানি ভীষণ লজ্জা করছে৷

-“আর ইউ ওকে, মিসেস খান?”
আলো প্রতিত্তোরে জবাব না দিয়ে উঠে বসল। মাথা নিচু করে দু’হাতে পরণের শার্টের খোলা দুটো বোতাম লাগাল। তারপর এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করে রেখে দিল। শরীর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে বিছানা থেকে নামতে গেলে আধার উঠে এসে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি সাহায্য করব?”
আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আমার পা ভেঙে যায়নি।”
আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে কাঁধ নাচিয়ে বলল,
-“অ্যাজ ইওর উইশ!”
আলো কিছু না বলে বিছানা থেকে নেমে সামনে পা বাড়াতেই টের পেল, তার পা দুটো অবশ হয়ে আছে। তবুও সে বাহিরে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু বেশিক্ষণ অভিনয় করতে পারল না। কয়েক কদম হাঁটার পরই ধপাস করে ফ্লোরের মাঝে আছড়ে পড়ল। মেয়েটার নাজেহাল অবস্থা দেখে আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে, সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। এবং গমগমে গলায় বলল,

-“সো ম্যাডাম? আপনার পা জোড়া অক্ষত থাকা সত্ত্বেও কেন হাঁটতে পারছেন না?”
একথা শুনে আলোর ইচ্ছে করল, মানুষটার মাথার সব চুল টেনে ছিঁড়তে।
-“হুইলচেয়ার লাগবে? তাহলে আমি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি! কি বলেন?”
আলো রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে বামহাতের তর্জনী তাক করে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“আমি দূর্বল নই। আই রিপিট…দূর্বল নই!”
আধার তর্জনী আঙুল ধরে, চোখে চোখ রেখে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“রাইট জান! আফটার অল…যতটুকু আশা করেছিলাম, তারচেয়ে দিগুণ পেয়েছি। আই অ্যাম সো ইমপ্রেসড!”
কথাগুলোর মানে বুঝতে কয়েক মিনিট সময় লাগে আলোর। কিন্তু যখন বুঝতে পারল, তখন বিছানা হাতড়ে বালিশ নিয়ে লোকটার মুখে ছুঁড়ে মে’রে চেঁচিয়ে উঠল,

-“চুপ করুন অসভ্য লোক।”
আধার বালিশ ধরে নিঃশব্দে হেঁসে উঠে দাঁড়ায়। আলো সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে স্বামীর দিকে তাকায়। পাষাণ লোকটা সারারাত তাকে জ্বালিয়ে এখন দিব্যি দাঁত বের করে হাসছে। অথচ সে শরীরের ব্যথায় ম’রছে!
আলো কোনোমতে উঠে দাঁড়ায়। আধার মনে মনে ভাবল, মেয়েটা হয়তো এখন ওয়াশরুমে যাবে। কিন্তু তাকে ভুল প্রমাণিত করে দিয়ে, আলো বিছানার মাঝে শুয়ে পড়ল। মেয়েটার কান্ড দেখে আধার মাথা নিচু করে হাসল। পরক্ষণে কাছে এসে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল।
-“শুরুতে ত্যাড়ামি না করলেও পারতে।”
আলো দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনিও শুরুতে নাটক না করে, বউয়ের সেবা করলেই পারতেন।”
আধার মাথা নিচু করে মেয়েটার কেটে যাওয়া ঠোঁটের কোণে শক্ত চুমু খেল। তারপর ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে শান্ত গলায় বলল,

-“অর্ধাঙ্গিনীর সেবা করতে এই আধার খান সারাজীবন প্রস্তুত।”
আলো কিছু না বলে বুকের মাঝে লেপ্টে থাকল। আধার খুব যত্নের সাথে প্রিয়তমাকে গোসল করিয়ে দিয়ে, রুমে নিয়ে এল। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসিয়ে রেখে চুলগুলো মুছে দিল। আলো মুখ তুলে ভুলেও আয়নার দিকে তাকায় না। অথচ সে অনুভব করতে পারছে, এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ তাকেই দেখতে ব্যস্ত। আধার নিজের কাজ শেষ করে আলোকে বিছানায় আধশোয়া করে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের শরীর থেকে আধভেজা শার্ট খুলে ফেলল। এই পাঁজি মেয়েটা তাকেও ভিজিয়ে দিয়েছে। আলো আড়চোখে স্বামীর নগ্ন পিঠের দিকে তাকায়। সেথায় অসংখ্য নখের আঁচড়, খামচি স্পষ্ট! কাঁধও রক্ষে পায়নি। সেখানেও ছোপ ছোপ কামড়ের চিহ্ন। এইজন্যই বুঝি টিশার্টের বদলে শার্ট পরেছে। আলো নজর সরিয়ে নিজের গলা ও কাঁধের দিকে তাকায়। অসভ্য লোকটা তাকেও ইচ্ছেমতো কামড়েছে। তাহলে সে কীভাবে ছেড়ে দিত?
তার কল্পনা জল্পনার মধ্যেই আধার চেঞ্জ করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এবং ফিরে এল খাবারের প্লেট নিয়ে। অর্ধাঙ্গিনীর সামনে বসে নিজ হাতে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতে লাগল। সেও একই প্লেট থেকে খেল!

-“জান?”
আলো ঔষধ খেয়ে বিছানার হেড বোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে ছিল। সেসময় গলার ভাঁজে নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠল। আধার সকল ক্ষতস্থানে গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। তারপর আবারো আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল,
-“শ্যামা পাখি?”
আলো ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে নিতে কোনোমতে জবাব দিল,
-“ব…বলুন?”
-“সারপ্রাইজ গিফট পছন্দ হয়েছে?”
লজ্জায় আলোর চেহারা লাল টকটকে হয়ে ওঠে। এহেন কথা শুনে মনে হলো, কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। কতবড় নির্লজ্জ হলে এমন কথা আবার বড়মুখ করে জিজ্ঞেস করে! আলো হাসফাস করতে করতে দু’হাতে স্বামীকে ঠেলতে শুরু করল। আধার গ্রীবাদেশ থেকে মুখ তুলে কপাল কুঁচকে বলল,

-“সবসময় এমন ব্যাঙের মতো তিড়িংবিড়িং করো কেন?”
-“তো কি আপনার অসভ্য মার্কা কথা শুনব?”
-“এখানে অসভ্যতামির কি দেখলে আশ্চর্য!
-“তাহলে ওই কথা জিজ্ঞেস করার মানে কী, হুহ্?”
আধারের কপাল আরো কুঁচকে গেল। সে মেয়েটার বাম হাত
সামনে এনে অনামিকা আঙুলের দিকে ইশারা করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি এটার কথা বলছিলাম।”
আলো হাতের দিকে তাকায়। অনামিকা আঙুলের মাঝে একখানা ডায়মন্ডের রিং চকচক করছে। রিংটা অর্ধেক চাঁদের আকারে ডিজাইন করা। দেখে এক ফালি চাঁদই লাগছে। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে সয়ং চাঁদ নেমে এসেছে তার হাতে। আলো যতটা না মুগ্ধ হয়েছে তারচেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছে। সে আংটিটা ছুঁয়ে দিয়ে বিস্ময়ে আওরাল,

-“চাঁদ…?”
আধার ঝুঁকে হাতে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তুমি আমার অন্ধকার জীবনে আসা এক মুঠো চাঁদের আলো। আর এই তুমি আধারের ব্যক্তিগত চাঁদ!”
-“চাঁদের কিন্তু কলঙ্ক থাকে।”
-“হুম, তোমারও আছে!”
আলো চোখদুটো বড়বড় করে জিজ্ঞেস করল,
-“কই?”
আধার চোখে চোখ রেখে বলল,
-“চেয়ে দেখো, আমিই তোমার সেই কলঙ্ক!”
আলো মুচকি হেঁসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“চাঁদের কলঙ্ক সয়ং আধার খান। উমম…ব্যাপারটা মন্দ নয়!”
আধার অর্ধাঙ্গিনীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। তারপর শুধাল,
-“বললে না তো, গিফট পছন্দ হয়েছে কিনা?”
আলো ঝুঁকে স্বামীর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে শান্ত গলায় বলল,

-“খুউউউব পছন্দ হয়েছে।”
-“আর প্রথমটা?”
আলো দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে টানাটানি করতে করতে বিরবির করে বলল,
-“আপনি ভালো হবেন না, তাই না?
আধার হেঁসে উবুড় হয়ে বাহুডোরে শক্ত করে রমণীর পাতলা কোমর আঁকড়ে ধরে, পেটের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
-“এতদিন তো ভালোই ছিলাম, এখন থেকে নাহয় একটু খারাপই হলাম।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আজ থেকে শুধু তোমার কাছেই আধার খান ব্যাড বয় হয়ে থাকবে, প্রমিস!”

রাতের বেলায় অফিসে একটা পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। একটা ডিল সাকসেস হওয়ায় আজ এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটি। অফিসের গ্রাউন্ডফ্লোর খুব চমৎকার ভাবে সাজানো হয়েছে। সেথায় মানব-মানবীরা গিজগিজ করছে এবং নিজেদের মতো পার্টি এনজয় করছে। এখানে কোনো বাইরের লোক নেই। সবাই অফিসের কর্মচারী!
রাত একটা টেবিলে বসে থেকে রেড ওয়াইন খাচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত না, যতটুকু খেলে নেশায় বুদ হবে না ঠিক ততটুকুই খেয়েছে। তার আগে থেকেই নেশা করার অভ্যেস আছে। দেশের বাইরে থাকাকালীন প্রতিদিন খেত। এইজন্য এখন একটু খেলে সহজে নেশায় মাতাল হয় না। অস্ট্রেলিয়ায় থাকাকালীন একবার বড় ভাইকে ড্রিংক করিয়েছিল, ছেলেটা নরমাল ড্রিংক ভেবে খেয়েছিল। কিন্তু সে কি জানত? ওই নরমাল ড্রিংকে তার ছোট ভাই নেশাক্ত কিছু মিশিয়ে রেখেছিল! রাতের প্ল্যান ছিল বড় ভাইকে মাতাল করে মেয়ের কাছে পাঠাবে। কারণ সারাক্ষণ তাকে চরিত্র নিয়ে কথা শোনাত। তাই সেও ঠিক করে বড় ভাইয়ের ফুলের মতো চরিত্রে একটু দাগ লাগাবে। যেন সেও পাল্টা জবাব দিতে পারে। সবকিছু তার প্ল্যান মতোই হয়েছিল, বিদেশি সুন্দরী রমণীকেও বড় ভাইয়ের রুমে পাঠিয়েছিল। কিন্তু তার অতি ভদ্রলোক ভাই মাতাল অবস্থায় থেকেও ওই মেয়েটার দুগাল চড়িয়ে লাল করে দিয়েছিল।

ওই রাতে শুধু বিদেশি রমণী মা’র খায়নি, সাথে সেও খেয়েছিল। এমনকি সকালে নেশা কেটে যাওয়ার পর তাকে আবারো গণধোলাই দিয়েছে। বড় ভাইয়ের হাতে মা’র খেয়ে এক সপ্তাহের মতো হাসপাতালে পড়ে ছিল। সেইদিন থেকেই তার মনে অনেক রাগ জমে। তাই তো বড় ভাইকে বেশি পাত্তা দেয় না। সে সবসময় নিজ মর্জি অনুযায়ী চলাফেরা করে এসেছে।
কিন্তু! এই দেড়টা বছরের মধ্যে সে অন্য রূপে বড় ভাইকে আবিষ্কার করে। সে এতগুলো বছর নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। কথায় কথায় অপমানও করেছে। সে সারাক্ষণ খারাপ ব্যবহার করলেও কখনো তার ভাই খারাপ ব্যবহার করেনি। বরং সবকিছু মুখ বুঁজে হজম করে নিয়েছে। এতকিছুর পরও তাদের কোনো কমতি অনুভব করতে দেয়নি। উল্টো নিজের সবটা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে এবং করে আসছেও! অথচ সে বড় ভাইয়ের মূল দিতে পারল না। আজকাল এইগুলো ভাবলে, বড্ড আফসোস হয় রাতের। সে যখন থেকে ইনকাম করতে শুরু করেছে, তখন থেকে বুঝতে পেরেছে টাকা কামানো ঠিক কতটা কষ্টের। সময়ের সাথে সাথে সে একটু একটু করে বড় ভাইয়ের কষ্ট উপলব্ধি করতে পেরেছে। একই সাথে অতীতের কিছু খারাপ দৃশ্যও বারবার তাড়া করে বেড়ায়। সে এতটা খারাপ না হলেও পারত।

এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রাত। অতীতে করা কাজগুলো তো আর মুছে ফেলতে পারবে না, তবে সে বর্তমানে নিজেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই যে এখন সেও প্রতিমাসে বাড়িতে টাকা দেয়, আর বাদবাকি নিজের হাতখরচ হিসেবে রাখে। সে আগের মতো আর অতিরিক্ত খরচ করে না। এখন সবকিছু ভেবেচিন্তে, মেপে মেপে খরচ করে৷ সে একটু হলেও বড় ভাই নামক মানুষটার কাঁধের ভার কমাতে চায়। ছেলেটা অনেক করেছে তাদের জন্য, এখন থেকে নাহয় সে সব দায়িত্ব নিবে।
-“হাই হ্যান্ডসাম!”
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে একজন রমণী এসে রাতের পাশে বসল। এটা দেখে ছেলেটার কপাল কুঁচকে গেল। তবে পাত্তা না দিয়ে গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলল,

-“বাই।”
রমণী হাসল। অতঃপর বলল,
-“আমি তোমার ব্যাপারে জানি রাত।”
-“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
-“আই মিন….ইউ আর আ প্লেবয়।”
অচেনা মেয়েটার মুখে এমন কথা শুনেও রাত শান্ত। সে ওয়াইন শেষ করে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তাহলে আপনি আমার সামনে কেন? আপনি কি জানেন না? খারাপ ছেলেদের থেকে দূরে থাকতে হয়!”
-“খারাপ ছেলে যদি এত হট হয়, তাহলে কাছে আসায় যায়।”
-“কি বলতে চাচ্ছেন, সোজাসুজি বলুন।”
-“তোমাকে চাই আমার।”
মেয়েটার অঙ্গভঙ্গি ও হাবভাব দেখে রাত আগেই বুঝতে পেরেছিল এমন কিছুই বলবে। হাজার হোক, সে এসবে অনেকটাই পরিচিত।

-“অনেকটা দেরি করে ফেলেছেন, মিস! আমি আর এসবে নেই।”
যুবকের কথা শুনে মেয়েটা অসন্তুষ্ট হলো। সেই শুরু থেকে ছেলেটাকে দেখে আসছে। এমনকি কাজের বাহানা দিয়েও হুটহাট করে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু ছেলেটা কথা বলা তো থাক, সামান্য তাকায় না পর্যন্ত। তখনই বুঝতে পেরেছিল, হয়তো নিজেকে ভালো করার চেষ্টা করছে। তবুও সে আজ এসেছে। আর এতদিন যেটা সন্দেহ করেছে, এখন সেটাই সত্য হলো।
-“ঠিক আছে, চলো বিয়ে করে নিই।”
মেয়েটার এহেন কথা শুনে রাতের মুখ থেকে সব মদটুকু টেবিলের ওপর ছিটকে পড়ল। সে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে অদ্ভুত চোখে তাকায়৷ তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-“আমার বেড কাঁপানোর বদলে যদি নরম গালে গরম থাপ্পড় পড়ে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে?”
-“খুবই জ’ঘন্য।”
পাশ থেকে খুব চেনা মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে রাত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ঈশিতা বুকে দু’হাত বেঁধে চোখমুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। সিনিয়র ম্যামকে দেখা মাত্রই মেয়েটা কেটে পড়ল। ঈশিতা এসে অন্য চেয়ারে বসতে বসতে বলল,

-“চলুন, বিয়ে করে নিই!”
রাত বাঁকা হেঁসে বলল,
-“চলুন, বিয়ের আগে বাসর করে নিই।”
-“ছিহ! আপনি কত অশ্লীল।”
-“আর আপনি বড়োই সুশীল।”
-“আরে বাবা, আমি তো মজা করছিলাম।”
-“আমিও মজা করছিলাম।”
ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি প্লেবয়?”
রাত শান্ত গলায় বলল,
-“ছিলাম, বাট…এখন বড় ভাইয়ের মতো জেন্টলম্যান হওয়ার চেষ্টা করছি। সে আমার থেকে হাজারগুন ভালো। অথচ আমি ব্যাড বয়!”
-“অতীতে আপনি নাহয় খারাপ ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তো চেষ্টা করছেন ভালো হাওয়ার। এটাই বা কয়জন করে?”
রাত শব্দ করে শ্বাস ছেড়ে বিরবির করে বলে উঠল,
-“অবশেষে কোনো মেয়ে এই খারাপ আমিটাকে বুঝল!”

আজ সারাটাদিন রুমের ভেতরই কেটে গিয়েছে আলোর। মানুষটা কই যেন গেছে, আর সে একা একা মুরগির বাচ্চার মতো ঝিমাচ্ছে। আলো বিরক্তিতে আশেপাশে তাকায়। তারপর আস্তেধীরে বিছানা থেকে নেমে রুমের বাইরে গেল। তার শরীরটা এখন কিছুটা সুস্থ আছে।
ড্রয়িংরুমে কাউকে দেখতে পেল না। আলো সোজা রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ খুলে দেখে, কিছু খাওয়ার জন্য আসে কিনা। মিষ্টি দেখে আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে চটপট মিষ্টি নিয়ে খেতে খেতে ড্রয়িংরুমে এল। কিন্তু বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না। ছুটে এসে বেসিনে বমি করতে শুরু করল।
-“তুমি প্রেগন্যান্ট?”
অপ্রত্যাশিত বাক্যটি শুনে আলো চমকে উঠল। তড়াক করে পিছনে তাকিয়ে দেখে, তাহমিনা খান গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সে চোখমুখ ধুয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আপনার ভুল হচ্ছে মা।”
-“তাহলে হুটহাট করে বমি করে কেন?”
আলো কি জবাব দিবে বুঝতে পারল না। তার ছোট বেলা থেকেই হুটহাট বমি করার বাজে অভ্যাস আছে। বেশিরভাগ পেট খারাপ হলেই সে বমি করে। কিছুদিন ধরেই তার পেট কেমন জানি করছে, এটার জন্য ডাক্তার দেখাতে হবে। নয়তো এসবের জন্য সে ফেঁসে যাবে।
-“সত্যি করে বলো, তোমার পেটে কার বাচ্চা?”
আলো অবাক চোখে তাকায়। কার বাচ্চা মানে? এই মহিলা কি বলতে চাচ্ছে?
-“আপনি এসব কি বলছেন মা? আমি কেন প্রেগন্যান্ট হতে যাবো? আসলে আমার পেটের সমস্যা হয়েছে। এইজন্য…!”

-“তাহলে এটা কী?”
একথা বলে তাহমিনা খান একটা প্রেগ্ন্যাসির কীট বাড়িয়ে ধরল। আলো অবিশ্বাস চোখে ওই লাল দুটো চিহ্নের দিকে তাকায়। তাহমিনা খান তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
-“তোমার মতো মেয়েকে আমার ভালো করেই চেনা আছে। নিশ্চয়ই কোথাও গিয়ে নষ্টামি করে, নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ করেছো। ছিহ! লজ্জা করল না তোমার? আধার স্ত্রীর অধিকার না দেওয়ায় তুমি এমনটা করলে?”
আলোর পুরো পৃথিবী ভনভন করে ঘুরে উঠল। সে কিছু বলতে যাবে তখনই খেয়াল করল—দরজা খুলে আধার স্যার প্রবেশ করছে।

-“কি হয়েছে এখানে? আর তুমি নিচে কেন?”
আলো কোনো জবাব দিল না। শুধু অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার চোখে পানি দেখে আধার অস্থির হলো। তড়িঘড়ি করে কাছে এসে দুগালে হাত রেখে বিচিলিত কণ্ঠে শুধাল,
-“খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকব?”
আলো স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে দিল। এতবড় একটা মিথ্যে অপবাদ, কীভাবে দিতে পারলেন তাহমিনা খান?
-“তারমানে তুমিও জানো, এই মেয়ে মা হতে চলেছে?”
তাহমিনা খানের কথা শুনে যেন আধার আকাশ থেকে পড়ল। পর মূহুর্তে চিল্লিয়ে উঠল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪১

-“হোয়াট ননসেন্স। ও কেন এখন মা হতে যাবে?”
তাহমিনা খান নিজের হাতে থাকা কীট দেখিয়ে বলল,
-“এরপরও আমাকে অবিশ্বাস করবে?”
আধার একপলক লাল দাগের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
-“এটা আমার বউয়ের না। নিশ্চয়ই আশরাফ খানের সেকেন্ড বউয়ের! বাই দ্য ওয়ে…কংগ্রাচুলেশনস ছোট মা!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৩