এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৮
নুসরাত ফারিয়া
বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত একটা বেজে যায়। আলো ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে কোনোমতে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ল। আধার রুমের বাতি নিভিয়ে অর্ধাঙ্গিনীর কাছে এল।
-“মাঝরাস্তায় একজন পুরুষের ইজ্জত লুটে নিয়ে, এখন আরামে ঘুমানো হচ্ছে হুম?”
আলো হেঁসে চোখ পিটপিট করে জবাব দিল,
-“আমি আমার ব্যক্তিগত পুরুষের ইজ্জত লুটেছি, তাতে আপনার কি?”
-“আজকাল পুরুষরাও মেয়েদের কাছে সেইফ না। কি দিনকাল এলো রে বাবা!”
-“শুধু কয়েকটা চুমুই তো খেয়েছি, আপনি এমনভাব করছেন যেন আমি আপনাকে…..!”
বলতে বলতে থেমে যায় আলো। সে একটু আগে কি বলতে চেয়েছিল, ভাবতেই তাজ্জব বনে গেল।
-“তুমি আমাকে….কি বলো?”
বেহায়া ইঙ্গিত বুঝতে পেরে আলো লজ্জায় হাসফাস করতে করতে দু’হাতে স্বামীকে ঠেলে বলল, -“সরুন তো, আমাকে বিরক্ত না করে ঘুমাতে দিন।”
আধার সরে না! বরং সাপের মতো আরো আষ্টেপৃষ্টে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে গলায় মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“আমার ঘুম হারাম করে, এখন ঘুমাতে চাচ্ছো?”
-“তো কি এখন আপনার সাথে ধেইধেই করে নাচব?”
-“নাচতে হবে না, শুধু আমাকে অনুভব করো।”
-“আপনি কিন্তু দিনদিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছেন।”
-“সবকিছু তোমার জন্যই হয়েছে। কথায় আছে, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে!”
আলো প্রতিত্তোরে কিছু না বলে চোখ বুজে নিল৷ সময়ের সাথে সাথে আধার তার অর্ধাঙ্গিনীর মাঝে হারিয়ে গেল। মেয়েটা যখন স্বামীর ভালোবাসার মধ্যে অন্য এক জগতে বিচরণ করছিল, তখন আধার এগিয়ে এসে কপালের মাঝে গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে অবশেষে বলে উঠল,
-“ভালোবাসি…..জান!”
রাত কয়েকদিন ধরে অফিসে যায়নি, আর না কারোর সাথে যোগাযোগ করেছে। বসের ফোনকল পেয়ে আজ অফিসে এসেছে এবং ভেতরে প্রবেশ করতেই ঈশিতার সাথে দেখা হয়ে যায়। মেয়েটা এতদিন পর রাতকে দেখে এগিয়ে এল। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই রাত না চেনার ভান করে পাশ কাটিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। ছেলেটার এমন ব্যবহারে খুবই খারাপ লাগে ঈশিতার। সে তো ওইদিন রাতে ইচ্ছে করে ওইগুলো বলতে চায়নি, হঠাৎ তার কি হয়েছিল তার কে জানে। না চাইতেও রুড বিহেভিয়ার করে ফেলেছে। তারজন্য এই পর্যন্ত কম সরি বলেনি, অথচ ছেলেটা ওই একটা কথা নিয়েই পড়ে আছে।
-“রাত….?”
রাত বসের সাথে কথা বলে কেবিন থেকে বের হতেই ঈশিতা কই থেকে ছুটে এসে ডাকল। রাত পিছনে তাকানোর প্রয়োজন মনে করল না, সে ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে স্বাভাবিক গলায় বলল,
-“জ্বি বলুন?”
রাত খুব সহজে আপনি থেকে তুমিতে আসেনি, বরং তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হওয়ার দেড় মাস পর ‘তুমি’ বলে ডেকেছিল। কিন্তু আজ ওই একই কণ্ঠে ‘আপনি’ ডাক শুনে মেয়েটার আবারো খারাপ লাগল। তবে সে মুখে প্রকাশ করল না। ধীর পায়ে রাতের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
-“ওইদিনের জন্য আবারো সরি! আমি ইচ্ছে করে তোমাকে হার্ট করতে চাইনি।”
রাত মেয়েটার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“ইটস ওকে, মিস! আমি কিছু মনে করিনি। আর আপনি তো ভুল কিছু বলেন নি! আমি আসলেই বাজে একটা ছেলে।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল, -“আজ থেকে এই খারাপ আমিটার আর চেহারা দেখতে হবে না আপনাকে, আর না আমার প্যাচাল সহ্য করতে হবে। কারণ….আমি জব ছেড়ে দিয়েছি এবং খুব শীঘ্রই দেশটাও ছেড়ে দিবো। আজ থেকে আপনি আপনার পথে আর আমি আমার পথে। আই উইশ….আমাদের আর কখনো দেখা না হোক। ভালো থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ!”
একথা বলে রাত গলার টাইয়ের নট ঢিলে করতে করতে চলে যায়। আর পিছনে ফেলে গেল, স্তব্ধ হওয়া এক রমণীকে।
দেখতে দেখতে মৃন্ময়ের রাখা ইভেন্টের সেই বিশেষ দিন চলে এসেছে। আজ সবথেকে বেশি খুশি ছায়া। সাথে মৃন্ময়ের সকল ভক্তরাও। এতগুলো বছর পর প্রিয় গায়কের সাথে সশরীরে দেখা করবে, অটোগ্রাফ নিবে, সেলফি তুলবে, গিফট দিবে আরো কতকিছু। তাই তো দেশে একটা ছোট্ট হুলুস্থুল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মৃন্ময় স্যাড গানের জন্য বিখ্যাত ছিল, বিশেষ করে মেয়েদের কাছে। যারা ভালোবাসায় ছ্যাকা খেত, তারা রাতে মৃন্ময়ের গান শুনতো আর প্রিয় মানুষটিকে অনুভব করে চোখের জলে বালিশ ভেজাতো। অথচ তারা কেউই এই স্যাড গান গাওয়ার পিছনের রহস্য জানে না৷ তারা জানেই না, তাদের অতি প্রিয় গায়ক মৃন্ময় আহমেদ রাজও ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে আছে। আর নিজের ভালোবাসাকে না পাওয়ার কষ্ট থেকেই তার এই যাত্রা শুরু। এই নতুন জগতে সে খুব কম সময়ে সবার মন জিতে নিলেও অনেকেই হয়ে উঠেছে তার শত্রু! ভালোর মাঝেও খারাপ রয়েছে। ঠিক তেমনই মৃন্ময় ভক্তদের সাথে কিছুসংখ্যক শত্রুও পেয়েছে।
❝না রাখা কিছু কথা
সময়েরই ঝরা পাতা
দিয়ে যায় শুধু ব্যথা
এই বুকে….
থেমে যাওয়া সেই গানে
জমে থাকা অভিমানে
বৃষ্টি থামে না, দু চোখে…
ও মন কাঁদে রে,
কাঁদে রে, কাঁদে রে
স্মৃতি মোছে না… ওওও…(২)
আয়না মন ভাঙা আয়না
যায়না ব্যথা ভোলা যায়না
সয়না এই ব্যথা যে সয়না…(২)❞
বিশাল অডিটোরিয়ামে হাজারো ভক্তদের সামনে মূল স্টেজে, নিজের সিগনেচার গিটার নিয়ে গান গাইছে মি. মৃন্ময় আহমেদ রাজ। তার সামনে সকল ভক্তরা গানটা অনুভব করছে। এত এত মানুষের ভিড়ে আলো, ছায়া, মায়া হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম। তাদের জন্য বিশেষভাবে বসার আলাদা করে জায়গা করা হলেও তারা সবার মাঝেই এসে মিলেমিশে গেছে। আজ ছায়া মেরুন রঙা শাড়ি পরে এসেছে। তার দুইপাশে আলো ও মায়া রয়েছে। চারিদিকে ভক্তদের ভিড়ে মিডিয়ার লোকজন, পুলিশ, গার্ডও আছে।
আলো আশেপাশে উঁকিঝুঁকি মে’রে তার স্বামীকে খুঁজছে। একসময় পেয়েও গেল, ওই তো স্টেজের পাশে এক জায়গায় বসে থেকে ফোন টিপছে। চারিপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, সেদিকে উনার কোনো ধ্যান নেই! বেরসিক পুরুষ কোথাকার।
গান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে, মৃন্ময় বসে পড়ল সবাইকে অটোগ্রাফ দিতে। সে হাসিমুখে সবার সাথে টুকটাক কথা বলছে, অটোগ্রাফ দিচ্ছে, সেলফি তুলছে এবং ভক্তদের নিয়ে আসা উপহারও গ্রহণ করল। এমনকি তার তরফ থেকেও উপহার দেওয়া হলো। পুরো হল জুড়ে তার নাম ধরে চিৎকার, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর অন্যরকম একটা উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে।
-“এ্যাই আপু? চলো…চলো? অটোগ্রাফ নিবো।”
ছোট বোনের ঠেলাঠেলি দেখে আলো চোখমুখ কুঁচকে বলল,
-“ভাইয়া তো তোকে অটোগ্রাফ দিয়েছে, তাহলে আবার কেন নিবি?”
-“ইচ্ছে করছে তাই নিবো।”
-“তাহলে যা মায়াকে নিয়ে, আমি ওই ভিড়ের মধ্যে গিয়ে চ্যাপ্টা হতে পারব না।”
ছায়া বড় বোনকে আর জোর করল না। মায়াকে বগলদাবা করে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।
-“অটোগ্রাফ প্লিজ…!”
চেনা কণ্ঠস্বর শুনে মৃন্ময় মুখ তুলে সামনে দাঁড়ানো রমণীর দিকে তাকায়।
-“ডবল চান্স নেই, মিস! আপনাকে আমি অনেক আগেই অটোগ্রাফ দিয়েছি।”
-“আপু ঠিকই বলে, আপনি ভীষণ কিপ্টে।”
মৃন্ময় হেঁসে মেয়েটার হাত থেকে ডায়েরি নিয়ে অটোগ্রাফ দিল। ছায়া নিয়ে আসা একগুচ্ছ লাল গোলাপ এবং একটা ছোট্ট গিফট বক্স বাড়িয়ে দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আপনার ভক্তর তরফ থেকে সামান্য গিফট। আশা করছি গ্রহণ করবেন।”
মৃন্ময় বাধ্য ছেলের মতো সেগুলো নিয়ে নিজের পাশে রাখল। তারপর ছায়া বায়না করল সেলফি তোলার! মৃন্ময় চুপচাপ মেয়েটার সাথে হাসিমুখে অনেকগুলো ছবি তুললো। এবং স্পেশাল একটা গিফটও দিল। খুব চমৎকার একটা ব্রেসলেটের মাঝে খোদাই করে লেখা আছে—M.A!
যেটা পেয়ে এক মূহুর্তেই ছায়া খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল। মেয়েটার খুশি দেখে মৃন্ময় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বাকীদের কে অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে আলো মুচকি হাসল। তখন পাশে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আজ আমার বোনটা খুব খুশি।”
আধার ছায়ার দিকে তাকায়। মেয়েটা মায়াকে কিছু একটা বলছে আর হাসতে হাসতে বাম হাতে ব্রেসলেট পরছে। যেটা একটু আগে মৃন্ময় দিয়েছে।
-“আপনি অটোগ্রাফ নিবেন না?”
আলোর কথা শুনে আধার নজর সরিয়ে নিয়ে বিরবির করে বলল, -“যেখানে প্রতিরাতে বউয়ের থেকে অটোগ্রাফ পাই, সেখানে বন্ধুর থেকে অটোগ্রাফ নিয়ে কি করব?”
-“অসভ্য লোক কোথাকার।”
আলো চোখমুখ কুঁচকে সেখান থেকে সরে গেল। আর আধার মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হাসল।
এত এত ভক্তদের অসীম আনন্দের মাঝেও একজনের ঠোঁটের কোনো ক্রুর হাসি লেগে আছে, সাথে রক্তিম চোখদুটোও জ্বলজ্বল করছে। যেন কিছু একটা করার জন্য সঠিক মূহুর্তের অপেক্ষা আছে। গার্ডের পোশাক পরিহিত ব্যক্তিটা সকলের ওপর নজর রাখছে এবং মৃন্ময়ের থেকে বেশ দূরত্ব বজায় রেখে এক জায়গায় দাঁড়ায়। এখন শুধু ছেলেটার উঠে দাঁড়ানোর পালা। নয়তো টার্গেট মিস হয়ে যাবে। আর তিনি এই সুযোগ কোনোমতেই হারাতে চান না।
অচেনা লোকটাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মৃন্ময় পানি খেতে খেতে উঠে দাঁড়ায়। ভক্তদের সাথে হাত নাড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছে ছেলেটা। ঠিক তখনই, ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে গু লির বিকট শব্দে পুরো হল রুম মূহুর্তেই
কেঁপে উঠল, -“ঠাস…..!”
গু লির বিকট শব্দে অডিটোরিয়ামের হাজার হাজার মানুষের মধ্যে মুহূর্তেই হুলস্থুল আর চিৎকার শুরু হয়ে যায়। মানুষ পাগলের মতো এক্সিট গেটের দিকে দৌড়াচ্ছে। তারা অনেক খেয়ালই করল না, তাদের প্রিয় গায়ক কে বাঁচাতে গিয়ে এক রমণী নিজের বুকে বুলেট নিয়েছে!
-“ছা….ছায়াআআআ।”
চোখের সামনে নিজের কলিজার টুকরো বোনের র’ক্তা’ক্ত দেহ দেখে আলো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। অন্যদিকে, ছায়ার শরীরটা দূর্বল হয়ে ভেঙে পড়ল। ফ্লোরের শক্ত মেঝেতে ওর নাজুক শরীর স্পর্শ করার আগেই মৃন্ময় বাহুডোরে আগলে নিল।
ওইদিকে লোকটা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে কাকে গু লি করতে চেয়েছিল, আর এখন কে গু লি খেয়ে শুয়ে পড়েছে। পরক্ষণেই আবারো পি স্তল তাক করল, মৃন্ময়ের দিকে। কিন্তু এবার গু লি করার আগেই অন্য গার্ড, পুলিশ ছুটে এসে লোকটাকে ঘিরে ধরল।
-“ছ…ছায়া?”
মেয়েটার বুক থেকে গলগল করে তাজা র’ক্ত বের হচ্ছে। বুলেট ঠিক হৃদয়ের কাছে লেগেছে! মেয়েটার র’ক্তে মৃন্ময়ের গায়ে থাকা সাদা শার্ট র’ক্তবর্ণ হয়ে উঠল। ছেলেটার পুরো শরীর কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। এই পিচ্চি মেয়েটা কেন এমন করল? কেন তাকে বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিল? কে বলেছিল মেয়েটাকে, ওর সামনে এসে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে? এই মেয়েটার কি নিজের জীবনের প্রতি একটুও মায়াদয়া নেই? অপরিচিত একজনের জন্য কেউ এইভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে পারে? এখন এই মেয়েটার যদি কিছু হয়, তখন? না, না! সে কিছু হতে দিবে না। কিছু না।
ছায়া অস্বাভাবিকভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। লালচে, অশ্রুসিক্ত নয়নে মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না! মৃন্ময় সময় নষ্ট না করে, মেয়েটাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে গেটের দিকে ছুটল। এবং অস্থির গলায় বিরবির করতে থাকল,
-“কিচ্ছু হবে না তোমার, কিচ্ছু হবে না…!”
তীব্র কষ্টের মাঝেও ছায়া হাসল। সে নিজের র’ক্তা’ক্ত বাম হাতটা মৃন্ময়ের গালে রেখে, জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বহু কষ্টে বলার চেষ্টা করল, -“গ….গ-গায়ক স…সাহেব! আ…আ-আমি, আমি…আ…আপনাকে ভ…ভা….”
হঠাৎই ছায়ার শরীরটা জোরে খিচুনি দিয়ে উঠল। চোখের পলকে মেয়েটার ঠোঁটের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তাজা গাঢ় র’ক্ত গড়িয়ে পড়ল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না, তার শরীরটা একদম নিথর হয়ে যায়। এবং প্রিয় মানুষটির দেওয়া ব্রেসলেট পরা বাম হাতটা অবহেলায় পড়ে গেল। সঙ্গে থেমে গেল শ্বাসপ্রশ্বাস! কিন্তু তার চোখের পাতা দুটো তখনও বন্ধ হলো না, অর্ধেক খোলা পাথরের ন্যায় স্থির চোখ দুটো দিয়ে সে যেন শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
মৃন্ময়ের পায়ের সাথে ওর হৃদয়ও থমকে যায়। সে চট করে মেয়েটার খোলা, কাজল রাঙা, রক্তিম চোখের দিকে তাকায়। শেষ বারের মতো ছায়ার মায়াবী চোখের কার্নিশ বেয়ে দুফোঁটা নোনা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটার নিথর শরীরটা দেখে মৃন্ময়ের চোখদুটো জ্বলে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে মেয়েটাকে নিচে নামিয়ে, বুকের মাঝে নিয়ে চিল্লিয়ে ডাকতে শুরু করল,
-“এ্যাইইই মেয়ে? ওঠো বলছি। দেখো, আমার সাথে একদম নাটক করবে না। আমি জানি, তুমি আমাকে ভয় দেওয়ার জন্য ইচ্ছে করে এমন করছো। এই ওঠো বলছি!”
প্রতিত্তোরে কোনো জবাব এল না। শুধু মেয়েটার আঁখিজোড়ায় খোলা রয়ে যায়।
-“ওহ গড, নো! প্লিজ, সে ইট… প্লিজ, কিছু একটা বলো! এই, ছায়া? ওঠো বলছি, ড্যাম ইট…!”
রমণীর র’ক্তে ভেজা শরীরটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল মৃন্ময়। ওর রক্তিম এক চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল মেয়েটার মলিন মুখের ওপর। তবুও কোনোরকম সাড়া দিল না ছায়া! কারণ সে বহু আগেই আকাশের বাসিন্দা হয়ে গেছে। তাদের সামনে ধপ করে হাঁটু ভেঙে বসল আলো। যুবকের কাছ থেকে নিজের বোনকে ছিনিয়ে নিয়ে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“বোন আমার…! এইভাবে চুপ করে থাকিস না, তোর আপুর যে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। তুই তো আমার সোনা বোন, কখনো আপুকে কষ্ট দিসনি, তাহলে এখন কেন দিচ্ছিস? এই কথা বল না রে…একটু বল বোনু! আমার যে তোর এই নিশ্চুপ থাকাটা সহ্য হচ্ছে না, একটুও সহ্য হচ্ছে না। আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আজ থেকে তোর সব কথা শুনব, রাখব, তোর সব ইচ্ছে পূরণ করব। তুই না আমাকে খুব ভালোবাসিস? তাহলে কেন এখন আমার কথা শুনছিস না? এই বোনু? ওঠ, একটু আমার ডাকে সাড়া দে প্লিজ! আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে, খুউউউব।”
কথাগুলো বলে বোনকে দু’হাতে চেপে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল আলো। তার সাথে তাল মিলিয়ে মায়াও হাউমাউ করে কাঁদছে। ওইদিকে আধার ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে, চোখের সামনে এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্য দেখে এক মূহুর্তের মধ্যে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ওই মেয়েটার শরীরে এত র’ক্ত কেন? একটু আগেই তো সুস্থ অবস্থায় দেখে গেল, তাহলে?
আধার শুকনো ঢোক গিলে রোবটের মতো ভিড় ঠেলে কাছে এগিয়ে গেল। তাকে দেখে আলো কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“দেখুন না, আমার বোনটা কথা বলছে না আমার সাথে। আপনি ওকে বলুন না, আমার সাথে একটু কথা বলতে?”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আ…আমার বোনের শরীর থেকে অনেক র’ক্ত পড়ছে, ওকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলুন। তারপর দেখবেন সুস্থ হয়ে গেছে, আর আমার সাথে কথা বলছে। আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কি বলছি শুনতে পাচ্ছেন না? আমার বোনকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে চলুন, আমার কলিজার টুকরো বোনটার যে কষ্ট হচ্ছে। তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে চলুন, নয়তো ও আরো কষ্ট পাবে!”
আধারের চোখ ভীষণ বাজেভাবে জ্বলছে। সে যতই অতীত ভোলার চেষ্টা করুক না কেন, তবুও কোনো না কোনো উপায়ে ঠিকই তার ক্ষতকে জাগিয়ে তোলে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। কাঁপা কাঁপা বাম হাতটা মেয়েটার মাথার ওপর রাখল। আলো তখনো ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করে যাচ্ছে!
-“ওর শরীর থেকে যত র’ক্ত পড়েছে, সবটা আমি দিবো। তবুও ওকে হাসপাতালে নিয়ে চলুন। আপনার দুটো পায়ে পড়ি স্যার, আমার বোনটাকে বাঁচিয়ে দিন। ছায়া বিহীন আলো থাকবে কীভাবে? আমার ছায়াকে চাইইই! ওকে ফিরিয়ে আনুন, প্লিজ ফিরিয়ে আনুন…। আমি আমার বোনকে চাই।”
শেষের বাক্যগুলো নিভু নিভু গলায় বলে আলো। বুকের মাঝে লেপ্টে থাকা ছোট্ট শরীরটাকে একটু আলগা করে ঝুঁকে এসে বোনের পুরো চেহারায় পাগলের মতো ঠোঁট ছুঁয়ে বিরবির করল,
-“একটু সাড়া দে বোন আমার। তোর আপুর দমটা যে বন্ধ হয়ে আসছে! তুই কবে থেকে এত পাষাণ হলি? বড় বোনের কষ্ট দেখেও চুপ করে আছিস। আমার ছায়া তো এতটা স্বার্থপর ছিল না। কিন্তু…কিন্তু তুই? তুই তো একটা স্বার্থপর মেয়ে বের হলি। একবারের জন্যও আমাদের কথা ভাবলি না। এই ছায়া, ওঠ! নয়তো আমি তোর সাথে কখনো কথা বলব না। এতটা পাষাণ হস না। ভালোবাসি তো, তোকে তোর আপু অনেক অনেক ভালোবাসে। এখন তুই বল, তুইও আমাকে ভালোবাসিস! এইইইই….বল না রেএএএ।”
এত এত কথা বলার পরেও ছায়া নিশ্চুপ। আলো উন্মাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল, স্বামীর বুকের মাঝে। আধার অর্ধাঙ্গিনীকে আগলে নিয়ে চোখ বুজে নিল। ওরও কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কি থেকে কি হয়ে গেল, ভাবতেও দম আঁটকে আসছে। আজকের এই সুন্দর রাতটা এমন ভয়ংকর, নিষ্ঠুরতম না হলেও পারত।
ছায়ার জীবনের সাথে সাথে তার না বলা কথা, অনুভূতিগুলোও থেমে গেল৷ মেয়েটার বলা আর হলো না, সে তার গায়ক সাহেব কে কতটা ভালোবেসেছিল এবং চেয়েছিল। হয়তো ছেলেটা কখনো জানবেও না, তাকেও কেউ একজন নিঃস্বার্থের মতো ভালোবেসেছিল। যার শেষ পরিণাম বড্ডই নিষ্ঠুর! সর্বশেষে ঝড়ে পড়ল একটি ফুল এবং পৃথিবী থেকে এক নিমিষেই মুছে গেল একটি মেয়ের নিষ্পাপ প্রাণ….
অদূরে লোকালয়ের কোথাও একটা থেকে ভেসে এল কিছু গানের লাইন—
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৭
❝Phir agar mujhe, tu kabhi na mile
Humsafar mera tu bane na bane…
Faaslon se mera pyar hoga na kamm
Tu na hoga kabhi ab juda aaaa…
Maine tera naam dil rakh diya
Maine tera naam dil rakh diya..
Dhadkega tu mujhme sada
Maine tera naam dil rakh diya
Tere vaaste kabhi mera yeh pyar
na hoga kamm…❞
