Home এমপি তামিম সরকার এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৪

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৪

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৪
কায়নাত খান কবিতা

—– না গেলে হয় না?’’
—- যেতে হবে লক্ষী।’’
মুখ ভারি করে তামিমের সামনে দাড়িয়ে থাকে সুবহা। বিয়ের প্রায় এক বছর হতে চললো তাদের, তবে এই এক বছরে তামিম কখনোই সুবহাকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। কিন্তু আজ ৬ দিনের জন্য তাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। তার আব্বা জানের কিছু ফেলে রাখা গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে তাকে। কাজটি গুরুত্বপূর্ণ না হলে তামিম কখনোই সুবহাকে ফেলে যেতো না। কিন্তু সব সময় কি আর নিজেদের মন মর্জি মতো সব হয়?
তামিম সুবহার কপাল বরাবর আদুরে পরশ এঁকে দেয়।দু-চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে সুবহার।

— তাড়াতাড়ি চলে আসবো সকাল। ‘’
— আপনাকে ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না তামিম। প্লিজ আমাকে সাথে নিন।’’
—– এমন করে না পরী। আমি জ্বলদি তোমার কাছে ফিরে আসবো। আমাদের বিবাহ বার্ষিকির আগেই। ‘’
—- পিংকি প্রমিস? ‘’
সুবহা হাতের কনিষ্ঠ আঙুল ধরে তামিমের সামনে। তামিম ও নিজের কনিষ্ঠ আঙুল সুবহার আঙুলের ভাঁজে ঢুকিয়ে দেয়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—- পিংকি প্রমিস।
তামিম খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সুবহাকে। মনটা তার ও ভালো নেই। এতো কষ্ট করে পাওয়া শখের বউকে রেখে যেতে তার ও মনটা ভারি হয়ে আসে। কিন্তু দুনিয়ার নিয়মের কাছে মাঝে মাঝে নত হতে হয় আমাদের। সব সময় টাকার পাওয়ার চলে না। মেনে নিতে হয় প্রাকৃতিক নিয়ম।
তামিম সুবহা একসাথে হাত ধরে নিচে নেমে আসে। সেখানে তাদের জন্য সকলে অপেক্ষা করতে থাকে।
—- আসসালামু আলাইকুম আব্বা জান। ‘’
—– অলাইকুম আসসালাম বাবাজান। সব রেডি?’’
— জ্বী।’’
— আচ্ছা, আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।’’
— জ্বী।’’
তামিম তার মায়ের কাছে কিচেনে চলে যায়। যাওয়ার বেলা মায়ের সাথে দেখা না করলে ফোন দিয়ে তামিমের গুষ্টি শুদ্ধ করবে আয়েশা সরকার। তামিম ভালো মতোই জানে তার মায়ের কেমন ঝাঁঝ।

—- আম্মা জান, আমি বের হচ্ছি।’’
— এদিকে আয়’’
আয়েশা সরকারের ডাকে তার পাশে গিয়ে দাড়ায় তামিম।
— জ্বী আম্মা। ‘’
— ফোন চার্জার? ‘’
— নিয়েছি।’’
— আইপ্যাড?””
— নিয়েছি।’’
— মেডিসিন। ‘’
– নিয়েছি।’’
— এক্সট্রা গরম কাপড়?’’
— নিয়েছি।’’
— ফাইল?’’
— ফাইল?’’
আয়েশা সরকার তামিমের মাথায় গাট্টি মা’রে। তারপর পাশ থেকে ফাইল নিয়ে তামিমকে দেয়।

— বাপের মতো এতো ভোলা হলে হইবো? কি কইরা খাবি জীবনে? ‘’
—- খাওয়ানোর জন্য তো আপনি আছেন আম্মা।আপনার হাতে খাবো।’’
— একদম বাপের মতো হয়ছে।’’
— আমার ছেলে তো আমার মতোই হবে গিন্নি।’’
তানভীর সরকার এবং সুবহা দরজায় দাড়িয়ে থেকে মা-ছেলের খুনসুটি দেখতে থাকে। তামিমকে তার মায়ের হাতে মা’র খেতে দেখে বেশ খুশি হয় সুবহা। কারণ তামিম তাকে মা’রে আর তামিমের মা তামিমকে। একদম হিসাব বরাবর।
—- আর একটা দেন আম্মু। ‘’
– শয়তান ছেমড়ি, তুই…!”
আয়েশা সরকার চোখ গরম করে তাকায় তামিমের দিকে তাকায়। সাথে সাথে ভদ্রলোকের মতো চুপ হয়ে যায় তামিম।

— কাল রাতে আমার চুল টেনে ধরছিল আম্মু।’’
— মিথ্যা কথা আম্মা। আমি চুল ধরার মতো লোকই না’’
তামিম খুব কড়া নজর দেয় সুবহার পানে। একা পেলেই মজা বোঝাবে তার ভাবমূর্তি বলে দেয়। সুবহা ও আছে সেই আনন্দে। এখন আর তাকে কিছুই বলতে পারবে না। বললেই নিজে মা’র খাবে।
—- তুমি যে কেমন লোক,৷ সেটা আমার জানা আছে বাপ। আমার পেট থেকেই হয়ছো তুমি। ‘’
— আব্বা। ‘’
— আপনার আম্মার কথার বিরোধীতা করার মতো ক্ষমতা আমার নেই সরি।’’
তানভীর সরকার চুপচাপ আয়েশা সরকারের পাশে গিয়ে দাড়িয়ে পরে। বউয়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো সাহস তার ও নেই।
আয়েশা সরকার তামিমের দু-গালে হাত রাখে।

— বাপ। সাবধানে যাবা, সাবধানে আসবা। কেমন?’’
—- ঠিক আছে আম্মা।’’
সুবহার মন আবার ও ভারি হয়ে আসে তামিমের যাওয়ার কথা শুনে। এতক্ষণ কি সুন্দর সবাই মিলে ছিলো, এখন আবার যাওয়ার পালা।
—- আমাগো কেউ চক্ষে দেখে না রে।’’
—- হো সাকিব, আমাগো কেউ চয়েস করে না।’’
দ্বিতীয় দরজায় দাড়িয়ে পঞ্চ পান্ডব খুব আফসোস করতে থাকে। তাদের কেউ কাছে ডাকছে না। যাবে তো তারাও।
তানভীর সরকার হাত দিয়ে ইশারা করে সবাইকে ডাকে। তামিম সুবহার হাত ধরে তাকে নিজের সাথে দাড় করায়। সবাই মিলে আয়েশা সরকারকে জড়িয়ে ধরে

— লেটস টেক অ্যা সেলফি। ‘’
তামিম ফোন বের করে সকলের সাথে সেলফি নেয়। সবাই সুন্দর মতো দাঁড়ালে ও পঞ্চ পান্ডব আগে দাঁড়ানো চক্করে পুরো সেলফি নষ্ট করে ফেলে। এরা যে মানুষ হবে সেটা বার বার প্রমাণ করে দেয় এরা। হাস্যকর হলে ও খুব সুন্দর মূহুর্ত ক্যাপচার হয় তামিমের ফোনে।
—- আসি পরী। খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে।’’
— প্রমিস করেন তাড়াতাড়ি আসবেন’’
— প্রমিস। ‘’
— আর কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না।’’
— তুমি আর আম্মা ছাড়া আর মেয়ে আছে না-কি দুনিয়াতে? জানতাম না তো।’’
— শয়তান সরকার। ‘’
—- আলবিদা পরী।’’
— আলবিদা নয়, বলুন আসি।’’
— আসি পরী।’’
— হুমমম।’’

এক বুক ভারি কষ্ট নিয়ে সুবহা তামিমকে বিদায় দেয়। তার বার বার মনে হচ্ছিল ইস যদি আর কিছু ক্ষণ তামিমের সাথে থাকা যেতো। আর একবার যদি তামিমকে ছুঁয়ে দেখা যেতে। তারপর থেকে শুরু হয় সুবহার অপেক্ষার পালা। তামিমের অপেক্ষা।
প্রকৃতির আরেক অদ্ভুত নিয়ম হচ্ছে সে কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। আর না কারো জন্য নিজের গতানুগতিক ধারার পরিবর্তন করে। প্রকৃতি তার নিয়ম অনুযায়ী চলতে থাকে। মানুষকে ও তার গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে।
দেখতে দেখতে তামিম সুবহার বিয়ের কেটে যায় প্রায় একটি বছর। চোখের পলকে কীভাবে সময় চলে যায় তারা বুঝতেই পারে না। তাদের জীবনে সৃষ্টিকর্তা এতোটাই সুখ দিয়েছে যে, এক বছর ধরে তারা একসাথে মনেই হয় না। তামিমের মনে হয় এই তো সেদিন ২৬শে মার্চ সকাল ১০ টার সময় সুবহার সাথে রেইল লাইনে দেখা হলো, সুবহা সি-গ্রীন রং এর শাড়ি পড়ে রিক্সায় ছিলো, গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বার বার ঘাম মুছ ছিলো। সবটাই কতটা সতেজ স্মৃতি। অক্ষরে অক্ষরে মনে রাখা যায়।

— আজ ৪ দিন পার হয়ে গেলো তামিম সুবহার কাছে নেই। ফোনে তাদের কথা হয় ঠিকই কিন্তু স্বচক্ষের দেখার এক তীব্র ব্যকুলতা কাজ করে তাদের মাঝে।
— ভালোবাসার খামে, চিঠি লিখে তোমার নামে, পাঠিয়ে দিলাম আমি পড়ে নাও এবার’’
— পড়তে পারবো না, চিঠি আসে নাই শয়তান সরকার।’’
— বেডি রে বেডি, গান শুনাইতাছি, কই তারিখ করবি,
— আপনার গলা যেই বেসুরা। ধৈর্য ধরে গান শুনছি এটাই অনেক।
প্রচন্ড রাগে ফুলতে থাকে তামিম। তার বউ তাকে এমন ভাবে রোস্ট করে, যেমন ভাবে কোনো ইউটিউবার ও একজন আরেক জনকে রোস্ট করে না।
তামিমের পটকা মাছের মতো মুখ দেখে হেঁসে গড়াগড়ি খেতে থাকে সুবহা। তারপর ফোন স্ক্রিন সামনে ধরে বেশ কয়েকবার চু’মু খায়।

— এই শয়তান সরকার। আই লাভ ইউ তো, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ সো মাচ’’
— এখন দূরে আছি তাই বলতাছো, কাছে থাকলে তো পাত্তা দাও না’’
—- পাত্তা না দেওয়ার জন্য ও দূরে থাকতে হয়, আপনি আমাকে দু-সেকেন্ডের জন্য হলো ও কি দূরে থাকতে দিয়েছিলেন?’’
—- ওটা তো এই জন্মে সম্ভব না। মুসলিমের পরজন্ম নাই, তাই কোনো কালেই সম্ভব না।’’
— এতো কেন ভালো বাসেন আমাকে তামিম?’’
—- জানি না পরী। কিন্তু অনেক ভালো বাসি।’’
— কতটা?
—- অনেকটা।’’
— অনেকটা কতটা?’’
—– এই যে এত্ত গুলা।’’

একটার পর একটা কাটা পরিবর্তন হতে থাকে, কিন্তু তামিম সুবহার কথা শেষই যেন হয় না। তামিম যে-দিন থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছে, সেদিন থেকে তারা প্রায় ভোর রাত অব্দি ফোনে কথা বলে। যেনো তাদের কথাই শেষ হয় না। আজ ও তার ব্যতীক্রম নয়। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সুবহা। তামিম তখন ও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সুবহার পানে।
—- একটা মানুষ এতো সুন্দর কীভাবে হয়। এ কী অপরূপ সৃষ্টি আপনার খোদা।’’
ফোনের স্ক্রিনে ঘুমন্ত সুবহাকে দেখে এক তোলপাড় করা অনুভবি কাজ করে তামিমের মাঝে। বার বার তার ইচ্ছে করছিল সুবহাকে খুব গভীর ভাবে ছুঁয়ে দেখার জন্য, কিন্তু কাল সকাল না হওয়া অব্দি তো সে আর সুবহার কাছে আসতে পারবে না। তাই মনের সুপ্ত অনুভূতি গুলোকে মনেই দাবিয়ে রাখে। গেলে সুদে আসলে সব হিসাব চুকিয়ে নিবে।
এভাবে প্রায় সারা রাত তামিম ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে। সুবহা ঘুমায়, এবং তামিম তাকে দেখতে থাকে। যেনো মন ভরছে না তার সুবহাকে দেখে।

—- সকাল ঠিক ৮:৩০ নাগাদ সুবহার ঘুম ভেঙে যায়। পিট পিট করে চোখ খুলতে থাকে সে, উঠে আড়মোড়া দিয়ে নিজের ফোন খুঁজতে থাকে সুবহা। কোথায় ও না পেয়ে বালিশের পানে চোখ যায় তার। এখন ও ভিডিও কল চলছে। সাথে সাথে ফোন হাতে নেয়।
তামিম মীরর এর সামনে দাড়িয়ে সুন্দর মতো রেডি হচ্ছে। সুবহা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সে-দিকে।
—- উঠে গেছো জান?’’
— আপনি সারা রাত কলে ছিলেন?’’
— হুম’’
—- ঘুমাননি কেন?’’
— এতো সুন্দর বউ রেখে ঘুমাবো কীভাবে। কেউ যদি চুরি করে নেয়?’’

তামিমের প্রতি সুবহার ভালোবাসা যেনো আরেক ধাপ বাড়লো। এই নিয়ে চারটি রাত তামিম জেগে জেগে কাটিয়েছে, কথা ছিল ৬ দিন থাকবে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ায় আর থাকতে হলো না। চার দিনেই কাজ শেষ হলো তার।
—- তামিম।’’
— জ্বী পরী?’’
— আলাবু।’’
— আলাবু মোর মাই লাভ।’’
— কয় ঘন্টা লাগবে আসতে?’’
— দুই ঘন্টার ফ্লাইট, আর যেতে যতক্ষণ। ‘’
— ওক্কেয়য়য়য়।

সুবহা উঠে পরে তাড়াতাড়ি। দু-ঘন্টার মধ্যে তামিম চলে আসবে। তাকে ও তো সুন্দর মতো রেডি হতে হবে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুবহা বেশ অনেক ক্ষণ নিজেকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। চারদিন পর তামিমের সাথে দেখা হবে এভাবেই চলে যাবে? অনেক চিন্তা ভাবনা করে, আলমারি থেকে একটি সি-গ্রীন রং এর শাড়ি বের করে সুবহা। আজকে আবার ও এই রং পড়বে সে। ঠিক যেভাবে তাদের প্রথম দেখার সময় পড়েছিল।
মোটামুটি অনেকটা সময় লাগিয়ে রেডি হয় সুবহা। একদম তামিমের মন মতো। আজকে আবার ও তামিমকে পাগল করার উদ্দেশ্য তার।
রেডি হয়ে বেরিয়ে পরে সুবহা, তামিমকে আনতে যাবে সে, সারপ্রাইজ দিবে। তাই তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে বেরিয়ে পরে সুবহা, সে আজকে তার শয়তান সরকারকে সারপ্রাইজ দিবে।
চট্টগ্রাম থেকে আরশিনগরে আসতে দুই ঘন্টার মতো সময় লাগে তামিমের। নেমেই আগে সুবহাকে কল করে, কিন্তু রিং হওয়ার পর ও সুবহা ফোন ধরে না। এভাবে প্রায় ৩-৪ বার কল করে সুবহাকে। কিন্তু কোনো বারই সে ঠিকমতো রেসপন্স করে না।

—- ভাই? এতো টেনশনে ক্যালা?’’
—- তোগো জাতির ভাবি-মা আমাকে পাত্তা দেয় না’’
— আহারে কী কষ্ট। ‘’
— না ভাই কিছু না।’’
তামিম মা’রতে মা’রতে মারে না সাকিবকে। এখন তার বউয়ের কাছে আগে যেতে হবে। সব থেকে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট কাজ হলো সুবহার সাথে দেখা করা।
খোলা জীপ নিয়ে বেরিয়ে পরে তামিম সরকার বাড়ির উদ্দেশ্যে। আগে সুবহার সাথে দেখা করবে, পরে সব কাজ।
গাড়ি চলতে থাকে তার আপন গতিতে। উদ্দেশ্য সরকার বাড়ি। এয়ারপোর্ট থেকে ৩৫ মিনিটের মতো লাগার কথা বাড়িতে যেতে। মাঝে রেললাইনে ট্রেন যাওয়ার ফলে যা একটু সময় লাগে এই যা। সব মিলিয়ে ৪০ কিংবা ৪৫ মিনিটের মতো লাগবে এই যা। এর মাঝে ও তামিম ও বেশ কয়েকবার সুবহাকে ফোন করে। কিন্তু কোনো বারই সে ফোন ধরে না। প্রচন্ড বিরক্ত হয় তামিম। কেন এই মেয়েটা তাকে এতো জালায় আল্লাহ মাবুদ জানে।

— কীরে? গাড়ি থামাইলি কেন?’’
—- লাইন পড়ছে ভাই, ট্রেরেন আইবো।’’
—- ধ্যাত। কখন যে শয়তান ছেমরিরে দেখতে পারবো।’’
খুব কষ্ট করে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তামিম। আজ প্রকৃতি ও যেনো বার বার বাঁধা সৃষ্টি করছে সুবহার কাছে যেতে।
রাগের যখন অন্তিম সীমানায় তামিম তখন তার মুঠোফোন বেজে উঠে। স্ক্রিনে থাকা নাম্বারটি দেখে বেশ খুশি হয়ে যায় তামিম।
—– কই ছিলি এতোক্ষণ শয়তান ছেমরি? আমি কত বার…!
—- তামিম আমি আপনাকে দেখতে পারছি।’’
— দেখতে পারছো? কেমনে? ‘’
—- এই যে সামনে তাকান!’’
মাথা বের করে সামনে তাকায় তামিম। কিন্তু গার্ডদের গাড়ি সামনে থাকায় তেমন কিছুই দেখতে পায় না তামিম। গাড়ি থেকে নেমে একটু সামনে হাঁটে তামিম। দুকদম সামনে যেতেই রেললাইনের ওপারে সুবহাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে তামিম। ঠিক প্রথম দিনের মতো আজকে ও সে সি-গ্রী রং এর শাড়ি পরে দাড়িয়ে আছে সে।

—- গার্ড কই বউ? একা বের হইছো কেন?’’
— সারপ্রাইজ। ‘’
— শয়তান ছেমড়ি, হাতের কাছে পায় আগে।’’
—- ওকে আমি আপনার হাতের কাছে চলে আসছি।’’
সুবহা ফোন কানে তামিমের কাছে আসতে থাকে। তার সমস্ত চোখ জুড়ে শুধুই তামিম। ৫ দিন যেনো ৫ বছরের মতো হয়ে গেলো তার।
—- দাড়ায় বাবা। ট্রেন আসতাছে, যেয়ো নেক আগে।’’
— তামিম এই তিনটা লাইনের ট্রেন যেতে যেতে আমি বুড়ি না হয়ে যায়। ‘’
—- একটু ধৈর্য ধরো বাবা। আমি তো আসছি। আর যাবো না তোমাকে থুয়ে।’’
— – আমি যেতে দিলে তো যাবেন।’’
তিনটি লাইনের মাধ্যে দুটো লাইনের ট্রেন চলে যায়। সুবহা ও খুশি হয়ে যায়, আর একটা লাইন। কিন্তু শেষের ট্রেনটি আসতে আসতে এতোটাই দেরি হয়, সুবহার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে সুন্দর মতো আসতে থাকে তামিমের কাছে।

—— তাড়াহুড়ো করো না পরী। আর একটাই তো লাইন বাকি।’’
— ওই লাইনের আসলে দাঁড়িয়ে যাবো তামিম। এ দুটোর তো চলে গেছে। ‘’
—- পরী এতো অধৈর্য হয়ো না সোনা।’’
—– আপনি চুপ থাকুন””
সুবহা খুশি মনে সামনে যেতে থাকে। আর তো মাত্র একটা লাইন বাকি। ট্রেন আসার শব্দ হলে সাবধান হয়ে যাবে সে। দুটো লাইন যেতেই ট্রেন আসার শব্দ পায় সুবহা। চুপচাপ মাঝের লাইনে দাড়িয়ে পরে সে।
—– দেখেছেন আর একটা লাইন বাকি, ওমনি ট্রেন চলে এলো। এ কি আপনি দৌড়াচ্ছে কেন তামিম।’’
—- পরী চরে….র।।’’
—- চরে যাবো? সাউন্ডে কিছু বুঝি না তামিম। আপনি দৌড়াচ্ছেন কেননননননন? হেলোওওওও?’’

ফোনের এপাশ থেকে খুব জোড়ে জোড়ে তামিমকে ডাকতে থাকে সুবহা। এতো জোড়ে সাউন্ডের ফলে সে কিছু বুঝতে পারছে না। আর তামিম দৌড়ে কেন আসছে এই ট্রেন আসার সময়? সুবহা লাইনের ওপাশে তাকায় তিন নাম্বার লাইন দিয়ে তো কোনো ট্রেন আসছে না। আর শব্দ টা ও তীব্র হতে থাকে, শরীরে ও এক প্রকার কম্পন শুরু হয়ে যায় তার। ভয়ে কপালে ঘাম ছুটতে থাকে। বাম পাশ ফিরে তাকায় সুবহা। তাকানোর সাথে সাথে তার হাত থেকে ফোনটি পরে যায়।

—- সরে যাও পরীরররররররর। পরীররর সররররররর। পরীরররররররররর।
পরী সরোওওওও’’
শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়তাতে থাকে। কিন্তু প্রকৃতি আজ নিষ্ঠুর খেলা খেললো তামিমের সাথে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ট্রেন চলে যায়। শোনা যায় শুধু মাত্র একটি আর্তনাদ। খুব জোড়ে একটি মেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো।
—– তামিমমমমম।’’
ব্যাস, আর কিছু শোনা যায়নি। তারপর ট্রেনের শব্দ। থমকে যায় পরিবেশ।
‘’ কতই না ভালো হতো, যদি তোমার আর আমার শুরু টা এই রেললাইনে না হয়ে কোনো ফাঁকা রাস্তায় হতো। বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় তুমি আবার ও কাছে আসতে আমার। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম। তোমার ভেজা মুখুশ্রী দেখে আমি পরম যত্নে আদর আঁকতাম তোমার ওই কপালে।’’

‘’২ বছর পর’’
—- আজকে ও লেট?’’
— সরি পরী।’’
—- কথা নেই। ‘’
—- বললাম তো সরি।’’
— আপনি সব সময় আমার থেকে দূরে দূরে থাকেন শুধু তামিম।’’
—- আমি নিজের থেকে দূরে থাকতে পারবো সকাল। কিন্তু তোমার থেকে নয়।’’
—- মিষ্টি কথায় চেড়া ভিজে না। আমি গেলাম।’’
— না পরী যাইয়ো না, শোনো, পরীররর।
পরক্ষণেই তামিম লক্ষ্য করে তারা আবার ও সেই রেললাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সুবহা মাঝ লাইনে। সে তার থেকে দূরে। সুবহার হাতে ফোন, কিন্তু মুখে হাসি নেই। সে হাত বাড়িয়ে তামিমকে ডাকে। তামিম সুবহার কাছে যেতেই তার কানে ভেসে আসে ট্রেনের শব্দ ।

—- পরীরররর ট্রেনননন। পরী সরো।’’
তামিম আবার ও খুব জোড়ে দৌড় দেয়। এবার আর তার পরীকে হারানো যাবে না। তাকে ধরে রাখতে হবে।
—- পরীরররর। ও পরীররররর। পরীররর ট্রেনননন।’’
—- পরীরররররররর।’’
‘’ এই অবেলায়, তোমারি আকাশে, নীরব আপসে ভেসে যায়, সে ভিষণ শীতল চোখ, কখনো দেখায়নি তোমায়
কেউ কোথায় ভালো নেই যেন সেই, কত কাল আর হাতে হাত অবেলায়।
কতকাল আর ভুল অবসন্ন_বিকেলে ভেজা
চোখ দেখায়নি তোমায়।’’’
ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে তামিম। প্রচন্ড হাঁপাতে থাকে সে,
— পরী নেই, পরী নেই, পরী বেইমান করলি আমার সাথে, চলে গেলো।, পরী বেইমান।’’
আস্তে আস্তে তার পরীকে বেইমান বলতে থাকে তামিম। আজ দু-বছর হয়ে গেলো, তামিমের পরী নেই তার কাছে। তামিম এতোটাই দূর্ভাগা ছিলো যে তার পরীর লা’শ ও দেখতে পারেনি। মাটি ও দিতে পারেনি। প্রায় ৮ দিন পর তার সেন্স ফিরে। আর সেন্স ফিরার পর থেকে নিজের ভার্সম্য হারিয়ে ফেলে তামিম। আজ সে মানুষিক রোগী। পায়ে বেড়ি দিয়ে রাখতে হয় তাকে। কারণ যখনই সুযোগ পায় তখনই সে ছুটে যায় রেললাইনে কারণ তার পরী তাকে ডাকছে। সুবহার সেদিনের আর্তনাদ এখনো কানে ভেসে আসে তামিমের।

—- তামিমমমমমমম।’’
কতটা কষ্ট পেয়ে ম’রলো তার শখের বউ। মানুষের কত কিছু শখের থাকে। কিন্তু তামিমের ছিলো তার বউ। শখের বউ। কিন্তু আজ আর নেই তার বউ। সুবহা ম’রার ৬ মাসের মাথায় তার ভাই ও মা’রা যায়। সুবহার কোনো অস্বস্তি থাকে না তামিমের কাছে। শুধু আছে এই ঘর ভর্তি তার স্মৃতি।
একটু একটু করে উঠে দেয়ালের সামনে দাড়ায় তামিম। তারপর চক নিয়ে আবার ও সুবহার ছবি আঁকতে থাকে দেয়ালে। পায়ের বেড়িটা বার বার ডিস্টার্ব করে তাকে। কিন্তু সে-দিকে ধ্যান না দিয়ে সে সুবহার ছবি আঁকতে ব্যস্ত।

এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৩

‘’ তোমার -আমার প্রেমে আমি কি একাই স্মৃতির বাহক?
তুমি সব ভালো আমার…. তুমি সব আলো আমার… অন্ধকার তো না।
তবে কী বৃথা যাবে প্রেম পার্থনা?’’
ইশ্বর কী তোমার আমার মিলন লিখতে পারতো না?’’

এমপি তামিম সরকার শেষ পর্ব 

2 COMMENTS

Comments are closed.