এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৪
সেঁজুতি আক্তার
— মাইরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। আজ বাড়িতে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও গাড়ি নিয়ে যেতে ইচ্ছে করলো না। কেন জানি আজ কারো সাহায্য নিতে ইচ্ছে করছে না ওর। নিজের মতো করে যেতে চায়।
— গেটের বাইরে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই একটা রিকশা এসে সামনে থামলো। মাইরা আর কিছু না ভেবে রিকশায় উঠে বসলো। রিকশা ধীরে ধীরে কলেজের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করলো।
— আজ শরীরটা একদম ভালো লাগছে না। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে চোখের সামনে সবকিছু ঘুরছে। তবুও মাইরা চুপচাপ বসে রইল।
— কিছুক্ষণ পর রিকশা কলেজের গেটের সামনে এসে থামলো।
মাইরা ধীরে ধীরে রিকশা থেকে নামল। ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে কলেজের ভেতরে ঢুকতেই পেছন থেকে কেউ এসে ওকে জড়িয়ে ধরল।
— আরে দোস্ত! তুই এত লেট করলি কেন? আমি তোর জন্য কখন থেকে ওয়েট করছি, তোর কোনো আইডিয়া আছে?
— মাইরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখল তনু। মেয়েটাকে দেখেই মাইরার মুখে হাসি ফুটলো। আর বলিস না। বাসায় একটু কাজ ছিল। তাই আসতে লেট হয়ে গেছে।
— তনু মুখ বাঁকিয়ে বলল। তোর বাসায় কাজের শেষ আছে? প্রতিদিনই একটা না একটা কাজ!
— মাইরা মুচকি হেসে বলল, কী করবো বল? কাজ তো করতেই হবে।
— আচ্ছা চল। আগে ক্লাসে চল। আজকে কিন্তু একটা মজার ঘটনা ঘটবে।
— তনু মাইরার হাত ধরে টানতে টানতে ক্লাসের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। মাইরাও চুপচাপ ওর সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
— তনু মেয়েটা ভীষণ সহজ সরল। যা মনে আসে মুখের ওপর বলে দেয়। এই কয়েকদিনেই মাইরার সাথে ওর বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
— মাইরার মনে হয়, তনু মেয়েটা অনেকটা ওর মতোই। হয়তো এই কারণেই এত সহজে দুজনের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
— ক্লাসরুমের সামনে এসে তনু দরজা খুলে ঢুকতেই মাইরা থমকে দাঁড়াল। পুরো ক্লাসে যেন অন্যরকম একটা পরিবেশ। কেউ চুল ঠিক করছে। কেউ মুখে পাউডার দিচ্ছে। কেউ আবার আয়না বের করে নিজের চেহারা দেখছে।
— মাইরা অবাক হয়ে তনুর দিকে তাকিয়ে বলল, এসব কী?
— তনু মুচকি হেসে বলল, জানিস না?
— কী?
— আজকে আমাদের কলেজে নতুন একজন লেকচারার আসছে।
— তাতে? মাইরার এমন নির্লিপ্ত উত্তর শুনে তনু চোখ বড় বড় করে বলল, তাতে মানে? স্যার নাকি অসম্ভব হ্যান্ডসাম!
— মাইরা ভ্রু কুঁচকে ক্লাসের মেয়েদের দিকে তাকাল। একজন স্যারকে দেখার জন্য সবাই এভাবে সাজগোজ করছে?
— শুধু আমাদের ক্লাস না। সিনিয়র আপুরাও নাকি আজকে স্যারের ক্লাস করবে।
— স্যারের নাম কী?
— নীলাদ্রি নীল।
— মাইরা একটু হেসে বলল, বাহ! নামটাও আবার সুন্দর!
— তনু দুষ্টু চোখে বলল, আমি কিন্তু ঠিক করেছি আজকে স্যারকে দেখে আসবো। এত মেয়ে যদি পাগল হয়, তাহলে মানুষটা নিশ্চয়ই দেখার মতো।
— মাইরা তনুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তোর মনে কিছু চলছে না তো?
— ধুর! আমি শুধু দেখতে চাই স্যারটা আসলে কতটা সুন্দর।
— মাইরা মাথা নেড়ে নিজের সিটে গিয়ে বসে পড়ল। ওর এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। মানুষ সুন্দর হলেই বা কী? সুন্দর মানুষ তো ওর জীবনে আছেই।
— মাইরা নিজের অজান্তেই শেহরানের কথা মনে করে ফেলল। সাথে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
— তনু ফিসফিস করে বলল, মনে হচ্ছে স্যার আসছে!
— মাইরা তেমন একটা গুরুত্ব দিল না। কিন্তু পরক্ষণেই দরজার সামনে একটা ছায়া পড়তেই পুরো ক্লাস একদম চুপ হয়ে গেল।
— মাইরা অন্যমনস্কভাবে খাতার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপরও কেন জানি মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল। একজন লম্বা মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাদামাটা শার্ট আর কালো প্যান্ট। হাতে কয়েকটা বই। মুখে কোনো হাসি নেই।
— পুরো ক্লাসের দিকে একবার তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, গুড মর্নিং।
— তনু মাইরার কানে কানে বলল, দোস্ত
— মাইরা তাকাল। তনু ফিসফিস করে বলল, স্যার তো সত্যিই হেব্বি!
— মাইরা কিছু বলল না। নীলাদ্রি নীল টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি নীলাদ্রি নীল। আজ থেকে আপনাদের এই কোর্সটা আমি নেব। কথাটা বলেই নীলাদ্রি বোর্ডের দিকে ঘুরে কিছু লিখতে শুরু করল।
— ঠিক তখনই মাইরার মাথাটা আবার ঘুরে উঠল। হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরল। নীলাদ্রি হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলল, আপনি ঠিক আছেন?
— মাইরা চমকে মাথা তুলল। জি?
— আপনাকে একটু অসুস্থ মনে হচ্ছে। মাইরা দ্রুত মাথা নাড়ল।
না স্যার। আমি ঠিক আছি।
— নীলাদ্রি কয়েক সেকেন্ড মাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর কিছু বলল না। ক্লাস শুরু করল।
— তনু পাশ থেকে মাইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
মাইরা কিছুই বুঝল না। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
— কলেজ কিছুক্ষণ আগেই ছুটি হয়েছে। মাইরা তনুর সাথে কলেজ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসলো। আজকে ওকে আবার পড়াতে যেতে হবে।
— যেই দুইজন ছাত্রীর মা ওকে পড়ানোর জন্য বলেছিল, তাদের বাসার লোকেশন ফোনে পাঠিয়ে দিয়েছে।
— তনুই আসলে মাইরার জন্য এই টিউশনিটা ঠিক করে দিয়েছে। মাইরা ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর তনুকে বলেছিল ব্যাপারটা।
— তনুই পরিচিত একজনের মাধ্যমে দুইজন ছাত্রীর কথা জেনে মাইরাকে জানিয়েছিল।
— তনু মাইরার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, দোস্ত, তুই আজকে সরাসরি ওদের বাসায় যাবি?
— মাইরা মাথা নেড়ে বলল, হুম। আজকে প্রথম দিন। তাই একটু আগে গিয়ে দেখি।
— ভয় লাগছে? মাইরা মুচকি হেসে বলল, একটু তো লাগছেই। নতুন মানুষ, নতুন জায়গা। তবে পড়ানোর ব্যাপারে ভয় নেই।
— ওরা যদি মনোযোগ দিয়ে পড়ে তাহলে আমি ঠিকমতো পড়াতে পারব।
— তনু হেসে বলল, তুই পারবি। তোর পড়াশোনা নিয়ে তো আমার কোনো সন্দেহই নেই।
— মাইরাও হেসে ফেলল। আচ্ছা, তুই বাসায় যা। আমার আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
— ঠিক আছে। পৌঁছে আমাকে একটা ফোন দিস কিন্তু।
— তনু অন্যদিকে চলে গেল। মাইরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল।ফোন বের করে আবারও লোকেশনটা দেখে নিল।
— তারপরে একটা রিকশায় উঠে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে রিকশাটা এসে একটি বাড়ির সামনে থামল। মাইরা রিকশা থেকে নেমে বাড়িটার সামনে দাঁড়ালো।
— ফোনটা বের করে আবার লোকেশনটা মিলিয়ে নিল। ঠিকানাটা এটাই। বড় একটা বাড়ি। সামনে সুন্দর বাগান।
— মাইরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গেটের ভেতরে ঢুকে পড়লো। তারপর দরজার সামনে গিয়ে কলিংবেল চাপলো।
— কিছুক্ষণ পর একজন মহিলা দরজা খুলে দিলেন।
— তুমি মাইরা?
— মাইরা মাথা নেড়ে বলল, জি আন্টি।
— আচ্ছা আসো মা। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। মাইরা ভেতরে ঢুকে পড়লো।
— আন্টি ওকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে বললেন, আমার দুই মেয়েকে পড়াতে হবে। একজন ক্লাস ফাইভে আর একজন ক্লাস সেভেনে।
— দুজনেই পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো। তবে একটু দুষ্টু।
— মাইরা মুচকি হেসে বলল, জি আন্টি। আমি চেষ্টা করবো ভালোভাবে পড়াতে।
— চেষ্টা না মা, তুমি ভালো করে পড়াবে। তোমার বান্ধবী তোমার অনেক প্রশংসা করেছে।
— মাইরা মাথা নেড়ে বলল, জি। আন্টি মেয়েদের ডাকতে ভেতরে চলে গেলেন।
— মাইরা চুপচাপ সোফায় বসে রইলো। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে হাসির শব্দ শুনতে পেল।
— তোরা আবার আমার জিনিস নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
— ভাইয়া, এটা আমাদের লাগবে।
— তোমাদের সবকিছুই আমার লাগে না কেন? কথাগুলো শুনে মাইরা সেদিকে তাকালো।
— কিছুক্ষণ পর একজন লম্বা ছেলে হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। মাইরা প্রথমে তেমন গুরুত্ব দিল না। কিন্তু ছেলেটা সামনে আসতেই হঠাৎ থেমে গেল। মাইরাও থমকে গেল।
— দুজনেই কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
নীলাদ্রি মাইরাকে চিনতে পেরে বলল আপনি?
— মাইরা অবাক হয়ে বলল, স্যার!
— নীলাদ্রি একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি এখানে?
— মাইরা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালো। আমি এই বাড়ির দুইটা মেয়েকে পড়াতে এসেছি।
— নীলাদ্রি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হেসে ফেলল। ওহ! তাহলে আপনিই সেই নতুন টিচার!
— মাইরা মাথা নেড়ে বলল, জি।
— নীলাদ্রি এবার হেসে বলল, অদ্ভুত ব্যাপার তো! কলেজে আজ প্রথম দেখলাম, আর বাসায় এসেই আবার দেখা হয়ে গেল।
— মাইরা কিছু বলল না।
— নীলাদ্রি সোফার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, তবে একটা কথা বলি?
— মাইরা তাকালো। কলেজে আপনাকে দেখে মনে হয়েছিল খুব চুপচাপ টাইপের মানুষ। বাসায় এসে দেখি আপনিই আমার চাচাতো বোনদের নতুন টিচার।
— মাইরা মৃদু হেসে বলল, আমি তো আপনাকে নিয়ে কিছু বলিনি।
–নীলাদ্রি হেসে বলল, আমি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে ফেললাম তাহলে।
— মাইরা এবার একটু হেসে ফেললো।
–ঠিক তখনই ভেতর থেকে দুইটা মেয়ে দৌড়ে বেরিয়ে আসলো।
ভাইয়া!
— নীলাদ্রি সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে বলল, কী হয়েছে?
— আমাদের টিচার এসেছে।
— আমি তো দেখতেই পাচ্ছি।
— একটা মেয়ে মাইরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলল, আপু, তুমি আমাদের পড়াবে?
— মাইরা মুচকি হেসে বলল, হুম।
— তিন্নি বলল, ভাইয়ার মতো বকা দিও না কিন্তু। মাইরা হেসে ফেললো।
— নীলাদ্রি সঙ্গে সঙ্গে বলল, এই মেয়ে, আমি কবে তোদের বকা দিয়েছি?
— প্রতিদিন!
— মিথ্যা কথা।
— মাইরা চুপচাপ ওদের কথাগুলো শুনছিল। নীলাদ্রি মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি চাইলে ওদের একটু বেশি বকতে পারেন। আমার হয়ে কাজটা হয়ে যাবে।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৩
— মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলল, আমি কাউকে অযথা বকবো না।
–আচ্ছা! তাহলে বুঝলাম আপনি খুব ভালো টিচার।
— মাইরা আর কিছু বলল না। দুই মেয়েকে নিয়ে পড়ার ঘরের দিকে চলে গেল।
— পেছন থেকে নীলাদ্রি হেসে বলল, ম্যাডাম, প্রথম দিনেই কিন্তু আমার চাচাতো বোন দুটোকে আমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেবেন না!
— মাইরা ঘুরে তাকিয়ে শুধু মুচকি হাসলো। নীলাদ্রিও হেসে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
