এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫১
সুহাসিনী
প্রেমের কথায় সাঈদ বেশ অবাক হয়।তার মানে এটা রাহি। প্রেম ঠিকই রাহি আর বৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য করতে পারছে কিন্তু সে কেনো পারছে না।ভেবেই রাগে ফেটে পড়ছে সাঈদ। ভেতরে ভেতরে বৃষ্টির উপর চড়াও হলো সে। পরিবেশ পরিস্থিতি চিন্তা করে নিজের অজান্তেই হাতে থাকা কোল্ড্রিংস এর গ্লাসটা হাত দিয়ে এমন ভাবে চেপে ধরলো যে মুহূর্তেই তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। কয়েক টুকরো সাঈদের হাতের চামড়াতেও গেঁথে গেলো।কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল নেই তার।
আর কোনো কথা না বলে সেখান থেকে চলে গেলো সে।নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে।তাহলে রাহির প্রতি তার ভালোবাসা কি প্রেমের ভালবাসার কাছে ঠুনকো? নাহ্,সে আর ভাবতে পারলো না।আশেপাশে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো সে।
সাঈদের কাণ্ডে প্রেম বাকা হাসলো। রাহিকে নিজের সাথে নিয়ে খাবারের দিকে এগোলো।প্রেম হয়তো রাহির মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে প্রেয়সীর দীর্ঘক্ষণ যাবৎ লুকিয়ে রাখা পেটের ক্ষিদে।রাহির প্রেমের সাথে উৎফুল্ল মনে খেতে চলে গেলো।
হঠাৎ শব্দে বৃষ্টি আর শান্ত সেদিকে যেতে নিলে তাদের সাথে থাকা মহিলাটা বৃষ্টির হাত ধরে শান্তকে বললো,
“আপনি যান গিয়ে দেখুন কি হয়েছে।ওর সাথে আমার একটু দরকার আছে।”
মহিলার কথায় শান্ত মনে মনে ভেংচি কাটলেও মুখে কিছু না বলে সেদিকে চলে গেলো। শান্ত প্রস্থান করতেই মহিলাটি বৃষ্টিকে বললো,
“তোমার পরিচয়টা তো দিলে না, যাই হোক, বলতো এই শাড়িটা কোথা থেকে নিয়েছো?শাড়িটা না খুব সুন্দর,দেখেই আমার চোখ আটকে গেছে।”
বৃষ্টি কি বলবে কিছুক্ষণের জন্য বুঝতে পারল না।পড়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আমি আসলে জানি না শাড়িটা কোথা থেকে নেয়া হয়েছে।আমার হাজবেন্ড আমাকে এনে দিয়েছে।”
মহিলার মুখটা মলিন হয়ে গেলো।পরমুহূর্তেই বললো,
“তোমার হাজবেন্ড কোথায়?”
“আছে বোধ হয় ওইদিকটায়।”
এর মধ্যেই সাঈদ বেরিয়ে গাড়ি নিয়ে ছুটে চলেছে কোনো অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। যাকে এতো বছরের জীবনে প্রথমবার ভালো লাগলো সে নাকি অন্যের ঘরণী।এটা ভেবে আফসোস হচ্ছে তার,সে প্রেমের মতো ভালোবাসতে পারেনি বিধায় হয়তো সৃষ্টিকর্তা তার ভাগ্যে রাহিকে রাখে নি।কিন্তু সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে এই জীবনে আর দ্বিতীয়বার করো সাথে নিজেকে জড়াবে না।যার সাথে সারাজীবন কাটাতে চেয়েছিল সে তো কল্পনাতে ই রয়ে গেলো।
গাড়ীর স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ বৃষ্টির কথা মনে পড়লো তার। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ি ঘোরালো সে।
বৃষ্টি সাঈদকে খুঁজছে।তার মনে এক অজানা ভয় জেঁকে বসেছে।এতো বড় জায়গায় তার উপর আবার এতো এতো মানুষ এদের মাঝে সে কীভাবে সাঈদকে খুঁজে পাবে। সাঈদ কি তাকে খুঁজছে?এই একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দিতেই সাঈদের রাগান্বিত মুখবয়টা মনে ভেসে উঠলো বৃষ্টির।তাকে খুঁজে না পেয়ে যদি সাঈদ রাগারাগি করে, এমনিতেই তার উপর রেগে আছে।এসব ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টি প্রায় অন্ধকার হয়ে থাকা একটা জায়গায় পৌঁছে যায়। হঠাৎ বৃষ্টির মাথায় অদ্ভুত যন্ত্রণা হতে শুরু করে।যেটা তার এর আগেও হয়েছিল,যখন সে অন্ধকার রুমে একা হয় পড়তো তখন। বৃষ্টির মনে হচ্ছে তার দিকে কোনো অশরীরী অববয় এগিয়ে আসছে,মুখে লেগে আছে বিশ্রী হাসি।
বৃষ্টির চারপাশ হঠাৎ ঘুরতে শুরু করলো। অতীতের কোনো স্মৃতি এমন ভাবে তাকে তাড়া করছে যেনো ধরতে পারলে এক্ষুনি জান নিয়ে নিবে। বৃষ্টি আর সহ্য করতে পারল না এই অন্ধকারে মিশে থাকা অশরীরীকে। দ্বিকবিদ্বিক শূণ্য হয়ে ছুটতে শুরু করলো সে। এক পর্যায়ে হালকা হলদেটে আলো দেখতে পেয়ে সেদিকে ছুটে গেলো।
ছাদে হলুদ রঙের বাল্ব জ্বলছে।তার নিচেই কয়েকজন লোক মিলে তাস খেলায় মগ্ন,তাদের পাশেই অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে কয়েকটি মদের বোতল। আসলে এই বিল্ডিংয়ের একপাশে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। সেখানকারী কিছু বখাটে ছেলে পেলে ছাদে মদের আসার বসিয়েছিল। বর্তমানে তাদের অধিকাংশই মাতাল।
বৃষ্টি সহজ সরল গ্রামের মেয়ে।তার এসব বিষয়ে জ্ঞান কম।সে লোকগুলিকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। লোকগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে নরম কণ্ঠে শুধাল,
“এই যে ভাইয়ারা, আপনারা আমাকে একটু সাহায্য করবেন?”
বৃষ্টিকে দেখে ছেলেগুলোর মধ্যে অদ্ভুত কৌতূহল দেখা দিল।একটা ছেলে গলা খাকরি দিয়ে বলল,
“কি সাহায্য চায়?”
“আসলে আমি না হারিয়ে গিয়েছি।আমি আমার স্বামীর সাথে একটা পার্টিতে এসেছিলাম এখানে, কিন্তু এখন তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।আপনার যদি কেউ আমাকে সেই পার্টি পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন।”
“এই শহরে এই প্রথম এলে নাকি?”
“জ্বি”
ছেলেগুলো একে অপরের দিকে তাকালো। তাদের মনে হলো সেই অবস্থায় এই রাতের বেলা শাড়ি পরিহিত এক অপরূপ রমনী তাদের আসরকে আরও জমিয়ে দিতে এসেছে।এর পর একটা ছেলে উঠে টলতে টলতে বৃষ্টির কাছে গিয়ে বলল,
“তোমার স্বামীকে খোঁজার দরকার কি, আমরাই তোমার স্বামীর প্রয়োজন মিটিয়ে দিচ্ছি না হয়।”
একটা উটকো গন্ধ এসে বৃষ্টির নাকে ঠেকলো।লোকটার এমন বিশ্রী কথায় এবং লোকটার অবস্থা দেখে এখন বৃষ্টির যা বোঝার সে বুঝে গিয়েছে।এক বিপদ থেকে বাঁচতে সে আরও বড় বিপদের দরজায় এসে নিজেই কলিংবেল চেপে দিয়েছে। সে এমন জায়গায় সাহায্য চাইতে এসেছে যেখানে তার জন্য বিপদ স্বয়ং হাজির।
ছেলেটা যেই বৃষ্টিকে ধরতে আসবে অমনি বৃষ্টি চিৎকার দিয়ে ছেলেগুলোর পেছনের দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে উঠে,
“ঐ তো আমার স্বামী ওখানে।”
সবাই তড়িৎ গতিতে এক সঙ্গে পেছনে ফিরে।কিন্তু একি ওখানে তো কেউ নেই। বৃষ্টির চালাকি বুঝতে পেরে সামনে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি যেভাবে দৌঁড়ে এসেছিল সেভাবেই দৌঁড়ে পালাচ্ছে। লোকগুলো বৃষ্টিকে ধাওয়া করতে শুরু করে।একজন পুরুষের দৌঁড়ের সাথে একজন নারী কি দৌঁড়ে পারে। বৃষ্টি অনেকটা নিচে নেমে গিয়েছিল।কিন্তু এক পর্যায়ে লোকগুলোর মধ্যে থেকে একজন তাকে ধরে ফেলে। টানতে টানতে ছাদে নিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি এক নাগাড়ে চিৎকার করে যাচ্ছে।তার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে অতীতের কিছু স্মৃতি ভেসে উঠলো।
লোকগুলি বৃষ্টিকে নিয়ে প্রায় ছাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এমন সময় যেই ছেলেটা বৃষ্টির হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল পেছন থেকে হঠাৎ কেউ তার পিঠে সজোরে লাঠি বসায়। ছেলেটা এমন আঘাতে তিলমিলিয়ে ওঠে। পেছনে ফিরে পাল্টা আঘাত করতে যাবে ওমনেই পেছনে শক্ত চোয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অববয়টা দেখে সেখানেই জমে গেল।
অনেকক্ষণ যাবৎ জ্যামে আটকে রয়েছে সাঈদ।না সামনে এগোতে পারছে না পেছনে যেতে পারছে। এমনিতেই রাগ চড়ে আছে মাথায় তার উপর আবার ঢাকার এই অসহ্যকর জ্যাম।
একবার ফোন হাতে নিয়ে টাইম দেখে নিলো। এতক্ষণে নিশ্চয়ই পার্টি শেষ, সব লোকজন বেরিয়ে গিয়েছে। আর সহ্য হচ্ছে না তার।সে জানে মেয়েটা শহরের কিছুই চিনে না।আবার এই শহরের নিয়মকানুন কিছুই জানে না। কোথাও না আবার কোনো অঘঠন ঘটে যায়।রাগের বশে স্টিয়ারিংয়ে নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে একটা পাঞ্চ বসিয়ে দিল।
“প্লীজ বাঁচান আমাকে। ওরা… ওরা আমার সাথে…”
আর বলতে পারল না বৃষ্টি, ফুঁপিয়ে উঠলো।
লোকগুলো ভয়ে আর সামনে এগোলো না। শুকনো ঢোক গিললো তাঁদের সামনে যমরাজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাহির খান প্রেম।
ভয়ে লোকগুলো একসঙ্গে প্রেম আর বৃষ্টির কাছে ক্ষমা চাওয়া শুরু করলো।প্রেম রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
“তোদের মতো কতগুলো শু*য়োরের বাচ্চাদের জন্য আজকে এই দেশে মেয়েরা নিরাপদ না। তোদের মতো কুলঙ্গারদের জন্য আজকের বাংলাদেশ মেয়েদের সুরক্ষা দিতে না পেরে এতো পিছিয়ে। আরে তোরাও তো এরকম একটা মেয়ের গর্ভ থেকেই জন্মেছিস তাহলে জানোয়ারের মতো কাজ করতে লজ্জা করে না? আরে জানোয়ারের দল তোদের জন্য আজকে আমরা গোটা পুরুষজাতি নারী জাতির কাছে লজ্জিত।”
মুহুতেই পুলিশ এসে তাদের গ্রেফতার করে সেখান থেকে নিয়ে গেলো। বৃষ্টি ছলছল চোখে প্রেমের দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। কাপাকাপা কণ্ঠে বললো,
“ওদের মতো ওমানুষ দের জন্য আজকে যেমন এই দুনিয়া কুলষিত,ঠিক আপনাদের মতো কিছু মানুষদের জন্য এখনো কিয়ামত ঘটেনি।”
প্রেম সেদিকে আর কথা বাড়ালো না।
“অদ্ভুত হলেও সত্যি,আপনি হুবহু আমার বউ এর মতো দেখতে।আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম মিস্টার সাঈদের সাথে, আজকেও নিশ্চয় তার সাথেই এসেছেন। বাই দ্যা ওয়ে, আপনি এখানে একা কি করছিলেন?”
বৃষ্টি সমস্ত ঘটনা বলতে বলতে প্রেমের সাথে বাইরে চলে এলো।প্রেম জানালো সাঈদ অনেক আগেই বেরিয়ে গিয়েছে।এই কথা শুনে বৃষ্টির কষ্টটা দ্বিগুণ হলো।বউ বলে মানুক আর না মানুক অন্তত মানবিকতার খাতিরে তার সাথে এমন না করলেও পারত।সে মনে মনে ঠিক করে নিলো যত দ্রুত সম্ভব সাঈদকে মুক্তি দিবে।
প্রেম বৃষ্টিকে নিয়ে গাড়িতে বসাতেই রাহি পাথর বনে গেলো।নির্বিকার হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বৃষ্টির পানে।চোখে কোণে হয়তো কিঞ্চিৎ পানির ঝলক দেখা দিল কিন্তু সে খুব সূক্ষ্ম ভাবে তা গোপন করে ফেললো। বৃষ্টি রাহিকে অবাক চোখে দেখে মিষ্টি হেঁসে বললো,
“এতদিন শুনতাম আপনি আমার মতো দেখতে।আজকে নিজের চোখেই দেখে নিলাম। দেখা হয়ে ভালো লাগলো।”
রাহি জবাব দিলো না।চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে প্রেমকে শুধাল,
“বাড়ি চলুন এমপি সাহেব।”
রাহির এরূপ আচরণে বৃষ্টি সহ প্রেমও অবাক না হয়ে পারলো না।”
প্রায় এক ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে গন্তব্যে পৌঁছালো সাঈদ। পুরা বিল্ডিং খালি। বৃষ্টিকে সে পাগলের মতো খুঁজছে। কোথাও নেই।সে রফিক সাহেবের আমানত ঠিক করে রাখতে পারেনি। আমানতের খেয়ানত করে ফেলেছে সে।রাগে নিজের ফোন ছুঁড়ে মারলো পিচ ঢালা পাকা রাস্তায়। মুহূর্তেই তা খন্ড খন্ড হয়ে গেল।
হতাশা ঘিরে ধরলো সাঈদকে। একপর্যায়ে হতাশায় সাঈদ গাড়িতে হেলান দিয়ে রাস্তায় বসে পড়ল।এই শহরে বৃষ্টির কি এমন কোনো আত্মীয় আছে যেখানে সে যেতে পারে।
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫০
সাঈদ বৃষ্টির চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ সেইদিন রফিক সাহেবের দেওয়া চিঠির কথা মনে পড়লো।যেটা তার মানসিক অবস্থার কারণে এখনো খুলে পড়া হয়নি।যদি চিঠি থেকে কিছু জানা যায় সেই আশায় সাঈদ উঠে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে খুঁজতে লাগলো চিঠিটা।খানিকক্ষণ পরেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পেয়ে গেলো সে।সেইদিন যেইভাবে ড্যাশবোর্ডে চিঠিটা রেখেছিল এখনও সেরকমই আছে।হয়তো এই চিঠিতেই আছে বৃষ্টির গোটা জীবন।
