এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫৪
সুহাসিনী
প্রেম বাইকটা স্টার্ট দিতেই রাহি হঠাৎ বলল,
“আমি পদ্মা সেতু দেখব।”
প্রেম এক মুহূর্তও অমত করল না। বরং ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। বৃষ্টিভেজা রাতের বুক চিরে ছুটে চলল দুজনকে নিয়ে তাদের বাইক,গন্তব্য পদ্মা সেতু।
চারপাশে যেন অদ্ভুত এক নীরবতা। দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকারের মাঝে শুধু তাদের পাশ দিয়ে শনশন শব্দ তুলে ছুটে যাচ্ছে দু-একটা গাড়ি। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে একেকটা হলুদ আলোর রেখা তৈরি করেছে। সেই আলো পেরিয়ে তারা দুজন ছুটে চলেছে, যেন এই রাতের কোনো শেষ নেই।
বৃষ্টিতে দুজনেই একেবারে টইটুম্বুর। দুজনের মাথায় হেলমেট,পোশাক গায়ে লেপ্টে আছে। এই ভেজা শরীর নিয়ে নির্ঘাত ঠাণ্ডা লাগবে,তা দুজনেরই জানা। তবুও কারোর মুখে বাড়ি ফেরার কথা নেই।
আকাশে হঠাৎ গর্জন উঠল। তার কিছুক্ষণ পরই অন্ধকার আকাশ চিরে ক্ষণিকের জন্য বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল। সেই এক ঝলক আলোয় রাহি চুপচাপ তাকিয়ে রইল সামনে ছুটে চলা পথের দিকে। তার চোখেমুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
প্রেমও কিছু বলল না। শুধু বাইকের গতি সামলে নিল, যেন এই মুহূর্তটাকে যতটা সম্ভব দীর্ঘ করা যায়।
বৃষ্টি থামেনি। আকাশের গর্জনও থামেনি। অথচ তাদের দুজনের মনে যেন কোনো অস্বস্তি নেই। চারপাশের সুনশান রাত, বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানি আর পাশাপাশি ছুটে চলা,সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠেছে অদ্ভুত সুন্দর।
মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা বুঝি এই মুহূর্তে কেবল তাদের দুজনের জন্যই থমকে আছে।
বাড়ি ফেরার তাড়া নেই কারোর। নেই কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর অস্থিরতা। শুধু পাশাপাশি থাকা আর এই বৃষ্টিভেজা রাতটাকে নিজের মতো করে অনুভব করা।
হয়তো কিছু মুহূর্তের সৌন্দর্য গন্তব্যে নয়—পথেই লুকিয়ে থাকে। আর সেই পথ যদি হয় প্রিয় মানুষটার সঙ্গে, তবে ভিজে যাওয়াটাও যেন একরকম সুখ।
এখন সময় রাত তিনটা বেজে পঁয়ত্রিশ এর ঘরে।
সাঈদ বাড়িতে এসে শুনেছে বৃষ্টি প্রেমদের বাড়িতে।এই খবর শুনতেই তার অন্তরে অন্য রকম প্রশান্তি বয়ে গেলো।রাহি আর বৃষ্টি বোন,এখন তারা একই সাথে একই বাড়িতে আছে। সাঈদ আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না।বৃষ্টিকে চোখের দেখা না দেখলে তার শান্তি হচ্ছে না।তাই বাইরে ঝড়ের বা কারো পরোয়া না করে বেরিয়ে গেলো খান বাড়ির উদ্দেশ্যে।
এই ঝুম বৃষ্টির মাঝে ওই বাড়িতে পৌঁছাতে তার সময় লাগলো পঁচিশ মিনিট এর মতো।রাত শেষের দিকে তাই রাস্তায় তেমন জ্যাম নেই বললেই চলে। সদর দরজা খোলা।সাঈদের ভ্রু কুঁচকে গেলো এতে। এতো রাত পর্যন্ত সদর দরজা খোলা বিষয়টা ঠিক লাগলো না তার।ভেতরে ঢুকতে যদিও তার একটু দ্বিধা হচ্ছিল তবুও ঢুকলো সে। সারাবাড়ি অন্ধকার।এতো রাতে ভদ্র লোকের বাড়িতে আসা কেমন দেখায় ব্যাপারটা ভাবতেই খুব সংকোচ বোধ করলো সে।এখানে আসার আগে এত কিছু মাথায় আসেনি তার।এখন কি করবে বুঝতে পারছে না,একবার চিন্তা করলো কাউকে ডাকবে কিন্তু কাকে ডাকবে ভেবে পেলো না।
হঠাৎ অন্ধকারে ডিম লাইটের মৃদু আলোয় কারো অববয় চোখে পড়ল তার।মুহূর্তেই মস্তিষ্ক জানান দিলো সদর দরজা খোলা ছিল তার মানে নিশ্চয় চোর।তাই সাঈদ শব্দ না করে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো। সোফায় রাখা একটা চাদর তুলে নিলো তার হাতে। মুহূর্তের মাঝেই লোকটার মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে দিয়ে অন্ধকারেই লোকটার মাথায় হাতের কাছে থাকা ফুলদানি দিয়ে বাড়ি মারলো। লোকটাও গগন বিদারক এক চিৎকার দিলো।আবার ঠিক সেই ক্ষণেই সাঈদের মাথায় পড়লো আরেক বারি। সাঈদ তো হতবাক।তাহলে কি চোরের সঙ্গী তাকে আঘাত করলো।পেছনে ফিরে দেখতে নিবে তার আগেই,
ঠাস…
আবার শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করেছে তার বাহুতে।এরপর আর থামা থামি নেই।একের পর এক মার পড়ছে তো পড়ছেই।শুধু যে সাঈদের গায়ে লাঠির বারি পড়ছে তা না।সাঈদ যেই লোকটার মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে মাথায় আঘাত করেছিল তার গায়েও এক নাগাড়ে লাঠির মার পড়ছে।তারা দুজনেই চিৎকার করছে।সাঈদের চিৎকারের মাঝেই তার কানে এক পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো। বৃষ্টি নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে আঘাত করছে আর বলছে,
“কতো বড় সাহস চুরি করতে আসে।গ্রামে চুর ধরে অভ্যস্ত আমি।আমার হাত থেকে ছাড়া পাওয়া অসম্ভব।আজকে মেরে দুটোরই হাড্ডি গুড্ডি গুঁড়ো করে ফেলবো,শালা চুরের দল।”
সাঈদের বুঝতে বাকি রইলো না এটা যে তার সহজসরল বউ।শেষে কিনা বউ এর হাতে চুর সাব্যস্ত হয়ে মার খেতে হচ্ছে।এটা তো রাহির কাজ, বৃষ্টির এতো সাহস হলো কবে থেকে।হবেই না কেনো রাহি আর সে তো একই মায়ের পেটের। দুজনের মধ্যেই রণমূর্তির জিন আছে। কারোটা প্রকট জিন আর কারোটা প্রচ্ছন্ন জিন।
নাহ্, এবার মনে হয় হাড্ডি সব গুঁড়োই হয়ে গেলো। সাঈদের সাথে থাকা লোকটা চিৎকার করে বলছে,
“এই বাড়ির হবু জামাইকে মাঝ রাতে উত্তম মধ্যম কেলানি দেওয়া হচ্ছে।এতো বড় অবিচার ধর্মে সইবে না। আল্লাহ্ গো…”
আবার লাঠির বারি পড়তেই শান্ত আল্লাহর নাম নিয়ে চিৎকার করে উঠলো।
তখনই সেখান চিৎকার চেঁচামেচি শুনে উপস্থিত হলেন আমজাদ খান।সেও অন্ধকারে একজনকে মারতে দেখে গলা উঁচিয়ে বললেন,
“কে এখানে?কি হচ্ছে?”
শান্ত কথা বলতে নিবে তার আগেই তার পিঠে মার পড়লো। বৃষ্টি বললো,
“আঙ্কেল চুর ঢুকেছে বাড়িতে। দুটো চোর। সময় নষ্ট না করে আপনিও হাত লাগান।ওইখানেই লাঠি আছে।”
নে এবার ঠেলা সামলা। বৃষ্টির কথা শুনে সাঈদ,শান্ত দুজনেই চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
“নাহ্….”
ব্যস সেই মুহূর্তেই আমজাদ খান লাঠি তুলে নিয়ে লাগালেন মার। কাম সারছে এবার এদের দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
দুজনেই মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।এতক্ষণ যাও একটা মেয়ের হাতে মার খাচ্ছিল সেটা হজম করার মতো এখন একজন শক্তপোক্ত পুরুষের হাতের মার সহ্য করার মতো না।তখন হঠাৎই ড্রয়িংরুমের লাইট জ্বলে উঠলো।সাঈদের চেহারা চোখে পড়তেই আমজাদ খান লাঠি থামিয়ে দিয়ে চোঁখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।কিন্তু ওদিকে বৃষ্টি চোখ বন্ধ করে একের পর এক বারি মারছেই।ফ্লোরের দিকে তার লক্ষ্য নেই। আমজাদ খানকে থেমে যেতে দেখেই সে লাঠি উঁচিয়ে বললো,
“আঙ্কেল আপনি থামলেন কেনো? মারু….”
শেষ, বৃষ্টির জবান ওখানেই আটকে গেলো আর লাঠিও মাঝ রাস্তায়।নিচে সাঈদকে গড়াগড়ি খেতে দেখে তারও চোখ কপালে।সে আমতা আমতা করে বললো,
“আ… আপনি?”
সাঈদ বেচারা এবার দুখী দুখী মুখ করে বলল,
“হ্যাঁ বউ আমি।তোমার হতভাগা পেয়ারের জামাই।”
মুহূর্তেই বৃষ্টি তার লাঠিখানা ছুঁড়ে অদূরে ফেলে দিলো। আফরোজা খান এসে এদের কান্ড দেখে মাথায় হাত।তিনি তো আমজাদ খানের দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি না হয় বাচ্চা না বুঝে করে ফেলেছে কিন্তু তিনি।উনার মাথায় কি বুদ্ধি নেই।
সাঈদকে আফরোজা খান আর আমজাদ খান টেনে তুললেন।তখন কাপড়ে মুখ ঢেকে পরে থাকা শান্ত খুবই অসহায় সুরে বলল,
“আমাকেও তো কেউ একটু দয়া দেখাও।এই বাড়ির মেয়ে মনে হয় বিয়ের আগেই নিজের বাবার হাতে বিধবা হবে।”
এটা শান্ত বুঝতে পেরেই বৃষ্টি জিব্বায় কামড় দিলো।সে কত বড় আকাম করেছে বুঝতে পেরেই আমজাদ খানের পিছনে আশ্রয় নিলো।শান্তকে তুলে সোফায় বসানো হলে তাদের দুজনের জন্য বরফ আনতে কিচেনে ছুটল আফরোজা খান।
এই সুযোগে বৃষ্টি মিনমিনে গলায় দুজনের কাছে মাফ চেয়ে বলল,
“আমার ভুল হয়ে গেছে,আসলে এতো রাতে দানবের মতো দুজনকে একসাথে দেখে ভেবেছিলাম চোর।”
সাঈদ আর শান্ত আহাম্মোকের মতো চেয়ে দুজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। তারা দেখতে দানবের মতো?
আফরোজা খান বরফ নিয়ে এসে শান্তকে লাগিয়ে দিচ্ছেন আর। বাকি টুকু বৃষ্টির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন সাঈদকে লাগিয়ে দিতে। বৃষ্টি দ্বিধা নিয়ে সাঈদের দিকে তাকালে সাঈদ চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে বলল লাগিয়ে দিতে।তাই বৃষ্টি কোনরকম দ্বিমত ছাড়াই এগিয়ে গেলো সাঈদের দিকে।
কিছুক্ষণ পর সাঈদ বললো,
“মিস্টার প্রেম আর রাহিকে দেখছি না?”
“ওরা হয়তো ঘুমোচ্ছে,শুনতে পায়নি।”
আমজাদ খান বলেন। সাঈদ এবার বিরক্তির সুরে বলল,
“কিছুদিন আগেই প্রেম আর রাহির উপর এতো বড় হামলা হলো তাহলে আপনারা এতো কেয়ারলেস হয়ে সদর দরজা খোলা রেখেছেন কেনো?”
আমজাদ খান আর আফরোজা খান দুজনের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। আফরোজা খানের স্পষ্ট মনে আছে তিনি সবাই ঘুমোতে যাওয়ার পর নিজে সদর দরজা লক করেছিলেন।তাহলে খোলা থাকার প্রশ্নই আসে না।তাহলে কি প্রেম এই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়েছে।প্রশ্নটা মনে জগতেই তিনি ছুটলেন প্রেমের ঘরের দিকে।মায়ের মন বলে কথা।
এমপির অবাধ্য বউ পর্ব ৫৩
ঘরের সামনে এসে উনার ভ্রু কুঁচকে গেলো।দরাজ খোলা,ভেতরে কেউ নেই।তারমানে প্রেম আর রাহি দুজনে এক সাথে বেরিয়েছে।উনার প্রচণ্ড রাগ হলো।এদের শিক্ষা হবে না।এতো বড় দুর্ঘটনা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার আর এক দুর্ঘটনা ঘটাতে চলে গেছে দুজনে।নিচে এসে প্রেমকে ফোন করলে ফোনের ওপাশ থেকে জানায় ফোন বন্ধ।তারা সবাই এক প্রকার টেনশনে পরে যায়।তখনই বাড়ির ল্যানলাইন এ একটা কল আসে। আমজাদ খান রিসিভ করেন কল টা।এতো রাতে বাড়ির ল্যানলাইনে কল আসায় সবার চিন্তা আরও গাঢ় হলো।আমজাদ খান হ্যালো বলার পর ওপাশ থেকে কিছু বলার সাথে সাথে আমজাদ খান চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,
“হোয়াট? এক্সিডেন্ট?”
