কাজলরেখা পর্ব ৪১ (৩)
তানজিনা ইসলাম
জবা বেগম আরমান শিকদারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে বসেছেন।তবে ওনার দরকারি কথা হোক বা অদরকারী, অন্য একজন মানুষকে নিয়ে গীবত করবেনই। এটার হেরফের হবে না। আরমান শিকদার বরাবরই বউয়ের বাধ্য। বউ যা বলবে তা। ওনার নিজের কোনো মতামত থাকে না। জবা বেগমের মুখের কথায় ওনার কথা।
জবা বেগম কিছুক্ষণ বসে চাদনীর বদনাম করলেন। মেয়েটাকে কেন যেন উনি সহ্যই করতে পারেন না। আঁধারের সাথে বিয়ের পর তো একদমই না। অর্পিতার স্বামী কে দেখলে ওনার আফসোস হয়। বোকা মেয়েটা কী রেখে কী খুঁজতে গেছে! এভাবে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল কে মারে৷ আরমান শিকদার স্ত্রীর চিন্তিত মুখ দেখে বললেন
-“কী হয়েছে? চিন্তা করছো কেন?”
-“আঁধার অর্পিতা কে দেখলেই চিল্লাপাল্লা করে। এভাবে থাকা যায় বলো! কতোবার জামাই শুনেছে। আমাদের সম্মানটা কোথায় যাচ্ছে বলতো।”
-“অর্পিতা নিজের দোষেই পাচ্ছে এসব। ওর শ্বশুরবাড়ির মানুষও তো ওঁকে মেনে নিচ্ছে না।এখন আমি ঘরজামাই রাখবো?”
-“ভুল হয়ে গেছে। আর কতোবার বিষয়টা নিয়ে মেয়েটাকে খোঁচাবা তোমরা। আমাদের মেয়ের দায়িত্ব তো আমাদেরই নিতে হবে। ছেলেটা এমন কেন করছে কে জানে! তবে ওরও দোষ দিতে পারি না আমি। অর্পিতার জন্যই তো ওঁকে চাদনীকে বিয়ে করতে হলো। ওর সাথে চাদনীর কোনো দিক দিয়ে যায় বলো?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“যায় না কেন?”
জবা বেগম রেগে বললেন
-“বোকার মতো কথা বলছো কেন? অর্পিতার মতো সুন্দর ও? চাদনী তো এ বাড়ির মেয়েও না।”
-“মেয়ে না হলে কী হবে? আকিব তো ওঁকে মেয়ে মানে। শুধু ওর দায়িত্ব পালনের জন্য আরেকটা বিয়ে পর্যন্ত করেনি। আকিবের ভাগের সব সম্পত্তি তো ওর।”
-“তাহলে তো সিংহভাগ সম্পদ ওই পাবে। বিজনেসের অর্ধেক ভাগ আকিব ভাইয়ার, বাকি অর্ধেক তোমার আর বড় ভাইয়ার। একটা অনাথ আশ্রমের মেয়ে আমার অর্পিতার চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা পাবে? আমাদের উপর ছুড়ি ঘোরাবে। এটা হতে পারে না। আমি এটা হতে দেবো না। আমি আমার মেয়ের জন্য সব করবো।”
-“লাভ নেই। আকিব চাদনীকে কতোটা ভালোবাসে সেটা তুমি জানো, ওর ফিউচারের কথা ভেবে ওর জন্য অনেক জমিজমা কিনে রেখেছে। ফ্ল্যাটও দেখেছিলো। ও আরেকটু বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো।”
জবা বেগম মুখ বাকালেন। শ্লেষাত্মক স্বরে বললেন
-“তুমি অর্পিতার জন্য কিছু করোনি কেন?”
-“আকিবের মতো আমার অতো এবিলিটি নেই। তবে আমার ভাগের সম্পদ অবশ্যই আমার মেয়ের।”
-“তোমার বলদ মেয়েটা আঁধার কে রেখে এ কার কাছে গেছে?এটলিস্ট আঁধারকে বিয়ে করলে, রাজরানীর হালে থাকতো। এখন জামাই শুদ্দ এখানে থাকতে হচ্ছে।”
-“কী আর করার! তবে যায় বলো, বড় ভাইয়ের অনেক বুদ্ধি। চাদনীকে ভালোবাসে এটা সত্য। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার কী জানো, চাদনীর সাথে আঁধারের বিয়ে হলে সবকিছু আঁধারের। বিজনেসের সিংহভাগও ও পাবে। আকিব আবার আঁধারকে বড্ড ভালোবাসে।”
জবা বেগম ব্যঙ্গ করে হাসলেন। বললেন
-“তোমার ভাইয়ের বুদ্ধি আছে ভালো। বাট ওই চাদনী টাকে আমার সহ্য হয় না। না আছে রূপের ছিরি, না আছে আমাদের পরিবারের পরিচয় তারপরও ও সবকিছু পাচ্ছে। যা আমার মেয়ের পাওয়ার কথা ছিলো।”
আঁধার মুখ বিকৃত করে ফেললো। ও মাত্রই বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছিলো। কক্ষের ভেতর থেকে আরমান শিকদার আর জবা বেগমের কথোপকথন ভেসে আসছে। কক্ষের দরজা আজলে বন্ধ করে রাখা। তবুও কথার শব্দ বাইরে পর্যন্ত আসছে। আঁধার ওঁদের কথা শুনেই দাঁড়িয়ে পরেছে। যদিও আড়ি পেতে মানুষের কথা শোনা আঁধারের একটুও পছন্দ না। কিন্তু এসব কানে আসার পর না শুনেও পারেনি। একটা মানুষের চিন্তা ভাবনা নিজের মানুষদের প্রতি এমন কী করে হয়!হয়তো সে কখনো নিজের স্বামী, সন্তান ছাড়া এ বাড়ির মানুষগুলোকে নিজের ভাবেইনি। আঁধার অনেকদিন ধরেই দেখছে ওর বাপ-চাচাদের সম্পর্ক ভালো চলছে না। সবাই উপরিউপর ঠিক আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবার কেমন যেন উদাসীনতা ক্ষোভ। আঁধার এ বাড়িতে থাকে না, কিন্তু এ বাড়ির যৌথ ফ্যামিলির সৌন্দর্যগুলোকে ও খুব ভালোবাসে। ও কখনোয় চায়না এ বাড়ি ভাগ হোক, সবাই আলাদা হয়ে যাক। আসলে যৌথ ফ্যামিলির বন্ডিংগুলো যেমন সুন্দর হয়, তেমনই এসব তিক্ত মনোভাব সব সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়।
জবা বেগম এখনও চাদসীকে গালমন্দ করছে। আঁধার আর শুনলো না। মুখ ফিরিয়ে চলে গেলো নিজের কক্ষে। ও যেতেই দেখলো অর্পিতা বসে আছে ওর কক্ষে। ওঁকে দেখতেই দাঁড়িয়ে বললো
-“ভাইয়া আমি।”
আঁধারের এমনিতেই মাথা খারাপ ছিলো জবা বেগমের কথা শুনে। অর্পিতাকে দেখে সে রাগ সব সীমা অতিক্রম করলো। তেড়েমেড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বললো
-“তুই এখানে কী করছিস? বেরো এখান থেকে।
-“তোমার সাথে আমার কথা আছে আঁধার ভাই, প্লিজ একটু শোনো।”
-“কিন্তু তোর সাথে আমার কোনো কথা নাই। বেয়াদব, আমার রুমে এসেছিস কোন সাহসে! যেখানে তোরে বাড়িতে সহ্য করতে পারছি না আমি, সেখানে আমার রুমে ঢুকে বসে আছিস। বেরো, বেরো বলছি। নয়তো বাড়ি থেকে বের করবো আমি তোকে।”
অর্পিতা অনুরোধ করে বললো
-“আঁধার ভাই। প্লিজ আমার কথাটা শোনো একটু, আমি জানি তোমার অনেক ক্ষোভ আমার উপর। আমার জন্য তোমার সম্মান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি অপারগ ছিলাম।”
আঁধার আগুন দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। আচ্ছা, ও কী এখন একটা থাপ্পড় মেরে দেবে! না ওর চুলগুলো সব ধরে ছিড়ে দিবে। কোনটা করলে এই বেয়াদবটা অপমান সইতে না পেরে বাড়ি থেকে চলে যাবে। আঁধার দ্বন্দ্বে পরলো।
অর্পিতা অসহায় স্বরে বললো
-“তোমার সাথে আমি অনেক দিন ধরে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।কিন্তু তুমি আমাকে দেখলেই রেগে যাও। চেঁচামেচি করো। বিশ্বাস করো আমি পালাতে চাইনি। কিন্তু ও আমাকে ব্লেকমেইল করেছিলো আঁধার ভাই। আমার কাছে কোনো উপায় ছিলো না ওঁকে বিয়ে করা ছাড়া।”
আঁধার বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালো। বললো
-“তুই কচি খুকি তোকে ব্লেকমেইল করবে?”
-“খুকি না বলেই চিন্তায় পরে গিয়েছিলাম। সম্মানের ভয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।নয়তো যে আমি হলুদ সন্ধ্যা পর্যন্ত এতো খুশি ছিলাম সে বিয়ের দিন পালিয়ে যাবে! ওর সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গিয়েছিলো আঁধার ভাই। তোমার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরপরই ওর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিলো।কিন্তু আমি ধরা টা কোথায় খেলাম জানো, ওর সাথে রিলেশনে থাকাকালীন আমি অনেক ক্লোজ হয়ে গিয়েছিলাম।ওর কাছে আমার অনেক সেনসিটিভ ছবি ছিলো।নয়তো তুমি বলো,তোমার মতো একটা মানুষকে ছেড়ে আমি ওর মতো একটা ছেলের সাথে পালিয়ে যাই?”
আঁধার মনোযোগ দিয়ে কোনো কথায় শুনলো না। কিন্তু শেষের কথাগুলো শুনে নাকমুখ কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। শক্ত কন্ঠে বললো
-“নষ্টামির কথা আবার গলা উঁচিয়ে বলছিসও। ভাগ্যেস ছেলেটা তোকে ব্লেকমেইল করলো, তুই পালিয়ে গেলি। নয়তো পরে আমি জানতে পারলে তোর সাথে থাকার রুচি আমার এমনিতেই হতো না।”
-“তুমি আমাকে যা গাল দিবে দাও, কিন্তু এটাই সত্যি আমার তোমার জন্য অনেক খারাপ লেগেছে। আমি..
অর্পিতা চট করে দু’হাতে আঁধারের হাত ধরলো।আঁধার ঝাড়া মেরে ছাড়ালো ওর হাত, চোখ পাকিয়ে বললো
-“হাত ধরছিস কোন সাহসে?”
-“আমার কথাটা শোনো,,
চাদনী কক্ষে ঢুকলো সেসময়। ওঁদের চিল্লাপাল্লা শুনেই বোধহয় দৌড়ে এসেছে। আঁধার আর অর্পিতা দু’জন ওঁকে দেখে একসাথে তাকালো। চাদনী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো দু’জনের দিকে। অর্পিতা তড়িঘড়ি করে বললো
-“চাদনী তুই যা এখন। কথা বলছি আমরা। স্পেস দে।”
চাদনী গেলো না। দৃঢ় স্বরে বললো
-“স্পেসটা তুমি তোমার হাসবেন্ডের সাথে চায়লে আমি দিতাম।কিন্তু আমার জামাইয়ের সাথে আমি তোমারে কী করে স্পেস দিবো অর্পিতা আপু।”
-“তুই বুঝছিস না কেন? কথা বলছি না আমি? নাক কেন গলাচ্ছিস তুই? এতো জামাই জামাই যে করছিস, আমার জন্যই তো পেয়েছিস। কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে হলেও যা।”
চাদনী গভীর স্বরে বললো
-“তুমি বেরোও। এটা আমার রুম।আঁধার ভাইয়ের সাথে বিয়ে হওয়ার পরই এটা আমার রুম হয়ে গেছে। আমি আমার রুমে তোমাকে এলাউ করছি না।”
অর্পিতা আঁধারের দিকে তাকালো। ও ভ্রু উঁচিয়ে চেয়ে আছে চাদনীর দিকে। অর্পিতা ডাকলো
-“আঁধার ভাই।”
-“চাদনী কী বললো শুনতে পাসনি? ও ও নিজের রুমে তোকে এলাউ করছে না। বেরো এখান থেকে। জোর করে বের করলে, তোর হাত-পা আস্ত থাকবে না।”
অর্পিতা অপমানে জর্জরিত হয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে। আঁধার তাকালো চাদনীর দিকে। ও ফুঁসছে। আঁধার কিছু বলতে গেলো। কিন্তু চাদনী বাঁধা দিয়ে বললো
-“কিছু বলো না। দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে। কিছুদিন শাবিহা আপু, কিছুদিন অর্পিতা আপু, আরো কতো আপু যে আছে..। অবাক হই না!”
-“আমার কথাটা একটু শোন।”
চাদনী বিষাদ হাসলো।কন্ঠে জগতের সমস্ত দুঃখ ঢেলে বললো
-“তুমি দুঃখও দিলা, আবার অন্য কারো সাথে দেখার যন্ত্রণাও দিলা।”
-“চাদনী, ইয়ার তুই সিম্পল কথা কেন বুঝছিস না? এটা জাস্ট একটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। তুই ভুল দেখেছিস!”
-“ভুল? আমি নিজের চোখে দেখেছি, অর্পিতা আপু তোমার হাত ধরেছিলো।”
-“সবসময় চোখের দেখাটা সত্যি হয় না! বিশ্বাস করিস না আমাকে?”
-“তুমি করো আমাকে বিশ্বাস? তুমি বুঝেছিলে সেদিন? বোঝোনি। সেদিন তো চোখের দেখাটা জিতে গিয়েছিলো। কী করেছিলে মনে নেই? মেরেছিলে আমাকে। আমি তো সেদিন শুধু একটা ছেলের সাথে দাঁড়িয়েছিলাম, আজ যে একটা মেয়ে তোমার রুমে ঢুকে তোমার হাত ধরেছিলো। আরো আমাকে বলছিলো তোমাদের স্পেস দিতে, নাক না গলাতে।এসব দোষ না আঁধার ভাই?”
কাজলরেখা পর্ব ৪১ (২)
-“আমি ওঁকে বেরিয়ে যেতে বলছিলাম। নির্লজ্জ টা শুনছিলো না। তুই একটু আগে আসলে দেখতি আমি ওর সাথে কি বাজে বিহেভ করেছি। কিন্তু তুই তখনই আসলি যখন ও আমার হাত ধরলো।
-“তুমিও সেদিন তখনই এসেছিলে, যখন আমি ওনার সাথে ক্যাফিটোরিয়ার বাইরে বেরিয়েছিলাম।তুমি আমাকে মেরেছিলে, কিন্তু আমি তোমার কিছু করতে পারবো না। কারণ আমি মেয়ে। আর ঠিক এই জায়গাটায় এসেই মেয়েদের সব ক্ষমতা, অধিকারবোধ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।”

Apu 42 part Kobe diben