Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৩

কাজলরেখা পর্ব ৪৩

কাজলরেখা পর্ব ৪৩
তানজিনা ইসলাম

একটা রাজকীয় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে আকিব শিকদারের গাড়ি। মূল ফটক বন্ধ। আকিব শিকদার গাড়ি থামিয়ে রেখেছেন, এখনো হর্ণ দেননি। হর্ণ দিলে ফটক খুলবে, এটা ওনার জানা কথা। ওনি দ্বন্দ্বে পরেছেন, যাবেন না-কি না! পুরো রাস্তা এসব ভাবতে ভাবতে এসেছেন। ঠিক এজায়গায় উনি রাত্রি শিকদারকে নামিয়ে দিতেন। ওনি বাড়ির ভেতর চলে যেতেন। আকিব শিকদার দেনামোনা করতেন ফটক পেরিয়ে ঢুকবেন না-কি না।ওনাকে মোবারক হোসেন কখনো ডাকেননি। আজও সে দ্বন্দ্ব পরলেন তিনি। আত্মসম্মান বাঁধা দিচ্ছে যেতে, আবার রাত্রি শিকদারের কথা ভেবে এখান থেকে ফিরেও যেতে পারছেন না।

চাদনী অবাক হয়ে দেখছে বাড়িটা। এ জায়গাটায় ছোটবেলায় অনেকবার এসেছে ও। স্হানীয়রা এ বাড়িকে রাজবাড়ী নামে চেনে। এখানের পাশেই ঘোরার একটা সুন্দর জায়গা আছে। চাদনী বাড়ি টু স্কুল করতে করতে ছুটির দিনে ওর বাবার সাথে এখানেই আসতো। চাদনী কখনো এ বাড়িতে ঢোকেনি, তবে বাইরে থেকে দেখতো।এখানকার বাসিন্দারা প্রায়শই বিদেশ চলে যায়। ওঁদের আতরের বড় ব্যবসা আছে এবরোডে। রাজনীতি করে। তাই বেশিরভাগ সময় বাড়িটা খালি থাকে। এসব তথ্য দিয়েছিলো ওঁকে, ওর বাবা। ঘুরতে এসে চাদনী প্রশ্ন করলে এসব কথায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাতো আকিব শিকদার।অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটাই আকিব শিকদার বললো না ওঁকে। এটা ওর নানুরবাড়ি। এখানে ওর কিছু আপনজন আছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আসলেই আপনজন? সে আপনজনরা তো এতোবছরে একবারও মনে করলো না ওঁদের। এজন্যই বোধহয় আকিব শিকদার অভিমান করে কথাটা বলেনি কোনোদিন ওঁকে।
আকিব শিকদার হর্ণ দিলেন।হর্ণের শব্দ পেয়ে দারোয়ান গেইট খুলে দিলো। আকিব শিকদার গাড়ি চালিয়ে গেইট পেরিয়ে ঢুকলেন।দারোয়ান দৌড়ে এলো জানালার কাছে।
নম্র স্বরে বললো
-“স্যার, পার্কিং লট এদিকে।”
দারোয়ান হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দিলো। আকিব শিকদার গাড়ি পার্ক করে, চাঁদনী কে নিয়ে এলেন।
চাদনী পুলকিত হলো। ইশ! কি সুন্দর সবাকিছু। কতোবড় বাগান!ইয়ার্ডের একপাশে হলুদ, লাল আর সাদা রঙের গোলাপের চারা। চাদনীর একটা ছিড়ে নিতে মন চায়লো। কিন্তু সম্মানের দিকে তাকিয়ে আর নিলো না। কেও দেখে ফেললে পাছে ওঁকে ছোঁচা বলে! রাজকীয়তার ছোঁয়া সব জায়গায়। চাদনী ফিসফিস করে বললো

-“তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তো খুব ধনী বাবা!”
-“তোর বাপও কম ধনী না।”
-“ওয়াও। ইয়ে এটিটিউড হি তো মে দেখনা চা রাহিতি।”
আকিব শিকদার চোখ বুঁজে হাসলেন। চাদনী ওনার বাহু জড়িয়ে ধরলো। আকিব শিকদারের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে থাকলো।
সদরদরজার সামনে এসে দাঁড়ালো দু’জনে। চাদনীর বুক ধুকপুক করছে। কারা কারা থাকতে পারে ভেতরে? নানুভাই, খালামনি আর কে? মামা? মামাতো ভাই,বোন?

ওর ভাবনার মাঝেই আকিব শিকদার বেল চাপলেন। তক্ষুনি দরজা খট করে খুলে গেলো। যেন কেও উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলো ওঁদের আসার।দরজার পাশে বসে ছিলো, ওরা আসলেই দরজা খুলে দেবে।
দরজা খুলেই রাত বেরিয়ে এলো, মিষ্টি হেঁসে দেখলো ওঁদের।
চাদনী আকাশ থেকে পরলো যেন।ভুল দেখছে মনে করে, চোখ কচলে আবার তাকালো। নাহ, ভুল দেখছে না। চিমটি কাটার পরও ভুল দেখার কথা না। রাত হাসিমুখে তাকালো, আকিব শিকদারের দিকে।সেও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।
রাত খরখরে গলায় বললো

-“ভালো আছেন আঙ্কেল?”
-“তুমি?”
-“হু, আপনার সাথে না আমার, আলাপ-আলোচনা বাকি থেকে গিয়েছিলো।”
-“আবরার, তুমি এখানে..
-“ওয়াও আপনি আমার নামও মনে রেখে দিয়েছেন।কিউট তো! ভেতরে আসুন।সব পরিচিতি কী বাইরে দাঁড়িয়ে হবে!”
চাদনী আকিব শিকদারের বাহু ছেড়ে দিলো। আকিব শিকদার ভেতরে প্রবেশ করে বললো
-“গাড়িতে নাস্তা ছিলো।সেগুলো আনার জন্য কাওকে লাগতো।”
-“আপনি বসুন। ওরা নিয়ে আসবে।”

আকিব শিকদার হ্যান্ডশেকের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন। রাত ওনার হাত ধরে হ্যান্ডশেক করলো,পরপর জড়িয়ে ধরলো ওনাকে। চাদনী হা করে দেখলো দু’জনকে। রাতের ব্যবহারে দফায় দফায় অবাক হচ্ছে ও। এই নাক উচা ছেলেটা এতো ভালো বিহেভ করছে কী করে! ও কে হয় এ বাড়ির?
রাত একবারও তাকালো না চাদনীর দিকে। অদেখা করলো ওঁকে। মোবারক হোসেন এ পর্যায়ে ড্রইংরুমে এলেন। আকিব শিকদার ওনাকে দেখে কী বলবেন বুঝতে পারলেন না। চাদনী সালাম দিলো ওনাকে। আকিব শিকদার সালাম নিয়ে হেঁসে বললেন

-“কেমন আছো তোমরা?”
চাদনী আকিব শিকদারের দিকে তাকালো। উনিও চাদনীর দিকে তাকালেন। দু’জনের মুখ চাওয়াচাওয়ি দেখলো রাত। আকিব শিকদার আর মোবারক হোসেন দু’জনেই একে অপরের সাথে কথা বলতে সংকোচ বোধ করলেন।
রাত পরিস্থিতি ঠিক করতে বললো
-“আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন না। আমরা বসে কথা বলি।”
আকিব শিকদার কথা না বাড়িয়ে সোফায় গিয়ে বসলেন। চাদনী গেলো ওনার পিছু পিছু। আকিব শিকদার রাতের উদ্দেশ্যে বললেন

-“তুমি এ বাড়ির কে হও আবরার?”
-“রাত্রি শিকদার আমার খালামনি হন। আপনিই বলুন আমি কে হই?”
আকিব শিকদার অবাক স্বরে বললেন
-“তুমি রোদেলা আপুর ছেলে?”
-“জ্বি।”
-“এজন্যই আমার তোমাকে চেনা চেনা লাগছিলো।”
-“কীরকম? আমি আমার আম্মুর মতো দেখতে?”
-“নিরানব্বই পার্সেন্ট।”
রাত হাসলো। পরক্ষণেই মোবারক হোসেনের দিকে তাকিয়ে কনুই দিয়ে গুঁতো দিলো, আকিব শিকদারের সাথে কথা বলার জন্য। উনি করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন। কী কথা বলবেন উনি? যখন বলার দরকার ছিলো তখনই কিছু বলেননি।

-“রোদেলা আপু কেমন আছেন?”
-“আলহামদুলিল্লাহ।”
-“তুমি এখানে বেড়াতে এসেছো?”
-“আমি তো ছোটবেলা থেকে এখানেই থাকি।”
আকিব শিকদার কপালে ভাজ ফেলে তাকালেন। ক্ষীণ স্বরে বললেন
-“আমি শুনেছিলাম রোদেলা আপুর শ্বশুরবাড়ি ঢাকায়?”
-“আম্মুর ডিভোর্স হয়ে গেছে।”
রাত বিষাদ হাসলো। চাদনীর মনে হলো, জাগতিক সকল দুঃখ-বিষাদ রাতের হাসিতে প্রকাশ পেলো। দ্রুত একহাতে আকিব শিকদারের হাত চেপে ধরলো চাদনী। ফিসফিসিয়ে বললো
-“এজন্যই তোমাকে মানুষের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে প্রশ্ন করতে মানা করি। সবার জীবন সুখের হবে এমন কোনো কথা নেউ।”

-“আমিতো শুধু…
-“তুমি আর কোনো প্রশ্ন করবে না।”
রাত চোখমুখ কুচকে দেখলো চাদনীর ফিসফিসানি। আকিব শিকদার বললেন
-“সরি আবরার, ফর ইউর লস্ট।”
-“ইট’স নট মাই লস্ট। মানুষের জীবনে উত্থান-পতন আসে। আম্মু কষ্ট পেয়েছে।কিন্তু আমার মনে হয় ওটা আমার জীবনের প্রাপ্তি ছিলো।”
আকিব শিকদার কী বলবেন ভেবে পেলেন না। সার্ভেন্টরা কিচেন থেকে ট্রে করে নাশতা নিয়ে আসলো। মুহুর্তেই কাচের গোল টেবিলের কোণা কোণা ভর্তি হয়ে গেলো কাঁচের প্লেটে। রাত বললো
-“আঙ্কেল নাস্তা নিন।”

চাদনীকে রাত নাস্তা নিতে বললো না। ভেতরে ভেতরে সুক্ষ্ম অপমানবোধ হলো ওর।রাত আজও চাদনী কে চিনতে পারলো না। চাদনী বুঝে নিলো এ ছেলের স্মৃতিশক্তি খুব কম। এমন একটা মানুষের জনতার নেতা হওয়া একেবারেই উচিত না। এমন ভুলোমনা নেতা, ওঁদের একটুও দরকার নেই।
-“আপনি নিচ্ছেন না কেন? আপনাকে আলাদাভাবে বলতে হবে?”
চাদনী নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকালো রাতের দিকে। আকিব শিকদার বললেন
-“ও এতো হেলদি ফুড খায় না!”
-“কী খায় সে?”
-“জাঙ্কফুড আর কোনোমতে একচামচ ভাত। এভাবেই বেঁচে আছে।”
চাদনী ফিসফিস করে বললো
-“ওনাকে এসব বলছো কেন তুমি?”
-“আরে আমি তো..
-“তোমার সাথে আর কথা নাই আমার।”
রাত ছোটোছোট চোখ করে তাকালো চাদনীর দিকে। এই মেয়ে এতো ফিসফিস করে কেন? ফিসফিসানি পিচ্চি একটা!

আকিব শিকদার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন
-“তুমি আমাদেরকে ডেকে পাঠিয়েছো তাই না আবারার?”
-“শুধু আমি না তো। নানুভাইও আপনাদের সাথে দেখা করতে চেয়েছেন।”
-“তোমার নানুভাইয়ের তো এতোবছরেও দেখা করার প্রয়োজন পরলো না। হঠাৎ এখন কেন?”
মোবারক হোসেন লজ্জায় পরলেন। রাত বললো
-“আসলে, আপনার সাথে ওইদিন পরিচিত হওয়ার পর। আমার খালি মনে হচ্ছিলো, আপনাকে আমি চিনি। কোথাও না কোথাও আপনার কথা আমি শুনেছি। আপনাকে সরাসরি না দেখলেও রাত্রি খালামনি খুব বলতো আপনার কথা।”
-“রোদেলা আপু কোথায়?”
-“আমি ডেকে নিয়ে আসছি।”
রাত ডাকতে গেলো। কিন্তু কিছু সময় পর একা ফিরে এসে বললো
-“আম্মু ঘুমাচ্ছে। একটু পরই উঠে যাবে। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে, মাথা ব্যাথা করে।”
-“কোনো সমস্যা নেই।”

-“আমরা লাঞ্চ টা করে ফেলি ততক্ষণে! আম্মুও উঠে যাবে।”
সবাই টেবিলে গিয়ে বসলো লাঞ্চের উদ্দেশ্যে। চাদনীর বিরক্ত লাগছে। কি বোরিং একটা টাইম যাচ্ছে! কত কি ভেবে এসেছিলো ও। ওর অনেক কাজিন থাকবে, সবার সাথে পরিচিত হবে। কত কি যে করবে। সেখানে এই গোমড়ামুখোটাই ওর কাজিন হতে পেলো। নাহ! আঁধার ভাই ঠিকই বলেছিলো।ও ব্যাতিত চাদনীর আর কাজিন নাই। এ ছেলে কাজিন হওয়ার যোগ্য না।কাজিনরা আর যায় হোক, এতো বোরিং হয় না। ভেবেই চাদনী মুখ বাকালো।
লাঞ্চে চাদনী তেমন কিছুই খেলো না। শুধু এক চামচ ভাত আর একটা লেগ রোস্ট। এই নিয়েও খাবার টেবিলে রাত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বাঁশ মেরেছে ওঁকে। মেয়েরা না-কি স্টাইলের জন্য ভাতই খেতে পারে না।ওঁদের লিপস্টিক লেপ্টে যাবে সেজন্য। কত্তোবড় অন্ধ হলে এ কথা বলে। রাত কোথায় দেখেছে ওঁকে লিপস্টিক দিতে! ছি,ছি! এ কেমন নেতা পেতে চলেছে ওরা ভবিষ্যতে। নেতা এমন অন্ধ, ভুলোমনা হলে কী করে হয়।

চাদনী সবার আগে ভাত খেয়ে উঠলো। উঠে হাত ধুতে গেলো বেসিনে। হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে ধুতে ও কিছুক্ষণ বিরবির করে গালি দিলো রাতকে। হঠাৎই ওর চোখ পরলো, আটপৌড়ে শাড়ি পরা একজন সুন্দরী নারী, পর্দার পেছনে লুকিয়ে লুকিয়ে ওঁকে দেখছে। ও তাকাতেই সে ভেতরে চলে গেলো। রাত এলো তখন হাত ধুতে। চাদনী তখন ভেতরে উঁকি মারছে।
-“কী হয়েছে? এভরিথিং ইজ ওঁকে, পিচ্চি?
চাদনী তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে বললো
-“ওখানে? ওখানে খুব সুন্দর একটা মানুষ ছিলো।”
-“কে?”
-“আমি কী করে জানবো, আপনার বাড়িতে কে আছে! আর আমি পিচ্চি না।”
নাক মুখ কুঁচকে বললো চাদনী। রোদেলা এহসান আবার এসে, ওঁকে দেখে চলে গেলো। চাদনী তড়িঘড়ি করে বললো

-“ওইতো। চলে গেলো আবার।”
-“ওহহো, শি ইজ মাই এংরি বার্ড।”
-“কে? আপনার বোন?” অন্যমনস্ক হয়ে বললো চাদনী।
-“আমার আম্মু।”
চাদনী বড় বড় চোখ করে তাকালো। বললো
-“সত্যিই? এতো সুন্দরী। বয়স বোঝায় যায় না।আমি তো মনে করেছি আমার চেয়ে একটু বড় হবে, অথচ আপনার আম্মু।
কত্তো কিউট, মাশাআল্লাহ!
-“থ্যাঙ্কিউ।”
-“আপনি আপনার আম্মুর মতো হয়েছেন তাই না?”
-“যেমন?”
-“কিছু নাহ।”
-“আমি আমার আম্মুর সৌন্দর্যের ছিটাফোঁটাও পাইনি।”
-“তেমন না, সৌন্দর্যের পুরোটা পাননি। ছিটাফোঁটা পেয়েছেন।”
রাত হেঁসে দিলো। টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে এগিয়ে দিলো চাদনীর দিকে। চাদনী হাত মুছতে মুছতে বললো

কাজলরেখা পর্ব ৪২

-“থ্যাঙ্কিউ।”
রাত বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললো
-“তোমার নাম যেন কী, শ্যামাঙ্গিনী?”
-“আপনার স্মৃতিশক্তি কী কম ভাইয়া? না মানে, একটা সিম্পল নাম মনে রাখতে পারেন না। জনগণের সেবা করবেন কী করে? কার কী অভিযোগ সেটাই তো ভুলে যাবেন।”
-“তোমার নাম মনে রাখা কী, জনগণের সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ? না, তুমি কোনো সেলিব্রিটি?”
চাদনী মুখ ফেরালো। কথা বললো না আর। রাত মনে মনে হাসলো।কিন্তু উপরিউপর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।

কাজলরেখা পর্ব ৪৩ (২)