কাজলরেখা পর্ব ৪৫
তানজিনা ইসলাম
নিশুতিরাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। রাত তিনটে বাজে হয়তো। চাদনীর হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। ওর ওয়াশরুমে যেতে হবে। কিন্তু একা যেতে ভয় লাগছে। ইদানীং ও রাতে খুব ভয় পায়। ওইদিনের স্বপ্নটা ওর উপর এতো প্রভাব ফেলেছে যে, ও এখন রাত-বিরেতে জ্বিন দেখছে। ওর মনে হচ্ছে বাড়িটা ভুতুড়ে হয়ে গেছে। আশেপাশে কেও থাকে। চাদনী একা থাকলেই খপ করে ধরে ফেলবে৷ চাদনী পাশে তাকালো। আঁধার ঘুমিয়ে আছে। ও ঘুমিয়েছেও হয়তো একটু আগে। ওঁদের দু’জনের ঘুমটায় বড় আজব। পুরো রাত মোবাইল চালিয়ে, সকালে ঘুমানোর বদঅভ্যাসে দু’জনের মিল পাওয়া। চাদনী রাত জেগে মোবাইল দেখে না। যদি আঁধার ঘুমিয়ে যায়, রাতে ওর ঘুমাতে ভয় লাগবে। এজন্য আগেভাগে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে।
কিন্তু এখন যে ঘুম ভেঙে গেলো। এখন কী করবে ও? ইমার্জেন্সি ওয়াশরুমে যেতে হবে। ইশ! আজ পানি কম খাওয়া উচিত ছিলো। চাদনী ভাবলো আঁধারকে ডাকবে না, ও একা একা যাবে। আঁধার ওঁকে খেপাবে নয়তো! সাহস করতে পারলো না। বসে বসে,দাঁত দিয়ে নখ কাটতে লাগলো। সহ্য করতে না পেরে আঁধারকে ফিসফিস করে ডাকলো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“আঁধার ভাই।”
-“হু।”
-“ঘুমোওনি?”
-“জানি না।”
আঁধার বিপরীত পাশে ফিরে আছে। চোখ বন্ধ করে উত্তর দিচ্ছে। ওর ঘুম খুবই পাতলা। একটা ছোট্ট আওয়াজ কানে গেলেও ঘুম ভেঙে যায়।
-“শোনো না একটু।”
-“কী?”
-“আমার সাথে একটু ওয়াশরুমে যাবে?”
-“তোর সাথে ওয়াশরুমে ঢুকে বসে থাকতাম?”
-“ছি! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমার ভয় লাগছে৷”
আঁধার উঠে বসলো। ঘুম ঘুম চোখে তাকালো ওর দিকে। হামি তুলে বললো
-“তুই আবার ভয় পাচ্ছিস?”
-“প্লিজ চলো। ইমার্জেন্সি না হলে তোমাকে ডাকতাম না।”
-“চল।”
আঁধার ওয়াশরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ঝিমাতে থাকলো। চাদনী ভেতর থেকে আওয়াজ দিলো
-“তুমি চলে গেছো?”
-“আছি।”
চাদনী খুব দ্রুত বেরোলো। ওর মনে হচ্ছে আঁধার ওঁকে ফেলে চলে যাবে। আঁধার আবার শুতে গেলে ধরফরিয়ে বললো
-“একটু পানি খাই?”
-“ওখানেও দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?”
-“হুম।প্লিজ।”
চাদনী পানি খেলো। দ্রুত খেতে গিয়ে কাপড়ে পানি ফেলে ভিজিয়ে ফেললো।
-“আস্তে, এরকম করছিস কেন?এমনিতেই ঠান্ডা পরছে তার উপর আবার পানি ফেলছিস। বুকে পানি আটকে যাবে আস্তে খা।”
চাদনীর ঘুম আসছে না কোনোমতে। ও চোখ ঘুরিয়ে কক্ষের আশেপাশে তাকালো। ধরফরিয়ে উঠে বসে বেডসাইড ল্যাম্প জালিয়ে দিলো। শুয়ে পরে বিরবির করে দোয়া পরতে থাকলো৷ ও কালো কালো ধোঁয়াশে কি যেন দেখে! ও বুঝতে পারে এসব সত্যি না। ক’দিন ধরেই ও হ্যালুসিনেশনে ভুগছে।
দিনের বেলা যেমন তেমন কেটে গেলেও, রাতে কেমন যেন ভয়ে থাকে। ইভেন ওয়াশরুমে যেতে হলে পর্যন্ত আঁধার কে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখে।ওর একটা স্বভাব হচ্ছে অবসরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। ছাদে উঠে রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা।পাখিদের কলতান, সবুজ ঘাসের উপর সোনালী সূর্যরশ্মি এসব দেখে চোখ জুড়ানো।কিন্তু এখন ও দিনের বেলা ছাঁদে যেতেও ভয় পায়। আঁধারের কক্ষের জানালা দিয়ে বাড়ির পিছনের সাইড দেখা যায়। দু’দিন আগে সেখানে ও কোদাল দেখেছে। এটা দেখেই প্যানিক করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কোদাল থাকা স্বাভাবিক। ওটাকে বাগানও বলা যায়। ওখানে অনেকগুলো গাছ আছে৷ নারকেল , পেয়ারা, তেতুল, আম আরো অনেক ধরনের গাছ। মাঝে মাঝে নতুন চারা লাগানো হয়, তাই কোদাল থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু চাদনী এটা মন কে বোঝাতে পারছে না। ও তেতুল গাছের দিকে তাকাতে পর্যন্ত ভয় পাচ্ছে। তেতুল গাছে না-কি জ্বিন থাকে। এখন তো চাদনীর মনে হয়, ওইদিন হয়তো কোনো অশরীরী আত্মা আঁধার ভাইয়ের রূপ ধারণ করে ওঁকে মাটিচাপা দিয়ে দিতে চেয়েছিলো। এটা বাড়ির সবাইকে বলার পর ওরা অনেক হেসেছে। আঁধার তো এটা নিয়ে সারাক্ষণ পঁচায় ওঁকে। কিন্তু চাদনীর মনে হয় না ওটা স্বপ্ন ছিলো। ওর ভয় পাওয়া দেখে, আকিব শিকদার বাড়িতে হুজুর ডেকে এনেছেন। পুরো বাড়ি বন করিয়েছেন আবারও। তবুও চাদনীর ভয় কাটে না।
-“আঁধার ভাই।”
আঁধার ওপাশ ফিরে মুখে হাত চেপে ধরে হাসছিলো। চাদনীর ডাক শুনে শব্দ করে হেঁসে দিলো। চাদনীর বিহেভিয়ারগুলো মুখস্থ হয়ে গেছে ওর।প্রথমে সাহস করে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জোখ বন্ধ করে আজেবাজে কল্পনা করে আবার ওর দিকে ফিরতে বলে।
আঁধার বোঝেনি, চাদনী এতোটা ভয় পাবে৷ একটা দুঃস্বপ্ন এতোটা প্রভাব ফেলবে ওর উপর। ওর ট্রমা কাটছে না কোনোমতেই। আঁধারের বলতে হচ্ছে না ওর রুমে থাকতে, চাদনী নিজেই চলে আসছে। একবার সাহস করে রাতে নিজের রুমে থেকেছিলো।ভয়ে আবার ওর রুমে এসে হাজির হয়েছে।আঁধারের কক্ষের দরজা ওর জন্য সবসময় খোলা।
আঁধার চাদনীর দিকে ফিরলো। বহু কষ্টে হাসি আটকালো।
-“মজা মনে হচ্ছে তোমার?”
-“কেন ভয় পাচ্ছিস? কিচ্ছু নেই চাদনী।কিচ্ছু নেই এখানে।”
-“তোমরা কেও আমার কথা বিশ্বাস করছো না।এখানে
অশরীরী আত্মা ঘুরে বেড়ায়।তোমার রূপ ধরে। আমাকে কবর দিতে চেয়েছিলো। ওটা স্বপ্ন ছিলো না। আমি মরতে চাই না দাদাভাই।”
-“আচ্ছা।”
-“ভয় লাগছে!”
-“এদিকে আয়।”
আঁধার চাদনীকে টেনে আনলো নিজের কাছে।
চাদনী ভয়ে ভয়ে দেখতে থাকলো কক্ষের চারপাশে। আঁধার ওঁকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো
-“কিছু নেই চাদনী।”
-“আমাকে মেরে ফেলবে।”
-“আমি আছি না। আমি থাকতে তোর কিছু হতে দেবো?”
-“ও তো তোমার রূপ ধরেই আসে।”
-“ঘুমা তো।ফালতু কথা বলে খালি।”
-“তুমি একটা গল্প বলবে আমাকে?মাইন্ড ডাইভার্ট করা দরকার৷”
-“আমি গল্প জানি না। বেশি ভয় লাগলে চল, আমরা ঢাকায় চলে যাই। ভয়টা তো তোর এ বাড়ি ঘিরে।”
চাদনী আঁধারের বুকে মুখ গুঁজে থাকলো৷ ওর ভয় লাগছে। ভীষণ ভয়। সতেরো বছরের জীবনে ও কখনো এতটা ভয় পেয়েছে কি-না মনে পরে না। আঁধারের মন খারাপ হয়ে গেলো। মেয়েটা এতো আতঙ্কিত হয়ে পরেছে! একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো না ব্যাপারটা।
চাদনী সোফায় বসে আছে।ও হাসনাহেনার সাথে কথা বলছে। অনেকদিন পর বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে ওর। ক্লাস শুরু হয়ে গেছে, চাদনী এখনো যাচ্ছে না।এই নিয়ে ওদের চিন্তার শেষ নেই। ওঁকে তাড়াতাড়ি যেতে বলছে ওরা। চাদনী এখন কক্ষ থেকে খুবই কম বেরোয়। সারাক্ষণ কুন্ডলী পাকিয়ে বসে থাকে কক্ষে। দোর দিয়ে রাখে। তবে আজ মন ফ্রেশ করার জন্য ড্রইংরুমে বসলো। এখানে ওয়াইফাই কানেকশন ভালো পাওয়া যায়। অর্পিতা নিচে নেমে ওঁকে বসে থাকতে দেখেই আদেশ ছুঁড়লো
-“চা বানিয়ে দে তোর ভাইয়াকে।”
চাদনী তাকালো না। ওর কানে ইয়ারপডস থাকায় অর্পিতার কথা শুনলো না। অর্পিতা চবর্গীয় শব্দ করে ওর সামনে গেলো। তুড়ি বাজিয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করলো।চাদনী অবুঝ দৃষ্টিতে তাকালো। ইশারায় বোঝালো
-“কী?”
-“ইয়ারপডস খোল আগে।”
চাদনী ইয়ারপডস খুলতেই বললো
-“চা বানিয়ে দে।”
-“কার জন্য?”
-“তোর দুলাভাইয়ের জন্য।”
-“আমি আমার ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলছি। অন্য কাওকে বলো।তোমার হাসবেন্ড কে আমি কেন চা দেবো?”
-“কারণ তুই চা বানাতে জানিস। আমি পারি না৷ আম্মু ঘুমাচ্ছে। বড় মাও রেস্ট করছে।”
-“বড় মা অসুস্থ। তোমাদের ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে অসুস্থ হয়ে গেছে।”
-“এবার তুই একটু খাট।সারাদিন তো শুয়ে বসে থাকিস।”
-“সেম টু ইউ।”
-“এতো কথা না বলে চা বানিয়ে আন।”
-“পারবো না।
-“আম্মুকে ডাকবো।”
-“ডাকো, কাওকে ভয় পাইনা।”
অর্পিতার রেগে যেতে গিয়েও শান্ত করলো নিজেকে। বললো
-“তুই তোর বড় বোনের কথা শুনবি না?”
-“আমার বড় বোন? তুমি? হাহ! কাজের জন্য লাগবে সেটা বলো।”
-“বুঝছিসই তো। দে না ভাই। পারি না। নয়তো তোকে বলতাম।”
চাদনী আর কথা না বাড়িয়ে বললো
-“আচ্ছা, একটু পর বানিয়ে দিচ্ছি।”
-“এখন বানিয়ে দিতে সমস্যা কী?”
জবা বেগম নামতো নামতে বললেন। চাদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। অর্পিতা বললো
-“দেখো না আম্মু।একটু চা-ই তো বানিয়ে দিতে বলছি।”
-“চাদনী।”
চাদনী মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে বললো
-“তুমি বানিয়ে দাও। নেমেই তো এসেছো।
-“বেয়াদবি করছিস কেন? যেটা বলেছি সেটা কর।”
জবা বেগমের মেজাজ চড়ে গেলো। চাদনী কেন এভাবে শুয়ে-বসে থাকবে। শুয়ে বসে থাকবে তো ওনার মেয়ে। চাদনীর তো কোনো অধিকার নেই এ বাড়িতে।তবুও কেন রাণীর হালে থাকবে ও?এমনিতেই চাদনীর ওপর ওনার অনেক রাগ। এবারে সে আগুনে যেন, চাদনীর মুখে মুখে তর্ক করা ঘি ফেললো। চোখ মুখ লাল করো বললো
-“কথা শুনবি না তুই?”
-“শুনতাম।যদি সুন্দর করে বলতে। চা বানানো কোনো বড় ব্যাপার না। অর্পিতা আপুর কথায় রাজিও হয়েছিলাম।কিন্তু অর্ডার করছো কাকে তুমি? আমি এ বাড়ির সার্ভেন্ট না।”
-“থাপ্পড় দেবো তোকে আমি। বেয়াদব! এক্ষুণি চা বানিয়ে আনবি তুই।
-“না।”
জবা বেগম রাগে কিড়মিড় করতে থাকলেন।বর্ষা বেগম নেমে এলেন ওদের চেঁচামেচি শুনে।ধরফরিয়ে বললেন
-“কী হয়েছে?
-“কত্তোবড় বেয়াদব দেখো! মুখে মুখে তর্ক করছে আমার সাথে।”
বর্ষা বেগম চাদনীর দিকে তাকালেন। চোয়াল শক্ত করে দাড়িয়ে আছে।ওর থেকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, জবা বেগম সবকিছু বললেন। বর্ষা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অসুস্থ হয়েও তার শান্তি নেই।
-“আচ্ছা, চা বানাতে হবে তো? আমি বানিয়ে দিচ্ছি। চাঁদনী এদিকে এসো।”
-“না, তুমি বানাবে না। ও বানাবে। ও কেন মুখ বাজাবে আমার সাথে। বেয়াদব মেয়ে।মা না থাকলে এমনি হয়। শিক্ষা দীক্ষা নেই।”
চাদনী চেচিয়ে বললো
-“মেঝোমা।খবরদার আমার আম্মুকে নিয়ে কিছু বলবে না।”
বর্ষা বেগম বললেন
-“আশ্চর্য! তোমরা এমন করছো কেন ওর সাথে?”
-“তুমি চুপ করো ভাবি। তোমাকে কেও ডাকেনি এখানে।”
বর্ষা থতমত খেলেন। লজ্জাও পেলেন।বয়সে বড় হওয়া সত্বেও জবা বেগম এভাবে কথা বলেন ওনার সাথে।
চাদনী বুকে দু-হাত আড়াআড়ি করে বললো
-“এখন তো আরো বানাবো না। নিজেদের কাজ নিজেরা করো। তোমার মেয়ের জামাইকে আমি কেন চা বানিয়ে দেবো?তোমার মেয়ে চা বানাতে পারে না?আমাকে তো ঠিকই খোঁটা দিতে পারো। নিজের মেয়ে যে অষ্টরম্ভা সেটা দেখোনা? আমিও চা বানাবো না। বড় আম্মুকেও বানাতে দেবো না। যা করার করো।”
জবা বেগম রাগে ক্ষোভে তাকালেন। এবারের কথাগুলো খুব গায়ে লাগলো ওনার। তর্ক করার মতো কোনো টপিক খুঁজে না পেয়ে যা তা বলতে থাকলেন। কী বললেন, কী ইঙ্গিত করলেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না।
-“আমার মেয়ের সংসারে চোখ দিয়েছিস। নির্লজ্জ একটা! আমার মেয়ে যদি সেদিন চলে না যেতো, বিয়ে পর্যন্ত হতো না তোর।তোর যে রূপ তাতে কেও নিয়ে যেতো না তোকে। অথচ এখন আমার মেয়েকেই দোষারোপ করছিস। চালচুলোহীন মেয়েদের মাথায় তুললে এমনই হয়।”
-“কী?”
-“বুঝিস না? এই যে সার্ভেন্ট না বললি, তোর অবস্থান এ বাড়িতে ওদের চেয়েও নিচু। এটলিস্ট ওরা এ বাড়ির সার্ভেন্ট, তুই তো কেও না।”
-“আমি কেও না মানে? আমি এ বাড়ির মেয়ে।অর্পিতা আপুর মতো আমারও এবাড়িতে অধিকার আছে৷ তুমি কী বলছো মেঝোমা? যা মুখে আসছে তাই বলছো আমাকে।”
-“একটা কথাও মিথ্যা না।তুই..
বর্ষা বেগম তীব্র স্বরে বললেন
-“চুপ করো না তোমরা। মেয়েটার সাথে এরকম কেন করছো? শত্রুতা শুরু করেছো।”
-“ছেলের বউয়ের জন্য খারাপ লাগছে ভাবী?”
-“হ্যাঁ তাই। চাদনী এসো আমার সাথে।”
চাদনী দুপাশে মাথা নাড়িয়ে
-“না বড়মা। আমাকে জানতে হবে। মেঝোমা আমাকে যা তা বলতে পারে না। এ বাড়িতে অর্পিতা আপুর যতটা অধিকার আছে। আমারও ততটাই আছে। কেন ওরা আমার সাথে এমন আচরণ করবে? কেন বলবে আমার অবস্থান সার্ভেন্টের চেয়েও নিচু।”
অর্পিতা মোক্ষম একটা সুযোগ পেলো। ওর জামাইকে চা বানিয়ে না দেওয়া না! সবসময় অধিকার নিয়ে তর্ক করা। আর সবচেয়ে কুৎসিত যে ব্যাপারটা ওর ঘর, বর নিজের করে নেওয়া। ও যখন সব ফেলে চলেই গিয়েছিলো, সেসব চাদনী কেনো নেবে? চাদনী তো ওর সাথে রূপ বা ফ্যামিলি স্ট্যাটাস কোনো দিক দিয়েই জিতকে পারবে না সেখানে ও আঁধারকে বিয়ে করে, রাণীর হালে কেন থাকবে।
-“তোর সাথে আমার তুলনা চলে না চাদনী! তুই এ বাড়ির কেও না।”
-“মানে? এ বাড়ির কেও না মানে কী? ফালতু কথা বলবে না আপু। অনেকবার তুমি একথা বরেছো আমাকে।”
-“যেটা সত্যি সেটাই বলেছি। তুই এ বাড়ির কেও না। চাচ্চু তোকে দত্তক নিয়েছে। চাচ্চু তোর আসল বাবা না। তোর আসল মা-বাবার কোনো পরিচয় নেই।তুই এ বাড়ির কেও না।”
চাদনী বিশ্বাস করলো না। অর্পিতা এ কথা অনেকবার বলেছে ওঁকে। যতবারই চাদনীর সাথে ওর কোনো ঝামেলা লাগে, অর্পিতা এসব বলে দুর্বল করতে চায় ওঁকে।
-“চুপ। একদম চুপ করো।মিথ্যুক একটা! ছি! কতোবড় মিথ্যে কথা বলছো।”
-“মিথ্যে কথা বলছে না ও। যা সত্যি তাই বলছে।”
জবা বেগম বললেন। চাদনী ভাঙা গলায় বললো
-“অর্পিতা আপু, তুমি পালিয়েছো সেটা আমার দোষ? আমি তো কিছু কেঁড়ে নিইনি তোমার! তবুও কেন এতো ক্ষোভ? তুমি বলো তুমি মিথ্যে বলছো। ক্ষোভ ঝাড়ছো আমার উপর।”
-“মিথ্যে বলছি না। এ বাড়িতে তোর কোনো অধিকার নাই।”
-“হাহ। বিশ্বাস করি না আমি। তবুও না থাকলেও, আমি আমার বাবার অধিকারে থাকি। আমার বাবার টাকায় খাই। ও হ্যাঁ এখন তো আমার হাসবেন্ডও এ বাড়ির ছেলে। তোমাদের ভাষ্য অনুযায়ী যদি মেয়ে হয়ে বাড়িতে আমার অধিকার না থাকে, বাবা আর আঁধার ভাইয়ের দৌলতে আমার অধিকার আছে। কিন্তু তোমার জামাই কেন এ বাড়িতে বসে বসে খাচ্ছে? সে কে হয় এ বাড়ির? তার কী অধিকার?পালিয়ে যাওয়া মেয়ের জামাই সে? আমাকে যেসব কথা বলছো, সেসব তো আমি তোমাকেও বলতে পারি।বিয়ের দিন আসর থেকে পালিয়ে গিয়ে, জামাই নিয়ে বাড়িতে উঠে এসেছো।লজ্জা করছে না? নির্লজ্জ একটা!”
অর্পিতা কিছু না বলে ঠাস করে চড় মেরে দিলো চাদনীকে।বর্ষা বেগম দু’হাতে আঁকড়ে ধরলেন চাদনীকে। উনি বুঝতে পারেনি অর্পিতা অকস্মাৎ থাপ্পড় মেরে দেবে ওঁকে। নয়তো উনি অবশ্যই আটকাতেন। চাদনী কেঁদে দিলো। বর্ষা বেগমের হাত ধরে ব্যালেন্স রাখলো নিজের। বর্ষা বেগম গর্জে বললেন
-“অর্পিতা। কোন সাহসে ওঁকে মারলে তুমি!”
আঁধার মাত্রই সদরদরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকলো। তার পিছু পিছু আকিব শিকদার এসে পৌঁছালেন। ওরা দু’জন আজ শপিংয়ে গিয়েছিলো, কেনাকাটা করতে। আকিব শিকদার অফিস থেকে ফোন করে জানালেন, আঁধারকে বেরোতে। ওরা দু’জন আজ শপিংয়ে যাবে। আঁধার ওনাকে যা যা বলেছিলো, সব কথা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন উনি। আঁধারের ভাবনা উনি জানেন না, কিন্তু আঁধারকে উনি কখনো ভাইয়ের ছেলে মানেনি। সবসময় নিজের ছেলেই ভেবে এসেছেন।
আঁধার দেখলো চাদনী কাঁদছে।বর্ষা বেগম ধরে আছে ওঁকে। অর্পিতা চিল্লাচ্ছে ওর উপর৷ ওর শক্তি হিসেবে আছে জবা বেগম। দুই মা মেয়ে মিলে, বর্ষা বেগম আর চাদনীকে হেনস্থা করছে।
চাদনী কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ ওর দিকে তাকালো। ভেজা চোখের দিকে চোখ পরতেই আঁধারের বুক ধ্বক করে উঠে। ঢোক গিললো ও। চাদনী বর্ষা বেগম কে ছেড়ে চোখ মুছলো। তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে ওর কাছে এগিয়ে এলো। আকিব শিকদার পেছনে থাকায় ও আকিব শিকদারকে খেয়াল করলো না। ও এখন সবাইকে খেয়াল করার মতো অবস্থায় নেই।
চাদনী অভিযোগ করে বললো
-“দেখো, ওরা কী বলছে আমাকে। আমি এ বাড়ির মেয়ে নই? অর্পিতা আপু সবসময় আমাকে এসব বলে। আমি বিশ্বাস করি না।আজও করিনি। তুমি বলো সব মিথ্যা!”
আঁধার নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ওর দিকে। কিছু বললো না।
চাদনী এলোমেলো ভঙ্গিতে, অস্হির স্বরে বললো
-“আঁধার ভাই, তুমি বলো না অর্পিতা আপু যা বলছে সব মিথ্যা! বলো, বলো তুমি। প্লিজ বলো।আমার খুব খারাপ লাগছে এসব শুনতে।ওরা কেন আমাকে এসব বলবে?”
-“মিথ্যা না। সত্যি।”
চাদনী ক্রুদ্ধ স্বরে বললো
-“কী বলতে চায়ছো? আমি আম্মু-আব্বুর আসল মেয়ে না? আমার কোনো সম্পর্ক নেই শিকদার বাড়ির সাথে?”
-“না, কোনো সম্পর্ক নেই। চাচ্চু আর ছোটমা এডপ্ট করেছিলো তোকে অনাথাশ্রম থেকে।তুই আমাদের রক্তের কেও হোস না।”
চাদনী স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো। বিমূঢ় স্বরে বললো
-“মিথ্যে কেনো বলছো তুমি হ্যাঁ?মিথ্যে কেন বলছো? মিথ্যুক একটা! আর কী কী বলে দুর্বল করবে আমাকে? যতবার উঠে দাঁড়াতে চাই, বারবার কেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও?তোমাদের কারো কথা বিশ্বাস করছি না আমি।তোমরা সবাই স্বার্থপর!”
চাদনী কাঁপছে।ওর মনে হচ্ছে আঁধার এক্ষুনি বলবে, সব মিথ্যা। কিন্তু সে নিষ্ঠুরের মতো বললো
-“চাঁদ! বিশ্বাস কর বা না কর, কিন্তু এটাই সত্যি।মিথ্যে বলে স্বান্তনা দেওয়ার চেয়ে সত্য বলে কষ্ট দেওয়া ভালো না? পরে তো কষ্টটা আরো বেশি হতো। আজকেই জেনে নে।ছোটমা কোনোদিন মা হতে পারতো না। এজন্য চাচ্চু তোকে এডপ্ট করে নিয়ে এসেছে এ বাড়িতে। কিন্তু তুই এ বাড়ির কেও না এটা কে বললো? ওই অর্পিতা। যে কিনা নিজেই পালিয়েছিলো এ বাড়ি থেকে। তুই চাচ্চুর মেয়ে, তাই তুই এ বাড়ির মেয়ে। আর আমার বউ তাই, তুই এ বাড়ির বউ। দু’টো পরিচয় তোর।ওর চেয়েও বেশি অধিকার আছে।”
চাদনী অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো ওঁর দিকে।আকিব শিকদার এসে আধারের কাধে হাত রাখলেন।ধরফরিয়ে বললো
-“কেন বলছো এসব। একটা কথাও সত্যি না।চাঁদ..
-“চাচ্চু ইয়ার, আর কতোবছর লুকাবে। বেশি গোপন করতে গেলে, সেটা আরো বেশি প্রকাশ হয়ে যায়। পরে জানলে কী ও কষ্ট পাবে না? তখন বেশি কষ্ট পাওয়ার চেয়ে, আজ কষ্ট পেয়ে ওঁদের জবাব দিতে পারলে সেটা বেশি ভালো না!”
চাদনী একপলক ওর বাবার দিকে তাকালো। তিনি ঘেমে আছেন। চিন্তায় পরলে মানুষ ঘেমে যায়।ও কিছু বলতে যাবে তার আগেই,অর্পিতা ওঁদের কথায় বাগড়া দিয়ে, ঝাঁঝালো স্বরে বললো
-“তুই কীসের এতো বড়াই করিস চাদনী? শিকদার টাইটেলের এতো বড়াই তো তোকে মানায় না!তুই বুঝিস না, এ বাড়িতে কেন তোকে কেও পাত্তা দেয় না? আঁধার ভাই আর আমার প্রতি তাঁদের আচরণ আর তোর প্রতি তাদের ভিন্ন আচরণের মাধ্যমেই বোঝা যায় তুই এ বাড়ির কেও না। তোর মা-বাবা তোকে অনাথ আশ্রমে ফেলে চলে গিয়েছিলো।তোর রক্তের ঠিক নাই, জন্মের ঠিক নাই।তুই আঁধার ভাইয়ের লেভেলে নাই। বুঝিস না তোর সাথে সবাই কেন এমন আচরণ করে?আঁধার ভাই তোকে কেন এতো অপমান করছিলো বুঝিসিনি? তোর সাথে আধার ভাইয়ের কোনো দিক দিয়েই যায় না।তুই আঁধার ভাইয়ের বউ হওয়ার যোগ্য না এজন্য!”
আঁধার আক্রোশে তাকালো অর্পিতার দিকে।তেড়ে গিয়ে সহসা চড় বসালো ওর গালে। অর্পিতার মনে হলো, ওর দাঁত গুলো খুলে পরে যাবে।আঁধার ন্যানোসেকেন্ডে আরেকটা মারলো। চুলগুলো মুঠো করে ধরে বললো
-“বেয়াদবের বাচ্চা বেয়াদব! সাহস কতো তোর! এই তোর চাকর ও? অর্ডার করছিস যে ওকে! কোন সাহসে ওর গায়ে হাত তুলেছিস? তোর হাত ভেঙে দেবো আমি।”
জবা বেগম ওর হাত ধরলেন। চেচিয়ে বললেন
-“এই ছেলে ছাড়ো ওঁকে। কোন সাহসে মারছো আমার মেয়েকে।সাহস তো কম না তোমার।”
আঁধারের শক্ত হাত উনি ছাড়াতে পারলেন না। ও অর্পিতার চুলগুলো ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আসতে চায়লো। ধমকে-ধামকে বললো
-“কে বলেছে ও শিকদার বাড়ির কেও না?ও আমার বউ। চাচ্চুর মেয়ে।ও এ বাড়ির মেয়ে, বউ দুটোই। শিকদার বাড়ির পদবীর অহংকার অবশ্যই ও করবে। তুই কে হোস ওর রক্ত, জন্ম নিয়ে খোঁটা দেওয়া। বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ের আগে নিজের ন্যু*ড পিক দিয়ে রাখিস। তারপর চাপে পরে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে যাস। সবার পায়ে ধরে জামাই নিয়ে বাড়িতে উঠে এসেছিস। তোর ন্যায়বিচারক মা তোর মতো নষ্টারে কিছু বলতে পারে না। আরেকজনের মেয়েকে যা তা বলে। মা-মেয়ে দুটোই কেমনে এতো বড় শয়তান হোস। ওরে বাড়িতে থাকার খোঁটা দিলি তো জানোয়ার, আজ তোকে আর তোর জামাইকে বাড়ি ছাড়া করবো আমি।”
অর্পিতা চেঁচাচ্ছে। সাথে জবা বেগম বিলাপ করছে। বর্ষা বেগম ছাড়তে বলছে আঁধার কে। আঁধারের কানে একটা কথাও ঢুকছে না। ওর অনেকদিনের রাগ অর্পিতার উপর। অনেক ক্ষোভ! আজ চাদনীকে এসব বলায় সব ক্ষোভ উগরে এসেছে।
চাদনী নিজের দুঃখ সইবে, না কান্না করবে, না আঁধার কে থামাবে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। ওর কান্না গলার কাছে এসে আটকে গেছে।
আকিব শিকদার আঁধার কে টেনে নিয়ে এলেন। তবুও ও অর্পিতার চুল ধরে থাকলো। বর্ষা বেগম চাপ প্রয়োগ করে আঙুল খুলে চুল ছাড়ালেন। তবুও একগোছা চুল আঁধারের হাতে চলে এলো।
ও আবারো আক্রোশে অর্পিতার দিকে তেড়ে গেলো।আকিব শিকদার আবার ওঁকে থামালেন।
বর্ষা বেগম আর আকিব শিকদার ওঁকে ধরে রেখেছিলো। আঁধার নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ওঁদের থেকে। হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে, অর্পিতার জামাইয়ের মুখোমুখি হলো ও। সে সিঁড়ি ধরে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বউয়ের মার খাওয়া দেখছে।ভেড়া একটা! অবশ্য শ্বশুরের বাড়িতে থেকে শ্বশুরবাড়ির লোকের উপর চোটপাট করবে সে হেডামই বা কই ওর!
আঁধার দাঁতে দাঁত চেপে বললো
কাজলরেখা পর্ব ৪৪ (২)
-“মজা নিচ্ছেন। আর কতোকাল এভাবে শ্বশুরের টাকায় অন্য ধ্বংস করবেন! একটু তো লজ্জা করুন। বউকে নিয়ে বিদেয় হোন এখান থেকে। আমি বিদায় করতে গেলে খুব খারাপ হবে। বউয়ের ভেড়া হয়ে থাকতে এতো ভালো লাগে? অবশ্য আপনার শ্বশুরও এমন! বউয়ের ভেড়া! যেমন কুকুর তার তেমন মুগুর!”
আঁধার দপদপিয়ে চলে গেলো।
