Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৮ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৮ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৮ (২)
তানজিনা ইসলাম

শাবিহা চাদনীকে কলেজের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলো। আজ শাবিহা কে অন্যদিনের তুলনায় অন্যরকম লাগছিলো চাদনীর কাছে। গম্ভীর মেয়েটা মাঝে মাঝে হাসছিলো। ওর পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিলো। পুরো রাস্তা কথা বলতে বলতে এসেছে ওরা। চাদনী ইতস্তত বোধ করলেও শাবিহা মন খুলেই কথা বলছিলো। তবে একটা সত্যি কথা হচ্ছে পুরো রাস্তা চাদনী আঁড়চোখে পরখ করেছে শাবিহা কে। মেয়েটা নিঃসন্দেহে খুব সুন্দর। হাসলে এতো সুইট লাগে। কিন্তু সে হাসে না। মুখটা সবসময় গম্ভীর রাখে৷ আঁধারের সাথেও যতবার কথা বলতে দেখেছে এভাবেই কথা বলেছে। এই প্রথমবার চাদনীর মনে হয়েছে, আঁধারের হয়তো রাগ করাটা স্বাভাবিক ছিলো। কথা শোনানো টা বাদ দিয়ে, ওকে মানতে না পারাটাও অতো বেশি ভুল ছিলো না। শাবিহার জায়গায় ওঁকে মানা যায় না, আসলেই না।
চাদনী মন খারাপ করেই কলেজে ঢুকলো।

চাদনী ওর বন্ধুদের সাথে বসে আছে ক্লাসরুমে। সামনে টিচার লেকচার দিচ্ছে। অন্যদিনের তুলনায় আজকে স্টুডেন্টের সংখ্যা বেশি। বেঞ্চে কিছুটা গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে সবাইকে। চাদনী, হাসনা আর বৃষ্টি এক বেঞ্চে বসেছে। ওঁদের পাশের রো এর বেঞ্চে রেহান আর সিয়াম বসেছে। চাদনী মনোযোগ দিয়ে লেকচার শুনছে। নিজের খাতায় নোট করছে। হাসনা আর বৃষ্টির খাতায়ও লিখে দিচ্ছে। রেহান আর সিয়ামও ওঁকে নিজেদের খাতা গছিয়ে দিতে চেয়েছিলো। হাসনা আর বৃষ্টির জন্য পারেনি। ওঁদের কথা, চাদনী শুধু ওঁদের নোট করে দিবে। বাকি দু’জনের নোট করতে গেলে বেশি কষ্ট হয়ে যাবে ওর জন্য।
ওরা সবাই ফিসফিস করে কথা বলছিলো। কথায় কথায় রেহান চাদনীকে ডেকে বললো

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-“তুই যাবি তো চাদনী?”
-“কোথায়?”
-“দাওয়াতে। আমাদের বাড়িতে পার্টি আছে। বড় ভাইয়া জিতে গেছে।”
-“আচ্ছা, তাহলে এখন সে ঢাকা-৯ এর এমপি?”
-“জ্বি। সে উপলক্ষ্যে সেলিব্রেশন হবে আমাদের বাড়িতে। হাসনা আর বৃষ্টিও যাবে। তুই ওঁদের সাথে যেতে পারিস।”
-“পারমিশন পাবো না রে। তার উপর রাতের বেলা।”
-“ভাইয়া কে নিয়ে আসতে পারবি, সমস্যা নেই।
চাদনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বললো
-“ভাইয়া? তোর ভাইয়ের সাথে কেন যাবো আমি?”
-” ধুর! আমার ভাইয়ের সাথে কেন তুই যাবি? ভাই বলতে, তোর হাসবেন্ড কে বোঝাচ্ছি। হাসনা বলেছে, তোর যে বিয়ে হয়ে গেছে।”

-“হুম।”
-“তোর উপর খুব রাগ হয়েছে আমার বুঝেছিস। আমরা তোকে আমাদের পেটের কথা সব বলি, অথচ তুই আমাদের এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বললি না৷ টু বেড!”
-“আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।”
-“না হলেও, তাই বলে বলবি না। হাসনা আর বৃষ্টি তোর হাসবেন্ড কেও দেখেছে। আমি দেখলাম না।”
-“ভাই রে, আমার জামাইরে দেখে কী করবি তুই?”
-“কিচ্ছু করবো না। শুধু দেখবো।”
-“আজকে নিতে আসবে আমাকে।তখন দেখিস!”
রেহান কিছু বলার আগেই হাসনা লাফ দিয়ে বললো

-“তোকে নিতে আসবে।”
-“হু।”
-“আমাদের সাথে কথা বলতে বলিস তো।”
সিয়াম বললো
-“হাসনা। ওর জামাই আসছে। তুই এতো এক্সাইটেড কেন?”
হাসনা মিনমিন করে বললো
-“এমনি। ওইদিন কথা বলে খুবই ভালো লেগেছে। চাদনী তুই মন খারাপ করছিস না তো।”
চাদনী হাসছিলো৷ ঠোঁট টিপে বললো
-“না।”
সিয়াম করজোড়ে অনুরোধ করে বললো

-“হাসনা, বোন আমার। এবার অন্তত থাম তুই। কয়টা লাগে তোর? অন্তত বান্ধবীর জামাইয়ের উপর চোখ দেওয়া বন্ধু কর। কি ঘাটিয়া একটা বিষয়, তুই তোর বান্ধবীর জামাইয়ের সাথে কথা বলবি, এজন্য এমন এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছিস।”
হাসনা দুম করে কিল বসালো সিয়ামের পিঠে। রেগে মেগে বললো
-“চুপ বেয়াদব। এতোটাও নিচে নামিনি আমি। জাস্ট কথা বলবো বলেছি। চাদনীর তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তোর কী বে?”
-“ওইতো একটা বলদ। সবকিছুতেই ছাড় ওর, সবেই নির্লিপ্ত। নয়তো তোর কথা শুনে ওর অবশ্যই মন খারাপ হওয়া উচিত ছিলো। নিজের জিনিসের প্রতি অবসেশন থাকতে হয়। আজকে যেটা মজা করে বলছিস, কাল সেটা সিরিয়াস টপিক হয়েও যেতে পারে। তখন তোর বান্ধবী বুঝবে।”
সিয়াম সিরিয়াস হয়ে বললো।
হাসনা কাঁদো কাঁদো মুখ করে চাদনীর দিকে তাকালো। চাদনী কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে সিয়ামের দিকে। হাসনা তাকাতেই বললো

-“চিন্তাটা আসলে আমার জন্য না। ওর নিজের জন্য হচ্ছে। কিন্তু নাম দিচ্ছে আমার। আমি জানি তুই কেমন!”
-“ওর চিন্তা কী নিয়ে হচ্ছে?”
-“ওর থেকেই জিজ্ঞেস কর।”
হাসনা জিজ্ঞেস করলো সিয়াম থেকে। কিন্তু সিয়াম কোনো উত্তর দিলো না।

আঁধার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। এখন ও চাদনীকে প্রতিদিনই নিতে আসে। কলেজ ছুটি হয়ে গেছে। ছেলে-মেয়েরা দলে দলে বেরোচ্ছে। আঁধার চঞ্চল চোখে খুঁজছে চাদনীকে৷ মেয়েটা এতো লেট করে বেরোতে। বন্ধুদের বিদায় দিয়ে আসতে আসতেই, অর্ধেক কলেজ খালি হয়ে যায়। গেইট দিয়ে রেহান বেরোচ্ছিলো। আঁধার ওঁকে দেখতেই ডাকলো। রেহান নিজের নাম শুনে তাকালো সেদিকে। পরিচিত মুখ দেখে এগিয়ে গেলো কথা বলতে।

-“ভাইয়া।”
-“কীরে কী খবর তোমার? কেমন আছো?
-“ভালোই, আপনি ভালো আছেন ভাইয়া?
-“হ্যাঁ। তুমি এখানে পড়ো? দেখিনি তোমাকে কোনোদিন।”
-“জ্বি। আপনি এখানে আসেন? আমাদের তো দেখা হওয়ার কথা না।”
-“ও আমার একজন পড়ে এখানে৷”
-“কে? আপুর সাথে কথা হয়েছে? আচ্ছা, আপনাকে দাওয়াত দিয়েছে?”
আঁধার হাসলো ওর কথায়। মাথায় হাত রেখে বললো

-“হ্যাঁ দিয়েছে। চিন্তা নেই।”
-“আপনি আসবেন?”
-“অবশ্যই।”
-“কে পড়ে বললেন না তো?”
আঁধার বলতে যাচ্ছিলো, তখনই চাদনীকে ওর বান্ধবী দের সাথে আসতে দেখা গেলো।আঁধার ওঁকে দেখিয়ে বললো
-“ও পড়ে।”
রেহান অবাক চোখে তাকালো। হাসনা প্রথমেই এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললো
-“ভালো আছেন ভাইয়া?”
-“খুবব। তোমাদের দেখে ভালো লাগছে।”
রেহানের হঠাৎ মাথায় এলো চাদনীর কথাটা। ওর হাসবেন্ডের আজ ওঁকে নিতে আসার কথা ছিলো। রেহান হড়বড়িয়ে বললো

-“চাদনী আপনার কে হয়?”
-“বউ।”
-“কেমন বউ?”
-“নিজের বউ!”
হাসনা বাহু দিয়ে ধাক্কা দিলো রেহানকে। রেহান এতোটায় অন্যমনস্ক ছিলো যে পরে যেতে যেতে সামলালো নিজেকে।হাসনা ফিসফিস করে বললো
-“বউ আবার কেমন হয়? পাগল কোথাকার!”
রেহান তখন অন্য ভাবনায় বুদ ছিলো। ওর বোন কী জানে, তার না হওয়া সতীন রেহানের বেস্টফ্রেন্ড। জানলে অবশ্যই সে রেহানের পিঠের উপর আস্ত একটা ইট ভাঙবে। রেহান কেঁপে উঠলো।
চাদনী উদগ্রীব স্বরে বললো

-“তুমি রেহান কে কী করে চেনো?”
-“শাবিহার ভাই ও। তুই বললি না তো, তোর একটা ফ্রেন্ডের নাম রেহান। তাহলেই তো আমি বুঝে যেতাম।”
-“ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আঁধার ভাই।”
পাশ থেকে রেহান তড়িঘড়ি করে বললো। আঁধার বললো
-“ভালো।”

চাদনী ভয়ে ভয়ে তাকালো আঁধারের দিকে। ও হাসিমুখেই কথা বলছে সবার সাথে। চাদনীর বুকের মধ্যে টান পরলো। এতো মানুষ থাকতে রেহানই শাবিহার ভাই হতে পেলো। তার উপর আবরার রাত রেহানের বড় ভাই। তারমানে সে শাবিহারও ভাই। এজন্যই শাবিহার আচরণ কিছুটা রাতের মতো ছিলো। আঁধার মনে হয় না সেটা জানে। জানলে এতোটা স্বাভাবিক আচরণ করতে পারতো না। চাদনী ঢোক গিললো। পার্টিতে গেলে নির্ঘাত রাতের সাথে ওর দেখা হবেই। তখন আঁধার কী করবে?সবার সাথেই স্বাভাবিক আচরণ করবে। অস্বাভাবিক আচরণ টা হবে শুধু ওর সাধে।

কাজলরেখা পর্ব ৪৮

আঁধার সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠলো। চাদনী উঠার আগেই রেহান আরেকবার ওঁকে পার্টির কথা মনে করিয়ে দিলো। এখন তো ওরা আরো বেশি পরিচিত হয়ে গেলো। রাতে পার্টি হলেও আঁধারের সাথে আসতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না চাদনীর। কিন্তু চাদনীর ভয় টাতো অন্য বিষয়ে ছিলো। আবরার রাত নামের একটা ছেলের সাথে ওর দেখা হওয়ার পর থেকেই সব উল্টাপাল্টা হচ্ছে। এক কথায় শনির দশা লেগেছে চাদনীর কপালে। কোনো না কোনোভাবেই ও মারা খাচ্ছে, নয়তো অপদস্হ হচ্ছে। কুফা একটা! এমন কুফার ঢাকার একটা এলাকার এমপি হওয়া একেবারেই উচিত নয়। তাতে যেমন দেশের ক্ষতি, তেমন চাদনী নামের, ঢাকায় বসবাস করা একটা ক্ষুদ্র মানুষেরও বিরাট ক্ষতি।

কাজলরেখা পর্ব ৪৯