কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৫
তন্ময়ী তিতিক্ষা
পুরোনো একটা টিনের ঘর। কৃত্রিম লাইটের মৃদু আলোয় আলোকিত ভিতরটা। নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রবেশ করল প্রহর। তার পিছু পিছু প্রবেশ করল মিহির। তাদের দেখা মাত্র সামনে থাকা নোমান ভ্রঁ কুঁচকে তাকালো। তাকে কেন ধরে আনা হয়েছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। এবার কিছুটা ক্লান্ত আর বিরক্তির স্বরে বলে উঠল,
“তোরা কারা ভাই। হুট করে আমাকে ধরে এনে বেঁধে রেখেছিস কেন?”
মিহির আর প্রহরের মস্তিষ্ক রাগে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকলো। রাগে হাত মুঠোবদ্ধ হয়ে আসছে তাদের। তবে তারা কিছুই করবে না। আযরানের নিষেধ আছে। এবার মিহির ধীর কদমে এগিয়ে এলো। নোমানের কাঁধে হাত রেখে ভ্রুঁ নাচিয়ে বাঁকা হাসল। ফিচেল স্বরে বলে উঠল,
“কেন এনেছি একটু পরেই টের পাবে ভাইয়া। আজকে তোমার খৎনা করানো হবে।”
নোমান কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই মুখ বিকৃত করে বলে উঠল,
“মানে? এইসব কী ফালতু কথা বলছিস তোরা?”
মিহির ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপলো। যেন বেশ মজা পেয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহর নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে ভীষণভাবে। রাগটা স্পষ্ট। মিহির তা দেখেই দাঁত ক্যালানো। হাসতে হাসতেই এগিয়ে গেল প্রহরের কাছে। যা দেখে আঁড়চোখে চাইলো প্রহর। এই ছেলের মতিগতি ঠিক লাগছে না তার কাছে। মিহির পুনরায় দাঁত ক্যালিয়ে বলে উঠল,
“ও বাবা প্রহর ভাই দেখি হেব্বি রাগী মুডে আছে। আসো চুনা একটা চুমু দিয়ে দেই।”
কথাটা বলেই হাত এগিয়ে নিয়ে এলো মিহির। প্রহর আঁতকে উঠল। কিছুটা লাফিয়ে পিছিয়ে গেলো কয়েকপা। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
“নীলা তোকে লাথির ওপরে রেখে ঠিকই করে। শ্লা গে একটা।”
নীলার কথা শুনতেই মিহিরের মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেল। একরাশ মিছে ভয় এসে জমল চোখে মুখে। সূক্ষ্ম একটা ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল,
“আমি মোটেও গে না। শুধু একটু মজাই করছিলাম।”
আকস্মিক তীক্ষ্ণ এক শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো দু’জনেই। ব্যথায় নাক মুখ কুঁচকে রেখেছে নোমান। মিহির আর প্রহরের ঠোঁটের কোণে প্রস্ফুটিত হলো বাঁকা হাসি। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাতেই নজরে এলো পকেটে হাত গুঁজে ভিতরে প্রবেশ করছে আযরান৷ হাতে দু’টো মার্বেল। কিছুক্ষণ পূর্বেই একটা মার্বেল ছুঁড়ে মেরেছে নোমানের কপাল বরাবর। তাকে দেখে নোমান থমকাল। পরক্ষণেই দৃষ্টি বদলে স্থান পেল রাগ। এবার বুঝতে বাকি নেই কেন তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। আযরান নোমানের সামনে এসে থেমে গেল। কিছুটা ঝুঁকে পড়ল নোমানের উপর৷ শান্তস্বরে বলে উঠল,
“কি অবস্থা না হওয়া সতান।”
তড়িৎ বেগে প্রহরের কানের সামনে ঝুঁকল মিহির। ফিসফিস করে বলে উঠল,
“সতান আবার কি বে?”
“আরে সতীনের বেডা ভার্সন সতান। শালা বলদ।”
‘ও’ বলে টান দিয়ে মিহির পুনরায় মনোযোগী হলো। আযরান পুনরায় কিছু বলবে এর পূর্বেই দূর্বোধ্য হাসল নোমান। তাচ্ছিল্যের সহিত বলে উঠল,
“তোর কি রুচি আযরান। যদিও আর্শির মতো মুটকি তোর বেস্টফ্রেন্ড শুনেই বুঝে গেছিলাম তোর রুচি। কিন্তু এত এত মেয়ে থাকতে শেষে কিনা পতিতালয়ে বিক্রি হওয়া মেয়েকে বিয়ে করলি? না জানি কার খাওয়া মাল।”
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল নোমান। দপ করে জ্বলে উঠল আযরানের মস্তিষ্ক। সেই সাথে রেগে গেল মিহির আর প্রহর। আযরানের কপালের ফুলে উঠা একেকটা রগ জানান দিচ্ছে আযরানের রাগের তীব্রতা। ফর্সা মুখশ্রী রাগের প্রকোটে লাল আভায় ছেঁয়ে গেছে। হাতের রগগুলো ফুলেফেঁপে উঠেছে। শিরা-উপশিরায় ক্রোধের উত্তাপ বয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। নোমানের হাত ঝাকিয়ে ধরল আযরান। কটমট শব্দ নিমিষেই কর্ণে প্রতিধ্বনি হলো প্রত্যেকটা মানুষের। প্রচন্ড ব্যথায় গলা ফাঁটিয়ে চিল্লিয়ে উঠল নোমান। নিমিষেই মিহির আর প্রহরের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুঁটে উঠল। আযরান থেমে থামলো না। উন্মাদের মতো একেক পর এক প্রহার করতে থাকলো। অস্থির কন্ঠে আওড়ালো,
“আমার আর্শিকে নিয়ে যে বাজে কথা বলবে তাকে আমি কিছুতেই ছাড়বো না। তোর জিভ আজকে আজকে আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
ক্ষণে ক্ষণে আর্তনাদ বেড়ে চলেছে। ঠিক কতক্ষণ চললো হিসাব নেই। হুট করে টেবিলে থাকা ছুরি টা হাতে তুলে নিল আযরান।মাটিতে পরে কুঁকড়াতে থাকা নোমান এবার আঁতকে উঠল। আযরানের পা ধরে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“এবারের মতো মাফ করে দে ভাই। আমি আর কখনোই এমন কিছু বলবো না।”
আযরান শুনলো না। সম্পূর্ণ কথাটা অগ্রাহ্য করে নোমানের জিহ্বা টেনে ছুরি চালিয়ে দিল। ব্যথায় বিষিয়ে উঠল সে। আর্তনাদ করতে গিয়েও পারলো না। পুনরায় ছুরি চালানোর পূর্বেই মিহির জাপটে ধরল আযরানকে। আযরান নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল,
“ছাড় মিহির! এই কু*** বাচ্চাকে আজ আমি মেরেই দম নিবো।”
“আযরান পাগলামি করিস না। এভাবে মারলে মরে যাবে ও। আর তোকে পুলিশ ধরবে। তখন আর্শির কি হবে? আর্শির আর কেউ আছে তুই ছাড়া?”
প্রহরের এরূপ কথায় নিমিষেই থেমে গেল আযরান। জ্বলন্ত শিখা যেন মুহুর্তে শীতলতায় রূপ নিল। বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো। কিন্তু হুট করে সমস্ত শক্তি দিয়ে লাথি বসালো নোমানের বুকে। প্রচন্ড যন্ত্রণায় চোখ ঝাপসা হয়ে এলো নোমানের। অগ্নিঝরা চক্ষে তাকিয়ে আযরান বলে উঠল,
“আমার আর্শিকে তোর মতো বাস্টার্ডের জন্য আমি হারাতে বসেছিলাম। বছরের পর বছর আমি ওকে আগলে রেখেছি সকল হায়নাদের কাছ থেকে। কিন্তু তু.. তুই মাঝে ঢুকে আমার আর্শিকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিলি। কলঙ্কিত করার চেষ্টা করলি। তুই আমার মুটিকে হার্ট করেছিস। তাকে কষ্ট দিয়েছিস। তোকে তো….।”
চিল্লিয়ে কথাগুলো বলে পুনরায় আঘাত করল আযরান। একসময় আধমরা হয়ে গেলে মিহির আর প্রহর ছাড়িয়ে নিল। বহুকষ্টে আঁটকে রাখলো খ্যাপাটে আযরানকে।
বিস্তর গগনে অসংখ্য তারার বিচরণ। পুরো আকাশ যেন এক থালা তারা দিয়ে ভরা। সেদিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরাল আযরান। পরক্ষণেই দ্রুত কদমে পা বাঁড়িয়ে সিঁড়ি মাড়িয়ে এসে থামলো দরজার সামনে। মাথাটা ব্যথায় টনটন করছে। তার উপর তখনকার রাগ এখনো রয়ে গেছে। মেজাজও খিটখিটে হয়ে আছে ভীষণ। শাওয়ার নিলে যদি একটু ঠিক হয়। এইসব ভেবে দরজার কড়া নাড়ল আযরান৷ বেশ খানিকটা সময় কেটে গেলেও অপরপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। আযরানের ভ্রুঁ যুগল কুঁচকে গেল আপনাআপনি। চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ল কয়েকটা। পুনরায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করল। হুট করে দরজা খুলে বিদ্যামান হলো আর্শির মুখশ্রী। আযরান স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। আর্শির মুখের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই নজরে এলো আর্শির ক্রন্দনরত মুখশ্রী। অভ্যন্তর ছটফট করে উঠল মুহূর্তে। আর্শির গালে হাত রেখে অস্থির স্বরে বলে উঠল,
“কি হয়েছে মুটি। তোর চোখে পানি কেন? তুই কাঁদছিস?”
প্রচন্ড রকম বিরক্ত হলো আর্শি। ঘেমে শরীরের অবস্থা খুবই বাজে। আযরানের হাত সরিয়ে চোখের কোণে থাকা অশ্রুটুকু মুছে বলে উঠল,
“ছাড়। কিছু হয়নি।”
আযরান নিশ্চুপ! হুট করে মাথায় এলো একটাই নাম, নোমান! তাহলে কি আর্শি নোমানের জন্য কাঁদছে? আযরানের দৃষ্টি শীতল হয়ে গেল। ধীরে ধীরে চোয়াল শক্ত হতে শুরু করল। কথা বাড়ালো না সে। হনহন পায়ে বাসার ভিতরে ঢুকে গেল। আর্শি হতভম্ব আযরানের এরূপ ব্যবহারে। দরজা লাগিয়ে গিয়ে গেল আযরানের কাছাকাছি। কাঁধে হাত রাখতেই অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আর্শির পানে। আর্শি চমকে উঠল। ভয়ে একপা পিছিয়ে গেল নিমিষেই। আযরান এগিয়ে এলো। শক্ত করে চেপে ধরলো আর্শির বাঁহু। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল মেয়েটা। ছলছল করে উঠল নেত্রপল্লব। রোষপূর্ণ চাহনি নিক্ষেপ করে আযরান তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠল,
“আর একটু কান্না করলে, আই সোয়ার। আমার হাতে তুই খুন হবি তুই।”
আযরানের কথায় হতভম্ব, নির্বাক আর্শি। বিস্ময়কর দৃষ্টি মেলে বলে উঠল,
“এমন কেন করছিস আযরান। কি করেছি আমি?”
নিরবতার ছড়াছড়ি কক্ষজুঁড়ে। ভয়ে আর্শির হৃদপিন্ডের গতি বেড়েই চলেছে। বেলকনি দিয়ে আসা হাওয়া ছুঁয়ে গেল। এলোমেলো করে দিলো আর্শির কয়েক ফালি চুল। আযরানের হাত তখনও আর্শি কাঁধ চেপে। এবার আরেকটু শক্তি প্রয়োগ করলো। যন্ত্রণায় চক্ষুদ্বয় খিঁচে ফেলল আর্শি।
“নোমানের প্রতি কেন তোর এত ভালোবাসা আর্শি? কেন তুই আমাকে ভালোবাসিস না? আমার অপরাধ কোথায় বলতে পারবি? ওই বাস্টার্ডের জন্য এখনো তুই অশ্রু ঝরিয়ে যাচ্ছিস। অথচ আমি? আমি যে তোর একটু ভালোবাসা পাওয়ার আশায় এত কিছু করছি। তোর চোখে লাগে না? তোর কি আমাকে দেখে মায়া হয় না? একটুও মায়া হয় না রে বল না আর্শি ? কেন আমাকে ভালোবাসিস না তুই? কেন?”
চিল্লিয়ে কথাগুলো বলে থামল আযরান। চক্ষুদ্বয় রক্তিম আকার ধারণ করেছে তৎক্ষনাৎ। যন্ত্রণাদায়ক পীড়ন ছড়িয়ে পড়ল আর্শির সারা শরীরে। সহ্য করতে পারল না আযরানের এহেম ব্যবহার। মন কুঠিরেতে এসে ঠাঁই নিলো একরাশ অভিমান। ঝরঝরে করে কেঁদে উঠল। বাচ্চাদের মতো গুটিসুটি মেরে জায়গা খুঁজতে লাগল আযরানের প্রশস্ত বুকে। আযরান বিস্ময়ে হতবাক। কয়েক সেকেন্ডের হতভম্বের ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে কোমড় আঁকড়ে দেহটাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে চলেছে আর্শি। আকস্মিক অশ্রুসিক্ত কন্ঠে মৃদুস্বরে বলল,
“আমি কারো জন্য কাঁদছিলাম না তো। রান্না করার সময় পেয়াজ কাটার কারনে চোখে পানি চলে এসেছে। আর..আর আমি চেষ্টা করছি তো তোকে ভালোবাসার।”
আর্শির বোকা বোকা কন্ঠে নিজের ভুলটা বুঝল আযরান। মনে মনে আফসোস হচ্ছে এতবড় ভুল করার। মেয়েটাকে অকারনে কষ্ট দিয়ে ফেলল। বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর্শিকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আযরান। কেটে গেল বেশ খানিকটা মুহুর্ত। আর্শির কান্নাও কমে এসেছে তবে সেখানে এসে স্থান পেয়েছে একরাশ লজ্জা। তখন তো মনের দুঃখে জড়িয়ে ধরেছে কিন্তু এখন লজ্জায় বক্ষস্থল ঢিপঢিপ করছে। আর্শি সরে আসতে চাইলো। তাতেই বাঁধা দিল আযরান। মেয়েটাকে আরেকটু নিজের সাথে চেপে স্মিত কন্ঠে আওড়ালো,
“আরেকটু থাক! ভালো লাগছে।”
প্রচন্ড অভিমানে ফুলে উঠল আর্শি মুখশ্রী। কিছুক্ষণ পূর্বের কথা মনে পড়ে গেল নিমিষেই। তড়িৎ বেগে ছিটকে সরে গেল আর্শি। আযরান ভ্রুঁ কুঁচকে চাইল আর্শির পানে। যা আঁড়চোখে দেখলো সে। অভিমানে জর্জরিত হয়ে বলে উঠল,
“আজ থেকে কেউ যেন আমাকে আর স্পর্শ না করে। যে ঠিক করে না শুনে বউকে দোষ দেয় তার বউয়ের সাথে কথা বলার দরকার নেই।”
কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ২৪
কথাটা বলেই হনহন করে রান্নাঘরে চলে গেল আর্শি। আযরান বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার চুপচাপ, শান্তশিষ্ট মুটি কি তাহলে একটু একটু করে অভিমানী আর চঞ্চল হচ্ছে? নিমিষেই আনন্দে বিমোহিত হয়ে গেল আযরান। পরক্ষণেই আর্শির বলা লাস্ট কথাটা মনে হতেই মুখমন্ডলে অন্ধকারের মেঘ ভীর করল। তাহলে কি এখন বউয়ের সাথে কথা না বলে থাকতে হবে? আযরানের চক্ষুদ্বয় অসহায়ের মতো হয়ে গেল। নজর আঁটকে রইলো সামনে থাকা পাষাণ বউটার দিকে। কি করে পারবে তার মতো ছেলেটার সাথে কথা না বলে থাকতে?
