Home কালকুঠুরি কালকুঠুরি পর্ব ৫০

কালকুঠুরি পর্ব ৫০

কালকুঠুরি পর্ব ৫০
sumona khatun mollika

আমার কাছে ভালোবাসার সজ্ঞা হচ্ছে ধ্বংসের সমান্তরাল । সামির সিকান্দার নিজেকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিল কিন্তু যে তার পরিবর্তন এর উছিলা হতে চেয়েছিল সে তার কাছে নেই।
ছাদে চুপচাপ বসে আছে সামির। যেদিন কাজ থাকেনা সেদিন ভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে ফিরে এসে বাড়িতেই থাকে। কাশেম, রকি ওরা এটা ওটা আজগুবি বাহানা দিয়ে চলে আসে। খানিক সময় এটা সেটা বলে বেরিয়ে যায় । নাজিয়া সিয়েরাকে কোলে করে ছাদে আসে। সিয়েরা হাত ঝাড়ি মেরে ছুটে কাকার পাশে বসে পরে।

– কাকা?
– কি বে বাঙ্গির নাতনি! মরবি নাকি? এমনে কেও দৌড়ায় ছাদের ওপর?
– মরবোনা ।
– আচ্ছা? কেমনে? এখান থেকে পরলে পেটের নাড়িভুড়ি সব বেরোয় যাবে।
– আরে পরব কেন আমার কাকা আছে না।
– ওরেস সালা, হেব্বি তেল মারছিস যে আজ, কিছু চাই?
– ও কাকা আমিনা এবারো ফেল করেছি!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কথাটা বলেই সিয়েরা ঠোঁট দিয়ে দাঁত চেপে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে রইল । সামির তার কান টেনে বলল,,
– ফেল করে আবার দাঁত কেলিয়ে হাসছে দেখ! এই ছুড়ি! এইসব৷ ক, খ, গ পড়ায় আবার ফেল কিভাবে করিস।
– জানিনা, মাস্টার শত্রুতা করে ফেল দিছে।
– তাই নাকি, বলত শুনি,, ১, ২, ৩৷ ক শুনি।
– ১,২,৪,৫,৬,৯,১২,১৬,১৯,৩০।
– হ্যা হ্যা সেই সেই ! একশোয় দুইশো! কে শিখাইছে তোরে ভুলভাল বাল!
– মা
– পিটবো ধরে আম্মু ভুল শিখায়নি তুই একটা গদাই মনে রাখতে পারিস না। মাঝখানের কয়েকটা কয়েকটা করে বাঙ্গিমারা করে দিলি কেন?
– তুমি বুড়ো হয়ে গেছো কাকা। কানে কম শোনো।
– তবেরে! আমি বুড়ো?

সামির সিয়েরাকে উল্টো করে কোলে তুলে বলে , ফেলে দি, দেব ফেলে? তোর মাম্মি বুড়ি শালা । এযুগের বাচ্চা হয়ে এত পিছিয়ে কেন তুই? পড়াশোনার শখ নাই? বিয়ে করবি?
– আগে নিজে একটা করে নাও। আমার চিন্তা পরে কইরো,
– আমি কি আবিয়াইত্তা নাকি?
– এহহ, তোমার বউ কই?
– আমার বউ? আমার মধ্যেই আছে। তোকে চিন্তা না করলেও চলবে।
– ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও বাবা এসেছে।
– যা।

সামির তাকিয়ে দেখে আজ পর্যন্ত বহুবার দেখেছে, বাপ আসলে এই সিয়েরা পেয়ারা দৌড়ে গিয়ে কোলে চড়ে। নাজিয়া একটু দুরত্ব রেখেই জিজ্ঞেস করে,,
– আপনার কখনো শখ হয় না?
– কিসের?
– এইযে সিয়েরার মতো যদি একটা বেবি যদি আপনারো থাকতো,, ? নুসরাত, রাহা এদের মতো আপনারো বউ থাকতো?
– থাকতো মানে? আছেইতো। তাছাড়া আমার বউয়ের অন্যের মতো হওয়ার প্রয়োজন নাই। সে মেডাম সবচে আলাদা। আমার চড়ওয়ালী । পানি সুন্দরী বোরখাওয়ালী।
– বেঁচে তো নেই?
– কে বলেছে ? ও সবসময়ই আমার বুকের বামপাশে ভারী আফসোসের বোঝা হয়ে বিরাজ করে। ভালো টালো বাসিনা ওকে। শত্রুকে কেও কি করে ভালোবাসে?
– শত্রু?!
– হুম। হিসাবের খাতায় লিখে শেষ করা যাবেনা ও আমাকে কতগুলো চড় মেরেছে। সেই ছোট্টকাল থেকে।
– কি বৱলেন? কিন্তু আপনাদের প্রথম দেখা না কদমতলীর মোড়ে। নুসরাত তো তাই বলল,,
– সে যেটা জানে সেটাই বলেছে।
– আমাকে প্লিজ বলবেন৷ প্লিজ। প্লিজ।
– কেন বলব?
– উমম,,,, এমনিই। আপনিইতো বেশি বড়লোক টাকাতো আর নিবেন না। তাহলে?
– তাহলে??

সামির চোখ উঁচু করে নাজিয়ার চোখ বরাবর তাকালে নাজিয়া চোখ ঘুরিয়ে বলে,,
– আবব,, কি হলো, ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন? এএএ, আমি আপনাকে বৈধভাবে পছন্দ করি, ভুলেও উল্টোপাল্টা কিছু চাইবেন না।
– গেস করো কি চাইতে পারি?
– আমি ক.. কি করে বলব?
– তোমাকে চাই।
– আমি রাজি..!

নাজিয়া চোখ ঘুরিয়ে ঘাড় চুলকালো। সামির আবারো পাগলের মতোন করে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,,,
– এই বাঙ্গি, তোকে চাওয়াই তো অবৈধ, তাহলে হুট করে রাজি বললি কেন?
– আমি ভেবেছি অন্য কিছু। হাসছেন কেন? এখানে এভাবে হাসার কি হলো?

সামির আকাশের দিকে মুখ করে সটান হয়ে শুয়ে পরল। নাজিয়াও তার পাশে শুয়ে পরল । আকাশে কালো কালো মেঘ, চারপাশ কুয়াশায় ঘেরা। তাকানো যায় । চোখ জ্বলেনা। সামির আপনমনেই বলতে শুরু করল,,
– হআআহ,, জানো দিবা কখনো আমাকে পাগলের মতো হাসার কারণ জিজ্ঞেস করেনি। একবার করেছিল। সেদিন আমি ওরে একটা সবুজ শাড়ি ধরায় দিয়া কইছিলাম পইড়া আসতে । নজর চুরি দেখে বুঝতে পারি সে রান্নায় পটু হলেও শাড়ি পরতে পারেনা। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,, আপনি শাড়ি পরতে পারেননা চড়ওয়ালী ? সে বলেছিল হাসছেন কেন?
– না পারতেই পারে হাসার কি ছিল?
– ছিল কারণ। তাকে তুমি কোনোদিকে সহজে কাত করতে পারবেনা। পড়াশোনা, রান্নাবারা, যুক্তিতর্ক , কণ্ঠস্বর , গড়ন, আর বিশেষ করে তার কনফিউশান ওয়ালা চোখ।
– আপনার যা বর্ণনা শুনেছিলাম তাতে কখনো ভাবিনি আপনি কাওকে ভালোও বাসতে পারেন।
– ভালোতো বাসিনা। আমিতো ওরে ঘৃণা করি। অয় আমারে ঠকায় চলে গেছে । সঙ্গে আমার বা…
– আপনার কি?
– কিছুনা। সার কথা এটাই দিবা কোনোদিনও আমাকে ভালোবাসে নাই। রাগ ছিল রাগ। জবরদস্তি বিয়া করছিলাম তো।
– হায়রে সামির সিকান্দার ! আপনিতো নিজেকেই চিনতে পারেন না। অন্য কে কি বুঝবেন?
নাজিয়া উঠে চলে গেলে সামির চোখ দুটো বন্ধ করে ধীর কণ্ঠে গাইতে থাকে,,

আমি পাগল, আমার মনও পাগল,
তাহার ওই মায়াবী চোখে আমি হতবিহ্বল।
তবু কেন আজ সে দূরে,
বড়ো অচেনা নিস্তব্ধতাল।
তার স্মৃতিরা রাতভর জ্বলে,
বুকে তোলে বিষণ্ন অবাঙাল।
ফিরে আসবে ভেবে বসে থাকি,
মন হয়ে যায় ব্যাকুল
তার নাম ডাকি নিঃশব্দ আকাশে,
প্রতিধ্বনি দেয় মেঘের দল,,
বিরহের এই পথে আমি একা, তবু তাকে চাই নিরুপায় অবিচল।

” হোক হাজার জনম পরে, হোক পদ্মা নদীর তীরে
হোক ঝলসালো রূপে, হোকপুড়ে ছাই হওয়া চেহারায়, তুমি যখন যেভাবেই ফিরে আসো, এই হারামি বাঙ্গি তোমায় সকল রূপে গ্রহণ করতে রাজি দিবা ”
নুসরাত পেছন থেকে বলে,
– আজ বিয়ে করেও লাভ নাই। শালার স্বামী এত সুন্দর করে কোনোদিনও বলেনা।
– কি চাই?
– সিভান কোথায়?
– আমি কি করে জানবো?
– বেলা ফুরিয়েছে কিন্তু এখনো ফেরত আসেনি। একটু পর সন্ধ্যার আজান দেবে। বলাতো যায়না কেও যদি তুলে নিয়ে যায়।
– কাইশসারে ফোন দেও।
– নিজে যাও। কাশেম রাজশাহী তে নেই.. রকি চাপাইয়ে। সিয়েরার বাবা লালকুঠি তে।
– তুমি কি দুঃখ দেখাতে এসেছ?
– এত সহজে বোঝ কি করে?
– সন্দেহ লাগে নাকি? খোজ লাগাব তোমার সোয়ামীর পিছে?
– তুমি কি করে বুঝবে বলো,, জানিনা সিয়াম একবারো কি চিন্তা করে না তার নিজেরও একটা মেয়ে আছে ।
– করে।
– শিওর?
– আশি শতাংশ ।
– কিভাবে?
– কি করে বোঝাব আমিতো আর কারো বাপ নই।
– আফসোস হয়?
– খুউব।

কিছুক্ষণ নিরবতা। নুসরাতের মনে হয় সামির যথেষ্ট সাজা পেয়েছে। এবারে তাকে সব বলা উচিৎ । পাঁচ টা বছর কম নয়। মাহাকে বলেছে মাহা স্বিকার হয়নি। মাহা আদো কি উদ্দেশ্য নিয়ে ছুটছে নুসরাতও তা জানোনা
‎সামির উঠে দাড়িয়ে বলল,
– আমি তাহলে বাহির থেকে ঘুরে আসছি।
– হুমম।
সামিরের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল নুসরাত । সিয়েরা জোর করায় সঙ্গে নিলো তাকেও।
সিভান নর্থ সাউথ পাবলিক স্কুলে পড়ে। ছুটি হয় বিকেল তিনটায় । সাড়ে চারটা বাজে এখনো ফিরে আসেনি। অন্য দিন এত দেরি করেনা।
নুসরাতের ধারণা সঠিক। সিভান কে তিহানের দলের গুন্ডারা ঘেরাও করেছে। স্কুলের থেকে সামান্য দূরে। সাফিন কে ভয় দেখানোই মূলত উদ্দেশ্য। সিভান বলেছে,, তার রাস্তা ছেড়ে দিতে কাকা আসলে ছাড়বেনা। শুনছে কোথায়!

তবে সিভানের গায়ে হাত তোলায় সে তার কাকার মতো গালি দিয়ে বসে,,
– হারামজাদা শালা! তুই আমাকে চড় মারলি! ছাড়বনা তোকে।
সামনের লোকটা বিনা কারণে সামান্যতেই ক্ষেপে বোম হয়ে গেল । চেলাদের আদেশ করল,,
– এ তোল একে, সাহস কতো! তুই আমাকে গাইল দিলি!

সিভানের স্বাস্থ্য স্বাভাবিক । খুব একটা ভারী না। তাকে তুলতেও তেমন বেগ পেতে হলোনা তাদের! জবরদস্তি সিভানকে তুলে নিয়ে গেল তারা। সামির এসে দেখে কয়টা কালো গাড়ি চলে যাচ্ছে । একটুর জন্য সে দেখতে পায়নি। বেশ কিছুসময় খোঁজে । সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয় তবে সিভানকে খুঁজে পায়না। সিয়েরাও চিন্তা শুরু করেছে। নিজ থেকেই বলল,,
– কাকা,
– বল পেয়ারা,,
– ভাইয়ু কে কিডন্যাপ করেছে মনে হয় ।
– আমারো তাই মনে হয় । চল, অর বাপ রে আগে কই।
– চলো।

বাড়িতে ফিরে সামির সহ রাহা, নুসরাত, নাজিয়া সবাই যার যার নাম্বার দিয়ে ট্রাই করেছে। কিন্তু সাফিনের ফোনে কল ঢোকেনি৷ রাত প্রায় ১১ টা বেজে যায় । সামির বেরোচ্ছে না জন্য নুসরাতের আবার রাগ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তখনি মাহাবুব উদ্দিন বাড়িতে ঢোক ঢোকে সমিরের উদ্দেশ্যে বলে,
– কেমন চলছে সামির সিকান্দার ? নাকি প্রফেসর সামির সিকান্দার ভিরান বলব?
– ওয়েলকাম ব্যাক।
– ধন্যবাদ । আপনার জন্য দুটো দুঃসংবাদ আছে।
– সু শব্দটা আমার জন্য নয় মাহবুব উদ্দিন নাকি ওসি মাহবুব উদ্দিন বলব?
-এখনো তেজ কমেনি আপনার! এনিওয়ে,, সিভানকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। এমপি সাফিন সিকান্দার আকস্মিক বোমা হামলায় আহত।

– মারা খায়া হাসপাতালে পইরা আছে। এর লাইগাই কল তুলতাছেনা। সিভুরে কে উঠায়ছে?
– জানিনা। নতুন মনে হয় ওরা। খোঁজ চালাচ্ছি। আপনার কুকুরটাকে দেন….
– কি বাঙ্গিমারা জিন্দেগী ! আপনার সবসময় আমার জিনিসপত্র কেন চাই? আগে বউ চাইতেন, এহন কুত্তাডাও চাই?
– কি জানি সামির সাহেব, সবসময় আপনার জিনিসগুলাই ভালো লেগে যায় । আপনার একটা মেয়ে বাবু থাকলে বলতাম, আমাকে দেন আমি পালি।
– আমার ক্ষেতে কোনো বাঙ্গি বাকি নাই। কুত্তাডাও নিবেন গা?
-দিয়েন, বাঙ্গি, মূলা, কলা, যা ইচ্ছে দিয়েন।
– কোথা থেকে উঠায়ছে?
-স্কুল থেকে সামান্য দূরে থেকে। খবর দিতে এসেছিলাম। আপাতত আসি। আবার দেখা হবে

কালকুঠুরি পর্ব ৪৯

মাহবুব উদ্দিন বেরিয়ে গেলে সামির বিনা নোটিশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় । এদিকে সবাই টেনশনে পরে যায় রাহা, নুসরাত, সাথি সবাই হাসপাতালে পৌঁছে যায় ।
সামির যা সন্দেহ করে নব্বই শতাংশ মিলে যায় । কি করে যেন বুঝে যায় , সাফিনের হামলার সাথে সিভান গুম হওয়া কানেক্টেড । তবে ধরেছে কারা তা বুঝতে পারছে না। শিষ বাজাতেই হাজির হয় রিটো। এতগুলো দিনে তার ধারালো দাঁত আরো ধারালো হয়েছে। সামির তার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসে। সিভানের শার্ট শুকিয়ে বলে ,
!চল কামলা কামে যাই

কালকুঠুরি পর্ব ৫১