Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৯+২০

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৯+২০

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৯+২০
মুনমুন বুড়ি

অভ্র নিজের রুমে আসছিল তখনই মিহির আওয়াজ শুনে তাড়াহুড়ো করে রুমে এসে দেখে মিহি মেঝেতে বসে আছে আর বিরবির করে কিছু বলছে। অভ্র মিহির সামনে এসে দেখতে পায় মিহির হাতে ওর ফোন। অভ্র মিহির সামনে বসে বলে
— এই মিহি, কি হয়েছে? এমন করছিস কেন?
মিহির কোনো হুঁশ নেই, ও সমানে বিরবির করে বলে যাচ্ছে—
— না না, এটা হতে পারে না, এটা হতে পারে না।
অভ্র মিহির কথা শুনে বলে—
— কি হয়েছে? কী হতে পারে না?
মিহি হঠাৎ কান্না করতে করতে বলে ওঠে—
— আব্বু… আ… আব্বু… ভা… ভাইয়া…
এতক্ষণে অভ্রের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়। সবকিছু বুঝে উঠতেই দেখে মিহি হাঁপড়ের মতো নিশ্বাস নিচ্ছে। প্যানিক অ্যাটাক করেছে ও। অভ্র মিহিকে এক হাতে আগলে ওর গালে আলতো চাপড় দিতে দিতে বলে—
— মিহি, এই মিহি… বেশি কষ্ট হচ্ছে তোর? মিহি, চোখ বন্ধ করিস না। কিচ্ছু হবে না তোর, আমি আছি তো। আমি কিচ্ছু হতে দেব না তোর।

শেখ বাড়ির সামনে আসতেই গাড়ি থামায় অভ্র। পাশে মিহি বসে আছে চুপচাপ, পাথরের মতো কোনো কথা বলছে না। তখন প্যানিক অ্যাটাক হওয়ার পরই অভ্র তাদের ফ্যামিলি ডাক্তারকে ফোন দেয়। ডাক্তার এসে মিহিকে চেকআপ করে কিছু ওষুধ লিখে দেয় আর মিহিকে রেস্ট নিতে বলে। কিন্তু মিহি স্বাভাবিক হওয়ার পরই এখানে আসার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে, ফলে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অভ্রকে মিহিকে নিয়ে এখানে আসতে হয়। গাড়ি থামার সাথে সাথেই অভ্র মিহির দিকে ফিরে তাকায়, মিহি আগের মতোই চুপচাপ হয়ে বসে আছে।
অভ্র শান্ত স্বরে মিহিকে বলে ওঠে—
— মিহি, নাম… আমরা এসে গেছি।
অভ্রের কথা শোনার সাথে সাথেই মিহি কোনো কথা না বলে গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়ে। অভ্র নিজেও গাড়ি থেকে নেমে মিহির সামনে এসে দাঁড়ায়। কোনো রূপ বনিতা না করেই অভ্র সরাসরি মিহির হাত ধরে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই মিহির বুক কেঁপে উঠে। হৃদয়ে ছুরিকাঘাত করার মতো কষ্ট অনুভূত হয় ওর। সামনে দুটো খাটিয়া রাখা, যার একটিতে শুয়ে আছেন আলতাফ শেখ, অন্যটিতে শুয়ে আছে সিয়াম শেখ। দুজনেরই মুখাবয়বে অজস্র ক্ষতের চিহ্ন। আলতাফ শেখের নাকে গোঁজা তুলো দুটোও লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সিয়ামের বাম গালে গভীর ক্ষত— কোনো জংলি পশুর নখের চিহ্ন যেন।
ওদের লাশের পাশেই নিথর হয়ে পড়ে আছে রিনা বেগম। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে শরীরে কোনো প্রাণ নেই। শান্ত চোখে একধ্যানে তাকিয়ে আছে স্বামীর খাটিয়ার পানে। চোখ বেয়ে বৃষ্টির মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে পাশে বসে রয়েছে তিহি, মেয়েটা বিলাপ করে কাঁদছে। দুজন মহিলা দুদিক থেকে তিহিকে ধরেও সামলাতে পারছে না। একদিনে বাপ-ভাইকে হারিয়ে পাগল প্রায় মেয়েটা। বারবার হামাগুড়ি দিয়ে একবার বাবার খাটিয়ার সামনে যাচ্ছে, তো অন্যবার ভাইয়ের খাটিয়ার সামনে যাচ্ছে।
আলতাফ শেখের খাটিয়ার সামনে গিয়ে তিহি কান্না করে বলে ওঠে—

— আব্বু, তুমি আমাদের আই-বাবা ছেড়ে যেতে পারো না। তুমি ছাড়া বাঁচবো কি করে, আব্বু? তুমি এমনটা করতে পারো না, আব্বু। চোখ খুলো না, আব্বু… আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। দেখো আব্বু, দেখো… তোমার মেয়েটা কাঁদছে। তুমি একবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে না?
তিহি পুনরায় সিয়ামের খাটিয়ার সামনে গিয়ে বলে—
— এই ভাইয়া, তুমিও আই-বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলে? তুমি তো বলেছিলে সবসময় আমাদের সাথে থাকবা। যেকোনো সমস্যায় তোমার কাছে গেলে তুমি ম্যাজিক করে সব সমস্যা ভ্যানিশ করে দিতে। আমার মন খারাপ থাকলে সবার আগে তুমি বুঝতে, আমার মন ভালো করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে। এখন কে আমার মন ভালো করবে? ওঠো না ভাইয়া, ওঠো… প্লিজ। আর আই-বাবা শুয়ে থাকো না, ওঠো এবার…

তিহির আহাজারি শুনে আশেপাশে থাকা লোকজনের চোখও ভিজে উঠে। মিহি আর সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে আলতাফ শেখের খাটিয়ার সামনে গিয়ে বসে পড়ে। আলতাফ শেখের প্রাণশূন্য মুখটা দেখে কান্না করে বলে ওঠে—
— আব্বু… ও আব্বু… তুমি এইভাবে আমাকে শাস্তি দিলে? এইভাবে? তুমি নিষেধ করেছিলে বলেই তো আর তোমার সামনে আসিনি… কিন্তু তারপরও এত বড় শাস্তি কেন দিলে, আব্বু? আব্বু, একবার চোখ খুলো… সত্যি বলছি, আর কখনো তোমাকে কষ্ট দেবো না। শুধু একবার চোখ খুলো। আচ্ছা, তোমার যত ইচ্ছা তত আমাকে বকো… তারপরও বকো… আমাকে উঠো না আব্বু… আ…
আর কিছু বলতে পারে না মিহি। এর আগেই কেউ ওর বাহু টেনে ওকে আলতাফ শেখের খাটিয়ার সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। মিহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ মিহির গালে একটা জোরালো থাপ্পড় মারে, ফলস্বরূপ মিহি একদিকে হেলে যায়।
মিহি নিজের গালে এক হাত দিয়ে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় রিনা বেগম ওর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিহি আহত কণ্ঠে বলে ওঠে—

— আম্মু… তু…
— চুপ! একদম চুপ! ডাকবি না আম্মু আমাকে। আমি তোর আম্মু নই। অপয়া রাক্ষসী একটা! আমার পুরো সংসারটা খেয়ে দিলি। নিজের মা-বাবা খেয়ে শান্তি হয়নি, এখন আমার স্বামী-সন্তানকেও খেয়েছিস!
মুহূর্তেই মিহির মাথায় যেন বাজ পড়লো। পুরো দুনিয়া ওর কাছে গোলগোল ঘুরতে থাকল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
— নিজের… নিজের মা-বাবা… মা মানে?
— বুঝতে পারছিস না নাকি, না বোঝার ভান করছিস— কোনটা? তাহলে শুনে রাখ, তুই আমাদের কেউ নোস। তুই কে, আমরা সেটা ভালোভাবেই জানি। আর না কি জানি— শরীরে ভালো রক্ত বয়ছে কিনা!
মিহি নিজের বুকে হাত দিয়ে বহু কষ্টে বলল—

— তাহলে… আমার মা-বাবা কোথায়?
— মরেছে ওরা! ওদেরকেও ধ্বংস করে দিয়েছিস। তোকে তো কুড়িয়ে এনেছিল আমার স্বামী। কিন্তু দেখ— আজকে আমার স্বামী-সন্তানটাকেও তুই মেরে ফেললি!
মিহি নিজের দুই কান চেপে ধরে বলল—
— না… না… না… মিথ্যে! সব মিথ্যে! বন্ধ করো এইসব!
— সব সত্যি! সব! আর এটাও সত্যি— তোর জন্যই আজ আমাদের এই অবস্থা হয়েছে। সবকিছুর জন্য তুই দায়ী,
মিহি… তুই!

কিছু মূহুর্ত নিঃশব্দে অতিবাহিত হয়।
এরপর
হঠাৎই ধুম করে একটা শব্দ হয়।

মিহি সেন্সলেস হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকে। অভ্র এক পা এক পা করে মিহির সামনে এসে বসে। মিহির পাশে এসে বসে মিহির আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে রক্তচক্ষু নিয়ে রিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে এক আঙুল তুলে রিনা বেগমকে শাসিয়ে বলে ওঠে—

— ইউ হ্যাভ টু পে ফর দিস।
কথাটা বলার সাথে সাথেই অভ্র মিহির শরীরটা কোলের নিয়ে তুলে দাঁড়ায়। এরপর উপস্থিত সবার দিকে একবার একবার করে তাকায়। অভ্রের সেই চাহনি ছিল ভয়ংকর যে কোনো মানুষ সেই দৃষ্টি দেখে ভয় পাবে। অভ্র মিহিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে থাকলে সবাই তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

মিহি আস্তে আস্তে চোখ খুলে সামনে একটি ঝাপসা মুখাবয়ব দেখতে পায়। মিহি কয়েকবার পলক ঝাপটে সামনে থাকলেও এইবার মুখাবয়বটি স্পষ্ট হয়। অভ্র মিহির দিকে তাকিয়ে রইলে মিহি আবার ঘুরে অভ্রকে জিজ্ঞাসা করে—
— এখন কেমন লাগছে?
মিহি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ অভ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিহি কোনো উত্তর না দেয়ায় অভ্র পুনরায় প্রশ্ন করে—
— কিছু চাই?
মিহি জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে—
— পা পানি…
মিহির কথা শুনে অভ্র বেডসাইড টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখে পানির বোতল খালি। অভ্র মিহির দিকে তাকিয়ে বলে—
— পানি শেষ হয়ে গেছে, আমি পানি নিয়ে আসছি।
অভ্র কথা বলার সাথে সাথেই বোতল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিহির চোখের সামনে এক ফোঁটা জল ঝলমল করে পড়ে।

অভ্র পানি নিয়ে ঘরের সামনে এসে দেখি দরজা ভিতর থেকে লক করা। অভ্র কিছুক্ষণ ধরে কিছু ভাবা-মুখো কিছু মুহূর্ত চুপচাপ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকক্ষণ যাওয়ার পরও যখন মিহি দরজা খোলে না, তখন অভ্র দরজা কড়া করে নক করতে থাকে। কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। এবার অভ্র জোড়ে জোড়ে দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করে, কিন্তু মিহি দরজা খুলছে না অভ্র মিহিকে উদ্দেশ্য করে বলে—
— মিহি, ওপেন দ্যা ডোর। ইউ হিয়ার মি, রাইট? প্লিজ, ওপেন দ্যা ডোর… মিহি, মিহি!
অভ্রের চিৎকার শুনে নাসরিন আহমেদ নিচ থেকে উপরে এসে দেখে অভ্র দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। নাসরিন আহমেদ অভ্রের সামনে এসে জিজ্ঞেস করে—

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৮

— অভ্র, কি হয়েছে?
কিন্তু অভ্র কোনো উত্তর দেয় না। হঠাৎ অভ্র কিছু একটা ভেবে উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে—
— মিহি, যদি উল্টা-পাল্টা কিছু করার চেষ্টা করিস, আই স্যার, আই উইল কিল ইউ!
ঠিক তখনই ঘরের ভিতর থেকে কিছু পড়ার শব্দ আসে। অভ্র আর কিছু না ভেবে দরজা ভাঙার চেষ্টা চালিয়ে থাকে। কিছু মুহূর্ত পর অভ্র দক্ষ কৌশলে দরজাটি ভাঙতে সক্ষম হয়। দরজাটা ভাঙার সাথে সাথেই অভ্র দেখতে পায় মিহির ঝুলন্ত পা।

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ২১