Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৮

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৮

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৮
মুনমুন বুড়ি

মিহির অবস্থা এখন আগের থেকে অনেক ভালো। পেটে শক্ত খাবার থাকায় ওষুধ খুব বেশি ইফেক্ট ফেলতে পারেনি। তবু শরীর খুব দুর্বল। অভ্র আর সিয়াম তিন ব্যাগ রক্ত দিয়েছে মিহিকে। রক্ত দেওয়ার পর দু’জনকেই রেস্ট করতে বলেছে ডাক্তার। কিন্তু সিয়াম রেস্ট করলেও মিহির অবস্থা ভালো শুনে অভ্র কোথায় যেন বেরিয়ে গেল।
মিহির এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার বলেছে সন্ধ্যের মধ্যে জ্ঞান ফিরবে।
পুরো এক দিন কেটে এখন বিকেল ৫টা ৪৫। সবাই এখনো হাসপাতালে। সবাই একবার মিহিকে দেখতে চায়, কিন্তু ডাক্তার কাউকে পারমিশন দিচ্ছেন না। আলতাফ শেখ, কেভিন এর বাইরে পায়চারি করছেন। সেই কখন থেকে রিনা বেগমও উদ্‌গ্রীব হয়ে আছেন একবার মেয়েকে দেখার জন্য। নাসরিন আহমেদ চলে গেছেন অভ্রর সাথে সবার জন্য একটু খাবার আনতে। কেউ সারাদিন একটু দানাপানিও দাঁতে কাটেনি।

তখনই কেভিন দেখে একটা নার্স বের হয়ে ডাক্তারের ডেকে যাচ্ছে। আলতাফ শেখ, রিনা বেগম, তিহি—সবাই অস্থির হয়ে ওঠেন। ডাক্তারের তারাহুরো করে কেভিনে যায় এটা দেখে রিনা বেগম আলতাফ শেখের কাছে এসে বলেন—
— এই কী হয়েছে আবার মেয়েটার ?নার্সটা এইভাবে চিৎকার করলো কেন? আবার কি কিছু হয়েছে আমাদের মেয়েটার?
আলতাফ শেখ নিজে ভেতরে ভেতরে অনেক অস্থির হলেও বাইরে তা প্রকাশ করলেন না। স্ত্রীকে সান্ত্বনার সুরে বললেন—
— কিছু হবে না মিহির। ডাক্তার বলেছেন না, এখন মিহি ভালো আছে। হয়তো অন্য কোনো কারণে ডাক্তার ভেতরে গেছেন। তুমি শান্ত হও।
ওনাদের কথোপকথনের মাঝেই ডাক্তার কেভিনে থেকে বেরিয়ে আসেন। ডাক্তারকে দেখে আলতাফ শেখ আর রিনা বেগম ডাক্তারের কাছে যান। রিনা বেগম ছটফট করে বলে ওঠেন—

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আমার মেয়ে কেমন আছে ডাক্তার?
ডাক্তার প্রসন্নসুরে বলে ওঠেন—
— রিল্যাক্স আন্টি। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে এবং উনি এখন একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন। আপনারা চাইলে এখন উনার সাথে দেখা করতে পারেন। তবে একজন একজন করে এবং উনাকে কোনো প্রেশার দেবেন না। এটা উনার জন্য ক্ষতিকারক।
ডাক্তারের কথা শুনে রিনা বেগম ও আলতাফ শেখের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। রিনা বেগম দ্রুত বলে ওঠেন—
— তাহলে আমি আগে যাই?

আলতাফ শেখ স্ত্রীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সায় জানান।
রিনা বেগম কেভিনের ভেতরে ঢুকে দেখে মেয়েটা শান্ত হয়ে শুয়ে আছে। এই একদিনে কতটা কষ্ট সহ্য করেছে মেয়েটা ভাবলেই এখনো তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। রিনা বেগম মিহির বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আলতোভাবে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন। মিহি কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলে তাকায়। মেয়েকে চোখ খুলতে দেখে রিনা বেগম ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। মিহি হালকা হেসে জড়ানো কণ্ঠে বলে—

— ম… মা… ত… তুমি কেঁদো না। আ… আমি ঠিক আছি।
রিনা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন—
— সে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি তুই কেমন ঠিক আছিস। এরকমটা কেন করলি মা? একবারও আমাদের কথাটা ভাবলি না? তোকে ছাড়া আমরা কী করে থাকবো? এত বড় একটা কাজ কেন করলি মা? কেন কিসের এত কষ্ট তোর?
মিহি চুপ করে আছে। কোনো কথা বলছে না। শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
রিনা বেগম মেয়ের মাথায় একটা চুমু খেয়ে বেরিয়ে আসেন। মেয়েকে একা ফেলে আসতে ইচ্ছা করছিল না, কিন্তু বাইরে আলতাফ শেখ আর তিহিও অপেক্ষা করছে মিহিকে দেখার জন্য। তাই না চেয়েও আসতে হলো। আলতাফ শেখও মেয়েকে দেখে বাইরে এলেন।

এবার তিহির পালা। কিন্তু তিহি কোনোভাবেই যেতে রাজি হচ্ছে না। কোথাও একটা আটকাচ্ছে ওকে ভেতরে। কিন্তু বাবা-মার জোরাজোরিতে তিহিকে শেষমেশ আসতেই হলো কেভিনে।
কেভিনে ঢুকেই তিহির খারাপ লাগা শুরু হলো। মিহির হাতে মোটা ব্যান্ডেজ, মুখটা শুকিয়ে গেছে—দেখলেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ক্লান্ত। তিহি আস্তে আস্তে মিহির বেডের সামনে এসে দাঁড়ায়। মিহি কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলে তাকায়। মিহি তিহিকে দেখে কটাক্ষ করে বলে ওঠে—
— আ… আপু, তুমি ও এসেছো? আ… আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আরো খু… খুশি হবে আমাকে এভাবে দেখে।
মিহির কথা শুনে তিহি ফুপিয়ে উঠলো। ভাঙা গলায় বললো—

— তুই এসব কী বলছিস মিহি? আমি তোকে কখনোই এই অবস্থায় দেখতে চাইনি। ওইদিন তো আমি রাগের মাথায় ওইসব বলেছিলাম। আমার একদিকে ভালোবাসা, একদিকে বোন—আমি কোনো একটাকে চুজ করতে পারছিলাম না মিহি। আমি তাই এসব বলেছি। তুই বিশ্বাস কর, আমি আমার মনের অবস্থা কাউকে বোঝাতে পারছি না। তোকে এভাবে দেখে আমার কত কষ্ট হচ্ছে সেটা আমি কীভাবে বোঝাবো তোকে বল?
কথাগুলো বলতে বলতে তিহি কান্না করে দেয়। মিহি তাকিয়ে থাকে তিহির দিকে। মনে মনে ভাবে—সত্যিই ভালোবাসা মানুষকে কতটা অসহায় করে দেয়। কিন্তু ভালোবাসার মানুষটি যদি সঠিক না হয়, তাহলে জীবন নরকে পরিণত হয়।

কেটে গেছে দুটো দিন। মিহির জ্ঞান ফেরার পরের দিনই ওকে বাড়ি আনা হয়েছিল। এখন মিহি প্রায় সুস্থ। শুধু শরীরটা একটু দুর্বল, এই যা। মিহি বাড়ি ফেরার পর থেকেই চুপচাপ হয়ে আছে। কারো সাথে তেমন কোনো কথা বলছে না। কেউ মিহিকে জোরও করছে না কিছু নিয়ে।
কিন্তু সবার মনেই একটা প্রশ্ন—কৌশিক কোথায় গেল? একবার মিহির খোঁজও নিলো না। আগে তো মিহির সামান্য জ্বর হলেও কৌশিক মিহিদের বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে থাকতো। তাহলে এখন মিহির ওপর দিয়ে এতকিছু গেল, কৌশিকের কোনো খবর কেন নেই?

এমনটাও না যে কৌশিক কিছু জানে না। কৌশিকের বাবা আশরাফুল খান কাল এসে মিহিকে দেখে গেছেন। তাহলে কৌশিক নিশ্চয়ই সব জানে। তাহলে কৌশিক কেন কোনো খবর নিচ্ছে না মিহির?
মিহির কানেও এসব কথা এসেছে। কিন্তু মিহি নির্বিকার। কেউ না জানুক, মিহি তো জানে কেন কৌশিক মিহির কোনো খবর নিচ্ছে না। এমনিতেই মিহির মতো মেয়েকে কে বা মেনে নেবে। তাও তো কৌশিক কথাটা পাচকান করেনি এটাই শুকরিয়া।
মিহি এতসব ভাবনার মাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মিহির খুব তেষ্টা পেয়েছে। পাশে তাকিয়ে দেখলো জলের বোতল খালি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত ১টা বাজে। পাশে কেউ নেই যে যাকে বলবে একটু জল এনে দিতে। আগে মাঝেমধ্যে তিহি একসাথে থাকতো, এখন ওই ঘটনার পর থেকে আর থাকে না হয়তো অপরাধবোধে।
মিহি বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো, পানি আনার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ড্রইংরুমে এসে ফিল্টার থেকে জল ভরছিল মিহি। এমন সময় হঠাৎ মনে হলো ড্রইংরুমের সোফায় কেউ বসে আছে। অন্ধকারের জন্য লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। মিহি কাঁপা কাঁপা গলায় বললো—

— ক… কে? কে ওখানে?
ঠিক তখনই কালো অবয়বটা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এক পা এক পা করে মিহির দিকে এগোতে থাকে। মিহির ইচ্ছা করছে দৌড়ে জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে, কিন্তু পা দুটো এক বিন্দুও নড়ছে না। অন্যদিকে অবয়বটা যতই কাছে আসছে, তার মুখটা ততই পরিষ্কার হচ্ছে। এক পর্যায়ে অবয়বটা স্পষ্ট হয়। মিহির মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটা শব্দ

— অভ্র ভাইয়া!
অভ্র মিহির থেকে এক কদম দূরে দাঁড়িয়ে গাঢ় কণ্ঠে বলে—
— কী ডার্লিং, কেমন আছো? শরীর ঠিকঠাক?
মিহি কোনো উত্তর দিচ্ছে না। অভ্র পুনরায় বলে ওঠে
— কী হলো বেবি, উত্তর দাও।
— আপনি এখানে কেন এসেছেন? আবার আমার জীবনটা ধ্বংস করতে এসেছেন? একটু বাঁচতে দিন না আমাকে। প্লিজ, একটু বাঁচতে চাই আমি।
অভ্র কুটিল হেসে বলে ওঠে
— তো তুই বাঁচ না কে মানা করেছে? তোকে বাঁচানোর জন্য শরীর থেকে এত দামি দামি রক্ত তোকে দিয়ে দিলাম, তারপরও বলছিস আমি তোকে বাঁচতে দিচ্ছি না? নেমোহারাম নারী কোথাকার।
মিহি অবাক সুরে বলে ওঠে

— রক্ত দিয়েছেন মানে?
অভ্র কুটিল হেসে বলে ওঠে
— রক্ত বুঝিস না? ব্লাড ব্লাড। এই জানোয়ারের রক্ত এখন তোর শরীরে আছে। যাই হোক, বাদ দে। শুনলাম তোর আশিক নাকি তোর কোনো খবর নেয়নি, একবার দেখতেও আসেনি। এটা শুনে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। বুকের ভেতরে হৃদপিণ্ডটাই একটু একটু ব্যথার উৎপন্ন হয়েছে। তাই তোর জন্য একটা জিনিস নিয়ে আসলাম।
মিহি দাঁতে দাঁত চেপে বলে
— আপনাকে কে দিতে বলেছিল আপনার এত দামি দামি রক্ত আমি বলেছিলাম? আর আমার খবর কে নিলো না নিলো সেটা আপনার না জানলেও চলবে। এখন আপনার এসব ফালতু কথা বাদ দিয়ে এখান থেকে যান।
অভ্র কুটিল হেসে বলে—

— রাগলে তোকে ভালোই লাগে, কিন্তু এখন আমি যাবো না। তোকে একটা জিনিস দেখাবো আগে।
— আমি দেখবো না আপনার কোনো জিনিস।
কথাগুলো বলে মিহি রুমের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরতেই অভ্র বলে ওঠে—
— কৌশিক তোর জন্য কিছু পাঠিয়েছে।
মুহূর্তেই থমকে যায় মিহি। পিছনে ঘুরে অভ্রর দিকে তাকায়। অভ্র কয়েক কদম এগিয়ে আসে মিহির দিকে। মিহি শান্ত সুরে বলে—
— কী পাঠিয়েছে?
অভ্র কোনো উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিডিও প্লে করে মিহির সামনে ধরে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কৌশিক একটা চেয়ারে বসে আছে। তার মুখোমুখি আরও একজন বসে আছে, কিন্তু তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কৌশিক বলতে শুরু করে—

— মিহিকে তো আমি শুধু ব্যবহার করেছি। ওকে আমি কোনোদিনই ভালোবাসিনি। ও তো একটা বোকা, ভালোবাসার জালে আটকা পড়েছিল। ইচ্ছা ছিল একবার মেয়েটাকে কাছে পাওয়ার, কিন্তু মাঝখান থেকে ওই অভ্র শালায় বাজি মেরে দিল। আর তুমি তো জানো আমি ইউজ করা জিনিসে নট ইন্টারেস্টেড।
এতটুকু বলার পরেই ভিডিওটা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে মিহি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো দুনিয়া ঘুরছে ওর মনে। আসছে শুধু একটা কথাই—ছয় বছর ধরে সব নাটক ছিল। এত ভালো অভিনয় করলো কৌশিক।
মিহি ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে—
— এটা মিথ্যে। নকল। আপনি বানিয়েছেন এটা।
অভ্র সোজাসাপ্টা ভাবে বলে—

— ঠিক আছে, আমি ভিডিওটা তোকে সেন্ড করছি। তোর যদি মনে হয় ভিডিওটা ফেক, তাহলে তুই যাচাই করতে পারিস আমার কোনো বাধা নেই। কিন্তু একটা কথার উত্তর দে আমাকে—তোর কৌশিক আজ কোথায়? তুই তো মরতে বসেছিলি, তাহলে তোর কৌশিক একবারও কেন তোর খবর নিলো না? এত তাড়াতাড়ি ভালোবাসা শেষ হয়ে গেল?
মিহি অভ্রর কথা না চাইলেও বিশ্বাস করে। সত্যিই তো—ভালোবাসা এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায় নাকি? কৌশিক যদি সত্যিই একদিনের জন্য হলেও ভালোবাসতো, তাহলে তো একবার একটা কল হলেও করতো। কিন্তু আজ কৌশিক কোথায়? আর ভিডিওটা ফেক হলে অভ্র এত কনফিডেন্সের সাথে কীভাবে বলছে কথাগুলো?
সবকিছু ভেবে মিহি ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে।
অভ্র শান্ত সুরে বলে—

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৬+৭

— ছেড়ে দে ওকে। ও শুধু তোকে ইউজ করেছে।
কথাটা শুনেই মিহি ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। কান্নারত কণ্ঠে বলে—
— আমি কীভাবে ওকে ছাড়বো? ওকে ছাড়ার তো কোনো উপায় নেই।
অভ্র ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—
— কেন?
— ও তো আমার স্বামী !!!

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ৯