Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ৩১

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩১

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩১
হামিদা আক্তার ইভা

নামাজের পর পাত্র পক্ষ হাজির হলেন।আগে বিয়ে পড়িয়ে তারপর খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।নূপুরকে আজ লাল টুকটুকে বউ সাজানো হয়েছে।বিয়ে পড়ানো হলো খানিকক্ষণ পরেই।বউ আর জামাইকে আলাদা করে খেতে দেয়া হয়েছে রজনী বেগমের ঘরে।বাইরে চলছে খাবারের আয়োজন।ময়ূরীর পরিবার এসেছে আজ।তাদের খাতির-যত্ন করছে তাহসিন নিজে।মেম্বার,রাজু এবং মাহতাবের পরিচিত অনেক লোকজন এসেছেন।বৈঠক হবে দুইটা।বিশাল বাগানে চলছে তোড়জোড়।

ময়ূরী ছিল বাড়ির ভেতর মা আর বোনের সাথে।পুতুল খালার কোলে বসে আছে চুপটি করে।ফিরোজা বেগমের পাশেই রজনী বেগম।অরুণিমা বেগম ব্যস্ত এই মুহূর্তে।ফিরোজা বেগম এর আগে কখনও চেয়ারম্যান বাড়ি আসেননি।আসার প্রয়োজন হয়নি।বাড়িটা দেখে তিনি বেশ অবাক হয়েছেন।এত বড় বাড়ির বউ তার মেয়ে।ভাবতেও কেমন যেন লাগছে।
ময়ূরী মায়ের শুকনো মুখটা দেখে জিজ্ঞেস করল,

“আম্মা,তোমার কী হয়েছে বলো তো?ডাক্তার কী বলেছে?”
ফিরোজা বেগম বললেন,
“শরীর দুর্বলরে মা।ঠিক হয়ে যাব বিশ্রাম নিলেই।”
“ঔষধ খাচ্ছ তো ঠিক মতো?”
“খাচ্ছি।”
রজনী বেগম ফিরোজা বেগমের সাথে কথায় ব্যস্ত হলে মধু ফিসফিস করে ময়ূরীকে বলল,
“তোর ঘর কোনটা?এত বড় বাড়ির মধ্যে তো বুঝতেই পারছি না।”
ময়ূরী উঠে দাঁড়াল।বর্তমানে তার কাজের কোনো চাপ নেই।সে বোন আর মেয়েকে নিয়ে দো’তলায় তাহসিনের ঘরে এলো।বিশাল ঘর।মধুর মনে হলো এই ঘরের সমান তাদের দুই ঘর।সে পুরো ঘরে দৃষ্টি বুলিয়ে বলল,
“এখন নিশ্চই আমাদের বাড়ি গিয়ে থাকতে তোর অসুবিধা হয়,তাই না?”
কপাল কুঁচকে এলো ময়ূরীর।খিলখিল করে হেসে ফেলল সে।মাথার কাপড় টেনে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে বলে,
“যেখানে মাটি কামড়ে বড় হয়েছি এত বছর,সেখানে থাকতে আবার অসুবিধা হবে কেন?বরং এই বাড়িতে থাকতে ভীষণ অসুবিধা হয়।কত নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়।”

“সবাই অনেক রাগী তাই না?”
“উহুম!বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের চরিত্র আলাদা।”
মধু গিয়ে বসল বোনের পাশে।পুতুল বিছানায় বসে বসে খেলছে নিজের মতো।সে আড়চোখে ভাগ্নিকে দেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“ভাবছি বিয়েটা করে ফেলব।তোর তো বিয়ে হয়েছে,জামাই আঁচলে বাঁধে কী করে?”
মধুর এহেন কথায় ময়ূরী নাক-মুখ কুঁচকে বলে,
“আমি তোর ছোট বোন হই।”
“তো?বিয়ে তো তোর আগে হয়েছে।”
“জামাইকে আঁচলে বাঁধে কী করে?”
“নাটক করিস না।আমার কী চোখ নেইরে?ভাইয়া দেখি সব সময় তোর আঁচল ধরে ঘুরে।”

লজ্জা লাগল একটু তার।বড় বোনের কাছে স্বামীকে নিয়ে এমন কথা শুনলে লজ্জা তো লাগবেই।মধু ভুল কিছু বলেনি।বিয়ের আগে বিয়ে করতে না চাইলেও বিয়ের পর লোকটা কেমন যেন হয়ে গেছে।সব সময় বউয়ের আঁচল ধরে রাখা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।বাড়ির মহিলারা তাকে বউপাগল বলে এত কথা শোনায়,তবু লোকটার কোনো পরিবর্তন নেই।ময়ূরী লাজুক দৃষ্টি সরাতেই দরজার বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করল আফিয়া।হাতে মিষ্টির একটা ছোট বাটি।সেটা মধুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এত বিয়ের শখ জাগল কেন শুনি?”
মধু বলল,

“আমার সব বান্ধুবীদের বিয়ে হয়ে গেছে।আমার চোখের সামনে দিয়ে জামাই নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সব।আমারও তো ইচ্ছে করে নাকি?”
“তোমার বোন তো জামাই নিয়ে ঘুরঘুর করে না।”
“ওর জামাই’ই তো ওর পিছু ছাড়ে না,ও আবার কী ঘুরবে?”
আফিয়া আর মধু শব্দ করে হেসে উঠল।ময়ূরী লজ্জায় লাল হয়ে চোখ পাকিয়ে বলল,
“থামবে তোমরা?আমার জামাই আমাকে ভালোবাসে সেটাও তোমাদের সহ্য হচ্ছে না?”
আফিয়া বলল,
“সহ্য হবে কী করে?আমার জামাই তো দেবর জির মতো আমার পিছু পিছু ঘুরে না।”
“ইশ!” সে উঠে দাঁড়াল।পেছন থেকে পুতুল কুটুর কুটুর চোখে সবাইকে দেখে বলল,
“মা লজ্জা পায় কেন?”
আফিয়া পুতুলের নাক টেনে দিয়ে বলে,
“আজ মায়ের লজ্জা পাওয়ার দিন।”

হাসি-আড্ডা দিতেই সময় গড়াল বেশ।বিকেল বেলা বাড়িতে বড়দের আলোচনা চলছে।বক্কর ফরাজী ও ফিরোজা বেগম বসে আছেন তাদের সাথেই।উপরে নূপুরের বাসর সাজানো হচ্ছে লোক দিয়ে।কাল ছেলের বাড়ি অনুষ্ঠান হবে বলে সেই বিষয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।পাত্র পক্ষ সন্ধ্যার দিকে রওনা হবেন।আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে হওয়ায় এপক্ষ আর ওইপক্ষের মানুষ প্রায় একই বলতে গেলে।বাড়ির বাইরে খাওয়ার আয়োজন শেষ।সেখানে মাহতাব তার পরিচিত নেতাদের সাথে ব্যস্ত।বাড়ির পেছনে পুকুর পাড়ে এসেছিল মধু।সাথে আছে কুসুম আর বর্ষাও।বাড়ির চারপাশে এত মানুষ যে কোথাও গিয়ে শান্তি নেই।বাগান ঘুরে রাজু এলো পুকুর পাড়ের এদিকে।কুসুম ও বর্ষা দু’জনেই মেম্বারের ছেলেকে চেনে বলে সালাম করল।মধু বিরক্ত হলো রাজুকে দেখে।রাজু কুসুমকে বলল এখন থেকে একটু চলে যেতে।সে মধুর সাথে কথা বলবে।ওরা বাড়ির অন্যপাশে চলে যেতে চাইলে মধুও পা বাড়ায় ওদের সাথে।পেছন থেকে রাজু মৃদু গলায় বলে,

“তোমার ডানা ছাটার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছে আমার।”
মধু রেগে পিছু ঘুরে দাঁড়ায়।দাঁত চিবিয়ে বলে,
“চরিত্রহীন পুরুষ!তোমার লজ্জা থাকলে কখনও এই মুখ আমায় দেখিও না।”
রাজু হেসে বলে,
“তোমায় ছুঁয়েছি?আমি যে চরিত্রহীন বুঝলে কী করে?”
“দেখো,তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।এখন কোনো ঝামেলা করতে এসো না আমার সাথে।”
রাজুর হাসিটা মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখে মুখে একটা কুটিল ভাব ফুটে উঠল। সে এক কদম এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,

“সম্পর্ক নেই? সম্পর্ক আমি বানিয়ে নেব। এমন কথা রটাব গ্রামে,তোর মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।”
মধু নরম গলায় বলল,
“কেন করছো এমন?আমার পিছু কেন ছাড়ছ না?”
“আমি ডাকলেই আমার কাছে চলে আসবে।”
কথাটার অর্থ এত নোংরা ছিল যে মধুর গা গুলিয়ে এলো।এমন ধরনের একটা প্রস্তাব যদি কোনো মেয়েকে দেয়া হয় তাহলে তার রিঅ্যাকশন কেমন হওয়া উচিত?মধুর মন চাইল রাজুর গালে ঠাটিয়ে একটা চড় মারতে।কিন্তু সেই সাহস তার নেই।সে কথা না বাড়িয়ে পিছু ফিরলে রাজু দাঁত চিবিয়ে বলে,
“তোর সাথে সাথে তোর বোনের শরীরের তেজও ভাঙব আমি।”
মধুর ভয় হলো।সে এসব ঝামেলায় কখনও জড়ায়নি।কিংবা ময়ূরীর মতো এত সাহসও তার নেই।কী করবে রাজু?সে বুঝতে পারে,রাজু প্রায় তার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে রাত্রে বেলা।একমাত্র জেদ আর নোংরা ইচ্ছে পূরণ করার জন্য।কী হবে আগামীতে?এই নরপশুর ফাঁদে পা বাড়াবে সে?নাকি শক্ত হয়ে একজন নারীর শক্তির পরিচয় দিবে মধু?

রাতে আর কেউ থাকলেন না।বর পক্ষ যাওয়ার পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হলো বাইরে।তাহসিন গেছে শ্বশুর-শাশুড়িকে দিয়ে আসতে।রাত হয়েছে বেশ।ময়ূরী শাশুড়ির ঘরে গিয়ে দেখল পুতুল আর ফাহাদ চুপটি করে শুয়ে আছে।আজ ফিরোজা বেগম ফাহাদকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।ফাহাদ বাচ্চাটা যেতে চায় না বোনকে রেখে।ময়ূরী আম্মাকে বুঝিয়ে বলেছে সামনে সপ্তায় তার পরীক্ষার সময় ফাহাদকে দিয়ে আসবে বাড়িয়ে।
সে বের হলো ঘর থেকে।সবার ঘরের দরজা প্রায় বন্ধ।আড়চোখে আফিয়ার ঘরের দিকে তাকাল সে।আফিয়ার সাথে তার খানিকক্ষণ আগেও কথা হয়েছে।আজ ভয় হচ্ছে।সে পা টিপে টিপে তাহসিনের ঘরে এলো।আফিয়া সয়তানী করে ঘর সাজিয়ে দিয়ে গেছে একটু।পায়ের পাতা শিরশির করছে তার।হঠাৎ দরজায় শব্দ হলো।তাহসিন এসেছে।মেয়েটা চমকে উঠে ভেতর থেকে বলল,

“কী চাই?”
তাহসিন বাইরে থেকে বলল,
“ভিজে গেছি।দরজাটা খোলো বউ!”
লাজ-লজ্জা একপাশে রেখে দরজা খুলে দিল ময়ূরী।তাহসিন হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকতেই ময়ূরী দরজা চাপিয়ে দিল।তাহসিন আঁচল টেনে ধরতেই ভয়ে শরীর জমে এলো।তার আঁচল দিয়ে ভেজা মাথা মুছতে ব্যস্ত সে।
“ভয় পাচ্ছ কেন,বেগম সাহেবা?”
তাহসিনের শীতল কণ্ঠস্বর শুনে সে আমতা আমতা করে বলে,
“শরীরটা ভালো লাগছে না।আজ..মানে আজ একটু মাথা ধরেছে।”
তাহসিন সোজা হয়ে দাঁড়াল।ভ্রু কুঁচকে ময়ূরীকে পর্যবেক্ষণ করে পুরো ঘরে দৃষ্টি বুলাল।কিছু যেন বুঝতে পারল সে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে আগে ওয়াশরুম থেকে কাপড় চেঞ্জ করে এলো সে।বিছানার এক কোনায় বসে ময়ূরীকে কাছে ডাকল।ময়ূরী গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলেও তাহসিনের কাছে গেল না।বরং তাহসিন নিজেই এলো নিকটে।বউয়ের ছোট্ট ছোট্ট হাত জোড়া মুঠোয় নিয়ে সেথায় নরম চুমু খেলো।
“নিজের উপর জুলুম করছো কেন?আমি কিন্তু তোমায় জোর করিনি।তোমার অনুমতি ব্যতীত কিছু হবে না।আমায় কী বিশ্বাস করো না তুমি?”

ময়ূরী মাথা নিচু করল।সে তো বাঁধা দিতে চাচ্ছে না;তবে ভয়ে শরীর জমে আসছে।আফিয়ার বলা কিছু কথা যেন বারবার কানে এসে লাগছে।স্বামীকে দূরে রাখা ঠিক নয়।তবে ময়ূরী এইটুকু বিশ্বাস রাখতে পারে,তাহসিন বউ ব্যতীত অন্য নারীর দিকে চোখ তুলে তাকানোর মতো পাপ করবে না।
ভয়ের সাথে সাথে লজ্জাটাও আজ অন্যরকম।সে খুব ধীরে মাথা তুলল।তাহসিনের চোখে কোনো তাড়া নেই, নেই জেদ,শুধু আছে অপেক্ষা।
“আমি বিশ্বাস করি।”ময়ূরী ফিসফিস করে বলল।
“কিন্তু নিজেকেই যেন বোঝাতে পারছি না।”
তাহসিন আর কোনো কথা বলল না।ওর কপালে আলতো করে কপাল ছুঁইয়ে দিল।সেই স্পর্শে কোনো দাবি নেই, আছে শুধু আশ্বাস।

“তাহলে আজ শুধু পাশে থাকি।যেদিন তুমি নিজে চাইবে, সেদিনই।”
ময়ূরীর বুকের ভেতরটা হালকা হয়ে এলো।সে নিজেই এক কদম এগিয়ে এলো।এইবার আর পিছু হটল না।আঁচলের প্রান্তটা ধীরে তাহসিনের আঙুলে গিয়ে আঁটকাল!ভয়ে নয়, ইচ্ছেতেই।
তাহসিন বুঝে গেল।ছোট্ট বউটা বুকে গুটিয়ে আসতেই ওষ্ঠ মিলিত হলো।খানিকক্ষণ পর তাহসিন ভীষণ আদুরে গলায় আবদার করে বলল,
“বউ,আজ রাতটা আমায় দাও।একান্ত আমার করে।”
বিয়ের দেড় মাস পরে, এই প্রথম ভয় নয়, লজ্জা নয়,শুধু বিশ্বাস নিয়ে ময়ূরী তার খুব কাছে এলো।মত্ত হলো স্বামীর ভালোবাসায়।

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩০

বৃষ্টি থেমে গিয়েছে বাইরে।ঘরের ভেতর আলোটা নরম হয়ে এসেছে।দু’জনের মাঝের দূরত্ব মিলিয়ে গেল নিঃশব্দে।তাহসিনের উন্মাদনা সামলাতে যেন বড্ড হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে সে।তবুও শোয়ে নিল সেটুকু।
এই রাতটা ছিল না কোনো দাবি বা তাড়ার।
এই রাতটা ছিল বিশ্বাসের,ধীরে ধীরে কাছে আসার,
আর এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।নীরব ঘরে শুধু বাতির আলো কাঁপছিল।আর দু’টি হৃদয়,একই ছন্দে ধুকপুক করছিল।

কিশোরী কন্যা পর্ব ৩২