Home কিশোরী কন্যা কিশোরী কন্যা পর্ব ৬

কিশোরী কন্যা পর্ব ৬

কিশোরী কন্যা পর্ব ৬
হামিদা আক্তার ইভা

আদনানের আগমনে ময়ূরী ছিঁটকে দূরে সরে গেলো।একটা সময় লজ্জায় লাল হয়ে আদনানকে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকেই বেরিয়ে গেলো।তাহসিন কটমট দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে আদনানের দিকে।আদনান দৌঁড়ে এসে তাহসিনের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
“ভাই তোর কপাল পুড়লো রে।অফিস থেকে তোকে কল করেছিল কিন্তু তোর ফোন অফ।তোর চাকরি গেলো বোধহয়।”
তাহসিন পা ঝাড়া মেরে আদনানকে সরিয়ে দিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখল পুতুল ফোন বন্ধ করে রেখেছে।ফোন অন করে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে কল কেটে দিলো সে।আদনান ফের ওর পা জড়িয়ে ধরে বলল,

“এবার আমার বেতনটা একটু বাড়িয়ে দিতে বল না ভাই!তোর পিছু পিছু ঘুরতে আমার আর ভালো লাগে না।শালা হাগতে গেলেও তোর পিছু যেতে হয়।”
তাহসিন আরাম করে বালিশে মাথা রাখল।আড়চোখে আদনানের একটু খানি মুখশ্রী দেখে বলল,
“তোর কাজই আমার লেজ ধরে থাকা।পা টা টিপে দে তো।”
“তুই কিন্তু শত্রুতা করছিস আমার সাথে।”
“প্রথমত আমি তোর বড় ভাই,দ্বিতীয় তোর কাজই আমার সাথে থেকে আমাকে সাপোর্ট করা।এই হারামি,কয়েকদিন আগে না তোর স্যালারি বাড়ল?”
“বাল বাড়ছে।ঐ টাকায় কী হয়?তুই তো লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরিস তাই তোর গায়ে লাগে না।”
“চুপচাপ পা টিপে দে।”
“গলাটা টিপে দেই?”
“বেশি কথা বললে তোর চাকরি খাবো আমি।এমনিতেই আমার রোমান্সের মাঝে এসে সব বিগড়ে দিয়েছিস।শালা ভালো করে পা টেপ।”

ময়ূরী ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল হিমি খাবার গরম করে ডাইনিং টেবিলে রাখছে।পুতুল একটা সাদা বিড়াল কোলে নিয়ে মেঝেতে বসে আছে।মেয়েটা এত আদুরে,তার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে গেলো।হিমি ময়ূরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুচকি হেসে বলল,
“এইযে নতুন বউ,তোমায় কী বলে ডাকবো?নাম ধরে নাকি ভাবি বলে?”
ময়ূরী হিমির কথায় তার নিকট এগিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“নাম ধরে ডাকবেন।”
“তোমার নাম কী?”
“দিলরুবা ফরাজী,তবে সবাই ময়ূরী বলে ডাকে।”
“বাহ,সুন্দর নাম।তাহলে আমিও ময়ূরী বলে ডাকবো?”
“আপনার ইচ্ছা।”
হিমি মুচকি হাসল।

“যাও দেখি তোমার জামাইকে ডেকে নিয়ে আসো।তোমাদের জন্য রান্না করে রেখেছিলাম আমি।”
ময়ূরী শাড়ির আঁচল আঙুলে মুড়িয়ে হাঁসফাঁস করছিল।হিমি সেটা বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে?জবাবে ময়ূরী বলল,
“আপনি কে হন উনার?”
“ওর ফ্রেন্ড এবং সহকর্মী।আমরা একই অফিসে জব করি।”
“আপনি চাকরি করেন?”
“হ্যা।”
“বিয়ে করেননি?”
হিমি খিলখিল করে হেসে উঠল।বয়স তার ২৮ এখনো হয়নি তবে বিয়ের বয়স পেরিয়ে এসেছে বহুদিন আগে।তাকে দেখলে বয়স বুঝা যায় না ঠিক তবে বয়স জানার পর মানুষের রিয়েকশন কিছুটা হতভম্বই থাকে।সে মাথা নাড়িয়ে না বুঝালে ময়ূরী মাথা নাড়ে।পুতুল তার বিড়াল ছানাকে কোলে নিয়ে হিমির পায়ের কাছে এসে শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।হিমি তাকে কোলে উঠিয়ে ময়ূরীকে দেখিয়ে বলল,

“নতুন মায়ের সাথে কথা বলেছ?”
পুতুল হিমির কাঁধে মাথা রেখে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“নতুন মা অনেক ঝাল।”
ময়ূরী ভ্রু কুঁচকে ফেলল।হিমি আশ্চর্য হয়ে বলে,
“ঝাল মানে?”
“নতুন মা আমার সাথে কথা বলে না।”
হিমি ময়ূরীর দিকে তাকালো।ময়ূরী পিটপিট করে বাচ্চাটার মায়াবী মুখ পানে তাকিয়ে আছে।কী মিষ্টি দেখতে মেয়েটা।কিছুটা তাহসিনের মতো তবে গায়ের রং টুকটুকে ফরসা।মা বোধহয় ফরসা ছিলো।ময়ূরী পুতুলকে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো।তার পাশে পুতুলকে বসিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,

“তুমি জানো আমি তোমার কী হই?”
পুতুল মাথা নাড়িয়ে বলল,
“মা।”
ময়ূরী তাকিয়ে রইলো বাচ্চাটার দিকে।কী সুন্দর করে মা বলে ডাকল তাকে।
“আমাকে তুমি মা বলেই ডাকবে?”
পুতুল ময়ূরীর শাড়ির আঁচল হাতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“মাকে তো মা বলেই ডাকতে হয়।বাবা বলেছে তোমাকে আম্মা বলে ডাকতে।”
তাহসিন তখন ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।চেয়ার টেনে বসতে বসতে আড়চোখে বউ বাচ্চার দিকে তাকিয়ে হিমিকে খাবার দিতে বলল।ময়ূরী,পুতুল ,আদনান সবাই রাতের খাবার সেরে ঘুমানোর সময় ময়ূরী বলল সে তাহসিনের সাথে থাকবে না।তাহসিন মাত্রই ঘরের দরজা লাগাচ্ছিল,ময়ূরীর কথা শুনে পিছু ঘুরে দাঁড়াল।তাহসিন এগিয়ে এলো ময়ূরীর নিকট।পাশে দুরত্ব রেখে বসতেই ময়ূরী বলল,
“খারাপ ভাববেন না,তবে আমি আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই।”
“বলো।”
ময়ূরী লম্বা শ্বাস টানলো।কণ্ঠ নরম করে বলল,

“স্বামী স্ত্রী একসাথে থাকবে এটা স্বাভাবিক।কিন্তু আমি আসলে একটু সময় চাইছি আপনার কাছে।বিয়েটা হুট করেই হয়ে গেছে,তা ছাড়া আমার এই বয়সে বিয়ে করার ইচ্ছেও ছিল না।আশা করি আপনি আমার সমস্যাটা বুঝতে পারবেন।”
ময়ূরী আড়চোখে তাহসিনের শান্ত বদন দেখে ফের বলল,
“আমি আপনাকে সেইভাবে চিনি না।আমার মনে হয় একে অপরকে কিছুটা সময় দেয়া উচিত।একটা সম্পর্কে আন্ডারস্ট্যান্ডিং জিনিসটা ভীষণ দরকার।আমি…আমি আসলে আপনাকে আগে একটু বুঝতে চাই।”
তাহসিন ঠোঁট কামড়ে হাসল।ছোট বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করলাম।তুমি বোধহয় ভয় পাচ্ছ আমি স্বামীর অধিকার ফলাবো এর জন্য তাই তো?স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এটা স্বাভাবিক হলেও অবশ্যই আমাদের সময় নেয়া উচিত।তোমার স্বামী কা-পুরুষ নয়।”
তাহসিন ময়ূরীর একহাত মুঠোয় নিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“তুমি যতদিন না নিজে থেকে আমার কাছে আসবে ততদিন আমি তোমাকে কোনো কিছু নিয়ে জোর করব না।আমি তো আগেই বলেছি আমার কোনো চাওয়া পাওয়া নেই।যত খুশি সময় নাও।তবে হ্যা,বিয়ে যখন একবার করেছি মৃত্যুর আগ অব্দি তুমি আমার।আল্লাহকে সাক্ষী রেখে যখন কবুল পড়েছ তখন স্বামীর সকল আদেশ মেনে চলবে।আমি কখনো তোমার খারাপ চাইবো না।যা করবো সব তোমার ভালোর জন্যই।”
ময়ূরী মাথা নাড়ল।তাহসিন আদনানের ঘরে গিয়ে ময়ূরীর জন্য পুরো ঘর পরিষ্কার করে দিলো।পুতুলকে বলল আজ আম্মার সাথে ঘুমাতে।ময়ূরী পুতুলকে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করতেই তাহসিন আদনানকে বলল,
“তুই তোর ফ্ল্যাটে থাকবি নাকি আমার ঘরে?”
আদনান বেক্কলের মতো তাহসিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।কী হচ্ছে এসব?সে নখ মুখে দিয়ে একবার তার ঘরের দিকে তাকিয়ে আবার তাহসিনের দিকে তাকালো।আশ্চর্য হয়ে বলল,

“ভাবি আমার ঘরে গেলো কেন?”
“ও আজ থেকে ওখানেই থাকবে।”
“কিন্তু কেন?”
তাহসিন গম্ভীর হয়ে আদনানের কাঁধে হাত রাখল।
“এটা তোর ভাবির পার্সোনাল ব্যাপার।”
আদনান বুঝলো।ময়ূরীর ব্যাপার নিয়ে আর মাথা ঘামালো না।সে তাহসিনের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
“আমার ওই ভূতুরে ফ্ল্যাটে ভূতের সাথে প্রেম করার জন্য যাবো নাকি?তুই আয়,আজ তোর সাথে ঘুমাবো।”
ময়ূরী পুতুলকে নিয়ে শুয়েছে বিছানায়।পুতুলের একটা বাজে অভ্যাস আছে।সে ঘুমানোর সময় সব সময় মুখে কাপড় কামড়ে ধরে রাখে।আজও ময়ূরীর শাড়ির আঁচল দাঁতে চেপে শুয়ে পড়ল।ময়ূরী অবাক হয়ে দেখল এটা।সে আঁচল তার মুখ থেকে বের করে বলল,
“এটা কী করছো তুমি?”
পুতুল ময়ূরীর শরীর ঘেঁষে কাছে এগিয়ে এলো।ছোট ছোট দুই হাত দিয়ে তার শরীর খানা ঝাঁপটে ধরে ঘুমঘুম কণ্ঠে বলল,
“চোখে ঘুম।”

ময়ূরী মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।কিছু সময় যেতেই পুতুলের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।ময়ূরী উপরে ঝুলতে থাকা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলো।এমন কিছু ঘটনা নিজের জীবনের সাথে ঘটবে সে কল্পনাও করেনি।নিয়তি আসলেই বড্ড অদ্ভুত।আল্লাহ যেটা চান সেটা হবেই।তবুও বুকের কোথাও একটা শান্তি কাজ করছে।তাহসিনকে তার ভালো লাগত।লোকটা সুন্দর করে বুঝিয়ে কথা বলে।কেমন করে যেন তার মনের কথা গুলোও জেনে যায়।তার জায়গায় অন্য পুরুষ হলে বোধহয় আগে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতো।তাহসিন তো তেমন কিছুই করেনি।উল্টো কবুল বলার পর থেকেই লোকটা তার যত্ন নিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে।তবুও সে বিয়েটা মানতে পারছে না।দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।আল্লাহ যেটা ভাগ্যে লিখে রেখেছেন সেটাই কবুল!

গত কাল বৃষ্টি হয়নি।উত্তপ্ত দুপুর বেলায় বক্কর ক্ষেত দেখে সবে বাড়ি ফিরেছেন।মধু আজ রান্না করছে।বাড়িতে তার মামাতো ভাই এসেছে।ফিরোজা বেগম ব্যস্ত হয়ে ভাইয়ের ছেলের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছেন।বক্কর বাড়ি ফিরতেই ফিরোজা বেগম হাতের কাজ রেখে বললেন,
“ওয়াহিদ এসেছে বাড়িতে।”
বক্কর আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“তোমার ভাইয়ের ছেলে ওয়াহিদ?”
“হ্যা।”
তিনি ভীষণ অবাক হলেন এই সংবাদ শুনে।ফিরোজা বেগমের বাপের বাড়ি থেকে ওয়াহিদ আর তার মা ছাড়া কেও কখনো এই বাড়িতে আসে না।তা ছাড়া ওয়াহিদও আজ বহু বছর পর ফুপুর বাড়ি এসেছে।তিনি ঘরে ঢুকলেন।ওয়াহিদকে দেখেই নিজে থেকে আগে সালাম দিলেন।
“আসসালামু ওয়ালাইকুম আব্বাজান,ভালো আছো?”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম ফুপা।আল্লাহ ভালো রেখেছেন।আপনার কী খবর?”
“এইতো আছি।”

তিনি এগিয়ে গিয়ে পালঙ্কে বসলেন।বক্কর ভালো করে ওয়াহিদের দিকে তাকালেন।ছেলেটা উজ্জল শ্যামলা।বেশ লম্বা চওড়া সুন্দর দেখতে।বয়স ২৯।পেশায় পুলিশ,এসআই পদে আছে।
“তোমার বাবা মা কেমন আছে?”
“ভালো আছে ফুপা।আম্মা একটু অসুস্থ তবে আল্লাহ ভরসা ঠিক হয়ে যাবে।”
“বেশ ভালো।হঠাৎ আজ ফুপুর কথা মনে পড়ল যে?”
“ফুপুর সাথে অনেকদিন দেখা হয় না,তাই ভাবলাম আজ গিয়ে একটু দেখা করে আসি।”
মধু ঠান্ডা সরবত নিয়ে এলো।সেটা ওয়াহিদ সামনে দিতেই বক্কর বললেন,
“ওয়াহিদ কী মাত্র আসছো?”
ওয়াহিদ মাথা নাড়ায়।বক্কর উঠে বসলেন।বাইরে গিয়ে স্ত্রীর সাথে টুকটাক কথা বলে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলেন।ফিরোজা বেগম রান্না ঘরে ঢুকেছেন।বাড়িতেই দেশি মুরগি ছিল।পাশের বাড়ির এক ছেলেকে দিয়ে জবা’ই করিয়েছেন।
ওয়াহিদকে সরবতের গ্লাস এগিয়ে দেয়ার পর মধু ঘর থেকে বের হতে চাইলে ওয়াহিদ পিছু ডাকে তাকে।মধু পিছু ঘুরে দাঁড়ালে ওয়াহিদ পাশে এসে বসতে বলে।মধু চুপচাপ পাশে গিয়ে বসে।

“কী খবর তোমার?”
মধু মুচকি হেসে বলে,
“ভালো আছি।”
“ময়ূরীর খবর কী?তাকে তো বাড়িতে দেখছি না।”
“ময়ূরীর বিয়ে হয়েছে ভাইয়া।”
ওয়াহিদ হতবাক এহেন কথায়।সে আশ্চর্য কণ্ঠে বলল,
“বিয়ে হয়েছে মানে?”
“চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে প্রস্তাব এসেছিল।চেয়ারম্যান সাহেবের প্রস্তাব আব্বা ফেরায়নি।”
“এটা কোনো কথা হলো?ময়ূরীর বয়সই বা কত?ও না পড়াশোনা করছে?”
“চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন ওকে পড়াবেন।”
“কার সাথে বিয়ে হয়েছে?”
“উনার মেজ নাতি,তাহসিন ভাইয়ের সাথে।”
ওয়াহিদ আর প্রশ্ন করল না।মধু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ফিরোজা বেগম বললেন উঠোন নোংরা হয়েছে,পরিষ্কার করে খাবারের আয়োজন করতে।

ঢাকার বিকেল মানেই এক অদ্ভুত বিশৃঙ্খলার সৌন্দর্য।সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে,আলোটা একটু সোনালি,একটু ধুলোমাখা। রাস্তায় হর্ণের চিৎকার,রিকশার টুংটাং শব্দ,হকারের ডাক সব মিলে এক অব্যবস্থার মধ্যেও যেন এক জীবন্ত ছন্দ।
গরমের ভেতরেও বাতাসে মিশে থাকে ভাজা চপ, পেঁয়াজুর গন্ধ।স্কুল ছুটির পর বাচ্চারা ব্যাগ হাতে ছুটে যাচ্ছে,অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষ ভিড় করছে বাসস্ট্যান্ডে।কেউ হাতে চা,কেউ ফোনে কথা বলছে, আবার কেউবা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে যানজটে আটকে থাকা গাড়ির সারির দিকে।
পথের ধারে ছেলেরা বাদাম বিক্রি করছে,অন্যদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি।ঢাকার বিকেল মানে অস্থির, ধুলোমাখা, তবু আশ্চর্যভাবে জীবন্ত;যেন শহরটা একটু হাঁপিয়ে নিয়েও আবার নতুন করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে আগামী দিনের ভোরের জন্য।
তাহসিন মেয়েকে কোলে নিয়ে ময়ূরীকে পাশে নিয়ে হাঁটছে।পেছনে হিমি আর আদনান ঝগড়া করছে এক তালে।ময়ূরী একবার পিছু ফিরে তাকালো।আদনান জোর করে হিমির এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।হিমি ছাড়াতে পারছে না বলে দাঁত চিবিয়ে বলল,

“হারামি হাত ছাড় নাহলে তোর খবর আছে।এই রাস্তার মধ্যে তোর ইজ্জত সাবান ছাড়া ধুয়ে ফেলব।”
“ডার্লিং এত পাষাণ কেন তুমি?এত ভালোবাসি তবুও কেন কাছে আসো না?”
হিমি বিরক্ত হয়ে তাহসিনকে ডেকে উঠল,
“তাহসিন ওকে দূরে যেতে বল?আমার কিন্তু মাথা গরম হচ্ছে।তেল ছাড়া ওর ডিম ভাজব আমি বলে দিলাম।”
আদনান এবার সত্যি সত্যি ওর হাত ছেড়ে দিয়ে দুরত্ব রেখে দাঁড়াল।তাহসিন পিছু ঘুরে দাঁড়িয়ে একবার আদনানের দিকে তাকিয়ে হিমিকে বলল,
“তোরা কী এখনো ছোট বাচ্চা?এই ভরা রাস্তার মধ্যে ঝগড়া করছিস কেন?”
আদনান মুখ কালো করে বলল,
“মানলাম আমার বয়সটা তোদের থেকে একটু কম তাই বলে আমি তো নাদান শিশু নই।এই জাউরা আমার প্রেমের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বলে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম,তাও শালী রাজী হয় না।এখন তুই’ই বল আমার বিয়ের বয়স পাড় হয়ে যাচ্ছে না?বাচ্চা কাচ্চারও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি?”
হিমি ঠাস করে আদনানের পিঠে একটা ঘুষি মেরে দাঁত কটমট করে বলল,
“দুনিয়ায় মেয়েরা অভাব পড়েছে?তোর কত বড় সাহস তুই আমার পেছনে পড়েছিস।জেলের ভাত খাওয়াব তোকে এখন?”

আদনান রাগ করে আর হিমির সাথে কথাই বলল না।সে তাহসিনের কোল থেকে পুতুলকে নামিয়ে সামনে হাঁটা ধরলো।তারা বের হয়েছে কিছু কেনা-কাটা করতে।সামনে শুক্রবারে তারা বগুড়া যাচ্ছে।এবার হয়তো লম্বা একটা সময় সেখানে থাকা হবে।ময়ূরীকে এখনো তেমন কিছু দেয়া হয়নি।বোরহান সওদাগর চেয়েছিলেন দিতে তবে তাহসিন মানা করেছে।তার বউকে সে নিজের টাকা দিয়ে সব কিনে দিবে বলে বোরহান সওদাগর আর মানা করেননি।তাহসিন ময়ূরীর প্রয়োজনীয় সব কিছুই কিনে দিলো।সাথে মেয়ের জন্যও কিছু নিলো।এবার পুতুলকে সে সাথে নিয়ে যাবে।হিমি যেহেতু তার সাথে যাবে সেই ক্ষেত্রে পুতুলকে নিয়েই যেতে হবে।
তারা বাসায় ফিরল রাতে।বাইরে থেকে রাতের খাবার নিয়ে এলো।হিমি নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেছে।আদনান ওয়াশরুমে গেছে ফ্রেশ হতে।পুতুল ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছে।
ময়ূরী চুপচাপ বসে ছিল পুতুলের পাশে।হঠাৎ তাহসিন এসে তার পাশে বসতেই কিছুটা চমকে উঠল সে।

কিশোরী কন্যা পর্ব ৫

“ভয় পেয়েছো?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে না বলল।তারপর জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কিসের চাকরি করেন?”
তাহসিন শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ব্যাংক-এর সিনিয়র অফিসার।”
“ওহ,আপনি যে বললেন দুদিন পরেই গ্রামে যাবেন?আপনার চাকরি থাকবে?”
“এসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।তোমাকে তোমার স্বামী ভালো রাখলেই তো হলো?এবার যাও ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো।”

কিশোরী কন্যা পর্ব ৭