কিশোরী কন্যা পর্ব ৯
হামিদা আক্তার ইভা
যোহরের নামাজ শেষে খাওয়ার আয়োজন শুরু হলো।বক্কর ফরাজীও এসেছেন।তিনি গ্রামের মানুষদের সাথেই এসেছিলেন,কিন্তু মেম্বার বাড়ির সামনে এসে দেখা মিলল তাহসিনের সাথে।তাহসিন শ্বশুরকে দেখে সালাম দিয়ে বলল,
“ভালো আছেন আব্বা?”
বক্কর হেসে সালামের উত্তর নিয়ে বললেন,
“আছি,আল্লাহ ভালো রেখেছেন।তুমি ভালো আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“ময়ূরী কেমন আছে বাবা?”
“ভালো আছে আব্বা।”
“মেয়েটাকে নিয়ে আর তো আমার বাড়ি আসলে না।ওর মা ওকে একবার দেখতে চাইছে।”
“আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম,ভাবছিলাম একবার আপনার বাড়ি গিয়ে দেখা করে আসবো।”
“ঢাকা কবে গিয়েছিল?”
“সপ্তা খানিক আগে।অফিসের কাজে যেতে হয়েছিল,আর পুতুলকেও নিয়ে এসেছি।”
বক্কর খুশি হলেন পুতুলের কথা শুনে।তিনি বললেন,
“একবার ওদের নিয়ে বাড়িতে এসো।”
তাহসিন শ্বশুরকে নিয়ে আগে অন্যপাশে গিয়ে একই টেবিলে বসল।সওদাগর বাড়ির মানুষও সেখানে উপস্থিত।বোরহান সওদাগর বক্করকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন।সবার সাথেই কথা হলো তার।খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে ৩টা বেজে গেছে তাদের।
বক্কর চলে গেছেন।সওদাগর বাড়ির সবাই মেম্বার বাড়ির ভেতরে বড় উঠোনে চেয়ার পেতে বসেছেন।উঠোন জুড়ে নেতা দিয়ে ভরপুর।মাহতাব এবং বোরহান সওদাগর তাদের সাথেই আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত।তাহসিন ঠোঁট কামড়ে কপালে ভাঁজ ফেলে মেম্বার বাড়ির চারপাশে চোখ বুলাচ্ছে।বেশ বড় বাড়ি।চারপাশে ঘেরাও করা দালান ঘর,আর মধ্যে বড় উঠোন।
রাজু উঠোনে বসে মোবাইলে কারও সঙ্গে গম্ভীরভাবে কথা বলছিল।চেয়ারের কোণায় বসে থাকা কিছু তরুণ তার কথায় মাথা নাড়ছিল,কেউ কেউ নোট নিচ্ছিল।
তাহসিনের চোখে পড়ল এই ছেলেগুলো গ্রামের পুরোনো মুখ।ওদের গায়ে রাজুদের দলের প্রতীকের ছাপানো টি-শার্ট।
বোরহান সওদাগর পাশে বসা মাহতাবকে বলছিলেন,
“এই রাজু এখন গ্রামের সব উন্নয়নের কাজের দায়িত্ব নিয়েছে।ব্রিজ, রাস্তা, স্কুল সব কিছুতেই হাত দিচ্ছে।”
মাহতাব মৃদু হেসে উত্তর দিলো,
“রাজনীতি মানেই এখন প্রভাব।যার প্রভাব বেশি, তারই দৌড় সবচেয়ে দীর্ঘ।বেশ ভালো,এখন থেকেই শিখে রাখছে।”
তাহসিন চুপচাপ শুনছিল।চোখে একধরনের বিরক্তি জমেছে।সে জানে,উন্নয়নের নামেই চলছে অন্য খেলা।বেশ কিছু সরকারি টাকা আসছে গ্রামের নামে, কিন্তু তা কোনো কাজেই লাগছে না।
রাজু সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমাদের গ্রাম এখন উন্নয়নের পথে! মেম্বার সাহেবের সহযোগিতায় আমরা আগামী মাসে উত্তর পাড়ার ব্রীজের কাজ শুরু করব।”
তাহসিনের চোখ পড়ল কোণে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ কৃষকের দিকে, যার চোখে পানি।লোকটা ফিসফিস করে পাশেরজনকে বলছেন,
“আমাগো খেতের রাস্তা বন্ধ কইরা ওইখানে ব্রীজ বানাইব,উন্নয়ন না,সর্বনাশ হইব।”
তাহসিন উঠে উনাদের কাছে গেলো।নিচু গলায় বলল,
“ব্রীজটা কোন খালের উপর পড়ছে?”
বৃদ্ধ বললেন,
“খাল না বাবা,আমাগো জমির মাঝখান দিয়া।মাটি কাইট্টা নিয়া গেছে মেম্বারের লোকজন।বলে উন্নয়নের কাজ।”
“জমির বিনিময়ে আপনাকে টাকা দেয়া হয়েছে?”
“না,উল্টা পুলিশের ভয় দেখাইছে।”
মাহতাব দূর থেকে ডেকে বলল,
“তাহসিন, এইদিকে আয়!”
তাহসিন ফিরে তাকিয়ে দেখল রাজু ও মাহতাব হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।রাজু বলল,
“আপনাকেও কাজের কমিটিতে রাখব ভাবতেছি ভাই।আপনার মতো শিক্ষিত মানুষ থাকলে সবাই ভরসা পাবে।”
তাহসিন শান্ত গলায় বলল,
“মানুষের ভরসা বিশ্বাসে হয়,ভয় দেখিয়ে না।”
রাজু কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল,
“ভয়? না ভাই, এখনকার রাজনীতিতে একটু শক্ত হাত না থাকলে সমস্যা।”
“নেতা তুমি নাকি তোমার বাবা?”
রাজুর মুখ চুপসে গেলো।তাহসিন মুখ ফিরিয়ে নিল।
বিকেল হয়ে গেছে আলোচনা শেষ হতে হতে।মেম্বার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সওদাগর বাড়ির মানুষ।মাহতাবের কাজ আছে একটু পৌরসভায়।তাই সে নিজের ছেলেদের নিয়ে সেদিকে চলে গেছে।কাঁচা সরু রাস্তা ধরে হাঁটছেন সবাই।রমজান সওদাগর হঠাৎ করেই তাহসিনকে প্রশ্ন করলেন,
“কতদিনের ছুটিতে আসছিস?”
তাহসিন বলল,
“আছি বেশ কয়েকদিন।”
“আর আদনান?”
আদনান শুকনো ঢোক গিলে তাহসিনের পেটে খোঁচা মারল।তাহসিন চোখ রাঙিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওর চাকরি নেই।আপতত বেকার পুরুষ।”
“চাকরি নেই মানে?”
“এই বেতনে ওর পকেট গরম হয় না,তাই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।কিছুদিন রেস্ট নিয়ে অন্য কিছু ভাববে।”
আদনান কটমট করে তাকালো তাহসিনের দিকে।ভাব খানা এমন যেন পারলে তাহসিনের গলা চেপে ধরে।
তাদের বাড়ি ফিরতে কিছুটা সময় লাগল বটে।বাড়ির ড্রয়িংরুমে মহিলারা ছিলেন জড়ো হয়ে।বাড়িতে সজিব এসেছে ময়ূরীর সাথে দেখা করতে।সজিব বসে ছিলো সোফায়,অন্যপাশে রজনী বেগম।বাড়িতে তাহসিনরা ঢুকতেই সজিব উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো তাদের।বোরহান সওদাগর গিয়ে বসলেন সজিবের পাশে।তাহসিন আড়চোখে ময়ূরীর দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বসলো সেখানে।
“আপনাকে তো চিনলাম না?”
তাহসিনের কথায় বোরহান সওদাগর বললেন,
“এই গ্রামের ছেলেই,ময়ূরীর স্কুলের স্যার।”
সজিব মুচকি হেসে তাহসিনকে উদ্দেশ্য করে শুধোয়,
“আমি ময়ূরীকে অংক পড়াতাম।সপ্তা খানিক আগে জানতে পারি তার বিয়ে হয়েছে আপনার সাথে।চাচার কাছে পড়ার ব্যপারে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেন ময়ূরী পড়বে।আমি এর আগেও এসেছিলাম এই বাড়ি,তবে আপনাদের কাউকে পাইনি আমি।”
রজনী বেগম হঠাৎ করেই বলে বসলেন,
“এখন আর পইড়া কী করব?বিয়া হইছে সংসারে মন দিক।পড়াশোনা কইরা কাম নাই।”
ময়ূরী ভ্রু কুঁচকে দাদি শাশুড়ির কথা শুনলো।আজব ব্যাপার,তার মুখের উপর একটা মানুষও প্রতিবাদ করছে না।
তাহসিন দাদির কথা শুনে বলল,
“আমি আমার স্ত্রীকে পড়াব নাকি পড়াব না এটা আমার ব্যাপার দাদি।বেয়াদবি মাফ করবেন,ময়ূরী পড়বে এবং ভবিষ্যতে নিজের পায়েও দাঁড়াবে।আমি চাই আমার স্ত্রী শিক্ষিত হোক।সে কেন আমার উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাবে?তার নিজের একটা জীবন আছে,শখ আছে।আমি চাইলেই তার শখ,ইচ্ছে,স্বাধীনতা নষ্ট করতে পারি না।”
“এত পইড়া কী হইব?সেই দিন শেষে বাচ্চা কাচ্চা মানুষ করতেই জীবন যাইব।”
“পৃথিবীতে আর কোনো নারী নেই,যে শিক্ষিত হয়ে সংসার সামলিয়েছে?দরকার হলে সংসার আমি দেখব তবুও সে পড়বে।”
ময়ূরী অবাক চোখে তাকিয়ে রইল লোকটার দিকে।সে ভাবতেও পারেনি তাহসিন তার পক্ষ নিয়ে কথা বলবে।রজনী বেগম ক্ষিপ্ত হলেন নাতির উপর।তাহসিন সেসবে মন না দিয়ে সজিবকে বলল,
“ওর পরীক্ষা সামনে,আমি চাই সে ভালো রেজাল্ট করুক।তুমি কাল থেকে ওকে পড়াতে এসো।”
সজিব মাথা নাড়ে।সে বিদায় জানিয়ে বাড়ি থেকে যাওয়ার পর রজনী বেগম বললেন,
“পড়াইবা ভালো কথা,তাই কী তুমি বউরে প্রত্যেকদিন স্কুলে পাঠাইতে চাও?”
তাহসিন এবার ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে দাদির উপর।এক কথা একটা মানুষকে কতবার বুঝাতে হয়?দাদাই বা কেন আজ চুপ করে আছেন?তিনি বিয়ের দিনও বলেছিলেন ময়ূরীকে পড়াবেন,তাহলে আজ কিছু বলছেন না কেন?তাহসিন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।বাইরে থেকে সন্ধ্যার আযানের শব্দ ভেসে আসছে।সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,
“আপনি কী চাইছেন?”
“পড়লে পড়ুক,কিন্তু বাড়ির বাইরে যাইতে পারব না।পরীক্ষার সময় নাহয় শুধু পরীক্ষা দিয়া আইবো।”
“বাইরে গেলে কী সমস্যা?”
“বাড়ির বউ বাইরে যাইব ওইডা আমার পছন্দ না।”
তাহসিন ময়ূরীর দিকে তাকালো।ময়ূরী তাহসিনের দৃষ্টি বুঝে বলল,
“আমার কোনো সমস্যা নেই।আমি বাড়ির বাইরে যাব না।”
তাহসিন আর অমত করল না।পড়াশোনা ঠিক থাকলেই হলো।
খুব বেশি রাত হয়নি।৯-১০টার মতো বাজে হয়তো!হিমি চেয়ারম্যান বাড়ির ছাদে বসে ছিল একা।আকাশে আজ রূপালী চাঁদ উঠেছে।জীবন বড্ড কঠিন।মানুষ বাইরে থেকে দেখে ভাবে এমন সুখের জীবন সবার কেন হয় না?আদৌ মানুষ বোঝে,সবার জীবনেই একটা না একটা লুকায়িত দুঃখ থাকে।হিমির ক্ষেত্রেও তাই।বয়স হবে ২৮ এর কাছাকাছি।এখনো বিয়ে হয়নি বলে কত মানুষের কত কথা শুনতে হয়।
আদনান সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে এলো।আপছা আলোয় দেখল হিমি ছাদের এক কোণায় চুপটি করে বসে আছে কাঠের চেয়ারে।সে এগিয়ে গেলো।পাশের চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।হিমি আড়চোখে আদনানকে দেখে বলল,
“ছাদে কী করেছিস?”
“তোকে দেখতে এলাম।”
“আমি তোর বড়,আপু বলে ডাক।”
আদনান হাসল।ঘাড় চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে বলল,
“কেন বারেবারে ফিরিয়ে দিচ্ছিস?পুরুষ হিসেবে আমি এতই খারাপ?”
“খারাপ নয়,বেমানান।”
“তাই সই।”
“ভুল সিদ্ধান্ত।”
“তাও কবুল।”
“চাইলেই সব হয় না আদনান।”
আদনান সোজা হয়ে বসল।হিমির চোখে চোখ রেখে বলল,
“এত সমাজের ভয় কেন?আমি ভালোবাসি এইটুকুই যথেষ্ট নয়?”
“আমি তো ভালোবাসি না।”
“তোর চোখ তো অন্য কথা বলে।”
আদনান মেঝেতে বসল।হিমির হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল,
“আমি ভীষণ অগোছালো একটা মানুষ।এই ছন্নছাড়া জীবনে তোকে ভীষণ দরকার আমার।তুই বিশ্বাস কর?আমার এই প্রাণ থাকতে জীবনেও তোর হাত ছাড়ব না।শুধু..শুধু একটাবার বিশ্বাস করে আমার হাতটা ধর?”
হিমির গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।দৃষ্টি নামিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“একটা সময় এই সিদ্ধান্তটাই কাল হয়ে দাঁড়াবে।ছাড়,নিচে যাব আমি।”
পরেরদিন সকাল বেলা তাহসিন ময়ূরিকে নিয়ে ফরাজী বাড়ি এলো।কোলে আছে ছোট্ট পুতুল।উঠোনে এসে হাজির হতেই বাড়ির ভেতর থেকে ফাহাদ দৌঁড়ে এসে ময়ূরীকে জড়িয়ে ধরলো।ময়ূরী নিচু হয়ে ভাই কোলে নিয়ে গালে বেশ কয়েকটা চুমু খেয়ে বলল,
“ভাই,কেমন আছিস?”
ফাহাদ বোনকে পেয়ে কেঁদে উঠল।পুতুল বাবার কোল থেকে চোখ ছোট ছোট করে মামার দিকে তাকিয়ে রইল।সে বাবার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“বাবা,ওই বাবু কাঁদে কেন?”
তাহসিন বলে,
“সে আপনার মামা হয় আম্মা।মামা বলে ডাকবেন কেমন?”
পুতুল মাথা নাড়ায়।মধু,ফিরোজা বেগম পুকুরের পাশ থেকে এসেই বাড়িতে জামাই আর মেয়েকে দেখে ভীষণ খুশি হলেন।তিনি এগিয়ে আসতেই তাহসিন বলল,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম আম্মা।ভালো আছেন?”
“খুব ভালো আছি বাবা।তোমরা কখন আসলা?”
“মাত্রই।”
তিনি ময়ূরীর দিকে করুণ চোখে তাকালেন।মেয়েটা মায়ের দিকে একবারও তাকায়নি।মধু বলল,
“ময়ূরী?কেমন আছিস?”
ময়ূরী ছোট করে বলল,
“ভালো।”
তাহসিন হালকা গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আব্বা কোথায়?তিনি বাড়িতে নেই?”
ফিরোজা বেগম বললেন বক্কর একটু বাজারে গেছেন তেল আনতে।তারপর তাদের ঘরে নিয়ে গেলেন বিশ্রাম নেয়ার জন্য।মধু সরবত বানাতে ব্যস্ত।পুতুল বাবার শরীর ঘেঁষে বসে আছে পাশে।ফাহাদ ময়ূরীর বুকে লেপ্টে আছে দেখে তার ভীষণ রাগ হচ্ছে।মায়ের কোলে অন্য একটা বাবুকে দেখে যেন রাগে শরীর কাঁপছে তার।সে চোখ রাঙিয়ে ফাহাদের দিকে তাকালো।ফাহাদ ঠোঁট উল্টে কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ময়ূরী চুপচাপ বসে ছিল পাশে।হঠাৎ তাহসিন হাত বাড়িয়ে কপালের সামনে চলে আসা চুল গুলো কানের কাছে গুঁজে দিয়ে বলল,
“এখনো রেগে আছো?বিয়ে তো হয়েই গেছে,রেগে থাকলেই কী সব ঠিক হয়ে যাবে?আম্মার সাথে কথা কেন বললে না?”
“ইচ্ছে করছিল না।”
“দোষ তো তোমার বাবা কিংবা মায়ের নয়।দোষ করলে আমার দাদা এবং আমি করেছি।তাহলে তোমার বাবা মাকে কষ্ট দিচ্ছো কেন?”
ময়ূরীর কিশোরী মন যেন যুদ্ধ করতে ব্যস্ত।আসলেই তো তাই!বাবা তো তাকে বিয়ে দিতে চায়নি,উল্টো বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল বলে প্রতিবাদ করেছিলেন।
সে মাথা নত করল।
“ক্ষমা চাওয়া উচিত আমার।”
“গুড,নিজের ভুল বুঝতে পেরেছো এটাই অনেক।”
পুতুল তাহসিনের থেকে সরে গিয়ে একটু একটু করে ময়ূরীর কাছে এগিয়ে এলো।ময়ূরীর একহাত বুকে চেপে ধরে বলল,
“তুমি ওকে কোলে নিয়েছো কেন?ওকে নামাও।”
ফাহাদ ঠোঁট উল্টে চোখ পাকিয়ে বলল,
“আমার আপা আমি যামু না।”
পুতুল ফাহাদকে টেনে ধরে ময়ূরীর কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে ময়ূরীকে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ রেখে বলল,
“এটা আমার মা।”
ফাহাদ কেঁদে উঠল।তাহসিন ও ময়ূরী দুজনেই হতভম্ব।ফাহাদ পুতুলের জামা ধরে টানছে তাকে ময়ূরীর থেকে ছাড়ানোর জন্য।অথচ পুতুল এমন ভাবে জড়িয়ে ধরেছে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।তাহসিন তাড়াতাড়ি ফাহাদকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“শালাবাবু ঝগড়া করো কেন?”
ফাহাদ রাগ দেখিয়ে বলল,
“ঝুগড়া কুরি না।আপার কুলে উটছে কেন?”
“তুমিও তো উঠেছিলে।”
“তাই কী?”
“তুমি উঠতে পারলে সে কেন উঠতে পারবে না?”
ফাহাদ রেগে আর কথাই বলল না।গাল ফুলিয়ে ময়ূরীর দিকে তাকিয়ে রইল।ময়ূরীর বুক ধুকপুক করছে।পুতুল তাকে কেমন করে মা বলে ডাকল।কী মিষ্টি সম্বোধন।সে পুতুলের পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,
“ছাড়ো আমায়?”
পুতুল বলল,
“তুমি ওই ছেলেকে কোলে নিবে না।”
“সে আমার ভাই হয়,মানে তোমার মামা।”
“আমি কিছু জানি না।”
তাহসিন ঠোঁট কামড়ে হাসল।
বক্কর ফিরলেন আধ ঘণ্টা পর।তাহসিনদের দেখে ভীষণ খুশি হলেন।ময়ূরীও আজ আর রাগ দেখাল না।বরং সব ভুলে মা বাবার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলল।আজ তারা এই বাড়ি থাকবে।রাতের রান্না যখন চুলায় তখন ময়ূরী মধুর সাথে পুকুর পাড়ে বসে।চারপাশ অন্ধকার,শুধু ঘরের লাইট থেকে আপছা আলোয় আলোকিত ওইটুকু।
“তুই এখনো রাজু ভাইয়ের সাথে কথা বলিস আপা?”
মধু বলল,
“বললেই বা কী?”
ময়ূরীর বড্ড খারাপ লাগল বোনের কথা শুনে।বোন যে কেন বুঝতে চাইছে না।
আজ থেকে প্রায় কয়েক মাস আগের ঘটনা।মেম্বার বাড়ি থেকে তাদের স্কুল কিছুটা কাছে।শীতের সময় ছিল।বিকেল বেলা স্কুল ছুটির পর শবনম আর সে ফিরছিল বাড়ির পথে।রাজু বাইক নিয়ে নিজের ছেলেদের নিয়ে মাঠের পাশে আড্ডা দিচ্ছিল।রাজু শবনমকে খুব খারাপ ভাষায় বাজে কথা বলেছিল।মেয়েটা বাড়ি ফিরে খুব কেঁদেছিল,ভয়ে কাউকে বলতে পারেনি রাজুর কথা।শুধু এখানেই শেষ নয়,তার কিছুদিন পর শুনতে পারে স্কুলের অনেক মেয়েদেরই সে বিরক্ত করে।রাজনীতির লোক বলে কেও সাহস পায় না কিছু বলার।তবে আজ ময়ূরীর মনে হচ্ছে রাজুকে সামনে পেলে ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মারতেও তার বিবেক বাঁধা দিবে না।
মধুকে মা ডাকছেন বলে সে উঠে চলে গেলো।খানিকক্ষণ পর সেখানে তাহসিন এলো ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে।গায়ে ধূসর রঙা একটা টি-শার্ট।সে এগিয়ে এসে দোলনায় ময়ূরীর পাশে বসতেই মেয়েটা চমকে উঠল।ভীতু কণ্ঠে বলল,
“এভাবে কেও আসে?”
“আমি আসি।”
ময়ূরী দোলন থেকে উঠতে চাইলে তাহসিন আঁটকে দেয় তাকে।হাত টেনে পাশে বসিয়ে বলে,
“এত পালাই পালাই করছো কেন?ভয় পাচ্ছো আমাকে?”
“আপনাকে ভয় পাব কেন?”
তাহসিন দুষ্টু হেসে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসায় ফেঁসে যাবে বলে।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ৮
“আমি ছোট মানুষ,এত কিছু বুঝি না।আপনি’ই বলুন?কখন বুঝতে পারব আপনাকে আমি ভালোবাসি?”
তাহসিন মুচকি হাসল।আড়চোখে ময়ূরীর কিশোরীর বদন দেখে পুকুরে দৃষ্টি রেখে বলল,
“ভালোবাসা মানে শুধু মুখে “ভালোবাসি” নয়।ভালোবাসা অনুভব করার জিনিস।যখন আমাকে একপলক দেখার জন্য তোমার মন ব্যাকুল হবে,আমার বুকে মাথা রেখে জীবন পাড়ি দিতে ইচ্ছে করবে,যখন মনে হবে আমিবিহীন তোমার জীবনে অন্য কোনো পুরুষের অস্তিত্ব নেই তখন বুঝবে তুমি আমায় ভালোবাসো।”
