Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৮

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৮

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৮
লামিয়া রহমান মেঘলা

“Did he touch you anywhere?
Tell me honestly, Serin.”
অন্ধকারে ডুবে থাকা রুমটিতে কেবল মৃদু ড্রিমলাইটের আবছা আলো ছড়িয়ে আছে। আলো আর ছায়ার মিশেলে চারপাশ যেন আরও রহস্যময়, আরও ভারী হয়ে উঠেছে। নিস্তব্ধতার মাঝেও বাতাসে জমে আছে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা।
সেরিনের শরীর জুড়ে কায়ানের হাতের বিস্তার। উষ্ণ দেহে তার শীতল স্পর্শ লাগতেই সেরিন ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। তার ঠোঁট অনবরত কাঁপছে, নিঃশ্বাসগুলো এলোমেলো হয়ে আসছে।

মৃদু আলোয় কায়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কম্পিত রমনির দিকে। তার উপরের শরীর অনাবৃত, প্রশস্ত কাঁধ আর দৃঢ় গঠনের শরীর অন্ধকারেও ভয়ংকর আকর্ষণ ছড়াচ্ছে। গাড় কালো চোখ দুটো গভীর, তীক্ষ্ণ, যেন একবার তাকালেই মানুষের অন্তর ভেদ করে ফেলতে পারে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো কুঞ্চিত কালো চুলগুলো বারবার কপাল ছুঁয়ে চোখের ওপর এসে পড়ছে। আলোছায়ার খেলায় তাকে অসম্ভব সুদর্শন, অথচ একই সঙ্গে বিপজ্জনক লাগছে। এমন এক পুরুষ, যার সৌন্দর্যের ভেতরেও লুকিয়ে আছে দখলদারির নির্মম ঘোষণা।
কিন্তু সেরিনের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।
সে শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রেখেছে, যেন চোখ খুললেই বাস্তবতা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।
কায়ান সামান্য নিচু হয়ে সেরিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

“Open your eyes, Serin.”
তবুও সেরিন চোখ খুলল না।
তখন কায়ান এমন এক কাজ করল, যাতে সেরিন হঠাৎই তাকাতে বাধ্য হলো।
সেরিন তার হাত সরাতে চাইতেই কায়ান তড়িৎ গতিতে নিজের এক হাতের নিচে সেরিনের দুটো হাত চেপে ধরল। তার কণ্ঠ এবার আরও ভারী, আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“Answer me, damn. Did he touch you anywhere?”
সেরিনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“ন না, ক কোথাও ছুঁই নি আমাকে। বিশ্বাস করুন আমাকে।”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কায়ানের বুকের ভেতর জমে থাকা দহন সামান্য শান্ত হলো।
সে নিচু হয়ে সেরিনের ওষ্ঠের ওপর নিজের অধিকার স্থাপন করল। সেরিনও ধীরে চোখ বন্ধ করে নিল। তার চোখের কোণ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল বালিশে।
কায়ান বাম হাতের আঙুলে সেই অশ্রুবিন্দু ছুঁয়ে দিল।
তারপর কপাল ঠেকাল সেরিনের কপালে।
কণ্ঠ নিচু, অথচ ভয়ংকরভাবে স্থির।

“কথাটা মনে রেখো, Serin, তোমার মাথা থেকে ঝরে পড়া একটি সামান্য চুলের অধিকারও কেবলমাত্র আমার।”
সেরিন কোনো উত্তর দিল না।
কায়ান ধীরে ধীরে সেরিনের হাত দুটো ছেড়ে দিল। এক মুহূর্তের জন্য সেরিনের মনে হলো, এটাই বুঝি তার মুক্তি।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই ভাবনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কায়ান পাশের টেবিলের ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে একটি লোহার ধাতব বস্তু বের করল। মৃদু আলোয় সেটি স্পষ্ট বোঝা গেল না, তবে ধাতব বস্তুর টুনটুন শব্দ সেরিনের বুকের ভেতর অকারণ আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল।
বাইরে সমুদ্র উত্তাল। একের পর এক ঢেউ তটে আছড়ে পড়ছে। তার সঙ্গে ঝরছে অবিরাম বৃষ্টি। জানালার কাচ বেয়ে নেমে আসা জলের রেখাগুলো যেন রাতটাকে আরও ভারী, আরও গভীর করে তুলেছে।
কায়ান একটি শব্দও বলল না।
নিঃশব্দে সে সেরিনের হাত দুটো বিছানার সঙ্গে লক করে দিল।
সেরিন ঘাবড়ে গেল। তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসে বুক ওঠানামা করছে।
কায়ান নিচু হয়ে সেরিনের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। তার গরম নিঃশ্বাস সেরিনের ত্বকে কাঁপন তুলল।
নিম্ন, ভারী কণ্ঠে সে বলল,

“It’s your punishment, jaan, I am not making love with you.”
সেরিন এরপর আর কিছু বলার সুযোগ পেল না।
কায়ানের তীব্র উপস্থিতি, তার দখলদার নৈকট্য, তার অদম্য আধিপত্য ধীরে ধীরে সেরিনকে ঘিরে ফেলল।
বাইরে ঝড়, বৃষ্টি আর সমুদ্রের গর্জন যেন ভেতরের অস্থিরতার প্রতিধ্বনি হয়ে উঠল।
কায়ান ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বের ছাপ রেখে গেল সেরিনের সমস্ত অনুভূতিতে। প্রতিটি মুহূর্তে সেরিন ব্যথা, ভয়, টান আর অদ্ভুত এক আবেগের ঘূর্ণিতে কুঁকড়ে উঠল।
রাতটা যেন ভালোবাসা আর অন্ধকারের মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল।
এক ভালোবাসা, যা কোমল নয়।
এক অধিকার, যা প্রশ্ন করে না।
শুধু নিজের অস্তিত্ব জানিয়ে দেয়।

সিকদার নিবাস
রাত ১০টা।
আজ নিজের রুমের টিভি না দেখে লিভিং রুমের টিভিটাই চালু করেছে জেবরান। সিকদার বাড়ির সবার রাতের খাবার শেষ হয়েছে বেশ আগেই। সকাল থেকে আবহাওয়া ছিল বেশ মনোরম, প্রশান্ত। তবে সন্ধ্যা নামার পর হঠাৎ করেই আকাশের মুখ ভার হয়ে আসে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় টুপটাপ বৃষ্টি। এখন বাইরের নীরবতা ভেঙে শুধু বৃষ্টির ছন্দময় শব্দ ভেসে আসছে।
জেবরান রিমোট হাতে একের পর এক চ্যানেল বদলাচ্ছিল। কখনো বিনোদন, কখনো খেলাধুলা, আবার কখনো পুরোনো কোনো সিনেমার দৃশ্যে চোখ আটকে যাচ্ছিল তার। এমন সময় চ্যানেল বদলাতে বদলাতে হঠাৎ নিউজ চ্যানেলে গিয়ে থামল সে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি ব্রেকিং নিউজ।
এমপির ছেলে জাকির নিখোঁজ।
নিউজটি দেখেই বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে গেল জেবরানের।
এ তো চট্টগ্রামের এমপি।
সদ্য আসনপ্রাপ্ত দলের এক প্রভাবশালী নেতার ছেলে গুম হয়ে গেছে।
বিষয়টি জেবরানকে ভীষণ অবাক করল। এমন ঘটনা সহজে হজম করার মতো নয়।
ঠিক তখনই শিমুল এক গ্লাস পানি হাতে জেবরানের দিকে এগিয়ে আসছিল। টিভির স্ক্রিনে নিউজটি চোখে পড়তেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। মুখের রক্ত মুহূর্তে সরে গেল। ভয় আর শঙ্কায় তার হাত কেঁপে উঠল।

পরের মুহূর্তেই গ্লাসটি হাত ফসকে ফ্লোরে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কাচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দে জেবরান দ্রুত পেছনে ফিরে তাকাল।
শিমুলকে সেই অবস্থায় দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
“শিমুল, কি হয়েছে?”
জেবরানের ডাকে শিমুলের সম্বিত ফিরল। সে আমতা আমতা করে বলল,
“ন না, কিছু না।”
জেবরান সন্দিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকাল।
“খারাপ লাগছে? রুমে যাবে?”
শিমুল জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“ন না, আসলে কি বলব। মাথাটা হঠাৎ ঘুরিয়ে উঠল।”
জেবরান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ওহো শিমুল, এত স্ট্রেস কেন নাও তুমি? বাচ্চাদের সামলাতে সামলাতে খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ো তুমি। যাও, রেস্ট করো।”
শিমুল নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তারপর ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটতে লাগল।
জেবরান আবার সোফায় বসে উর্মিকে ডাকল।

“উর্মি।”
কিচেন থেকে বেরিয়ে এল উর্মি।
“জি স্যার?”
“কাচটা পরিষ্কার করে ফেলো।”
উর্মি মাথা নাড়িয়ে ঝাড়ু আনতে গেল। ফিরে এসে কাচ পরিষ্কার করতে করতে টিভির নিউজটি তার কানেও পৌঁছাল।
নিউজের প্রতিটি শব্দ যেন তার শরীরের ভেতর অস্বস্তির শীতল স্রোত বইয়ে দিল।
সে দ্রুত হাত চালিয়ে কাচ পরিষ্কার শেষ করল। তারপর কোনো কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেল।
রুমে ঢুকেই দরজা জানালা বন্ধ করে দিল সে।
এরপর তড়িঘড়ি করে নিজের ফোন বের করে কাউকে কল করল।
একবার রিং হলো।
দুইবার।
তিনবার।

রিংয়ের পর রিং বাজতেই থাকল, কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না।
উর্মির কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো।
সে পরপর দশবার কল দিল।
তবুও কোনো সাড়া নেই।
বিরক্তি আর অস্থিরতায় সে বিছানায় বসে পড়ল।
“উফ, কি হলো লোকটার? ধরা পড়ে গেল নাত?”
কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
“তাহলেই তো সমস্যা। এবার কি করব আমি?”
উর্মির চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে, এই ঘটনার পেছনে তার অবদানও মোটেই কম নয়।
যেন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক নীরব খেলোয়াড়, যার চালেই হয়তো শুরু হয়েছে এই ভয়ংকর খেলা।

ক্লান্ত সেরিনেরকে নিজের উরুতে শুইয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে কায়ান।
সেরিনের মাথাটা তার বুকের একটু নিচে। সে ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আছন্ন।
তার বাম হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধীরে ধীরে টান দিচ্ছে সে, আর প্রতিবার ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছেড়ে দিচ্ছে উপরের দিকে। আবছা আলোয় সেই ধোঁয়াগুলো পাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে, যেন রাতের বুকেই হারিয়ে যাচ্ছে সব অস্থিরতা।
অন্য হাতে ধরা একটি আননোন নম্বর থেকে আসা ফোন।
ফোনটা একের পর এক বেজেই চলেছে।
কায়ান নির্বিকার মুখে সিগারেটে টান দিতে দিতে স্ক্রিনে ভেসে থাকা নাম্বারটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই, উদ্বেগও নেই। বরং সেই স্থির দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত এক শীতলতা, যেন ওপাশের মানুষটির অস্থিরতা তাকে সামান্যও স্পর্শ করতে পারছে না।
একটানা দশবার বেজে উঠল ফোনটি।
অবশেষে যখন কল থেমে গেল, কায়ান নিজের ফোন হাতে নিয়ে নম্বরটি হিমেলকে সেন্ড করে দিল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হিমেলের কল এলো।
কায়ান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে হিমেলের কণ্ঠ ভেসে এল।
“কিরে কায়ান, কোথায় তুই?”
কায়ান শান্ত, নিম্নস্বরে উত্তর দিল,

“Cox’s Bazar.”
হিমেল আবার জিজ্ঞেস করল,
“দেখেছিস নিউজ?”
কায়ানের ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“ভয় নেই, মারিনি। মারলে এতক্ষণে নিউজে জানিয়ে দিতাম।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর হিমেল হালকা বিরক্তি মেশানো স্বরে বলল,
“ভাই, তুই আসলেই পাগল।”
কায়ান সিগারেটে আরেকটি টান দিল।
“Not so.
যাই হোক, নাম্বারটা দিলাম। ট্রেস কর। কোথা থেকে কল হচ্ছে এবং নাম্বারের ওনার কে।”
“ওকে, করছি।”
কায়ান আবার বলল,
“আর শোন।”
“হ্যাঁ, বল।”
কিছু সেকেন্ড নীরব থেকে কায়ান এমন একটি প্রশ্ন করল, যাতে হিমেল একেবারে থমকে গেল।
“Baby conceive করার জন্য perfect time কোনটা?”
কথাটি শুনে হিমেল শব্দ করে হেসে উঠল।
কায়ান সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
তার গলায় বিরক্তির সুর।

“হাসির কি হলো?”
হিমেল হাসি থামানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“ভাই, নিজের জিনিসে বিশ্বাস রাখ। তোরটা যদি শক্তিশালী হয়, তবে এমনিই হয়ে যাবে।”
কায়ানের চোখ সামান্য সরু হয়ে এলো।
“তোর কি সন্দেহ আছে আমাকে নিয়ে?”
হিমেল তড়িঘড়ি করে বলল,
“না না ভাই, তোকে নিয়ে সন্দেহ? তা কি হয়!”
আর একটি শব্দও বলল না কায়ান।
নির্বিকার ভঙ্গিতে কল কেটে দিল।
ওপাশে হিমেল তখনও হাসতে হাসতে প্রায় শেষ।
তবুও হাসির আড়ালে সে আসল সত্যিটা ভালো করেই জানে।
কায়ান এমন প্রশ্ন হঠাৎ করে করে না।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৭

“ওদের গল্পটা সত্যিই জটিল।”
কথাটির সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল দুজন মানুষের অদ্ভুত সম্পর্কের জটিল সমীকরণ।
ভালোবাসা, অধিকার, রাগ, প্রতিশোধ, আকর্ষণ আর অস্বীকারের মিশেলে গড়া এক সম্পর্ক।
যেখানে অনুভূতির চেয়ে জটিল আর কিছু নেই।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৪৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here