চারুবৃত্ত পর্ব ১
জুলি জোনাকি
“লঙ্কা বাটা দিয়ে ভাত খাচ্ছ কেন ?ফ্রিজে কোন তরকারি নেই ?”
রাত তখন এগারোটা ছুইছুই, অন্ধকারে মধ্যেই ফোনে আলো জালিয়ে রান্না ঘরে বসে লঙ্কা বাটা দিয়ে ভাত খাচ্ছিল চারু । মুখ ভর্তি ভাত , ঠোট লালে টকটকা , চোখ দিয়ে পানি ও ঝরছে , অথচ পেটে ক্ষিদে । বাড়ির সবকাজ করতে গিয়ে রাত অনেক হয়ে গেছে । তাই লঙ্কা বাটা ছাড়া ভাত জুটবে না । গপগপ করে খাচ্ছিল খাবার এমন সময় কেউ পেছন থেকে লাইট ধরে কথাটা বলে উঠল । খাওয়া ফেলে উপরে তাকাল , একটা ছেলে তার দিকে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে । চারুকে চুপ থাকতে দেখে ফের বলল,
“লঙ্কা বাটা দিয়ে ভাত কেন খাচ্ছ ? ঠোট তো লাল হয়ে গেছে ।”
বলে পানি এনে এগিয়ে দিল । চারু তা খেল । চোখ দিয়ে যেন এখন আগুন বের হবে । চারুকে চুপ থাকতে দেখে বলল,
“নাম কি তোমার ?”
চারু ভয়ে জড়সর হয়ে বলল,
“চা চারু ।”
সেই পুরুষ টা ধীর কণ্ঠে বলল,
“লঙ্কা বাটা দিয়ে ভাত কেন খাচ্ছিলে ? ফ্রিজে তরকারি নেই ?”
“হ্যাঁ আছে ।?
“তাহলে ?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
কি বলবে চারু এখন । সে তো বলতে পারবে না যে রাত নয়টার পর এবাড়িতে ফ্রিজে তালা লাগানো থাকে । আর এটা তার রোজ রাতের খাবার । চারুকে ফের চুপ থাকতে দেখে ছেলেটা কিছু বলতে যাবে তখন ঘরের লাইট জ্বলে উঠলো । কেউ বলে উঠলো ,
“এই কে রে রান্না ঘরে ?”
চারু বুঝতে পারলো কে কথা বলছে । চারুকে এখন রান্না ঘরে খেতে দেখলে তো মহাবিপদ , কাল আর কলেজে যাওয়া হবে না । চারু রান্না ঘরে বসে পড়লো, ছেলেটা কেবল তাকিয়ে চারুর কাণ্ড দেখলো , তখন পেছন থেকে একটা মহিলা বলে উঠলো ,
“বৃত্ত, আব্বু তুই কখন এলি ?”
“মাত্রই আম্মু ।”
“ওখানে কি করছিস ?ক্ষিদে পেয়েছে? ”
বলে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে গেলে চারু ভয় পেয়ে যায় । বৃত্ত তা দেখলো , বুঝলো ভয় পেয়েছে ।তাই তার মাকে থামিয়ে দিয়ে বলর,
“আরে না , পানি খেতে এসেছিলাম । চলো উপরে যাই ।”
যেতে যেতে চারুর দিকে তাকাল । হাফ ছেড়ে বাঁচলো চারু । বুকে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিল । খাবার প্লেট টা নিয়ে তারাতারি ধুয়ে রাখলো । তার পর ঘরে চলে গেল ।
“কেমন আছিস বাবা , এতো রাতে হঠাৎ না বলে এলি যে ?”
শার্ট খুলতে খুলতে উত্তর দিল,
“একটা কলেজে চাকরির আবেদন করেছিলাম চাকরি টা হয়ে গেছে তাই চলে আসতে হলো ।”
“এটা তো ভালো খবর । তা কবে থেকে যাবি ?”
“কাল থেকে জয়েন করবো ।”
“ওহ আচ্ছা । কিছু খাবি বানিয়ে দিব ?”
“হ্যাঁ দাও , আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি ।”
“আচ্ছা তুই আয় ।”
নিচে গিয়ে চারুকে ডাক ছাড়লেন ,
“চারু এই চারু ?”
চারুর মা ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন আর চারু পাশে টেবিল ল্যাম্প জালিয়ে পরছিল । বাইরে থেকে ডাক কানে যেতেই বই খাতা বন্ধ করে বাইরে গেল , বাড়ির বেগম ডাকছেন । কাছে গিয়ে বলল,
“ডাকছিলেন কাকিমা ? ”
“হ্যাঁ ,আমার ছেলে এসেছে , যা কিছু বানিয়ে দে গরম গরম ।”
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল চারু । রান্না ঘরে গিয়ে বলল,
“কাকিমা ফ্রিজের চাবি ?”
“দাড়া আমি খুলে দিচ্ছি ।”
ফ্রিজ খুলে একটা ডিম বের করলো । অমলেট আর পরেটা বানিয়ে দিল । টেবিলে রাখতেই বৃত্ত এসে দাঁড়ালো । চারু চোখ তুলে তাকালো সে দিক । বৃত্ত কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল । তার মায়ের দিক তাকিয়ে বলল,
“তুমি খেয়েছ ?”
“হ্যা বাবা , তুই বসবি আয় । ”
বৃত্ত বসলো । বৃত্তর মা চারুকে বলল,
“আর একটা অমলেট বানিয়ে আন যা ।”
চারু রান্নাঘরে পা বাড়াতেই বৃত্ত তার মাকে প্রশ্ন করলো,
“ও কে মা ,আগে তো দেখিনি ?”
“আরে বুয়ার মেয়ে । বুয়া ওর জন্য আমার থেকে টাকা ধার নিয়ে আর ফেরত দিতে পারছিল না , কাজ ও তেমন করতে পারে না ভুলে যায় সব তাই ওর মেয়ে কে দিয়ে কাজ করিয়ে টাকা বুঝে নিচ্ছি । কিছু দিন হলো এসেছে । মা মেয়ে এখানেই থাকে । ”
বৃত্ত তাকাল খেয়ালির দিক । মেয়েটা এক মনে কাজ করে যাচ্ছে । এই মেয়েই তো একটু আগে লঙ্কা বাটা মেখে ভাত খাচ্ছিল ।
চারু এসে আরেকটা অমলেট প্লেটে তুলে দিল । বৃত্ত খেতে গিয়ে ফের একবার তাকাল । বৃত্তর মা বলল,
“এখন যা এখান থেকে । ”
চারু চলে গেল ।
বৃত্ত চার মাস পর ঢাকা থেকে আজ বাড়ি এলো । তারা এক ভাই দুই বোন । বাবা মাছের ব্যবসা করে । পড়াশোনা শেষ না হতেই একটা কলেজে চাকরির আবেদন করেছিল এতেই যেন কাজ হয়ে গেল । তাই বাড়ি ফিরে এলো ।
বৃত্ত খাওয়া শেষ করে ঘরে গেল । বিছানায় শুয়ে পরলো । চারু আবার পরতে বসলো । বাড়ির সব কাজ যেন তাকে আর তার মাকে করতে হয় । যখন চারু কলেজে যায় তখন তার মা এ বাড়ির সব কাজ করে । সামনে চারুর এইচএসসি পরীক্ষা অথচ পড়ার সময় টা পায় না । এ বাড়িতে যে কত্ত কাজ ,আজ তা বুজতে পারছে । চারুর যখন আট বছর তখন তার বাবা অন্য আরেক টা বিয়ে করে তাকে আর তার মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল । তখন চারুর মা এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করে তাদের পেট চালাত । চারু যখন ক্লাস নাইনে উঠলো তখন থেকে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের পড়িয়ে যে টাকা পেত তা দিয়ে তার পড়ার খরচ টা চালাত । এখন ও সময় পেলে কিছু বাচ্চাদের বাড়ি গিয়ে পড়িয়ে আসে , এতে তার পড়ার সময় হয়ে ওঠে না ।
“চারু রান্না হলো ?”
রাত করে ঘুমিয়েছে জন্য আজ উঠতে দেরি হয়ে গেছে রান্না বসাতে । চারু রান্না করছে আর তার মা সবজি কেটে দিচ্ছে । চারুর মায়ের মাথায় সমস্যা হয়েছে , মাঝে মধ্যেই সব ভুলে বসে । তখন চারুকে তার মাকে কতো কষ্টে সামলাতে হয় । এখন তার মা কতো চুপচাপ বসে সবজি কাটছে । আর চারু রান্না করছে । তখন ডাইনিং টেবিল থেকে কেউ হুকুম জারি করলেন । চারু চেঁচিয়ে উওর দিল,
“হয়েই গেছে প্রায় ।”
“তারাতারি কর ,আজ আমার ছেলের চাকরির প্রথম দিন । ”
“এই তো হয়ে গেছে ।”
“গুড মর্নিং আম্মু ।”
” আজ এতো তারাতারি উঠলি যে , কি মনে করে ?”
“আজ কলেজে প্রথম দিন ভুলে গেছো ?”
“ওহ ভুলেই তো গেছিলাম । বিন্দু উঠেছে ?”
“হুমম আসছে ।”
বিন্দু আর বিন্তি বৃত্তের জমোজ বোন । সবে একসাথে কলেজে উঠলো । বিন্তি খাবার টেবিলে বসে ব্রেড রুটিতে মাখন ভরিয়ে খেতে খেতে চুরুকে বলল,
” আমার জন্য আজ হালকা খাবার বানাস চারু ।”
“ঠিক আছে আপা ।”
“আমাকে ও হালকা কিছু বানিয়ে দে ।”
পেছন থেকে বিন্দুও কথাটা বলল,
” আচ্ছা আপা ।”
বিন্দু আর বিন্তি চারুর এক বছরের ছোট অথচ চারুকে নাম ধরে ডাকে । দুজন কে একি রকম দেখা যায় ।
চারু খাবার এনে টেবিলে রাখলো । বৃত্ত পেছন থেকে এসে তার বোনদের কান চেপে ধরে বলল,
“আজ তোদের কলেজের প্রথম দিন অথচ আমায় একবার ও জানালি না ?”
পেছন ফিরে অবাক হলো দুজন । উঠে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভাইয়া তুমি কখন এলে ?”
“রাতে ।”
“আমাদের জন্য কি এনেছ ?”
“কিছুই না ।”
বলে খাবার টেবিলে বসলো । বিন্তি বলল,
“কিছুই আনো নি ভাইয় ।”
” না টাকা নেই ?”
গাল ফুলাল দুজন । বৃত্ত হেসে ফেলল।বলল,
“আমার ঘরে রাখা আছে । আগে খাবি দেন পাবি ।”
“ঠিক আছে ।”
বৃত্তর মা বলল,
“তোদের ভাই তোদের কলেজে চাকরি পেয়েছে , আজ থেকে জয়েন করবে ।”
“সত্যি? এটা তো খুব ভালো , ভাইয়ার সাবজেক্টে এ ফেল করলে পাশ করিয়ে দিবে ।”
“সোজা কলেজ থেকে বের করে দিব । ”
বৃত্ত কথাটা বলল । চারু খাবার এনে বৃত্ত সামনে রাখলো । তাকাল বৃত্ত । কাল তো এই মেয়েই ছিল, দেখতে বেশ! কামিজ পরে ওরনাটা মাথা ওপধি টানা । শ্যামলা , তবে সুন্দর । বৃত্ত চোখ সরিয়ে খাওয়ায় মন দিল ।
“এই কোথায় যাচ্ছিস চারু?”
চারু বাড়ির সব কাজ করে কলেজে যাওয়ার জন্য বের হতেই বৃত্তের মা আটকে দিলেন । এক গাদা কাপড় এনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“তোর মা ভালো করে কাচতে পারে না , এগুলো ধুয়ে দিয়ে তার পর যা । আর দুপুরে রান্নার আগেই যেন বাড়িতে দেখি । না হলে কলেজ যাওয়া বের করবো ।”
চারুকে আজ তারাতারি যেতে হবে । কলেজে আজ নতুন স্যার এসেছে । ফিজিক্স স্যার , ফিজিক্সছে চারু বড্ড কাচা।
তারাতারি যেতে গিয়েও আটকা পরে গেল । ড্রেসটা খুলে কাপড় গুলো ধুতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল । হাটতে হাটতে কলেজে রওনা দিল ……..
