চারুবৃত্ত পর্ব ২০
জুলি জোনাকি
তখন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুইছুই, একদম বিয়ের সময় । আদিলের নাক থেকে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে । বৃত্ত ফের হাত ওঠালো আরেকটা মারবে বলে এমন সময়ে বিন্দু আর লতা এসে বৃত্তের হাত ধরে আটকে দিল । বৃত্তের চোখ মুখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে । এমন কাণ্ডের জন্য চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন হতভম্ব হয়ে গেল। বৃত্তের বাবা বৃত্তের মায়ের কাছে গিয়ে সবার সামনে হাত ওঠাতে যাবে তখন বিন্তি বাবার হাত ধরে ফেলল । বৃত্তের বাবা চোখ রক্তিম করে বলে উঠলো ,
“কি তামাশা শুরু করছো তুমি?”
বৃত্তের মা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আমার ছেলের যেটাতে ভালো ,মা হিসাবে আমি সেটাই করেছি ।”
বৃত্ত বাবা রুখে যেতেই বিন্তি তার বাবাকে জোর করে সরিয়ে নিয়ে গেল ।
আদিল নাক ধরে বৃত্তের কাছে গিয়ে বলল,
“আরে ব্যাটা মারে ফেলবি নাকি ? ”
বৃত্ত রেগে আদিলের কাছে যেতেই আদিল চট করে বলে উঠলো ,
“আরে আরে এতো দেখছি আমায় মেরেই ফেলবে । ”
“তোক ওই দিনই মারা উচিত ছিল । ”
বলে বৃত্ত চোখ ছলছল করে উঠলো । চারুর দিক তাকালো দেখলো চারু স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে আছে ।
চারুর কাছে যেতেই ফের আদিল এসে আটকে দিতেই ফের জোরে একটা নাক বরাবর মারলো । ওমা বলে আদিল মাটিতে পড়ে গেল । বৃত্ত মাটিতে বসে আরেকটা মারতে যাবে আদিল চেঁচিয়ে ওঠে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“আরে আরে এটা নাটক , ও আমার বউ না তোমারই বউ । ”
বৃত্ত চট করে থেমে গেল । দাঁতের উপর দাঁত তুলে বলে ,
“মানে? ”
আদিল নাক ধরে কান্না করতে করতে বলল,
“বিয়ে টা তোমার সাথেই হবে , এটা তো সারপ্রাইজ ছিল । ”
“সারপ্রাইজ? ”
বৃত্ত সবার দিকে তাকালো । সবাই এবার হেসে ফেললো । লতা গিয়ে আদিল কে হাত ধরে টেনে তুললো । বিন্দু গিয়ে বৃত্ত কে উঠিয়ে বলল,
“আরে এতো তারাতারি বলে দিলেন?আর একটু সময় নিতেন ।”
আদিল হাত জোর করে বলল,
“না বোন আর মার খেতে চাই না ।”
বিন্দু দাঁত কেলিয়ে হেসে ভাইয়ের দিক তাকিয়ে বলল,
“আমার একমাত্র ভাইকে কষ্ট দেই কি করে ? তাই মা আমাদের সবাইকে সব কিছু বলে এখানে এনেছে । তারপর তোমাকে ওভাবে আসতে বলেছিল । সরি কষ্ট দেওয়ার জন্য ।”
বৃত্ত চটকরে চারুর দিক তাকাল, মেয়েটা কেমন গাল ভরে হাসছে ! এমন ভাবে হাসতে দেখিনি বৃত্ত কখনো । বৃত্ত কাউকে তোয়াক্কা না করে দৌড়ে গিয়ে চারুকে উঁচু করে গাল ভরা হাসি নিয়ে ঘোড়ালো ।চারু পড়ে যাবার ভয়ে বৃত্তের গলা শক্ত করে ধরলো ।
সবাই হো হো করে হেসে উঠল । বৃত্তের মা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল , বৃত্ত বাবা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“বেগম, তাহলে তোমার মাথায় এই ছিল ? আরে আমায় তো আগেই বলবে তাহলে এমন কিছু হতো না ।”
“তুমি তো আমার সাথে কথাই বলো না । একটু আগে সবার সামনে হাত তুলতে চাইছিলে । ”
স্ত্রীর রাগ ভাঙ্গাতে বলল,
“বাড়ি গিয়ে কান ধরে ক্ষমা চাইবো, এখন ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করো ।”
বৃত্তের মা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তোমায় কিছু করতে হবে না, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি । ”
বৃত্ত বাবা আর কিছু বললো না । বৃত্ত চারুকে নামিয়ে চারুর কঁপালে কঁপাল ঠেঁকিয়ে আস্তে করে বললো,
“বাঁচা মুশকিল করে দিয়েছিলে । ”
চারুর মুখ থেকে হাসি সরছেই না । তখন বৃত্ত তার মায়ের দিকে তাকাল । ছেলের দিক তাকিয়ে হাসছিলেন । বৃত্ত গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে মাকে ও আঁকড়ে ধরলো । আর বিজয় হাসি হেসে বললো,
“ধন্যবাদ মা, আর কিছুই চাইবো না তোমার থেকে, তুমি যা দিয়েছো আমার সব চাওয়া পাওয়ার সমান । মনে হচ্ছে সব পেয়ে গেছি । ”
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ,
“তুই আমার ছেলে , তোর মাঝে আমি সুখ খুঁজে বেড়াই, তুই ভালো থাকলেই আমি ভালো । ”
বিন্দু আর বিন্তি দুজন এগিয়ে এলো সাথে তাদের জামাই, তারা বলল,
“মা তাহলে শুভ কাজটা সেরে ফেলি? বর তো এসেই গেছে ।”
“হ্যাঁ চলো ।”
ওদিকে লতা আদিলের নাক দেখছে, বেশ লেগেছে, লতা আলতো করে হাত ছুঁইয়ে বলল,
“খুব লেগেছে? ”
“নাহ , লাগবে কেন , এমনি এমনি রক্ত পড়ছে । শালার হাতে মনে হয় ইট বাঁধা । এমন ভাবে মারবে আগে জানলে এমন নাটকে নামই দিতাম না । যারে চাইলাম তারে তো পাইলামি না উল্টে তার ভালো করতে গিয়ে মৃতো হয়ে গেলাম । উফফফ কি লেগেছে গো ।”
“চ চলুন ওদিকটায় ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছি । ”
“ওষুধ লাগালে হবে না এক্স -রে করতে হবে , নাকের হাড্ডি ভেঙ্গে দিয়েছে ।”
লতা নিয়ে ওদিকটাতে চলে গেল । বৃত্ত গিয়ে চারুর হাত ধরলো । বৃত্তের মা আর চারুর মা এক হলো । তারপর পাশের মসজিদে নিয়ে গেল । হালকা করে সাজিয়েছে । বৃত্ত সেখানে গিয়ে ওজু করে অগোছালো হয়েই ভেতরে গিয়ে বসলো । তারপর মসজিদে থাকা হুজুর এসে সামনে বসলো । সবাই আস্তে আস্তে চারপাশ দিয়ে বসলো । বৃত্তের মা আর চারুর মা চারুকে এনে বৃত্তের পাশে বসালেন । বৃত্ত তাকালো, দেখলো লম্বা একটা ঘোমটা টেনে বসে আছে ।
বৃত্ত তার হাতটা এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“শুনো চারু, একটা চিমটি কাটো তো ,মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছি ।”
চারু হালকা করে চিমটি কাটতেই বৃত্ত বলল,
“ইস ! স্বপ্ন না।”
তারপর দুজনেই মুচকি হাসলো । একটু পরে বিয়ে পড়ানো শুরু করলো ।
যখন কবুল বললো তখন যেন দুজনে মনে শীতল হাওয়া বইল ।
যুদ্ধে জিতেছে এমন একটা বিজয়ের হাসি দিল । মুখোমুখি বসালো দুজনকে । চারুর বুকের ভেতর কেমন ধরফর করছে । সবার সামনে চারুর ঘোমটা তুলতে যাবে বলে হাত বাড়িয়ে দিতেই বৃত্তের হাত যেন কাঁপছিল । কাঁপাকাঁপা হাত নিয়ে ঘোমটা তুলে কেঁদে ফেললো বৃত্ত।কাঁপাকাঁপা ঠোঁট চারুর কপালে ছোয়াতেই চারু চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল ।
ঠোঁট সরিয়ে নিল বৃত্ত আওরাল,
“আলহামদুলিল্লা, আলহামদুলিল্লা, আলহামদুলিল্লা ।”
চারু চোখ মেলে তাকিয়ে বৃত্তের চোখে চোখ রাখলো, বৃত্তের চোখের পানি দু হাত দিয়ে মুছে হাসলো ।
তারপর সবাই মিলে বাইরে খেজুর দিলো । চারু আর বৃত্ত উঠে দাঁড়ালো, আল্লাহ কাছে দু হাত তুলে দোয়া করে বাইরে আসতেই লতা আর আদিল এগিয়ে এলো । লতা বলল,
“এটা একদম ঠিক করেন নি ভাইয়া, দেখেন কি বেহাল দশা করেছেন । ”
আদিলের নাক ব্যান্ডেজ করা দেখে বৃত্ত মাথা চুলকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“সরি , আমায় বললে এমন কিছুই করতাম না । তবে তোমার কপাল ভালো যে শুধু নাক ফাটিয়েছে, ভেবেছিল একদম মেরেই ফেলবো ।”
আদিল দাঁত কটমট করে বললে,
“শালার ভালো করলাম, আর শালা আমারে মারার প্ল্যান করে রেখেছে । সুবিধাবাদী কোথাকার ।”
বৃত্ত আদিলের কাধ চাপকে বললে,
“বেশি কথা বললে নাকের ওপর আরেকটা মেরে দিব ।”
আদিল দু পা পিছিয়ে গেল । আর বলল,
“ভালো হয়ে যান মাস্টার মশাই । ভালো হতে টাকা পয়সা লাগে না। ”
বৃত্ত হেসে চারুর হাত ধরে বলল,
“বউ পেয়ে গেছি, অবশ্যই ভালো হয়ে যাব। ”
চারু বেশ লজ্জা পেল । লজ্জায় বৃত্তের পেছনে মুখ লুকালো ।
তারপর সবাই বাড়ি চলে এলো । চারুবৃত্তকে বরণ করে ঘরে তুললো । বিন্দু, বিন্তি, আর তাদের জামাই মিলে বাসর ঘর সাজাতে ব্যস্ত হলো ।
দু দিন পর বড় করে অনুষ্ঠান করবে বলে সবাই একসাথে বলে আলোচনা করলো । তারপর সবাই যে যার ঘরে চলে গেল । লতা আর চারুর মা এক ঘরে শুলো ।
রাত একটা ছুইছুই, বৃত্ত ধীরে দরজা খুলে ঘরে এলো । চারু নড়েচড়ে বসলো । বৃত্ত এগিয়ে গিয়ে চারুর ঘোমটা না তুলেই বলল,
“চারু শুনছো ……”
চারু লজ্জিত ভাবে শুধলো,
“হুমমম শুনছি । বলুন মাস্টার মশাই ।”
বৃত্ত হাসলো, হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“চলো ছাঁদে যাই?।”
“এখন? এতো রাতে ?”
“হুমম, চলো , সারপ্রাইজ আছে ।”
“আবার সারপ্রাইজ? ”
“বারে তোমারা সবাই মিলে আমায় সারপ্রাইজ দিলে আর আমি তোমায় দিতে পারবো না ?”
“কি সারপ্রাইজ? ”
“আগে চলো । এসো ।”
চারু বৃত্তের হাত ধরে নামলো । বলল,
“এভাবেই যাবো? ”
“হুমম।”
তারপর দুজন পা টিপে টিপে উপরে গেল । চাদের আলোতে যেন চারপাশটা আলোকিত হয়ে আছে । চারুকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে চারুর ঘোমটা খুলে চাঁদের আলোতে দেখলো। বুকের বা পাশে দুহাত রেখে বলল,
“এখানটায় রোজ ব্যাথা করতো, আজ থেকে আর হবে না ।”
চারু মাথা নুইয়ে হাঁসলো । বৃত্ত একটু ঝুঁকে বলল,
“তোমায় লজ্জা পেলে আরো আদুরে লাগে । ”
একটু থেমে চারুর দু গালে হাত রেখে আদুরে ভঙ্গিতে আওরাল,
“শাদি মোবারক ছাহেবা ”
তারপর আলতো করে চারুর হাত ধরে নিয়ে বসলো । চারুর মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে হাতটা জড়িয়ে ধরে খালি গলায় সুর তুলে গাইলো,
চারুবৃত্ত পর্ব ১৯
“Tuuu jo mila
Toh zindegi hai badli
Main pura naya hogayaaa ”
