Home চারুবৃত্ত চারুবৃত্ত পর্ব ৮

চারুবৃত্ত পর্ব ৮

চারুবৃত্ত পর্ব ৮
জুলি জোনাকি

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, বৃষ্টি পরছে বেঘরে । এক ছাতার নিচে দুজন । চারুর এমন বেগোছালো হাল দেখে বৃত্ত হেসে ফের বলল,
” শুনো চারু , তাকাও ।”
চারু চোখ মেলে তাকালো, বৃত্তের কথা না শুনে জোরে এক ধাক্কা দিয়ে ছাতার বাইরে বের করে দিল । নিমিষেই ভিজে গেল বৃত্ত । চারু ছাতা ধরে একাই হাটতে শুরু করল । বৃত্ত তার এক হাত দিয়ে চুল গুলো এলোমেলো করে খালি গলায় গান গাইতে গাইতে পেছন পেছন হাটলো ,

” সে বৃষ্টি ভেজা পায়ে সামনে
এলে হায় ফোটে কামিনি
আজ ভিজতে ভালো লাগে
শূন্য মনে জাগে প্রেমের কাহিনী ”
বৃত্ত এক মনে বৃষ্টিতে ভিজে গেয়েই যাচ্ছে । তা শুনে চারু হাটার গতি বাড়িয়ে দিল । বৃত্ত গান থামিয়ে হেসে বলল,
“চারু শুনছো? এভাবে ফেলে যাচ্ছো ? ”
চারু শুনলো না দেখে বৃত্ত দৌড়ে গিয়ে চারুর হাত থেকে ছাতা নিয়ে নিজে ধরে বলল,
” আমি থাকতে তুমি কেন ছাতা ধরবে ?”
চারু বুঝলো , বৃত্ত এবার বড্ড বেশি বেশি করছে , যা চারু জিবনে অনেক বড় সর্বনাশ আনতে পারে ।
চারু কেবল তাকাল , বৃত্তের চোখে মুখে হাসির ঝলক । ঠোঁট কামরে চোখ বন্ধ করে ভারি নিশ্বাস নিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” আপনি যা চাইছেন তা সম্ভব না ।”
“আমি কি চাইছি ?”
মজা করে বলল বৃত্ত । চারু ভেঙ্গে কিছু না বলে ছাতার নিচ থেকে ভিজে ভিজে চলে গেল , বৃত্ত নিজের মাথার ওপর থেকে ছাতা সরিয়ে চেঁচিয়ে জানতে চাইলো ,
” বলে যাও আমি কি চাই , আর কেন সম্ভব না । চারু ?”
চারু দৌড়ে চলে গেল । বৃত্ত চারুর যাওয়ার দিক তাকিয়ে থাকলো । ফের গাওয়া গানের সুর তুলে গাইলো ,
“রিমঝিম এ ধারাতে
চায় মন হারাতে
রিমঝিম এ ধারাতে
চায় মন হারাতে ”

“তুমি কি চারুকে পছন্দ করো বৃত্ত ভাইয়া ?”
বৃত্ত সবে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসতেই বিন্দু এমন প্রশ্ন নিয়ে রুমে ঢুকলো । বৃত্ত চমকালো না , কেবল স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলো,
“কেন ভাবি পছন্দ হয়নি ?”
বিন্দু ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
” পছন্দ না হওয়ার কোন কারণ নেই , চারু তো ভালো মেয়ে বড্ড সরল মেয়ে, কিন্তু ভাইয়া ।”
“কিন্তু কি ?”
” ও তো এবাড়ি কাজ করে , মা জানলে কি হবে জানো ?”
” তোরা কাজ করাস তাই করে , এতে মানা না মানার কি আছে ?”
” তবুও ।”
বৃত্ত উঠে দাঁড়ালো বিন্দু মাথায় হাত রেখে বলল,

” ও যেমনি হোক , আমার তেমনি ভালো লাগে । কেনো তোর ভালো লাগে না ?”
” ভালো না লাগলে অবশ্যই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতাম । ”
” ব্যস , এতেই হবে । বাকিটা আমার ওপর ছেরে দে ।”
” ঠিক আছে, তুমি যেখানে ভালো থাকবে আমি আর বিন্তি সেখানে অমত দেই কি করে ?”
“বিন্তি? ”
“হুমম । আমরা দুজনেই কিছুটা ধরতে পেরেছি ।”
“কিভাবে? ”
” তা ধরবো না , চারু তোমার সামনে এলেই তোমার চোখ মুখ কেমন চকচক করে উঠে , তোমার চোখ দুটোও ভয়ংকর ভালোবাসা প্রকাশ করে । ”

“এই মরেছে । মা বুঝে যায় নি তো ?”
“কি জানি , তবে একটা কথা বলি ?”
“হূমম বল ।”
” সামনে মেয়েটার পরীক্ষা, এমন কিছু করো না যা মায়ের চোখে পড়ুক আর চারুর পড়াশোনা বন্ধ করে দিক । তুমি তো চেনোই মা কে । পরীক্ষা টা শেষ হোক ভালো করে তারপর তোমার মনের কথাটা বইলো , আমি আর বিন্তি হেল্প করবো ।”
“হুমম বুঝলাম । ঠিক আছে তাই হবে ।”
বিন্দু এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

” ঘুষ দিবে না ?”
“কিসের ঘুষ ?”
“বারে , মুখ বন্ধ রাখতে হবে না ?”
“তবে রে ”
বলে বৃত্ত বিন্দু কান টেনে ধরলো , বিন্দু উফ শব্দ করে বলল ,
” ঘুষ না দিলে মুখ খুলে দিব ।”
“আবার আমাকে থ্রেট দিচ্ছে । সাহস তো কম না ।”
বিন্দু কান ছাড়িয়ে ফের বলল,
“দিবা কি না ।”
বৃত্ত চোখ ছোট ছোট করে মানি ব্যাগ থেকে এক হাজার টাকা বের করে দিয়ে বলল,
“আমার ও সময় আসবে ।”
“সে তখন দেখা যাবে , তার আগে আরো এক হাজার টাকা বের করো ।”
“আবার কিসের টাকা ?”

“ওমা , এক বোনকে দিলে আরেক বোনকে দিবে না ?”
মুখে হাত রেখে বৃত্ত বলল,
“এক হাজার দুজন ভাগাভাগি করে নিবি , এখন যা ।”
“ঠিক আছে , তাহলে দুজন ভাগাভাগি করেই মাকে বলে দিব । ”
বিন্দু যেতেই বৃত্ত পেছন থেকে চুল টেনে ধরে আরো এক হাজার টাকা বের করে দিয়ে বলল,
” তোদের পরে দেখে নিব ।”
” পরে কেন ভাইয়া এখনি দেখ , বিন্তি কেও ডাকি ?”
বৃত্ত কান ধরে রুম থেকে বের করে দিল । বিছানায় দেহটা এলিয়ে দিল হাফ ছাড়লো ।

আজ কলেজে শেষ দিন , এর পর থেকে যাবে না । কছুদিন পর পরীক্ষা শুরু । চারু আজ সবার আগে কলেজে গেল । বৃত্তের মা কাল আসে নি জন্য সকালে তেমন বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না , তাই রান্না করে রেখে সবার আগে চলে এসেছে ।
” আজ আপনাদের শেষ ক্লাস । কিছু দিনের পরিচয় আমাদের , আপনারা ভালো করে পড়বেন ভালো করে পরীক্ষা দিবেন । কোন সমস্যা হলে ফোন দিবেন আমি সমাধান করে দিব ।”
বোর্ডে বৃত্ত তার নাম্বার লিখে দিল । সবাই সেভ করে নিলো , কেবল চারু বাদে । বৃত্ত আরো অনেকখন কথা বলে বিদায় নিল । রুমের সবাই কথা বলছিল এমন সময়ে সেই বেহায়া মেয়ে জোরে বলে উঠলো,
” প্রয়োজন ছাড়া কেউ স্যার কে বিরক্ত করবে না , আমি হলে অন্য কথা । বুঝেছো সবাই ?”
কেউ তেমন উওর দিন না । মেয়েটা মুখ ভেঙচি কেটে চুপ হলো ।

“তোমার ফোন কোথায় ?”
“ঘরে ।”
“নিয়ে এসো ।”
“কেন ।”
“দরকার আছে ।”
চারু সন্ধ্যায় বাগান থেকে ভেতরে ঢুকতেই বৃত্ত সামনা সামনি পড়ে গেল । বৃত্ত চারুকে থামিয়ে তারপর কথাগুলো বললো । চারু গিয়ে ফোনটা এনে ধরিয়ে দিল । বৃত্ত চারুর ফোনে নিজের নাম্বার তুলতেই দেখলো সেভ করা নেই , তাই সেভ করে দিয়ে বলল,
“যাও পড়তে বসো । আমি ফোন বা মেসেজ দিলে উওর দিও ।”
চরু যেতেই ফের থামিয়ে দিয়ে ডাকলো ,

“শুনো ।”
চারু ফিরে তাকালো ,
“বলুন ?”
“ঠিক আছো তুমি ?”
“কেন ? কি হবে আমার ?”
“এমন দেখাচ্ছে কেন ? কোনো সমস্যা? ”
“উহু, আমি তো ঠিকই আছি ।”
বৃত্ত ঠোঁট এলিয়ে হাসলো, কাছে গিয়ে বলল,
” ঠিক আছে যাও ।”
চারু কিছু বললো না । ফোনটা নিয়ে চলে গেল । বৃত্তের মা উপর থেকে তা দেখে ফেললো । চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে তাকিয়ে দেখলো ।

” শোন তো চারু ।”
রাত তখন নয়টা কি দশটা , ঘরে পড়ছিল চারু । বৃত্তের মা ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ডাকলো । চারু ঘর খুলে মুখোমুখি দাঁড়াতেই বৃত্তের মা হাত ধরে টেনে দূরে নিয়ে গিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন ,
“বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে যাচ্ছিস ? ”
“অ ক কাকিমা কি ব বলছো বুঝতে পারছি না ।”
“আরে মহারানি তো দেখি বুঝতেই পারছে না , ঠিক আছে ভালো কে বোঝাই , তুই আমার ছেলেকে নিজের জালে আটকাতে চাচ্ছিস ?”
চারুর কাপাকাপি শুরু হয়ে গেল, কেমন করে ঝাকিয়ে প্রশ্ন করছে । কাপাকাপি সুরে বলল,

” ক কাকিমা এমন কিছু না আ…”
“আবার বলে এমন কিছু না , আমি ওপর থেকে সব কিছুই দেখেছি একদম মিথ্যে বলতে যাবি না চারু ।”
চারু অসহায় একটা ঢোক গিলে আওরাল,
“সত্যি বলছি কাকিমা, আমার দিক থেকে এমন কিছুই নেই আপনি যেমন ভাবছেন ।”
“ওহ তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস যে আমার ছেলে নিজে থেকেই তোর মতো ফকিন্নির পেছনে লেগে আছে ? সাহস তো কম না আমার ছেলের গায়ে দোষ চাপাস বেয়াদব মেয়ে । আমার ছেলের থেকে দূরে থাকবি, ও যেখানে থাকবে সেখানে যাবি না , দরকার হলে কথা ও বলবি না । আমার চোখে যদি একবার আসে না তো বাড়ি থেকে তো বের করতে পারবো না তবে পরীক্ষা দিতে দিব না বলে দিলাম । ”
এতো গুলো কথা শুনিয়ে চলে গেল বৃত্তের মা । চোখ থেকে অঝরে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো । চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক ভাবে ঘরে গেল ।

“চারু ।”
“কি লাগবে বলুন ?”
“তুমি কি ব্যস্ত? ”
চারু সকালে বাজার থেকে ফিরে রান্না ঘরে পানি খাচ্ছিল, বৃত্তের আওয়াজ পেয়ে ভরকে গেল । চট করে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ আছে কি না ।
“হুমম রান্না করছি । কি খাবেন বলুন বানিয়ে দিচ্ছি।”
বৃত্ত রান্না ঘরে ঢুকে সবজি হাতে নিয়ে বলল,
“হেল্প করি ?”
“না না আপনি যান তো এখান থেকে , কি লাগবে মুখ ফুটে বলুন বানিয়ে দিচ্ছি ।”
” কিছু লাগবে না , শুধু হেল্প করতে আসছি ।”
“লাগবে না হেল্প । আর যদি সত্যিই হেল্প করতে চান তাহলে এখান থেকে যান তাতেই হবে ।”
বৃত্ত কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে বলল,

“আমি থাকলে কি সমস্যা? ”
“অনেক সমস্যা ।”
“যেমন ।”
গভীর শ্বাস নিল চারু । তার পর রয়েসয়ে ধীরে জবাব দিল,
“আপনি শুধু আমার থেকে দূরে থাকুন এতে আপনার আমার দুজনেরই ভালো । পাল্টা প্রশ্ন করবে না ।”
“ঠিক আছে পরীক্ষা শেষে জমিয়ে কথা হবে ।”
বৃত্ত যেতেই হাফ ছেড়ে বুকে হাত রেখে ধীরে শ্বাস নিল । বৃত্ত সিড়ি বেয়ে ওঠতে গিয়ে থেমে ঘার ঘুমিয়ে চারুকে ডাকলো ,

চারুবৃত্ত পর্ব ৭

“চারু শুনছো? ”
চারু আচমকা তাকাল , বৃত্ত হাত নেড়ে বাই বলে হেসে উপরে চলে গেল । চারু আনমনেই ঠোট এলিয়ে হাসলো । নিজের এমন কাণ্ড খেয়ালে আসতেই মাথা ঝাকিয়ে হাসি থামিয়ে বলল,
“আমি হাসছি কেন ?”

চারুবৃত্ত পর্ব ৯