Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮০

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮০

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮০
ইশরাত জাহান জেরিন

চিত্রার জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল ফারাজের বুকে। একটু নড়েচড়ে উঠতেই দেখল সে তার ঘরের মধ্যেই আছে। হ্যাঁ এটা তার বেডরুম। এই জায়গা চেনার ক্ষেত্রে তার ভুল হতেই পারে না। সে ফারাজকে ছুঁয়ে দেখতেই ফারাজের ঘুম ভেঙে গেল৷ ফারাজ এক ঝটকায় উঠে বসল। চিন্তিত কণ্ঠে বলল, “বউ তুমি ঠিক আছো?”
চিত্রা এখন আগের থেকে বেটার ফিল করছে। সে উঠে বসার চেষ্টা করতেই ফারাজ তাকে পুনরায় শুইয়ে দিয়ে বলল, “ওঠা লাগবে না। এত পাকনামি কেন করতে গিয়েছিলে? আমার বাচ্চার যদি কিছু হতো? সাধ্য থাকলে তোমার পেট থেকে বের করে আমার পেটের মধ্যেই রাখতাম। আরেকটু দেরি হলে বাচ্চার মা হয়ে যেত বারবিকিউ আর বাচ্চা হয়ে যেত তান্দুরি।”

চিত্রা পুনরায় ফারাজের গালে হাত রাখল, জিজ্ঞেস করল, “আপনি সত্যি আমার সামনে তো? নাকি আমি কল্পনা দেখছি?”
“চাইলে পার্সোনাল ভাবে বুঝাতে পারি। নিশ্চয়ই তখন আর সন্দেহ থাকবে না।”
চিত্রা লজ্জায় পড়ে গেল। যেহেতু এই লোকের মুখ দিয়ে ভালো কথা বের হয়নি তারমানে নিশ্চয়ই এটা বাস্তব। সে এবার নিশ্চিত হয়ে গেল কিন্তু সে এখানে কি করে? সে তো আগুনে ঝলসে যাচ্ছিল। বাঁচার কোনো উপায় তো তার হাতে ছিল না। সে ফারাজের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ফারাজ মৃদু হেসে বলল, “মনে অনেক প্রশ্ন তাই না? কি করে বাঁচলে? কি করে এই ঘরে ফিরলে?”
চিত্রা মাথা নাড়তেই ফারাজ বলল, “তোমার ঘরে মুইন ঢুকেছিল তাই না?”
“সে কিছু করেছিল?”
“না, রুমে ঢুকে বারান্দায় চলে গিয়েছিল।”

“হ্যাঁ ওইসময় সে আমায় কল করে। জানো চিত্রা মানুষের উপকার করলে যে তার এত সুন্দর ফল পাওয়া যায় সেটা আজকের আগে বুঝিনি। খোদার পরিকল্পনা বোঝা দায়। বেশ অনেকদিন আগের কথা। প্রায় তিন থেকে চারমাস আগের কথা তো হবেই। বজ্রের সঙ্গে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে একবার যাওয়া হয়। বজ্রের ওই হাসপাতালে ওইদিন একটা কাজ ছিল। তার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেদিন হাসপাতালে একটা ছেলেকে দেখলাম ডাক্তারের হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করছে। হাতে অনেক সময় ছিল। মন কেমন করে যেন সেদিন বলে উঠল, ” যাহ ফারাজ, ঘটনা কি হয়েছে দেখে আয়।” আমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে এখানে?” ডাক্তার বললেন, “আরে বলবেন না, বলছি ওনার বাবার চিকিৎসা আর এখানে হবে না। ঢাকায় পাঠাতে হবে। বলে কিনা ঢাকায় চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। একটু এখানেই দেখতে। বাবাকে বাঁচাতেই হবে। অবস্থা ভালো না।” আমার নিজের বাবার কথা মনে পড়ে গেল। এই ছেলেটার ভাগ্য নিশ্চয়ই আমার থেকে ভালো, ওর বাবা বোধ-হয় ওকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। নইলে কী বাবাকে বাঁচানোর জন্য এত কিছু করত? কই ফারাজ তো করেনি?

ফারাজের তো ইচ্ছে করেনি তার বাবাকে বাঁচিয়ে রাখতে? সে তো তার বাবাকে একই ভাবে একই জায়গায় জীবন্ত জ্বালিয়েছে কেবল প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। আফসোস যদি তার বাবাও ভালো হতো, সেও বাবাকে বাঁচানোর জন্য এমন ভাবে হাত-পায়ে ধরে কাঁদতে পারত। অথচ বাবার ভালোবাসা কী জিনিস খোদা তার কপালেই লিখল না। সেদিন আমি ওই ছেলের বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা দেই, লোকটা এখন চিকিৎসা করে সুস্থ। বাড়ি আছেন। ওই ছেলের নামটাও সাহায্যের সময় জিজ্ঞেস করিনি। তবে সে কিন্তু ঠিকই আমার খোঁজ রেখেছে। আজ জানতে পারি মুইনই সেই দিনের ওই ছেলে ছিল যাকে আমি সাহায্য করেছিলাম। যে কেবল নিজের বাবাকে সুস্থ করার জন্য এই নোংরা লাল রক্তে হাত রাঙানোর কাজে নেমেছিল। শুনেছি সোহানের থেকে নাকি সে কাজের টাকা ছাড়াও অগ্রিম কয়েকমাসের টাকা চেয়েছিল কিন্তু ওইসময় কাজকারবার ঠিক মতো না চলার কারণে দিতে পারেনি। যাই হোক সেটা আমার দেখার বিষয় না। তবে আমি জাস্ট অবাক হলাম যখন তোমাকে বাঁচানোর মতো হাতে কোনো উপায় পাচ্ছিলাম না তখনই মুইনের কল আসে। জানায় চিত্রা কোথায়। ভাগ্য ভালো ওইসময় আমরাও নদীর ঘাটেই ছিলাম। নইলে এত কম সময়ে তোমাকে বাঁচাতাম কেমন করে? যাক মুইন চেয়েছিল দায় নিয়ে না থাকতে, তাকে সাহায্য করেছিলাম বিধায় সে বিনিময়ে এত বড় উপকার করল। এটা কি চিত্রা কোনো ম্যাজিকের থেকে কম কিছু? দুনিয়ায় এমন মানুষও হয়?”

“হয়, যদি বিবেক থাকে কিন্তু আমি তো আগুনে ঝলসে যাচ্ছিলাম বাঁচলাম কি করে?”
“আগুন তখনো পুরোপুরি লাগেনি। ভাগ্যিস এর আগেই ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছিলাম।”
“বাইরে এতগুলো লোক ছিল ওদের কে আঁটকে দিলেন কী করে?”
“হাত সাফাই বুঝো? একটু হাত সাফাই করতে হয়েছে। অনেক দিন ধরে মারপিট করেনি তো এখন শরীর ম্যাচম্যাচ করছে,রাতে একটু শারিরীক পরিশ্রম করতে হবে বুঝলে তো?”
চিত্রা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “বাচ্চার কথা আপনাকে কে বলেছে?”
“বজ্র ছাড়া আর কে?”
“ওর খবর আছে, আমি না করেছিলাম বলতে।”
“কেন তোমার কি উদ্দেশ্য ছিল আমার বাচ্চা নিয়ে বর্ডার ক্রোস করার?”
“কেন আমি চোর না ডাকাত? আমি চেয়েছিলাম নিজের মুখে সব খুলে বলতে।”
ফারাজ চিত্রার পেটে চুমু খেতেই হঠা অভ্র ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেই এক মুহূর্তে লজ্জা পেয়ে বলল, “ভাই মাফ করবেন। আমি তাহলে পরে আসি।”
চিত্রা নিজেও লজ্জায় কুকিয়ে গেল। ঠিক তখনই ফারাজ রেগে বলল, “শালার ব্যাটা খোদার নালত পড়ুক তোর ওপর।”

অভ্র রুম থেকে চলে যেতেই এবার চিত্রা ফারাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার অনেক কিছু বলার আছে আপনাকে।”
“আমার জানার দরকার নেই। যা হয়ে গেছে তো হয়ে গেছেই।”
“উঁহু আপনাকে জানতেই হবে। শুরু থেকে সব কিছু আপনাকে জানতেই হবে। নইলে আমি ভেতর ভেতর মরব।”
ফারাজ এবার নিশ্বাস ছেড়ে চিত্রার দিকে তাকাতেই চিত্রা নড়েচড়ে উঠে বসল। ফারাজ তার পেছনে বালিশ দিলো তাকে হেলান দেওয়ার জন্য। তারপর বলতে শুরু করল, চিত্রাঙ্গনা কায়সারের, চিত্রাঙ্গনা তালুকদার হয়ে ওঠার গল্প।
“ঘটনা আজ থেকে আরো ২ বছর আগের। সাল ২০২০ তখন। আমার হাতে ক্রিমিলাদের নতুন ক্রাইমটা সবে এলো। সেখানে চোখ বুলাতেই প্রথম যেই নামটায় আঁটকে গেলাম সে হচ্ছে ফারাজ এলাহী। নামের মধ্যেই একটা রাজত্ব ভাব। আমি ফারাজ এলাহীর ক্রিমিনাল ফাইলটা খুললাম, তাতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল সে ইতালির একজন স্মাগলার। তার নেশাদ্রব্য, অস্ত্র তৈরির জন্য আলাদা ফ্যক্টরী ছিল। তাছড়াও ইতালির বাজারে সারা দেশ থেকে যত মাছ প্রবেশ করে, রপ্তানি হয় তাও ফারাজ এলাহীর মাছের ফ্যাক্টরী থেকে। রেডিমেড, প্রেসেসিং করা সকল মাছ, মাছ জাতীয় খাদ্যের জন্য ফারাজ এলাহীর কোম্পানি গুলো নাম্বার ওয়ানে ছিল। মজা বিষয় হচ্ছে তাকে ইতালির সরকার থেকে নেশাদ্রব্য আর অস্ত্র তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। তার জন্য সব কিছুই বৈধ। আর ইতালিতে এমন অনেক স্মাগলার, মাফিয়া আছে যাদের জন্য এসব অবৈধ কাজ করার জন্য লাইসেন্স আছে। তাদের মধ্যকার একজনই হচ্ছে ফারাজ এলাহী। আমি ফারাজ এলাহীর সম্পর্কে যত জানলাম ততই অবাক হতে থাকলাম। অদ্ভুত মানুষ। তার ছবি দেখে সেই যে উত্তাল সমুদ্রে ঝাপ দিলাম সেই সমুদ্র থেকে আমি চিত্রা কায়সার আজও বের হতে পারিনি। আপনি ফারাজ আমায় খুন করতে এসে প্রেমে পড়েছিলেন না? অথচ আমি আপনার আগে আপনাকে খুন করতে গিয়ে আপনার প্রেমে পড়েছি।”

ফারাজ চুপ করে রইল। তাকিয়ে রইল চিত্রার দিকে। হঠাৎ বলে উঠল, “বউ পপকন নিয়ে আসি, ঘটনায় বুঝলাম অনেক প্যাচ আছে। শুনতে শুনতে পাছা ব্যথা হয়ে যাবে। সাথে যাই স্টিম হিনহেলারটা আগেভাগে নিয়ে একেবারে বসি।”
চিত্রা চোখ রাঙাতেই ফারাজ এবার সিরিয়াস হলো। চিত্রা পুনরায় বলল, “আমি কে এখনো আপনি জানেন না। আমি হলাম ইতালির একজন সিক্রেট ফোর্সের অফিসার। আবার ধরে নিতে পারেন সেই ফোর্সের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। আমার ফোর্স ক্রিমিনালদের শাস্তি দেওয়ার কাছে নিয়জিত। আমাদের কাজ অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া বিশেষত তাদের, যারা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। আমাদের সংস্থার নাম ‘ফিনিক্স’। এটি একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যেখানে পরিচয় গোপন রাখা প্রথম ও প্রধান নিয়ম। আজ পর্যন্ত খুব অল্প কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষ ছাড়া কেউ আমার প্রকৃত পরিচয় জানে না।” চিত্রা এক মুহূর্তে থেমে পুনরায় বলল, “কিন্তু জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন নিয়মও হৃদয়ের কাছে হার মানে। ২০২০ সালে, অজান্তেই আপনি আমার মনে জায়গা করে নেন। তখন নিজের সংস্থার কঠোর নিয়ম ভেঙে আমি আপনার প্রেমে পড়ি। আপনি জানেনই না আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নিশ্বাসের খবর আমার কাছে যে পৌঁছাত। কর্তব্যের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই আপনার ওপর নজরদারি… কিন্তু অজান্তেই তা রূপ নেয় অনুভূতিতে। আপনি ভেবেছেন আপনার পরিকল্পনায় সব হয়েছে তাই না? উঁহু গল্প আমার তৈরি করা ছিল। যে গল্প আপনি আমাকে শুনিয়েছেন, আমি তার লেখক।

আপনার বিষয়ে জানতে গিয়ে সবার আগে কি জানতে পেলাম জানেন? আপনার অতীত। আপনি ভাবছেন হয়তো যেদিন আপনার গায়ে গুলি লেগেছিল ওইদিন রাতেই আমি আপনার বিষয়ে জানতে পাড়ি। অথচ আমি আরো ২ বছর আগের থেকে আপনার বিষয়ে প্রতিটি তথ্য জানি। আপনি ভেবেছেন আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাকে আপনি বিয়ে করেছেন? উঁহু ফারাজ পরিকল্পনা আমি করেছিলাম আর আপনি কেবল তা বাস্তবায়ন করেছিলেন। আসলে ঘটনা কি জানেন? দাবার কোটে আপনারা সবাই গুটি ছিলেন, আর চাল দিয়েছি আপনার সামনে বসে থাকা চিত্রাঙ্গনা কায়সার।” ফারাজ আরো মনোযোগ দিয়ে চিত্রার দিকে তাকালো। “আপনি ভালোবাসার জন্য পাপ ছেড়ে ছিলেন না? আর আমি চিত্রা ভালোবাসার জন্য পাপ করেছি। প্রথম পাপ তো নিজের পেশার সাথে করেছিলাম। যাক ব্যাপার না। আমি আপনার ভয়ানক রূপটাকেও ভালোবাসি, নরম রূপটাকেও ভালোবাসি কারণ হচ্ছে আমি পুরোটাই আপনাকে ভালোবাসি। এবার তাহলে বলি শুনুন, আপনার বিষয়ে জানতে গিয়ে জানতে পারলাম, তালুকদার বাড়ির মানুষও আপনার মায়ের মৃত্যুর সাথে জড়িত। ভাগ্য বুঝলেন তো, ওইসময় পুরোই আমার পক্ষে ছিল। আমি তালুকদার বাড়ির সকলের সম্পর্কে খোঁজ শুরু করলাম, তারই মধ্যে জানতে পারলাম আপনি নাকি তালুকদারের ছোট মেয়েকে খুঁজছেন প্রতিশোধ নিবেন বলে। আমি সেই মেয়েকে খোঁজা শুরু করি,মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে মার্জিয়া বেগম এবং তার স্বামীকে খুঁজে পাই। সেখান থেকেই জানতে পারি তালুকদারের যেই মেয়ে ছিল সেই মেয়ে নাকি মার্জিয়াদের কাছেই মানুষ হয়। তবে চার-পাঁচ বছর আগে সেই মেয়ে নিখোঁজ হয় আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথায় সেই মেয়ে এটা জানতে গিয়ে ঘুরেফিরে এলাহী বাড়ির নাম বেড়িয়ে আসে।

জানতে পাই সুলেমান এলাহী নামক এক ব্যক্তির হাতে ধর্ষণ হয়েছিল এক মেয়ে। সেই ঘটনার আগের দিন তালুকদার বাড়ির সেই মেয়ে নিখোঁজ হয়। পরের দিনই নদীর ধারে লাশ পাওয়া যায়। কিন্তু লাশের যেই হাল ছিল যাচাই-বাছাই করার মতো অবস্থায় ছিল না। মার্জিয়া বেগম অবশ্য সেই লাশ দেখে আন্দাজ করতে পেরেছিল লাশটা কার। তবে লোকে বাজে কথা বলবে, আঙুল তাদের ওপর এসে তুলবে দেখে চুপ করে যান। আর এলাহী বাড়ির মানুষ সম্পর্কে সবারই ধারনা ছিল। তার ওপর সুলেমান এলাহী ছিল তখনকার চেয়ারম্যান। তাই সাহস হয়নি সুলেমানের সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করার। দুইবছর পর আমি মার্জিয়ার কাছে যাই। তখন তাদের অনেক অভাব ছিল। আমি জানাই তাদের সব খরচ আমি চালাবো, বিনিময়ে আমাকে সাহায্য করতে হবে। রাজি হলেন না ওই বাড়ি কেউ। মাহাদীও তখন বিবাহ করেনি, মার্জিয়া বেগমের স্বামীও তখন সুস্থ ছিল। আমি বিপাকে পড়ে যাই, বুঝতেই পারি ফারাজ এলাহী এখনো তালুকদার বাড়ির মেয়েকে তেমন ভাবে খোঁজা শুরু করেনি।

এটাই আমার কাছে সুযোগ ছিল। কিন্তু মার্জিয়া আমাকে সাহায্য না করলে আমার পরিকল্পনা সফল হবেই না। আমি মার্জিয়া মামীকে বুঝাই, কার্ড দিয়ে যাই। তারই কিছুদিনের মাথায় শুনি তার স্বামীর এক্সিডেন্ট হয়। অবস্থা খুব খারাপ। বাঁচানো যাবে না টাকার দরকার। তখন তাদেরকে আমিই টাকা দেই। বিনিময়ে তাদের কাছে কোনো উপায় না থাকায় আমার শর্ত তাদের মেনে নিতে হয়। শুরু হয় আমার সেই বাড়িতে চিত্রাঙ্গনা তালুকদার হিসেবে দিন শুরু করার গল্প। আমার মতো মেয়ের কিন্তু এইসবের দরকার ছিল না৷ কিন্তু কেন করেছি জানেন? আপনার কাছে যাওয়ার জন্য। প্রতিশোধ নেওয়ার অযুহাতেও যেন আপনাকে পাই কেবল তারই জন্য। যখন জানতে পারি আপনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন না, মেয়ে মানুষের ঠাঁই নেই আপনার হৃদয়ে তখন এই পথ অবলম্বন করা ছাড়া আমার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না।”

“আশপাশের মানুষ সন্দেহ করেনি? না মানে তোমার চেহেরা আর তালুকদার বাড়ির মেয়ের চেহেরা নিশ্চয়ই এক না।”
“সেটার জন্যও আমি ব্যবস্থা করেছিলাম। যেহেতু পাঁচ বছর আগেই হুট করে নিখোঁজ হয়ে যায় ওই মেয়ে তাই মানুষ একটা সময় বদনাম করতে করতে ভুলেই গিয়েছিল তার কথা। আমি যখন তাদের বাসায় আসি, তখন সবাইকে তারা বলেছিল তালুকদার বাড়ির সেই মেয়েকে মনসুর কাদের খুঁজে পেয়েছে। সে হারিয়ে ঢাকার এক পরিবারের কাছে চলে গিয়েছিল। সেখানেই এই পাঁচ বছর মানুষ হয়েছে। যেই বাড়িতে মানুষ হয় সেই বাড়ির মানুষের তাকে দেওয়া নাম হচ্ছে চিত্রাঙ্গনা। সবাই সেটা মেনেই নেয়। এমনিতেও মনসুর কাদের আর মার্জিয়াদের অবস্থা খারাপ থাকায় তাদের সাথে প্রতিবেশীদের তেমন সম্পর্ক ছিল না৷ আর তালুকদার বাড়ির সেই মেয়েকে মার্জিয়া ঘর থেকে বের হতে দিতেন না৷ কারণ সে জানে তার পরিবারকে যে মেরেছে একদিন তাকেও খুঁজে মারবে। তাই মানুষ ওই মেয়ের কথা তেমন একটা জানত না।”

“তাহলে যে তোমার সাথে সোহাগের সম্পর্ক? মার্জিয়া, মারিয়াদের তোমার ওপর অত্যাচার চালানো? তোমাকে বিয়ে করার পর যে বিয়ের রাতে তোমার গায়ে দাগ দেখতে পেয়েছিলাম?”
“বলছি, সব বলছি। মার্জিয়া কোনোদিন আমার গায়ে হাত দেওয়া তো দূরের বিষয়, হাতও তুলেননি। তবে মারিয়ার বিয়ে আমি আসার পরে হয়। তাই আমি বাড়ির মানুষকে আগেই সাবধান করেছিলাম যেন মারিয়া আমার বিষয়ে না জানতে পারে। যত কম মানুষ জানবে ততই মঙ্গল হবে। আর বাকি রইল সোহাগের সাথে আমার প্রেম কাহিনি? আসলে আমাদের মধ্যে কিছু ছিলই না। কেবল ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে আমাদের প্রেমের মিথ্যা নাটক সাজানো হয়। কিন্তু বেচারা সোহাগ নাটক করতে গিয়ে আমার প্রেমে পড়ে যায়৷ যার কারনে সে আজও পস্তাচ্ছে৷ ভালো করে মনে করুন তো, তালুকদার বাড়ির মেয়েকে যে আপনি ভেতর ভেতর খোঁজাখুঁজি করছিলেন সেই খবর আপনি কাকে কাকে জানিয়েছেন?”

“অভ্র।”
“আর?”
“বজ্র।”
“হ্যাঁ। আর এই বজ্রই কিন্তু সর্বপ্রথম তালুকদার বাড়ির মেয়ের খোঁজ পেয়েছে তারপর সেটা আপনাকে জানায়।”
“ওয়েট বজ্রের সাথে তোমার সম্পর্ক কী? মানলাম তুমি ২০ সালে আমার সম্পর্কে জেনেছো কিন্তু বজ্রের সঙ্গে তো আমার আরো অনেক আগ থেকেই সম্পর্ক। বলো বজ্র তোমার কী লাগে?”
“বজ্র? বজ্র কায়সার, কায়সার বংশের ছেলে। আমার চাচাতো ভাই।”
“বউ বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। একগ্লাস বিষ দাও পান করি।”
“বিষ পরে খাবেন,আগে আমার কথা শুনুন।”

ফারাজ নিঃশ্বাস ছাড়তেই চিত্রা পুনরায় বলতে শুরু করল, “কায়সার বাড়ির সবাই এই পেশার সাথে জড়িত হলেও বজ্র ডাক্তারি পেশা বেছে নিয়েছিল। বড় আব্বু এই কারনে বজ্র ভাইয়ের ওপর রাগ করেন অনেক। শেষে ঝামেলা হয় বজ্র ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। সেখান থেকে গিয়েই আপনার সাথে পরিচয় হয়। বাড়িতে বড় আব্বু বাদে বজ্রের সাথে যোগাযোগ আমাদের সবারই ছিল। যদিও বড় আব্বু চেয়েছিলেন বজ্রের সাথে কথা বলতে। আসলে বাবা ছেলের রাগ তো, ওইসব থাকে না। ওনারা দু’জনই দু’জনকে ছাড়া থাকতে পারেনা, আবার ওপর ওপর অভিমান দেখাতেন। তারপর ২০ সালে এলে আমি আমার বাবা আর মাকে আপনার কথা জানাই, তারা প্রথমে বিষয়টা মানতেই পারছিল না। তাদের মেয়ে একজন অপরাধীকে ভালোবাসবে? কিন্তু না করার মতো উপায়ও তাদের ছিল না কারণ আমি তাদের একমাত্র মেয়ে। আর আমি বলেদিয়েছিলাম যদি আমার কথা না মানা হয় তবে কোনো দায়িত্ব আর আমি পালন করতে পারব না। এরই মাঝে বজ্রের সঙ্গে বাড়িতে ঝামেলা ঠিক হয়ে যায়। বাসার সবাই চেয়েছিলেন আমার আর বজ্র ভাইকে বিয়ে দিবে। কিন্তু আমরা দুজনেই রাজি ছিলাম না।

যদিও বড় আব্বু এই বিষয় নিয়ে এখনো রেগে আছেন। যাক বাদ দেন, তারপর শুনুন আপনার ফাইল নিয়ে একদিন রাতে ঘাটাঘাটি করছিলাম ওইদিন বজ্র ভাই হুট করে আমার রুমে এসেই ল্যাপটপে আপনার ছবি দেখতে পায়। সেখান থেকে জানতে পারি আপনি আর সে বন্ধু। একবার আপনার বুকে গুলি লেগেছিল ওইসময় আশেপাশে কেউ ছিল না৷ বজ্রই সেদিন আপনাকে বাঁচায়। সেদিন থেকেই আপনার সাথে বজ্রর ভালো সম্পর্ক হয়, সেই সম্পর্ক থেকে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। বজ্র যখন আপনার ছবি আমার ল্যাপটপে দেখেছিল তখন সে জিজ্ঞেস করে, আপনাকে দিয়ে আমার কী কাজ? সব খুলে বলার পর সে আপনার কথা বলে। আমার কাজ তখন আরো সহজ হয়ে যায়। যেহেতু আমি আপনাকে ভালোবাসতাম, তাই বজ্র জানত আমি আপনার ক্ষতি করব না। আর তাই সে শুরু থেকেই আমাকে সাহায্য করে। বাড়িতে আমি বলি, আমি আপনাকে ধরার মিশনে যাচ্ছি, আর বজ্র বলে সেও আমাকে সাহায্য করতে আমার সাথেই যাবে। কিন্তু ওনারা তো আমাদের পরিকল্পনা জানতেন না। ওনারা আরো খুশি হয় কারন এইবার যদি আমার আর বজ্রের এই উছিলায় একটা গতি হয়।

এই বজ্রই আমার কথায় আপনার কাছে তালুকদার বাড়ির মেয়ের ইনফরমেশন দেয়। সেই ইনফরমেশন পেয়ে আপনি লোক লাগান আমার ওপর। সেই লোকেদের মাধ্যমে আমি অসহায় চিত্রাকে আপনার সামনে তুলে ধরেছি। আমি আপনাকে যা দেখিয়েছি আপনি তাই দেখেছেন। কিন্তু বছর গড়িয়ে গেলেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। কারণ আপনার সাথে আমি দেখাই করতে পারিনি কি করে দেখা হবে এটাও বুঝতে পারছিলাম না। প্রতিশোধের অযুহাতেও আপনার দর্শন চাইছিলাম। শেষে ভাবলাম এভাবে অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। অন্য কিছু করতে হবে। আমার তখন একটা গুটির দরকার ছিল। খুঁজে পেলাম মিজান নামক এক ব্যক্তিকে। সে জায়গায় জায়গায় বিয়ে করে বউ পাচারকারীদের সাপ্লাই দেয়। মার্জিয়া, মাহাদী ওদের দিয়ে মিজান সাহেবের কাছে আমার কথা জানান দিলাম। মিজানকে আমার ছবি দেখানোর পর সে তো দেওয়ানা। মিজানের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হলো। সোহাগকে ওইসময় কিছু জানানো হয়নি৷ একটা কথা বলব এলাহী সাহেব?

আপনাকে পাওয়ার লোভে আমি চিত্রা স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম, আপনাকে পাওয়ার লোভে সোহাগকে ধ্বংস করে দিলাম। এই আফসোস আমার ফুরোবে না। আপনি যেই লোক চিত্রা তালুকদারের পেছনে লাগিয়েছেন সেই লোক বিয়ের বিষয়ে জানতেই আপনাকে খবর দেয়। আপনি তখন ডেনমার্ক ছিলেন আপনার মায়ের জন্মভূমিতে। খবর পেয়ে ইমারজেন্সি ফ্লাইটে করে দেশে এসে আমাকে বিয়ে করেন। আপনি ভেবেছিলেন, চিত্রাকে এতদিন পাহারা দিয়ে রেখেছিলাম, এখন সুযোগ বিয়ে করে প্রতিশোধ নেওয়ার। অথচ আমি চিত্রাই আপনাকে সুযোগ করে দিয়েছিলাম, আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী সব হচ্ছিল ঠিক যেমনটা চেয়েছিলাম তেমন। আমি আপনার ভালোবাসায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে জানতাম আপনার হাতে আমার মৃত্যুও হতে পারে, তবুও আমি আপনাকেই বেছে নিয়েছিলাম। আমার নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল, বিশ্বাস ছিল একদিন আপনি আমার প্রেমে পড়বেন, ভালোবাসতে শিখবেন। ঠিক তাই হলো।”

“সেই রাতে যদি আমি না আসতাম?”
“সেই নিয়ে ভাবিনি, তবে মিজান সাহেব আমার হাতে যে মরত তা সিউর ছিলাম।”
“সোহাগ বিয়ের রাতে নিখোঁজ ছিল। তারপর যখন ফিরল বউ নিয়ে। এটাও কী পরিকল্পনা?”
“উঁহু সে যেন বিয়ের সময় ঝামেলা না করে তাই তাকে রাতের দিকে কাজের বাহানায় বাইরে বের করা হয়। ভেবেছিলাম বন্দী করে রাখব। কিন্তু তার আগেই জান্নাত নামক মেয়েটিকে বাঁচাতে তাকে বিয়ে করতে হয়। সেই ঝামেলা শেষ করে বউ নিয়ে সকালে সে বাড়ি এসে আমার বিয়ের কথা শুনে নিজের অসহায় ভাগ্যকে মেনে নেয়।”
“তার মানে যেই তালুকদার বাড়ির জন্য তুমি এত কেঁদেছো সেটা তোমার বাড়িই নয়?”
চিত্রা ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়। সে অবাকের ওপর অবাক হচ্ছে। “ আয়েশা আর জমেলার তোমার সাথে কী সম্পর্ক?”

“ওরাও আমার সংস্থার লোক। জমেলা সুস্থ মানুষ, সে আমার বাবার আমল থেকে আমাদের সাথে কাজ করছে। আপনারা যেই জমেলাকে চিনেন মূলত সে জমেলা না, সে জুনাইয়া সুলতানা। ফিনিক্স সংস্থার সে আন্ডারকভার এজেন্ট এবং সঙ্গে ডিপ-ইনফিলট্রেশন এক্সপার্ট। আমাদের সংস্থায় কিছু ইউনিট আছে। যার মধ্যে একটা হচ্ছে রেভেন ইউনিট। নীরব পর্যবেক্ষণ ও নজরদারিতে এই ইউনিট ভূমিকা পালন করে। যার দায়িত্বে আছে জুনাইয়া সুলতানা। আর আয়েশাকে তিনি পেলেছেন। আমি আর আয়েশা একই সাথে হয়েছি। আয়েশাও কোনো সাধারণ ব্যক্তি নয়। সে স্নাইপার স্পেশালিস্ট। শুটিংয়ে সবচেয়ে বেশি পারদর্শীদের মধ্যকার একজন। ওর গুলি মিস হওয়ার চান্স নেই। একই সঙ্গে আয়েশা ট্যাকটিক্যাল অপারেটিভও। সরাসরি সে মিশনেও যায়৷ আমাদের ভাইপার ইউনিটের লিডার সে। আয়েশা আর জমেলাকে আমার এখানে দরকার ছিল। তাই তাদেরকে এই বাড়িতে কাজের অযুহাতে আপনার মাধ্যমেই প্রবেশ করাই। আয়েশা প্রথমবার অভ্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল একবার। যেদিন আমি আর আপনি তালুকদার বাড়িতে যাই সেদিন রাতে। ওই ধাক্কাটাও মূলত আমাদের পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৯

ফারাজ কিছুক্ষণ কেবল চিত্রার দিকে চেয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “একটা জবাব দেও তো, তোমার কী তাহলে বাবা মা বেঁচে আছে?”
চিত্রা নিচের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, “হ্যাঁ বেঁচে আছে।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮১