Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৮

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৮

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৮
ইশরাত জাহান জেরিন

দুপুরের রৌদ্র তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। আকাশে একরাশ স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে আছে। খাওয়ার টেবিলে বসে চিত্রা ধীরে ধীরে ভাত মাখছে।
ফারাজ সামনে বসে আছে, কিন্তু তার চোখ যেন সারাক্ষণ চিত্রার দিকেই।
“চিত্রা, এত দ্রুত খেও না। ধীরে খাও। বজ্র বলেছিল না, তাড়াহুড়া করা যাবে না।”
চিত্রা মৃদু হেসে তাকায়। “আমি তো ধীরেই খাচ্ছি। আপনি এমনভাবে বলছেন যেন আমি যুদ্ধ করছি।”
পাশ থেকে বজ্র বলল, “আজকাল আমি কিছু না বললেও আমার ওপর দোষ চাপায় একজন মানুষ। এসব কিন্তু ছোটলোকি কারবার।”
ফারাজ তার দিকে আঁড়চোখে একবার তাকিয়ে চিত্রাকে গম্ভীর মুখে বলল,

“যুদ্ধই তো।”
খাওয়া শেষ হলে ফারাজ নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। “এটা খাও। তারপর একটু বিশ্রাম নাও। তারপর আমরা বের হবো।”
চিত্রা হেসে বলে, “আমি কি এতটাই দুর্বল হয়ে গেছি?”
ফারাজ নরম স্বরে উত্তর দেয়, “দুর্বল না… আগের থেকেও অধিক মূল্যবান।”
চিত্রা তাকিয়ে রইল তার দিকে।
ফারাজ আবার বলল, “ভাঙা জিনিসকে মানুষ ফেলে দেয়, কিন্তু যেগুলো আবার জোড়া লাগে—সেগুলোকে মানুষ যত্ন করে রাখে। কারণ তখন সে জানে, হারানোর ভয়টা কেমন।”
বজ্র তখন মুচকি হেসে বলল, “আহা! দুপুরের ভাতের সাথে দর্শনও পরিবেশন হচ্ছে দেখছি।”
ফারাজ শান্ত স্বরে উত্তর দিল, “দর্শন না বজ্র, এটা খুব সাধারণ কথা। তোর মতো হাতুড়ি টু মাচ ছোটলোক ওইসব বুঝবে না। শুন, যাকে মানুষ সত্যি যত্ন করে তার জন্য নিয়ম বানায়, সময় থামায়, আর নিজের স্বভাবও বদলে ফেলে।”

চিত্রা ধীরে ধীরে পানি খেল। ফারাজ আবার বলল,
“জানো চিত্রা, পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে—
একজন থাকে নিজের মতো, আরেকজন থাকে অন্য কারো জন্য। দ্বিতীয় মানুষগুলোই পৃথিবীকে একটু সহনীয় করে রাখে।”
চিত্রা মৃদু স্বরে বলল,
“আর আপনি কোন দলে?”
ফারাজ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর শান্তভাবে বলল,
“আমি চেষ্টা করছি দ্বিতীয় দলে নাম লেখাতে।”
দুপুরের আলো তখন আরও কোমল হয়ে এসেছে। জানালার পাশে রাখা মানিপ্ল্যান্টের পাতায় রোদ পড়ে সবুজ ছায়া তৈরি করেছে ঘরে। খাওয়া-দাওয়া শেষ। চিত্রার খাবার সবার শেষে শেষ হয়েছে। চিত্রা হাত ধুতে উঠতেই ফারাজ দ্রুত এগিয়ে এসে তোয়ালেটা এগিয়ে দিল।

“ধীরে… মেঝেটা ভেজা।”
চিত্রা অবাক হয়ে হেসে বলল,
“আপনি কি সবসময়ই এত সতর্ক থাকেন, নাকি শুধু আজ?”
ফারাজ শান্তভাবে উত্তর দিল, “মানুষ তখনই সতর্ক হয়, যখন কিছু হারানোর ভয় জন্মায়।”
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পিয়াস পাশ থেকে হালকা গলায় বলল,
“আচ্ছা ফারাজ, এত যত্ন করলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায় কিন্তু।”
ফারাজ হেসে বলল,
“যত্নে অভ্যস্ত হওয়া দোষের না। অবহেলায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ওটাই আসল দুঃখ।”
চিত্রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছে। ফারাজ চেয়ারটা একটু সরিয়ে দিল যাতে চিত্রা সহজে বসতে পারে। তারপর নরম স্বরে বলল,
“খারাপ লাগছে?”
চিত্রা মাথা নাড়ল। “না, তেমন না।”
ফারাজ ধীরে বলল,
“মানুষ অনেক সময় ক্লান্তি টের পায় না।”
বজ্র এবার হাসল।

“তুমি তো দেখি মানুষের মনের ডাক্তার হয়ে গেছ!”
ফারাজ মৃদু হেসে বলল, “না, ডাক্তার না। কিছু মানুষকে শুধু মন দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়।”
চিত্রা জিজ্ঞেস করল, “আমাকে কি খুব বোঝা যায়?”
ফারাজ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“তোমাকে বোঝা যায় না… তোমাকে অনুভব করতে হয়।”
বজ্র তখন মজা করে বলল, “এইসব কথা শুনতে শুনতে আমারই কবি হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে।”
ফারাজ মৃদু হেসে উত্তর দিল, “কবিতা তো মানুষ তখনই লেখে বজ্র যখন তার কাছে কেউ খুব প্রিয় হয়ে ওঠে।”
চিত্রা ধীরে ধীরে জানালার বাইরে তাকাল। দূরে রোদ নরম হয়ে আসছে। ফারাজ আবার শান্ত কণ্ঠে বলল,
“জানো চিত্রা, পৃথিবীতে সব সম্পর্ক শব্দে হয় না।
কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় শুধু যত্নের ভেতর দিয়ে।”
চিত্রা তাকাল তার দিকে। ফারাজ হেসে বলল, “বাগানে যাবে?”
সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বজ্র চেয়ার ঠেলে উঠে হেসে বলল, “আমি কিন্তু এই হাঁটাহাঁটির নাটকে যাচ্ছি না। তোমরা যাও, আমি শান্তিতে চা খাই।”

ফারাজ মুচকি হেসে বলল,
“সব জায়গায় দর্শক থাকা জরুরি না, বজ্র।” বজ্র চুপসে গেল। মুখ বাঁকিয়ে বলল, “বউ আমারও আছে ব্যাটা। তুই আমার বোন নিয়ে যাচ্ছিস না? আমি তোরটা নিয়ে যাবো।”
বাগানের পথে হাঁটতে হাঁটতে চিত্রা চারদিকে তাকাল। শিউলি গাছের নিচে সাদা ফুল পড়ে আছে। দূরে পুকুরের পানি রোদের আলোয় চিকচিক করছে।
ফারাজ ধীর পায়ে হাঁটছে, যেন চিত্রার গতির সাথে তাল মিলিয়ে। “ক্লান্ত লাগছে?” সে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল।
চিত্রা মাথা নেড়ে বলল,
“না… বরং ভালো লাগছে।”
ফারাজ হালকা হাসল।

“প্রকৃতির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মানুষের ভেতরের ক্লান্তিটা সে চুপচাপ টেনে নেয়।”
পুকুরপাড়ে একটা পুরোনো কাঠের বেঞ্চ। দুজন গিয়ে সেখানে বসে পড়ল।
পুকুরের পানি স্থির। মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে ঢেউ উঠছে। চিত্রা পানির দিকে তাকিয়ে বলল,
“পুকুরের পানি সবসময় এত শান্ত কেন?”
ফারাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,
“কারণ সে গভীর। যা যত গভীর, তা তত কম শব্দ করে।”
“শুনছেন?”
“হুম।”
“এই দুনিয়ার মানুষের তো কত আবেগ, আপনার কাছে এই আবেগ মানে কী?”
“আবেগ… মানে তুমি। কারণ তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে আমার ভেতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয় তার কোনো যুক্তি নেই, তবু সেটা সত্যি।”
চিত্রা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। “তাহলে প্রাপ্তি?”
ফারাজ পুকুরের দিকে তাকিয়ে আবার বলল, “দু’জন থেকে তিনজন হতে পারা। তারচেয়ে বড় প্রাপ্তি তোমায় অর্ধাঙ্গনী হিসেবে পাওয়া।”
চিত্রা মৃদু স্বরে বলল,

“তাহলে ভয়?”
ফারাজ এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
“ভয় মানে, তোমাকে হারানো। আমার জীবনে তুমি হারানোর চেয়ে বড় ভয় আর দু’টো নেই। তোমাকে যখন কোথায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখন উপলব্ধি করতে পারলাম আমি ফারাজ এলাহী কতখানি ভিতু,একটা মানুষকে ভয় কতখানি কাবু করতে পারে। আমি ওমন ভয় আর পেতে চাই না বিবিজান। ওমন ভয় কোনো স্বামীর জীবনে না আসুক।”
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফারাজের হাত ধরে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল বাঁশবাগানের ডালে বসে থাকা মাছরাঙাটির দিকে।

বিকেলের দিকে চিত্রা আর ফারাজ বের হলো। গাড়ির দরজা খুলে ফারাজ আগে চিত্রাকে বসতে দেয়। তারপর সিটবেল্ট লাগিয়ে দেয় নিজের হাতে।
“আরাম লাগছে তো?”
“হ্যাঁ, ঠিক আছি।” গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তায় এগিয়ে যায়। ফারাজ আজ অদ্ভুতভাবে সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে। যেন সামান্য ঝাঁকুনিও চিত্রার কাছে পৌঁছাতে না পারে। মাঝে মাঝে সে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কোনো অস্বস্তি হচ্ছে?”
চিত্রা একটু বিরক্ত সেজে বলে, “আপনি যদি প্রতি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আর একবারও এই কথা জিজ্ঞেস করেন, তাহলে এইবার অবশ্যই অস্বস্তি হবে।”
ফারাজ হালকা হাসে।“ঠিক আছে, আর জিজ্ঞেস করবো না… কিন্তু তুমি নিজে বলবে।”
চিত্রা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলে, “জানেন ফারাজ… মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একা নই। কেউ যেন আমার সাথে হাঁটছে।”

ফারাজের কণ্ঠ নরম হয়ে যায়। “সে তো আছেই। আমাদের ছোট্ট অতিথি।”
গাড়ি তখন ধীরে ধীরে শহরের ভিড় পেরিয়ে তুলনামূলক শান্ত এক রাস্তায় ঢুকেছে। বিকেলের আলো জানালার কাঁচে এসে পড়ছে। চিত্রা পাশের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। বাতাসে তার চুলের কিছু আলগা গোছা উড়ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর সে হঠাৎ বলল,
“একটা প্রশ্ন করবো?”
ফারাজ হালকা হাসল। হাজারটা করুন ম্যাডাম।” চিত্রার পা দু’টো এখনো ফারাজের উরুর ওপরে। সে তাতে একটু পর পর চুমু খাচ্ছে। একহাতে ড্রাইভ করে অন্যহাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
চিত্রা একটু ভেবে বলল,
“আপনার কাছে জিদ মানে কী?”
ফারাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল, “আমার কাছে জিদ মানে কেবল তুমি। চিত্রাঙ্গনাকে নিজের করে পাওয়া, সারাজীবনের জন্য নিজের করার চেয়ে বড় জিদ ফারাজ এলাহীর জীবনে দু’টো নেই।” সে একটু থামল।
“কিন্তু একটা কথা আছে।”

চিত্রা তাকাল।
“সব জিদ ভালো না।
কিছু জিদ মানুষকে ভাঙে… আর কিছু জিদ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল,
“আপনার জিদ কোনটা?”
ফারাজ এগিয়ে এসে চিত্রার কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“তোমাকে সুখে রাখা।”
চিত্রা কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের তীর্যক হাসি ফুটে উঠল। গাড়ি তখন গাছঘেরা সরু রাস্তা ধরে এগোচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর চিত্রা আবার বলল,
“আচ্ছা… এবার বলুন, আপনার কাছে ভালোবাসা মানে কী?”
ফারাজ গভীর শ্বাস নিল। “ভালোবাসা… বলতে আমি তোমায় বুঝি। তুমি কাঁদলে এ-ই বুকে ব্যথা করে। তুমি হাসলে অজান্তেই মন হেসে উঠে। তোমার কষ্ট দেখলে ঠিক থাকতে পারি না। এটা কী ভালোবাসা নয়?”
চিত্রা চুপ করে শুনছে।

ফারাজ বলল, “মুখে হাজারবার না বলেও কাজে ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলাকে আমি ফারাজ ভালোবাসার যুক্তিতে রাখি।
চিত্রা ধীরে বলল, “আপনি খুব দার্শনিক হয়ে গেছেন।”
ফারাজ হাসল।
“না। শুধু তোমায় ভালোবাসতে গিয়ে নতুন কিছু শিখেছি।”
গাড়ির ভেতর আবার কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো। বাইরে আকাশে মেঘ জমেছে হালকা।
চিত্রা আবার বলল, “আর একটা প্রশ্ন?”
“করো।”
“আপনার কাছে হাহাকার মানে কী?”
এইবার ফারাজের মুখের হাসিটা একটু ফিকে হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল, হাহাকার… মানে এমন একটা শূন্যতা, যেটা মানুষের ভেতরে শব্দ না করেও চিৎকার করে।”
চিত্রা তাকিয়ে রইল। যেদিন তালুকদার বাড়িতে আমার সত্য তোমায় জানালাম, তুমি মুখ ঘুরিয়ে বললে, আমায় ঘৃণা করো। সেদিন তোমাকে পাওয়ার জন্য খোদার আসমানের দিকে তাকিয়ে যেই ফরিয়াদ করেছিলাম। যেই শব্দহীন চিৎকার করেছিলাম হাহাকার বলতে আমি কেবল তাই বুঝি।”

চিত্রা নিঃশব্দে তার হাতের ওপর হাত রাখল।
গাড়ির ভেতর হালকা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর চিত্রা আবার বলল,
“তাহলে দুঃখ?”
ফারাজ এইবার খুব দ্রুত উত্তর দিল না।রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলল,
“দুঃখ… সবসময় খারাপ কিছু না।”
চিত্রা অবাক হলো।
“মানে?”
ফারাজ বলল, “যে মানুষ কখনও দুঃখ পায়নি, সে আসলে সুখের দামও বোঝে না। মায়ের মৃত্যুতে যেই দুঃখ পেয়েছিলাম সেই দুঃখ না পেলে তুমি নামক সুখ পেতাম না। তাই আমি দুঃখকে বড্ড ভালোবাসি বিবিজান। তবে কিছু দুঃখেও দুঃখ আছে। এই যেমন তোমার আগে মরতে না পারলে আমার পুরো জীবনটা একটা দুঃখে বদলে যাবে। তাই বলছি, দুঃখ বলতে আমি তোমার আগে দুনিয়া ছাড়তে না পারাকে বুঝি। ভাবো চিত্রা খোদা আমার প্রতি কতখানি নারাজ হলে, আমায় এতবড় শাস্তি দিবেন? খোদার সব শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি, কিন্তু তোমার খাটিয়া নিজের কাঁধে তোলার মতো এত কঠোর শাস্তি নিতে আমি ফারাজ এলাহী অন্তত পারব না।”
চিত্রা মৃদু স্বরে বলল, “তাহলে… সুখ?”

এইবার ফারাজ একটু হাসল। গাড়ি তখন একটা দীর্ঘ রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। দুপাশে গাছের সারি।
সে বলল, “এইযে এই মুহূর্তটা। তোমার সাথে কাটানো এমন প্রতিটি প্রহর আমার জন্য সুখের। তুমি আমার প্রিয় সুখ, সুখের ওপর নাম তুমি। এক থেকে দুজন, দুজন থেকে তিনজন এটা কী সুখ নয় বিবিজান? আমার কাছে সুখ মানে তো এই অনুভূতিগুলোই।”
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে বলল, “আপনি জানেন…?”
“কি?”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “আপনি যখন এমন কথা বলেন, তখন মনে হয় পৃথিবীটা খুব একটা কঠিন নয়, কেবল তাকে সহজ করে দেওয়ার মতো একজন আপনি থাকলেই যথেষ্ট। আচ্ছা একটা শেষ প্রশ্ন করি?”
ফারাজ নরম গলায় বলল, “করো।”
“আপনার আর আমার মধ্যে যখন একটা বিরোধের লম্বা, শক্ত প্রাচীর তৈরি হলো তখন এই ফারাজ এলাহীটা কোথায় ছিলো?
ফারাজ এবার গাড়ি থামিয়ে দিলো। চিত্রার দিকে একবার তাকিয়ে ঝুঁকে এগিয়ে এলো। আস্তে করে তার কানের কাছ থেকে আলতো করে চুল সরিয়ে, মুখটা এগিয়ে এনে ফিসফিসিয়ে বলল,
❝তুমি যখন শাসক ছিলে,
নিষিদ্ধ রাজনীতি জুড়ে,
আমি ছিলাম বিরোধী দলে
একলা একা দূরে❞

হাসপাতালে এসেছে চিত্ররাজ। চারপাশে জীবাণুনাশকের গন্ধ।ফারাজ রিসেপশনে গিয়ে নাম লিখিয়ে আসে। তারপর এসে চিত্রার পাশে বসে।
“আর একটু অপেক্ষা। তারপর ডাকবে।”
চিত্রা হালকা ক্লান্ত হয়ে মাথা চেয়ারের পেছনে ঠেকায়। ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে।
“ক্লান্ত লাগছে?”
“না, শুধু একটু ভারী লাগছে।”
ফারাজ তার ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে
দেয়। “একটু পানি খাও।”
হঠাৎ নার্স এসে ডাক দেয়,
“মিসেস চিত্রা?”
ফারাজ সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়।
“চল।”

ডাক্তারের কক্ষে আগে চিত্রা প্রবেশ করে। ফারাজ তাকে চেয়ার টেনে বসিয়ে নিজে পাশে বসল।
ডাক্তারের কক্ষটা ছিমছাম। টেবিলের ওপারে মাঝবয়সী এক নারী ডাক্তার বসে আছেন।
ডাক্তার হাসিমুখে বলেন,
“তিন মাস চলছে তো?”
চিত্রা মাথা নাড়ে।
ডাক্তার কিছু প্রশ্ন করেন, কিছু পরীক্ষা করেন। ফারাজ পুরো সময়টা মনোযোগ দিয়ে শুনছে।
“ও কি ঠিকমতো খাচ্ছে?” ফারাজ জিজ্ঞেস করে।
ডাক্তার হেসে বলেন, “আপনি বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।”
ফারাজ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, “প্রথমবার… তাই।”
ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বলেন, “সবকিছু ভালো আছে। বাচ্চার গ্রোথও ঠিক আছে।”
চিত্রা নিঃশ্বাস ফেলে স্বস্তি পায়।
ফারাজের মুখে যেন আলো ফুটে ওঠে।
“সত্যি? কোনো সমস্যা নেই?”
“না। শুধু নিয়মিত খাবার আর বিশ্রাম দরকার।”
ক্যাবিন থেকে বের হয়ে গাড়ির সামনে এসে ফারাজ বলল, “দেখেছো তো ডাক্তার কী কী বলেছে? পাই টু পাই সব মেইনটেইন করতে হবে। শুনো এখন থেকে একটা কাজেও তুমি হাত দিবে না।”
“দেই কোথায়?”

“যা দেও তাও বন্ধ। দরকার হলে আমি ফারাজ তোমার প্রতিটি কাজের জন্য মানুষ রাখব। আর আমার অনুমতি ছাড়া কিছুই করবে না। কারন তুমি পাকনামি করে সব বাজে জিনিসগুলোই করো। এই শুনো, বাড়িতে একটা লিফট লাগিয়ে দিবো। যাতে দোতলা থেকে তোমার নামতে উঠতে কষ্ট না হয়।”
“আরে আপনার মাথা গেছে। এসব কাজ করলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
ফারাজ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “আচ্ছা তাহলে শুনো তোমার কখন নিচে নামা লাগবে, আর উঠা লাগবে আমাকে জানিও। আমি কোলে করে তোমাকে ওপরে উঠাবো আবার নামাবো।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৭

“আপনি যখন কাজে থাকবেন?”
“আমাকে কল করবে। আমি বাসায় এসে তোমাকে নিচে নামাবো, আর নিচে থাকলে ওপরে উঠিয়ে দিবো। তাও আমি না আসা অবধি পাকনামি করা যাবে না।”
চিত্রা মনে মনে হাসল। আসলেই লোকটার মাথা গেছে।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৯